leadT1ad

ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক: ট্রাম্পের মুখরক্ষা নাকি ইরানের কৌশলগত বিজয়

প্রকাশ : ১৪ জুন ২০২৬, ১৬: ৩৭
স্ট্রিম গ্রাফিক

চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ সামরিক আগ্রাসনের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে যে রক্তক্ষয়ী ইরান যুদ্ধের সূচনা হয়েছিল, তা দীর্ঘ সাড়ে তিন মাস পর নাটকীয় মোড় নিয়েছে। কাতার ও পাকিস্তানের সফল মধ্যস্থতায় ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে চূড়ান্ত হয়েছে একটি অন্তর্বর্তীকালীন যুদ্ধবিরতি ও শান্তি চুক্তির খসড়া, যা আন্তর্জাতিক কূটনীতির টেবিলে ‘ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক’ নামে পরিচিতি পেয়েছে।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা অনুযায়ী, রোববারই ডিজিটাল পদ্ধতিতে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হতে যাচ্ছে, যা হরমুজ প্রণালি উন্মুক্তকরণ এবং ইরানের ওপর থেকে মার্কিন নৌ-অবরোধ প্রত্যাহারের পথ সুগম করবে। তবে এই আকস্মিক নীতি পরিবর্তন ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের দীর্ঘদিনের কৌশলগত সম্পর্কের ফাটলকে যেমন নগ্নভাবে জনসমক্ষে এনেছে, তেমনি গাজা ও লেবানন যুদ্ধ ঘিরে আরব বিশ্বের প্রকাশ্য নিন্দা ও আড়ালে বাণিজ্য টিকিয়ে রাখার দ্বৈততা বা ভণ্ডামির বাস্তব চিত্রকেও নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।

বিশ্ব রাজনীতির এই ক্রান্তিলগ্নে দাঁড়িয়ে আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—এই আকস্মিক চুক্তি কি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য কেবলই একটি মুখরক্ষার মরিয়া চেষ্টা, নাকি এটি তেহরানের জন্য ‘কৌশলগত বিজয়’? একদিকে আন্দ্রিয়া দেসির মতো বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই যুদ্ধ আমেরিকার জন্য একটি কৌশলগত বিপর্যয় হয়ে উঠেছিল, যা ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা ধসিয়ে দিয়ে আসন্ন নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে তার রাজনৈতিক অস্তিত্বকে তীব্র ঝুঁকিতে ফেলেছিল; ফলে তীব্র অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংকট ও মূল্যস্ফীতি থেকে বাঁচতে ট্রাম্পের সামনে সম্মানজনকভাবে বেরিয়ে আসার আর কোনো বিকল্প পথ ছিল না।

অন্যদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এই চুক্তিকে তেহরানের বিজয় হিসেবে ঘোষণা করেছেন, কারণ ইরান তার পারমাণবিক অবকাঠামো সম্পূর্ণ সুরক্ষিত ও অক্ষুণ্ন রেখেই দীর্ঘ ৪৭ বছরের ইতিহাসে প্রথমবার আমেরিকার কাছ থেকে লিখিতভাবে নিজেদের সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের কাছ থেকে কোটি কোটি ডলারের ক্ষতিপূরণ ফান্ড আদায় করে নিতে সক্ষম হয়েছে, যা এককথায় ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের যুদ্ধংদেহী নীতির চূড়ান্ত পরাজয়কে নির্দেশ করে।

ট্রাম্পের মুখরক্ষার মরিয়া চেষ্টা: অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক চাপ

আমেরিকান ইউনিভার্সিটি অব রোমের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক আন্দ্রিয়া দেসি আল-জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, এই ইরান যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য চরম ‘কৌশলগত বিপর্যয়’ হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। সামরিক পরাশক্তি হওয়া সত্ত্বেও ওয়াশিংটন এই যুদ্ধ থেকে কোনো স্পষ্ট ভূ-রাজনৈতিক ফায়দা তুলতে পারেনি। এই গভীর পঙ্কিলতা থেকে একটি সম্মানজনক ও নিরাপদ এক্সিট রুট বা বেরিয়ে আসার পথ খুঁজছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। শেষ পর্যন্ত ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক নামের এই চুক্তিটিকে তিনি নিজের একটি বিশাল কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে বিশ্ববাসীর কাছে উপস্থাপন করছেন, যা মূলত তার জন্য একটি মোক্ষম ‘মুখরক্ষার’ সুযোগ এনে দিয়েছে।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ওপর এই সমঝোতায় পৌঁছানোর জন্য অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক পর্যায় থেকে যে বহুমুখী ও তীব্র চাপ কাজ করছিল, তার মূল ক্ষেত্রগুলো হলো:

অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংকট ও বিশ্ববাজারের অস্থিরতা

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই বিশ্ব অর্থনীতিতে এর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করে। মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম প্রধান জ্বালানি সরবরাহকারী দেশ ইরানের ওপর মার্কিন ও ইসরাইলি যৌথ আগ্রাসনের কারণে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম রাতারাতি বেড়ে যায়। আমেরিকার অভ্যন্তরীণ বাজারে এর প্রভাব ছিল আরও ভয়াবহ। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির সরাসরি ধাক্কা লাগে মার্কিন উৎপাদন ও পরিবহন খাতে, যার ফলে দেশটিতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যস্ফীতি পূর্বের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যায়। সাধারণ মার্কিন নাগরিকদের জীবনযাত্রার ব্যয় অসহনীয় পর্যায়ে চলে যাওয়ায় ট্রাম্প প্রশাসনের অর্থনৈতিক নীতি তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে এবং যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করার অর্থনৈতিক সক্ষমতা ওয়াশিংটনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।

নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন ও রাজনৈতিক অস্তিত্বের লড়াই

যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির হিসাব-নিকাশ এই যুদ্ধবিরতির পেছনে সবচেয়ে বড় নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে। অপ্রয়োজনীয় ও ব্যয়বহুল এই মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে মার্কিন ভোটারদের একাংশ, বিশেষ করে তরুণ সমাজ ও যুদ্ধবিরোধী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে ডোনাল্ড ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পেতে থাকে। সবচেয়ে বড় ভয়ের কারণ হলো আসন্ন নভেম্বরের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচন। বিশ্লেষকদের মতে, এই জনপ্রিয়তার ধস নিয়ে যদি ট্রাম্প নির্বাচনে যেতেন, তবে কংগ্রেসে তার দল বড় ধরনের রাজনৈতিক বিপর্যয়ের মুখে পড়ত। মার্কিন আইনসভায় নিয়ন্ত্রণ হারানোর এই আসন্ন বিপর্যয় এড়াতে এবং নিজের রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতেই ট্রাম্পের সামনে যেকোনো উপায়ে এই যুদ্ধ থামানো ছাড়া আর কোনো বিকল্প চয়েস ছিল না।

হোয়াইট হাউসের বিবৃতির বৈপরীত্য ও মনস্তাত্ত্বিক চাপ

যুদ্ধের পুরোটা সময়জুড়ে হোয়াইট হাউস এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ব্যক্তিগত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম 'ট্রুথ সোশ্যাল'-এর বিবৃতিগুলোর দিকে তাকালে এক চরম অস্থিরতা ও নড়বড়ে অবস্থান স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ট্রাম্প এক অদ্ভুত দ্বিমুখী নীতি অবলম্বন করছিলেন। একদিকে তিনি গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বারবার দাবি করছিলেন যে তেহরানের সাথে শান্তি চুক্তি প্রায় চূড়ান্ত এবং আর মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই আনুষ্ঠানিক চুক্তি স্বাক্ষর হতে পারে। কিন্তু এর ঠিক পরক্ষণেই আবার তার সুর বদলে যেত। তিনি ইরানকে পুরোপুরি ধ্বংস করার হুমকি দিয়ে বলতেন, চুক্তিতে রাজি না হলে ইরানের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ খার্গ দ্বীপ বা তাদের ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে মার্কিন বি-২ স্টিলথ বোমারু বিমান দিয়ে চূড়ান্ত হামলা চালানো হবে। মার্কিন কমান্ডিং পজিশন থেকে একই সাথে শান্তি ও পারমাণবিক ধ্বংসযজ্ঞের এই পরস্পরবিরোধী এবং অসামঞ্জস্যপূর্ণ বক্তব্যগুলোই প্রমাণ করে যে, ইরানকে দমাতে না পেরে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজে কতটা তীব্র মনস্তাত্ত্বিক ও কৌশলগত চাপের মধ্যে দিনাতিপাত করছিলেন।

ইরানের কৌশলগত বিজয়: খসড়া চুক্তির সমীকরণ

ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারকের চূড়ান্ত খসড়াটি সামনে আসার পর ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের বড় একটি অংশ এটিকে তেহরানের একটি বড় ধরনের কূটনৈতিক ও কৌশলগত বিজয় হিসেবে দেখছেন। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সাথে ঘোষণা করেছেন:

‘এই সংঘাতের মধ্য দিয়ে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান আরও শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে এই যুদ্ধে কার্যত ইরানই বিজয়ী।’

আরাগচির এই আপাতদৃষ্টিতে আক্রমণাত্মক কিন্তু আত্মবিশ্বাসী দাবির পেছনে আন্তর্জাতিক কূটনীতির টেবিল ও চুক্তির খসড়ায় থাকা ১৪টি ধারার একটি শক্তিশালী ও সুবিন্যস্ত প্যাকেজ রয়েছে। এই সমীকরণগুলো নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করলে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, ইরান তার সামরিক ও কূটনৈতিক অবস্থান থেকে বিন্দুমাত্র বিচ্যুত না হয়ে কীভাবে ওয়াশিংটনকে শর্ত মানতে বাধ্য করেছে। আরাগচির দাবির সপক্ষে মূল ক্ষেত্রগুলো নিচে বিশদভাবে বিশ্লেষণ করা হলো:

সার্বভৌমত্বের ঐতিহাসিক স্বীকৃতি

ইসলামী বিপ্লবের পর দীর্ঘ ৪৭ বছরের ইতিহাসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্পর্ক সবসময়ই ছিল চরম বৈরিতাপূর্ণ ও অবিশ্বাসের। আরাগচির ভাষ্যমতে, এই প্রথম কোনো আন্তর্জাতিক চুক্তির দলিলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র লিখিতভাবে এটি স্বীকার করতে বাধ্য হচ্ছে যে, তারা "ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের সার্বভৌমত্বকে সম্মান করে"। ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থা ও তাদের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর এই আনুষ্ঠানিক এবং লিখিত স্বীকৃতি তেহরানের জন্য একটি বিশাল রাজনৈতিক বিজয়। এটি প্রমাণ করে যে, সামরিক শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে ইরানের শাসনব্যবস্থার পতন বা রেজিম চেঞ্জের যে মার্কিন স্বপ্ন ছিল, তা এই যুদ্ধের মাধ্যমে চিরতরে সমাহিত হয়েছে।

পারমাণবিক ইস্যুতে ছাড় না দেওয়া ও অবকাঠামো রক্ষা

যুদ্ধ শুরুর প্রাক্কালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মূল লক্ষ্যই ছিল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে সমূলে বিনাশ করা। হোয়াইট হাউস থেকে প্রথমে শর্ত দেওয়া হয়েছিল যে, ইরানকে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে, উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ধ্বংস বা চিরতরে দেশ থেকে সরিয়ে ফেলতে হবে এবং দীর্ঘমেয়াদি কঠোর আন্তর্জাতিক পরিদর্শনের অনুমতি দিতে হবে। কিন্তু তেহরান শুরুতেই এই শর্ত কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করে। ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারকের বর্তমান রূপরেখা অনুযায়ী, পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধের মতো অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও জটিল বিষয়গুলো প্রথম ধাপের যুদ্ধবিরতি থেকে সরিয়ে পরবর্তী ৬০ দিনের কারিগরি ও রাজনৈতিক আলোচনার টেবিলে স্থানান্তর করা হয়েছে। এর অর্থ দাঁড়ায়, ইরান তার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের স্টকপাইল এবং সামগ্রিক পারমাণবিক অবকাঠামো সম্পূর্ণ অক্ষুণ্ন ও সুরক্ষিত রেখেই একটি সম্মানজনক যুদ্ধবিরতি অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে—যা ট্রাম্পের প্রাথমিক যুদ্ধকালীন লক্ষ্যের সম্পূর্ণ বিপরীত।

হরমুজ প্রণালিতে কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা

বিশ্বের অন্যতম প্রধান ও সংবেদনশীল জ্বালানি সরবরাহ পথ হলো হরমুজ প্রণালি। প্রাথমিক মার্কিন খসড়ায় হরমুজ প্রণালির ওপর থেকে ইরানের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ বা কর্তৃত্ব কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু ইরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে, জলপথ দিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার স্বার্থে অবরোধ তুলে নেওয়ার বিনিময়ে তারা কেবল প্রণালিটি সাময়িকভাবে উন্মুক্ত করবে। তবে এই কৌশলগত জলপথের ওপর তেহরানের সার্বিক নিয়ন্ত্রণ ও কর্তৃত্ব আগের মতোই বহাল থাকবে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এ প্রসঙ্গে হুংকার দিয়ে মার্কিন ও পশ্চিমা শক্তিকে হুঁশিয়ার করে বলেছেন—‘আমাদের তলোয়ার সবসময় হরমুজ প্রণালির ওপর থাকবে।’

আন্তর্জাতিক আইন ও সমুদ্র বাণিজ্যের নিয়ম মেনে ইরান এই রুট দিয়ে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলো থেকে কোনো ধরনের অতিরিক্ত ‘ট্রানজিট শুল্ক’ নেবে না বলে সম্মত হয়েছে। তবে এই জলপথের সার্বিক নিরাপত্তা ও তদারকির দায়িত্ব নিজেদের হাতে রেখে তারা কেবল একটি নির্দিষ্ট 'সার্ভিস ফি' বা সেবা মাশুল আদায় করবে। এই শর্তটি নিশ্চিত করার মাধ্যমে ইরান বিশ্ব জ্বালানি বাজারের অন্যতম প্রধান নিয়ন্ত্রণ চাবিকাঠি বা 'চকপয়েন্ট' নিজের পকেটেই রেখে দিল।

নেতানিয়াহুর ‘তেতো বড়ি’ এবং ওয়াশিংটন-তেল আবিব ফাটল

ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারকের মাধ্যমে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার এই আকস্মিক বরফ গলে যাওয়া মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি দিয়েছে ইসরাইলকে, বিশেষ করে দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে। দীর্ঘদিন ধরে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা ও সামরিক শক্তিকে চিরতরে গুঁড়িয়ে দেওয়ার জন্য মার্কিন সামরিক ও কূটনৈতিক সহায়তার ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল ছিলেন তিনি। নেতানিয়াহুর সেই দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ট্রাম্পের এই আকস্মিক সমঝোতা ইসরাইলের জন্য একটি অত্যন্ত তিক্ত অভিজ্ঞতা বা ‘তেতো বড়ি’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই কূটনৈতিক নাটকীয়তা এবং এর ফলে ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের দীর্ঘদিনের নিবিড় সম্পর্কের ফাটলটি কয়েকটি সুনির্দিষ্ট ও বিস্ফোরক ঘটনার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে উঠে এসেছে:

সিএনএনের প্রতিবেদন: ইসরাইলকে অন্ধকারে রেখে ট্রাম্পের চাল

মার্কিন শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যম সিএনএন-এর একটি চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে শান্তি চুক্তির এই পুরো প্রক্রিয়াটি এতটাই গোপনে সম্পন্ন হয়েছে যে, তেল আবিবকে এর বিন্দুমাত্র আঁচ পেতে দেওয়া হয়নি। ঘটনাপ্রবাহের চরম নাটকীয়তা প্রকাশ পায় তখন, যখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম 'ট্রুথ সোশ্যালে' আচমকা ট্রাম্পের পক্ষ থেকে তেহরানের সাথে শান্তি চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার ঘোষণা আসছিল। ঠিক ওই মুহূর্তে প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু ইরানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার চূড়ান্ত নকশা তৈরি করতে ইসরাইলের শীর্ষ নিরাপত্তা ও সামরিক কর্মকর্তাদের সাথে একটি উচ্চপর্যায়ের জরুরি বৈঠকে ব্যস্ত ছিলেন। সিএনএন স্পষ্ট জানিয়েছে, ইসরাইল এই চুক্তি বা এর ভেতরের শর্তাবলি সম্পর্কে পূর্বেই বিন্দুমাত্র অবগত ছিল না। নিজের সবচেয়ে বড় মিত্রের কাছ থেকে এমন চরম অবহেলা ও গোপনীয়তা নেতানিয়াহু প্রশাসনের জন্য ছিল এক বড় ধরনের কৌশলগত চপেটাঘাত।

ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের সাক্ষাৎকার: নেতানিয়াহুকে ট্রাম্পের প্রকাশ্য হুঁশিয়ারি

চুক্তির চরম বিরোধিতা করা সত্ত্বেও ডোনাল্ড ট্রাম্প ইসরাইলকে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, তেল আবিবের এই চুক্তি মেনে নেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যবিষয়ক প্রভাবশালী পত্রিকা ফিন্যান্সিয়াল টাইমস-কে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ও সামরিক কর্তৃত্বকে একপ্রকার খাটো করে অত্যন্ত সরাসরি এবং কঠোর ভাষায় বলেন—‘এখানে সব সিদ্ধান্ত আমিই নিই, নেতানিয়াহু নয়। তার কোনো বিকল্প চয়েস থাকবে না।’

ট্রাম্পের এই অহংকারী ও স্পষ্ট বক্তব্য প্রমাণ করে যে, আমেরিকার কাছে নিজের অভ্যন্তরীণ স্বার্থ (যেমন: অর্থনীতি ও মধ্যবর্তী নির্বাচন) ইসরাইলের দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধংদেহী নীতির চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই একতরফা ডিক্টেট বা নির্দেশ ইসরাইলের নীতিনির্ধারকদের চরম হেয় প্রতিপন্ন করেছে।

ইসরাইলের ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া: ‘স্বাধীন’ সামরিক পদক্ষেপের ঘোষণা

যুক্তরাষ্ট্রের এই আকস্মিক ও একতরফা অবস্থানে চরম ক্ষুব্ধ ও কোণঠাসা হয়ে পড়েছে ইসরাইলি লিডারশিপ। নিজেদের অস্তিত্বের সংকট টের পেয়ে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং দেশটির নবনিযুক্ত প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ইসরাইল কাৎজ যৌথভাবে ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনীকে এক জরুরি ও অভূতপূর্ব নির্দেশ দিয়েছেন। তারা সামরিক বাহিনীকে মার্কিন সহযোগিতা ছাড়াই ইরানের বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ ‘স্বাধীনভাবে’ যেকোনো সময় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সর্বোচ্চ প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। তেল আবিবের নীতিগত অবস্থান থেকে দাবি করা হয়েছে যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কেবল নিজেদের অভ্যন্তরীণ ও রাজনৈতিক স্বার্থ দেখছে। কিন্তু এই চুক্তির মাধ্যমে ইসরাইলের জাতীয় নিরাপত্তা এবং লেবাননের হিজবুল্লাহ কিংবা ইয়েমেনের হুথিদের মতো ইরানের শক্তিশালী প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর তৈরি করা হুমকিকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা ও অবহেলা করা হয়েছে।

আরব বিশ্বের দ্বিমুখী নীতি ও আমিরাতের কৌশলগত চাল

গাজা ও লেবানন যুদ্ধ ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে আরব দেশগুলোর নীতিগত অবস্থান ও বাস্তব কাজের মধ্যে যে গভীর দ্বৈততা বা ভণ্ডামি প্রকাশ পেয়েছে, তা এই ‘ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক’-এর সমীকরণকে আরও জটিল ও বহুমুখী করে তুলেছে। প্রকাশ্যে আরব লিগের শীর্ষ সম্মেলন এবং আব্রাহাম চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী রাষ্ট্রগুলো ইসরাইলি আগ্রাসনের তীব্র নিন্দা ও ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতি জানালেও, পর্দার আড়ালের বাস্তব চিত্র ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। এই দ্বিমুখী নীতি এবং এর মধ্যে ধনী উপসাগরীয় দেশ সংযুক্ত আরব আমিরাতের নিজস্ব অস্তিত্ব ও ব্যবসাকেন্দ্র রক্ষার অবিশ্বাস্য কৌশলগত চালটি নিচে বিস্তারিতভাবে বিশ্লেষণ করা হলো:

আরব দেশগুলোর দ্বৈততা ও অক্ষুণ্ন কূটনৈতিক-বাণিজ্যিক সম্পর্ক

গাজা সংকটকে কেন্দ্র করে যখন আম্মান, কায়রো বা কাসাব্লাঙ্কার রাস্তায় সাধারণ মানুষ ইসরাইলবিরোধী ক্ষোভে উত্তাল, তখন আরব সরকারগুলো আধুনিক নজরদারি প্রযুক্তি ও শক্তিশালী নিরাপত্তা কাঠামোর মাধ্যমে সেই জনরোষকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করেছে। আরব লিগের আনুষ্ঠানিক নথিতে ফিলিস্তিনকে বারবার ‘কেন্দ্রীয় ইস্যু’ বলা হলেও, বাস্তবে ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা দেশগুলোর (বিশেষ করে জর্ডান, মিসর, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন ও মরক্কো) মৌলিক সম্পর্কের কাঠামোতে কোনো পরিবর্তন আসেনি। কোনো আরব দেশই ইসরাইলের বিরুদ্ধে এমন কোনো কঠোর কূটনৈতিক বা অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগ করেনি, যা তাদের সম্পর্কের ভিত্তিকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে। উল্টো, জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের মধ্যেও ইসরাইল ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের বাণিজ্য সচল ছিল, এমনকি তা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত একাই ইসরাইলে ১.৬ বিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের পরিশোধিত জ্বালানি তেল এবং গুরুত্বপূর্ণ শিল্পধাতু রপ্তানি করেছে, যা ইসরাইলের যুদ্ধকালীন অর্থনীতিকে সচল রাখতে অবিরত সহায়তা জুগিয়েছে।

রয়টার্সের এক্সক্লুসিভ প্রতিবেদন: আবুধাবির গোপন সমঝোতা

এই দ্বিমুখী নীতির মধ্যেই সবচেয়ে বড় ভূ-রাজনৈতিক চমকটি দেখিয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের একটি এক্সক্লুসিভ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের এই যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মুখে পড়ে আমিরাত। বিশেষ করে ১ মার্চ আবুধাবির জায়েদ বন্দরে এবং ৪ মে ওমান উপসাগরের ফুজাইরাহ বন্দরে ইরানের সরাসরি হামলায় দুবাই ও আবুধাবির আকাশ ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। এই হামলার ফলে দুবাইয়ের হোটেলগুলো খালি হয়ে যায়, বহু প্রবাসী দেশ ছেড়ে পালাতে শুরু করেন এবং একটি নিরাপদ বৈশ্বিক ব্যবসাকেন্দ্র হিসেবে আমিরাতের যে সুনাম ছিল, তা মারাত্মকভাবে ধাক্কা খায়। নিজেদের এই অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ও দুবাইয়ের মর্যাদাকে টিকিয়ে রাখতে আবুধাবির জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা শেখ তাহনুন বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের অতিথি ভবনে ইরানি বিপ্লবী গার্ড কোরের কর্মকর্তাদের সাথে এক গোপন ও সংবেদনশীল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়, যা এই অঞ্চলের পুরো সমীকরণ বদলে দেয়।

আমিরাতের ১০ থেকে ২০ বিলিয়ন ডলারের ফান্ড

রয়টার্সের সংশ্লিষ্ট চারটি কূটনৈতিক সূত্রের তথ্যমতে, সংযুক্ত আরব আমিরাত উত্তেজনা কমিয়ে শান্তি ফেরানোর লক্ষ্যে ইরানের জব্দ বা আটকে থাকা বিপুল পরিমাণ অর্থ ছাড় দিতে রাজি হয়েছে। দুটি আঞ্চলিক সূত্র জানিয়েছে, আমিরাত মোট ১,০০০ কোটি (১০ বিলিয়ন) ডলার ইরানকে ছাড়তে সম্মত হয়েছে। তবে এই সমঝোতার বিষয়ে অবগত অন্য দুটি সূত্র দাবি করেছে যে, এই অর্থের মোট পরিমাণ ২,০০০ কোটি (২০ বিলিয়ন) ডলার পর্যন্ত হতে পারে। জানা গিয়েছে যে, এই গোপন চুক্তির অধীনে প্রথম কিস্তির ৩০০ কোটি (৩ বিলিয়ন) ডলারের বেশি অর্থ ইতিমধ্যে তেহরানের কোষাগারে সফলভাবে স্থানান্তর বা পরিশোধ করা হয়েছে।

শর্তাধীন অর্থ ছাড় ও ওয়াশিংটনের ওপর মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব

বিপুল পরিমাণ অর্থ হস্তান্তরের পেছনে আমিরাতের প্রধান শর্ত ছিল—ইরান আর কখনো আমিরাতের ভূখণ্ডে কোনো ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন হামলা চালাবে না। এর পাশাপাশি দুই দেশের মধ্যে নতুন করে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করার বিষয়েও দ্বিপক্ষীয় চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এদিকে, ওয়াশিংটনে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স শুক্রবার এক বিবৃতিতে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে দাবি করেন যে, সম্ভাব্য চুক্তিটি সম্পূর্ণ "পারফরম্যান্স-ভিত্তিক" এবং ইরান নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ না করলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের কোনো অবরুদ্ধ তহবিল বা অর্থনৈতিক সুবিধা দেবে না। কিন্তু বাস্তবতা হলো, মার্কিন নিষেধাজ্ঞার তোয়াক্কা না করে আমিরাতের এই একক ও অগ্রিম অর্থ ছাড়ের পদক্ষেপ ওয়াশিংটনকে একপ্রকার বাধ্য করেছে ইরানের অর্থনৈতিক দাবিগুলোর সামনে নতি স্বীকার করতে। এর ফলে মার্কিন প্রশাসনও নিজেদের রেড লাইন অতিক্রম না করেই বলতে পারছে যে তারা সরাসরি কোনো টাকা দেয়নি, অথচ ইরান দাবি করতে পারছে যে তারা যুদ্ধের বড় অঙ্কের ক্ষতিপূরণ আদায় করে নিয়েছে।

চুক্তির মূল শর্তাবলি ও ভবিষ্যৎ রূপরেখা

'ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক' মূলত একটি দুই ধাপের অন্তর্বর্তীকালীন রূপরেখা, যা আগামী ৬০ দিনের জন্য ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার বৈরিতাকে একটি নিয়ন্ত্রিত কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসবে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আল জাজিরা, রয়টার্স এবং ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের তথ্য ও খসড়া চুক্তি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এর প্রথম ধাপের (আগামী ৩০ থেকে ৬০ দিন) মূল লক্ষ্য হলো তাৎক্ষণিক সামরিক সংঘাতের অবসান ঘটানো। এই প্রাথমিক ধাপে ইরান এবং লেবাননের হিজবুল্লাহ ফ্রন্টে সম্পূর্ণ যুদ্ধবিরতি কার্যকর করার পাশাপাশি ওমান উপসাগর ও লোহিত সাগরে মার্কিন নৌ-অবরোধ তুলে নেওয়া হবে। বিনিময়ে, ইরান হরমুজ প্রণালি থেকে তাদের পাতা সামুদ্রিক মাইন অপসারণ করবে এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যের জন্য জলপথটি উন্মুক্ত করে দেবে। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে, ইরানের তীব্র চাপের মুখে কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের ব্যাংকগুলোতে আটকে থাকা ইরানি ফান্ডের অংশবিশেষ (প্রায় ৩ থেকে ১০ বিলিয়ন ডলার) অবমুক্ত করা হবে, যা প্রথম কিস্তির অংশ হিসেবে তেহরানকে একধরনের স্বস্তি দেবে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, প্রথম ধাপে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা ধ্বংস বা উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম স্থানান্তরের কোনো শর্ত চাপানো হয়নি; বরং ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বর্তমান স্তরেই স্থিতিশীল রাখার আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতির বিনিময়ে এই প্রাথমিক যুদ্ধবিরতি অর্জিত হচ্ছে, যা তেহরানের জন্য বড় জয়।

এই অন্তর্বর্তীকালীন যুদ্ধবিরতির সফল সমাপ্তির ওপর ভিত্তি করে শুরু হবে চুক্তির দ্বিতীয় ধাপ, যা মূলত দীর্ঘমেয়াদি কারিগরি ও আইনি আলোচনার জটিল গোলকধাঁধায় প্রবেশ করবে। এই দ্বিতীয় ধাপে মধ্যপ্রাচ্যে একটি টেকসই ও দীর্ঘস্থায়ী আঞ্চলিক নিরাপত্তা চুক্তি প্রতিষ্ঠার বিষয়ে আলোচনা হবে, যেখানে ইরানের প্রক্সি নেটওয়ার্ক ও ইসরাইলের নিরাপত্তা উদ্বেগের মতো সংবেদনশীল বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত থাকবে। নৌপথের সুরক্ষায় হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের সার্বভৌমত্ব বজায় রেখেই আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করতে নির্দিষ্ট 'সার্ভিস ফি' আদায় এবং যৌথ নিরাপত্তা তদারকির জন্য একটি স্থায়ী আইনি কাঠামো নির্ধারণ করা হবে। সবচেয়ে কঠিন আলোচনা হবে অর্থনৈতিক ও পারমাণবিক ফ্রন্টে, যেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, আটকে থাকা বাকি ২৪ বিলিয়ন ডলারের তহবিল পুরোপুরি ফেরত এবং যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি বাবদ ইরানের দাবি করা ৩০০ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতিপূরণ প্যাকেজ নিয়ে দরকষাকষি চলবে। একই সাথে, ইরানের ভেতরে থাকা ৬০% সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামকে কীভাবে নিম্নমাত্রায় রূপান্তর বা লঘুকরণ করা হবে এবং ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার দীর্ঘমেয়াদি পরিদর্শনের শর্তাবলি কেমন হবে, তা এই কারিগরি পর্বেই চূড়ান্ত করা হবে।

‘ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক’ আপাতদৃষ্টে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য একটি সাময়িক স্বস্তির নিঃশ্বাস এবং অর্থনৈতিক সংকট কাটিয়ে ওঠার ‘মুখরক্ষা’র উপায় হলেও, দীর্ঘমেয়াদি ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্রে এটি ইরানের একটি অসামান্য কৌশলগত বিজয়। মার্কিন সামরিক আগ্রাসন ও তীব্র নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও তেহরান তার পারমাণবিক সক্ষমতা ও আঞ্চলিক প্রক্সি নেটওয়ার্ক অক্ষত রেখেই পরাশক্তি আমেরিকার কাছ থেকে সার্বভৌমত্বের ঐতিহাসিক লিখিত স্বীকৃতি এবং আরব আমিরাতের কাছ থেকে শত কোটি ডলারের তহবিল আদায় করে নিয়েছে। তবে এই চুক্তির ভবিষ্যৎ রূপরেখা এখনো চরম অনিশ্চয়তায় ঘেরা; আগামী ৬০ দিনের কারিগরি আলোচনা যদি ব্যর্থ হয়, তবে মধ্যপ্রাচ্য আরও ভয়াবহ সংঘাতের মুখে পড়তে পারে। বিশেষ করে, ট্রাম্পের এই একতরফা সমঝোতায় ক্ষুব্ধ হয়ে ওয়াশিংটনের চিরস্থায়ী মিত্র ইসরাইল যদি ‘স্বাধীনভাবে’ ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় আকস্মিক আঘাত হানে, তবে এই চুক্তি কাগজের দলিলেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়বে এবং মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন আধিপত্যের চূড়ান্ত অবসান ঘটিয়ে এক নতুন বিশ্বব্যবস্থার জন্ম দেবে।

সুমন সুবহান: নিরাপত্তা বিশ্লেষক

Ad 300x250

সম্পর্কিত