তৌফিক হাসান

চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারি বাসভবন ‘গণভবন’ এখন জুলাই স্মৃতি জাদুঘর। গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তিতে গত ৫ আগস্ট জাদুঘরটি সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে। তবে এটি শুধু চব্বিশের জুলাই নয়, আওয়ামী লীগের ফ্যাসিবাদী শাসনামলের নিপীড়ন-নৃশংসতার সাক্ষী।
বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) জাদুঘরটি সরেজমিনে দেখা যায়, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের গুম, খুন ও নির্যাতনসহ সকল অপকর্মের চিত্র এতে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
আওয়ামী লীগ বিরোধী রাজনৈতিক দল ও অন্যান্যদের ওপর চালানো নিপীড়ন, পিলখানায় বিডিআর হত্যা ও শাপলা চত্বরের ঘটনার প্রতীকী উপস্থাপনা রয়েছে জাদুঘরে।
বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের মহাপরিচালক তানজিম ইবনে ওয়াহাব জানান, প্রথম দিনেই চার হাজারের বেশি মানুষ জাদুঘর দেখতে এসেছেন এবং ১৪ আগস্ট পর্যন্ত অনলাইনের সব টিকিট বিক্রি হয়ে গেছে। তিনি বলেন, ‘ফ্যাসিবাদের পতন বুঝতে হলে তার উত্থান বোঝাও জরুরি। সে কারণে নিচতলায় ১৬ বছরের অত্যাচার ও গুম-খুনের গল্প সাজানো হয়েছে।’

শুরুতেই প্রতীকী কবর ও ভাস্কর্য
জাদুঘরের মূল ফটক দিয়ে ঢুকেই দেখা মিলবে সবুজ ঘাসে মোড়ানো ৪ হাজার প্রতীকী কবর। যেখানে শহীদদের পাশাপাশি বিগত ১৬ বছরে গুম ও হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়া ব্যক্তিদের নামের ফলক রয়েছে। যেখানে শুধু শহীদ কিংবা আওয়ামী সহিংসতায় নিহত ব্যক্তির নাম নয়, রয়েছে ১৬ বছর গুম-নির্যাতনের শিকার হওয়া ব্যক্তিরও নাম।
প্রতীকী কবর পার হলেই চোখে পড়ে, জুলাই আন্দোলনে শহীদ, আন্দোলনকারী ও নির্যাতনের শিকার হওয়া ব্যক্তিদের ভাস্কর্য। তাদের ভাস্কর্যের পাশে কে কখন কীভাবে শহীদ কিংবা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, তার বিবরণও দেওয়া হয়েছে।
মূল ভবনের শুরুতেই গুম ও টর্চার সেল
প্রতীকী কবর ও ভাস্কর্য দেখার পর জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের মূল ভবনে প্রবেশ করলেই চোখে পড়বে শেখ হাসিনার মাথা-কাটা একটি ছোট ভাস্কর্য। তার পাশেই শেখ হাসিনার দুঃশাসনের সঙ্গী সালমান এফ রহমানসহ আওয়ামী লীগের বিভিন্ন নেতার মাথা-কাটা ছোট ভাস্কর্য। এর পাশেই একটি ছোট রুমে হাসিনার ব্যবহৃত চেয়ার ও সরঞ্জামাদি রাখার ছোট টেবিল। সেখানে এলইডি লাইটে লেখা উঠছে, ‘রাজাকারের নাতিপুতি, নিজেকে মাবুদ মনে করে’। এছাড়া সেখানে দুটি স্ক্রিন দেওয়া আছে, যে স্ক্রিনে দর্শনার্থীরা দেখতে পারছেন চব্বিশের ৫ আগস্টের গণভবনের চিত্র।
প্রবেশমুখ থেকে ভেতরে দেখার জন্য এগোলে প্রথমে যে রুমটি চোখে পড়ে তার নাম টর্চার সেল। সেখানে আওয়ামী আমলে বিরোধী পক্ষকে টর্চার করার জন্য কাঠের তৈরি ইলেকট্রিক চেয়ারসহ চাবুক, ড্রিল মেশিন, এসএমজি অস্ত্রের ম্যাগজিন রাখা হয়েছে। যেগুলো আওয়ামী আমলে তৈরি বিভিন্ন আয়নাঘর থেকে পাওয়া গেছে বলে ওখানে অবস্থানরত কর্মকর্তারা জানান।

টর্চার সেলের পাশের রুমটি গুম-ঘর নামে পরিচিত। সে ঘরে গত ১৬ বছর গুম ও হত্যার শিকার হওয়া ব্যক্তিদের ব্যবহৃত পোশাক, জুতা, মোবাইল, চিঠিসহ বন্দী থাকা সময়ে দেয়ালে লেখা গল্প এবং ছবি প্রদর্শন করা হয়েছে। এছাড়া গুম হওয়া অনেক ব্যক্তির ছবি কাঠে খোদাই করে রাখা হয়েছে। এছাড়া রুমের বাইরের অংশে গুমঘর কিংবা আয়নাঘর দেখার জন্য ভিআর ও মিনিয়াচার মডেল রাখা হয়েছে। ভিআর ও মিনিয়াচার মডেলে ঘরগুলো কেমন ছিল, সেখানে কী থাকত ও গুম হওয়া ব্যক্তিরা কী লিখতেন, তা ফুটে উঠেছে।
ফুটে উঠেছে লাল ফোনের ইতিহাসও
টর্চার সেল ও গুমঘরের পর রয়েছে শেখ হাসিনার অফিস ঘর। যে ঘরে ৩ টেবিলে ৬টি লাল ফোন রয়েছে। সে ফোনগুলোর পাশে শেখ হাসিনার কথা বলা বিভিন্ন নম্বরের তালিকা ও নেতার নাম দেওয়া হয়েছে। দর্শনার্থীদেরও খুব আগ্রহ নিয়ে ফোনের রেকর্ড শুনতে দেখা গেছে।
তারা কী শুনছেন জানতে চাইলে তেজগাঁও থেকে বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরতে আসা শহীদুল ইসলাম স্ট্রিমকে বলেন, ‘উনি তো অনেকভাবে নির্দেশনা দিছেন। এটা খারাপ নির্দেশনা, কোনো ভালো নির্দেশনা দেন নাই। ছাত্রদেরকে মারার জন্য বিভিন্নভাবে বলছেন।’

আরেক যুবককে ফোন হাতে বলতে শোনা যায়, ‘আপারে একটাই কথা বলি, ভারতে থাইকা ষড়যন্ত্র কইরা লাভ নাই। বাংলাদেশে ফিরা আসেন, আমরা আপনারে শাহবাগে দেখে নেব।’
শুধু দর্শনার্থীই নন, স্ট্রিমের পক্ষ থেকে দুটি রেকর্ড শোনার চেষ্টা করা হয়। এর মধ্যে একটি ফজলে নূর তাপসের সঙ্গে শেখ হাসিনার কথোপকথন। এই কথোপকথনে শোনা যায়, তাপস শেখ হাসিনাকে বলছেন শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমন নামে একজন রয়েছেন, সে এখন কারাগারে রয়েছে। কিন্তু সে বিদেশে অনেক সন্ত্রাসীদের সঙ্গে কথা বলে দেশে সন্ত্রাসীদের নামাচ্ছে। তখন হাসিনা তাপসকে জিজ্ঞেস করেন, সব সন্ত্রাসীই তো বাইরে। ইমনও কি বাইরে? উত্তরে তাপস বলেন, ইমন কারাগারে, তাকে এখন একটি বিশেষ সেলে বন্দী করতে হবে। তখন শেখ হাসিনা বলেন, হুম।
আরেকটি কথোপকথন ছিল শাহজাহান খানের সঙ্গে। সেখানে হাসিনা শাহজাহান খানকে বলেন, ‘আমাদের যতগুলো ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান পুড়িয়ে ধ্বংস করেছে, ওদের সব কটার যতগুলো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান আছে সবগুলো ধ্বংস করে দিতে হবে।’

পিলখানা ও শাপলাসহ রাজনৈতিক নির্যাতনের বিভিন্ন চিত্র
জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের নিচতলার একপাশে যেমন টর্চার সেল, গুম-ঘর ও লাল টেলিফোন রয়েছে, তেমনি অন্য পাশে বিডিআর বিদ্রোহ, শাপলা চত্বরসহ রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডও রয়েছে। অপর পাশের রুমগুলোতে প্রবেশ করলে দেখা যায়, সেখানে বিএনপিসহ আওয়ামী বিরোধী বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ওপর নিপীড়ন, বিডিআর বিদ্রোহ, শাপলা চত্বরের ঘটনার শিকার হওয়া ব্যক্তিদের সরঞ্জামাদিসহ বিভিন্ন জিনিসপত্র ও সংবাদের কাটিং প্রদর্শন করা হয়েছে।
একই সঙ্গে বিডিআর বিদ্রোহেরও টেলিফোন কথোপকথন ও তথ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়েছে। সেই টেলিফোনে সেনা সদস্যদের আর্তনাদের কথাও শোনা গেছে। এছাড়া একটি রুমে ছাত্রলীগের সহিংসতার চিত্রও প্রদর্শন করা হয়েছে। আর ওই সময়কার অডিটোরিয়ামটিতে জুলাই আন্দোলন নিয়ে তৈরি করা বিভিন্ন তথ্যচিত্র প্রদর্শন করা হচ্ছে।

দ্বিতীয় তলায় ৩৬ জুলাই
জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের নিচতলা ১৬ বছরের নৃশংসতা দিয়ে ঘেরা থাকলেও দ্বিতীয় তলাটি পুরোপুরি জুলাইয়ের ৩৬ দিনকে কেন্দ্র করে সাজানো হয়েছে। সেখানে ৩৬টি শহীদ হওয়া ব্যক্তিদের ব্যবহৃত পোশাকসহ অন্যান্য জিনিসপত্র যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে প্রতিটা দিনে ঘটে যাওয়া ঘটনার বিভিন্ন চিত্র।
তলাটিতে প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দ্বারা আন্দোলনকারীদের ওপর চালানো হত্যাকাণ্ড, বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়া আন্দোলন ও প্রবাসীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিবাদ ও আন্দোলনের ভিডিওচিত্র। এছাড়া যেখানে আন্দোলনকারীদের পোশাক প্রদর্শন করা হয়েছে, সেখানেও তাদের আন্দোলনের ভিডিও প্রদর্শন করা হচ্ছে। পাশাপাশি জুলাইয়ের সময়কার বিভিন্ন আলোকচিত্রও প্রদর্শন করা হয়েছে। এমনকি জুলাইয়ে শহীদ হওয়া ৩ শিশুর ভাস্কর্য ও শহীদ নাফিজকে বহনকারী রিকশাটিও রাখা হয়েছে। এছাড়া একটি লাইব্রেরি তৈরি করে সেখানে জুলাই অভ্যুত্থান কেন্দ্রিক বিভিন্ন বই রাখা হয়েছে, যা দর্শনার্থীরা সেখানে বসেই পড়ার সুযোগ পাচ্ছেন।
পরিবর্তন নেই হাসিনার রুমের
ভবনটির সকল রুমেরই পরিবর্তন ঘটালেও এই ভবনে গত ১৬ বছর অবস্থান করা শেখ হাসিনার রুমের কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি। তার ব্যবহৃত খাট, টেবিল-চেয়ার সবই রাখা হয়েছে। শুধু এগুলো জুলাই শহীদদের সরঞ্জামাদি দিয়ে সাজানো হয়েছে।

আর্তনাদ-বেদনার সুর দর্শনার্থীদের ভাষ্যে
জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর উন্মুক্ত হওয়ার পর আজ সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত ৪ হাজারের অধিক মানুষ প্রবেশ করেছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের মহাপরিচালক তানজিম ইবনে ওয়াহাব। স্ট্রিমকে তিনি বলেন, ‘আজকে প্রথম দিনেই চার হাজারের অধিক মানুষ জাদুঘর দেখতে এসেছে। এছাড়া অনলাইনে ১৪ই আগস্ট পর্যন্ত সব টিকিট বিক্রি হয়ে গেছে।’
আগত দর্শনার্থীদের সঙ্গে কথা বলেছে স্ট্রিম। তাদের কথায় পাওয়া গেছে আর্তনাদ ও বেদনার সুর।
মোহাম্মদপুর থেকে বন্ধুদের সঙ্গে জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর দেখতে এসেছেন জামিয়া রাহমানিয়া ইসলামিয়া মাদ্রাসার শিক্ষার্থী শরিফুল ইসলাম। জুলাইয়ের আবেগ প্রকাশ করে স্ট্রিমকে তিনি বলেন, ‘অনুভূতি তো সবসময় ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব না। আমরা যখন পত্রিকার কাগজে পড়তাম এরকম হয়েছে, কিন্তু ওই বিষয়টা যখন দেখলাম তখন আসলে তখনকার অনুভূতি কিছুটা জাগ্রত হয় যে কী রকম বিভীষিকাময় অবস্থা ছিল। এটা আসলে ভাষায় প্রকাশ করা অনেকটা অসম্ভব।’
রাজধানীর বনশ্রী থেকে পরিবারসহ জাদুঘর দেখতে এসেছেন নার্গিস রায়হান। নিচতলা ঘুরে দ্বিতীয় তলায় উঠেই শেখ হাসিনার ওপর ক্ষোভ ঝাড়তে শুরু করেন তিনি। এ সময় স্ট্রিমকে তিনি বলেন, ‘অনুভূতি প্রকাশ করতে গেলে তো এখন ভাষা অন্যরকম হয়ে যাবে। এতটাই নোংরা কাজ করে গেছে, মানে এটা ভাষায় বলার মতো না।’
সাভার থেকে পরিবার নিয়ে এসেছিলেন নজরুল ইসলাম। জাদুঘর ঘোরা শেষে স্ট্রিমকে তিনি বলেন, ‘শহীদদের বিভিন্ন স্মৃতি, তারপর হলো তাদের যে পোশাক-আশাক, ব্যবহৃত যত সামগ্রী আছে সবগুলো দেখলাম। আসলে যখন দেখছি তখন খুব নার্ভাস লাগছে। যে আসলে এই ধরনের ঘটনা বাস্তবে দেখা তো অনেক হয়েছে, নার্ভাস ফিল করছিলাম অনেক।’

চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারি বাসভবন ‘গণভবন’ এখন জুলাই স্মৃতি জাদুঘর। গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তিতে গত ৫ আগস্ট জাদুঘরটি সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে। তবে এটি শুধু চব্বিশের জুলাই নয়, আওয়ামী লীগের ফ্যাসিবাদী শাসনামলের নিপীড়ন-নৃশংসতার সাক্ষী।
বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) জাদুঘরটি সরেজমিনে দেখা যায়, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের গুম, খুন ও নির্যাতনসহ সকল অপকর্মের চিত্র এতে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
আওয়ামী লীগ বিরোধী রাজনৈতিক দল ও অন্যান্যদের ওপর চালানো নিপীড়ন, পিলখানায় বিডিআর হত্যা ও শাপলা চত্বরের ঘটনার প্রতীকী উপস্থাপনা রয়েছে জাদুঘরে।
বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের মহাপরিচালক তানজিম ইবনে ওয়াহাব জানান, প্রথম দিনেই চার হাজারের বেশি মানুষ জাদুঘর দেখতে এসেছেন এবং ১৪ আগস্ট পর্যন্ত অনলাইনের সব টিকিট বিক্রি হয়ে গেছে। তিনি বলেন, ‘ফ্যাসিবাদের পতন বুঝতে হলে তার উত্থান বোঝাও জরুরি। সে কারণে নিচতলায় ১৬ বছরের অত্যাচার ও গুম-খুনের গল্প সাজানো হয়েছে।’

শুরুতেই প্রতীকী কবর ও ভাস্কর্য
জাদুঘরের মূল ফটক দিয়ে ঢুকেই দেখা মিলবে সবুজ ঘাসে মোড়ানো ৪ হাজার প্রতীকী কবর। যেখানে শহীদদের পাশাপাশি বিগত ১৬ বছরে গুম ও হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়া ব্যক্তিদের নামের ফলক রয়েছে। যেখানে শুধু শহীদ কিংবা আওয়ামী সহিংসতায় নিহত ব্যক্তির নাম নয়, রয়েছে ১৬ বছর গুম-নির্যাতনের শিকার হওয়া ব্যক্তিরও নাম।
প্রতীকী কবর পার হলেই চোখে পড়ে, জুলাই আন্দোলনে শহীদ, আন্দোলনকারী ও নির্যাতনের শিকার হওয়া ব্যক্তিদের ভাস্কর্য। তাদের ভাস্কর্যের পাশে কে কখন কীভাবে শহীদ কিংবা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, তার বিবরণও দেওয়া হয়েছে।
মূল ভবনের শুরুতেই গুম ও টর্চার সেল
প্রতীকী কবর ও ভাস্কর্য দেখার পর জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের মূল ভবনে প্রবেশ করলেই চোখে পড়বে শেখ হাসিনার মাথা-কাটা একটি ছোট ভাস্কর্য। তার পাশেই শেখ হাসিনার দুঃশাসনের সঙ্গী সালমান এফ রহমানসহ আওয়ামী লীগের বিভিন্ন নেতার মাথা-কাটা ছোট ভাস্কর্য। এর পাশেই একটি ছোট রুমে হাসিনার ব্যবহৃত চেয়ার ও সরঞ্জামাদি রাখার ছোট টেবিল। সেখানে এলইডি লাইটে লেখা উঠছে, ‘রাজাকারের নাতিপুতি, নিজেকে মাবুদ মনে করে’। এছাড়া সেখানে দুটি স্ক্রিন দেওয়া আছে, যে স্ক্রিনে দর্শনার্থীরা দেখতে পারছেন চব্বিশের ৫ আগস্টের গণভবনের চিত্র।
প্রবেশমুখ থেকে ভেতরে দেখার জন্য এগোলে প্রথমে যে রুমটি চোখে পড়ে তার নাম টর্চার সেল। সেখানে আওয়ামী আমলে বিরোধী পক্ষকে টর্চার করার জন্য কাঠের তৈরি ইলেকট্রিক চেয়ারসহ চাবুক, ড্রিল মেশিন, এসএমজি অস্ত্রের ম্যাগজিন রাখা হয়েছে। যেগুলো আওয়ামী আমলে তৈরি বিভিন্ন আয়নাঘর থেকে পাওয়া গেছে বলে ওখানে অবস্থানরত কর্মকর্তারা জানান।

টর্চার সেলের পাশের রুমটি গুম-ঘর নামে পরিচিত। সে ঘরে গত ১৬ বছর গুম ও হত্যার শিকার হওয়া ব্যক্তিদের ব্যবহৃত পোশাক, জুতা, মোবাইল, চিঠিসহ বন্দী থাকা সময়ে দেয়ালে লেখা গল্প এবং ছবি প্রদর্শন করা হয়েছে। এছাড়া গুম হওয়া অনেক ব্যক্তির ছবি কাঠে খোদাই করে রাখা হয়েছে। এছাড়া রুমের বাইরের অংশে গুমঘর কিংবা আয়নাঘর দেখার জন্য ভিআর ও মিনিয়াচার মডেল রাখা হয়েছে। ভিআর ও মিনিয়াচার মডেলে ঘরগুলো কেমন ছিল, সেখানে কী থাকত ও গুম হওয়া ব্যক্তিরা কী লিখতেন, তা ফুটে উঠেছে।
ফুটে উঠেছে লাল ফোনের ইতিহাসও
টর্চার সেল ও গুমঘরের পর রয়েছে শেখ হাসিনার অফিস ঘর। যে ঘরে ৩ টেবিলে ৬টি লাল ফোন রয়েছে। সে ফোনগুলোর পাশে শেখ হাসিনার কথা বলা বিভিন্ন নম্বরের তালিকা ও নেতার নাম দেওয়া হয়েছে। দর্শনার্থীদেরও খুব আগ্রহ নিয়ে ফোনের রেকর্ড শুনতে দেখা গেছে।
তারা কী শুনছেন জানতে চাইলে তেজগাঁও থেকে বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরতে আসা শহীদুল ইসলাম স্ট্রিমকে বলেন, ‘উনি তো অনেকভাবে নির্দেশনা দিছেন। এটা খারাপ নির্দেশনা, কোনো ভালো নির্দেশনা দেন নাই। ছাত্রদেরকে মারার জন্য বিভিন্নভাবে বলছেন।’

আরেক যুবককে ফোন হাতে বলতে শোনা যায়, ‘আপারে একটাই কথা বলি, ভারতে থাইকা ষড়যন্ত্র কইরা লাভ নাই। বাংলাদেশে ফিরা আসেন, আমরা আপনারে শাহবাগে দেখে নেব।’
শুধু দর্শনার্থীই নন, স্ট্রিমের পক্ষ থেকে দুটি রেকর্ড শোনার চেষ্টা করা হয়। এর মধ্যে একটি ফজলে নূর তাপসের সঙ্গে শেখ হাসিনার কথোপকথন। এই কথোপকথনে শোনা যায়, তাপস শেখ হাসিনাকে বলছেন শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমন নামে একজন রয়েছেন, সে এখন কারাগারে রয়েছে। কিন্তু সে বিদেশে অনেক সন্ত্রাসীদের সঙ্গে কথা বলে দেশে সন্ত্রাসীদের নামাচ্ছে। তখন হাসিনা তাপসকে জিজ্ঞেস করেন, সব সন্ত্রাসীই তো বাইরে। ইমনও কি বাইরে? উত্তরে তাপস বলেন, ইমন কারাগারে, তাকে এখন একটি বিশেষ সেলে বন্দী করতে হবে। তখন শেখ হাসিনা বলেন, হুম।
আরেকটি কথোপকথন ছিল শাহজাহান খানের সঙ্গে। সেখানে হাসিনা শাহজাহান খানকে বলেন, ‘আমাদের যতগুলো ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান পুড়িয়ে ধ্বংস করেছে, ওদের সব কটার যতগুলো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান আছে সবগুলো ধ্বংস করে দিতে হবে।’

পিলখানা ও শাপলাসহ রাজনৈতিক নির্যাতনের বিভিন্ন চিত্র
জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের নিচতলার একপাশে যেমন টর্চার সেল, গুম-ঘর ও লাল টেলিফোন রয়েছে, তেমনি অন্য পাশে বিডিআর বিদ্রোহ, শাপলা চত্বরসহ রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডও রয়েছে। অপর পাশের রুমগুলোতে প্রবেশ করলে দেখা যায়, সেখানে বিএনপিসহ আওয়ামী বিরোধী বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ওপর নিপীড়ন, বিডিআর বিদ্রোহ, শাপলা চত্বরের ঘটনার শিকার হওয়া ব্যক্তিদের সরঞ্জামাদিসহ বিভিন্ন জিনিসপত্র ও সংবাদের কাটিং প্রদর্শন করা হয়েছে।
একই সঙ্গে বিডিআর বিদ্রোহেরও টেলিফোন কথোপকথন ও তথ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়েছে। সেই টেলিফোনে সেনা সদস্যদের আর্তনাদের কথাও শোনা গেছে। এছাড়া একটি রুমে ছাত্রলীগের সহিংসতার চিত্রও প্রদর্শন করা হয়েছে। আর ওই সময়কার অডিটোরিয়ামটিতে জুলাই আন্দোলন নিয়ে তৈরি করা বিভিন্ন তথ্যচিত্র প্রদর্শন করা হচ্ছে।

দ্বিতীয় তলায় ৩৬ জুলাই
জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের নিচতলা ১৬ বছরের নৃশংসতা দিয়ে ঘেরা থাকলেও দ্বিতীয় তলাটি পুরোপুরি জুলাইয়ের ৩৬ দিনকে কেন্দ্র করে সাজানো হয়েছে। সেখানে ৩৬টি শহীদ হওয়া ব্যক্তিদের ব্যবহৃত পোশাকসহ অন্যান্য জিনিসপত্র যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে প্রতিটা দিনে ঘটে যাওয়া ঘটনার বিভিন্ন চিত্র।
তলাটিতে প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দ্বারা আন্দোলনকারীদের ওপর চালানো হত্যাকাণ্ড, বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়া আন্দোলন ও প্রবাসীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিবাদ ও আন্দোলনের ভিডিওচিত্র। এছাড়া যেখানে আন্দোলনকারীদের পোশাক প্রদর্শন করা হয়েছে, সেখানেও তাদের আন্দোলনের ভিডিও প্রদর্শন করা হচ্ছে। পাশাপাশি জুলাইয়ের সময়কার বিভিন্ন আলোকচিত্রও প্রদর্শন করা হয়েছে। এমনকি জুলাইয়ে শহীদ হওয়া ৩ শিশুর ভাস্কর্য ও শহীদ নাফিজকে বহনকারী রিকশাটিও রাখা হয়েছে। এছাড়া একটি লাইব্রেরি তৈরি করে সেখানে জুলাই অভ্যুত্থান কেন্দ্রিক বিভিন্ন বই রাখা হয়েছে, যা দর্শনার্থীরা সেখানে বসেই পড়ার সুযোগ পাচ্ছেন।
পরিবর্তন নেই হাসিনার রুমের
ভবনটির সকল রুমেরই পরিবর্তন ঘটালেও এই ভবনে গত ১৬ বছর অবস্থান করা শেখ হাসিনার রুমের কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি। তার ব্যবহৃত খাট, টেবিল-চেয়ার সবই রাখা হয়েছে। শুধু এগুলো জুলাই শহীদদের সরঞ্জামাদি দিয়ে সাজানো হয়েছে।

আর্তনাদ-বেদনার সুর দর্শনার্থীদের ভাষ্যে
জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর উন্মুক্ত হওয়ার পর আজ সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত ৪ হাজারের অধিক মানুষ প্রবেশ করেছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের মহাপরিচালক তানজিম ইবনে ওয়াহাব। স্ট্রিমকে তিনি বলেন, ‘আজকে প্রথম দিনেই চার হাজারের অধিক মানুষ জাদুঘর দেখতে এসেছে। এছাড়া অনলাইনে ১৪ই আগস্ট পর্যন্ত সব টিকিট বিক্রি হয়ে গেছে।’
আগত দর্শনার্থীদের সঙ্গে কথা বলেছে স্ট্রিম। তাদের কথায় পাওয়া গেছে আর্তনাদ ও বেদনার সুর।
মোহাম্মদপুর থেকে বন্ধুদের সঙ্গে জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর দেখতে এসেছেন জামিয়া রাহমানিয়া ইসলামিয়া মাদ্রাসার শিক্ষার্থী শরিফুল ইসলাম। জুলাইয়ের আবেগ প্রকাশ করে স্ট্রিমকে তিনি বলেন, ‘অনুভূতি তো সবসময় ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব না। আমরা যখন পত্রিকার কাগজে পড়তাম এরকম হয়েছে, কিন্তু ওই বিষয়টা যখন দেখলাম তখন আসলে তখনকার অনুভূতি কিছুটা জাগ্রত হয় যে কী রকম বিভীষিকাময় অবস্থা ছিল। এটা আসলে ভাষায় প্রকাশ করা অনেকটা অসম্ভব।’
রাজধানীর বনশ্রী থেকে পরিবারসহ জাদুঘর দেখতে এসেছেন নার্গিস রায়হান। নিচতলা ঘুরে দ্বিতীয় তলায় উঠেই শেখ হাসিনার ওপর ক্ষোভ ঝাড়তে শুরু করেন তিনি। এ সময় স্ট্রিমকে তিনি বলেন, ‘অনুভূতি প্রকাশ করতে গেলে তো এখন ভাষা অন্যরকম হয়ে যাবে। এতটাই নোংরা কাজ করে গেছে, মানে এটা ভাষায় বলার মতো না।’
সাভার থেকে পরিবার নিয়ে এসেছিলেন নজরুল ইসলাম। জাদুঘর ঘোরা শেষে স্ট্রিমকে তিনি বলেন, ‘শহীদদের বিভিন্ন স্মৃতি, তারপর হলো তাদের যে পোশাক-আশাক, ব্যবহৃত যত সামগ্রী আছে সবগুলো দেখলাম। আসলে যখন দেখছি তখন খুব নার্ভাস লাগছে। যে আসলে এই ধরনের ঘটনা বাস্তবে দেখা তো অনেক হয়েছে, নার্ভাস ফিল করছিলাম অনেক।’
.png)

প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেছেন, সরকারের লক্ষ্য কেবল নতুন ভাতা চালু নয়, বরং অধিকারভিত্তিক কল্যাণরাষ্ট্র গড়া।
২ ঘণ্টা আগে
কক্সবাজারের মহেশখালী পাহাড় মৌজার সংরক্ষিত বনের ভেতর দিয়ে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) সড়ক নির্মাণ কার্যক্রমের ওপর দুই মাসের নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন হাইকোর্ট।
৩ ঘণ্টা আগে
মৌলভীবাজারের রাজনগরে কাওয়াদীঘি হাওরে কৃত্রিম জলাবদ্ধতায় আমন ধানের জমি ও বীজতলা পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় বিক্ষভ করেছে স্থানীয় কৃষকেরা। বিক্ষোভ শেষে তারা জেলা প্রশাসক বরাবর স্মারকলিপি দিয়েছেন।
৩ ঘণ্টা আগে
বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) নতুন মহাপরিচালক হিসেবে সাংবাদিক কাজী জেসিনকে এক বছরের জন্য নিয়োগ দিয়েছে সরকার। বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এ-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করে।
৩ ঘণ্টা আগে