আনন্দবাজার পারবে এই রংবাজির উত্তর দিতে?

সুমন সেনগুপ্ত, ইনস্ক্রিপ্ট
সুমন সেনগুপ্ত, ইনস্ক্রিপ্ট

স্ট্রিম গ্রাফিক্স
স্ট্রিম গ্রাফিক্স

আনন্দবাজার পত্রিকার দফতরে কিছু গেরুয়া পরিহিত মানুষজন বিক্ষোভ দেখালেন। শুধু বিক্ষোভ নয়, দেখা গেল তার মধ্যে বেশ কিছু বিক্ষোভকারী আনন্দবাজারের উদ্দেশ্যে স্লোগান দিল হিন্দিতে যে ওই পত্রিকার যারা সাংবাদিক তাঁরা সবাই 'দিমাগি নকশাল'। বিষয়টি সেখানেই থামল না। কয়েকজন বিক্ষোভকারীকে দেখা গেল, পত্রিকার দফতরের স্তম্ভগুলিতে গেরুয়া রং লাগাতে। ওই বিক্ষোভ চলাকালীন সবচেয়ে আশ্চর্যজনকভাবে দেখা গেল, কলকাতা পুলিশের কিছু মানুষজন আগের সরকারের দেওয়া নীল সাদা ছাতা হাতে দাঁড়িয়ে পুরো বিষয়টি দেখছেন। কোনোভাবে ওই বিক্ষোভকারীদের আটকানোর চেষ্টা করছেন না, নিরস্ত করার চেষ্টা করছেন না।

যাঁরা জানেন না তাঁদের জন্য পুরো ঘটনাটি জানানো দরকার—কোথা থেকে আনন্দবাজারের উপর এই আক্রোশ তৈরি হলো। কিছুদিন আগে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে এবিভিপি ছাত্রদের সারারাত জুড়ে তাণ্ডবের পরে আনন্দবাজার পত্রিকা শিরোনাম করেছিল 'গেরুয়া গুন্ডামি'। সেই শিরোনাম রুষ্ট করেছে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে। তিনি নাম না করে সরাসরি হুমকি দিয়েছিলেন, একটি সংবাদপত্র গোষ্ঠী সচেতন ভাবে গেরুয়া রং-এর অপমান করেছে। তিনি আরও বলেছিলেন, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ক্ষমা চাইতে হবে নয়তো হাজারে হাজারে গেরুয়া বসন পরিহিত মানুষজন আনন্দবাজারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ দেখাবে। তার আরও বক্তব্য ছিল, গেরুয়া রং ত্যাগের প্রতীক, ওই রঙের বিরুদ্ধে কেন লেখা হলো?যদি মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে যদি কোনো অভিযোগ থাকে, বিজেপির বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকে, তাহলে সেই সমালোচনা চলতে পারে কিন্তু ওই রংকে নির্দিষ্ট করে কেন ওই শিরোনাম?

মনে রাখতে হবে, বিজেপি জেতার পর যখন লেখা হয়, 'গেরুয়া ঝড়' তখন কিন্তু কোনো সমস্যা হয় না। বিজেপির বিধায়ক থেকে শুরু করে এবিভিপির সদস্যরা যখন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলা চালান, যখন ক্যামেরার সামনে বিজেপির বিধায়ক গলার শিরা ফুলিয়ে বলেন সারারাত তাণ্ডব চলবে তখন 'গেরুয়া গুন্ডামী' লেখা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে কি? আরও অন্যরকম শিরোনাম হয়তো দেওয়া যেত কিন্তু এই শিরোনাম অত্যন্ত উপযুক্ত যে হয়েছে তা তার বিরোধিতা দেখেই বোঝা যায়।

এমনিতেই সংবাদপত্রের স্বাধীনতার সূচকে ভারতের স্থান ক্রমশ তলানিতে ঠেকছে। ১৮০ টি দেশের মধ্যে ভারতের স্থান ১৫৭ তম। ভারতের সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার সূচকে ক্রমাগত এই নিম্নমুখী অবস্থানের পিছনে দেশের প্রথম সারির সংবাদপত্র ও সংবাদমাধ্যম আনন্দবাজার গোষ্ঠীর ভূমিকাও কম নয়। তারা বিভিন্ন সময়ে সরকারের বিভিন্ন অনৈতিক কাজ দেখেও না দেখার ভান করেছে।

এবার মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন, গেরুয়া রং ত্যাগের প্রতীক। আমাদের জাতীয় পতাকার কথা ভাবার সময়ও এই ত্যাগের ভাবনাটিই মাথায় রাখা হয়েছিল। ভারতবর্ষ যে ত্যাগ ও আত্মত্যাগের আদর্শকে ধারণ করে, জাতীয় পতাকার গেরুয়া রং সেই ভাবনারই প্রতীক। কিন্তু যখন দেখা যায়, এই গেরুয়া বসন পরে গেরুয়া রংকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করে, কোনো একটি নির্দিষ্ট দল রাজনৈতিক ফায়দা নিচ্ছে তখন তো তার সমালোচনা করতে হয়। এটা শুধুমাত্র গেরুয়া রংকে নির্দিষ্ট করা নয়। গেরুয়া রংয়ের যে রাজনীতিকরণ তারও বিরোধিতা করা। একটি সংবাদপত্রের কি সেই স্বাধীনতা থাকতে নেই নাকি কোনো ব্যক্তি মানুষ এই গেরুয়া রংবাজির বিরুদ্ধে কথা বলতে পারবেন না? স্বামী বিবেকানন্দ সারা পৃথিবীর কাছে গেরুয়া রংকে ত্যাগ ও আত্মসংযমের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরেছিলেন। কিন্তু সেই গেরুয়া বসন পরেই যদি আশারাম বাপু, বাবা রাম রহিমের মতো ব্যক্তি বা ভণ্ড সাধুরা নিজেদের অপকর্মের মাধ্যমে এই পবিত্র রংটির বদনাম করেন, তাহলে সেই অপব্যবহারেরও তো প্রতিবাদ হওয়া উচিত। আনন্দবাজার ঠিক সেটিই করেছে, সেই জন্যই তারা ওই শিরোনামটি দিয়েছে। হুমকি দিয়ে চোখ রাঙিয়ে তাদেরকে যদি ক্ষমা চাওয়ানোর কথা বলা হয় তাহলে আরও একবার ওই গেরুয়া রঙের গুন্ডামিটাকেই মান্যতা দেওয়া হয়।

এমনিতেই সংবাদপত্রের স্বাধীনতার সূচকে ভারতের স্থান ক্রমশ তলানিতে ঠেকছে। ১৮০ টি দেশের মধ্যে ভারতের স্থান ১৫৭ তম। ভারতের সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার সূচকে ক্রমাগত এই নিম্নমুখী অবস্থানের পিছনে দেশের প্রথম সারির সংবাদপত্র ও সংবাদমাধ্যম আনন্দবাজার গোষ্ঠীর ভূমিকাও কম নয়। তারা বিভিন্ন সময়ে সরকারের বিভিন্ন অনৈতিক কাজ দেখেও না দেখার ভান করেছে। এসআইআর প্রক্রিয়া চলাকালীন যখন রাজ্যে রোহিঙ্গা খোঁজার হিড়িক উঠেছিল, তখন এবিপি আনন্দের অন্যতম সাংবাদিকও সেই প্রচারে সহযোগী ভূমিকা নিয়েছিলেন। অপারেশন সিঁদুরের সময় স্টুডিও থেকে ওই চ্যানেলে করাচি ও লাহোর দখল হয়ে যাওয়ার মতো বিভ্রান্তিকর খবরও প্রচার করা হয়েছিল। গত ৪ মে বাংলার নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের সময় অনেকেই দেখেছে এই সঞ্চালক সকালে যে রংয়ের টাই পরেছিলেন, ফল প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে তিনি তার টাই এর রং অবধি বদল করে নেন।

এই আনন্দবাজার পত্রিকা এবং আনন্দবাজার গোষ্ঠী নানান সময়ে নানান মিথ্যে খবর মিথ্যে ভ্রান্ত ধারণা ছড়িয়েছে। তা সত্ত্বেও আজকের আনন্দবাজারের উপর এই আক্রমণকে নিন্দা করতে হবে। কারণ যারা আজকে এই আনন্দবাজারকে আক্রমণ করছে তারা শুধুমাত্র গেরুয়া রংকে আক্রমণ করা হয়েছে বলে এই কাজটি করছে, এমনটা নয়। তারা চাইছে যাতে সাংবাদিকরা সংবাদপত্রগুলি মাথা নত করে। এবং মাথা নত করে তাদের মত করে পজিটিভ খবরগুলি দেওয়ার চেষ্টা করে।

যখন আনন্দবাজার এই বকলমে বিজেপির প্রচারের কাজগুলি করছিল তখন কিন্তু আমরা দেখেছিলাম বহু স্বাধীন সংবাদপত্র সংবাদমাধ্যম তারা খবর করার চেষ্টা করে গিয়েছে। স্বাধীন সংবাদমাধ্যমই পারে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার সূচকে ভারতের স্থানকে উপরে তুলতে। এই ধরনের প্রচলিত গণমাধ্যম যারা নির্ভর করে সরকারের বিজ্ঞাপন এবং অন্যান্য বড় কর্পোরেট হাউজের বিজ্ঞাপনের উপর তারা কোনোদিনও সত্যি খবর পরিবেশন করতে পারে না। তাই সোনালী খাতুন, সুইটি বিবি বা জলিল আখতারদের উপর অন্যায় হলেও তারা জোরের সঙ্গে এই কথাগুলি বলতে পারে না। তাদের চিন্তাভাবনা তাদের লেখনীর উপর কোথাও একটা অদৃশ্য বাঁধন দেওয়া থাকে। কিন্তু স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের ক্ষেত্রে সেই অদৃশ্য বাঁধন থাকে না। তাই আনন্দবাজারের উপর হামলার পর বিজেপির মুখপাত্র যখন দাবি করেন, এই ঘটনার সঙ্গে দলের কোনো যোগ নেই, তখন অল্ট নিউজের মতো স্বাধীন সংবাদমাধ্যম অনুসন্ধান করে দেখায় হামলাকারীদের মধ্যে বিজেপির সক্রিয় কর্মীরাও ছিলেন, যাঁদের অধিকাংশই অবাঙালি। সেই খবরটিও আনন্দবাজার করে উঠতে পারে না।

এই আনন্দবাজার পত্রিকা এবং আনন্দবাজার গোষ্ঠী নানান সময়ে নানান মিথ্যে খবর মিথ্যে ভ্রান্ত ধারণা ছড়িয়েছে। তা সত্ত্বেও আজকের আনন্দবাজারের উপর এই আক্রমণকে নিন্দা করতে হবে। কারণ যারা আজকে এই আনন্দবাজারকে আক্রমণ করছে তারা শুধুমাত্র গেরুয়া রংকে আক্রমণ করা হয়েছে বলে এই কাজটি করছে, এমনটা নয়। তারা চাইছে যাতে সাংবাদিকরা সংবাদপত্রগুলি মাথা নত করে।

যাঁরা আশা করেছিলেন, আনন্দবাজার হয়তো প্রথম পাতায় বড় বড় হেডলাইন দেবে এই গেরুয়া রংবাজির বিরুদ্ধে, তাঁদের জন্য একরাশ ভালোবাসা। যাঁরা আশা করেছিলেন, টেলিগ্রাফ পত্রিকায় একটা বড় হেডলাইন থাকবে, তাঁদের জন্য অনেক ভালোবাসা। যাঁরা আশা করেছিলেন, এবিপি আনন্দের প্রাইম টাইম শো-তে কয়েক মিনিট দেবেন এই গেরুয়া রংবাজির বিরুদ্ধে কথা বলার জন্য, তাঁদের জন্য বুক ভরা ভালবাসা। যাঁরা আশা করেছিলেন যে অন্তত একটি সম্পাদকীয় থাকবে আনন্দবাজারে তাঁদের জন্য এক আকাশ ভালোবাসা। তবে এই ভালোবাসা দেওয়ার আগে, যে যে পুলিশ কর্মীরা তৃণমূলের সরকারের দেওয়া নীল সাদা ছাতা হাতে এই গেরুয়া রংবাজি দেখলেন তাদের জন্য একটা জোরে হাততালি। সাধারণত আমরা জানি, কোনো বিক্ষোভ দেখানোর সময় যে কোনো আন্দোলন করার সময় পুলিশকে জানাতে হয়। তা সে পুলিশকে কারা মেল করেছিল সেটা তো অন্তত জানা যাবে, না সেটিও হবে না। তবে সম্পাদক এবং সম্পাদকীয়তে কাজ করেন যাঁরা তাঁরা তাঁদের ফেসবুকে অনেক কথা লিখেছেন। আসলে ফেসবুকে লেখাটা সহজ, বড় শিরোনাম দেওয়াটা সহজ নয়।

আনন্দবাজারের দফতরে ওই হামলার খবর শেষ পর্যন্ত তারা প্রকাশ করেছে ঠিকই, তবে জায়গা দিয়েছে পঞ্চম পাতায়। তাদের যুক্তি সরাসরি আসেনি কিন্তু তাদের দফতরে যাঁরা কাজ করেন তাঁরা বলেছেন এই খবরটির গুরুত্ব যতটুকু দেওয়ার ততটুকুই দেওয়া হয়েছে। হয়তো তাঁরা ঠিক। কিন্তু আজকে আনন্দবাজারকে যে হুমকি দেওয়া হচ্ছে তার জন্য কি তারা নিজেরা দায়ী নয়? যে মানুষের মেরুদন্ড থাকে যে মানুষের শিরদাঁড়া ঋজু থাকে, তাকে হুমকি দেওয়া যায়, কিন্তু মাথা নত করানো যায় না। আনন্দবাজারের যে ইতিহাস তার শিরদাঁড়া এখনও কিছুটা ঋজু আছে বলে তাদের এখনও মাথা নত করানো যায়নি।

তবে আজকে যদি এই আক্রমণের বিরোধিতা প্রত্যেকটি গণতান্ত্রিক মানুষ, প্রতিটি রাজনৈতিক দল না করে তাহলে আগামী দিনে আনন্দবাজারের মতো পরিণতি প্রতিটি রাজনৈতিক দলের হবে এবং প্রতিটি গণতান্ত্রিক মানুষের হবে, এটা বলতে খুব বেশি বিজ্ঞান জানতে হয় না। আসলে বাংলায় বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর রাজনীতির পরিসরে এক ধরনের শূন্যতা তৈরি হয়েছে। তবে মানুষ কিন্তু ক্ষুব্ধ বিজেপির সমস্ত সরকারি কর্মকাণ্ড দেখে, সেই সেই মানুষদের যদি ঐক্যবদ্ধ করানো যায় তাহলে আগামী দিনে কোনো রাজনৈতিক দল কিংবা কোনো শক্তিই থাকবে না যারা বিজেপির বিরোধিতা করবে। মানুষের আন্দোলন কখনোই কিন্তু সংবাদমাধ্যমের উপর নির্ভরশীল নয়।

সংবাদ মাধ্যমের কাজ সঠিক খবর পরিবেশন করা। কোনো পক্ষ না নিয়ে নিরপেক্ষভাবে একটি সংবাদকে পরিবেশন করা। সেই কাজটি কি আনন্দবাজার করেছে অন্তত নির্বাচনের আগে কি করেছে? শেষে একটিই প্রশ্ন করতে হয়। এবং সেটি আজকে আনন্দবাজারকেই করতে হয় 'কি পরিবর্তন ভালো লাগছে তো?'। যে পরিবর্তনের পক্ষে আনন্দবাজার সওয়াল করেছিল ঘুরিয়ে ফিরিয়ে সেই পরিবর্তন যে ঘুরে তারই দিকে এইভাবে ফিরে আসবে তা কি আনন্দবাজারও ভাবতে পেরেছিল?

(লেখাটি ইনস্ক্রিপ্ট থেকে নেওয়া)

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত