সুমন সুবহান

একটি রাজনৈতিক দল, যার লোগো কোনো ফুল, হাত বা সাইকেল নয়—বরং একটি ‘তেলাপোকো’। যার স্লোগান হলো—‘ভয়েস অব দ্য লেজি অ্যান্ড আনএমপ্লয়েড’। শুনতে অদ্ভুত ও অবিশ্বাস্য মনে হলেও প্রথাগত রাজনীতির চেনা ছক ও প্রচলিত প্রতীকের বাইরে গিয়ে ভারতের বুকে জন্ম নিয়েছে এক নতুন ধারার ইন্টারনেট বিপ্লব।
‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) বা ককরোচ আন্দোলন হচ্ছে ভারতের লাখ লাখ হতাশ, ক্ষুব্ধ অথচ প্রযুক্তিবন্ধু তরুণ ও ‘জেন-জি’ প্রজন্মের এক অভিনব ব্যঙ্গাত্মক সামাজিক-রাজনৈতিক প্রতিবাদ। কোনো বিশাল জনসভা বা কোটি টাকার ফান্ডিং ছাড়াই, কেবল স্মার্টফোনের স্ক্রিনকে হাতিয়ার করে তারা রাষ্ট্রের প্রচলিত শাসনকাঠামোকে এক বড়সড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছে।
এদের মূল অস্ত্র এখন ইন্টারনেট দুনিয়ার ধারালো মিম, ইনস্টাগ্রাম রিলস আর ঝাঁঝালো হিউমার। নির্বাচন কমিশনের খাতায় সিলমোহর না থাকলেও, ইন্টারনেটের দুনিয়ায় এদের দাপট এখন যেকোনো ঐতিহ্যবাহী ও ক্ষমতাসীন দলের চেয়েও বহুগুণ বেশি।
গত ১৫ মে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির একটি বিতর্কিত মন্তব্যকে কেন্দ্র করে এই অভিনব ব্যঙ্গাত্মক প্রতিবাদের সূচনা ঘটে। পারমাণবিক বিস্ফোরণেও তেলাপোকা যেভাবে টিকে থাকে, প্রতিকূল অর্থনৈতিক বাজারেও দেশের যুবসমাজ তেলাপোকার মতোই টিকে থাকার লড়াই করবে—এই দর্শন নিয়ে দলটির পথচলা।
চালুর মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে এই আন্দোলন ভার্চুয়াল দুনিয়ার দেয়াল ভেঙে ভারতের বিভিন্ন বড় বড় রাজ্যের রাজপথেও ছড়িয়ে পড়ে। কোনো সহিংসতা বা ভাঙচুর ছাড়াই, নিছক হাসির ছলে এরা রাষ্ট্রের বড় বড় নীতি আর বিচারব্যবস্থার ভিত নাড়িয়ে দিচ্ছে।
এই অভিনব বিদ্রোহের মূল কারণ হলো দেশের বর্তমান আকাশছোঁয়া বেকারত্ব, বারবার সরকারি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং যুবসমাজের প্রতি রাষ্ট্রের চরম উদাসীনতা। পুঞ্জীভূত এই ক্ষোভকে প্রথাগত রাজনীতির বাইরে গিয়ে এক শান্তিপূর্ণ অথচ বুক কাঁপানো গণ-আন্দোলনে রূপ দিয়েছে এই জেন-জি প্রজন্ম। কোনো বিশাল জনসভা বা কোটি টাকার ফান্ডিং নেই এদের।
এই আন্দোলনের গভীর অন্তর্নিহিত দর্শনটি গড়ে উঠেছে তেলাপোকার মতো চরম প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও যেকোনো উপায়ে টিকে থাকার এক অদ্ভুত জেদ নিয়ে। দেশের বর্তমান অন্ধকার আর্থ-সামাজিক বাস্তবতাকে উপহাসের চাবুকে রক্তাক্ত করাই এই ভার্চুয়াল গ্রুপের প্রধান রণকৌশল ও প্রতিদিনের খেলা হয়ে উঠেছে। যারা এতদিন কেবল সামাজিক মাধ্যমে স্ক্রল করে সময় কাটাত, তারা আজ রাজনৈতিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক অদৃশ্য কিন্তু শক্তিশালী ডিজিটাল প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। যুবসমাজের এই স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ প্রমাণ করে যে, প্রযুক্তির যুগে প্রতিবাদের জন্য এখন আর রাজপথের ভাঙচুরের প্রয়োজন পড়ে না। সিস্টেমের বৈষম্য আর অবহেলাকে ব্যঙ্গাত্মক ইশতেহারে রূপ দিয়ে তারা নীতিনির্ধারকদের প্রতিনিয়ত জবাবদিহিতার কাঠগড়ায় দাঁড় করাচ্ছে। তেলাপোকার এই রূপকটি ব্যবহার করে জেন-জি প্রজন্ম ক্ষমতার অলিন্দে থাকা মানুষদের বুঝিয়ে দিচ্ছে যে, অবহেলিত সাধারণ জনতাকে আর সহজে দমানো যাবে না।
শুরুতে এটি ছিল শুধুই ইনস্টাগ্রাম আর ‘এক্স’ (টুইটার)-এর দেয়ালে আটকে থাকা এক তুমুল ঝড়। কিন্তু জেন-জি প্রজন্মের এই ক্ষোভের পারদ এতটাই চড়া ছিল যে, মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে তা ভার্চুয়াল দুনিয়ার সীমানা ভেঙে আছড়ে পড়ে বাস্তবের রাজপথে। দিল্লি ছাড়িয়ে এর তীব্র ঢেউ মুহূর্তের মধ্যে গ্রাস করে পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, উত্তরপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র ও মধ্যপ্রদেশের মতো বড় বড় রাজ্যগুলোকে।
স্মার্টফোনের স্ক্রিনে শুরু হওয়া একটি সাধারণ মিম পেজ কীভাবে চোখের পলকে গণ-আন্দোলনে রূপ নিতে পারে, ককরোচ জনতা পার্টি তার জীবন্ত প্রমাণ। ভারতের কোণায় কোণায় ছড়িয়ে থাকা হতাশ তরুণদের এটি যেন এক অদৃশ্য সুতোয় বেঁধে ফেলেছে। সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যালগরিদমকে হাতিয়ার করে এই আন্দোলন এখন দেশের এক রাজ্য থেকে অন্য রাজ্যে দাবানলের মতো জ্বলছে। দিল্লির সাইবার স্পেস থেকে শুরু হওয়া এই তেলাপোকা-ঝড় আজ পুরো ভারতের রাজপথ কাঁপানো এক বাস্তবতা!
ককরোচ জনতা পার্টির এই অভাবনীয় ডিজিটাল বিপ্লবের পেছনে মূল মস্তিষ্ক হিসেবে কাজ করছেন বোস্টন ইউনিভার্সিটির পাবলিক রিলেশনসের সদ্য স্নাতক এবং পলিটিক্যাল কমিউনিকেশন স্ট্র্যাটেজিস্ট ৩০ বছর বয়সী তরুণ অভিজিৎ দীপক। পূর্বে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ডিজিটাল ক্যাম্পেইন সামলানোর বাস্তব অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে তিনি এই অভিনব প্রতিবাদের ট্রেন্ড তৈরি করেন।
তবে এই আন্দোলনের আসল চালিকাশক্তি হলো ভারতের কোটি কোটি সাধারণ বেকার, শিক্ষার্থী এবং প্রযুক্তিবন্ধু ‘জেন-জি’ প্রজন্মের তরুণ-তরুণী, যারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে এর সাথে যুক্ত হয়েছে। ভার্চুয়াল দুনিয়ায় এদের ক্ষোভের তীব্রতা এতটাই প্রবল ছিল যে, চালুর মাত্র ৫-৬ দিনের মাথায় দলটির ইনস্টাগ্রাম পেজের ফলোয়ার সংখ্যা দেড় কোটি ছাড়িয়ে যায়। এই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অনুসারী সংখ্যা ভারতের ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল বিজেপির অফিশিয়াল ইনস্টাগ্রাম ফলোয়ারের চেয়েও বেশি।
শুধু সাধারণ শিক্ষার্থীরাই নয়, এই আন্দোলনের জোয়ারে গা ভাসিয়েছেন দেশের প্রথম সারির মূলধারার রাজনীতিকেরাও। তৃণমূল কংগ্রেসের সংসদ সদস্য মহুয়া মৈত্রের মতো প্রভাবশালী বিরোধী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরা ব্যঙ্গাত্মকভাবে এই দলের মেম্বারশিপ বা সদস্যপদ গ্রহণ করেছেন। সব মিলিয়ে, একজন দক্ষ স্ট্র্যাটেজিস্টের আইডিয়া এবং দেশের কোটি বঞ্চিত তরুণের সম্মিলিত অনলাইন ক্ষোভই আজ এই ককরোচ আন্দোলনকে ভারতের সবচেয়ে বড় ডিজিটাল বিদ্রোহে পরিণত করেছে।
গত ১৫ মে একটি মামলার শুনানির সময় প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত দেশের বেকার যুবকদের একটি অংশকে উদ্দেশ্য করে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি মন্তব্য করেন যে, কর্মহীন তরুণদের অনেকেই আসলে ‘তেলাপোকার’ মতো আচরণ করছে। কোথাও স্থায়ী চাকরি না পেয়ে এরা সোশ্যাল মিডিয়া কিংবা আরটিআই অ্যাক্টিভিস্ট সেজে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে ব্ল্যাকমেইল বা আক্রমণ করে বেড়াচ্ছে।
প্রধান বিচারপতির মুখে দেশের যুবসমাজকে সরাসরি সমাজের ‘পরজীবী’ হিসেবে সম্বোধন করার এই বিষয়টি মুহূর্তের মধ্যে দেশজুড়ে আলোড়ন তৈরি করে। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ স্তম্ভের এমন চরম উদাসীন ও অপমানজনক দৃষ্টিভঙ্গি ভারতের কোটি কোটি হতাশ ও ক্ষুব্ধ তরুণ-তরুণীর ভেতরের জমানো ক্ষোভের আগুনকে এক নিমেষে উস্কে দেয়।
প্রধান বিচারপতির এই অপমানজনক ‘তেলাপোকো’ তত্ত্বের জবাব দিতেই মূলত ডিজিটাল দুনিয়ায় প্রতিবাদের পরিকল্পনা করা হয়। তার এই মন্তব্যের ঠিক পরদিনই, অর্থাৎ ১৬ মে রাজনৈতিক স্ট্র্যাটেজিস্ট অভিজিৎ দীপক রসিকতা ও ক্ষোভের মিশেলে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ গঠনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন।
যা শুরুতে কেবল একটি আদালতের মন্তব্যের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া ছিল, তা মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে কোটি তরুণের এক ইস্পাতকঠিন নাগরিক অধিকার রক্ষার আন্দোলনে রূপ নেয়।
তীক্ষ্ণ হাস্যরস আর মিমের মোড়কে এই আন্দোলন আসলে ভারতের বিচার বিভাগের পক্ষপাতিত্ব, রাজনৈতিক দুর্নীতি এবং শাসনব্যবস্থার একনায়কতান্ত্রিক মানসিকতার আসল মুখোশ খুলে দিচ্ছে। তাদের ইশতেহারে শিক্ষিত তরুণদের কর্মসংস্থানের অধিকার নিশ্চিত করা এবং বারবার হওয়া প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রণয়নের জোরালো দাবি জানানো হয়েছে। একই সাথে বিচার ব্যবস্থার নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে কোনো বিচারপতি অবসরের পর সরাসরি রাজ্যসভার আসন বা সরকারি লাভজনক পদ পাবেন না—এমন বৈপ্লবিক সংস্কারের দাবি তুলেছে তারা। এছাড়াও দেশের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নারীদের জন্য সংসদ ও মন্ত্রিসভায় ৫০ শতাংশ আসন সংরক্ষণ এবং তথ্যের অধিকার রক্ষায় অ্যাক্টিভিস্টদের পূর্ণ সুরক্ষার দাবিও এই আন্দোলনের অন্যতম প্রধান এজেন্ডা।
ব্যঙ্গাত্মক এই রাজনৈতিক দলে যোগ দেওয়ার জন্য জেন-জি প্রজন্ম কিছু অদ্ভুত ও মজার সদস্যপদের শর্ত জুড়ে দিয়েছে। আবেদনকারীকে অবশ্যই বেকার কিংবা আন্ডার-এমপ্লয়েড হতে হবে এবং দিনে অন্তত ১১ ঘণ্টা ইন্টারনেটে সক্রিয় থাকার পাশাপাশি সিস্টেমের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশের যোগ্যতা থাকতে হবে।
এই অনলাইনের শক্তিকে তারা অফলাইনেও কাজে লাগাচ্ছে এবং প্লাস্টিক বর্জ্য অপসারণ ও যমুনা নদী পরিষ্কারের মতো চমৎকার সব বাস্তবমুখী সামাজিক কাজের মাধ্যমে সমাজ সংস্কারের এক নতুন উদাহরণ তৈরি করছে।
এই ডিজিটাল বিদ্রোহের ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তায় ভারতের নীতিনির্ধারকেরা বেশ নড়েচড়ে বসেছেন। আন্দোলনের গতি রুখে দিতে গত ২১ মে সরকারের বিশেষ অনুরোধে ককরোচ জনতা পার্টির অফিশিয়াল এক্স হ্যান্ডেলটি সাময়িকভাবে ব্লক বা উইথহোল্ড করে দেওয়া হয়।
ডিজিটাল স্ক্রিন থেকে শুরু হয়ে বাস্তবের রাজপথে আছড়ে পড়া এই তেলাপোকা-ঝড় স্পষ্ট বার্তা দেয় যে, তরুণদের দাবি ও ক্ষোভকে আর কোনোভাবেই উপেক্ষা করা সম্ভব নয়। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ স্তম্ভগুলোর অবিবেচক মন্তব্য কিংবা দমনমূলক সেন্সরশিপ দিয়ে যে এই নতুন প্রজন্মের কণ্ঠরোধ করা যায় না, দলটির অফিশিয়াল সোশ্যাল মিডিয়া হ্যান্ডেল ব্লক করার ঘটনা এবং তার পরবর্তী তীব্র প্রতিক্রিয়াই তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ।
কিবোর্ডের বোতাম থেকে শুরু হওয়া এই তেলাপোকা-বাহিনীর লড়াই শেষ পর্যন্ত এটাই প্রমাণ করল যে, একটি সুতীক্ষ্ণ আইডিয়া বা মিম আজ পারমাণবিক বোমার চেয়েও শক্তিশালী উপায়ে রাষ্ট্রের বিবেককে নাড়িয়ে দিতে পারে।

একটি রাজনৈতিক দল, যার লোগো কোনো ফুল, হাত বা সাইকেল নয়—বরং একটি ‘তেলাপোকো’। যার স্লোগান হলো—‘ভয়েস অব দ্য লেজি অ্যান্ড আনএমপ্লয়েড’। শুনতে অদ্ভুত ও অবিশ্বাস্য মনে হলেও প্রথাগত রাজনীতির চেনা ছক ও প্রচলিত প্রতীকের বাইরে গিয়ে ভারতের বুকে জন্ম নিয়েছে এক নতুন ধারার ইন্টারনেট বিপ্লব।
‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) বা ককরোচ আন্দোলন হচ্ছে ভারতের লাখ লাখ হতাশ, ক্ষুব্ধ অথচ প্রযুক্তিবন্ধু তরুণ ও ‘জেন-জি’ প্রজন্মের এক অভিনব ব্যঙ্গাত্মক সামাজিক-রাজনৈতিক প্রতিবাদ। কোনো বিশাল জনসভা বা কোটি টাকার ফান্ডিং ছাড়াই, কেবল স্মার্টফোনের স্ক্রিনকে হাতিয়ার করে তারা রাষ্ট্রের প্রচলিত শাসনকাঠামোকে এক বড়সড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছে।
এদের মূল অস্ত্র এখন ইন্টারনেট দুনিয়ার ধারালো মিম, ইনস্টাগ্রাম রিলস আর ঝাঁঝালো হিউমার। নির্বাচন কমিশনের খাতায় সিলমোহর না থাকলেও, ইন্টারনেটের দুনিয়ায় এদের দাপট এখন যেকোনো ঐতিহ্যবাহী ও ক্ষমতাসীন দলের চেয়েও বহুগুণ বেশি।
গত ১৫ মে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির একটি বিতর্কিত মন্তব্যকে কেন্দ্র করে এই অভিনব ব্যঙ্গাত্মক প্রতিবাদের সূচনা ঘটে। পারমাণবিক বিস্ফোরণেও তেলাপোকা যেভাবে টিকে থাকে, প্রতিকূল অর্থনৈতিক বাজারেও দেশের যুবসমাজ তেলাপোকার মতোই টিকে থাকার লড়াই করবে—এই দর্শন নিয়ে দলটির পথচলা।
চালুর মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে এই আন্দোলন ভার্চুয়াল দুনিয়ার দেয়াল ভেঙে ভারতের বিভিন্ন বড় বড় রাজ্যের রাজপথেও ছড়িয়ে পড়ে। কোনো সহিংসতা বা ভাঙচুর ছাড়াই, নিছক হাসির ছলে এরা রাষ্ট্রের বড় বড় নীতি আর বিচারব্যবস্থার ভিত নাড়িয়ে দিচ্ছে।
এই অভিনব বিদ্রোহের মূল কারণ হলো দেশের বর্তমান আকাশছোঁয়া বেকারত্ব, বারবার সরকারি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং যুবসমাজের প্রতি রাষ্ট্রের চরম উদাসীনতা। পুঞ্জীভূত এই ক্ষোভকে প্রথাগত রাজনীতির বাইরে গিয়ে এক শান্তিপূর্ণ অথচ বুক কাঁপানো গণ-আন্দোলনে রূপ দিয়েছে এই জেন-জি প্রজন্ম। কোনো বিশাল জনসভা বা কোটি টাকার ফান্ডিং নেই এদের।
এই আন্দোলনের গভীর অন্তর্নিহিত দর্শনটি গড়ে উঠেছে তেলাপোকার মতো চরম প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও যেকোনো উপায়ে টিকে থাকার এক অদ্ভুত জেদ নিয়ে। দেশের বর্তমান অন্ধকার আর্থ-সামাজিক বাস্তবতাকে উপহাসের চাবুকে রক্তাক্ত করাই এই ভার্চুয়াল গ্রুপের প্রধান রণকৌশল ও প্রতিদিনের খেলা হয়ে উঠেছে। যারা এতদিন কেবল সামাজিক মাধ্যমে স্ক্রল করে সময় কাটাত, তারা আজ রাজনৈতিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক অদৃশ্য কিন্তু শক্তিশালী ডিজিটাল প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। যুবসমাজের এই স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ প্রমাণ করে যে, প্রযুক্তির যুগে প্রতিবাদের জন্য এখন আর রাজপথের ভাঙচুরের প্রয়োজন পড়ে না। সিস্টেমের বৈষম্য আর অবহেলাকে ব্যঙ্গাত্মক ইশতেহারে রূপ দিয়ে তারা নীতিনির্ধারকদের প্রতিনিয়ত জবাবদিহিতার কাঠগড়ায় দাঁড় করাচ্ছে। তেলাপোকার এই রূপকটি ব্যবহার করে জেন-জি প্রজন্ম ক্ষমতার অলিন্দে থাকা মানুষদের বুঝিয়ে দিচ্ছে যে, অবহেলিত সাধারণ জনতাকে আর সহজে দমানো যাবে না।
শুরুতে এটি ছিল শুধুই ইনস্টাগ্রাম আর ‘এক্স’ (টুইটার)-এর দেয়ালে আটকে থাকা এক তুমুল ঝড়। কিন্তু জেন-জি প্রজন্মের এই ক্ষোভের পারদ এতটাই চড়া ছিল যে, মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে তা ভার্চুয়াল দুনিয়ার সীমানা ভেঙে আছড়ে পড়ে বাস্তবের রাজপথে। দিল্লি ছাড়িয়ে এর তীব্র ঢেউ মুহূর্তের মধ্যে গ্রাস করে পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, উত্তরপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র ও মধ্যপ্রদেশের মতো বড় বড় রাজ্যগুলোকে।
স্মার্টফোনের স্ক্রিনে শুরু হওয়া একটি সাধারণ মিম পেজ কীভাবে চোখের পলকে গণ-আন্দোলনে রূপ নিতে পারে, ককরোচ জনতা পার্টি তার জীবন্ত প্রমাণ। ভারতের কোণায় কোণায় ছড়িয়ে থাকা হতাশ তরুণদের এটি যেন এক অদৃশ্য সুতোয় বেঁধে ফেলেছে। সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যালগরিদমকে হাতিয়ার করে এই আন্দোলন এখন দেশের এক রাজ্য থেকে অন্য রাজ্যে দাবানলের মতো জ্বলছে। দিল্লির সাইবার স্পেস থেকে শুরু হওয়া এই তেলাপোকা-ঝড় আজ পুরো ভারতের রাজপথ কাঁপানো এক বাস্তবতা!
ককরোচ জনতা পার্টির এই অভাবনীয় ডিজিটাল বিপ্লবের পেছনে মূল মস্তিষ্ক হিসেবে কাজ করছেন বোস্টন ইউনিভার্সিটির পাবলিক রিলেশনসের সদ্য স্নাতক এবং পলিটিক্যাল কমিউনিকেশন স্ট্র্যাটেজিস্ট ৩০ বছর বয়সী তরুণ অভিজিৎ দীপক। পূর্বে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ডিজিটাল ক্যাম্পেইন সামলানোর বাস্তব অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে তিনি এই অভিনব প্রতিবাদের ট্রেন্ড তৈরি করেন।
তবে এই আন্দোলনের আসল চালিকাশক্তি হলো ভারতের কোটি কোটি সাধারণ বেকার, শিক্ষার্থী এবং প্রযুক্তিবন্ধু ‘জেন-জি’ প্রজন্মের তরুণ-তরুণী, যারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে এর সাথে যুক্ত হয়েছে। ভার্চুয়াল দুনিয়ায় এদের ক্ষোভের তীব্রতা এতটাই প্রবল ছিল যে, চালুর মাত্র ৫-৬ দিনের মাথায় দলটির ইনস্টাগ্রাম পেজের ফলোয়ার সংখ্যা দেড় কোটি ছাড়িয়ে যায়। এই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অনুসারী সংখ্যা ভারতের ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল বিজেপির অফিশিয়াল ইনস্টাগ্রাম ফলোয়ারের চেয়েও বেশি।
শুধু সাধারণ শিক্ষার্থীরাই নয়, এই আন্দোলনের জোয়ারে গা ভাসিয়েছেন দেশের প্রথম সারির মূলধারার রাজনীতিকেরাও। তৃণমূল কংগ্রেসের সংসদ সদস্য মহুয়া মৈত্রের মতো প্রভাবশালী বিরোধী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরা ব্যঙ্গাত্মকভাবে এই দলের মেম্বারশিপ বা সদস্যপদ গ্রহণ করেছেন। সব মিলিয়ে, একজন দক্ষ স্ট্র্যাটেজিস্টের আইডিয়া এবং দেশের কোটি বঞ্চিত তরুণের সম্মিলিত অনলাইন ক্ষোভই আজ এই ককরোচ আন্দোলনকে ভারতের সবচেয়ে বড় ডিজিটাল বিদ্রোহে পরিণত করেছে।
গত ১৫ মে একটি মামলার শুনানির সময় প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত দেশের বেকার যুবকদের একটি অংশকে উদ্দেশ্য করে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি মন্তব্য করেন যে, কর্মহীন তরুণদের অনেকেই আসলে ‘তেলাপোকার’ মতো আচরণ করছে। কোথাও স্থায়ী চাকরি না পেয়ে এরা সোশ্যাল মিডিয়া কিংবা আরটিআই অ্যাক্টিভিস্ট সেজে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে ব্ল্যাকমেইল বা আক্রমণ করে বেড়াচ্ছে।
প্রধান বিচারপতির মুখে দেশের যুবসমাজকে সরাসরি সমাজের ‘পরজীবী’ হিসেবে সম্বোধন করার এই বিষয়টি মুহূর্তের মধ্যে দেশজুড়ে আলোড়ন তৈরি করে। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ স্তম্ভের এমন চরম উদাসীন ও অপমানজনক দৃষ্টিভঙ্গি ভারতের কোটি কোটি হতাশ ও ক্ষুব্ধ তরুণ-তরুণীর ভেতরের জমানো ক্ষোভের আগুনকে এক নিমেষে উস্কে দেয়।
প্রধান বিচারপতির এই অপমানজনক ‘তেলাপোকো’ তত্ত্বের জবাব দিতেই মূলত ডিজিটাল দুনিয়ায় প্রতিবাদের পরিকল্পনা করা হয়। তার এই মন্তব্যের ঠিক পরদিনই, অর্থাৎ ১৬ মে রাজনৈতিক স্ট্র্যাটেজিস্ট অভিজিৎ দীপক রসিকতা ও ক্ষোভের মিশেলে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ গঠনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন।
যা শুরুতে কেবল একটি আদালতের মন্তব্যের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া ছিল, তা মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে কোটি তরুণের এক ইস্পাতকঠিন নাগরিক অধিকার রক্ষার আন্দোলনে রূপ নেয়।
তীক্ষ্ণ হাস্যরস আর মিমের মোড়কে এই আন্দোলন আসলে ভারতের বিচার বিভাগের পক্ষপাতিত্ব, রাজনৈতিক দুর্নীতি এবং শাসনব্যবস্থার একনায়কতান্ত্রিক মানসিকতার আসল মুখোশ খুলে দিচ্ছে। তাদের ইশতেহারে শিক্ষিত তরুণদের কর্মসংস্থানের অধিকার নিশ্চিত করা এবং বারবার হওয়া প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রণয়নের জোরালো দাবি জানানো হয়েছে। একই সাথে বিচার ব্যবস্থার নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে কোনো বিচারপতি অবসরের পর সরাসরি রাজ্যসভার আসন বা সরকারি লাভজনক পদ পাবেন না—এমন বৈপ্লবিক সংস্কারের দাবি তুলেছে তারা। এছাড়াও দেশের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নারীদের জন্য সংসদ ও মন্ত্রিসভায় ৫০ শতাংশ আসন সংরক্ষণ এবং তথ্যের অধিকার রক্ষায় অ্যাক্টিভিস্টদের পূর্ণ সুরক্ষার দাবিও এই আন্দোলনের অন্যতম প্রধান এজেন্ডা।
ব্যঙ্গাত্মক এই রাজনৈতিক দলে যোগ দেওয়ার জন্য জেন-জি প্রজন্ম কিছু অদ্ভুত ও মজার সদস্যপদের শর্ত জুড়ে দিয়েছে। আবেদনকারীকে অবশ্যই বেকার কিংবা আন্ডার-এমপ্লয়েড হতে হবে এবং দিনে অন্তত ১১ ঘণ্টা ইন্টারনেটে সক্রিয় থাকার পাশাপাশি সিস্টেমের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশের যোগ্যতা থাকতে হবে।
এই অনলাইনের শক্তিকে তারা অফলাইনেও কাজে লাগাচ্ছে এবং প্লাস্টিক বর্জ্য অপসারণ ও যমুনা নদী পরিষ্কারের মতো চমৎকার সব বাস্তবমুখী সামাজিক কাজের মাধ্যমে সমাজ সংস্কারের এক নতুন উদাহরণ তৈরি করছে।
এই ডিজিটাল বিদ্রোহের ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তায় ভারতের নীতিনির্ধারকেরা বেশ নড়েচড়ে বসেছেন। আন্দোলনের গতি রুখে দিতে গত ২১ মে সরকারের বিশেষ অনুরোধে ককরোচ জনতা পার্টির অফিশিয়াল এক্স হ্যান্ডেলটি সাময়িকভাবে ব্লক বা উইথহোল্ড করে দেওয়া হয়।
ডিজিটাল স্ক্রিন থেকে শুরু হয়ে বাস্তবের রাজপথে আছড়ে পড়া এই তেলাপোকা-ঝড় স্পষ্ট বার্তা দেয় যে, তরুণদের দাবি ও ক্ষোভকে আর কোনোভাবেই উপেক্ষা করা সম্ভব নয়। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ স্তম্ভগুলোর অবিবেচক মন্তব্য কিংবা দমনমূলক সেন্সরশিপ দিয়ে যে এই নতুন প্রজন্মের কণ্ঠরোধ করা যায় না, দলটির অফিশিয়াল সোশ্যাল মিডিয়া হ্যান্ডেল ব্লক করার ঘটনা এবং তার পরবর্তী তীব্র প্রতিক্রিয়াই তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ।
কিবোর্ডের বোতাম থেকে শুরু হওয়া এই তেলাপোকা-বাহিনীর লড়াই শেষ পর্যন্ত এটাই প্রমাণ করল যে, একটি সুতীক্ষ্ণ আইডিয়া বা মিম আজ পারমাণবিক বোমার চেয়েও শক্তিশালী উপায়ে রাষ্ট্রের বিবেককে নাড়িয়ে দিতে পারে।

মানুষের স্মৃতিতে জিয়াউর রহমান এমন এক শাসক, যিনি উন্নয়নের ভাষাকে শহরের মসনদ থেকে নামিয়ে খাল, মাঠ ও ইউনিয়ন পরিষদের উঠোনে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। খাল কাটা কর্মসূচি, স্বনির্ভর বাংলাদেশ ও গ্রাম সরকার; এসব ধারণা আজও বাংলাদেশের রাজনৈতিক অভিধানে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। প্রশ্ন হচ্ছে, তাঁর সেই উন্নয়ন-দর্শন আজকের
৩ ঘণ্টা আগে
১৯৭৫ সালের পটপরিবর্তনের পর এক চরম ভূ-রাজনৈতিক ও অভ্যন্তরীণ সংকটের সন্ধিক্ষণে বাংলাদেশের শাসনভার গ্রহণ করেন মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি মূলত ভারত এবং সোভিয়েত ব্লকের ওপর বহুলাংশে নির্ভরশীল থাকলেও, জিয়াউর রহমানের শাসনামল (১৯৭৭-১৯৮১) দেশের জাতীয় নিরাপত
৪ ঘণ্টা আগে
একটি বিকল্প বা অনুমিত ইতিহাসের দিকে তাকানো যাক। যখন মেজর জিয়াউর রহমান চট্টগ্রাম বন্দরে থাকার নির্দেশ মেনে নিয়েছিলেন অথবা পদক্ষেপ নেওয়ার আগেই তাঁকে নিষ্ক্রিয় করে দেওয়া হয়েছিল। ভাবা যাক মেজর জিয়ার এই দৃশ্যপটে আগমনের কারণ।
৬ ঘণ্টা আগে
সমকালীন ভারতীয় রাজনীতিতে আদর্শিক অবস্থানের সাথে বাস্তবতার এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও কাঠামোগত দ্বন্দ্ব দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে যে রাজনৈতিক রূপান্তর ঘটেছে, তার ধারাবাহিকতায় পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন পরবর্তী পরিস্থিতিকে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং উদ্বেগজনক ‘কেস স্টাডি’ হিসেবে ধরা যায়।
১ দিন আগে