ড. মো. আবু সালেহ

আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কোনো নবনির্বাচিত সরকারপ্রধানের প্রথম বিদেশ সফর কেবল প্রথাগত সৌজন্যমূলক সাক্ষাৎ নয়; বরং এটি ওই রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ কৌশলগত অগ্রাধিকার ও ভূ-রাজনৈতিক অভিমুখের স্পষ্ট বার্তা। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম আনুষ্ঠানিক সফর হিসেবে মালয়েশিয়া ও চীন নির্বাচন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। ঐতিহাসিকভাবে ঢাকা যে প্রথাগত আঞ্চলিক ও পশ্চিমাকেন্দ্রিক কূটনৈতিক ধারা অনুসরণ করে আসছিল, সেখান থেকে বেরিয়ে এসে কুয়ালালামপুর ও বেইজিংকে বেছে নেওয়া বাংলাদেশের এক নতুন ‘স্বাধীন ও সার্বভৌম’ সিদ্ধান্তের বহিঃপ্রকাশ।
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ‘নব্য-বাস্তববাদ’-এর আলোকে এটি একটি যৌক্তিক সিদ্ধান্ত। বাংলাদেশ তার নিজস্ব কাঠামোগত বাস্তবতাকে মাথায় রেখে কোনো একক পরাশক্তির আধিপত্য বা মনস্তাত্ত্বিক চাপ থেকে বেরিয়ে নিজের অর্থনৈতিক স্বকীয়তাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। এই সফর বার্তা দেয় যে, ঢাকা তার জাতীয় স্বার্থ ও অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের পথে আর প্রথাগত বলয়ের ওপর নির্ভরশীল নয়। বরং ‘লুক ইস্ট পলিসি’র আনুষ্ঠানিক রূপান্তরের মাধ্যমে বাংলাদেশ এখন উদীয়মান এশীয় অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সঙ্গে নিজেকে একীভূত করতে এবং নিজস্ব কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বজায় রাখতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
১৯৭২ সাল থেকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষিত নীতি ‘সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে বৈরিতা নয়’। একবিংশ শতাব্দীর অত্যন্ত জটিল ও মেরুকৃত ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই দর্শনের কার্যকারিতা বজায় রাখা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই দ্বিপাক্ষিক সফর (২১-২২ জুন মালয়েশিয়া এবং ২৩-২৬ জুন চীন) বাংলাদেশের এই ঐতিহাসিক ভারসাম্যমূলক নীতির একটি সমসাময়িক ও বাস্তবমুখী সম্প্রসারণ।
এই সফরের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের ‘লুক ইস্ট পলিসি’ বা পূর্বমুখী কূটনীতিকে নিছক ধারণার গণ্ডি থেকে বের করে একটি আনুষ্ঠানিক, প্রাতিষ্ঠানিক ও কৌশলগত রূপ দিতে যাচ্ছে। দীর্ঘদিন যাবৎ বাংলাদেশের কূটনীতি পশ্চিমা বাজারের ওপর তৈরি পোশাক রপ্তানি এবং মধ্যপ্রাচ্যের ওপর রেমিট্যান্সের জন্য নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু যখন আটলান্টিক থেকে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে স্থানান্তরিত হচ্ছে, তখন বাংলাদেশের জন্য পূর্বমুখী নীতি আর কোনো ঐচ্ছিক বিকল্প নয়, বরং একটি ভূ-অর্থনৈতিক বাধ্যবাধকতা।
মালয়েশিয়া এবং চীন-উভয় রাষ্ট্রই পূর্ব এশীয় অর্থনৈতিক মিরাকলের প্রতীক। মালয়েশিয়া যেখানে আসিয়ানের অন্যতম নীতি-নির্ধারক এবং বাংলাদেশের জন্য একটি প্রধান শ্রমবাজার ও উদীয়মান প্রযুক্তি অংশীদার; চীন সেখানে বৈশ্বিক ম্যানুফ্যাকচারিং হাব এবং বাংলাদেশের বৃহত্তম অবকাঠামো উন্নয়ন সহযোগী। এই দুই রাষ্ট্রে এক টানা সফরের মাধ্যমে তারেক রহমান তার পূর্বমুখী নীতিকে নিছক কাগজের দলিল থেকে বের করে এনে একটি সক্রিয় কৌশলগত স্তরে উন্নীত করছে।
এটি প্রমাণ করে, বাংলাদেশ তার বহুমাত্রিক কূটনীতি বা কূটনৈতিক বৈচিত্র্যায়ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এমন একটি অবস্থানে পৌঁছাতে চায়, যেখানে সে পূর্ব ও পশ্চিম- উভয় ব্লকের সঙ্গেই সমদূরত্ব বজায় রেখে নিজস্ব জাতীয় স্বার্থ সর্বোচ্চ স্তরে হাসিল করতে পারবে। এই রূপান্তরটি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে একটি নতুন যুগের সূচনা করছে, যা আঞ্চলিক রাজনীতিতে ঢাকার দরকষাকষির ক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।
মালয়েশিয়ায় শ্রমবাজার ও অর্থনৈতিক কূটনীতি
বাংলাদেশের ভূ-অর্থনৈতিক বাস্তবতায় মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার কেবল বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের উৎস নয়। বরং তা দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও বেকারত্ব দূরীকরণের একটি অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। তবে বিগত বছরগুলোতে এই শ্রমবাজারটি সিন্ডিকেট বা নির্দিষ্ট চক্রের একচেটিয়া আধিপত্য, অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয় এবং পদ্ধতিগত স্বচ্ছতার অভাবে বারবার স্থবিরতার মুখোমুখি হয়েছে। তারেক রহমানের ২১-২২ জুনের এই সংক্ষিপ্ত অথচ নিবিড় সফরটির অন্যতম প্রধান এজেন্ডা হলো এই স্থবির হয়ে থাকা শ্রমবাজারকে সম্পূর্ণ সচল করা এবং একটি টেকসই প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া।
আন্তর্জাতিক শ্রম কূটনীতির নিরিখে, বাংলাদেশ এই সফরে একটি ‘পদ্ধতিগত সংস্কার’ বা রিভিউ প্রসেস চালুর ওপর জোর দিচ্ছে। পূর্ববর্তী দ্বিপাক্ষিক চুক্তিগুলোর দুর্বলতা দূর করে একটি সম্পূর্ণ ডিজিটাল, স্বয়ংক্রিয় এবং মধ্যস্বত্বভোগী-মুক্ত কর্মী প্রেরণ প্রক্রিয়া (সরকারিভাবে নিয়ন্ত্রিত কাঠামো) তৈরি করা এই আলোচনার মূল লক্ষ্য। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সংস্কারপন্থী সরকারের সঙ্গে বাংলাদেশের এই নতুন রাজনৈতিক নেতৃত্বের সংলাপ কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে অভিবাসন ব্যয় আইএলও নির্ধারিত স্ট্যান্ডার্ডে নামিয়ে আনতে সাহায্য করবে।
এছাড়াও, এই অর্থনৈতিক কূটনীতির একটি বড় অংশজুড়ে রয়েছে মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত বাংলাদেশি অভিবাসী শ্রমিকদের আইনি অধিকার, মানবিক মর্যাদা এবং কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ। কুয়ালালামপুরের সঙ্গে ঢাকার এই উচ্চপর্যায়ের আলোচনা কেবল নতুন কর্মী পাঠানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং যারা ইতিমধ্যে সেখানে কর্মরত আছেন তাদের পুনঃনিবন্ধন এবং বেতন বৈষম্য দূরীকরণের মতো আইনি সুরক্ষার বিষয়গুলোকেও অন্তর্ভুক্ত করে, যা বাংলাদেশের রেমিট্যান্স প্রবাহকে দীর্ঘমেয়াদে সুরক্ষিত করবে।
বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যকার বাণিজ্য সম্পর্ককে প্রথাগত পণ্য আমদানির গণ্ডি পেরিয়ে একবিংশ শতাব্দীর উদীয়মান খাতসমূহে বিস্তৃত করার জন্য এই সফরটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ঘাটতি মালয়েশিয়ার পক্ষে থাকলেও, বাংলাদেশ তার রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্রায়নের মাধ্যমে এই ঘাটতি কমিয়ে আনার কৌশল গ্রহণ করছে। এই ক্ষেত্রে তিনটি খাত সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে; হালাল অর্থনীতি, সেমিকন্ডাক্টর শিল্প, কৃষি-প্রযুক্তি।
বিশ্বজুড়ে হালাল পণ্যের বাজার এখন ট্রিলিয়ন ডলারের। মালয়েশিয়া এই খাতের বৈশ্বিক স্ট্যান্ডার্ড নির্ধারণকারী দেশ। বাংলাদেশ এই সফরে মালয়েশিয়ার কারিগরি সহায়তায় দেশে একটি সার্টিফাইড হালাল ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার বিষয়ে যৌথ চুক্তি স্বাক্ষর করতে পারে। এর ফলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য এবং চামড়াজাত পণ্য আন্তর্জাতিক হালাল বাজারে প্রবেশাধিকার পাবে।
মালয়েশিয়া বিশ্ব সেমিকন্ডাক্টর এবং মাইক্রোচিপ টেস্টিং ও প্যাকেজিংয়ের একটি অন্যতম প্রধান বৈশ্বিক হাব। বাংলাদেশের বিশাল আইটি ও ইঞ্জিনিয়ারিং গ্র্যাজুয়েটদের এই উদীয়মান হাই-টেক শিল্পে সম্পৃক্ত করতে যৌথ উদ্যোগ এবং প্রযুক্তি স্থানান্তরের বিষয়ে এই সফরে গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হতে যাচ্ছে। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে মালয়েশিয়ার আধুনিক পাম অয়েল প্রক্রিয়াকরণ প্রযুক্তি এবং উন্নত কৃষি-ব্যবস্থাপনার অভিজ্ঞতাকে বাংলাদেশের কৃষি খাতে কাজে লাগানোর বিষয়ে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা এই সফরের বাণিজ্যিক এজেন্ডার অন্তর্ভুক্ত।
বাংলাদেশের পূর্বমুখী পররাষ্ট্রনীতির চূড়ান্ত সাফল্য নির্ভর করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ১০টি দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক জোট আসিয়ানের সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক কতটা গভীর, তার ওপর। বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে আসিয়ানের সেক্টরাল ডায়ালগ পার্টনার বা কৌশলগত সংলাপ অংশীদারত্বের মর্যাদা পাওয়ার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। আসিয়ানের অন্যতম প্রভাবশালী ও প্রতিষ্ঠাতা সদস্য দেশ হিসেবে মালয়েশিয়ার সমর্থন ঢাকার এই লক্ষ্য অর্জনে সহায়ক হিসেবে কাজ করবে। এই সফরে আসিয়ানের সঙ্গে বাংলাদেশের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের বিষয়টিও গতি পাবে।
মিয়ানমারের অভ্যন্তরে চলমান গৃহযুদ্ধ এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকট বাংলাদেশের জন্য একটি বড় ধরনের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ এই দ্বিপাক্ষিক সফরে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়টিকে পুনরায় আঞ্চলিক ফোরামে শক্তভাবে উত্থাপনের কৌশল নিয়েছে। যেহেতু মিয়ানমার আসিয়ানের সদস্য এবং মালয়েশিয়া এই জোটে অত্যন্ত প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করে, তাই কুয়ালালামপুরের মাধ্যমে আসিয়ান নেতৃত্বের ওপর ভূ-রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করা সম্ভব।
তারেক রহমান মালয়েশিয়ার শীর্ষ নেতৃত্বের কাছে মিয়ানমারের জান্তা সরকার এবং আরাকান আর্মি উভয় পক্ষের সঙ্গেই আসিয়ানের মাধ্যমে একটি বহুমাত্রিক সংলাপের রূপরেখা প্রস্তাব করতে পারেন, যেন রাখাইন রাজ্যে একটি নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করে রোহিঙ্গাদের টেকসই প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু করা যায়। এটি বাংলাদেশের আঞ্চলিক নিরাপত্তা কূটনীতির ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে কাজ করবে।
তারেক রহমানের চীন সফরটি ঢাকা-বেইজিং সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি ঐতিহাসিক কৌশলগত মাইলফলক। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে দায়িত্ব গ্রহণের পর বেইজিংয়ে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, প্রিমিয়ার লি ছিয়াং এবং চীনের কমিউনিস্ট পার্টির শীর্ষ তিন নেতার সঙ্গে এই উচ্চপর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক বৈঠকগুলো দুই দেশের রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতাকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে।
এই সফরের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক অর্জন হতে যাচ্ছে দীর্ঘ দুই দশক পর ঢাকা-বেইজিং সম্পর্কের একটি পূর্ণাঙ্গ ‘যৌথ ঘোষণা’ স্বাক্ষর। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পরিভাষায়, যৌথ ঘোষণা হলো এমন একটি দলিল যা দুটি রাষ্ট্রের মধ্যকার সম্পর্কের ভবিষ্যৎ গতিপথের একটি প্রাতিষ্ঠানিক ও দীর্ঘমেয়াদি ব্লুপ্রিন্ট বা রোডম্যাপ তৈরি করে। এই যৌথ ঘোষণার মাধ্যমে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কটি পূর্বের ‘কৌশলগত অংশীদারিত্ব’ থেকে আরও গভীর ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করবে। আর এটি দুই দেশের রাজনৈতিক নীতিনির্ধারকদের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া ও বহুমাত্রিক সংযোগকে আরও সুদৃঢ় করবে।
বাংলাদেশের অবকাঠামোগত রূপান্তরে চীনের ভূমিকা অনস্বীকার্য। এই সফরে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ এবং সরকারের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ ১ ট্রিলিয়ন (এক লাখ কোটি) টাকারও বেশি বরাদ্দের ৮টি সুনির্দিষ্ট মেগা প্রকল্পের প্রস্তাবনা বেইজিংয়ের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে উপস্থাপন করছে। এই প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে: কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ দ্বিতীয় যমুনা সেতু এবং দ্বিতীয় পদ্মা সেতু নির্মাণ, সারাদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থায় বিপ্লব আনতে ঢাকা-চট্টগ্রাম এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, শহুরে গণপরিবহণ ব্যবস্থার আধুনিকায়নে পাতাল রেল প্রকল্প।
এই মেগা প্রজেক্টগুলোর অর্থায়নে বাংলাদেশ চীনের কাছ থেকে প্রথাগত বাণিজ্যিক ঋণের পরিবর্তে কনসেশনাল লোন বা রেয়াতি ঋণ এবং অনুদানের একটি নতুন মিশ্রণ বা ‘ফাইন্যান্সিং ব্লেন্ড’ অর্জনের চেষ্টা করছে। বাংলাদেশের বর্তমান সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে কম সুদে ও দীর্ঘ গ্রেস পিরিয়ডসহ (ঋণ পরিশোধ শুরুর আগের সময়) এই ঋণ প্রাপ্তি দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ না বাড়িয়ে অবকাঠামোগত উন্নয়ন নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে একটি বড় ধরনের ভূ-অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করবে।
বাংলাদেশের পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অভিযোজনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে আলোচিত ও সংবেদনশীল প্রকল্প হলো ‘তিস্তা মহাপ্রকল্প’। উত্তরবঙ্গের বিশাল অঞ্চলের কৃষি, অর্থনীতি এবং পরিবেশের ভাগ্য এই প্রকল্পের ওপর নির্ভরশীল। ভারতের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি ঝুলে থাকায় বাংলাদেশ তার নিজস্ব জলসীমায় এই নদী অববাহিকার সামগ্রিক ব্যবস্থাপনার জন্য চীনের কারিগরি ও আর্থিক সহায়তার ওপর বিশেষ জোর দিচ্ছে।
এই সফরে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন ও তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনায় চীনের সহায়তার বিষয়টি চূড়ান্ত রূপ পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ভূ-রাজনীতির নিরিখে এটি একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল পদক্ষেপ। চীনের অত্যন্ত উন্নত ড্যাম নির্মাণ, নদী ড্রেজিং এবং পানি সংরক্ষণ প্রযুক্তির মাধ্যমে উত্তরবঙ্গে শুষ্ক মৌসুমে পানির অভাব দূর করা এবং বর্ষা মৌসুমে বন্যা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। তবে এই প্রকল্পের বাস্তবায়ন বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ সীমানার মধ্যে হলেও, ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এটি আঞ্চলিক রাজনীতিতে কৌশলগত দরকষাকষির একটি নতুন ক্ষেত্র তৈরি করছে।
বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যকার সম্পর্কের অন্যতম প্রাচীন এবং অবিচ্ছেদ্য স্তম্ভ হলো প্রতিরক্ষা সহযোগিতা। বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকায়ন এবং ‘ফোর্সেস গোল’ অর্জনে চীন ঐতিহাসিকভাবেই প্রধান প্রধান সামরিক সরঞ্জাম (যেমন- সাবমেরিন, করভেট, ফ্রিগেট এবং ফাইটার জেট) সরবরাহ করে আসছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই সফরে সামরিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতাকে কেবল ‘ক্রেতা-বিক্রেতার’ সম্পর্ক থেকে বের করে এনে প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং যৌথ উৎপাদনের স্তরে উন্নীত করার বিষয়ে আলোচনা হচ্ছে। এর ফলে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী এবং বিমানবাহিনীর কারিগরি সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে এবং স্থানীয়ভাবে সামরিক সরঞ্জামের রক্ষণাবেক্ষণ ও ওভারহোলিং ক্ষমতা জোরদার হবে, যা দেশের সামগ্রিক জাতীয় নিরাপত্তাকে আরও স্বাবলম্বী করে তুলবে।
অবকাঠামো ও সামরিক খাতের বাইরে, এই সফরের একটি অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক দিক হলো ডালিয়ানে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ১৭তম ‘সামার ডাভোস’ সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণ। এই বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্মে বিশ্বনেতা ও বহুজাতিক কর্পোরেশনের প্রধানদের সামনে বাংলাদেশ তার সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক সংস্কার এবং অনুকূল বিনিয়োগ পরিবেশের কথা তুলে ধরবে, যা দেশে সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণে সাহায্য করবে।
একইসঙ্গে, চীনের প্রস্তাবিত বৈশ্বিক উন্নয়ন রূপরেখা গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ (জিডিআই) এ বাংলাদেশের প্রাতিষ্ঠানিক অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি এই সফরে চূড়ান্ত হতে যাচ্ছে। বেইজিংয়ের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) যদি হয় অবকাঠামোগত সংযোগের প্রতীক, তবে জিডিআই হলো দারিদ্র্য বিমোচন, খাদ্য নিরাপত্তা, জলবায়ু অর্থায়ন এবং ডিজিটাল অর্থনীতির মতো টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের একটি আর্থিক ও প্রযুক্তিগত ফ্রেমওয়ার্ক। জিডিআইতে যুক্ত হওয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশ জাতিসংঘের উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে চীনের কাছ থেকে বিশেষ প্রযুক্তিগত ও আর্থিক তহবিল ব্যবহারের সুযোগ পাবে।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে ভৌগোলিক ও ঐতিহাসিকভাবে ভারত একটি অপরিহার্য ফ্যাক্টর। তারেক রহমানের প্রথম দ্বিপাক্ষিক সফরে চীন ও মালয়েশিয়াকে বেছে নেওয়া এবং বেইজিংয়ের সঙ্গে গভীর অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত সংযোগ স্থাপন করা নয়া দিল্লির কৌশলগত মহলে স্বাভাবিকভাবেই গভীর মনোযোগ এবং একধরনের নিরাপত্তা উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে, ‘তিস্তা মহাপ্রকল্প’ এবং চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সামরিক ও কৌশলগত ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধির বিষয়টি ভারতের ভূ-রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশে অত্যন্ত সংবেদনশীল।
ভারতের শঙ্কা হলো, শিলিগুড়ি করিডোর বা ‘চিকেনস নেক’-এর কাছাকাছি কোনো অঞ্চলে চীনের কারিগরি ও আর্থিক উপস্থিতির ফলে তাদের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর নিরাপত্তা বলয় প্রভাবিত হতে পারে। একইসঙ্গে, বাংলাদেশের সামরিক আধুনিকায়নে চীনের প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি স্থানান্তরের বিষয়টিও ভারতের আঞ্চলিক আধিপত্যের সমীকরণে একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের সরকারকে অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও দূরদর্শী ভারসাম্যমূলক কূটনীতির পরীক্ষা দিতে হবে। ঢাকাকে বেইজিংয়ের কাছে এটি পরিষ্কার করতে হচ্ছে যে, চীনের সঙ্গে উন্নয়ন অংশীদারিত্ব সম্পূর্ণ অর্থনৈতিক ও অবকাঠামো-কেন্দ্রিক, যা কোনো তৃতীয় দেশের নিরাপত্তার জন্য হুমকি নয়। ভারতের এই কৌশলগত উদ্বেগ নিরসনে বাংলাদেশ একাধারে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার পথ খোলা রাখছে এবং এটি প্রমাণ করার চেষ্টা করছে যে, পরাশক্তিগুলোর আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ঢাকা কোনো নির্দিষ্ট ব্লকের দিকে ধাবিত হচ্ছে না, বরং নিজস্ব জাতীয় স্বার্থকেই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
দক্ষিণ এশিয়া এবং সামগ্রিক ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মূল কৌশলগত চালিকাশক্তি হলো তাদের ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল, যার প্রধান লক্ষ্য এই অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবকে প্রতিহত করা। এই বৈশ্বিক ক্ষমতার লড়াইয়ের কেন্দ্রে অবস্থান করছে বাংলাদেশ। তারেক রহমানের এই সফরে চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ এবং গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ এর প্রতি বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান প্রাতিষ্ঠানিক ঝোঁক ওয়াশিংটন-ঢাকা সম্পর্কে নতুন এক ধরনের ভূ-রাজনৈতিক চাপের সৃষ্টি করতে পারে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তার পশ্চিমা মিত্ররা দীর্ঘ দিন ধরেই ঢাকাকে বেইজিংয়ের ঋণ-নির্ভর অবকাঠামো উন্নয়ন বা ‘ডেবট-ট্র্যাপ ডিপ্লোম্যাসি’ বিষয়ে সতর্ক করে আসছে। তবে বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে ঋণ ব্যবস্থাপনা পরিচালনা করছে। ২০২৬ সালের এই নতুন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে, প্রথম সফরেই চীনের সঙ্গে ১ ট্রিলিয়ন টাকার মেগা প্রজেক্টের প্রস্তাবনা এবং বৈশ্বিক ফোরামে চীনের এজেন্ডার সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করার ফলে ওয়াশিংটন ঢাকার ওপর বহুমাত্রিক রাজনৈতিক বা বাণিজ্য-সম্পর্কিত চাপ সৃষ্টি করতে পারে। জেনারেলাইজড সিস্টেম অব প্রেফারেন্সেস (জিএসপি) সুবিধা, তৈরি পোশাকের বাজার কিংবা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও মানবাধিকারের মতো বিষয়গুলোকে ওয়াশিংটন প্রায়শই তাদের কৌশলগত স্বার্থে লিভারেজ হিসেবে ব্যবহার করে থাকে। ফলে, বেইজিংয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ানোর পাশাপাশি ওয়াশিংটনের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সুসম্পর্ক বজায় রাখা বাংলাদেশের জন্য একটি বড় ধরনের মনস্তাত্ত্বিক ও কৌশলগত চ্যালেঞ্জ।
তারেক রহমানের এই মালয়েশিয়া ও চীন সফরটি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত থাকবে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের কাঠামোগত বাস্তবতায় এই সফর প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশ তার প্রথাগত একমুখী বা দ্বিমুখী কূটনৈতিক নির্ভরতা থেকে বের হয়ে এসে একটি বহুমাত্রিক এবং সুদূরপ্রসারী কূটনৈতিক বৈচিত্র্যায়ন প্রক্রিয়ায় প্রবেশ করেছে। প্রথম বিদেশ সফর হিসেবে দক্ষিণ-পূর্ব ও পূর্ব এশিয়ার দুটি প্রধান অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক কেন্দ্রবিন্দুকে বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্তটি অত্যন্ত সুচিন্তিত এবং দেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করার একটি বাস্তবসম্মত প্রয়াস।
মালয়েশিয়ার সঙ্গে শ্রমবাজারের পদ্ধতিগত সংস্কার ও আসিয়ান সংযোগ এবং চীনের সঙ্গে ১ ট্রিলিয়ন টাকার মেগা প্রজেক্টের অর্থায়ন ও তিস্তা মহাপরিকল্পনার মতো সংবেদনশীল বিষয়ের অবতারণা নির্দেশ করে যে, বাংলাদেশ এখন আর ভূ-রাজনীতিতে কেবল একটি নিষ্ক্রিয় রাষ্ট্র নয়, বরং সে নিজের জাতীয় স্বার্থকে সামনে রেখে অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে দরকষাকষি করতে সক্ষম। পরাশক্তিগুলোর তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাঝেও ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত উদ্বেগকে সুনিপুণ কৌশলের মাধ্যমে সামাল দিয়ে বাংলাদেশ তার কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বজায় রাখতে পারলে, তা এই নতুন নেতৃত্বের কূটনৈতিক পরিপক্বতারই বহিঃপ্রকাশ হবে।
একবিংশ শতাব্দীকে বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাসে ‘এশীয় শতাব্দী’ হিসেবে অভিহিত করা হয়, যেখানে বৈশ্বিক জিডিপি এবং বাণিজ্যের মূল চালিকাশক্তি আটলান্টিক থেকে স্থানান্তরিত হয়ে প্রশান্ত মহাসাগরীয় ও এশীয় অঞ্চলে কেন্দ্রীভূত হচ্ছে। এই ঐতিহাসিক রূপান্তরের সময়ে বাংলাদেশের ‘লুক ইস্ট পলিসি’ বা পূর্বমুখী কূটনীতি কোনো সাময়িক কৌশল নয়, বরং এটি দেশের ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির মূল ভিত্তি।
এই সফরের মাধ্যমে বাংলাদেশ পূর্ব এশিয়ার উৎপাদন শৃঙ্খল, হালাল অর্থনীতি, সেমিকন্ডাক্টর শিল্প এবং চীনের গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ এর মতো শক্তিশালী অর্থনৈতিক ইকোসিস্টেমের সঙ্গে নিজেকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে যুক্ত করার যে রোডম্যাপ তৈরি করেছে, তা আগামী দশকগুলোতে দেশের শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান ও জিডিপি প্রবৃদ্ধিকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে। তবে এই অর্জিত কূটনৈতিক সম্ভাবনাগুলোর সফল বাস্তবায়ন নির্ভর করবে দেশের অভ্যন্তরীণ প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা, স্বচ্ছ আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়া এবং চুক্তিগুলোর দ্রুত ও সুচারু বাস্তবায়নের ওপর। সামগ্রিকভাবে, এই সফর বাংলাদেশকে একটি উদীয়মান আঞ্চলিক অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তরিত করার পথে একটি অত্যন্ত সফল ও দূরদর্শী পদক্ষেপ হিসেবে ইতিহাসের পাতায় স্থান করে নেবে।

আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কোনো নবনির্বাচিত সরকারপ্রধানের প্রথম বিদেশ সফর কেবল প্রথাগত সৌজন্যমূলক সাক্ষাৎ নয়; বরং এটি ওই রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ কৌশলগত অগ্রাধিকার ও ভূ-রাজনৈতিক অভিমুখের স্পষ্ট বার্তা। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম আনুষ্ঠানিক সফর হিসেবে মালয়েশিয়া ও চীন নির্বাচন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। ঐতিহাসিকভাবে ঢাকা যে প্রথাগত আঞ্চলিক ও পশ্চিমাকেন্দ্রিক কূটনৈতিক ধারা অনুসরণ করে আসছিল, সেখান থেকে বেরিয়ে এসে কুয়ালালামপুর ও বেইজিংকে বেছে নেওয়া বাংলাদেশের এক নতুন ‘স্বাধীন ও সার্বভৌম’ সিদ্ধান্তের বহিঃপ্রকাশ।
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ‘নব্য-বাস্তববাদ’-এর আলোকে এটি একটি যৌক্তিক সিদ্ধান্ত। বাংলাদেশ তার নিজস্ব কাঠামোগত বাস্তবতাকে মাথায় রেখে কোনো একক পরাশক্তির আধিপত্য বা মনস্তাত্ত্বিক চাপ থেকে বেরিয়ে নিজের অর্থনৈতিক স্বকীয়তাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। এই সফর বার্তা দেয় যে, ঢাকা তার জাতীয় স্বার্থ ও অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের পথে আর প্রথাগত বলয়ের ওপর নির্ভরশীল নয়। বরং ‘লুক ইস্ট পলিসি’র আনুষ্ঠানিক রূপান্তরের মাধ্যমে বাংলাদেশ এখন উদীয়মান এশীয় অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সঙ্গে নিজেকে একীভূত করতে এবং নিজস্ব কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বজায় রাখতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
১৯৭২ সাল থেকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষিত নীতি ‘সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে বৈরিতা নয়’। একবিংশ শতাব্দীর অত্যন্ত জটিল ও মেরুকৃত ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই দর্শনের কার্যকারিতা বজায় রাখা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই দ্বিপাক্ষিক সফর (২১-২২ জুন মালয়েশিয়া এবং ২৩-২৬ জুন চীন) বাংলাদেশের এই ঐতিহাসিক ভারসাম্যমূলক নীতির একটি সমসাময়িক ও বাস্তবমুখী সম্প্রসারণ।
এই সফরের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের ‘লুক ইস্ট পলিসি’ বা পূর্বমুখী কূটনীতিকে নিছক ধারণার গণ্ডি থেকে বের করে একটি আনুষ্ঠানিক, প্রাতিষ্ঠানিক ও কৌশলগত রূপ দিতে যাচ্ছে। দীর্ঘদিন যাবৎ বাংলাদেশের কূটনীতি পশ্চিমা বাজারের ওপর তৈরি পোশাক রপ্তানি এবং মধ্যপ্রাচ্যের ওপর রেমিট্যান্সের জন্য নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু যখন আটলান্টিক থেকে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে স্থানান্তরিত হচ্ছে, তখন বাংলাদেশের জন্য পূর্বমুখী নীতি আর কোনো ঐচ্ছিক বিকল্প নয়, বরং একটি ভূ-অর্থনৈতিক বাধ্যবাধকতা।
মালয়েশিয়া এবং চীন-উভয় রাষ্ট্রই পূর্ব এশীয় অর্থনৈতিক মিরাকলের প্রতীক। মালয়েশিয়া যেখানে আসিয়ানের অন্যতম নীতি-নির্ধারক এবং বাংলাদেশের জন্য একটি প্রধান শ্রমবাজার ও উদীয়মান প্রযুক্তি অংশীদার; চীন সেখানে বৈশ্বিক ম্যানুফ্যাকচারিং হাব এবং বাংলাদেশের বৃহত্তম অবকাঠামো উন্নয়ন সহযোগী। এই দুই রাষ্ট্রে এক টানা সফরের মাধ্যমে তারেক রহমান তার পূর্বমুখী নীতিকে নিছক কাগজের দলিল থেকে বের করে এনে একটি সক্রিয় কৌশলগত স্তরে উন্নীত করছে।
এটি প্রমাণ করে, বাংলাদেশ তার বহুমাত্রিক কূটনীতি বা কূটনৈতিক বৈচিত্র্যায়ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এমন একটি অবস্থানে পৌঁছাতে চায়, যেখানে সে পূর্ব ও পশ্চিম- উভয় ব্লকের সঙ্গেই সমদূরত্ব বজায় রেখে নিজস্ব জাতীয় স্বার্থ সর্বোচ্চ স্তরে হাসিল করতে পারবে। এই রূপান্তরটি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে একটি নতুন যুগের সূচনা করছে, যা আঞ্চলিক রাজনীতিতে ঢাকার দরকষাকষির ক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।
মালয়েশিয়ায় শ্রমবাজার ও অর্থনৈতিক কূটনীতি
বাংলাদেশের ভূ-অর্থনৈতিক বাস্তবতায় মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার কেবল বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের উৎস নয়। বরং তা দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও বেকারত্ব দূরীকরণের একটি অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। তবে বিগত বছরগুলোতে এই শ্রমবাজারটি সিন্ডিকেট বা নির্দিষ্ট চক্রের একচেটিয়া আধিপত্য, অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয় এবং পদ্ধতিগত স্বচ্ছতার অভাবে বারবার স্থবিরতার মুখোমুখি হয়েছে। তারেক রহমানের ২১-২২ জুনের এই সংক্ষিপ্ত অথচ নিবিড় সফরটির অন্যতম প্রধান এজেন্ডা হলো এই স্থবির হয়ে থাকা শ্রমবাজারকে সম্পূর্ণ সচল করা এবং একটি টেকসই প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া।
আন্তর্জাতিক শ্রম কূটনীতির নিরিখে, বাংলাদেশ এই সফরে একটি ‘পদ্ধতিগত সংস্কার’ বা রিভিউ প্রসেস চালুর ওপর জোর দিচ্ছে। পূর্ববর্তী দ্বিপাক্ষিক চুক্তিগুলোর দুর্বলতা দূর করে একটি সম্পূর্ণ ডিজিটাল, স্বয়ংক্রিয় এবং মধ্যস্বত্বভোগী-মুক্ত কর্মী প্রেরণ প্রক্রিয়া (সরকারিভাবে নিয়ন্ত্রিত কাঠামো) তৈরি করা এই আলোচনার মূল লক্ষ্য। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সংস্কারপন্থী সরকারের সঙ্গে বাংলাদেশের এই নতুন রাজনৈতিক নেতৃত্বের সংলাপ কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে অভিবাসন ব্যয় আইএলও নির্ধারিত স্ট্যান্ডার্ডে নামিয়ে আনতে সাহায্য করবে।
এছাড়াও, এই অর্থনৈতিক কূটনীতির একটি বড় অংশজুড়ে রয়েছে মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত বাংলাদেশি অভিবাসী শ্রমিকদের আইনি অধিকার, মানবিক মর্যাদা এবং কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ। কুয়ালালামপুরের সঙ্গে ঢাকার এই উচ্চপর্যায়ের আলোচনা কেবল নতুন কর্মী পাঠানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং যারা ইতিমধ্যে সেখানে কর্মরত আছেন তাদের পুনঃনিবন্ধন এবং বেতন বৈষম্য দূরীকরণের মতো আইনি সুরক্ষার বিষয়গুলোকেও অন্তর্ভুক্ত করে, যা বাংলাদেশের রেমিট্যান্স প্রবাহকে দীর্ঘমেয়াদে সুরক্ষিত করবে।
বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যকার বাণিজ্য সম্পর্ককে প্রথাগত পণ্য আমদানির গণ্ডি পেরিয়ে একবিংশ শতাব্দীর উদীয়মান খাতসমূহে বিস্তৃত করার জন্য এই সফরটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ঘাটতি মালয়েশিয়ার পক্ষে থাকলেও, বাংলাদেশ তার রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্রায়নের মাধ্যমে এই ঘাটতি কমিয়ে আনার কৌশল গ্রহণ করছে। এই ক্ষেত্রে তিনটি খাত সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে; হালাল অর্থনীতি, সেমিকন্ডাক্টর শিল্প, কৃষি-প্রযুক্তি।
বিশ্বজুড়ে হালাল পণ্যের বাজার এখন ট্রিলিয়ন ডলারের। মালয়েশিয়া এই খাতের বৈশ্বিক স্ট্যান্ডার্ড নির্ধারণকারী দেশ। বাংলাদেশ এই সফরে মালয়েশিয়ার কারিগরি সহায়তায় দেশে একটি সার্টিফাইড হালাল ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার বিষয়ে যৌথ চুক্তি স্বাক্ষর করতে পারে। এর ফলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য এবং চামড়াজাত পণ্য আন্তর্জাতিক হালাল বাজারে প্রবেশাধিকার পাবে।
মালয়েশিয়া বিশ্ব সেমিকন্ডাক্টর এবং মাইক্রোচিপ টেস্টিং ও প্যাকেজিংয়ের একটি অন্যতম প্রধান বৈশ্বিক হাব। বাংলাদেশের বিশাল আইটি ও ইঞ্জিনিয়ারিং গ্র্যাজুয়েটদের এই উদীয়মান হাই-টেক শিল্পে সম্পৃক্ত করতে যৌথ উদ্যোগ এবং প্রযুক্তি স্থানান্তরের বিষয়ে এই সফরে গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হতে যাচ্ছে। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে মালয়েশিয়ার আধুনিক পাম অয়েল প্রক্রিয়াকরণ প্রযুক্তি এবং উন্নত কৃষি-ব্যবস্থাপনার অভিজ্ঞতাকে বাংলাদেশের কৃষি খাতে কাজে লাগানোর বিষয়ে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা এই সফরের বাণিজ্যিক এজেন্ডার অন্তর্ভুক্ত।
বাংলাদেশের পূর্বমুখী পররাষ্ট্রনীতির চূড়ান্ত সাফল্য নির্ভর করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ১০টি দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক জোট আসিয়ানের সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক কতটা গভীর, তার ওপর। বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে আসিয়ানের সেক্টরাল ডায়ালগ পার্টনার বা কৌশলগত সংলাপ অংশীদারত্বের মর্যাদা পাওয়ার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। আসিয়ানের অন্যতম প্রভাবশালী ও প্রতিষ্ঠাতা সদস্য দেশ হিসেবে মালয়েশিয়ার সমর্থন ঢাকার এই লক্ষ্য অর্জনে সহায়ক হিসেবে কাজ করবে। এই সফরে আসিয়ানের সঙ্গে বাংলাদেশের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের বিষয়টিও গতি পাবে।
মিয়ানমারের অভ্যন্তরে চলমান গৃহযুদ্ধ এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকট বাংলাদেশের জন্য একটি বড় ধরনের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ এই দ্বিপাক্ষিক সফরে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়টিকে পুনরায় আঞ্চলিক ফোরামে শক্তভাবে উত্থাপনের কৌশল নিয়েছে। যেহেতু মিয়ানমার আসিয়ানের সদস্য এবং মালয়েশিয়া এই জোটে অত্যন্ত প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করে, তাই কুয়ালালামপুরের মাধ্যমে আসিয়ান নেতৃত্বের ওপর ভূ-রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করা সম্ভব।
তারেক রহমান মালয়েশিয়ার শীর্ষ নেতৃত্বের কাছে মিয়ানমারের জান্তা সরকার এবং আরাকান আর্মি উভয় পক্ষের সঙ্গেই আসিয়ানের মাধ্যমে একটি বহুমাত্রিক সংলাপের রূপরেখা প্রস্তাব করতে পারেন, যেন রাখাইন রাজ্যে একটি নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করে রোহিঙ্গাদের টেকসই প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু করা যায়। এটি বাংলাদেশের আঞ্চলিক নিরাপত্তা কূটনীতির ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে কাজ করবে।
তারেক রহমানের চীন সফরটি ঢাকা-বেইজিং সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি ঐতিহাসিক কৌশলগত মাইলফলক। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে দায়িত্ব গ্রহণের পর বেইজিংয়ে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, প্রিমিয়ার লি ছিয়াং এবং চীনের কমিউনিস্ট পার্টির শীর্ষ তিন নেতার সঙ্গে এই উচ্চপর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক বৈঠকগুলো দুই দেশের রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতাকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে।
এই সফরের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক অর্জন হতে যাচ্ছে দীর্ঘ দুই দশক পর ঢাকা-বেইজিং সম্পর্কের একটি পূর্ণাঙ্গ ‘যৌথ ঘোষণা’ স্বাক্ষর। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পরিভাষায়, যৌথ ঘোষণা হলো এমন একটি দলিল যা দুটি রাষ্ট্রের মধ্যকার সম্পর্কের ভবিষ্যৎ গতিপথের একটি প্রাতিষ্ঠানিক ও দীর্ঘমেয়াদি ব্লুপ্রিন্ট বা রোডম্যাপ তৈরি করে। এই যৌথ ঘোষণার মাধ্যমে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কটি পূর্বের ‘কৌশলগত অংশীদারিত্ব’ থেকে আরও গভীর ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করবে। আর এটি দুই দেশের রাজনৈতিক নীতিনির্ধারকদের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া ও বহুমাত্রিক সংযোগকে আরও সুদৃঢ় করবে।
বাংলাদেশের অবকাঠামোগত রূপান্তরে চীনের ভূমিকা অনস্বীকার্য। এই সফরে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ এবং সরকারের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ ১ ট্রিলিয়ন (এক লাখ কোটি) টাকারও বেশি বরাদ্দের ৮টি সুনির্দিষ্ট মেগা প্রকল্পের প্রস্তাবনা বেইজিংয়ের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে উপস্থাপন করছে। এই প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে: কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ দ্বিতীয় যমুনা সেতু এবং দ্বিতীয় পদ্মা সেতু নির্মাণ, সারাদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থায় বিপ্লব আনতে ঢাকা-চট্টগ্রাম এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, শহুরে গণপরিবহণ ব্যবস্থার আধুনিকায়নে পাতাল রেল প্রকল্প।
এই মেগা প্রজেক্টগুলোর অর্থায়নে বাংলাদেশ চীনের কাছ থেকে প্রথাগত বাণিজ্যিক ঋণের পরিবর্তে কনসেশনাল লোন বা রেয়াতি ঋণ এবং অনুদানের একটি নতুন মিশ্রণ বা ‘ফাইন্যান্সিং ব্লেন্ড’ অর্জনের চেষ্টা করছে। বাংলাদেশের বর্তমান সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে কম সুদে ও দীর্ঘ গ্রেস পিরিয়ডসহ (ঋণ পরিশোধ শুরুর আগের সময়) এই ঋণ প্রাপ্তি দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ না বাড়িয়ে অবকাঠামোগত উন্নয়ন নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে একটি বড় ধরনের ভূ-অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করবে।
বাংলাদেশের পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অভিযোজনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে আলোচিত ও সংবেদনশীল প্রকল্প হলো ‘তিস্তা মহাপ্রকল্প’। উত্তরবঙ্গের বিশাল অঞ্চলের কৃষি, অর্থনীতি এবং পরিবেশের ভাগ্য এই প্রকল্পের ওপর নির্ভরশীল। ভারতের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি ঝুলে থাকায় বাংলাদেশ তার নিজস্ব জলসীমায় এই নদী অববাহিকার সামগ্রিক ব্যবস্থাপনার জন্য চীনের কারিগরি ও আর্থিক সহায়তার ওপর বিশেষ জোর দিচ্ছে।
এই সফরে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন ও তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনায় চীনের সহায়তার বিষয়টি চূড়ান্ত রূপ পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ভূ-রাজনীতির নিরিখে এটি একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল পদক্ষেপ। চীনের অত্যন্ত উন্নত ড্যাম নির্মাণ, নদী ড্রেজিং এবং পানি সংরক্ষণ প্রযুক্তির মাধ্যমে উত্তরবঙ্গে শুষ্ক মৌসুমে পানির অভাব দূর করা এবং বর্ষা মৌসুমে বন্যা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। তবে এই প্রকল্পের বাস্তবায়ন বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ সীমানার মধ্যে হলেও, ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এটি আঞ্চলিক রাজনীতিতে কৌশলগত দরকষাকষির একটি নতুন ক্ষেত্র তৈরি করছে।
বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যকার সম্পর্কের অন্যতম প্রাচীন এবং অবিচ্ছেদ্য স্তম্ভ হলো প্রতিরক্ষা সহযোগিতা। বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকায়ন এবং ‘ফোর্সেস গোল’ অর্জনে চীন ঐতিহাসিকভাবেই প্রধান প্রধান সামরিক সরঞ্জাম (যেমন- সাবমেরিন, করভেট, ফ্রিগেট এবং ফাইটার জেট) সরবরাহ করে আসছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই সফরে সামরিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতাকে কেবল ‘ক্রেতা-বিক্রেতার’ সম্পর্ক থেকে বের করে এনে প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং যৌথ উৎপাদনের স্তরে উন্নীত করার বিষয়ে আলোচনা হচ্ছে। এর ফলে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী এবং বিমানবাহিনীর কারিগরি সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে এবং স্থানীয়ভাবে সামরিক সরঞ্জামের রক্ষণাবেক্ষণ ও ওভারহোলিং ক্ষমতা জোরদার হবে, যা দেশের সামগ্রিক জাতীয় নিরাপত্তাকে আরও স্বাবলম্বী করে তুলবে।
অবকাঠামো ও সামরিক খাতের বাইরে, এই সফরের একটি অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক দিক হলো ডালিয়ানে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ১৭তম ‘সামার ডাভোস’ সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণ। এই বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্মে বিশ্বনেতা ও বহুজাতিক কর্পোরেশনের প্রধানদের সামনে বাংলাদেশ তার সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক সংস্কার এবং অনুকূল বিনিয়োগ পরিবেশের কথা তুলে ধরবে, যা দেশে সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণে সাহায্য করবে।
একইসঙ্গে, চীনের প্রস্তাবিত বৈশ্বিক উন্নয়ন রূপরেখা গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ (জিডিআই) এ বাংলাদেশের প্রাতিষ্ঠানিক অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি এই সফরে চূড়ান্ত হতে যাচ্ছে। বেইজিংয়ের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) যদি হয় অবকাঠামোগত সংযোগের প্রতীক, তবে জিডিআই হলো দারিদ্র্য বিমোচন, খাদ্য নিরাপত্তা, জলবায়ু অর্থায়ন এবং ডিজিটাল অর্থনীতির মতো টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের একটি আর্থিক ও প্রযুক্তিগত ফ্রেমওয়ার্ক। জিডিআইতে যুক্ত হওয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশ জাতিসংঘের উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে চীনের কাছ থেকে বিশেষ প্রযুক্তিগত ও আর্থিক তহবিল ব্যবহারের সুযোগ পাবে।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে ভৌগোলিক ও ঐতিহাসিকভাবে ভারত একটি অপরিহার্য ফ্যাক্টর। তারেক রহমানের প্রথম দ্বিপাক্ষিক সফরে চীন ও মালয়েশিয়াকে বেছে নেওয়া এবং বেইজিংয়ের সঙ্গে গভীর অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত সংযোগ স্থাপন করা নয়া দিল্লির কৌশলগত মহলে স্বাভাবিকভাবেই গভীর মনোযোগ এবং একধরনের নিরাপত্তা উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে, ‘তিস্তা মহাপ্রকল্প’ এবং চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সামরিক ও কৌশলগত ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধির বিষয়টি ভারতের ভূ-রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশে অত্যন্ত সংবেদনশীল।
ভারতের শঙ্কা হলো, শিলিগুড়ি করিডোর বা ‘চিকেনস নেক’-এর কাছাকাছি কোনো অঞ্চলে চীনের কারিগরি ও আর্থিক উপস্থিতির ফলে তাদের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর নিরাপত্তা বলয় প্রভাবিত হতে পারে। একইসঙ্গে, বাংলাদেশের সামরিক আধুনিকায়নে চীনের প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি স্থানান্তরের বিষয়টিও ভারতের আঞ্চলিক আধিপত্যের সমীকরণে একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের সরকারকে অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও দূরদর্শী ভারসাম্যমূলক কূটনীতির পরীক্ষা দিতে হবে। ঢাকাকে বেইজিংয়ের কাছে এটি পরিষ্কার করতে হচ্ছে যে, চীনের সঙ্গে উন্নয়ন অংশীদারিত্ব সম্পূর্ণ অর্থনৈতিক ও অবকাঠামো-কেন্দ্রিক, যা কোনো তৃতীয় দেশের নিরাপত্তার জন্য হুমকি নয়। ভারতের এই কৌশলগত উদ্বেগ নিরসনে বাংলাদেশ একাধারে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার পথ খোলা রাখছে এবং এটি প্রমাণ করার চেষ্টা করছে যে, পরাশক্তিগুলোর আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ঢাকা কোনো নির্দিষ্ট ব্লকের দিকে ধাবিত হচ্ছে না, বরং নিজস্ব জাতীয় স্বার্থকেই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
দক্ষিণ এশিয়া এবং সামগ্রিক ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মূল কৌশলগত চালিকাশক্তি হলো তাদের ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল, যার প্রধান লক্ষ্য এই অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবকে প্রতিহত করা। এই বৈশ্বিক ক্ষমতার লড়াইয়ের কেন্দ্রে অবস্থান করছে বাংলাদেশ। তারেক রহমানের এই সফরে চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ এবং গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ এর প্রতি বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান প্রাতিষ্ঠানিক ঝোঁক ওয়াশিংটন-ঢাকা সম্পর্কে নতুন এক ধরনের ভূ-রাজনৈতিক চাপের সৃষ্টি করতে পারে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তার পশ্চিমা মিত্ররা দীর্ঘ দিন ধরেই ঢাকাকে বেইজিংয়ের ঋণ-নির্ভর অবকাঠামো উন্নয়ন বা ‘ডেবট-ট্র্যাপ ডিপ্লোম্যাসি’ বিষয়ে সতর্ক করে আসছে। তবে বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে ঋণ ব্যবস্থাপনা পরিচালনা করছে। ২০২৬ সালের এই নতুন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে, প্রথম সফরেই চীনের সঙ্গে ১ ট্রিলিয়ন টাকার মেগা প্রজেক্টের প্রস্তাবনা এবং বৈশ্বিক ফোরামে চীনের এজেন্ডার সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করার ফলে ওয়াশিংটন ঢাকার ওপর বহুমাত্রিক রাজনৈতিক বা বাণিজ্য-সম্পর্কিত চাপ সৃষ্টি করতে পারে। জেনারেলাইজড সিস্টেম অব প্রেফারেন্সেস (জিএসপি) সুবিধা, তৈরি পোশাকের বাজার কিংবা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও মানবাধিকারের মতো বিষয়গুলোকে ওয়াশিংটন প্রায়শই তাদের কৌশলগত স্বার্থে লিভারেজ হিসেবে ব্যবহার করে থাকে। ফলে, বেইজিংয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ানোর পাশাপাশি ওয়াশিংটনের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সুসম্পর্ক বজায় রাখা বাংলাদেশের জন্য একটি বড় ধরনের মনস্তাত্ত্বিক ও কৌশলগত চ্যালেঞ্জ।
তারেক রহমানের এই মালয়েশিয়া ও চীন সফরটি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত থাকবে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের কাঠামোগত বাস্তবতায় এই সফর প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশ তার প্রথাগত একমুখী বা দ্বিমুখী কূটনৈতিক নির্ভরতা থেকে বের হয়ে এসে একটি বহুমাত্রিক এবং সুদূরপ্রসারী কূটনৈতিক বৈচিত্র্যায়ন প্রক্রিয়ায় প্রবেশ করেছে। প্রথম বিদেশ সফর হিসেবে দক্ষিণ-পূর্ব ও পূর্ব এশিয়ার দুটি প্রধান অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক কেন্দ্রবিন্দুকে বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্তটি অত্যন্ত সুচিন্তিত এবং দেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করার একটি বাস্তবসম্মত প্রয়াস।
মালয়েশিয়ার সঙ্গে শ্রমবাজারের পদ্ধতিগত সংস্কার ও আসিয়ান সংযোগ এবং চীনের সঙ্গে ১ ট্রিলিয়ন টাকার মেগা প্রজেক্টের অর্থায়ন ও তিস্তা মহাপরিকল্পনার মতো সংবেদনশীল বিষয়ের অবতারণা নির্দেশ করে যে, বাংলাদেশ এখন আর ভূ-রাজনীতিতে কেবল একটি নিষ্ক্রিয় রাষ্ট্র নয়, বরং সে নিজের জাতীয় স্বার্থকে সামনে রেখে অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে দরকষাকষি করতে সক্ষম। পরাশক্তিগুলোর তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাঝেও ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত উদ্বেগকে সুনিপুণ কৌশলের মাধ্যমে সামাল দিয়ে বাংলাদেশ তার কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বজায় রাখতে পারলে, তা এই নতুন নেতৃত্বের কূটনৈতিক পরিপক্বতারই বহিঃপ্রকাশ হবে।
একবিংশ শতাব্দীকে বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাসে ‘এশীয় শতাব্দী’ হিসেবে অভিহিত করা হয়, যেখানে বৈশ্বিক জিডিপি এবং বাণিজ্যের মূল চালিকাশক্তি আটলান্টিক থেকে স্থানান্তরিত হয়ে প্রশান্ত মহাসাগরীয় ও এশীয় অঞ্চলে কেন্দ্রীভূত হচ্ছে। এই ঐতিহাসিক রূপান্তরের সময়ে বাংলাদেশের ‘লুক ইস্ট পলিসি’ বা পূর্বমুখী কূটনীতি কোনো সাময়িক কৌশল নয়, বরং এটি দেশের ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির মূল ভিত্তি।
এই সফরের মাধ্যমে বাংলাদেশ পূর্ব এশিয়ার উৎপাদন শৃঙ্খল, হালাল অর্থনীতি, সেমিকন্ডাক্টর শিল্প এবং চীনের গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ এর মতো শক্তিশালী অর্থনৈতিক ইকোসিস্টেমের সঙ্গে নিজেকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে যুক্ত করার যে রোডম্যাপ তৈরি করেছে, তা আগামী দশকগুলোতে দেশের শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান ও জিডিপি প্রবৃদ্ধিকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে। তবে এই অর্জিত কূটনৈতিক সম্ভাবনাগুলোর সফল বাস্তবায়ন নির্ভর করবে দেশের অভ্যন্তরীণ প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা, স্বচ্ছ আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়া এবং চুক্তিগুলোর দ্রুত ও সুচারু বাস্তবায়নের ওপর। সামগ্রিকভাবে, এই সফর বাংলাদেশকে একটি উদীয়মান আঞ্চলিক অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তরিত করার পথে একটি অত্যন্ত সফল ও দূরদর্শী পদক্ষেপ হিসেবে ইতিহাসের পাতায় স্থান করে নেবে।
.png)

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফরের গন্তব্য মালয়েশিয়া, একটি বহুমাত্রিক তাৎপর্য বহন করে। এটি নিছক কূটনৈতিক সৌজন্য নয়; বরং নতুন সরকারের অগ্রাধিকার, আঞ্চলিক বাস্তবতা এবং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক প্রয়োজনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত।
৫ ঘণ্টা আগে
মালয়েশিয়া ও জাপানের বাজারে আম রপ্তানির সুযোগ সৃষ্টির খবর উৎসাহব্যঞ্জক। ঢাকা স্ট্রিমে এ বিষয়ে যে প্রতিবেদন এসেছে, তাতে রপ্তানিকারকদের সঙ্গে আমচাষীরাও খুশি হবেন। মালয়েশিয়ার বাজারে আম রপ্তানির সম্ভাবনা নাকি বেশি জোরালো।
২০ ঘণ্টা আগে
বাংলাদেশে সুনীল অর্থনীতি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হলেও এর ভিত্তি হলো নির্ভরযোগ্য সমুদ্র-উপাত্ত। মৎস্যসম্পদ ব্যবস্থাপনা, অফশোর জ্বালানি অনুসন্ধান, সাবমেরিন কেবল স্থাপন, সামুদ্রিক গবেষণা এবং ভবিষ্যৎ গভীর সমুদ্র সম্পদ উন্নয়নের জন্য উচ্চমানের হাইড্রোগ্রাফিক তথ্য অপরিহার্য।
১ দিন আগে
আমরা বাবাদের দেখি উপার্জনকারী হিসেবে। রক্ষাকারী হিসেবে। দায়িত্ব পালনকারী হিসেবে। কিন্তু মানুষ হিসেবে দেখি কতটা? সম্ভবত খুব কম। তাই বাবা দিবস এলেই আমার ফুল, কেক বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টগুলোর কথা মনে হয় না। আমার মনে পড়ে সেই স্টেশন।
১ দিন আগে