স্ট্রিম সম্পাদকীয়

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে সংঘটিত ঘটনাকে দুই পক্ষের সংঘর্ষ বা একটি ছাত্ররাজনৈতিক ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ ভাবলে ভুল হবে। এটি বৃহত্তর সংকটের প্রতিচ্ছবি। আইনের শাসনের জায়গাটি পেশিশক্তি দখল করে নিচ্ছে বললে অত্যুক্তি হবে না। বিচারের এখতিয়ার আদালতের নয়; বরং যে গোষ্ঠী বেশি শক্তিশালী—এমনটাই যেন প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে।
ঘটনার শুরু একজন ছাত্রীর অভিযোগকে কেন্দ্র করে। কিন্তু অভিযোগের তদন্ত বা আইনি প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগেই কিছু শিক্ষার্থীকে ‘ট্যাগ’ দেওয়া হলো, তাঁদের ফোন তল্লাশি করে রাজনৈতিক পরিচয় নির্ধারণ হলো, তারপর তাঁদের ওপর চালানো হলো হামলা। পরে গ্রন্থাগারের পাঠকক্ষে ঢুকে আবারও সংঘবদ্ধভাবে মারধর করা হলো। যদি কেউ নিষিদ্ধ সংগঠনের কর্মীও হন, তাঁকে শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতা কি কোনো ছাত্রসংগঠনের? বাংলাদেশের সংবিধান, ফৌজদারি আইন কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো বিধি কি এমন অধিকার দেয়?
ঘটনাটিকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে হামলার স্থান। বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে অধ্যয়নই মুখ্য হওয়ার কথা। অথচ সেই পাঠকক্ষে লাঠি, রড, বেল্ট, এমনকি বেলচা হাতে প্রবেশ করে হামলা হয়েছে। কেউ কেউ ঘটনাটিকে হয়তো ব্যাখ্যার চেষ্টা করবেন এভাবে—প্রশাসন পদক্ষেপ নেয়নি, তাই ‘শিক্ষার্থী’রা ক্ষুব্ধ হয়েছে। কিন্তু এই যুক্তি বিপজ্জনক। কারণ একই যুক্তি ব্যবহার করে ক্ষমতাবান যেকোনো গোষ্ঠী নিজ হাতে বিচার তুলে নিতে পারে। এভাবে রাষ্ট্রের আইন নয়, বরং প্রতিশোধের যুক্তি শেষ পর্যন্ত সমাজের ভাষা হয়ে দাঁড়ায়।
এখানেই ‘মব’ ও ‘আইন’—এই দুই ধারণার মৌলিক পার্থক্য। আইনের ভিত্তি হলো অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত ও আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ। মবের ভিত্তি হলো সন্দেহ, আবেগ, সংখ্যাগরিষ্ঠের শক্তি ও তাৎক্ষণিক শাস্তি। আইনের চোখে অপরাধ প্রমাণ না হওয়া পর্যন্ত অভিযুক্ত ব্যক্তি নির্দোষ। মবের চোখে তিনি নিজেকে বাঁচাতে না পারলে অপরাধী। এ পার্থক্যটিই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও মবের মধ্যে সীমারেখা টেনে দেয়।
কোনো কিছু পছন্দ না হলেই প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে সংগঠিত শক্তি প্রদর্শন করে সিদ্ধান্ত আদায় কিংবা নিজেরাই বিচার সম্পন্নের প্রবণতা বাড়ছে। এই মানসিকতার বিপজ্জনক দিক হলো, এটি ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠানকে অকার্যকর করে দেয়। প্রশাসন যদি সংঘবদ্ধ শক্তির কাছে নতি স্বীকার করে, তাহলে শিক্ষার্থী, শিক্ষক বা সাধারণ মানুষ আর প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থা রাখবেন না। তারা বিশ্বাস করতে শুরু করবেন, প্রশাসন বা আদালতের মাধ্যমে না গিয়ে পেশিশক্তির মাধ্যমে বিচার নিশ্চিত করতে হয়। এটি রাষ্ট্রের বৈধ বলপ্রয়োগের অধিকার ক্ষয়ে যাওয়ার লক্ষণ। রাষ্ট্র সেই কর্তৃত্ব হারাতে শুরু করলে ক্ষমতাবান বিভিন্ন গোষ্ঠী নিজেদের হাতে ‘বৈধতা’ তৈরি করতে চায়। ফলাফল দীর্ঘস্থায়ী অরাজকতা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য এই সংকট আরও গভীর। একটি দেশের বিশ্ববিদ্যালয় ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব, গবেষণা ও বুদ্ধিবৃত্তিক সংস্কৃতির জন্মস্থান। অথচ আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আলোচিত সংঘর্ষ, দখল, ট্যাগিং ও সহিংসতার কারণে। এটি শুধু বিশ্ববিদ্যালয় নয়, রাষ্ট্রের ব্যর্থতা বলেও বিবেচিত হবে। অন্যান্য দেশেও বিপ্লব বা তেমন পালাবদলের পর এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়। তবে সফল রাষ্ট্রগুলো দ্রুতই এই সত্য প্রতিষ্ঠা করে যে—প্রতিশোধ নয়, বিচার; দলবদ্ধ জনতার শাস্তি নয়, আইনের শাস্তি। মবকে একবার বৈধতা দিলে সেটি কিন্তু আর কোনো একটি দলের সম্পদ থাকে না। একসময় সেটি সবার বিরুদ্ধে দাঁড়ায়।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনা তাই শুধু কিছু শিক্ষার্থীর ওপর হামলায় সীমাবদ্ধ নয়। এটি রাষ্ট্রের সামনে একটি মৌলিক প্রশ্ন রাখে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতর কি বাংলাদেশের আইন কার্যকর? নাকি অন্য কোনো ক্ষমতা কার্যকর? যদি উত্তর দ্বিতীয়টি হয়, তাহলে বিপদ কেবল ওই ক্যাম্পাসে সীমাবদ্ধ থাকবে না।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে সংঘটিত ঘটনাকে দুই পক্ষের সংঘর্ষ বা একটি ছাত্ররাজনৈতিক ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ ভাবলে ভুল হবে। এটি বৃহত্তর সংকটের প্রতিচ্ছবি। আইনের শাসনের জায়গাটি পেশিশক্তি দখল করে নিচ্ছে বললে অত্যুক্তি হবে না। বিচারের এখতিয়ার আদালতের নয়; বরং যে গোষ্ঠী বেশি শক্তিশালী—এমনটাই যেন প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে।
ঘটনার শুরু একজন ছাত্রীর অভিযোগকে কেন্দ্র করে। কিন্তু অভিযোগের তদন্ত বা আইনি প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগেই কিছু শিক্ষার্থীকে ‘ট্যাগ’ দেওয়া হলো, তাঁদের ফোন তল্লাশি করে রাজনৈতিক পরিচয় নির্ধারণ হলো, তারপর তাঁদের ওপর চালানো হলো হামলা। পরে গ্রন্থাগারের পাঠকক্ষে ঢুকে আবারও সংঘবদ্ধভাবে মারধর করা হলো। যদি কেউ নিষিদ্ধ সংগঠনের কর্মীও হন, তাঁকে শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতা কি কোনো ছাত্রসংগঠনের? বাংলাদেশের সংবিধান, ফৌজদারি আইন কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো বিধি কি এমন অধিকার দেয়?
ঘটনাটিকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে হামলার স্থান। বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে অধ্যয়নই মুখ্য হওয়ার কথা। অথচ সেই পাঠকক্ষে লাঠি, রড, বেল্ট, এমনকি বেলচা হাতে প্রবেশ করে হামলা হয়েছে। কেউ কেউ ঘটনাটিকে হয়তো ব্যাখ্যার চেষ্টা করবেন এভাবে—প্রশাসন পদক্ষেপ নেয়নি, তাই ‘শিক্ষার্থী’রা ক্ষুব্ধ হয়েছে। কিন্তু এই যুক্তি বিপজ্জনক। কারণ একই যুক্তি ব্যবহার করে ক্ষমতাবান যেকোনো গোষ্ঠী নিজ হাতে বিচার তুলে নিতে পারে। এভাবে রাষ্ট্রের আইন নয়, বরং প্রতিশোধের যুক্তি শেষ পর্যন্ত সমাজের ভাষা হয়ে দাঁড়ায়।
এখানেই ‘মব’ ও ‘আইন’—এই দুই ধারণার মৌলিক পার্থক্য। আইনের ভিত্তি হলো অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত ও আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ। মবের ভিত্তি হলো সন্দেহ, আবেগ, সংখ্যাগরিষ্ঠের শক্তি ও তাৎক্ষণিক শাস্তি। আইনের চোখে অপরাধ প্রমাণ না হওয়া পর্যন্ত অভিযুক্ত ব্যক্তি নির্দোষ। মবের চোখে তিনি নিজেকে বাঁচাতে না পারলে অপরাধী। এ পার্থক্যটিই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও মবের মধ্যে সীমারেখা টেনে দেয়।
কোনো কিছু পছন্দ না হলেই প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে সংগঠিত শক্তি প্রদর্শন করে সিদ্ধান্ত আদায় কিংবা নিজেরাই বিচার সম্পন্নের প্রবণতা বাড়ছে। এই মানসিকতার বিপজ্জনক দিক হলো, এটি ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠানকে অকার্যকর করে দেয়। প্রশাসন যদি সংঘবদ্ধ শক্তির কাছে নতি স্বীকার করে, তাহলে শিক্ষার্থী, শিক্ষক বা সাধারণ মানুষ আর প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থা রাখবেন না। তারা বিশ্বাস করতে শুরু করবেন, প্রশাসন বা আদালতের মাধ্যমে না গিয়ে পেশিশক্তির মাধ্যমে বিচার নিশ্চিত করতে হয়। এটি রাষ্ট্রের বৈধ বলপ্রয়োগের অধিকার ক্ষয়ে যাওয়ার লক্ষণ। রাষ্ট্র সেই কর্তৃত্ব হারাতে শুরু করলে ক্ষমতাবান বিভিন্ন গোষ্ঠী নিজেদের হাতে ‘বৈধতা’ তৈরি করতে চায়। ফলাফল দীর্ঘস্থায়ী অরাজকতা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য এই সংকট আরও গভীর। একটি দেশের বিশ্ববিদ্যালয় ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব, গবেষণা ও বুদ্ধিবৃত্তিক সংস্কৃতির জন্মস্থান। অথচ আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আলোচিত সংঘর্ষ, দখল, ট্যাগিং ও সহিংসতার কারণে। এটি শুধু বিশ্ববিদ্যালয় নয়, রাষ্ট্রের ব্যর্থতা বলেও বিবেচিত হবে। অন্যান্য দেশেও বিপ্লব বা তেমন পালাবদলের পর এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়। তবে সফল রাষ্ট্রগুলো দ্রুতই এই সত্য প্রতিষ্ঠা করে যে—প্রতিশোধ নয়, বিচার; দলবদ্ধ জনতার শাস্তি নয়, আইনের শাস্তি। মবকে একবার বৈধতা দিলে সেটি কিন্তু আর কোনো একটি দলের সম্পদ থাকে না। একসময় সেটি সবার বিরুদ্ধে দাঁড়ায়।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনা তাই শুধু কিছু শিক্ষার্থীর ওপর হামলায় সীমাবদ্ধ নয়। এটি রাষ্ট্রের সামনে একটি মৌলিক প্রশ্ন রাখে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতর কি বাংলাদেশের আইন কার্যকর? নাকি অন্য কোনো ক্ষমতা কার্যকর? যদি উত্তর দ্বিতীয়টি হয়, তাহলে বিপদ কেবল ওই ক্যাম্পাসে সীমাবদ্ধ থাকবে না।
.png)

বছরের পর বছর ধরে ভারতীয় সমাজে একটি গভীর সংকট দানা বাঁধছে। একসময় মানুষের বিশ্বাস ছিল, পড়াশোনা করলেই সমাজে ও অর্থনীতিতে ভালো অবস্থানে পৌঁছানো যাবে। কিন্তু সেই বিশ্বাস এখন ধীরে ধীরে ভেঙে যাচ্ছে। সম্প্রতি ভারতে ‘জেন-জি’ বা নতুন প্রজন্মের বিক্ষোভ এই সংকটকে আবারও সামনে এনেছে। তবে সত্যি বলতে, বহু বছর ধরেই
৪ ঘণ্টা আগে
জোরপূর্বক শ্রম চরম পর্যায়ের একটি মানবাধিকার লঙ্ঘন। মানবাধিকার লঙ্ঘনের মতো একটি বিষয়কে শুল্কের শর্ত হিসেবে দাঁড় করানো যায় না। কেউ যদি বলে, "যেহেতু পণ্যটিতে মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে, তাই ১০ শতাংশ বেশি শুল্ক দিতে হবে"—এর অর্থ দাঁড়ায়, শুল্ক দিয়ে মানবাধিকার লঙ্ঘনকেও ‘জায়েজ’ বা বৈধ করা যায়।
৬ ঘণ্টা আগে
বিউটি রানি পাল জানতেনও না, স্কুল প্রাঙ্গণে হেঁটে বেড়ানোর একটা রিল তাঁকে রাতারাতি বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দেবে। কিন্তু এই আকস্মিকতাই আসলে সবচেয়ে ভয়ংকর সত্যটা উন্মোচন করে দেয়—নারীর জন্য ‘স্বাভাবিক’ থাকাটাও নিরাপদ নয়। বরং প্রতিটি মুহূর্তই পরীক্ষা।
৭ ঘণ্টা আগে
ভারতের ইতিহাসে বড় বড় আন্দোলনের পেছনে সাধারণত বিরোধীদলীয় রাজনৈতিক নেতাদের ভূমিকা ছিল। কিন্তু সম্প্রতি ‘ন্যাশনাল এলিজিবিলিটি কাম এন্ট্রান্স টেস্ট’ (নিট) প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদ সেই প্রচলিত ধারাকে ভেঙে দিয়েছে। এই আন্দোলন ছিল স্বতঃস্ফূর্ত, তীব্র এবং অরাজনৈতিক।
১০ ঘণ্টা আগে