প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া সফর: বাংলাদেশের কৌশলগত ৪ সুযোগ

প্রকাশ : ২২ জুন ২০২৬, ১১: ২২
স্ট্রিম গ্রাফিক্স

বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফরের গন্তব্য মালয়েশিয়া, একটি বহুমাত্রিক তাৎপর্য বহন করে। এটি নিছক কূটনৈতিক সৌজন্য নয়; বরং নতুন সরকারের অগ্রাধিকার, আঞ্চলিক বাস্তবতা এবং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক প্রয়োজনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত। সাম্প্রতিক আলোচনায় উঠে এসেছে, কুয়ালালামপুর সফরে শ্রমবাজার, বিনিয়োগ, জ্বালানি সহযোগিতা এবং রোহিঙ্গা সংকট—এই চারটি বিষয়ই অগ্রাধিকার পেতে পারে।

সুতরাং এই সফরকে শুধু একটি দ্বিপক্ষীয় সফর হিসেবে নয় বরং এটি এমন এক মুহূর্ত, যখন বাংলাদেশকে একযোগে অভিবাসন কূটনীতি, অর্থনৈতিক কূটনীতি, জ্বালানি কূটনীতি এবং মানবিক কূটনীতি—এই চার ক্ষেত্রেই আরও সুসংহত ও বাস্তবমুখী ফলাফল ভিত্তিক কৌশল নিতে হবে।

প্রশ্ন হচ্ছে, মালয়েশিয়া সফর থেকে বাংলাদেশ কী পেতে পারে? এবং আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—এই সফরকে বাস্তব সাফল্যে রূপ দিতে বাংলাদেশকে কী করতে হবে? আমার মতে, সফরটির গুরুত্ব চারটি ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি। প্রথমত, নিরাপদ, সাশ্রয়ী ও মর্যাদাপূর্ণ শ্রম অভিবাসন নিশ্চিত করা। দ্বিতীয়ত, মালয়েশীয় বিনিয়োগ আকর্ষণে বাস্তব বিনিয়োগ-সুযোগ ও নীতি-সংস্কার সামনে আনা। তৃতীয়ত, বৈশ্বিক জ্বালানি অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে বিকল্প জ্বালানি উৎস ও জ্বালানি নিরাপত্তায় সহযোগিতা বাড়ানো। চতুর্থত, রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবর্তনের প্রশ্নে মালয়েশিয়াকে একটি সক্রিয় কূটনৈতিক অংশীদার হিসেবে গড়ে তোলা।

কেন মালয়েশিয়া গুরুত্বপূর্ণ

বাংলাদেশের জন্য মালয়েশিয়ার গুরুত্ব বহুমাত্রিক। প্রথমত, এটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ মুসলিম-অধ্যুষিত অর্থনীতি, যার সঙ্গে বাংলাদেশের জনমানুষের সম্পর্ক বহুদিনের। দ্বিতীয়ত, মালয়েশিয়া দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশি শ্রমিকদের অন্যতম বড় গন্তব্য। তৃতীয়ত, আসিয়ান অঞ্চলের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সংযোগ বাড়াতে মালয়েশিয়া একটি কার্যকর সেতু হতে পারে। চতুর্থত, রোহিঙ্গা সংকটের মতো আঞ্চলিক মানবিক প্রশ্নে মালয়েশিয়া অতীতে তুলনামূলকভাবে সরব অবস্থান নিয়েছে। এই সফরের একটি প্রতীকী তাৎপর্যও আছে। নতুন সরকারের প্রথম বিদেশ সফর যদি মালয়েশিয়ায় হয়, তবে সেটি ইঙ্গিত দিতে পারে যে ঢাকা তার পররাষ্ট্রনীতিতে এমন এক ভারসাম্য খুঁজছে, যেখানে প্রতিবেশী শক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি শ্রমবাজার, বিনিয়োগ, জ্বালানি ও মুসলিম বিশ্বের প্রভাবশালী অংশীদারদের সঙ্গে বাস্তবভিত্তিক সহযোগিতাও সমান জরুরি।

