নারীর নিজের শরীর, কার হাতে কর্তৃত্বের ভার

প্রকাশ : ২৮ জুলাই ২০২৬, ১৫: ৪০
স্ট্রিম গ্রাফিক

শ্রাবণের মেঘগুলো জড়ো হলো আকাশে… নব্বইয়ের দশকের নস্টালজিয়ার হাওয়ায় ভাসে খোলা চুল নীল শাড়ির আঁচল। কিন্তু এই দৃশ্যে কেন ঝড় উঠল? কেন গড়তে হলো প্রতিরোধ?

বিউটি রানি পাল জানতেনও না, স্কুল প্রাঙ্গণে হেঁটে বেড়ানোর একটা রিল তাঁকে রাতারাতি বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দেবে। কিন্তু এই আকস্মিকতাই আসলে সবচেয়ে ভয়ংকর সত্যটা উন্মোচন করে দেয়—নারীর জন্য ‘স্বাভাবিক’ থাকাটাও নিরাপদ নয়। বরং প্রতিটি মুহূর্তই পরীক্ষা।

সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জের পিটাইটিকর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা যে রিলটি বানিয়েছিলেন, তা এমন কিছু নয় যা ব্যাখ্যার দাবি রাখে। অথচ ট্রলিং শুরু হলো, শিক্ষা বিভাগ তদন্তের ঘোষণা দিল, আচরণবিধি লঙ্ঘনের প্রশ্ন উঠল। কার আচরণবিধি? কার শালীনতার সংজ্ঞা? আর কেন একজন নারীর সাধারণ আনন্দ-প্রকাশ রাষ্ট্রীয় তদারকির বিষয়বস্তু হয়ে ওঠে, অথচ একই কাজ একজন পুরুষ করলে তা নিছক মজা হিসেবে দেখা হয়?

মিশেল ফুকো তাঁর ডিসিপ্লিন অ্যান্ড পানিশ গ্রন্থে দেখিয়েছিলেন, আধুনিক ক্ষমতা প্রকাশ্য দমন-পীড়নের ভাষায় কথা বলে না—সে কাজ করে নজরদারি আর স্বাভাবিকীকরণের সূক্ষ্ম কৌশলে। বেন্থামের প্যানপ্টিকন যেমন—বন্দিকে এমন এক অবস্থানে রাখা হয় যেখানে সে জানে না কখন তাকে দেখা হচ্ছে, কিন্তু সবসময় ধরে নেয় তাকে কেউ দেখছে। ফলে নিজেই নিজের প্রহরী হয়ে ওঠে। বিউটি রানি পালের ঘটনায় এই একই যন্ত্র কাজ করেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদমের ভেতর দিয়ে। কোনো রাষ্ট্রীয় ফরমান লাগেনি তাঁকে ‘সীমা’ চিনিয়ে দিতে; একদল অচেনা মানুষের মন্তব্যই যথেষ্ট হয়েছে তাঁকে জানিয়ে দিতে যে তিনি প্রহরার মধ্যে আছেন, তাঁর বিচার হচ্ছে।

এই নজরদারি এতটাই প্রসারিত যে তার কোনো একক উৎস খুঁজে পাওয়া যায় না। আর সেটাই তাকে আরও শক্তিশালী করে তোলে। কেউ একজন নির্দেশ দেয়নি ‘চুপ করো’; হাজারো বিচ্ছিন্ন কণ্ঠস্বর মিলেই তৈরি করেছে সেই নীরবতার চাপ।

কিন্তু ফুকোর তত্ত্ব দীর্ঘদিন একটি লিঙ্গ-নিরপেক্ষ কাঠামো হিসেবেই থেকে গিয়েছিল, যতক্ষণ না স্যান্ড্রা লি বার্টকি তাঁর ‘ফুকো, ফেমিনিনিটি অ্যান্ড মডার্নাইজেশন অব প্যাট্রিয়ার্কাল পাওয়ার’ প্রবন্ধে প্রশ্ন তোলেন—এই নজরদারির শিকার কি সবাই সমানভাবে হয়? বার্টকির যুক্তি হলো, নারীর শরীর হাইপার-ভিজিবল বা অতি-দৃশ্যমান ও হাইপার-রেগুলেটেড বা অতি-নিয়ন্ত্রিত পরিসর; যেখানে ভঙ্গি, চলাফেরা, পোশাক, এমনকি আনন্দ প্রকাশের ধরনও নিয়ন্ত্রিত হয় এক অলিখিত বিধানে।

একজন নারীকে শেখানো হয় নিজের শরীরকে বাইরে থেকে দেখতে, নিজেই নিজের সমালোচক হয়ে উঠতে। নারী যতবার আয়নার সামনে দাঁড়ায়, সমাজের চোখ দিয়ে নিজেকে দেখে। বিউটি রানি পালের বেলায় ‘শালীনতা’ শব্দটি যেভাবে ব্যবহৃত হলো, তা আসলে এই নিয়ন্ত্রণেরই ভাষান্তর—নারীকে বোঝানো হচ্ছে তার শরীর তার নিজের নয়, বরং প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক তত্ত্বাবধানের অধীন এক বস্তু, যার প্রতিটি নড়াচড়া অনুমোদনসাপেক্ষ।

এই গল্পের ভেতরেই লুকিয়ে আছে প্রতিরোধের সম্ভাবনাও। বিভিন্ন পেশার নারী ও পুরুষ যখন একই গানে নিজেদের ভিডিও পোস্ট করে সংহতি জানালেন, তখন তা নিছক সমর্থন ছিল না, ছিল এক সম্মিলিত অস্বীকৃতি, প্যানপ্টিকনের যুক্তিকে প্রশ্ন করার প্রয়াস।

মারি রুতি এখানে আরেকটি স্তর যোগ করেন। তাঁর ‘দ্য এজ অব সায়েন্টিফিক সেক্সিজম’ গ্রন্থে তিনি দেখান কীভাবে বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞানের ছদ্মবৈজ্ঞানিক আখ্যান নারীর যৌনতা ও আচরণকে ‘স্বাভাবিক’ ও ‘অস্বাভাবিক’-এর বাইনারিতে বেঁধে ফেলে; আর এই বিভাজনই সমাজে নারীর প্রতি সহিংসতাকে বৈধতা জোগায়। রুতির যুক্তি হলো, নারীর ওপর যে নৈতিক দাবি চাপানো হয়, তা কোনো প্রাকৃতিক বা চিরন্তন সত্য নয়; বরং একধরনের আখ্যান-নির্মাণ, যা বারবার পুনরুৎপাদিত হয় নারীকে বশ্যতায় রাখার জন্য।

বিউটি রানি পালকে যখন বলা হলো তাঁর আচরণ ‘শিক্ষকসুলভ নয়’, তখন আসলে কী ঘটল? ‘শিক্ষিকা’ পরিচয়ের সঙ্গে যৌনতাহীন, আনন্দহীন, প্রায়-অদৃশ্য এক নারীমূর্তিকে জুড়ে দেওয়া হলো। রুতি যাকে বলেন নরম্যাটিভ ভায়োলেন্স—স্বাভাবিকতার নামে যে সূক্ষ্ম সহিংসতা চলে, যা কখনো রক্তপাত ঘটায় না অথচ প্রতিদিন একটু একটু করে নারীর আত্মবিশ্বাস ও স্বাধীনতাকে ক্ষয় করে—তারই একটি জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত এই ঘটনা।

তবে এই গল্পের ভেতরেই লুকিয়ে আছে প্রতিরোধের সম্ভাবনাও। বিভিন্ন পেশার নারী ও পুরুষ যখন একই গানে নিজেদের ভিডিও পোস্ট করে সংহতি জানালেন, তখন তা নিছক সমর্থন ছিল না, ছিল এক সম্মিলিত অস্বীকৃতি, প্যানপ্টিকনের যুক্তিকে প্রশ্ন করার প্রয়াস।

সাংবাদিক রিমু সিদ্দিকী লিখলেন, বৃষ্টি কখনো আনন্দ, কখনো বিষাদ, কখনো অনুভূতির প্রকাশ। শিক্ষক দীপা মণ্ডল প্রশ্ন তুললেন, শাড়ি পরে স্বাভাবিকভাবে হাঁটাকে কীভাবে অশ্লীল বলে দেখা যায়। লেখক হুমায়ুন কবির ঢালী মনে করিয়ে দিলেন, একজন শিক্ষক যন্ত্র নন, রক্তমাংসের মানুষ। এই কণ্ঠস্বরগুলো একত্রিত হয়ে যা তৈরি করল, তা ফুকোর ভাষায় এক ধরনের কাউন্টার কনডাক্ট বা প্রতি আচরণ—ক্ষমতার বিরুদ্ধে সরাসরি সংঘাত নয়, বরং তার যুক্তির ভেতরেই ভিন্ন এক আচরণ-পদ্ধতি প্রতিষ্ঠা করা। নজরদারির কাঠামোর ভেতরেও ফাটল তৈরি করা যায়।

তবু প্রশ্ন থেকে যায়—এই সংহতি কি কাঠামো বদলাতে পারে, নাকি শুধু একটি বিচ্ছিন্ন মুহূর্তের প্রতিরোধ হয়ে থেকে যায়? বার্টকি যেমন মনে করিয়ে দেন, পুরুষতান্ত্রিক নিয়মানুবর্তিতা আমরা এতটাই আত্মস্থ করে ফেলেছি যে একটি ঘটনার প্রতিবাদেই তা ভেঙে পড়ে না। প্রত্যেক নারীকে নতুন করে এই যুদ্ধ লড়তে হয়, প্রতিটি প্রজন্মকে আবার নিজের শরীরের ওপর নিজের অধিকার আদায় করতে হয়। আজ বিউটি রানি পালের সঙ্গে ঘটেছে, আগামীকাল হয়তো অন্য কোনো নারীকে একই পথে হাঁটতে হবে।

তবু এই প্রতিটি ঘটনা একটি সঞ্চয় তৈরি করে—ভাষার সঞ্চয়, প্রশ্নের সঞ্চয়, সংহতির সঞ্চয়। যখন একজন শিক্ষিকা নিজেই বলেন, অভিযোগ থাকলে তা যথাযথ কর্তৃপক্ষকে জানানো উচিত, প্রকাশ্যে হেনস্থা নয়, তখন তিনি আসলে রাষ্ট্র ও সমাজের হাতে থাকা বিচারের ভারকে ফিরিয়ে দিচ্ছেন তার যথাযথ জায়গায়, আর নিজের শরীরের ওপর নিজের কর্তৃত্বের দাবি জানাচ্ছেন। এই দাবিই আজকের সবচেয়ে জরুরি রাজনৈতিক ভাষা।

  • নাজিয়া আফরিন: শিক্ষক, ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস
Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত