সংবিধান সংস্কার: কেবল আইনের বিষয় নয়, জাতীয় ঐকমত্যেরও প্রশ্ন

প্রকাশ : ০৮ আগস্ট ২০২৬, ১৯: ০১
স্ট্রিম গ্রাফিক

সংবিধান একটি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন। কিন্তু সংবিধানকে কেবল একটি আইনি দলিল হিসেবে দেখলে তার প্রকৃত তাৎপর্য অনুধাবন করা যায় না। এটি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক দর্শন, ক্ষমতার বণ্টন, নাগরিকের অধিকার এবং রাষ্ট্র-নাগরিক সম্পর্কের মৌলিক ভিত্তি নির্ধারণ করে। তাই সংবিধান সংস্কারও কেবল কয়েকটি অনুচ্ছেদ পরিবর্তনের বিষয় নয়; এটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কাঠামো পুনর্বিন্যাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া। এ কারণেই সংবিধান সংস্কার যতটা আইনগত, ততটাই রাজনৈতিক, সামাজিক এবং নৈতিক প্রশ্ন।

সংবিধান সংস্কার নাকি সংবিধান পুনর্লিখন?

সংবিধান পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সাধারণত দুটি পৃথক ধারণা ব্যবহৃত হয়—সংবিধান সংস্কার এবং সংবিধান পুনর্লিখন বা নতুন সংবিধান প্রণয়ন। সংবিধান সংস্কার বলতে বিদ্যমান সংবিধানের মৌলিক পরিচয় ও ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ন রেখে এর নির্দিষ্ট বিধান, প্রতিষ্ঠান বা ক্ষমতার কাঠামোতে পরিবর্তন, সংযোজন বা বর্জনকে বোঝায়। এ ক্ষেত্রে সংবিধানের বৈধতা ও ধারাবাহিকতা বজায় থাকে এবং সাধারণত সংবিধানে নির্ধারিত সংশোধন পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। অন্যদিকে সংবিধান পুনর্লিখন বলতে বিদ্যমান সংবিধানের পরিবর্তে সম্পূর্ণ নতুন একটি সংবিধান গ্রহণকে বোঝায়।

সাধারণত বিপ্লব, স্বাধীনতা অর্জন, গৃহযুদ্ধের অবসান, সামরিক শাসন থেকে গণতন্ত্রে উত্তরণ অথবা রাষ্ট্রের মৌলিক পুনর্গঠনের মতো পরিস্থিতিতে নতুন সংবিধান প্রণয়নের প্রয়োজন দেখা দেয়। এ ক্ষেত্রে বিদ্যমান সংবিধানের ধারাবাহিকতা প্রায়ই সমাপ্ত হয় এবং একটি নতুন সাংবিধানিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়।

বিশেষ করে উপনিবেশ-উত্তর রাষ্ট্রগুলোতে সংবিধান পুনর্লিখনের প্রবণতা বেশি দেখা যায়। স্বাধীনতার সময় অনেক দেশ ঔপনিবেশিক শক্তির প্রণীত সাংবিধানিক কাঠামো উত্তরাধিকারসূত্রে গ্রহণ করলেও পরবর্তী সময়ে নিজস্ব রাজনৈতিক বাস্তবতা, জাতীয় পরিচয় এবং গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটাতে নতুন সংবিধান প্রণয়ন করেছে। উদাহরণস্বরূপ, ভারত ১৯৫০ সালে ঔপনিবেশিক শাসনামলে প্রণীত ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইনের পরিবর্তে একটি নতুন সংবিধান গ্রহণ করে। ঘানা (১৯৯২), নামিবিয়া (১৯৯০), দক্ষিণ আফ্রিকা (১৯৯৬), কেনিয়া (২০১০) প্রত্যেকেই রাজনৈতিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে নতুন সংবিধান প্রণয়ন করেছে।

এসব ক্ষেত্রে উদ্দেশ্য ছিল কেবল আইন পরিবর্তন নয়; বরং নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থা, ক্ষমতার ভারসাম্য, মানবাধিকার সুরক্ষা এবং গণতান্ত্রিক বৈধতার নতুন ভিত্তি নির্মাণ। অন্যদিকে অনেক দেশ নতুন সংবিধান প্রণয়নের পরিবর্তে সংবিধান সংস্কারের পথ বেছে নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ১৭৮৭ সালের সংবিধান বহাল রেখেই সংশোধনীর মাধ্যমে পরিবর্তন এনেছে। একইভাবে ভারতের সংবিধানও ক্রমাগত সংশোধনের মাধ্যমে পরিবর্তিত হয়েছে, যদিও তাদের মৌলিক সাংবিধানিক পরিচয় অপরিবর্তিত রয়েছে।

পোস্ট-কলোনিয়াল রাষ্ট্রগুলোর অভিজ্ঞতা থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পাওয়া যায়। স্বাধীনতার পর প্রথম পর্যায়ে অনেক রাষ্ট্র নতুন জাতীয় পরিচয় প্রতিষ্ঠার জন্য সম্পূর্ণ নতুন সংবিধান গ্রহণ করলেও পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জনের সঙ্গে সঙ্গে তারা পুনর্লিখনের পরিবর্তে সংস্কারকে অগ্রাধিকার দেয়। কারণ ঘন ঘন সংবিধান পরিবর্তন রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করতে পারে, যেখানে একটি স্থিতিশীল সংবিধানের ধারাবাহিক সংস্কার গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করে।

সংবিধান সংস্কারের সর্বজনীন মডেল নেই

সংবিধান সংস্কারের জন্য কোনো একক বা সর্বজনীন মডেল নেই। যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, জার্মানি, দক্ষিণ আফ্রিকা, কেনিয়া কিংবা নেপাল-প্রতিটি দেশই তাদের রাজনৈতিক বাস্তবতা ও সাংবিধানিক ঐতিহ্য অনুযায়ী ভিন্ন পথ অনুসরণ করেছে। তবে সফল ও দীর্ঘস্থায়ী সংবিধান সংস্কারের ক্ষেত্রে কয়েকটি মৌলিক নীতি প্রায় সর্বত্রই অভিন্ন। সেগুলো হলো আইনি বৈধতা, রাজনৈতিক ঐকমত্য, জনগণের আস্থা এবং অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়া। এই চারটি উপাদানের সমন্বয়ই একটি সংবিধান সংস্কারকে কার্যকর ও গ্রহণযোগ্য করে তোলে।

সাধারণত প্রতিটি দেশের সংবিধানে সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়া নির্ধারিত থাকে। সংবিধান সংস্কারের আইনি বৈধতা নিশ্চিত করতে হলে সংবিধানে নির্ধারিত সংশোধনের পদ্ধতিই অনুসরণ করতে হবে। রাজনৈতিকভাবে জনপ্রিয় বা নীতিগতভাবে আকর্ষণীয় কোনো উদ্যোগও যদি সংবিধান নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে, তবে তার সাংবিধানিক বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ হবে। সংবিধানের প্রকৃত শক্তি তার আইনি বাধ্যবাধকতায় নয়; বরং জনগণের গ্রহণযোগ্যতায়। জনগণ যদি সংশোধিত সংবিধানকে নিজেদের সম্মিলিত আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন বলে মনে না করে, তবে সেই সংবিধান দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে পারে না। ইতিহাসে এমন বহু উদাহরণ রয়েছে, যেখানে আইনগতভাবে বৈধ হলেও জনসমর্থনের অভাবে সাংবিধানিক পরিবর্তন টেকসই হয়নি। আবার এমনও দেখা গেছে যে, দীর্ঘ রাজনৈতিক সংলাপ ও সামাজিক সমঝোতার ভিত্তিতে গৃহীত সংবিধান কয়েক দশক ধরে কার্যকর থেকেছে। এ কারণেই আধুনিক সংবিধানতত্ত্বে অংশগ্রহণমূলক সংবিধান সংস্কারকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, অংশগ্রহণমূলক সংবিধান প্রণয়নের কোনো অভিন্ন মডেল নেই। তবে সফল উদাহরণগুলোর মধ্যে একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য লক্ষণীয়—সংবিধান প্রণয়নের প্রতিটি ধাপে জনগণের মতামত গ্রহণ, রাজনৈতিক সংলাপ এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হয়েছে।

অংশগ্রহণ বলতে শুধু রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা বোঝায় না। বরং নাগরিক সমাজ, বিশ্ববিদ্যালয়, পেশাজীবী সংগঠন, নারী, তরুণ, জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘু, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, ব্যবসায়ী সংগঠন এবং বিভিন্ন সামাজিক গোষ্ঠী—সবাইকে অর্থবহভাবে সম্পৃক্ত করার মধ্যেই অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়ার সার্থকতা নিহিত। গণশুনানি, জনপরামর্শ, খসড়া সংবিধান প্রকাশ, লিখিত মতামত আহ্বান এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে পরামর্শ গ্রহণ এখন বিশ্বের বহু দেশে সাংবিধানিক সংস্কারের স্বীকৃত অনুশীলন।

সংবিধান সংস্কারের আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি

আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং তুলনামূলক সংবিধান গবেষণার আলোকে সংবিধান সংস্কার বা নতুন সংবিধান প্রণয়ন সাধারণত একটি অংশগ্রহণমূলক, স্বচ্ছ এবং ধাপে ধাপে পরিচালিত প্রক্রিয়া। যদিও সব দেশের জন্য অভিন্ন কোনো মডেল নেই, তবু অধিকাংশ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কিছু মৌলিক ধাপ অনুসরণ করা হয়। প্রথম ধাপে সংবিধান সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা ও উদ্দেশ্য নির্ধারণ করা হয়। এ লক্ষ্যে অনেক দেশে একটি স্বাধীন বিশেষজ্ঞ কমিশন বা উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়, যার দায়িত্ব হলো বিদ্যমান সংবিধানের সীমাবদ্ধতা বিশ্লেষণ, সংস্কারের ক্ষেত্রসমূহ চিহ্নিত করা এবং প্রাথমিক সুপারিশ প্রণয়ন করা।

পরবর্তী ধাপে কমিশন বা বিশেষজ্ঞ কমিটি জনপরামর্শের ভিত্তিতে একটি খসড়া সংবিধান বা সংশোধনী প্রস্তাব প্রস্তুত করে এবং তা জনসমক্ষে প্রকাশ করে। খসড়া প্রকাশের উদ্দেশ্য হলো নাগরিক, রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ, পেশাজীবী সংগঠন এবং অন্যান্য অংশীজনের মতামত গ্রহণ করে প্রস্তাবটিকে আরও গ্রহণযোগ্য করে তোলা। জনপরামর্শ শেষে খসড়া সংসদে উপস্থাপন করা হয়। অধিকাংশ গণতান্ত্রিক দেশে সংসদীয় স্থায়ী বা বিশেষ কমিটি প্রস্তাবটি পর্যালোচনা করে এবং ধারা-অনুচ্ছেদভিত্তিক আলোচনা, সংশোধনী প্রস্তাব, বিরোধী দলের মতামত ও বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ বিবেচনার মাধ্যমে একটি চূড়ান্ত সাংবিধানিক পাঠ প্রস্তুত করা হয়। দক্ষিণ আফ্রিকা (১৯৯৪-১৯৯৬), কেনিয়া (২০০০-২০১০), আইসল্যান্ড (২০১১) এবং চিলি (২০২১-২০২৩)-এর সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় জনপরামর্শ, খসড়া প্রকাশ এবং বিভিন্ন অংশীজনের সক্রিয় অংশগ্রহণ এই পদ্ধতির গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।

সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে বিশ্বের অধিকাংশ দেশে সাধারণ আইন প্রণয়নের তুলনায় অধিক কঠোর পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। অনেক রাষ্ট্রে সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ বা তিন-চতুর্থাংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদের উভয় কক্ষের অনুমোদন কিংবা ফেডারেল রাষ্ট্রে অঙ্গরাজ্য বা প্রদেশগুলোর সম্মতি প্রয়োজন হয়।

সংবিধানের মৌলিক বা কাঠামোগত পরিবর্তনের ক্ষেত্রে কিছু দেশে সংসদীয় অনুমোদনের পাশাপাশি গণভোটের মাধ্যমেও জনগণের প্রত্যক্ষ সম্মতি গ্রহণ করা হয়। আয়ারল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া ও সুইজারল্যান্ডে গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে গণভোট একটি সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা। আবার কেনিয়ার ২০১০ সালের সংবিধানও গণভোটের মাধ্যমে অনুমোদিত হয়। তবে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা দেখায়, গণভোট নিজেই কোনো সাফল্যের নিশ্চয়তা নয়। চিলিতে ২০২২ সালে নতুন সংবিধানের খসড়া গণভোটে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর পুনরায় আরেকটি খসড়া প্রস্তুত করা হলেও ২০২৩ সালেও জনগণ সেটি গ্রহণ করেনি।

কেনিয়া, নেপাল ও দক্ষিণ আফ্রিকা: অংশগ্রহণমূলক সংবিধান প্রণয়ন থেকে কী শেখার আছে

সংবিধান একটি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন হলেও তার প্রকৃত শক্তি কেবল আইনি বাধ্যবাধকতায় নয়; বরং জনগণের সম্মতি ও আস্থায় নিহিত। এ কারণেই আধুনিক বিশ্বে সংবিধান প্রণয়ন বা মৌলিক সাংবিধানিক সংস্কারকে একটি অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখা হয়। অর্থাৎ সংবিধান কেবল রাজনৈতিক নেতৃত্ব বা সংসদের একক সিদ্ধান্তের ফল হবে না; বরং নাগরিক সমাজ, বিশেষজ্ঞ, রাজনৈতিক দল এবং সাধারণ জনগণের মতামতের সমন্বয়ে একটি জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে গড়ে উঠবে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, অংশগ্রহণমূলক সংবিধান প্রণয়নের কোনো অভিন্ন মডেল নেই। তবে সফল উদাহরণগুলোর মধ্যে একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য লক্ষণীয়—সংবিধান প্রণয়নের প্রতিটি ধাপে জনগণের মতামত গ্রহণ, রাজনৈতিক সংলাপ এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হয়েছে।

দক্ষিণ আফ্রিকার ১৯৯৬ সালের সংবিধান এ ক্ষেত্রে একটি অনন্য উদাহরণ। বর্ণবাদ-পরবর্তী রাষ্ট্র গঠনের সময় দেশটি উপলব্ধি করেছিল যে, নতুন সংবিধান কেবল সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে প্রণীত হলে তা দীর্ঘমেয়াদে গ্রহণযোগ্য হবে না। তাই সংবিধান প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় ব্যাপক জনপরামর্শ, গণমাধ্যমে সচেতনতামূলক প্রচার, লাখ লাখ লিখিত মতামত গ্রহণ এবং সাংবিধানিক আদালতের তত্ত্বাবধান নিশ্চিত করা হয়। এর ফলে নতুন সংবিধানটি শুধু একটি রাজনৈতিক আপসের দলিল নয়; বরং জাতীয় পুনর্মিলনের ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।

কেনিয়ার অভিজ্ঞতাও একইভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ২০০৭ সালের নির্বাচন-পরবর্তী রাজনৈতিক সহিংসতা দেশটিকে উপলব্ধি করায় যে, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য নতুন সাংবিধানিক কাঠামো অপরিহার্য। এই প্রেক্ষাপটে একটি স্বাধীন বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি পূর্ববর্তী খসড়া, বিভিন্ন কমিশনের সুপারিশ এবং জনগণের মতামত বিশ্লেষণ করে একটি খসড়া সংবিধান প্রস্তুত করে। খসড়াটি জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়, জনগণকে মতামত দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়, সংসদীয় কমিটি তা পর্যালোচনা করে এবং শেষ পর্যন্ত ২০১০ সালে গণভোটের মাধ্যমে জনগণের প্রত্যক্ষ অনুমোদনের পর নতুন সংবিধান কার্যকর হয়। অর্থাৎ বিশেষজ্ঞ, সংসদ এবং জনগণ-এই তিন স্তরের অংশগ্রহণের মাধ্যমে সংবিধানটি বৈধতা অর্জন করে।

নেপালের সংবিধান প্রণয়নের পথ ছিল আরও দীর্ঘ ও জটিল। দীর্ঘ রাজনৈতিক সংঘাত এবং রাজতন্ত্রের অবসানের পর দেশটি একটি গণপরিষদ গঠন করে। গণপরিষদের বিভিন্ন বিষয়ভিত্তিক কমিটি দেশজুড়ে জনপরামর্শ গ্রহণ করে, নাগরিক সমাজ ও বিভিন্ন সামাজিক গোষ্ঠীর মতামত সংগ্রহ করে এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে দীর্ঘ আলোচনার মাধ্যমে বিতর্কিত বিষয়গুলোতে সমঝোতা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে। যদিও প্রক্রিয়াটি সময়সাপেক্ষ ছিল এবং নানা রাজনৈতিক সংকটের মুখোমুখি হয়েছিল, তবুও ২০১৫ সালে নেপাল একটি নতুন সংবিধান গ্রহণ করতে সক্ষম হয়। এটি প্রমাণ করে যে, অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়া কখনো কখনো দীর্ঘ হতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তা অধিক গ্রহণযোগ্য সাংবিধানিক কাঠামো গড়ে তুলতে সহায়ক।

কেনিয়ায় চূড়ান্ত সংবিধান গণভোটে অনুমোদিত হয়, আর নেপালে গণপরিষদের দীর্ঘ আলোচনার মধ্য দিয়ে সংবিধান গৃহীত হয়। দুটি অভিজ্ঞতাই প্রমাণ করে যে, সংবিধান যত বেশি জনগণের মতামত ও রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে গড়ে ওঠে, তার বৈধতা ও স্থায়িত্ব তত বেশি হয়। তবে অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়া মানেই যে ফলাফল নিশ্চিতভাবে সফল হবে, তা নয়। নেপালের সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা তার একটি উদাহরণ।

বিভিন্ন দেশের উদাহরণ থেকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পাওয়া যায়। প্রথমত, সংবিধান সংস্কারের আগে সমস্যাগুলো চিহ্নিত করার জন্য একটি নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য প্রক্রিয়া থাকা দরকার। দ্বিতীয়ত, খসড়া প্রণয়নের আগে এবং পরে উভয় পর্যায়েই জনপরামর্শ নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংলাপ ও সমঝোতা ছাড়া টেকসই সাংবিধানিক পরিবর্তন সম্ভব নয়। চতুর্থত, পুরো প্রক্রিয়াটি হতে হবে স্বচ্ছ, উন্মুক্ত এবং জবাবদিহিমূলক। সুতরাং সংবিধান সংস্কার প্রক্রিয়ার সাফল্য নির্ভর করে প্রস্তাবিত সংস্কারের গ্রহণযোগ্যতা, রাজনৈতিক ঐকমত্য এবং একটি অবাধ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বিশ্বাসযোগ্য প্রক্রিয়ার ওপর।

এই আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাগুলো বাংলাদেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে সংবিধান সংস্কার নিয়ে আলোচনা নতুন নয়; পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতা, প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা এবং জনগণের ক্রমবর্ধমান প্রত্যাশার প্রেক্ষাপটে এ ধরনের আলোচনা স্বাভাবিক। তবে সংবিধান সংস্কার যেন কেবল রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা বা ক্ষমতার পালাবদলের হাতিয়ার না হয়ে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতীয় সংলাপে পরিণত হয়, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সংবিধান কোনো সরকার বা রাজনৈতিক দলের দলিল নয়; এটি রাষ্ট্র ও জনগণের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত একটি মৌলিক সামাজিক চুক্তি।

  • ড. কে এম মহিউদ্দিন: অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত