জ্বালানি তেল খাতে সতর্কতার সঙ্গে বাড়াতে হবে সক্ষমতা

প্রকাশ : ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২২: ৩৬
সম্পাদকীয় প্রতীকী ছবি। স্ট্রিম গ্রাফিক
সম্পাদকীয় প্রতীকী ছবি। স্ট্রিম গ্রাফিক

ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক গ্রুপের সঙ্গে হওয়া চুক্তির আওতায় রাষ্ট্রায়ত্ত ইস্টার্ন রিফাইনারির আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণে ১০০ কোটি মার্কিন ডলার মিলবে বলে খবর উৎসাহব্যঞ্জক। রিফাইনারিতে দ্বিতীয় ইউনিট স্থাপিত হলে জ্বালানি তেল পরিশোধন ক্ষমতা বছরে আরও প্রায় ৩০ লাখ মেট্রিক টন বাড়বে। সামগ্রিক সক্ষমতা হবে প্রায় তিনগুণ। জ্বালানি নিরাপত্তা অর্জনে এটা তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ।

সরকার হালে জ্বালানি তেল আমদানি ও পরিশোধনে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ বাড়ানোরও উদ্যোগ নিয়েছে। এ-সংক্রান্ত নীতিমালা চূড়ান্ত হলে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান পরিশোধিত জ্বালানি তেল সরাসরি আমদানি করতে পারবে। টার্মিনাল, সংরক্ষণাগার, পাইপলাইন ও পরিশোধনাগার নির্মাণে বিনিয়োগেরও সুযোগ তাদের থাকবে। এ প্রসঙ্গে আলোচিত হচ্ছে ভারতের অভিজ্ঞতা। সেখানে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বেসরকারি কোম্পানি জ্বালানি তেল পরিশোধন ও বিপণনে নিয়োজিত। এখন রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি—এ দুই উদ্যোগ একসঙ্গে জোরদার করা হলে সেটা বাংলাদেশের জ্বালানি তেল খাতে একটি কাঠামোগত পরিবর্তনের সূচনা করবে, সন্দেহ নেই।

একমাত্র রাষ্ট্রীয় পরিশোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারির সীমাবদ্ধতা আমাদের জানা। হরমুজ জটিলতায় বিগত মে মাসে অপরিশোধিত তেলের মজুদ ফুরিয়ে যাওয়ায় শোধনাগারটি টানা ২৬ দিন বন্ধ ছিল। ঘটনাটি জ্বালানি নিরাপত্তায় আমাদের ঝুঁকির দিকটি তীব্রভাবে সামনে আনে। এ বাস্তবতায় জ্বালানি তেল, বিশেষত ডিজেল পরিশোধন ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো এবং এর বিকল্প উৎস তৈরি করা জরুরি বৈকি।

অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই দুই উদ্যোগেরই গুরুত্ব ব্যাপক। পরিশোধন ক্ষমতা বাড়লে অধিক দামে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি কমবে। এতে কমবে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ। বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ আবার বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়াবে। তাতে ভোক্তার জন্য যুক্তিসঙ্গত দাম পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে। সরবরাহ ব্যবস্থায় একাধিক উৎস থাকলে সংকটকালীন ঝুঁকিও হ্রাস পায়। শিল্প খাত ‘নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি’ পেলে উৎপাদন স্থিতিশীল থাকে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থাও বাড়ে।

এতে ঝুঁকিও জড়িত বৈকি। বড় অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব বাংলাদেশে নতুন নয়। এ অবস্থায় ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিট নির্মাণে নির্ধারিত সময়সীমা মেনে চলা এক বড় চ্যালেঞ্জ। ঋণের শর্ত, ভবিষ্যৎ পরিশোধ সক্ষমতা যাচাই করাও জরুরি। বেসরকারি খাতে পরিশোধনাগার স্থাপনে পরিবেশ ও নিরাপত্তা মান নিশ্চিত করাটাও অপরিহার্য। নিয়ন্ত্রণ কাঠামো দুর্বল থাকলে আবার বাজার কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠানের হাতে জিম্মি হয়ে পড়তে পারে। এমন পরিস্থিতিতে প্রতিযোগিতার সুফল থেকে ভোক্তাদের বঞ্চিত হওয়ার শঙ্কা কম নয়।

এখানে কয়েকটি সুপারিশ বিবেচনাযোগ্য। প্রথমত, বেসরকারি খাতের জন্য পূর্বানুমানযোগ্য নীতিমালা চূড়ান্ত করতে হবে দ্রুত। দ্বিতীয়ত, পরিবেশ, নিরাপত্তা ইত্যাদির ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ থাকা দরকার। তৃতীয়ত, একটি স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থা জ্বালানির দাম ও বাজার আচরণ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবে। চতুর্থত, ইস্টার্ন রিফাইনারির আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণে কঠোর সময়সীমা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। পঞ্চমত, অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ শৃঙ্খলে বিকল্প উৎস রাখতে হবে, যাতে উৎপাদন বন্ধের পুনরাবৃত্তি না ঘটে। ষষ্ঠত, দক্ষ জনবল তৈরিতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি; কারণ আধুনিক পরিশোধনাগার পরিচালনায় বিশেষায়িত দক্ষতা প্রয়োজন। সপ্তমত, ঋণের শর্ত যাচাই ও জনসমক্ষে তা প্রকাশ করা উচিত, যাতে ঋণ পরিশোধের চাপ অসহনীয় না হয় আর বিষয়টিতে স্বচ্ছতা থাকে।

বাংলাদেশের জ্বালানি তেল খাত দীর্ঘদিন একক রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল ছিল। এখন যে উদ্যোগ পরিলক্ষিত, তা সঠিক পথে পরিচালিত হলে জ্বালানি নিরাপত্তা মজবুত হওয়ার আশা জোরালো হবে। এটি আমদানিনির্ভরতার ঝুঁকি থেকেও কিছুটা মুক্তি দিতে পারে। তবে সাফল্য নির্ভর করবে বাস্তবায়নের গুণমান ও নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর শক্তিমত্তার ওপর। নীতিনির্ধারকদের সযত্ন নজরদারি না থাকলে এই সম্ভাবনা হাতছাড়াও হয়ে যেতে পারে।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত