আন্তর্জাতিক শকুন সচেতনতা দিবস

শকুন সংরক্ষণ জরুরি কেন?

এআই জেনারেটেড ছবি
এআই জেনারেটেড ছবি

“মাঠ থেকে মাঠে-মাঠে—সমস্ত দুপুর ভরে এশিয়ার আকাশে-আকাশে শকুনেরা চরিতেছে”;

জীবনানন্দ দাশের বিখ্যাত ‘শকুন’ কবিতার প্রথম দুটি লাইন। কবি জীবনানন্দ দাশ শকুনকে কবিতায় যে অর্থেই ব্যবহার করুক না কেন, সে সময়ে অন্তত এটা ঠিক যে আকাশে আকাশে শকুনেরা চড়ে বেড়াত। সেই শকুন এখন বাংলাদেশে নেই বললেই চলে। বাংলাদেশে ১৯৭০ সালের শকুন শুমারিতে ৫০ হাজারের মত শকুন পাওয়া গিয়েছিল। ২০০৮-২০০৯ সালে এই সংখ্যা কমে হয়েছে ১ হাজার ৯৭২টি। ২০১১-১২ সালে ৮১৬ টি শকুন শুমারিতে পাওয়া গিয়েছিল।

২০১৪ সালের শুমারিতে শকুনের সংখ্যা পাওয়া গেছে মাত্র ২৬০টি। এই ২৬০ টি শকুনের ৭৫টিই দেখা গিয়েছিল হবিগঞ্জের রেমা-কালেঙ্গায়। এক সময় এই শকুন বাংলাদেশের সব জায়গাতেই পাওয়া গিয়েছে। বর্তমানে শুধু সিলেট আর সুন্দরবনে শকুন দেখা যাচ্ছে।

পৃথিবীতে শকুনের ১৮টি প্রজাতি রয়েছে। তার মধ্যে ৭ প্রজাতির শকুন বাংলাদেশে পাওয়া যেত। বর্তমানে ৬ প্রজাতির শকুন রয়েছে। রাজ শকুন পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে গেছে। বাকি ৬ প্রজাতির শকুনের মধ্যে ৪ প্রজাতির শকুন স্থায়ী আর বাকি ২ প্রজাতির শকুন পরিযায়ী। এগুলো হলো– বাংলা শকুন, সরুঠোঁট শকুন, রাজ শকুন, কালা শকুন, হিমালয়ী শকুন ও ধলা শকুন। হিমালয়ী ও ধলা শকুন পরিযায়ী। এগুলো কাদাচিৎ দেখা যায়। বাংলা শকুন অনেক পরিচিত হলেও বর্তমানে মহাবিপন্ন। সরুঠোঁট শকুনও মহাবিপন্ন প্রজাতি। রাজ শকুন সহজে দেখা যায় না। মহাবিপন্ন ও দুর্লভ।

শকুনের দেহে জীবাণু টিকে থাকতে পারে না। অ্যানথ্রাক্স, কলেরা, যক্ষ্মা, ক্ষুরা রোগের মত জীবাণুও এদের কিছু করতে পারে না। ফলে মৃতদেহ থেকে জীবাণু ছড়িয়ে পড়তে পারে না। বলা হয়, এক দল শকুন একটি মৃত গবাদি পশু মাংস হাড়সহ ২০ মিনিটে খেয়ে পরিষ্কার করে ফেলতে পারে।

শকুনদের ডানা অনেক বড় হয়। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিসম্পন্ন। এদের মাথা, ঘাড় ও গলায় পালক থাকে না। শকুনেরা বড় বড় গাছ যেমন বট গাছ, ডুমুর গাছ প্রভৃতিতে বাসা বানায়। গুহা, গাছের কোটরেও এরা বাসা বাঁধে। বাংলা শকুনগুলো লম্বায় ৯০ সে.মি. পর্যন্ত হতে পারে আর ওজনে এরা হয় ৪.৩ কেজি। এদের রঙ কালচে বাদামি। এদের প্রজনন কাল সেপ্টেম্বর থেকে মার্চ মাস।

শকুনেরা মাত্র একটি জীবনসঙ্গী রাখে। এরা সাদা রঙের ডিম পাড়ে। ডিম থেকে বাচ্চা ফুটতে ৪০-৪৫ দিন সময় লাগে। এদেরকে পরিচ্ছন্নতা কর্মী বা ঝাড়ুদার পাখি বলা হয়। কেননা এরা অনেক উপর থেকে যখন মৃত পশু দেখতে পায়, তখন এরা উড়ে আসে। ভাগাড় থেকে খাবার খুঁজে নেয়। শকুনের হজম ক্রিয়া বেশ শক্তিশালী। এরা মৃত পশু সহজে হজম করতে পারে। এমনকি মৃত পশুর হাড়ও সহজেই হজম করে ফেলতে পারে। শকুনের পরিপাকতন্ত্রে শক্তিশালী এসিড থাকে। এর ফলে শকুনের দেহে জীবাণু টিকে থাকতে পারে না। অ্যানথ্রাক্স, কলেরা, যক্ষ্মা, ক্ষুরা রোগের মত জীবাণুও এদের কিছু করতে পারে না। ফলে মৃতদেহ থেকে জীবাণু ছড়িয়ে পড়তে পারে না। বলা হয়, এক দল শকুন একটি মৃত গবাদি পশু মাংস হাড়সহ ২০ মিনিটে খেয়ে পরিষ্কার করে ফেলতে পারে। শকুনেরা সাধারণত দল বেঁধে খাবার খায়। খাওয়ার সময় বড়রা অগ্রাধিকার পায়। ছোটরা খাবার খায় পরে।

এরকম উপকারী শকুন প্রজাতিটি আমাদের দেশে মহাবিপন্ন কেন হয়ে গেল? এর পেছনে বেশ কয়েকটি কারণকে প্রধানত দেখা হয়। এর মধ্যে একটি হলো নব্বইয়ের দশকে গবাদি পশু বিশেষ করে গরুর ব্যথানাশক হিসেবে ডাইক্লোফেনাফ ও কিটোপ্রোফেন নামক ওষুধ ব্যবহার করা হত। শকুন যখন মৃত কোন গবাদি পশুর মাংস খেত তখন এদের শরীরেও এই ওষুধ চলে যেত।

এই ওষুধটি শকুনের কিডনি নষ্ট করে দিত। ফলে সাধারণত দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে শকুন মারা যেত। ২০২১ সালে বাংলাদেশে এই ওষুধটি নিষিদ্ধ করা হয়। এছাড়া বাংলাদেশে বড় বড় গাছের সংখ্যাও কমে গেছে অনেক। বট, শিমুল, দেবদারু, ছাতিমের মত গাছ কমে যাওয়ার কারণে ওরা যে উঁচু মগডালগুলোতে একসঙ্গে আশ্রয় নিত তা আর পারছে না। বনাঞ্চলও কমে গেছে। বসবাসের স্থান ছাড়াও ডিম পাড়া ও পরিচর্যার মত কাজগুলো এরা করতে পারছে না। এছাড়া খাদ্য সংকটের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। গবাদি পশুর চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নতির ফলে শকুনেরা আগের মত খাবার পাচ্ছে না।

একটি নির্দিষ্ট এলাকা নির্ধারণ করে আমরা মৃত গবাদি পশু রাখতে পারি যেখানে শকুন এসে খেয়ে তা পরিষ্কার করে যাবে। আলাদা করে তখন আর বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও করতে হবে না। আমরা যেহেতু প্রাকৃতিকভাবেই এর বংশবৃদ্ধিতে সফলতা পেয়েছি সেহেতু আর ভারতের মত ক্যাপটিভ ব্রিডিংয়ের প্রয়োজন নেই।

ভারতেও শকুনের সংখ্যা কমে গিয়েছিল। পরে ক্যাপটিভ ব্রিডিং করে এর সংখ্যা বাড়ানো হয়। তবে বাংলাদেশে শকুনের সংখ্যা প্রাকৃতিক ভাবেই বাড়ছে। ২০১৪ সালের ২৩ ডিসেম্বর রেমা-কালেঙ্গাকে বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য এবং খুলনার সুন্দরবনে দুইটি এলাকা শকুনের জন্য নিরাপদ এলাকা ঘোষণা করার পর এদের সংখ্যা এখন বাড়তে শুরু করেছে। ২০১৪ সালে যেখানে প্রজনন হার ছিল ৪৪ শতাংশ সেখানে ২০২০ সালে তা বেড়ে ৫৭ শতাংশ হয়েছে। ২০২২ সালে ৭২.২ শতাংশ প্রজনন হার ছিল।

এই প্রজনন বৃদ্ধির বিষয়টি সার্বিক চিত্র নয়। একটি নির্দিষ্ট এলাকায় শকুনের হার বৃদ্ধি পেয়েছে। অথচ এটি পুরো বাংলাদেশে ছিল। ওষুধ নিষিদ্ধ করার পর শকুন ফিরিয়ে আনার অন্যতম চ্যালেঞ্জ হচ্ছে বাসস্থান ও খাদ্য সংকট। এই দুটি বিষয় ঠিক রাখতে পারলে আবারও আগের মত সমস্ত বাংলাদেশেই এই উপকারী পাখিটিকে দেখা যাবে। সেজন্য আমাদের বড় বড় গাছ যেমন বট, ছাতিম, শিমুল ইত্যাদি লাগাতে হবে। আর খাদ্য সংকটও নিরসন করতে হবে।

এক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট এলাকা নির্ধারণ করে আমরা মৃত গবাদি পশু রাখতে পারি যেখানে শকুন এসে খেয়ে তা পরিষ্কার করে যাবে। আলাদা করে তখন আর বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও করতে হবে না। আমরা যেহেতু প্রাকৃতিকভাবেই এর বংশবৃদ্ধিতে সফলতা পেয়েছি সেহেতু আর ভারতের মত ক্যাপটিভ ব্রিডিংয়ের প্রয়োজন নেই।

প্রতিবছর সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম শনিবার আন্তর্জাতিক শকুন সচেতনতা দিবস পালন করা হয়। প্রকৃতিতে শকুনের গুরুত্ব ও সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তাকে গুরুত্ব দিতে এই দিবসটি পালন করা হয়। কেননা শকুন হচ্ছে প্রকৃতির ধাঙড়। এরা খুব দ্রুত মরা আবর্জনা খেয়ে প্রাকৃতিকভাবেই পরিষ্কার রাখে। অ্যানথ্রাক্সের মত জীবাণু খেয়ে মহামারি থেকে আমাদের রক্ষা করে। মরা পচা খেয়ে ও কার্বন নিঃসরণ কমাতে সহায়তা করার মাধ্যমে এরা প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা করে। তাই আসুন শকুন সংরক্ষণে আমরা সচেতন হই।

  • ড. বিভূতি ভূষণ মিত্র: পরিবেশ বিষয়ক লেখক

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত