সালাহউদ্দিন আহমেদ রায়হান

হাসিনার পলায়নের দুই বছর পূর্তি হলো ৫ আগস্ট ২০২৬-এ। ২০২৪-এর জুলাইয়ে ছিল ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশ। এর পরের জুলাইগুলো নানান কারণে কিছুটা বিবর্ণ হয়েছে। ঐক্যবদ্ধ রূপ আক্ষরিক অর্থে দেখা না গেলেও ফ্যাসিস্টের প্রশ্নে সবাই এক সূত্রে গাঁথা। কিন্তু যেটা তাৎপর্যপূর্ণ সেটা হচ্ছে এই দুই বছরের মধ্যে একবারও ৭৮ বছরের পুরোনো দল আওয়ামী লীগের কোনো অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি বাংলাদেশে। হাসিনার পাপের ভারে পুরো দলটাই আজ নিমজ্জিত। এটাই হওয়ার কথা।
২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বেগম খালেদা জিয়া খুব সচেতনভাবে বর্জন করেছিলেন। খালেদা জিয়া জানতেন একটি দলের রাজনীতি যেনতেনভাবে কয়েক বছর ক্ষমতায় থাকা নয়, বরং একটা দলের রাজনীতি হওয়া উচিত আদর্শভিত্তিক এবং যার মাধ্যমে দলটি টিকে থাকবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম, শতাব্দীর পর শতাব্দী।
হাসিনার বয়ান ছিল পুরোই উল্টো। তিনি আমিত্বকে খুবই ভালোবাসতেন। আমিই সব করেছি এই বয়ানের পাশাপাশি রাজাকার ট্যাগটাকে বিশেষভাবে ব্যবহার করেছেন বিরোধী দলকে কোণঠাসা করার জন্য। অথচ মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠাই করেছিল বিএনপি ২০০১ সালে। নিপীড়নই ছিল হাসিনার প্রধান অস্ত্র আর এর মাধ্যমেই নিজের মস্তিষ্কপ্রসূত নানান কলাকৌশলের মাধ্যমে নির্বাচন করে ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করাই ছিল তাঁর উদ্দেশ্য।
বেগম খালেদা জিয়ার তৎকালীন রাজনৈতিক প্রজ্ঞা সাময়িকভাবে সুশীল সমাজের একটা অংশের কাছে নেতিবাচক হলেও উনি আদর্শিক এবং জন-অধিকারের পরিপ্রেক্ষিতে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। যার ফলে বিএনপি এবং বাংলাদেশের জনগণ দীর্ঘ আদর্শিক সংগ্রামে লিপ্ত হয়।
শেখ হাসিনার রাজনৈতিক বয়ানে আরেকটা ছিল উন্নয়নের কথা। নিজের খেয়ালখুশির উন্নয়নের জন্য প্রত্যেকটা প্রকল্পের নির্মাণমূল্য দুই, তিন, চার গুণ বৃদ্ধি পেত। যেই পদ্মা সেতুর নির্মাণ মূল্য প্রাক্বলন করা হয়েছিল ১০১৬১ কোটি টাকা। তা শেষ হলো ৩০১৯৩ কোটি টাকায়—কোনো জবাবদিহি ছাড়াই। এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, মেট্রোরেল—প্রতিটি প্রকল্পের নির্মাণ মূল্য কয়েক গুণ বৃদ্ধি করা হয়েছে। বিদ্যুৎ খাতের লুটপাটকে বৈধতা দেওয়ার জন্য ২০১০ সালে ইনডেমনিটি দেওয়া হয়। কুইক রেন্টালের মাধ্যমে বিদ্যুৎ খাতকে টাকা চুরির একটা কারখানায় পরিণত করা হয়। এই উন্নয়নের বয়ান ছিল তাঁর নিত্যসঙ্গী। প্রতিটা বিদেশ সফর থেকে এসে তার চরম অনুগত সাংবাদিকদের তোষামোদে আহ্লাদিত হতেন। কতিপয় সাংবাদিক পেশাগত দায়বদ্ধতার কথা ভুলে গিয়ে নিজেদের স্বার্থের জন্য হাসিনার পদলেহনকারীতে পরিণত হয়েছিলেন।
দায়বদ্ধতা, জবাবদিহি যেন সমাজ ও দেশ থেকে উঠে গিয়েছিল! সংসদে বসত সঙদের আসর! সংসদ নেতাকে উদ্দেশ্য করে বিভিন্নজনের স্বরচিত গান, কবিতাপাঠ চলত। আওয়ামী লীগের তৈরি করা বিরোধী দল জাতীয় পার্টি ছিল তাদের একটি অঙ্গসংগঠনের মতো, যারা সমভাবে বাংলাদেশে গণতন্ত্র হত্যার জন্য দায়ী— হাসিনার সকল অপকর্মের সঙ্গী।
২০১৮ সালে কীভাবে দিনের ভোট রাতে করা হয়েছিল, তা সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার নূরুল হুদা এবং প্রাক্তন আইজিপি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুনের জবানবন্দি থেকে পাওয়া যায়। বেগম খালেদা জিয়াকে মিথ্যা মামলায় ফরমায়েশি রায়ে জেলে নিয়ে, বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বকে, কর্মীদের জেলে রেখে দিনের ভোট রাতে করল। গণতন্ত্রের প্রতি ন্যূনতম কোনো দায়বদ্ধতা শেখ হাসিনা বা আওয়ামী লীগের ছিল না—যেমনটা ছিল না শেখ মুজিবুর রহমানের। চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে একদলীয় বাকশাল কায়েম করেছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। মাত্র চারটি পত্রিকার সার্কুলেশন জারি রেখে অন্য সব পত্রিকা বন্ধ করে দিয়েছিলেন।
শেখ হাসিনার অপশাসন, দুর্নীতি ছিল শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতা পরবর্তী শাসনেরই অনুকরণ বা তার চেয়েও অনেক ভয়ংকর। রক্ষীবাহিনীর মাধ্যমে যেমন মানুষকে হত্যা ও গুম করা হতো, শেখ হাসিনার শাসনামলে গুম খুনের মাত্রা তার কয়েকগুণ হয়েছিল। গুম, খুনের মাত্রা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে যুক্তরাষ্ট্রের রাজস্ব বিভাগ ১০ ডিসেম্বর ২০২১ তারিখে বিশ্ব মানবাধিকার দিবসে র্যাব এবং পুলিশের শীর্ষ ৭ কর্মকর্তাকে স্যাংশন দিয়েছিল। বিরোধী দলের ওপর চরম দমন-পীড়নের কারণে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক কমিশন থেকে চিঠি দিয়েও সতর্ক করা হয়েছে সরকারকে।
বেগম খালেদা জিয়া বিভিন্ন সময় আওয়ামী লীগের অনাচার নিয়ে প্রতিনিয়ত বলতেন, ‘আল্লাহর দরবারে সহ্য হবে না।’ তিনি রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির বাইরে গিয়েও মানুষের মনোজগতের ভেতরের কষ্টের আবেগকে তাঁর কথায় তুলে ধরেছিলেন। সাধারণ রিকশাওয়ালারা বলত, ‘ফেরাউনের পতন হয়েছে, আর হাসিনার পতন হবে না?’ নৃশংস হাসিনা মানুষের মনোজগতকে অপশাসনের মাধ্যমে পুরোপুরি বিষিয়ে তুলেছিলেন।
একজন মা যখন হঠাৎ করেই জানতে পারে, সকালে মিছিলে যাওয়া তার ছেলেটির কোনো হদিস নেই, অথবা একজন পিতা যখন তাঁর সন্তানের গুলির আঘাতে ঝাঁঝরা মৃতদেহ নিয়ে প্রশ্ন করে, ‘একটা মানুষকে মারতে কয়টা গুলি লাগে?’ তখন এর উত্তরের জন্য মানুষ আন্দোলনের পাশাপাশি সৃষ্টিকর্তার কাছেও ফরিয়াদ জানাত। গুম হওয়া ইলিয়াস আলীর ছোট্ট শিশুটি আজ বড় হয়েছে। কিন্তু জানতে পারেনি তার বাবা জীবিত না মৃত। সাংবাদিক সাগর রুনি হত্যাকাণ্ডের কোনো সুরাহা পর্যন্ত হয়নি। একের পর এক তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের তারিখ পেছানো হয়েছে।
এ রকম অজস্র, অগণিত নারকীয় ঘটনার জননী শেখ হাসিনা। মানুষ ফুঁসে উঠেছে সময়ে সময়ে। সবচেয়ে নির্যাতিত দল হিসেবে বিএনপি অপরাপর রাজনৈতিক দলকে সঙ্গে নিয়ে প্রতিনিয়ত ফ্যাসিস্টের বিরুদ্ধে লড়ে গেছে। বিএনপির মহাসচিবসহ স্থায়ী কমিটির প্রায় সব সদস্য নিয়মিতভাবে গ্রেপ্তার হতেন। তাঁদের জামিন দেওয়া হতো না। এই ছিল আওয়ামী শাসন।
কেবল একটি নির্বাচনের ভয়ে, বিরোধী দলকে নির্বাচনে মোকাবিলা করার ভয়ে এবং লুটপাটের মাধ্যমে টাকা পাচারের নৈসর্গিক স্বাদ নেওয়া যেন বন্ধ হয়ে না যায় সেজন্য শেখ হাসিনা বাংলাদেশের বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশনসহ সংবিধিবদ্ধ সকল প্রতিষ্ঠানকে সচেতনভাবে ধ্বংস করেছেন।
২০২৪-এর ডামি নির্বাচনের পর হাসিনার আক্রমণাত্মক মনোভাব চরমভাবে বাড়তে থাকে। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের ব্যানারে শুরু হওয়া কোটা সংস্কার আন্দোলন খুব দ্রুতই জনপরিসরে হাসিনা পতনের আন্দোলনে রূপ নেয়। নানান মত ও পথের মানুষ তাদের দীর্ঘ দিনের বঞ্চনা ও নিপীড়নের বদলা নেওয়ার জন্য রাস্তায় নেমে আসে। শিশু, শ্রমজীবী, শিক্ষার্থী অকাতরে প্রাণ দিতে থাকে এই আন্দোলনে। জাতিসংঘের প্রতিবেদন অনুযায়ী ১৪০০ এর ও বেশি মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। আহত হয়েছেন হাজার হাজার মানুষ। মানুষের মনকে বিদীর্ণ করে ফেলে এই হত্যাযজ্ঞ।
২৪-এর জুলাই মাসে, বিশেষ করে ১৬ জুলাইয়ের পর থেকে মানুষ নিজেকে আর ঘরে আটকে রাখতে পারেনি। হাসিনার সমস্ত বয়ান তখন ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। অভিভাবক, শিক্ষক, সাহিত্যিক, কবি, শিল্পী, ডাক্তার, প্রকৌশলী সবাই যার যার জায়গা থেকে এই আন্দোলনে যুক্ত হয়। মানুষের বিদ্রোহী মনকে হাসিনার পদলেহনকারী রাষ্ট্রীয় বাহিনী, বুলেট, প্রাণঘাতী অস্ত্র কিছুই রুখতে পারেনি। এ ছিল এক সম্মিলিত প্রয়াস। বন্ধু তার সহযাত্রীর গুলিবিদ্ধ দেহ টেনে নিয়ে আসার সময় গুলি, ট্যাংক থেকে অর্ধমৃত দেহকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়ে গুলি, বহুতল ভবনের কার্নিশে ঝুলে থাকা যুবককে একের পর এক গুলি করছে— কিন্তু জনতার প্রতিরোধ থামছে না।
হাসিনার পতন ছড়া মানুষের আলাপ আলোচনায় আর কিছুই ছিল না। কারফিউ জারি করা আবার শিথিল করা; স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, অফিস আদালত সরকারি ছুটি দেওয়া, শ্যুট অ্যাট সাইট ঘোষণা দেওয়া কোনো কিছুই হাসিনাকে আটকাতে পারেনি। শেখ হাসিনা মানুষকে হত্যা করার সব পদক্ষেপ নিয়েছিলেন, কিন্তু নিজে পদত্যাগ করে তার গত ১৫ বছরের পাপ মোচনের কোনো পদক্ষেপ নেননি। তিনি মেট্রো স্টেশন পোড়ার জন্য চোখের পানি ফেলার নাটক করেছেন কিন্তু এত এত সন্তান শহীদ হওয়ার জন্য কোনো চোখের পানি ফেলেননি। তাঁর তথ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত আন্দোলনকারীদের এডিক্টেড বলে কটাক্ষ করতে পর্যন্ত দ্বিধা করেননি।
হাসিনার পতন অনিবার্য ছিল। রক্তে রঞ্জিত যার হাত, রক্তপিপাসু যে, প্রাকৃতিকভাবেই তার বিনাশ অবশ্যম্ভাবী হয়েছিল। মানুষের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা, অপরিসীম ত্যাগ এবং একটি গণতান্ত্রিক বৈষম্যহীন দেশ পাওয়ার অভিপ্রায় মানুষকে হাসিনা পতনের আন্দোলনে সবচেয়ে বেশি উদ্বুদ্ধ করেছিল। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ বিএনপির বিভিন্ন শীর্ষ স্থানীয় নেতারা যখন হাসিনাকে উদ্দেশ্য করে বলতেন, পালানোর পথ খুঁজে পাবেন না; তখন হাসিনা প্রত্যুত্তরে বলতেন, শেখ হাসিনা পালায় না।
বাংলাদেশ বনাম আওয়ামী লীগের যে যুদ্ধ শুরু হয়েছিল ২০২৪-এর জুলাইয়ে; ৩৬ দিনের রক্তক্ষয়ী সে যুদ্ধে বাংলাদেশ জয়ী হয়েছে। শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগ পালিয়ে গেছে।
জুলাই শেষ হয়ে যায়নি। জুলাইয়ের অনুভূতি প্রজন্মের পর প্রজন্ম, যুগের পর যুগ, শতাব্দীর পর শতাব্দী মানুষের মনে জাগরূক থাকবে। ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ সব সময় ঐক্যবদ্ধ থাকবে, জুলাইয়ের শহীদদের আত্মত্যাগকে ধারণ করে বাংলাদেশ বিনির্মাণে রাজনৈতিক দলগুলো অবিচল থাকবে।

হাসিনার পলায়নের দুই বছর পূর্তি হলো ৫ আগস্ট ২০২৬-এ। ২০২৪-এর জুলাইয়ে ছিল ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশ। এর পরের জুলাইগুলো নানান কারণে কিছুটা বিবর্ণ হয়েছে। ঐক্যবদ্ধ রূপ আক্ষরিক অর্থে দেখা না গেলেও ফ্যাসিস্টের প্রশ্নে সবাই এক সূত্রে গাঁথা। কিন্তু যেটা তাৎপর্যপূর্ণ সেটা হচ্ছে এই দুই বছরের মধ্যে একবারও ৭৮ বছরের পুরোনো দল আওয়ামী লীগের কোনো অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি বাংলাদেশে। হাসিনার পাপের ভারে পুরো দলটাই আজ নিমজ্জিত। এটাই হওয়ার কথা।
২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বেগম খালেদা জিয়া খুব সচেতনভাবে বর্জন করেছিলেন। খালেদা জিয়া জানতেন একটি দলের রাজনীতি যেনতেনভাবে কয়েক বছর ক্ষমতায় থাকা নয়, বরং একটা দলের রাজনীতি হওয়া উচিত আদর্শভিত্তিক এবং যার মাধ্যমে দলটি টিকে থাকবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম, শতাব্দীর পর শতাব্দী।
হাসিনার বয়ান ছিল পুরোই উল্টো। তিনি আমিত্বকে খুবই ভালোবাসতেন। আমিই সব করেছি এই বয়ানের পাশাপাশি রাজাকার ট্যাগটাকে বিশেষভাবে ব্যবহার করেছেন বিরোধী দলকে কোণঠাসা করার জন্য। অথচ মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠাই করেছিল বিএনপি ২০০১ সালে। নিপীড়নই ছিল হাসিনার প্রধান অস্ত্র আর এর মাধ্যমেই নিজের মস্তিষ্কপ্রসূত নানান কলাকৌশলের মাধ্যমে নির্বাচন করে ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করাই ছিল তাঁর উদ্দেশ্য।
বেগম খালেদা জিয়ার তৎকালীন রাজনৈতিক প্রজ্ঞা সাময়িকভাবে সুশীল সমাজের একটা অংশের কাছে নেতিবাচক হলেও উনি আদর্শিক এবং জন-অধিকারের পরিপ্রেক্ষিতে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। যার ফলে বিএনপি এবং বাংলাদেশের জনগণ দীর্ঘ আদর্শিক সংগ্রামে লিপ্ত হয়।
শেখ হাসিনার রাজনৈতিক বয়ানে আরেকটা ছিল উন্নয়নের কথা। নিজের খেয়ালখুশির উন্নয়নের জন্য প্রত্যেকটা প্রকল্পের নির্মাণমূল্য দুই, তিন, চার গুণ বৃদ্ধি পেত। যেই পদ্মা সেতুর নির্মাণ মূল্য প্রাক্বলন করা হয়েছিল ১০১৬১ কোটি টাকা। তা শেষ হলো ৩০১৯৩ কোটি টাকায়—কোনো জবাবদিহি ছাড়াই। এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, মেট্রোরেল—প্রতিটি প্রকল্পের নির্মাণ মূল্য কয়েক গুণ বৃদ্ধি করা হয়েছে। বিদ্যুৎ খাতের লুটপাটকে বৈধতা দেওয়ার জন্য ২০১০ সালে ইনডেমনিটি দেওয়া হয়। কুইক রেন্টালের মাধ্যমে বিদ্যুৎ খাতকে টাকা চুরির একটা কারখানায় পরিণত করা হয়। এই উন্নয়নের বয়ান ছিল তাঁর নিত্যসঙ্গী। প্রতিটা বিদেশ সফর থেকে এসে তার চরম অনুগত সাংবাদিকদের তোষামোদে আহ্লাদিত হতেন। কতিপয় সাংবাদিক পেশাগত দায়বদ্ধতার কথা ভুলে গিয়ে নিজেদের স্বার্থের জন্য হাসিনার পদলেহনকারীতে পরিণত হয়েছিলেন।
দায়বদ্ধতা, জবাবদিহি যেন সমাজ ও দেশ থেকে উঠে গিয়েছিল! সংসদে বসত সঙদের আসর! সংসদ নেতাকে উদ্দেশ্য করে বিভিন্নজনের স্বরচিত গান, কবিতাপাঠ চলত। আওয়ামী লীগের তৈরি করা বিরোধী দল জাতীয় পার্টি ছিল তাদের একটি অঙ্গসংগঠনের মতো, যারা সমভাবে বাংলাদেশে গণতন্ত্র হত্যার জন্য দায়ী— হাসিনার সকল অপকর্মের সঙ্গী।
২০১৮ সালে কীভাবে দিনের ভোট রাতে করা হয়েছিল, তা সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার নূরুল হুদা এবং প্রাক্তন আইজিপি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুনের জবানবন্দি থেকে পাওয়া যায়। বেগম খালেদা জিয়াকে মিথ্যা মামলায় ফরমায়েশি রায়ে জেলে নিয়ে, বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বকে, কর্মীদের জেলে রেখে দিনের ভোট রাতে করল। গণতন্ত্রের প্রতি ন্যূনতম কোনো দায়বদ্ধতা শেখ হাসিনা বা আওয়ামী লীগের ছিল না—যেমনটা ছিল না শেখ মুজিবুর রহমানের। চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে একদলীয় বাকশাল কায়েম করেছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। মাত্র চারটি পত্রিকার সার্কুলেশন জারি রেখে অন্য সব পত্রিকা বন্ধ করে দিয়েছিলেন।
শেখ হাসিনার অপশাসন, দুর্নীতি ছিল শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতা পরবর্তী শাসনেরই অনুকরণ বা তার চেয়েও অনেক ভয়ংকর। রক্ষীবাহিনীর মাধ্যমে যেমন মানুষকে হত্যা ও গুম করা হতো, শেখ হাসিনার শাসনামলে গুম খুনের মাত্রা তার কয়েকগুণ হয়েছিল। গুম, খুনের মাত্রা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে যুক্তরাষ্ট্রের রাজস্ব বিভাগ ১০ ডিসেম্বর ২০২১ তারিখে বিশ্ব মানবাধিকার দিবসে র্যাব এবং পুলিশের শীর্ষ ৭ কর্মকর্তাকে স্যাংশন দিয়েছিল। বিরোধী দলের ওপর চরম দমন-পীড়নের কারণে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক কমিশন থেকে চিঠি দিয়েও সতর্ক করা হয়েছে সরকারকে।
বেগম খালেদা জিয়া বিভিন্ন সময় আওয়ামী লীগের অনাচার নিয়ে প্রতিনিয়ত বলতেন, ‘আল্লাহর দরবারে সহ্য হবে না।’ তিনি রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির বাইরে গিয়েও মানুষের মনোজগতের ভেতরের কষ্টের আবেগকে তাঁর কথায় তুলে ধরেছিলেন। সাধারণ রিকশাওয়ালারা বলত, ‘ফেরাউনের পতন হয়েছে, আর হাসিনার পতন হবে না?’ নৃশংস হাসিনা মানুষের মনোজগতকে অপশাসনের মাধ্যমে পুরোপুরি বিষিয়ে তুলেছিলেন।
একজন মা যখন হঠাৎ করেই জানতে পারে, সকালে মিছিলে যাওয়া তার ছেলেটির কোনো হদিস নেই, অথবা একজন পিতা যখন তাঁর সন্তানের গুলির আঘাতে ঝাঁঝরা মৃতদেহ নিয়ে প্রশ্ন করে, ‘একটা মানুষকে মারতে কয়টা গুলি লাগে?’ তখন এর উত্তরের জন্য মানুষ আন্দোলনের পাশাপাশি সৃষ্টিকর্তার কাছেও ফরিয়াদ জানাত। গুম হওয়া ইলিয়াস আলীর ছোট্ট শিশুটি আজ বড় হয়েছে। কিন্তু জানতে পারেনি তার বাবা জীবিত না মৃত। সাংবাদিক সাগর রুনি হত্যাকাণ্ডের কোনো সুরাহা পর্যন্ত হয়নি। একের পর এক তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের তারিখ পেছানো হয়েছে।
এ রকম অজস্র, অগণিত নারকীয় ঘটনার জননী শেখ হাসিনা। মানুষ ফুঁসে উঠেছে সময়ে সময়ে। সবচেয়ে নির্যাতিত দল হিসেবে বিএনপি অপরাপর রাজনৈতিক দলকে সঙ্গে নিয়ে প্রতিনিয়ত ফ্যাসিস্টের বিরুদ্ধে লড়ে গেছে। বিএনপির মহাসচিবসহ স্থায়ী কমিটির প্রায় সব সদস্য নিয়মিতভাবে গ্রেপ্তার হতেন। তাঁদের জামিন দেওয়া হতো না। এই ছিল আওয়ামী শাসন।
কেবল একটি নির্বাচনের ভয়ে, বিরোধী দলকে নির্বাচনে মোকাবিলা করার ভয়ে এবং লুটপাটের মাধ্যমে টাকা পাচারের নৈসর্গিক স্বাদ নেওয়া যেন বন্ধ হয়ে না যায় সেজন্য শেখ হাসিনা বাংলাদেশের বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশনসহ সংবিধিবদ্ধ সকল প্রতিষ্ঠানকে সচেতনভাবে ধ্বংস করেছেন।
২০২৪-এর ডামি নির্বাচনের পর হাসিনার আক্রমণাত্মক মনোভাব চরমভাবে বাড়তে থাকে। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের ব্যানারে শুরু হওয়া কোটা সংস্কার আন্দোলন খুব দ্রুতই জনপরিসরে হাসিনা পতনের আন্দোলনে রূপ নেয়। নানান মত ও পথের মানুষ তাদের দীর্ঘ দিনের বঞ্চনা ও নিপীড়নের বদলা নেওয়ার জন্য রাস্তায় নেমে আসে। শিশু, শ্রমজীবী, শিক্ষার্থী অকাতরে প্রাণ দিতে থাকে এই আন্দোলনে। জাতিসংঘের প্রতিবেদন অনুযায়ী ১৪০০ এর ও বেশি মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। আহত হয়েছেন হাজার হাজার মানুষ। মানুষের মনকে বিদীর্ণ করে ফেলে এই হত্যাযজ্ঞ।
২৪-এর জুলাই মাসে, বিশেষ করে ১৬ জুলাইয়ের পর থেকে মানুষ নিজেকে আর ঘরে আটকে রাখতে পারেনি। হাসিনার সমস্ত বয়ান তখন ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। অভিভাবক, শিক্ষক, সাহিত্যিক, কবি, শিল্পী, ডাক্তার, প্রকৌশলী সবাই যার যার জায়গা থেকে এই আন্দোলনে যুক্ত হয়। মানুষের বিদ্রোহী মনকে হাসিনার পদলেহনকারী রাষ্ট্রীয় বাহিনী, বুলেট, প্রাণঘাতী অস্ত্র কিছুই রুখতে পারেনি। এ ছিল এক সম্মিলিত প্রয়াস। বন্ধু তার সহযাত্রীর গুলিবিদ্ধ দেহ টেনে নিয়ে আসার সময় গুলি, ট্যাংক থেকে অর্ধমৃত দেহকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়ে গুলি, বহুতল ভবনের কার্নিশে ঝুলে থাকা যুবককে একের পর এক গুলি করছে— কিন্তু জনতার প্রতিরোধ থামছে না।
হাসিনার পতন ছড়া মানুষের আলাপ আলোচনায় আর কিছুই ছিল না। কারফিউ জারি করা আবার শিথিল করা; স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, অফিস আদালত সরকারি ছুটি দেওয়া, শ্যুট অ্যাট সাইট ঘোষণা দেওয়া কোনো কিছুই হাসিনাকে আটকাতে পারেনি। শেখ হাসিনা মানুষকে হত্যা করার সব পদক্ষেপ নিয়েছিলেন, কিন্তু নিজে পদত্যাগ করে তার গত ১৫ বছরের পাপ মোচনের কোনো পদক্ষেপ নেননি। তিনি মেট্রো স্টেশন পোড়ার জন্য চোখের পানি ফেলার নাটক করেছেন কিন্তু এত এত সন্তান শহীদ হওয়ার জন্য কোনো চোখের পানি ফেলেননি। তাঁর তথ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত আন্দোলনকারীদের এডিক্টেড বলে কটাক্ষ করতে পর্যন্ত দ্বিধা করেননি।
হাসিনার পতন অনিবার্য ছিল। রক্তে রঞ্জিত যার হাত, রক্তপিপাসু যে, প্রাকৃতিকভাবেই তার বিনাশ অবশ্যম্ভাবী হয়েছিল। মানুষের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা, অপরিসীম ত্যাগ এবং একটি গণতান্ত্রিক বৈষম্যহীন দেশ পাওয়ার অভিপ্রায় মানুষকে হাসিনা পতনের আন্দোলনে সবচেয়ে বেশি উদ্বুদ্ধ করেছিল। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ বিএনপির বিভিন্ন শীর্ষ স্থানীয় নেতারা যখন হাসিনাকে উদ্দেশ্য করে বলতেন, পালানোর পথ খুঁজে পাবেন না; তখন হাসিনা প্রত্যুত্তরে বলতেন, শেখ হাসিনা পালায় না।
বাংলাদেশ বনাম আওয়ামী লীগের যে যুদ্ধ শুরু হয়েছিল ২০২৪-এর জুলাইয়ে; ৩৬ দিনের রক্তক্ষয়ী সে যুদ্ধে বাংলাদেশ জয়ী হয়েছে। শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগ পালিয়ে গেছে।
জুলাই শেষ হয়ে যায়নি। জুলাইয়ের অনুভূতি প্রজন্মের পর প্রজন্ম, যুগের পর যুগ, শতাব্দীর পর শতাব্দী মানুষের মনে জাগরূক থাকবে। ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ সব সময় ঐক্যবদ্ধ থাকবে, জুলাইয়ের শহীদদের আত্মত্যাগকে ধারণ করে বাংলাদেশ বিনির্মাণে রাজনৈতিক দলগুলো অবিচল থাকবে।
.png)

সংবিধান একটি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন। কিন্তু সংবিধানকে কেবল একটি আইনি দলিল হিসেবে দেখলে তার প্রকৃত তাৎপর্য অনুধাবন করা যায় না। এটি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক দর্শন, ক্ষমতার বণ্টন, নাগরিকের অধিকার এবং রাষ্ট্র-নাগরিক সম্পর্কের মৌলিক ভিত্তি নির্ধারণ করে।
১ ঘণ্টা আগে
দুই বছর আগে ৫ আগস্ট ক্ষমতা থেকে ন্যাক্কারজনকভাবে বিদায় নিতে হয়েছিল শেখ হাসিনাকে। সেই দিনটিকে সামনে রেখে নয়াদিল্লিতে তিনি আয়োজন করেছিলেন ভার্চ্যুয়াল সংবাদ সম্মেলন। এতে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে নতুন করে অস্বস্তি যুক্ত হয়েছে।
৪ ঘণ্টা আগে‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) আইন, ২০২৬’-এর খসড়া প্রকাশ করা হয়েছে, যার উদ্দেশ্য বিতর্কিত র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন বা র্যাবকে নতুন নাম ও কাঠামোয় পুনর্গঠন। এর আগে বাহিনীটির নাম বদলে ‘স্পেশাল ইন্টারভেনশন ফোর্স’ রাখার কথা শোনা গিয়েছিল।
২১ ঘণ্টা আগে
কোনো জাতির ইতিহাস কেবল ঘটনাবলির ধারাবিবরণী নয়; তা জাতীয় চেতনা, আত্মপরিচয়, গণসংগ্রামের স্মৃতি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সত্যের নির্ভরযোগ্য দলিল। বিশেষ করে গণআন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান কিংবা জাতীয় সংকটের মতো গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় নিয়ে নির্মিত প্রামাণ্যচিত্রের প্রতি মানুষের প্রত্যাশা থাকে অনেক বেশি।
০৭ আগস্ট ২০২৬