মতামত
সুমন সুবহান

১৯৭৫ সালের পটপরিবর্তনের পর এক চরম ভূ-রাজনৈতিক ও অভ্যন্তরীণ সংকটের সন্ধিক্ষণে বাংলাদেশের শাসনভার গ্রহণ করেন মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি মূলত ভারত এবং সোভিয়েত ব্লকের ওপর বহুলাংশে নির্ভরশীল থাকলেও, জিয়াউর রহমানের শাসনামল (১৯৭৭-১৯৮১) দেশের জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলে এক যুগান্তকারী ও বাস্তবমুখী রূপান্তরের সূচনা করে।
ওই সময়ে অভ্যন্তরীণ সামরিক অস্থিরতা, একের পর এক ক্যু-এর চেষ্টা এবং বিশেষ করে দক্ষিণ তালপট্টি দ্বীপকে কেন্দ্র করে ভারতের সাথে উদ্ভূত সামরিক সংঘাত বাংলাদেশকে এক কঠোর বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছিল। জিয়াউর রহমান উপলব্ধি করেছিলেন, কেবল ‘ন্যাশনালিজম’ কিংবা ‘জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন’-এর মতো আদর্শিক স্লোগান দিয়ে একটি সদ্য স্বাধীন ও ক্ষুদ্র রাষ্ট্রের ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষা করা সম্ভব নয়। রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব টিকিয়ে রাখতে তিনি ‘শক্তির ভারসাম্য’ নীতির ওপর ভিত্তি করে ‘রিয়ালিস্টিক ডিপ্লোম্যাসি’ বা বাস্তববাদী কূটনীতির জন্ম দেন।
জিয়াউর রহমান ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের সাথে শক্তিশালী কৌশলগত অক্ষ গড়ে তোলেন, যা ভারতকে আন্তর্জাতিক ‘কাউন্টার-ব্যালেন্স’-এর মুখোমুখি করে। সমরাস্ত্র ক্রয়ের ক্ষেত্রে কোনো একক দেশের ওপর নির্ভর না করে ‘বৈচিত্র্যকরণ নীতি’ গ্রহণ করে তিনি চীনের টাইপ-৫৯ ট্যাংক ও এফ-৬ যুদ্ধবিমান এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বেল-২১২ হেলিকপ্টার সংগ্রহের মাধ্যমে সশস্ত্র বাহিনীকে সামরিক ব্ল্যাকমেইল থেকে চিরতরে মুক্ত করেন। একই সাথে সংবিধানে ‘ইসলামী সংহতি’ যুক্ত করে সৌদি আরব, লিবিয়া ও ইরাকের মতো তেল-সমৃদ্ধ মুসলিম বিশ্বের সাথে সম্পর্কের সর্বোচ্চকরণ, ইরান-ইরাক যুদ্ধে ওআইসি শান্তি মিশনে ঐতিহাসিক মধ্যস্থতা এবং ভারতকে বহুপাক্ষিক আইনি কাঠামোয় বাঁধতে ‘সার্ক’-এর দূরদর্শী রূপরেখা প্রণয়ন তাঁর রিয়ালিস্টিক ডিপ্লোম্যাসির সমাদৃত বহিঃপ্রকাশ।
অভ্যন্তরীণ ফ্রন্টে পার্বত্য চট্টগ্রামের অখণ্ডতা রক্ষায় সামরিক বিন্যাস, আনসার ও ভিডিপিকে বৃহত্তম প্যারামিলিটারি ফোর্সে রূপান্তর এবং ‘অপারেশন নবদিগন্ত’ ও ‘অপারেশন সি গাল’-এর মাধ্যমে সিভিল-মিলিটারি কো-অপারেশনের যে মেলবন্ধন তিনি তৈরি করেছিলেন—তা আজও বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তার প্রধান কৌশলগত গ্যারান্টি হিসেবে সক্রিয় রয়েছে।
১৯৭০ সালের ঘূর্ণিঝড়ের পর জেগে ওঠা দক্ষিণ তালপট্টি দ্বীপের মালিকানা নিয়ে ১৯৮১ সালে ভারতের সামরিক আগ্রাসন বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বকে বড় ঝুঁকিতে ফেলেছিল। ভারতের বিশাল সামরিক শক্তির বিপরীতে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বিন্দুমাত্র পিছু না হটে তাৎক্ষণিকভাবে নৌবাহিনীর গানবোট পাঠিয়ে এক অনমনীয় ও সাহসী প্রতিরোধ গড়ে তোলেন।
মূলত বঙ্গোপসাগরের এই অগ্নিপরীক্ষাই জিয়াউর রহমানকে চূড়ান্ত বার্তা দিয়েছিল যে, ভারতের দ্বিপাক্ষিক চাপ মোকাবিলা করতে হলে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে শক্তিশালী শক্তির ভারসাম্য তৈরি করা বাংলাদেশের জন্য অপরিহার্য।
১৯৮১ সালের মে মাসে ভারত আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে বিতর্কিত দক্ষিণ তালপট্টি দ্বীপে সশস্ত্র বিএসএফ জোয়ান পাঠায় এবং সেখানে নিজেদের জাতীয় পতাকা উত্তোলন করে। মার্কাস ফ্রান্ডার বাংলাদেশ: দ্য ফার্স্ট ডিকেট (১৯৮২) গ্রন্থের বিবরণ অনুযায়ী, এই ঘটনার সাথে সাথে ভারতীয় নৌবাহিনীর অত্যাধুনিক যুদ্ধজাহাজ ‘আইএনএস সান্ধ্যক’ দ্বীপটির চারপাশের জলসীমায় অবস্থান নিয়ে এক নজিরবিহীন সামরিক আগ্রাসন চালায়।
ওই সময়ের জাতীয় দৈনিক ইত্তেফাক থেকে জানা যায়, বাংলাদেশের জলসীমায় ভারতের এই আকস্মিক শক্তির প্রদর্শন দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে চরম উত্তেজনা সৃষ্টি করেছিল। সামগ্রিকভাবে, আন্তর্জাতিক আইন ও সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের এই ঘটনাটি সেসময়ে বাংলাদেশের ভৌগোলিক অখণ্ডতার জন্য এক বিরাট হুমকি হিসেবে দেখা দিয়েছিল।
জিয়াউর রহমান তখন তাৎক্ষণিকভাবে বঙ্গোপসাগরের বিতর্কিত জলসীমায় নৌবাহিনীর গানবোট পাঠানোর নির্দেশ দেন এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে তীব্র প্রতিবাদ জানান। ভারতের মতো বিশাল সামরিক শক্তির বিরুদ্ধে বাংলাদেশের এই অনমনীয় অবস্থান ছিল একটি অত্যন্ত সাহসী এবং বাস্তবসম্মত প্রতিরোধ। মেজর জেনারেল (অব.) মইনুল হোসেন চৌধুরীর এক জেনারেলের নীরব সাক্ষ্য: স্বাধীনতার প্রথম দশক গ্রন্থে এই সামরিক প্রতিরোধের দৃঢ়তার কথা উল্লেখ রয়েছে।
রিয়ালিস্টিক ডিপ্লোম্যাসির মূলনীতিকে ধারণ করেই প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক কৌশল পুনর্নির্ধারণ করেছিলেন। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৮০ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের সাথে নিরাপত্তা সংলাপ এবং ১৯৭৬-৭৭ সাল থেকে চীনের সাথে সামরিক মৈত্রী স্থাপনের মাধ্যমে তিনি দেশের সার্বভৌমত্বের এক শক্তিশালী আন্তর্জাতিক ঢাল তৈরি করেন।
১৯৮০ সালের আগস্ট মাসে জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রীয় সফরে যুক্তরাষ্ট্র যান এবং প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের সাথে হোয়াইট হাউসে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে বসেন। এই সংলাপে জিয়াউর রহমান শুধু অর্থনৈতিক সাহায্যই চাননি, বরং বাংলাদেশের আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন। মার্কিন প্রশাসনের অবমুক্ত করা ঐতিহাসিক দলিল (FRUS - Foreign Relations of the United States, 1977–1981) অনুযায়ী, কার্টার প্রশাসনও দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে বাংলাদেশকে একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করতে শুরু করে। রিয়ালিস্টিক ডিপ্লোম্যাসির এই অনন্য প্রয়োগটি সেসময়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং বহুমাত্রিক শক্তির ভারসাম্য তৈরিতে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করেছিল।
১৯৭৫ সালের পটপরিবর্তনের পর জিয়াউর রহমান চীনের সাথে কূটনৈতিক ও সামরিক সম্পর্ককে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যান। ১৯৭৬-৭৭ সাল থেকে শুরু হওয়া এই নিবিড় দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের মূল কৌশলগত উদ্দেশ্য ছিল ভারতের সম্ভাব্য সামরিক ও আঞ্চলিক চাপ মোকাবিলায় একটি শক্তিশালী ‘কাউন্টার-ব্যালেন্স’ বা সামরিক ব্যাকআপ তৈরি করা। চীনের এই আন্তরিক সহযোগিতার ফলেই বাংলাদেশের তিন বাহিনীকে নতুন করে ঢেলে সাজানো এবং আধুনিকায়নের কাজ শুরু হয়। চীনা বিমান বাহিনীর এফ-৬ যুদ্ধবিমান এবং সেনাবাহিনীর জন্য টাইপ-৫৯ ট্যাংকের মতো ভারী সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর সক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদের মতে, বেইজিংয়ের এই সামরিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা ছিল বঙ্গোপসাগর ও সীমান্ত এলাকায় ভারতের যেকোনো একতরফা কৌশলগত চাপ মোকাবিলায় সবচেয়ে বড় মনস্তাত্ত্বিক ও সামরিক নিরাপত্তা ঢাল।
জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের সংবিধানে ‘ইসলামী সংহতির’ নীতি যুক্ত করার পেছনে মূল উদ্দেশ্য ছিল মধ্যপ্রাচ্যের তেল-সমৃদ্ধ দেশগুলোর সমর্থন আদায় এবং ভারতের ওপর একটি পরোক্ষ আন্তর্জাতিক চাপ তৈরি করা। এই দূরদর্শী নীতির আলোকেই তিনি একদিকে সৌদি আরবের বাদশাহ খালিদের সাথে সম্পর্ক জোরদার করে বিপুল অর্থনৈতিক সহায়তা নিশ্চিত করেন। অন্যদিকে মুয়াম্মা গাদ্দাফি, সাদ্দাম হোসেন ও ইয়াসির আরাফাতের মতো প্রভাবশালী নেতাদের সাথে ঘনিষ্ঠ জোট গড়ার মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশি জনশক্তি রপ্তানি ও রেমিট্যান্সের মূল ভিত্তি স্থাপন করেন।
প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান সৌদি আরবের তৎকালীন শাসক বাদশাহ খালিদের সাথে অত্যন্ত সুদৃঢ় ও ব্যক্তিগত কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলেন, যার সুবাদে ১৯৭৭ থেকে ১৯৮১ সালের মধ্যে সৌদি আরব থেকে বিপুল পরিমাণ অনুদান ও সহজ শর্তে ঋণসহায়তা আসতে শুরু করে। এ জে এম শামসুদ্দিন আহমেদের ফরেন পলিসি অব বাংলাদেশ: চ্যালেঞ্জেস অ্যান্ড অপরচুনিটিস গ্রন্থের তথ্য অনুযায়ী, এই সময়েই সৌদি ফান্ড ফর ডেভেলপমেন্ট বাংলাদেশের বিভিন্ন বড় অবকাঠামো ও বিদ্যুৎ খাতে কোটি কোটি ডলারের আর্থিক তহবিল অনুমোদন করে। এর পাশাপাশি, ১৯৭৮ সালে জিয়াউর রহমানের রিয়াদ সফরের পর সৌদি আরবে বাংলাদেশি জনশক্তি রপ্তানির এক অভূতপূর্ব দুয়ার উন্মোচিত হয়, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করেছিল।
ওআইসি সচিবালয়ের ঐতিহাসিক রেকর্ড এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন দ্বিপাক্ষিক চুক্তি সংক্রান্ত তথ্যমতে, মধ্যপ্রাচ্যের রাষ্ট্রপ্রধানদের সাথে জিয়াউর রহমানের ব্যক্তিগত বোঝাপড়া এতটাই সুদৃঢ় ছিল যে ইয়াসির আরাফাত একাধিকবার ঢাকা সফর করেন এবং লিবিয়া ও ইরাক বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের পক্ষে আন্তর্জাতিক মঞ্চে জোরালো সমর্থন দেয়।
এই অনন্য রাজনৈতিক মৈত্রীর সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক সুফল ছিল মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারের উন্মোচন। ১৯৭৬ থেকে ১৯৮১ সালের মধ্যে লিবিয়া ও ইরাকে রেকর্ডসংখ্যক বাংলাদেশি সরকারি ও বেসরকারিভাবে নির্মাণ ও সেবা খাতে কর্মসংস্থানের সুযোগ পায়। ব্যুরো অব ম্যানপাওয়ার, এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড ট্রেনিং-এর ঐতিহাসিক পরিসংখ্যান এবং সমসাময়িক অর্থনৈতিক সমীক্ষা অনুযায়ী, এই দেশগুলোতে বিপুল পরিমাণ বাংলাদেশি জনশক্তি রপ্তানির মাধ্যমেই বাংলাদেশের রেমিট্যান্স অর্থনীতির মূল শক্ত ভিত্তিটি স্থাপিত হয়েছিল।
১৯৮০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে যখন মধ্যপ্রাচ্যের দুই পরাশক্তি ইরান ও ইরাকের মধ্যে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শুরু হয়, তখন জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব বৃদ্ধির এক অভূতপূর্ব সুযোগ লুফে নেন। ওআইসি এই দুই মুসলিম দেশের মধ্যে মধ্যস্থতার উদ্দেশ্যে ১৯৮১ সালের জানুয়ারি মাসে মক্কায় অনুষ্ঠিত শীর্ষ সম্মেলনে ৯ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের ‘পিস কমিটি’ বা উম্মাহ শান্তি মিশন গঠন করে। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এই কমিটির অন্যতম শীর্ষ ও প্রভাবশালী কণ্ঠস্বর হিসেবে মনোনীত হন।
ড. মোস্তফা কামালের গবেষণামূলক প্রবন্ধে (The Dhaka University Studies, Vol. 38) উল্লেখ আছে যে, একটি সদ্য স্বাধীন ও অর্থনৈতিকভাবে অনুন্নত রাষ্ট্র হওয়া সত্ত্বেও ওআইসির এই শীর্ষ শান্তি মিশনে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তি ছিল মূলত জিয়াউর রহমানের দূরদর্শী কূটনীতির বিশাল স্বীকৃতি।
উম্মাহ পিস কমিটির অন্যতম মূল চালিকাশক্তি হিসেবে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ১৯৮১ সালের মার্চ ও এপ্রিল মাসে দফায় দফায় ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন এবং ইরানের বিপ্লবী নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সাথে দীর্ঘ বৈঠকে বসেন। ওআইসি সচিবালয়ের ঐতিহাসিক বিবরণী ও জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের আর্কাইভাল নথিপত্র (UN Security Council Records, 1981) অনুযায়ী, জিয়াউর রহমান দুই দেশের সামনে একটি বাস্তবসম্মত যুদ্ধবিরতির রূপরেখা, সেনা প্রত্যাহার এবং বিরোধপূর্ণ শাত-ইল-আরব জলসীমা নিয়ে আলোচনার প্রস্তাব পেশ করেছিলেন।
তেহরানে আয়াতুল্লাহ খোমেনির অনমনীয় মনোভাব এবং বাগদাদে সাদ্দাম হোসেনের ভূ-রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার কারণে এই যুদ্ধটি তাৎক্ষণিকভাবে থামানো না গেলেও, জিয়াউর রহমানের নিরপেক্ষ ও আন্তরিক মধ্যস্থতার প্রস্তাবটি উভয় পক্ষই অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করেছিল।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ও নিরাপত্তা পরিষদের তৎকালীন কার্যবিবরণী (UN General Assembly Proceedings, 1981) বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই মিশনের পর থেকে বিশ্ববাসী বাংলাদেশকে কেবল একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও সাহায্য-নির্ভর অনুন্নত রাষ্ট্র হিসেবে দেখার মানসিকতা থেকে বের হয়ে আসে এবং বৈশ্বিক শান্তির এক অন্যতম সক্রিয় অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করতে শুরু করে।
এ জে এম শামসুদ্দিন আহমেদের ফরেন পলিসি অব বাংলাদেশ: চ্যালেঞ্জেস অ্যান্ড অপরচুনিটিস গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে যে, এই শান্তি মিশনের রাষ্ট্রনায়কোচিত ভূমিকা বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি এতটাই উজ্জ্বল করেছিল যা পরবর্তীতে ১৯৮৯ সালে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী সদস্যপদ প্রাপ্তির পথকে অনেকাংশে সুগম করে দিয়েছিল।
প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বুঝতে পেরেছিলেন, দ্বিপাক্ষিক আলোচনার টেবিলে ভারতের একক আধিপত্যের মুখোমুখি হওয়া বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য অত্যন্ত কঠিন। এই অসম শক্তির ভারসাম্য মোকাবিলা করার জন্য ভারতকে একটি বহুদেশীয় আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে আনা অপরিহার্য ছিল। শ্রীলঙ্কান গবেষক ও ভূ-রাজনীতিবিদ ইরেগামাগে অনুরাধার দ্য জেনেসিস অব সার্ক: আ হিস্টোরিক্যাল পার্সপেক্টিভ শীর্ষক গবেষণা অনুযায়ী, জিয়াউর রহমানের মূল কৌশলগত উদ্দেশ্য ছিল একটি বহুপাক্ষিক আঞ্চলিক মঞ্চ তৈরি করা, যেখানে দক্ষিণ এশিয়ার অন্য ছোট রাষ্ট্রগুলোকে সাথে নিয়ে বাংলাদেশ সম্মিলিত দর-কষাকষির মাধ্যমে ভারতের ওপর একটি পরোক্ষ মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে। এই প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর আড়ালে তিনি মূলত ফারাক্কা বাঁধের পানি বণ্টন কিংবা সীমান্ত বিরোধের মতো জটিল দ্বিপাক্ষিক ইস্যুগুলোতে বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা ও দাবি আদায়ের পথকে আরও সুগম করতে চেয়েছিলেন।
১৯৮০ সালের মে মাসে জিয়াউর রহমান দক্ষিণ এশিয়ার অন্য ছয়টি দেশের (ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, ভুটান ও মালদ্বীপ) রাষ্ট্রপ্রধানদের কাছে একটি আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা গঠনের আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব পাঠিয়ে চিঠি দেন। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কূটনৈতিক আর্কাইভ এবং সার্ক সচিবালয়ের অফিশিয়াল নথিপত্র (SAARC Secretariat Records) থেকে জানা যায়, এই চিঠির পর জিয়াউর রহমানের বিশেষ দূতেরা দক্ষিণ এশিয়ার রাজধানীগুলোতে শাটল ডিপ্লোম্যাসি পরিচালনা করেন এবং একটি ‘ওয়ার্কিং পেপার’ পেশ করেন। যদিও ১৯৮১ সালের মে মাসে তাঁর মর্মান্তিক শাহাদতের কারণে তিনি নিজের জীবদ্দশায় এই স্বপ্নের বাস্তবায়ন দেখে যেতে পারেননি।
পরে ১৯৮৫ সালের ডিসেম্বরে ঢাকায় প্রথম শীর্ষ সম্মেলনের মাধ্যমে সার্ক আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মপ্রকাশ করে। দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতার ইতিহাসবিদদের মতে, সার্ক গঠন ছিল পরাশক্তিদের প্রভাব বলয়ের বাইরে গিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলোর আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে জিয়াউর রহমানের এক অনন্য, দীর্ঘমেয়াদি এবং অত্যন্ত চতুর কূটনৈতিক কৌশল।
ভারতের সীমান্ত সংলগ্ন কৌশলগত অঞ্চলগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিতে জিয়াউর রহমান সেনাবাহিনীতে নতুন নতুন ব্যাটালিয়ন ও চট্টগ্রামের ২৪তম পদাতিক ডিভিশনসহ একাধিক ডিভিশন তৈরি করেন। একই সাথে তৎকালীন বিডিআরকে (বর্তমান বিজিবি) পুনর্গঠন এবং গ্রাম প্রতিরক্ষা দল ও আনসার বাহিনীকে তৃণমূল স্তরে বিস্তৃত করে দেশের সার্বিক নিরাপত্তা নেটওয়ার্ক শক্তিশালী করেন। এছাড়া, জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় সামরিক বাহিনীর সাথে ঢাকা মেডিকেল ও পিজি হাসপাতালের মতো বেসামরিক প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে যৌথ মহড়ার আধুনিক ব্যবস্থা তিনিই প্রথম প্রবর্তন করেছিলেন।
ভারতের সীমান্ত সংলগ্ন সংবেদনশীল ও কৌশলগত এলাকাগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জিয়াউর রহমান সেনাবাহিনীতে নতুন নতুন ব্যাটালিয়ন এবং বেশ কয়েকটি নতুন পদাতিক ডিভিশন তৈরি করেন। মেজর জেনারেল (অব.) মইনুল হোসেন চৌধুরীর এক জেনারেলের নীরব সাক্ষ্য: স্বাধীনতার প্রথম দশক গ্রন্থের বিবরণ অনুযায়ী, এই সামরিক বিন্যাসের অংশ হিসেবেই দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্তের কৌশলগত সুরক্ষার জন্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি অঞ্চলে ‘২৪তম পদাতিক ডিভিশন’ প্রতিষ্ঠা করা হয়। ভারতের সাথে দীর্ঘ সীমান্ত রেখা এবং বঙ্গোপসাগরের উপকূলবর্তী অঞ্চলের দিকে নজর রেখে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গ্যারিসন স্থাপন ও সেনা মোতায়েনের এই দূরদর্শী বিন্যাস বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা কৌশলে এক নতুন যুগের সূচনা করেছিল।
১৯৭১ সালের পর দেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সোভিয়েত ও ভারতীয় বলয়ে থাকলেও, জিয়াউর রহমান যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও পশ্চিম ইউরোপ থেকে সমরাস্ত্র সংগ্রহ শুরু করেন। চীনের সাথে কৌশলগত মৈত্রী গড়ে তিনি বিমান বাহিনীর জন্য এফ-৬ যুদ্ধবিমান এবং সেনাবাহিনীর জন্য টাইপ-৫৯ ট্যাংকের মতো ভারী সমরাস্ত্রের জোগান নিশ্চিত করেন। একই সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করে ১৯৭৭ থেকে ১৯৮১ সালের মধ্যবর্তী সময়ে বিমান বাহিনীতে বিখ্যাত ‘বেল-২১২’ হেলিকপ্টার অন্তর্ভুক্ত করেন।
প্রতিরক্ষা উইং ও ড. ইমতিয়াজ আহমেদের ভূ-রাজনৈতিক গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, এই বেল হেলিকপ্টারগুলো পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের দমনে দ্রুত সেনা ও রসদ পরিবহনে এবং উপকূলীয় দুর্যোগে উদ্ধার অভিযানে বড় মনস্তাত্ত্বিক ও সামরিক ঢাল হিসেবে কাজ করে। এছাড়া যুক্তরাজ্যের কাছ থেকে নৌবাহিনীর জন্য ‘বিএনএস ওমর ফারুক’-এর মতো আধুনিক যুদ্ধজাহাজও এই সময়েই সংগ্রহ করা হয়।
প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের কৌশলগত সামরিক বিন্যাসের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা ছিল পার্বত্য চট্টগ্রামের অখণ্ডতা রক্ষা করা। তিনি সেখানে ব্যাপক হারে সেনা মোতায়েন করেন এবং কাউন্টার-ইনসার্জেন্সি বা বিদ্রোহ দমন অভিযানের সূচনা করেন। নবগঠিত ২৪তম পদাতিক ডিভিশনের অধীনে সমগ্র পার্বত্য অঞ্চলকে তিনটি প্রধান সামরিক জোনে (রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান) বিভক্ত করে সীমান্ত পাহারা এবং কৌশলগত পয়েন্টগুলোতে স্থায়ী সেনা ক্যাম্প স্থাপন করা হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের গবেষণা এবং বিভিন্ন সামরিক ইতিহাস সংকলন অনুযায়ী, জিয়াউর রহমানের এই দৃঢ় সামরিক মোতায়েন এবং একই সাথে সমতলের মানুষকে সেখানে পুনর্বাসনের নীতি সেসময়ে পার্বত্য চট্টগ্রামকে বাংলাদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করার সুদূরপ্রসারী আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রকে সম্পূর্ণ নস্যাৎ করে দিয়েছিল। এই অঞ্চলের কঠোর সামরিক প্রতিরক্ষা বিন্যাসই আজ পর্যন্ত বাংলাদেশের মানচিত্রের অখণ্ডতা অক্ষুণ্ণ রাখার প্রধান গ্যারান্টি হিসেবে কাজ করছে।
জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলের অংশ হিসেবে জিয়াউর রহমান তৎকালীন বাংলাদেশ রাইফেলসকে (বর্তমান বিজিবি) পুনর্গঠন ও আধুনিকায়ন করেন। যুদ্ধের সময় দেশের মূল সশস্ত্র বাহিনীকে সম্মুখ সমরে সহায়তা করা এবং স্বাভাবিক সময়ে সীমান্ত পাহারার গুরুদায়িত্ব দিয়ে বিজিবিকে ‘সেকেন্ড লাইন অফ ডিফেন্স’ বা প্রতিরক্ষার দ্বিতীয় স্তর হিসেবে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয়।
মেজর জেনারেল (অব) মইনুল হোসেন চৌধুরীর এক জেনারেলের নীরব সাক্ষ্য: স্বাধীনতার প্রথম দশক গ্রন্থের তথ্য অনুযায়ী, সীমান্ত সুরক্ষায় বিজিবির এই কৌশলগত রূপান্তর দেশের সামগ্রিক প্রতিরক্ষা নীতিকে এক অনন্য উচ্চতা দিয়েছিল। একই সাথে দেশের অভ্যন্তরে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা এবং ভিআইপি নিরাপত্তার বিশেষায়িত লজিস্টিকস হিসেবে ১৯৭৬ সালে বিশেষায়িত ‘আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন’ গঠন করা হয়, যা দেশের অভ্যন্তরীণ কৌশলগত নিরাপত্তা নেটওয়ার্ককে তৃণমূল স্তর পর্যন্ত অত্যন্ত শক্তিশালী করে তোলে।
জিয়াউর রহমান ১৯৭৬ সালে আনসার ব্যাটালিয়ন এবং ১৯৭৭ সালে গ্রাম প্রতিরক্ষা দল গঠন করেন। তাঁর এই দূরদর্শী ভাবনার ফসল হিসেবে গড়ে ওঠা ‘বাংলাদেশ আনসার ও ভিডিপি’ আজ সদস্য সংখ্যার দিক থেকে পৃথিবীর বৃহত্তম প্যারামিলিটারি ফোর্স হিসেবে বিশ্বমঞ্চে স্বীকৃত। আনসার ও ভিডিপি সদর দপ্তরের অফিশিয়াল পরিসংখ্যান ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হালনাগাদ কৌশলগত তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে এই বাহিনীর মোট সদস্য সংখ্যা প্রায় ৬১ লাখের বেশি, যা বিশ্বের যেকোনো একক আধাসামরিক বাহিনীর চেয়ে বহুগুণ বড়।
আধুনিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে জিয়াউর রহমান সামরিক ও বেসামরিক খাতের সমন্বয়ে ১৯৭৮-১৯৭৯ সালের দিকে উপকূলীয় অঞ্চলের সুরক্ষায় প্রথম সারির বৃহৎ এক্সারসাইজ ‘অপারেশন সি গাল’ এবং ১৯৭৯ সালে জাতীয় পর্যায়ে অত্যন্ত বড় পরিসরে ‘অপারেশন নবদিগন্ত’ পরিচালনা করেন।
এই মহড়াগুলোর মূল উদ্দেশ্য ও প্রয়োজনীয়তা ছিল দুর্যোগ পরবর্তী প্রাথমিক উদ্ধারকাজে বিভিন্ন সংস্থার মাঝে দেখা দেওয়া সমন্বয়হীনতা চিরতরে দূর করে একটি ‘ইউনিফাইড কমান্ড’ বা একক নির্দেশনার কাঠামো তৈরি করা। এই এক্সারসাইজগুলোতে সশস্ত্র বাহিনী (সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনী), তৎকালীন বিডিআর, পুলিশ ও আনসার বাহিনীর পাশাপাশি বেসামরিক চিকিৎসা খাতের শীর্ষ প্রতিষ্ঠান ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং তৎকালীন পিজি হাসপাতাল (বর্তমান বিএসএমএমইউ)-এর চিকিৎসকদের অগ্রগামী দল এবং ফায়ার সার্ভিস অংশ নেয়।
জরুরি পরিস্থিতিতে দুর্গম এলাকায় দ্রুততম সময়ে জীবন বাঁচানো, রসদ পৌঁছানো এবং অস্থায়ী ফিল্ড হাসপাতাল তৈরির লক্ষ্য নিয়ে এগুলো পরিচালিত হয়েছিল। ইতিহাসবিদ ও প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, ‘অপারেশন নবদিগন্ত’ ও ‘অপারেশন সি গাল’ ছিল বাংলাদেশে আধুনিক সিভিল-মিলিটারি কো-অপারেশনের প্রথম সফল ব্লুপ্রিন্ট।
বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে জিয়াউর রহমানের এই ঐতিহাসিক নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক ধারণা বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির জন্য একটি অত্যন্ত কার্যকর ও কালজয়ী দিকনির্দেশনা হিসেবে কাজ করতে পারে। সমকালীন আঞ্চলিক আধিপত্যবাদ, বঙ্গোপসাগরের ভূ-কৌশলগত ছায়া যুদ্ধ এবং বৈশ্বিক পরাশক্তিদের বহুমুখী ভূ-রাজনৈতিক চাপের মুখে টিকে থাকতে হলে কোনো একক ব্লকের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে সমরাস্ত্র ও সম্পর্কের ক্ষেত্রে ‘বৈচিত্র্যকরণ নীতি’ বজায় রাখা অপরিহার্য।
নিজের ভৌগোলিক অখণ্ডতা অক্ষুণ্ণ রাখতে দ্বিপাক্ষিক অসম চাপ মোকাবিলায় ‘সার্ক’-এর মতো বহুপাক্ষিক কূটনৈতিক কৌশল এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চে দেশের অর্থনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক ওজন বাড়ানো বর্তমান পররাষ্ট্রনীতির জন্য বড় শিক্ষা। একই সাথে, দেশের অভ্যন্তরীণ ফ্রন্টে আনসার ও ভিডিপি-র মতো মানবসম্পদকে কাজে লাগিয়ে তৃণমূল স্তরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং জাতীয় দুর্যোগে একক কমান্ডের আধুনিক ফ্রেমওয়ার্ক ধরে রাখাই হবে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতি বাস্তবায়নের মূল চাবিকাঠি।
ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব সুরক্ষায় এই বাস্তববাদী ও কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষাই রাষ্ট্রীয় অস্তিত্বের প্রধানতম গ্যারান্টি।

১৯৭৫ সালের পটপরিবর্তনের পর এক চরম ভূ-রাজনৈতিক ও অভ্যন্তরীণ সংকটের সন্ধিক্ষণে বাংলাদেশের শাসনভার গ্রহণ করেন মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি মূলত ভারত এবং সোভিয়েত ব্লকের ওপর বহুলাংশে নির্ভরশীল থাকলেও, জিয়াউর রহমানের শাসনামল (১৯৭৭-১৯৮১) দেশের জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলে এক যুগান্তকারী ও বাস্তবমুখী রূপান্তরের সূচনা করে।
ওই সময়ে অভ্যন্তরীণ সামরিক অস্থিরতা, একের পর এক ক্যু-এর চেষ্টা এবং বিশেষ করে দক্ষিণ তালপট্টি দ্বীপকে কেন্দ্র করে ভারতের সাথে উদ্ভূত সামরিক সংঘাত বাংলাদেশকে এক কঠোর বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছিল। জিয়াউর রহমান উপলব্ধি করেছিলেন, কেবল ‘ন্যাশনালিজম’ কিংবা ‘জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন’-এর মতো আদর্শিক স্লোগান দিয়ে একটি সদ্য স্বাধীন ও ক্ষুদ্র রাষ্ট্রের ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষা করা সম্ভব নয়। রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব টিকিয়ে রাখতে তিনি ‘শক্তির ভারসাম্য’ নীতির ওপর ভিত্তি করে ‘রিয়ালিস্টিক ডিপ্লোম্যাসি’ বা বাস্তববাদী কূটনীতির জন্ম দেন।
জিয়াউর রহমান ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের সাথে শক্তিশালী কৌশলগত অক্ষ গড়ে তোলেন, যা ভারতকে আন্তর্জাতিক ‘কাউন্টার-ব্যালেন্স’-এর মুখোমুখি করে। সমরাস্ত্র ক্রয়ের ক্ষেত্রে কোনো একক দেশের ওপর নির্ভর না করে ‘বৈচিত্র্যকরণ নীতি’ গ্রহণ করে তিনি চীনের টাইপ-৫৯ ট্যাংক ও এফ-৬ যুদ্ধবিমান এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বেল-২১২ হেলিকপ্টার সংগ্রহের মাধ্যমে সশস্ত্র বাহিনীকে সামরিক ব্ল্যাকমেইল থেকে চিরতরে মুক্ত করেন। একই সাথে সংবিধানে ‘ইসলামী সংহতি’ যুক্ত করে সৌদি আরব, লিবিয়া ও ইরাকের মতো তেল-সমৃদ্ধ মুসলিম বিশ্বের সাথে সম্পর্কের সর্বোচ্চকরণ, ইরান-ইরাক যুদ্ধে ওআইসি শান্তি মিশনে ঐতিহাসিক মধ্যস্থতা এবং ভারতকে বহুপাক্ষিক আইনি কাঠামোয় বাঁধতে ‘সার্ক’-এর দূরদর্শী রূপরেখা প্রণয়ন তাঁর রিয়ালিস্টিক ডিপ্লোম্যাসির সমাদৃত বহিঃপ্রকাশ।
অভ্যন্তরীণ ফ্রন্টে পার্বত্য চট্টগ্রামের অখণ্ডতা রক্ষায় সামরিক বিন্যাস, আনসার ও ভিডিপিকে বৃহত্তম প্যারামিলিটারি ফোর্সে রূপান্তর এবং ‘অপারেশন নবদিগন্ত’ ও ‘অপারেশন সি গাল’-এর মাধ্যমে সিভিল-মিলিটারি কো-অপারেশনের যে মেলবন্ধন তিনি তৈরি করেছিলেন—তা আজও বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তার প্রধান কৌশলগত গ্যারান্টি হিসেবে সক্রিয় রয়েছে।
১৯৭০ সালের ঘূর্ণিঝড়ের পর জেগে ওঠা দক্ষিণ তালপট্টি দ্বীপের মালিকানা নিয়ে ১৯৮১ সালে ভারতের সামরিক আগ্রাসন বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বকে বড় ঝুঁকিতে ফেলেছিল। ভারতের বিশাল সামরিক শক্তির বিপরীতে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বিন্দুমাত্র পিছু না হটে তাৎক্ষণিকভাবে নৌবাহিনীর গানবোট পাঠিয়ে এক অনমনীয় ও সাহসী প্রতিরোধ গড়ে তোলেন।
মূলত বঙ্গোপসাগরের এই অগ্নিপরীক্ষাই জিয়াউর রহমানকে চূড়ান্ত বার্তা দিয়েছিল যে, ভারতের দ্বিপাক্ষিক চাপ মোকাবিলা করতে হলে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে শক্তিশালী শক্তির ভারসাম্য তৈরি করা বাংলাদেশের জন্য অপরিহার্য।
১৯৮১ সালের মে মাসে ভারত আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে বিতর্কিত দক্ষিণ তালপট্টি দ্বীপে সশস্ত্র বিএসএফ জোয়ান পাঠায় এবং সেখানে নিজেদের জাতীয় পতাকা উত্তোলন করে। মার্কাস ফ্রান্ডার বাংলাদেশ: দ্য ফার্স্ট ডিকেট (১৯৮২) গ্রন্থের বিবরণ অনুযায়ী, এই ঘটনার সাথে সাথে ভারতীয় নৌবাহিনীর অত্যাধুনিক যুদ্ধজাহাজ ‘আইএনএস সান্ধ্যক’ দ্বীপটির চারপাশের জলসীমায় অবস্থান নিয়ে এক নজিরবিহীন সামরিক আগ্রাসন চালায়।
ওই সময়ের জাতীয় দৈনিক ইত্তেফাক থেকে জানা যায়, বাংলাদেশের জলসীমায় ভারতের এই আকস্মিক শক্তির প্রদর্শন দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে চরম উত্তেজনা সৃষ্টি করেছিল। সামগ্রিকভাবে, আন্তর্জাতিক আইন ও সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের এই ঘটনাটি সেসময়ে বাংলাদেশের ভৌগোলিক অখণ্ডতার জন্য এক বিরাট হুমকি হিসেবে দেখা দিয়েছিল।
জিয়াউর রহমান তখন তাৎক্ষণিকভাবে বঙ্গোপসাগরের বিতর্কিত জলসীমায় নৌবাহিনীর গানবোট পাঠানোর নির্দেশ দেন এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে তীব্র প্রতিবাদ জানান। ভারতের মতো বিশাল সামরিক শক্তির বিরুদ্ধে বাংলাদেশের এই অনমনীয় অবস্থান ছিল একটি অত্যন্ত সাহসী এবং বাস্তবসম্মত প্রতিরোধ। মেজর জেনারেল (অব.) মইনুল হোসেন চৌধুরীর এক জেনারেলের নীরব সাক্ষ্য: স্বাধীনতার প্রথম দশক গ্রন্থে এই সামরিক প্রতিরোধের দৃঢ়তার কথা উল্লেখ রয়েছে।
রিয়ালিস্টিক ডিপ্লোম্যাসির মূলনীতিকে ধারণ করেই প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক কৌশল পুনর্নির্ধারণ করেছিলেন। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৮০ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের সাথে নিরাপত্তা সংলাপ এবং ১৯৭৬-৭৭ সাল থেকে চীনের সাথে সামরিক মৈত্রী স্থাপনের মাধ্যমে তিনি দেশের সার্বভৌমত্বের এক শক্তিশালী আন্তর্জাতিক ঢাল তৈরি করেন।
১৯৮০ সালের আগস্ট মাসে জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রীয় সফরে যুক্তরাষ্ট্র যান এবং প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের সাথে হোয়াইট হাউসে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে বসেন। এই সংলাপে জিয়াউর রহমান শুধু অর্থনৈতিক সাহায্যই চাননি, বরং বাংলাদেশের আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন। মার্কিন প্রশাসনের অবমুক্ত করা ঐতিহাসিক দলিল (FRUS - Foreign Relations of the United States, 1977–1981) অনুযায়ী, কার্টার প্রশাসনও দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে বাংলাদেশকে একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করতে শুরু করে। রিয়ালিস্টিক ডিপ্লোম্যাসির এই অনন্য প্রয়োগটি সেসময়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং বহুমাত্রিক শক্তির ভারসাম্য তৈরিতে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করেছিল।
১৯৭৫ সালের পটপরিবর্তনের পর জিয়াউর রহমান চীনের সাথে কূটনৈতিক ও সামরিক সম্পর্ককে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যান। ১৯৭৬-৭৭ সাল থেকে শুরু হওয়া এই নিবিড় দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের মূল কৌশলগত উদ্দেশ্য ছিল ভারতের সম্ভাব্য সামরিক ও আঞ্চলিক চাপ মোকাবিলায় একটি শক্তিশালী ‘কাউন্টার-ব্যালেন্স’ বা সামরিক ব্যাকআপ তৈরি করা। চীনের এই আন্তরিক সহযোগিতার ফলেই বাংলাদেশের তিন বাহিনীকে নতুন করে ঢেলে সাজানো এবং আধুনিকায়নের কাজ শুরু হয়। চীনা বিমান বাহিনীর এফ-৬ যুদ্ধবিমান এবং সেনাবাহিনীর জন্য টাইপ-৫৯ ট্যাংকের মতো ভারী সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর সক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদের মতে, বেইজিংয়ের এই সামরিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা ছিল বঙ্গোপসাগর ও সীমান্ত এলাকায় ভারতের যেকোনো একতরফা কৌশলগত চাপ মোকাবিলায় সবচেয়ে বড় মনস্তাত্ত্বিক ও সামরিক নিরাপত্তা ঢাল।
জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের সংবিধানে ‘ইসলামী সংহতির’ নীতি যুক্ত করার পেছনে মূল উদ্দেশ্য ছিল মধ্যপ্রাচ্যের তেল-সমৃদ্ধ দেশগুলোর সমর্থন আদায় এবং ভারতের ওপর একটি পরোক্ষ আন্তর্জাতিক চাপ তৈরি করা। এই দূরদর্শী নীতির আলোকেই তিনি একদিকে সৌদি আরবের বাদশাহ খালিদের সাথে সম্পর্ক জোরদার করে বিপুল অর্থনৈতিক সহায়তা নিশ্চিত করেন। অন্যদিকে মুয়াম্মা গাদ্দাফি, সাদ্দাম হোসেন ও ইয়াসির আরাফাতের মতো প্রভাবশালী নেতাদের সাথে ঘনিষ্ঠ জোট গড়ার মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশি জনশক্তি রপ্তানি ও রেমিট্যান্সের মূল ভিত্তি স্থাপন করেন।
প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান সৌদি আরবের তৎকালীন শাসক বাদশাহ খালিদের সাথে অত্যন্ত সুদৃঢ় ও ব্যক্তিগত কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলেন, যার সুবাদে ১৯৭৭ থেকে ১৯৮১ সালের মধ্যে সৌদি আরব থেকে বিপুল পরিমাণ অনুদান ও সহজ শর্তে ঋণসহায়তা আসতে শুরু করে। এ জে এম শামসুদ্দিন আহমেদের ফরেন পলিসি অব বাংলাদেশ: চ্যালেঞ্জেস অ্যান্ড অপরচুনিটিস গ্রন্থের তথ্য অনুযায়ী, এই সময়েই সৌদি ফান্ড ফর ডেভেলপমেন্ট বাংলাদেশের বিভিন্ন বড় অবকাঠামো ও বিদ্যুৎ খাতে কোটি কোটি ডলারের আর্থিক তহবিল অনুমোদন করে। এর পাশাপাশি, ১৯৭৮ সালে জিয়াউর রহমানের রিয়াদ সফরের পর সৌদি আরবে বাংলাদেশি জনশক্তি রপ্তানির এক অভূতপূর্ব দুয়ার উন্মোচিত হয়, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করেছিল।
ওআইসি সচিবালয়ের ঐতিহাসিক রেকর্ড এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন দ্বিপাক্ষিক চুক্তি সংক্রান্ত তথ্যমতে, মধ্যপ্রাচ্যের রাষ্ট্রপ্রধানদের সাথে জিয়াউর রহমানের ব্যক্তিগত বোঝাপড়া এতটাই সুদৃঢ় ছিল যে ইয়াসির আরাফাত একাধিকবার ঢাকা সফর করেন এবং লিবিয়া ও ইরাক বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের পক্ষে আন্তর্জাতিক মঞ্চে জোরালো সমর্থন দেয়।
এই অনন্য রাজনৈতিক মৈত্রীর সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক সুফল ছিল মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারের উন্মোচন। ১৯৭৬ থেকে ১৯৮১ সালের মধ্যে লিবিয়া ও ইরাকে রেকর্ডসংখ্যক বাংলাদেশি সরকারি ও বেসরকারিভাবে নির্মাণ ও সেবা খাতে কর্মসংস্থানের সুযোগ পায়। ব্যুরো অব ম্যানপাওয়ার, এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড ট্রেনিং-এর ঐতিহাসিক পরিসংখ্যান এবং সমসাময়িক অর্থনৈতিক সমীক্ষা অনুযায়ী, এই দেশগুলোতে বিপুল পরিমাণ বাংলাদেশি জনশক্তি রপ্তানির মাধ্যমেই বাংলাদেশের রেমিট্যান্স অর্থনীতির মূল শক্ত ভিত্তিটি স্থাপিত হয়েছিল।
১৯৮০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে যখন মধ্যপ্রাচ্যের দুই পরাশক্তি ইরান ও ইরাকের মধ্যে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শুরু হয়, তখন জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব বৃদ্ধির এক অভূতপূর্ব সুযোগ লুফে নেন। ওআইসি এই দুই মুসলিম দেশের মধ্যে মধ্যস্থতার উদ্দেশ্যে ১৯৮১ সালের জানুয়ারি মাসে মক্কায় অনুষ্ঠিত শীর্ষ সম্মেলনে ৯ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের ‘পিস কমিটি’ বা উম্মাহ শান্তি মিশন গঠন করে। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এই কমিটির অন্যতম শীর্ষ ও প্রভাবশালী কণ্ঠস্বর হিসেবে মনোনীত হন।
ড. মোস্তফা কামালের গবেষণামূলক প্রবন্ধে (The Dhaka University Studies, Vol. 38) উল্লেখ আছে যে, একটি সদ্য স্বাধীন ও অর্থনৈতিকভাবে অনুন্নত রাষ্ট্র হওয়া সত্ত্বেও ওআইসির এই শীর্ষ শান্তি মিশনে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তি ছিল মূলত জিয়াউর রহমানের দূরদর্শী কূটনীতির বিশাল স্বীকৃতি।
উম্মাহ পিস কমিটির অন্যতম মূল চালিকাশক্তি হিসেবে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ১৯৮১ সালের মার্চ ও এপ্রিল মাসে দফায় দফায় ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন এবং ইরানের বিপ্লবী নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সাথে দীর্ঘ বৈঠকে বসেন। ওআইসি সচিবালয়ের ঐতিহাসিক বিবরণী ও জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের আর্কাইভাল নথিপত্র (UN Security Council Records, 1981) অনুযায়ী, জিয়াউর রহমান দুই দেশের সামনে একটি বাস্তবসম্মত যুদ্ধবিরতির রূপরেখা, সেনা প্রত্যাহার এবং বিরোধপূর্ণ শাত-ইল-আরব জলসীমা নিয়ে আলোচনার প্রস্তাব পেশ করেছিলেন।
তেহরানে আয়াতুল্লাহ খোমেনির অনমনীয় মনোভাব এবং বাগদাদে সাদ্দাম হোসেনের ভূ-রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার কারণে এই যুদ্ধটি তাৎক্ষণিকভাবে থামানো না গেলেও, জিয়াউর রহমানের নিরপেক্ষ ও আন্তরিক মধ্যস্থতার প্রস্তাবটি উভয় পক্ষই অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করেছিল।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ও নিরাপত্তা পরিষদের তৎকালীন কার্যবিবরণী (UN General Assembly Proceedings, 1981) বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই মিশনের পর থেকে বিশ্ববাসী বাংলাদেশকে কেবল একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও সাহায্য-নির্ভর অনুন্নত রাষ্ট্র হিসেবে দেখার মানসিকতা থেকে বের হয়ে আসে এবং বৈশ্বিক শান্তির এক অন্যতম সক্রিয় অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করতে শুরু করে।
এ জে এম শামসুদ্দিন আহমেদের ফরেন পলিসি অব বাংলাদেশ: চ্যালেঞ্জেস অ্যান্ড অপরচুনিটিস গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে যে, এই শান্তি মিশনের রাষ্ট্রনায়কোচিত ভূমিকা বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি এতটাই উজ্জ্বল করেছিল যা পরবর্তীতে ১৯৮৯ সালে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী সদস্যপদ প্রাপ্তির পথকে অনেকাংশে সুগম করে দিয়েছিল।
প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বুঝতে পেরেছিলেন, দ্বিপাক্ষিক আলোচনার টেবিলে ভারতের একক আধিপত্যের মুখোমুখি হওয়া বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য অত্যন্ত কঠিন। এই অসম শক্তির ভারসাম্য মোকাবিলা করার জন্য ভারতকে একটি বহুদেশীয় আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে আনা অপরিহার্য ছিল। শ্রীলঙ্কান গবেষক ও ভূ-রাজনীতিবিদ ইরেগামাগে অনুরাধার দ্য জেনেসিস অব সার্ক: আ হিস্টোরিক্যাল পার্সপেক্টিভ শীর্ষক গবেষণা অনুযায়ী, জিয়াউর রহমানের মূল কৌশলগত উদ্দেশ্য ছিল একটি বহুপাক্ষিক আঞ্চলিক মঞ্চ তৈরি করা, যেখানে দক্ষিণ এশিয়ার অন্য ছোট রাষ্ট্রগুলোকে সাথে নিয়ে বাংলাদেশ সম্মিলিত দর-কষাকষির মাধ্যমে ভারতের ওপর একটি পরোক্ষ মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে। এই প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর আড়ালে তিনি মূলত ফারাক্কা বাঁধের পানি বণ্টন কিংবা সীমান্ত বিরোধের মতো জটিল দ্বিপাক্ষিক ইস্যুগুলোতে বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা ও দাবি আদায়ের পথকে আরও সুগম করতে চেয়েছিলেন।
১৯৮০ সালের মে মাসে জিয়াউর রহমান দক্ষিণ এশিয়ার অন্য ছয়টি দেশের (ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, ভুটান ও মালদ্বীপ) রাষ্ট্রপ্রধানদের কাছে একটি আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা গঠনের আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব পাঠিয়ে চিঠি দেন। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কূটনৈতিক আর্কাইভ এবং সার্ক সচিবালয়ের অফিশিয়াল নথিপত্র (SAARC Secretariat Records) থেকে জানা যায়, এই চিঠির পর জিয়াউর রহমানের বিশেষ দূতেরা দক্ষিণ এশিয়ার রাজধানীগুলোতে শাটল ডিপ্লোম্যাসি পরিচালনা করেন এবং একটি ‘ওয়ার্কিং পেপার’ পেশ করেন। যদিও ১৯৮১ সালের মে মাসে তাঁর মর্মান্তিক শাহাদতের কারণে তিনি নিজের জীবদ্দশায় এই স্বপ্নের বাস্তবায়ন দেখে যেতে পারেননি।
পরে ১৯৮৫ সালের ডিসেম্বরে ঢাকায় প্রথম শীর্ষ সম্মেলনের মাধ্যমে সার্ক আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মপ্রকাশ করে। দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতার ইতিহাসবিদদের মতে, সার্ক গঠন ছিল পরাশক্তিদের প্রভাব বলয়ের বাইরে গিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলোর আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে জিয়াউর রহমানের এক অনন্য, দীর্ঘমেয়াদি এবং অত্যন্ত চতুর কূটনৈতিক কৌশল।
ভারতের সীমান্ত সংলগ্ন কৌশলগত অঞ্চলগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিতে জিয়াউর রহমান সেনাবাহিনীতে নতুন নতুন ব্যাটালিয়ন ও চট্টগ্রামের ২৪তম পদাতিক ডিভিশনসহ একাধিক ডিভিশন তৈরি করেন। একই সাথে তৎকালীন বিডিআরকে (বর্তমান বিজিবি) পুনর্গঠন এবং গ্রাম প্রতিরক্ষা দল ও আনসার বাহিনীকে তৃণমূল স্তরে বিস্তৃত করে দেশের সার্বিক নিরাপত্তা নেটওয়ার্ক শক্তিশালী করেন। এছাড়া, জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় সামরিক বাহিনীর সাথে ঢাকা মেডিকেল ও পিজি হাসপাতালের মতো বেসামরিক প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে যৌথ মহড়ার আধুনিক ব্যবস্থা তিনিই প্রথম প্রবর্তন করেছিলেন।
ভারতের সীমান্ত সংলগ্ন সংবেদনশীল ও কৌশলগত এলাকাগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জিয়াউর রহমান সেনাবাহিনীতে নতুন নতুন ব্যাটালিয়ন এবং বেশ কয়েকটি নতুন পদাতিক ডিভিশন তৈরি করেন। মেজর জেনারেল (অব.) মইনুল হোসেন চৌধুরীর এক জেনারেলের নীরব সাক্ষ্য: স্বাধীনতার প্রথম দশক গ্রন্থের বিবরণ অনুযায়ী, এই সামরিক বিন্যাসের অংশ হিসেবেই দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্তের কৌশলগত সুরক্ষার জন্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি অঞ্চলে ‘২৪তম পদাতিক ডিভিশন’ প্রতিষ্ঠা করা হয়। ভারতের সাথে দীর্ঘ সীমান্ত রেখা এবং বঙ্গোপসাগরের উপকূলবর্তী অঞ্চলের দিকে নজর রেখে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গ্যারিসন স্থাপন ও সেনা মোতায়েনের এই দূরদর্শী বিন্যাস বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা কৌশলে এক নতুন যুগের সূচনা করেছিল।
১৯৭১ সালের পর দেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সোভিয়েত ও ভারতীয় বলয়ে থাকলেও, জিয়াউর রহমান যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও পশ্চিম ইউরোপ থেকে সমরাস্ত্র সংগ্রহ শুরু করেন। চীনের সাথে কৌশলগত মৈত্রী গড়ে তিনি বিমান বাহিনীর জন্য এফ-৬ যুদ্ধবিমান এবং সেনাবাহিনীর জন্য টাইপ-৫৯ ট্যাংকের মতো ভারী সমরাস্ত্রের জোগান নিশ্চিত করেন। একই সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করে ১৯৭৭ থেকে ১৯৮১ সালের মধ্যবর্তী সময়ে বিমান বাহিনীতে বিখ্যাত ‘বেল-২১২’ হেলিকপ্টার অন্তর্ভুক্ত করেন।
প্রতিরক্ষা উইং ও ড. ইমতিয়াজ আহমেদের ভূ-রাজনৈতিক গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, এই বেল হেলিকপ্টারগুলো পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের দমনে দ্রুত সেনা ও রসদ পরিবহনে এবং উপকূলীয় দুর্যোগে উদ্ধার অভিযানে বড় মনস্তাত্ত্বিক ও সামরিক ঢাল হিসেবে কাজ করে। এছাড়া যুক্তরাজ্যের কাছ থেকে নৌবাহিনীর জন্য ‘বিএনএস ওমর ফারুক’-এর মতো আধুনিক যুদ্ধজাহাজও এই সময়েই সংগ্রহ করা হয়।
প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের কৌশলগত সামরিক বিন্যাসের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা ছিল পার্বত্য চট্টগ্রামের অখণ্ডতা রক্ষা করা। তিনি সেখানে ব্যাপক হারে সেনা মোতায়েন করেন এবং কাউন্টার-ইনসার্জেন্সি বা বিদ্রোহ দমন অভিযানের সূচনা করেন। নবগঠিত ২৪তম পদাতিক ডিভিশনের অধীনে সমগ্র পার্বত্য অঞ্চলকে তিনটি প্রধান সামরিক জোনে (রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান) বিভক্ত করে সীমান্ত পাহারা এবং কৌশলগত পয়েন্টগুলোতে স্থায়ী সেনা ক্যাম্প স্থাপন করা হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের গবেষণা এবং বিভিন্ন সামরিক ইতিহাস সংকলন অনুযায়ী, জিয়াউর রহমানের এই দৃঢ় সামরিক মোতায়েন এবং একই সাথে সমতলের মানুষকে সেখানে পুনর্বাসনের নীতি সেসময়ে পার্বত্য চট্টগ্রামকে বাংলাদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করার সুদূরপ্রসারী আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রকে সম্পূর্ণ নস্যাৎ করে দিয়েছিল। এই অঞ্চলের কঠোর সামরিক প্রতিরক্ষা বিন্যাসই আজ পর্যন্ত বাংলাদেশের মানচিত্রের অখণ্ডতা অক্ষুণ্ণ রাখার প্রধান গ্যারান্টি হিসেবে কাজ করছে।
জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলের অংশ হিসেবে জিয়াউর রহমান তৎকালীন বাংলাদেশ রাইফেলসকে (বর্তমান বিজিবি) পুনর্গঠন ও আধুনিকায়ন করেন। যুদ্ধের সময় দেশের মূল সশস্ত্র বাহিনীকে সম্মুখ সমরে সহায়তা করা এবং স্বাভাবিক সময়ে সীমান্ত পাহারার গুরুদায়িত্ব দিয়ে বিজিবিকে ‘সেকেন্ড লাইন অফ ডিফেন্স’ বা প্রতিরক্ষার দ্বিতীয় স্তর হিসেবে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয়।
মেজর জেনারেল (অব) মইনুল হোসেন চৌধুরীর এক জেনারেলের নীরব সাক্ষ্য: স্বাধীনতার প্রথম দশক গ্রন্থের তথ্য অনুযায়ী, সীমান্ত সুরক্ষায় বিজিবির এই কৌশলগত রূপান্তর দেশের সামগ্রিক প্রতিরক্ষা নীতিকে এক অনন্য উচ্চতা দিয়েছিল। একই সাথে দেশের অভ্যন্তরে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা এবং ভিআইপি নিরাপত্তার বিশেষায়িত লজিস্টিকস হিসেবে ১৯৭৬ সালে বিশেষায়িত ‘আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন’ গঠন করা হয়, যা দেশের অভ্যন্তরীণ কৌশলগত নিরাপত্তা নেটওয়ার্ককে তৃণমূল স্তর পর্যন্ত অত্যন্ত শক্তিশালী করে তোলে।
জিয়াউর রহমান ১৯৭৬ সালে আনসার ব্যাটালিয়ন এবং ১৯৭৭ সালে গ্রাম প্রতিরক্ষা দল গঠন করেন। তাঁর এই দূরদর্শী ভাবনার ফসল হিসেবে গড়ে ওঠা ‘বাংলাদেশ আনসার ও ভিডিপি’ আজ সদস্য সংখ্যার দিক থেকে পৃথিবীর বৃহত্তম প্যারামিলিটারি ফোর্স হিসেবে বিশ্বমঞ্চে স্বীকৃত। আনসার ও ভিডিপি সদর দপ্তরের অফিশিয়াল পরিসংখ্যান ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হালনাগাদ কৌশলগত তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে এই বাহিনীর মোট সদস্য সংখ্যা প্রায় ৬১ লাখের বেশি, যা বিশ্বের যেকোনো একক আধাসামরিক বাহিনীর চেয়ে বহুগুণ বড়।
আধুনিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে জিয়াউর রহমান সামরিক ও বেসামরিক খাতের সমন্বয়ে ১৯৭৮-১৯৭৯ সালের দিকে উপকূলীয় অঞ্চলের সুরক্ষায় প্রথম সারির বৃহৎ এক্সারসাইজ ‘অপারেশন সি গাল’ এবং ১৯৭৯ সালে জাতীয় পর্যায়ে অত্যন্ত বড় পরিসরে ‘অপারেশন নবদিগন্ত’ পরিচালনা করেন।
এই মহড়াগুলোর মূল উদ্দেশ্য ও প্রয়োজনীয়তা ছিল দুর্যোগ পরবর্তী প্রাথমিক উদ্ধারকাজে বিভিন্ন সংস্থার মাঝে দেখা দেওয়া সমন্বয়হীনতা চিরতরে দূর করে একটি ‘ইউনিফাইড কমান্ড’ বা একক নির্দেশনার কাঠামো তৈরি করা। এই এক্সারসাইজগুলোতে সশস্ত্র বাহিনী (সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনী), তৎকালীন বিডিআর, পুলিশ ও আনসার বাহিনীর পাশাপাশি বেসামরিক চিকিৎসা খাতের শীর্ষ প্রতিষ্ঠান ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং তৎকালীন পিজি হাসপাতাল (বর্তমান বিএসএমএমইউ)-এর চিকিৎসকদের অগ্রগামী দল এবং ফায়ার সার্ভিস অংশ নেয়।
জরুরি পরিস্থিতিতে দুর্গম এলাকায় দ্রুততম সময়ে জীবন বাঁচানো, রসদ পৌঁছানো এবং অস্থায়ী ফিল্ড হাসপাতাল তৈরির লক্ষ্য নিয়ে এগুলো পরিচালিত হয়েছিল। ইতিহাসবিদ ও প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, ‘অপারেশন নবদিগন্ত’ ও ‘অপারেশন সি গাল’ ছিল বাংলাদেশে আধুনিক সিভিল-মিলিটারি কো-অপারেশনের প্রথম সফল ব্লুপ্রিন্ট।
বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে জিয়াউর রহমানের এই ঐতিহাসিক নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক ধারণা বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির জন্য একটি অত্যন্ত কার্যকর ও কালজয়ী দিকনির্দেশনা হিসেবে কাজ করতে পারে। সমকালীন আঞ্চলিক আধিপত্যবাদ, বঙ্গোপসাগরের ভূ-কৌশলগত ছায়া যুদ্ধ এবং বৈশ্বিক পরাশক্তিদের বহুমুখী ভূ-রাজনৈতিক চাপের মুখে টিকে থাকতে হলে কোনো একক ব্লকের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে সমরাস্ত্র ও সম্পর্কের ক্ষেত্রে ‘বৈচিত্র্যকরণ নীতি’ বজায় রাখা অপরিহার্য।
নিজের ভৌগোলিক অখণ্ডতা অক্ষুণ্ণ রাখতে দ্বিপাক্ষিক অসম চাপ মোকাবিলায় ‘সার্ক’-এর মতো বহুপাক্ষিক কূটনৈতিক কৌশল এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চে দেশের অর্থনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক ওজন বাড়ানো বর্তমান পররাষ্ট্রনীতির জন্য বড় শিক্ষা। একই সাথে, দেশের অভ্যন্তরীণ ফ্রন্টে আনসার ও ভিডিপি-র মতো মানবসম্পদকে কাজে লাগিয়ে তৃণমূল স্তরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং জাতীয় দুর্যোগে একক কমান্ডের আধুনিক ফ্রেমওয়ার্ক ধরে রাখাই হবে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতি বাস্তবায়নের মূল চাবিকাঠি।
ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব সুরক্ষায় এই বাস্তববাদী ও কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষাই রাষ্ট্রীয় অস্তিত্বের প্রধানতম গ্যারান্টি।

মানুষের স্মৃতিতে জিয়াউর রহমান এমন এক শাসক, যিনি উন্নয়নের ভাষাকে শহরের মসনদ থেকে নামিয়ে খাল, মাঠ ও ইউনিয়ন পরিষদের উঠোনে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। খাল কাটা কর্মসূচি, স্বনির্ভর বাংলাদেশ ও গ্রাম সরকার; এসব ধারণা আজও বাংলাদেশের রাজনৈতিক অভিধানে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। প্রশ্ন হচ্ছে, তাঁর সেই উন্নয়ন-দর্শন আজকের
৩ ঘণ্টা আগে
একটি বিকল্প বা অনুমিত ইতিহাসের দিকে তাকানো যাক। যখন মেজর জিয়াউর রহমান চট্টগ্রাম বন্দরে থাকার নির্দেশ মেনে নিয়েছিলেন অথবা পদক্ষেপ নেওয়ার আগেই তাঁকে নিষ্ক্রিয় করে দেওয়া হয়েছিল। ভাবা যাক মেজর জিয়ার এই দৃশ্যপটে আগমনের কারণ।
৬ ঘণ্টা আগে
সমকালীন ভারতীয় রাজনীতিতে আদর্শিক অবস্থানের সাথে বাস্তবতার এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও কাঠামোগত দ্বন্দ্ব দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে যে রাজনৈতিক রূপান্তর ঘটেছে, তার ধারাবাহিকতায় পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন পরবর্তী পরিস্থিতিকে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং উদ্বেগজনক ‘কেস স্টাডি’ হিসেবে ধরা যায়।
১ দিন আগে
২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন-ইসরায়েলি যৌথ অভিযানের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া ইরান যুদ্ধ গত ৮ এপ্রিল পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় সাময়িক যুদ্ধবিরতির মুখ দেখেছিল। পরবর্তীতে এপ্রিলের শেষভাগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই যুদ্ধবিরতি অনির্দিষ্টকালের জন্য বর্ধিত করার ঘোষণা দিলেও, মাঠপর্যায়ের বর্তমান বাস্তবতা এক ভিন
১ দিন আগে