জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ডকুমেন্টারি: পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস, নাকি নির্বাচিত বয়ান

ড. খালিদুর রহমান
ড. খালিদুর রহমান

প্রকাশ : ০৭ আগস্ট ২০২৬, ১৮: ১৭
স্ট্রিম গ্রাফিক

কোনো জাতির ইতিহাস কেবল ঘটনাবলির ধারাবিবরণী নয়; তা জাতীয় চেতনা, আত্মপরিচয়, গণসংগ্রামের স্মৃতি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সত্যের নির্ভরযোগ্য দলিল। বিশেষ করে গণআন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান কিংবা জাতীয় সংকটের মতো গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় নিয়ে নির্মিত প্রামাণ্যচিত্রের প্রতি মানুষের প্রত্যাশা থাকে অনেক বেশি। কারণ এমন নির্মাণ ভবিষ্যতের গবেষণা, শিক্ষা এবং জনস্মৃতির ওপর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে। তাই ইতিহাসভিত্তিক কোনো সরকারি প্রামাণ্যচিত্রে তথ্যের যথার্থতা, ভারসাম্য ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উপস্থাপন নিশ্চিত করা শুধু নৈতিক নয়, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও।

জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের উদ্যোগে নির্মিত একটি প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনের পর সেই প্রত্যাশার বিপরীতে তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতারা অভিযোগ করেছেন, এতে ‘এক দফা’ ঘোষণার ইতিহাস এবং আন্দোলনের কৃতিত্ব উপস্থাপনে অসংগতি রয়েছে। আপত্তি জানিয়ে অনুষ্ঠান বর্জন করেন এনসিপির নেতা আখতার হোসেন, আর যুগ্ম সদস্যসচিব মাহিন সরকার প্রকাশ্যে এর প্রতিবাদ জানান। ঘটনাটি এতটাই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যে অনুষ্ঠানস্থলেই হট্টগোলের সৃষ্টি হয়।

সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদও ডকুমেন্টারিটির বিভিন্ন ত্রুটির কথা প্রকাশ্যে উল্লেখ করেন। তাঁর ভাষায়, ‘ডকুমেন্টারিতে অনেক ভুল আছে। আবু সাঈদ এই বিপ্লবের প্রতীক। তাঁকে যথাযথভাবে তুলে ধরা না হলে সেটি পূর্ণাঙ্গ ডকুমেন্টারি হতে পারে না।’ এই মন্তব্য বিতর্ককে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলে।

যদিও প্রদর্শিত ২ মিনিট ১২ সেকেন্ডের ভিডিওতে আবু সাঈদের ছবি সংক্ষিপ্তভাবে দেখা গেছে, সমালোচকদের বক্তব্য হলো—আন্দোলনের প্রথম শহীদ এবং সামনের সারির নেতৃত্বকে যে গুরুত্বে তুলে ধরা উচিত ছিল, তা সেখানে প্রতিফলিত হয়নি। একইভাবে বহু গুরুত্বপূর্ণ সমন্বয়ক ও প্রত্যক্ষ নেতৃত্বের ভূমিকা কার্যত অনুপস্থিত বলে অভিযোগ উঠেছে।

অন্যদিকে ডকুমেন্টারিতে বিএনপি এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভূমিকা তুলনামূলকভাবে বেশি গুরুত্ব দিয়ে উপস্থাপন করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, তাঁর আহ্বানে ছাত্র-জনতার সঙ্গে বিএনপির নেতাকর্মীরা আন্দোলনে যুক্ত হন এবং তাঁর ‘দফা এক, দাবি এক—খুনি হাসিনার পদত্যাগ’ বক্তব্যও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। প্রশ্নটি তাই কোনো ব্যক্তি বা দলের অবদান অস্বীকারের নয়; বরং একটি জাতীয় গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাসে সব গুরুত্বপূর্ণ অংশীজনের অবদান সমান সততা ও ভারসাম্যের সঙ্গে প্রতিফলিত হয়েছে কি না—সেই প্রশ্নই আজ আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।

বাংলাদেশের ইতিহাসই আমাদের শিক্ষা দেয় যে কোনো গণআন্দোলনের প্রকৃত চরিত্র রক্ষার জন্য সংশ্লিষ্ট প্রত্যেক গুরুত্বপূর্ণ মানুষের অবদান যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা কতটা জরুরি। ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে বহু সংগ্রামী ব্যক্তিত্ব দীর্ঘদিন পর্যাপ্ত স্বীকৃতি পাননি; পরবর্তী গবেষণা ও দলিলের ভিত্তিতে সেই ঘাটতি ধীরে ধীরে পূরণ হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসও বিভিন্ন রাজনৈতিক পর্বে ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যার শিকার হয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত গবেষণা, সাক্ষ্য ও প্রমাণই ইতিহাসকে তার প্রকৃত অবস্থানে ফিরিয়ে এনেছে। এই অভিজ্ঞতা আমাদের শেখায়—সত্যকে সাময়িকভাবে আড়াল করা সম্ভব হলেও ইতিহাসকে স্থায়ীভাবে পরিবর্তন করা যায় না।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানও কোনো একক ব্যক্তি, দল কিংবা প্রতিষ্ঠানের কৃতিত্ব নয়। এটি হাজারো শিক্ষার্থী, তরুণ, শ্রমিক, সাধারণ মানুষ, রাজনৈতিক কর্মী, সংগঠক, সমন্বয়ক এবং আত্মোৎসর্গকারী শহীদদের সম্মিলিত সংগ্রামের ফসল। ফলে ইতিহাসের কোনো গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রকে অতিরঞ্জিত করা যেমন অনুচিত, তেমনি তাঁর অবদানকে সংকুচিত করাও ইতিহাসের প্রতি অবিচার। একটি সরকারি প্রামাণ্যচিত্রে যদি আন্দোলনের প্রতীকী শহীদ, সম্মুখসারির সমন্বয়ক কিংবা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদের যথাযথ স্থান না দেওয়া হয়, তবে সেটি স্বাভাবিকভাবেই জনমনে প্রশ্নের জন্ম দেবে।

বিশ্ব ইতিহাসে এমন বহু উদাহরণ রয়েছে, যেখানে ক্ষমতাকেন্দ্রিক ইতিহাস রচনার প্রবণতা পরবর্তীকালে গভীর বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। সোভিয়েত ইউনিয়নে জোসেফ স্টালিনের শাসনামলে সরকারি ছবি ও নথি থেকে অনেক রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীর নাম ও ছবি মুছে ফেলা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে আর্কাইভ উন্মুক্ত হলে বিশ্ব জানতে পারে কীভাবে রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক ইতিহাসে পরিকল্পিত পরিবর্তন আনা হয়েছিল।

চীনের সাংস্কৃতিক বিপ্লব নিয়েও বহু বছর ধরে সরকারি বর্ণনা এবং গবেষকদের অনুসন্ধানের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য ছিল। স্পেনে জেনারেল ফ্রাঙ্কোর শাসন শেষে গণকবর অনুসন্ধান এবং ঐতিহাসিক সত্য পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য বিশেষ উদ্যোগ নিতে হয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবৈষম্য অবসানের পর গঠিত ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন দেখিয়েছে, সত্য গোপন না করে বরং উন্মুক্তভাবে স্বীকার করাই জাতীয় পুনর্মিলনের কার্যকর পথ। আবার জার্মানি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে নাৎসি অপরাধকে আড়াল না করে গবেষণা, শিক্ষা, জাদুঘর এবং স্মৃতিসৌধের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সামনে তুলে ধরার নীতি গ্রহণ করেছে। এসব উদাহরণ প্রমাণ করে, সত্যকে লুকিয়ে রাখা নয়, সত্যকে গ্রহণ করাই একটি পরিণত রাষ্ট্রের পরিচয়।

এ কারণেই বর্তমান বিতর্ককে কেবল রাজনৈতিক মতভেদের দৃষ্টিতে দেখা উচিত নয়। বরং নিরপেক্ষভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন—ডকুমেন্টারির গবেষণা কীভাবে হয়েছে, কারা বিষয়বস্তু নির্বাচন করেছেন, কোন বিবেচনায় কিছু ঘটনা ও ব্যক্তিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে এবং কেন অন্য গুরুত্বপূর্ণ অংশ বাদ পড়েছে। ইতিহাস নিয়ে রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক উপস্থাপনায় এই প্রশ্নগুলোর উত্তর জনগণের জানার অধিকার রয়েছে।

সরকারের জন্যও বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ রাষ্ট্রের গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং ন্যায়ভিত্তিক সিদ্ধান্তের ওপর। বহু সময় অতিউৎসাহী ব্যক্তি বা গোষ্ঠী ক্ষমতাসীনদের সন্তুষ্ট করার উদ্দেশ্যে বাস্তবতাকে একপাক্ষিকভাবে উপস্থাপন করে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, এমন প্রবণতা সাময়িকভাবে কারও ব্যক্তিগত স্বার্থ রক্ষা করলেও শেষ পর্যন্ত সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করে এবং জনগণের মধ্যে অপ্রয়োজনীয় অবিশ্বাস সৃষ্টি করে। তাই সরকারের প্রকৃত স্বার্থও নিহিত রয়েছে পূর্ণাঙ্গ ও নিরপেক্ষ ইতিহাস সংরক্ষণে।

এ মুহূর্তে সবচেয়ে প্রয়োজন একটি দ্রুত, স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য পর্যালোচনা। নির্মাতা, গবেষক, সম্পাদক, সংশ্লিষ্ট পরামর্শক এবং অনুমোদন প্রক্রিয়ায় যুক্ত ব্যক্তিদের বক্তব্য নিয়ে স্পষ্ট করা উচিত—কোন তথ্যের ভিত্তিতে চূড়ান্ত সংস্করণ প্রস্তুত হয়েছে এবং বিতর্কিত উপস্থাপনার কারণ কী। যদি এটি অনিচ্ছাকৃত সম্পাদনাগত সীমাবদ্ধতা হয়ে থাকে, তবে সংশোধিত সংস্করণ প্রকাশ করা উচিত। আর যদি ইচ্ছাকৃতভাবে ইতিহাস বিকৃতির প্রমাণ মেলে, তবে আইন ও নীতিমালার আলোকে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করাই হবে রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

বিশ্বের বহু দেশে জাতীয় গুরুত্বসম্পন্ন তথ্যচিত্র প্রকাশের আগে বহুমাত্রিক মূল্যায়নের প্রচলন রয়েছে। বাংলাদেশেও এ ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে উঠলে ভবিষ্যতে অনিচ্ছাকৃত ভুল কিংবা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বর্জন—উভয়ই অনেকাংশে প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদ, আহত, নেতৃত্বদানকারী এবং সাধারণ অংশগ্রহণকারীরা কোনো রাজনৈতিক পরিচয়ের সীমায় আবদ্ধ নন; তাঁরা জাতির সম্মিলিত ইতিহাসের অংশ। তাঁদের প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান প্রদর্শনের একমাত্র উপায় হলো সত্যকে অবিকৃত রাখা। ইতিহাসে কারও অবদান মুছে ফেলা যেমন অন্যায়, তেমনি কৃত্রিমভাবে কারও ভূমিকাকে অতিরঞ্জিত করাও সমানভাবে অগ্রহণযোগ্য। কারণ ইতিহাসের চূড়ান্ত বিচারক কোনো সরকার, রাজনৈতিক দল বা প্রজন্ম নয়; ইতিহাসের চূড়ান্ত বিচারক সত্য এবং সময়।

লেখক: শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের অধ্যাপক

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত