কেন ফিরে ফিরে আসে নব্বইয়ের দশক

লেখা:
লেখা:
মাহমুদুর রহমান

প্রকাশ : ২৭ এপ্রিল ২০২৬, ১৯: ৫০
স্ট্রিম গ্রাফিক

রামধনু, ঝালমুড়ি, হাফ টিকিট, আব্বুলিশ

বিটনুন আর চুরমুরের গল্প বল

কলকাতার ‘ওপেন টি বায়োস্কোপ’ সিনেমার কল্যাণে এই গান না শোনা মানুষের সংখ্যা কম। আর গানটা শুনলেই আমরা অনেকেই স্মৃতিকাতর হই। মনে পড়ে যায়, আমাদের হারিয়ে যাওয়া কৈশোরের কথা। হতে পারে সেটা শহুরে জীবন কিংবা গ্রামীণ, অথবা মফস্বলী—আমাদের মনে পড়বে সেইসব বিকেলের কথা।

আজকের দিনে নানান ছোটাছুটির মধ্যেও সোশ্যাল মিডিয়ায় হুট করে কিছু ছবি দেখে মনে পড়ে হারানো সেই সময়ের কথা। সুগন্ধী ইরেজার, পেন্সিল বক্স, ভিডিও গেমের দোকান, সিআরটি মনিটর ইত্যাদি ছবি দিয়ে মনে করানো হয় নব্বইয়ের দশকের কথা। গল্প, গান, আড্ডাতেও ফিরে আসে নব্বইয়ের দশক। যেন, যা কিছু সোনালী সবই ছিল তখন। সেটা কি হতে পারে? বস্তুত নব্বইয়ের দশকের যাপনটাই আমাদের কাছে ভাস্বর করে রেখেছে সময়টাকে।

নব্বইয়ের দশক আসলে নির্দিষ্ট কোনো সময় না। অর্থাৎ কেবল ১৯৯০-১৯৯৯ সময়কাল ‘নব্বইয়ের দশক’ না। এর আগের এবং পরের কিছু সময়ও ‘নব্বইয়ের দশক’কে ধারণ করে। মূলত কিছু চর্চা, অভ্যাস, রীতি, জীবন-বাস্তবতা আর যাপনের মিশ্রণই নব্বইয়ের দশক। তাই সেই সময়ে কিশোর থাকা মানুষেরাই কেবল ‘নাইন্টিজ কিড’ না, সেই যাপনে দিন কাটানো মানুষেরাও নিজেদের ‘নাইন্টিজ কিড’ মনে করে।

তারপরও আরেকটা প্রশ্ন ওঠে। নব্বইয়ের দশকই কেন বারবার ফিরে আসে? আশির দশক, সত্তরের দশক তো ফিরে আসে না। কিংবা এই শতকের কোনো দশক কি এভাবে উদ্‌যাপিত হবে? অবস্থাদৃষ্টে তো মনে হয় না। তাহলে কী আছে নব্বইয়ের দশকে।

আরো সহজ করে বলা যাক। নাইন্টিজ কিড তাদেরই হওয়ার কথা যাদের বয়স নব্বইয়ের দশকে অন্তত ৭-৮ ছিল। অর্থাৎ যাদের জন্ম ১৯৯০ সালে তাঁরা ১৯৯৭-৯৮ সালে এই বয়সে পৌঁছেছিলেন। তাহলে তাঁরা নব্বইয়ের দশক যাপন করেননি। যাপন করেছেন যাদের জন্ম আশির দশকের মাঝামাঝি সময় বা তার পরপর। আর তা হলেই কেবল নব্বইয়ের দশকে সময়ের হালহকিকত বোঝার মতো বয়সে থাকবেন। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকে জন্ম নেওয়া অনেকেও নিজেদের ‘নাইন্টিজ কিড’ বলেন। কারণ জেন-জি হলেও নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকে জন্ম নেওয়া এই ‘নাইন্টিজ কিড’রা নব্বইয়ের দশকের আবহে বড় হয়েছেন।

নব্বইয়ের দশক নিয়ে নানা আবেগ ও কথা নিয়ে আমি ব্যক্তিগতভাবে একটা সময় বিরক্ত ছিলাম। কারণ, নব্বইয়ের দশক নিয়ে যারা আলাপ করেন, সেই আলাপ থেকে নব্বইয়ের দশককে ইউটোপিয়া মনে হয়। মানে উপস্থাপনই করা হয় সেভাবে। এ নিয়ে আমাদের বন্ধুমহলে আলাপ হয়েছে অনেক। ‘আমরা’ কারা? আমাদের জন্ম নব্বইয়ের প্রথমার্ধে। আমাদের অনেকেই টিনটিনের কমিকস পড়েনি। অনেকেই স্যাটেলাইট টেলিভিশন পেয়েছে ২০০০-এর প্রথম দশকের দ্বিতীয়ার্ধে। তাঁরা সবাই ‘পিয়া বাসান্তী’ তো দূর, ‘ওয়ারফেজ’ও শোনেনি।

তাই প্রশ্ন জাগে, নব্বইয়ের দশক নিয়ে এত কথা হওয়ার কারণ কী? এর অন্যতম কারণ জানতে বা বুঝতে, যারা নব্বইয়ের দশক নিয়ে নস্টালজিয়ায় ভোগের বা কথা বলেন তাঁদের বয়সের দিকে তাকাতে হবে। এখন যারা সাহিত্য করছেন, গান বানাচ্ছেন, সিনেমা বানাচ্ছেন তাঁরা মূলত বড় হয়েছেন নব্বইয়ের দশকে। ফলে তাঁদের কাজের মধ্যে ঘুরেফিরে আসে নব্বইয়ের সময়টা। পৃথিবীর তাবড় সাহিত্যিক, শিল্পী, সিনেমা নির্মাতা তাঁদের শৈশব-কৈশোরের স্মৃতি ও যাপন দ্বারা প্রভাবিত। আর বাঙালির তো নস্টালজিয়া নামক জিনিসটা আছেই। আমরা সেটাকে ব্যবহার করি জাবড় কাটার মতো। সে কারণে নব্বইয়ের দশক নিয়ে আলাপ অনেক সময় বিরক্তিকর হয়ে ওঠে।

নব্বইয়ের দশক নিয়ে এত কথা হওয়ার কারণ কী? এর অন্যতম কারণ জানতে বা বুঝতে, যারা নব্বইয়ের দশক নিয়ে নস্টালজিয়ায় ভোগের বা কথা বলেন তাঁদের বয়সের দিকে তাকাতে হবে। এখন যারা সাহিত্য করছেন, গান বানাচ্ছেন, সিনেমা বানাচ্ছেন তাঁরা মূলত বড় হয়েছেন নব্বইয়ের দশকে। ফলে তাঁদের কাজের মধ্যে ঘুরেফিরে আসে নব্বইয়ের সময়টা।

তারপরও আরেকটা প্রশ্ন ওঠে। নব্বইয়ের দশকই কেন বারবার ফিরে আসে? আশির দশক, সত্তরের দশক তো ফিরে আসে না। কিংবা এই শতকের কোনো দশক কি এভাবে উদ্‌যাপিত হবে? অবস্থাদৃষ্টে তো মনে হয় না। তাহলে কী আছে নব্বইয়ের দশকে।

অনেক কিছুই আছে। নব্বইয়ের দশক মূলত বাংলাদেশের সবচেয়ে স্থির সময়। রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক—সব দিক থেকেই এই সময়টা ছিল স্থির। নতুনের বার্তাও এনেছিল। বাংলাদেশ স্বাধীন হলো ১৯৭১ সালে। যুদ্ধদগ্ধ দেশ। তারপর দুর্ভিক্ষ, রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড, সামরিক শাসন, আবার রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড, আবার সামরিক শাসন। এই সবকিছু শেষ করে দেশটা থিতু হলো নব্বইয়ের দশকে। দেশে গণতন্ত্র এল। রাজনৈতিক অবস্থা শান্ত হলো। অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিরও বার্তা পাওয়া গেল। ফলে মানুষ চিন্তা করতে পারল কিছু বিষয় নিয়ে। সাহিত্য করার সুযোগ এল, গান করার সুযোগ এল, মাঠে খেলা সহজ হলো।

২০০০ সাল পরবর্তী সময়ে শুরু হয়েছিল নানা রকম প্রতিযোগিতা। শিক্ষা, জীবনযাপন, চর্চা সবখানেই প্রতিযোগিতা। বস্তুগত উন্নয়নও ছিল। স্যাটেলাইট টেলিভিশন নব্বইয়ের দশকে এনেছিল বিনোদনের নতুন সম্ভাবনা। পরের দশকে স্যাটেলাইট টিভি আরও জনপ্রিয় হওয়ার পাশাপাশি মোবাইলের কারণে মানুষ যুক্ত হলো একে অপরের সঙ্গে। অর্থাৎ বেড়ে গেল গতি। গতির কারণে মানুষের মধ্যে স্থিতি গেল কমে। ইন্টারনেট সহজলভ্য হয়ে সেই গতি আরো বাড়ল।

নব্বইয়ের দশকে মানুষের তাড়া ছিল কম। এই এখন, ঢাকা শহরে আমরা প্রতিদিন ছুটতে থাকি। শহরের পাশাপাশি এখন মফস্বল-গ্রামের মানুষও ছোটে। কিন্তু নব্বইয়ের দশকে খোদ রাজধানীতেই এই ছোটাছুটি ছিল না। গ্লোবাল ওয়ার্মিং এত বাড়েনি। আবহাওয়া ছিল মনোরম। ঢাকায় ছিল খেলার মাঠ, স্কুলেও ছিল। সেই সময়টা তরুণরা নিজেদের সঙ্গে সময় কাটাতো। বন্ধুরা গ্রুপ চ্যাটে আড্ডা দিত না, তাঁরা একে অপরকে টেনে নিয়ে যেত মাঠে, ক্লাবে, চায়ের দোকানে। সিনেমা হল ছিল। নিয়মিত সিনেমা দেখতে যেত মানুষ। এত করপোরেট ছিল না আমাদের বাবা-মা। আবার, তাঁদের বাবা মায়ের মতো রক্ষণশীলও ছিল না। পরিবারকে সময় দিতেন তাঁরা।

নব্বইয়ের দশকের নস্টালজিয়া বেশি কাজ করে মধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্যে। আসলে বাংলাদেশের শহুরে ও মফস্বলের মধ্যবিত্ত-শিক্ষিত শ্রেণিটি তৈরি হয়েছিল এই সময়ের কিছু আগে। যেটা আগের অনুচ্ছেদে বলা হলো, একটা পারিবারিক পরিমণ্ডল ছিল। বাবা অফিস করে ফিরতেন সন্ধ্যায়। ছেলে-মেয়েদের নিয়ে বসতেন। চা খেতে খেতে হয়ত স্ত্রীর সঙ্গে খুনসুটিও করতেন স্বামী। ছুটির দিনে ঘুরতে বের হওয়া, তিন চার মাসে একবার শহরের বাইরে ঘুরতে যাওয়া, বইমেলা, সাহিত্য পাঠ, পহেলা বৈশাখের নাগরিক উদ্‌যাপনের সূচনা এই সময়েই হয়েছিল।

আমরা এখনও নানা রকম যাপন-উদ্‌যাপন করি। কিন্তু এত দ্রুত ও এত ছোটাছুটি থাকে যে সেসব পূর্ণাঙ্গ যাপন হয় না। আমাদের মেলায় যাওয়া, প্রদর্শনী দেখা এখন কেবল ছবি তুলে পোস্ট করার জন্যই। তাই আনন্দও আমাদের ক্ষণস্থায়ী। তাই কোনোকিছু নিয়েই বেশিদিন উচ্ছ্বাস দেখা যায় না। বেশি সময় দেখা যায় না। সারা বিশ্বেরই এই অবস্থা। গতিশীলতা আমাদের স্মৃতিকাতর করে না। আমাদের যাপনও গতিশীল। আমাদের জীবনে গতি কমেছিল কিছুটা কোভিডের সময়। সেই সময়টা আবার যেহেতু মহামারীকাল, সেটা আমরা এড়িয়ে যাই। তাই ফিরে আসার সম্ভাবনা কম।

মানুষ মূলত স্মৃতি নিয়ে বাঁচে। সেই স্মৃতি হতে পারে টিনটিনের বই, সুগন্ধী ইরেজার, শাকালাকা বুমবুম, লোডশেডিং সন্ধ্যায় ছাদে গিয়ে কানামাছি খেলা। আর এই সবকিছু সম্ভব হয়েছিল আমাদের চর্চা আর যাপনের কারণে। নব্বইয়ে দশকে যারা কিশোর-তরুণ ছিলেন, তাঁরা সময়টা যাপন করেছেন। এর সব অনুষঙ্গও যাপন করেছেন। এর আগে বা পরে এমন যাপনের সুযোগ আসেনি। সেই যাপনই জীবন্ত করে রেখেছে নব্বইয়ের দশককে।

সম্পর্কিত