মালয়েশিয়াকে বাংলাদেশের জন্য আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে আরেকটি বিষয়—দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক অর্থনীতি ও সরবরাহশৃঙ্খলে তার অবস্থান। আসিয়ানভুক্ত একটি মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে মালয়েশিয়া শুধু শ্রমবাজার নয়; বরং বাণিজ্য, হালাল অর্থনীতি, সেমিকন্ডাক্টর ও প্রযুক্তি খাত, ইসলামিক ফাইন্যান্স এবং আঞ্চলিক কূটনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। ফলে ঢাকা যদি কুয়ালালামপুরের সঙ্গে সম্পর্ককে কেবল জনশক্তি রপ্তানির প্রশ্নে সীমাবদ্ধ না রেখে একটি সমন্বিত অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অংশীদারত্বে রূপ দিতে পারে, তবে তা বাংলাদেশের “লুক ইস্ট” ধরনের অর্থনৈতিক কূটনীতিকে বাস্তব ভিত্তি দিতে পারে।

শ্রম অভিবাসন: শুধু বাজার খোলা নয়, নিরাপদ মাইগ্রেশন নিশ্চিত করা জরুরি

মালয়েশিয়া সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এজেন্ডা নিঃসন্দেহে শ্রম অভিবাসন। বাংলাদেশের জন্য বৈদেশিক কর্মসংস্থান শুধু বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের পথ নয়; এটি লাখো পরিবারের জীবিকা, সামাজিক গতিশীলতা এবং গ্রামীণ অর্থনীতির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। কিন্তু অভিজ্ঞতা বলে, বিদেশে শ্রমিক পাঠানো আর শ্রমিকের অধিকার রক্ষা—এই দুই বিষয় এক নয়। বহুবার দেখা গেছে, শ্রমবাজার খুললেও যদি রিক্রুটমেন্টে সিন্ডিকেট, অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয়, ভিসা জটিলতা, প্রতারণা, চুক্তিভঙ্গ, মজুরি বঞ্চনা ও কর্মক্ষেত্রে নির্যাতন বন্ধ না হয়, তবে সেই বাজার সাধারণ মানুষের জন্য কল্যাণের বদলে দুর্ভোগ বয়ে আনে। এছাড়া, উল্লেখিত কারণে মালয়েশিয়া সরকার বহুবার বাংলাদেশের শ্রমিক পাঠানোর প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। যার ফলশ্রুতিতে এরকম একটি শ্রমের বড় বাজার অন্যান্য প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রগুলোর হাতে চলে যাচ্ছে। তাই মালয়েশিয়ার সঙ্গে আলোচনায় বাংলাদেশের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত নিরাপদ, ন্যায্য ও স্বচ্ছ শ্রম অভিবাসনের একটি কার্যকর কাঠামো গড়ে তোলা। এটি কেবল একটি সমঝোতা স্মারক দিয়ে শেষ করলে চলবে না; বরং কয়েকটি সুনির্দিষ্ট বিষয় নিশ্চিত করতে হবে। এখানে যে বিষয়গুলো খেয়াল রাখা উচিত তা হল;

এই সফরকে শুধু একটি দ্বিপক্ষীয় সফর হিসেবে নয় বরং এটি এমন এক মুহূর্ত, যখন বাংলাদেশকে একযোগে অভিবাসন কূটনীতি, অর্থনৈতিক কূটনীতি, জ্বালানি কূটনীতি এবং মানবিক কূটনীতি—এই চার ক্ষেত্রেই আরও সুসংহত ও বাস্তবমুখী ফলাফল ভিত্তিক কৌশল নিতে হবে।

প্রথমত, নিয়োগব্যবস্থায় স্বচ্ছতা। বাংলাদেশি শ্রমিকদের বিদেশে যেতে যে বিপুল ব্যয় করতে হয়, তার বড় অংশই চলে যায় দালাল, সাব-এজেন্ট, অস্বচ্ছ রিক্রুটমেন্ট নেটওয়ার্ক ও মধ্যস্বত্বভোগীদের হাতে। মালয়েশিয়ার সঙ্গে যেকোনো চুক্তিতে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের মনিটরিং, ডিজিটাল ট্র্যাকিং, লাইসেন্সধারী রিক্রুটারদের জবাবদিহি এবং অভিবাসন ব্যয়ের একটি সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ জরুরি। “জিরো কস্ট” না হলেও অন্তত “লো কস্ট, ট্রেসেবল কস্ট” নিশ্চিত করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, শ্রমিকের অধিকার ও সুরক্ষা। বাংলাদেশি কর্মীরা মালয়েশিয়ায় গিয়ে যাতে পাসপোর্ট জব্দ, মজুরি আটকে রাখা, অমানবিক কর্মঘণ্টা, আবাসন-সংকট কিংবা আইনি সহায়তার অভাবে না পড়েন, সে জন্য চুক্তিতে ন্যূনতম মজুরি, স্বাস্থ্যসুরক্ষা, আবাসন মান, অভিযোগ নিষ্পত্তি এবং দূতাবাসভিত্তিক সহায়তা ব্যবস্থার স্পষ্ট কাঠামো থাকতে হবে। শ্রম উইংকে কাগুজে কাঠামো না রেখে কার্যকর সুরক্ষা-ব্যবস্থায় রূপ দিতে হবে।

তৃতীয়ত, দক্ষতা-নির্ভর অভিবাসন। বাংলাদেশের বড় দুর্বলতা হলো—আমরা এখনও অনেকাংশে কমদক্ষ শ্রম রপ্তানির ওপর নির্ভরশীল। অথচ মালয়েশিয়ার অর্থনীতি উৎপাদন, সেবা, লজিস্টিকস, নির্মাণ, ইলেকট্রনিক্স, স্বাস্থ্যসেবা ও প্রযুক্তির নানা খাতে দক্ষ জনশক্তি এখানে একটি মৌলিক নীতিগত পরিবর্তন জরুরি। বাংলাদেশের লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু “আরও বেশি শ্রমিক পাঠানো” নয়, বরং স্বল্পদক্ষ শ্রম রপ্তানিকারক দেশ থেকে দক্ষ মানবসম্পদের নির্ভরযোগ্য অংশীদার–এ পরিণত হওয়া। মালয়েশিয়ার বাজারে নির্মাণ শ্রমিকের পাশাপাশি স্বাস্থ্যকর্মী, টেকনিশিয়ান, আইটি পেশাজীবী, ওয়েল্ডার, মেশিন অপারেটর, ইলেকট্রনিক্স-সম্পর্কিত কর্মী এবং মধ্যম-দক্ষ সেবা খাতের জনশক্তির চাহিদা বাড়ছে। এই পরিবর্তনকে সামনে রেখে বাংলাদেশকে অভিবাসন নীতিকে কারিগরি শিক্ষা, ভাষা-প্রশিক্ষণ, আন্তর্জাতিক সনদায়ন এবং প্রবাসী কল্যাণ কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।

চতুর্থত, শ্রম অভিবাসনকে শুধু রেমিট্যান্সের চোখে না দেখা। এটি এখন মানবাধিকার, সামাজিক সুরক্ষা, শ্রমবাজার নীতি এবং আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির প্রশ্ন। বাংলাদেশ যদি নতুনভাবে শ্রম কূটনীতি গড়তে চায়, তবে মালয়েশিয়ার সঙ্গে যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ, অভিযোগ-ডাটাবেস, বার্ষিক রিভিউ মেকানিজম এবং শ্রমিক সুরক্ষা-পর্যবেক্ষণ কাঠামো গড়ে তোলার উদ্যোগ নিতে পারে।

বিনিয়োগ: শুধু আহ্বান নয়, বিশ্বাসযোগ্য সুযোগ তৈরি করতে হবে

মালয়েশিয়া সফরের দ্বিতীয় বড় সম্ভাবনা হলো বিনিয়োগ। বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রা এখন এমন এক পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে শুধু রপ্তানি ও রেমিট্যান্স দিয়ে প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা কঠিন হবে। শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান, অবকাঠামো, জ্বালানি, নগরায়ন ও প্রযুক্তিখাতে নতুন বিনিয়োগ প্রয়োজন। কিন্তু বিদেশি বিনিয়োগ আসবে কীভাবে? কেবল বিদেশ সফরে “বাংলাদেশে বিনিয়োগ করুন” বললে তো হবে না। বিনিয়োগকারীরা সবার আগে দেখেন—নীতি কতটা স্থিতিশীল, প্রশাসনিক জট কতটা কম, চুক্তি বাস্তবায়ন কতটা নির্ভরযোগ্য, অবকাঠামো কতটা কার্যকর, এবং ব্যবসা-পরিবেশ কতটা পূর্বানুমানযোগ্য। বাংলাদেশকে তাই মালয়েশিয়ার কাছে বিনিয়োগ চাওয়ার আগে নিজের ঘর গোছাতে হবে। কয়েকটি ক্ষেত্র এখানে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

প্রথমত, সেক্টরভিত্তিক বিনিয়োগ প্যাকেজ। বাংলাদেশ মালয়েশীয় বিনিয়োগকারীদের জন্য নির্দিষ্ট খাতভিত্তিক প্রস্তাব দিতে পারে—যেমন বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, হালাল শিল্প, ফার্মাসিউটিক্যালস, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, পাম অয়েলভিত্তিক শিল্প, লজিস্টিকস, স্বাস্থ্যসেবা, আইসিটি এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি। “সবাই আসুন” ধরনের সাধারণ আহ্বানের বদলে “এই খাতে, এই জায়গায়, এই সুবিধায়, এই সময়সীমায়”—এমন নির্দিষ্ট প্রস্তাব ফলপ্রসূ হবে।

দ্বিতীয়ত, ইসলামিক ফাইন্যান্স ও হালাল অর্থনীতি। মালয়েশিয়া ইসলামিক ব্যাংকিং, সুকুক, শরিয়াহসম্মত বিনিয়োগ এবং হালাল শিল্পে বিশ্বে অগ্রগণ্য। বাংলাদেশ চাইলে মালয়েশিয়ার সঙ্গে হালাল সার্টিফিকেশন, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, ইসলামিক ফাইন্যান্স, স্বাস্থ্য-পর্যটন ও শিক্ষা খাতে বড় ধরনের অংশীদারত্ব গড়ে তুলতে পারে। বাংলাদেশের ওষুধশিল্প, পোলট্রি, খাদ্যশিল্প ও কসমেটিকস খাতে হালাল বাজারের সম্ভাবনা কম নয়।

তৃতীয়ত, প্রবাসী-সংযোগকে বিনিয়োগে রূপ দেওয়া। মালয়েশিয়ায় থাকা বাংলাদেশি প্রবাসীরা শুধু রেমিট্যান্সের উৎস নন; তাঁরা ক্ষুদ্র ও মাঝারি বিনিয়োগ, বাজার-তথ্য, উদ্যোক্তা সংযোগ এবং প্রবাসী সঞ্চয়কে উৎপাদনমুখী খাতে নেওয়ার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। সরকার চাইলে বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স, ক্ষুদ্র সঞ্চয় ও দেশে ক্ষুদ্র-মাঝারি উদ্যোগে প্রবাসী বিনিয়োগের জন্য বিশেষ প্রণোদনা ও নীতিগত সহায়তা দিতে পারে।

চতুর্থত, বাস্তবতা হলো নীতির সংস্কার না করতে পারলে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ আসবেনা। বিনিয়োগকারীদের জন্য এক-স্টপ সার্ভিস, দ্রুত কাস্টমস, জমি-সংক্রান্ত স্বচ্ছতা, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি, করনীতির স্থিতিশীলতা এবং বিরোধ নিষ্পত্তির নির্ভরযোগ্য প্রক্রিয়া নিশ্চিত না করলে বিনিয়োগ আহ্বান বিশ্বাসযোগ্য হবে না। বিনিয়োগ সম্মেলন বা এমওইউর সংখ্যা দিয়ে সাফল্য মাপার বদলে বাস্তবায়িত বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও প্রযুক্তি স্থানান্তর দিয়ে সাফল্য বিচার করতে হবে।

জ্বালানি সহযোগিতা: বৈশ্বিক অস্থিরতার মধ্যে বিকল্প পথ খোঁজা

বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার এখনও অস্থির। যুদ্ধ, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, সরবরাহব্যবস্থার চাপ, ডলার-সংকট এবং আমদানিনির্ভর অর্থনীতির সীমাবদ্ধতা—সব মিলিয়ে বাংলাদেশ জ্বালানি নিরাপত্তার প্রশ্নে একটি স্পর্শকাতর অবস্থানে আছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পচালনা, সার কারখানা, নগর অর্থনীতি—সবই জ্বালানির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত। ফলে মালয়েশিয়া সফরে জ্বালানি সহযোগিতা কেবল অতিরিক্ত একটি বিষয় নয়; এটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক নিরাপত্তার কেন্দ্রীয় প্রশ্ন। মালয়েশিয়া জ্বালানি ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ ও সক্ষম একটি দেশ। এলএনজি, পেট্রোলিয়াম, পেট্রোকেমিক্যাল, অফশোর সক্ষমতা এবং জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় দেশটির অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের কাজে লাগতে পারে। বাংলাদেশ এখানে তিনটি দিক বিবেচনা করতে পারে।

প্রথমত, দীর্ঘমেয়াদি বা মধ্যমেয়াদি জ্বালানি সরবরাহ সহযোগিতা। স্পট মার্কেটের ওপর অতিনির্ভরতা ঝুঁকিপূর্ণ। মালয়েশিয়ার সঙ্গে এলএনজি সরবরাহ, স্টোরেজ, টার্মিনাল সহযোগিতা এবং মূল্য-অস্থিরতা কমানোর উপযোগী কাঠামো নিয়ে আলোচনা হতে পারে।

বাংলাদেশের এখন প্রয়োজন এমন এক পররাষ্ট্রনীতি, যা শুধু রাষ্ট্রনেতাদের করমর্দনে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং দেশের শ্রমিক, বিনিয়োগ, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং মানবিক দায়—সবকিছুর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হবে। মালয়েশিয়া সফর সেই পরীক্ষারই প্রথম বড় মঞ্চ।

দ্বিতীয়ত, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও জ্বালানি দক্ষতা। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ শুধু গ্যাস বা তেলনির্ভর হতে পারে না। সৌরবিদ্যুৎ, বর্জ্য থেকে জ্বালানি, শিল্পে জ্বালানি দক্ষতা, গ্রিড আধুনিকায়ন এবং সবুজ প্রযুক্তিতে মালয়েশীয় বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

তৃতীয়ত, জ্বালানি কূটনীতিকে অর্থনৈতিক কূটনীতির সঙ্গে যুক্ত করা। বাংলাদেশ যদি মালয়েশিয়ার কাছে জ্বালানি সহযোগিতা চায়, তবে সেটিকে শুধু ক্রয়-বিক্রয়ের সম্পর্ক হিসেবে না দেখে বিনিয়োগ, প্রযুক্তি স্থানান্তর, প্রশিক্ষণ, গবেষণা সহযোগিতা এবং জ্বালানি অবকাঠামো উন্নয়নের সমন্বিত প্যাকেজ হিসেবে ভাবতে হবে।

রোহিঙ্গা সংকট: মালয়েশিয়ার সঙ্গে যৌথ কূটনীতি জরুরি

বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া সম্পর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা হলো রোহিঙ্গা প্রশ্ন। প্রায় এক দশক ধরে বাংলাদেশ বিপুল মানবিক দায় বহন করছে। কক্সবাজারের ক্যাম্পগুলো শুধু মানবিক নয়; অর্থনৈতিক, পরিবেশগত, সামাজিক এবং নিরাপত্তাগত চাপও তৈরি করেছে। আন্তর্জাতিক সহায়তা কমছে, বৈশ্বিক মনোযোগ সরে যাচ্ছে, আর মিয়ানমারে এখনো এমন কোনো পরিবেশ তৈরি হয়নি যাতে রোহিঙ্গারা নিরাপদে, স্বেচ্ছায় ও মর্যাদার সঙ্গে ফিরে যেতে পারেন। এই প্রেক্ষাপটে মালয়েশিয়া বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক অংশীদার হতে পারে।

মালয়েশিয়া অতীতে রোহিঙ্গা ইস্যুতে তুলনামূলকভাবে উচ্চকণ্ঠ ছিল। দেশটিতে রোহিঙ্গা শরণার্থীও আছে; ফলে বিষয়টি তাদের জন্যও সম্পূর্ণ বহিরাগত নয়। বাংলাদেশের উচিত এই সফরে মালয়েশিয়ার সঙ্গে একটি যৌথ কূটনৈতিক ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি করা, যার লক্ষ্য হবে মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ানো এবং রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তনের পক্ষে বাস্তব পরিবেশ তৈরিতে বহুপাক্ষিক উদ্যোগ জোরদার করা।

এই সহযোগিতার কয়েকটি দিক হতে পারে। প্রথমত, ওআইসি, জাতিসংঘ ও আসিয়ান-সম্পর্কিত ফোরামে সমন্বিত কূটনৈতিক অবস্থান নেওয়া। দ্বিতীয়ত, “সেফ রিটার্ন” প্রশ্নে স্পষ্ট নীতিগত অবস্থান—অর্থাৎ প্রত্যাবর্তন হতে হবে নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ এবং অধিকারনির্ভর। তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক ফান্ডিং, মানবিক দায় ভাগাভাগি এবং সীমিত তৃতীয়-দেশ পুনর্বাসনের প্রশ্নে নতুন করে আন্তর্জাতিক সমর্থন জোগাড়ে মালয়েশিয়ার সহায়তা চাওয়া।

সবশেষে বলা যায়, বাংলাদেশে প্রায়ই দেখা যায়, বিদেশ সফর শেষে এমওইউ, যৌথ বিবৃতি ও সদিচ্ছার ভাষা নিয়ে প্রচুর প্রচার হয়; কিন্তু কয়েক মাস পর দেখা যায় বাস্তব অগ্রগতি সীমিত। তাই মালয়েশিয়া সফরের সাফল্যও এমওইউয়ের সংখ্যায় নয়, বরং কয়েকটি বাস্তব সূচকে মাপতে হবে। তারেক রহমানের মালয়েশিয়া সফর বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সুযোগ—কিন্তু সুযোগ নিজে নিজে সাফল্যে রূপ নেয় না। সেটিকে সাফল্যে পরিণত করতে হয় দূরদর্শী প্রস্তুতি, বাস্তবসম্মত অগ্রাধিকার, নীতিগত স্পষ্টতা এবং পরবর্তী বাস্তবায়নের সক্ষমতা দিয়ে। এই সফর যদি কেবল প্রতীকী প্রথম বিদেশ সফর হয়, তবে তা সংবাদশিরোনামে সীমাবদ্ধ থাকবে। কিন্তু যদি বাংলাদেশ এই সফরকে ব্যবহার করতে পারে নিরাপদ শ্রম অভিবাসনের নতুন মানদণ্ড গড়তে, মালয়েশীয় বিনিয়োগের জন্য বাস্তব পরিবেশ তৈরি করতে, জ্বালানি নিরাপত্তার বিকল্প পথ খুঁজতে এবং রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তনের প্রশ্নে আঞ্চলিক কূটনৈতিক সমর্থন গড়ে তুলতে, তবে এটি নতুন সরকারের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সাফল্যগুলোর একটি হয়ে উঠতে পারে।

বাংলাদেশের এখন প্রয়োজন এমন এক পররাষ্ট্রনীতি, যা শুধু রাষ্ট্রনেতাদের করমর্দনে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং দেশের শ্রমিক, বিনিয়োগ, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং মানবিক দায়—সবকিছুর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হবে। মালয়েশিয়া সফর সেই পরীক্ষারই প্রথম বড় মঞ্চ। এখন দেখার বিষয়, ঢাকা এই মঞ্চে কেবল উপস্থিতি দেখায়, নাকি বাস্তব অর্জনের নতুন মানদণ্ড স্থাপন করে।

  • ড. নুরুল হুদা সাকিব: অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
Ad 300x250

সম্পর্কিত