বাড়ছে সহিংস অপরাধ

‘ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ড ব্যুরো’ প্রতিষ্ঠা প্রয়োজন

লেখা:
লেখা:
শাহারিয়া আফরিন

প্রকাশ : ২৮ এপ্রিল ২০২৬, ১২: ১৬
স্ট্রিম গ্রাফিক্স

দেশে খুনের মতো গুরুতর সহিংস অপরাধের মাত্রা উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। কিছু কিছু রোমহর্ষক ঘটনা জনমনে ব্যাপক আলোড়ন ও ভীতির সঞ্চার করছে। সম্প্রতি কুমিল্লায় দুর্বৃত্তদের হাতে একজন কাস্টমস কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন। টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে মাটি খুঁড়ে বস্তাবন্দি অবস্থায় এক গর্ভবতী নারী ও তার নবজাতকের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। ঘটনাগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে সর্বত্র তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে।

বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা ও গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী , ২০২৬ এর জানুয়ারি-মার্চ এই তিন মাসে দেশে ৮৫৪টি খুন সংঘটিত হয়েছে। এর মধ্যে শুধু রাজধানী ঢাকাতেই ঘটেছে ১০৭টি। একজন অপরাধ বিশ্লেষক হিসেবে বিগত বছরগুলোর সঙ্গে এই ভয়াবহ পরিসংখ্যানের তুলনা করলে যে চিত্র ফুটে ওঠে, তা শিউরে ওঠার মতো। এখনই সময় এই অপরাধ বৃদ্ধির পেছনের কারণগুলো গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা এবং এর টেকসই সমাধানের পথ খোঁজা।

অপরাধ বিজ্ঞানের একটি অন্যতম প্রতিষ্ঠিত তত্ত্ব হলো ‘রুটিন অ্যাক্টিভিটি থিওরি’ বা ‘সুযোগ তত্ত্ব’। একজন মানুষ অপরাধপ্রবণ হতে পারে। কিন্তু আইনের কঠোর প্রয়োগ, শাস্তির ভয় এবং সুশৃঙ্খল কাঠামোর কারণে সে অপরাধ করা থেকে বিরত থাকে। কিন্তু যখনই সে অপরাধ করার সুযোগ পায় আর বুঝতে পারে যে সে ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকতে পারবে, তখনই তার ভেতরের অপরাধী সত্তা জেগে ওঠে। উদাহরণস্বরূপ, অফিসে দুর্নীতির সুযোগ থাকলেও ধরা পড়ার ও জবাবদিহিতার ভয়ে অনেকেই তা করতে পারেন না। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে অপরাধীরা সেই সুযোগটি পেয়ে যাচ্ছে।

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পালাবদল ঘটেছে। এর সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি লেগেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর। বিভিন্ন হামলা, মামলা, থানা ভাঙচুর ও অস্ত্র লুটের কারণে পুলিশ বাহিনী মনস্তাত্ত্বিক ও কাঠামোগতভাবে চরম বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল। অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে থানা বা মাঠে পুলিশের যে দৃশ্যমান, শক্তিশালী ও আত্মবিশ্বাসী উপস্থিতি থাকার কথা, তা এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত করা যায়নি। পুলিশের এই দুর্বল অবস্থানের সুযোগটিই লুফে নিয়েছে অপরাধীরা। চোখের সামনেই থানার সামনে মারামারি, দিনেদুপুরে ছিনতাই বা মব জাস্টিস-এর মতো ঘটনা প্রমাণ করে যে, আইন শৃঙ্খলা প্রয়োগকারী সংস্থার কমান্ড এন্ড কন্ট্রোল এখনো নিশ্ছিদ্র নয়। আমাদের পুলিশিং ব্যবস্থায় জনবল, জবাবদিহিতা ও কাঠামোগত নানা সংকট রয়েছে। এই দুর্বল ব্যবস্থার সুযোগ নিয়েই অপরাধীরা বেপরোয়া হয়ে উঠছে।

সরকার পরিবর্তনের ডামাডোলের মধ্যে দেশের বিভিন্ন কারাগার থেকে বেশ কয়েকজন শীর্ষ সন্ত্রাসী, সাজাপ্রাপ্ত আসামি ও জঙ্গি পালিয়ে যায়। অনেকেই আবার রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সুযোগে জামিনে বের হয়ে এসেছে। পাশাপাশি, জুলাই-আগস্টে থানা থেকে লুট হওয়া বিপুল পরিমাণ আগ্নেয়াস্ত্রের একটি বড় অংশ এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। অবৈধ অস্ত্র এবং চিহ্নিত অপরাধীদের এই অবাধ বিচরণ বর্তমান অপরাধ বৃদ্ধির সাথে সরাসরি যুক্ত।

বর্তমানে ঢাকা শহরসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে গ্যাং কালচার, পাড়া-মহল্লার কিশোর গ্যাং এবং সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্র অত্যন্ত সক্রিয় হয়ে উঠেছে। চাঁদাবাজি, এলাকা দখল ও মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এই চক্রগুলো নির্দিষ্ট চেইন অব কমান্ড মেনে অপরাধ সংঘটিত করছে। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, শীর্ষ সন্ত্রাসীরা সশরীরে মাঠে থাকছে না। তাদের নির্দেশনায় মাঠপর্যায়ের কর্মীরা খুন বা চাঁদাবাজির মতো ঘটনা ঘটাচ্ছে। পুলিশ হয়তো মাঠের দু-একজনকে গ্রেপ্তার করছে, কিন্তু গডফাদাররা ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যাচ্ছে। ফলে অপরাধের শেকড় কাটা পড়ছে না।

অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়া বা ‘রিঅ্যাক্টিভ পুলিশিং’-এর চেয়ে এখন বেশি প্রয়োজন ‘প্রোঅ্যাক্টিভ’ বা প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা। এর জন্য দেশজুড়ে সিসিটিভি মনিটরিং, ডিজিটাল সার্ভেইল্যান্স, ফরেনসিক ল্যাবের আধুনিকায়ন এবং ক্রাইম ম্যাপিংয়ের মতো প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।

বর্তমান অপরাধ বৃদ্ধির পেছনে সামষ্টিক অর্থনীতির প্রভাব কোনোভাবেই এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। দেশে বর্তমানে সাধারণ মূল্যস্ফীতি প্রায় ১০ শতাংশের কাছাকাছি। খাদ্য মূল্যস্ফীতি আরও বেশি। এর সাথে যুক্ত হয়েছে বেকারত্ব এবং চরম অর্থনৈতিক বৈষম্য। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষ সৎ পথে উপার্জন করে সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছে।

অপরাধ বিজ্ঞানী রবার্ট কে. মার্টন তাঁর ‘স্ট্রেইন থিওরি’-তে বলেছেন, সমাজ যখন মানুষকে সফল হওয়ার চাপ দেয় কিন্তু সেই সাফল্য অর্জনের বৈধ উপায় বা সুযোগ সবার জন্য সমান থাকে না, তখন মানুষ বাধ্য হয়ে অবৈধ পথের আশ্রয় নেয়। এই ইকোনমিক হার্ডশিপ-এর কারণে নিম্ন আয়ের মানুষের একটি বড় অংশ আজ ছিনতাই, চুরি, ডাকাতি, এমনকি ভাড়ায় খুন করার মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। সহজে ও শর্টকাটে টাকা উপার্জনের এই বিকৃত মানসিকতা সমাজে এক ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে।

পাশাপাশি, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং সামাজিক কাঠামোর ভাঙন অপরাধ বৃদ্ধির অন্যতম অনুঘটক। আমাদের পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও সমাজের যে নৈতিক শিক্ষা দেওয়ার কথা ছিল, তা আজ চরমভাবে ব্যর্থ হচ্ছে। সমাজে নৈতিকতার এই শূন্যতা তৈরি হলে মানুষ বিপথগামী আচরণ করে। তুচ্ছ ঘটনায় স্বামী স্ত্রীকে, ভাই ভাইকে কিংবা বন্ধু বন্ধুকে খুন করছে। মানুষের মধ্যে সহনশীলতা কমে গেছে। বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে মানুষ আইনের প্রতি শ্রদ্ধা হারিয়ে নিজের হাতে আইন তুলে নিচ্ছে, যার একটা নগ্ন প্রকাশ হলো দেশজুড়ে ঘটে চলা ‘মব জাস্টিস’ বা গণপিটুনির ঘটনাগুলো।

আমাদের বিচারব্যবস্থা ও ফৌজদারি আইনগুলো মান্ধাতার আমলের। আমরা এখনো ১৮৬০ সালের পেনাল কোড বা ১৯৪৩ সালের পুলিশ রেগুলেশনস (পিআরবি) দিয়ে চলছি। অথচ অপরাধের ধরন এখন সম্পূর্ণ পাল্টে গেছে। অপরাধীরা এখন সাইবার স্পেস, ডার্ক ওয়েব, ক্রিপ্টোকারেন্সি ও অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি বা এনআইডি সার্ভার থেকে তথ্য ফাঁসের ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে অপরাধীরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চেয়ে অন্তত দুই ধাপ এগিয়ে।

অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়া বা ‘রিঅ্যাক্টিভ পুলিশিং’-এর চেয়ে এখন বেশি প্রয়োজন ‘প্রোঅ্যাক্টিভ’ বা প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা। এর জন্য দেশজুড়ে সিসিটিভি মনিটরিং, ডিজিটাল সার্ভেইল্যান্স, ফরেনসিক ল্যাবের আধুনিকায়ন এবং ক্রাইম ম্যাপিংয়ের মতো প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। একসময় দেশে এসিড নিক্ষেপ মহামারির রূপ নিয়েছিল। কঠোর আইন প্রণয়ন ও তার দ্রুত প্রয়োগের মাধ্যমে সেটি প্রায় শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। সদিচ্ছা ও আধুনিকায়ন থাকলে বর্তমান সহিংস অপরাধগুলোও নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

সবচেয়ে বড় হতাশার জায়গা হলো—বাংলাদেশে অপরাধ সংক্রান্ত কোনো পূর্ণাঙ্গ ও আধুনিক ডেটাবেজ নেই। দেশে কোথায়, কী কারণে, কোন বয়সের মানুষ কোন ধরনের অপরাধ বেশি করছে, তার কোনো সঠিক পরিসংখ্যান বা ‘ক্রাইম প্যাটার্ন অ্যানালাইসিস’ নেই। অনেক অপরাধ তো থানায় রেকর্ডই হয় না। এরকম অপরাধকে অপরাধ বিজ্ঞানের ভাষায় ‘ডার্ক ফিগার অব ক্রাইম’ বলা হয়। অপরাধ বিজ্ঞানের গবেষক বা সমাজবিজ্ঞানীরাও গবেষণা করতে গিয়ে সঠিক ডেটার অভাবে পড়েন। ডেটা বা তথ্য ছাড়া নীতিনির্ধারকরা কীভাবে সঠিক পলিসি বানাবেন? রোগের মূল জায়গা চিহ্নিত করতে না পারলে তো সঠিক ওষুধ প্রয়োগ সম্ভব নয়। বাংলাদেশে অবিলম্বে একটি স্বাধীন ‘ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ড ব্যুরো’ প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন।

এখন একটি প্রশ্ন সামনে আসে তা হলো- অপরাধ নির্মূলে আমরা কি শুধুই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর নির্ভর করব? উত্তর হলো—না। আমেরিকার মতো উন্নত দেশে পুলিশের বিপুল জনবল ও অত্যাধুনিক প্রযুক্তি রয়েছে। সেখানেও অপরাধ শূন্য হয়নি। তাই আমাদের প্রয়োজন একটি সামগ্রিক অ্যাপ্রোচ।

পরিবার হচ্ছে মানুষের প্রাথমিক সামাজিকীকরণের জায়গা। ছোটবেলা থেকেই পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে নৈতিকতার বীজ বপন করতে হবে। পাশাপাশি, কমিউনিটি পুলিশিং ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। পাড়ার মুরুব্বি, শিক্ষক, ইমাম ও সমাজের ইনফ্লুয়েন্সারদের মাধ্যমে দুর্নীতি, কিশোর গ্যাং ও মাদকের বিরুদ্ধে পাড়ায় পাড়ায় সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। বিচারব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালগুলোর কার্যকারিতা বাড়াতে হবে, যাতে অপরাধী বুঝতে পারে যে অপরাধ করলে শাস্তি অবধারিত।

অপরাধ নিয়ন্ত্রণ কোনো জাদুর কাঠি নয় যে, সরকার চাইলেই একদিনে সব ঠিক হয়ে যাবে। এর জন্য প্রয়োজন রাষ্ট্র, প্রশাসন, পুলিশ এবং নাগরিকদের সম্মিলিত, বিজ্ঞানভিত্তিক ও দীর্ঘমেয়াদি প্রচেষ্টা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে দ্রুত তাদের পেশাদারিত্ব ও মনোবল ফিরে পেয়ে দৃশ্যমান হতে হবে, পাশাপাশি রাষ্ট্রকে কাজ করতে হবে অর্থনৈতিক বৈষম্য কমানো ও সামাজিক সুবিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে। তবেই হয়তো আমরা আগামী প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ, মানবিক ও বাসযোগ্য বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারব। নয়ত, অপরাধের এই ঊর্ধ্বমুখী গ্রাফ অচিরেই আমাদের গোটা রাষ্ট্রকাঠামোকেই ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেবে।

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, ক্রিমিনোলজি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সম্পর্কিত