leadT1ad

গণভোটের ফলাফলের ওপরেই কি অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ আর জুলাই সনদের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে

আমীন আল রশীদ
আমীন আল রশীদ

প্রকাশ : ২১ জানুয়ারি ২০২৬, ১৭: ৩৮
স্ট্রিম গ্রাফিক

বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার শপথ নিয়েছে বিদ্যমান সংবিধানের আলোকে। সুতরাং, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে একই দিনে হতে যাওয়া গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে যখন সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হবে, তখন কি এই সরকারের ক্ষমতায় থাকার কোনো বাধ্যবাধতা তৈরি হবে? বা সংবিধান সংশোধনের পুরো প্রক্রিয়াটি শেষ না হওয়া পর্যন্ত অন্তর্বর্তী সরকারকে দায়িত্ব পালন করতে হবে? এই বিষয়গুলো নিয়ে কেউ কেউ প্রশ্ন তুলছেন।

আবার, যদি অন্তর্বর্তী সরকার না থাকে তাহলে সংবিধান সংস্কার পরিষদই কি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পালন করবে? বা ওই সময়কালে সরকার পরিচালনা নিয়ে কোনো ধরনের সমস্যা বা জটিলতার সৃষ্টি হবে কি না?

এমন প্রশ্নও জনমনে আছে যে, গণভোটে হ্যাঁ জয়ী হওয়া মানেই কি জুলাই সনদের সবগুলো ধারা বা প্রস্তাব অনুমোদন করতে সংসদ বা সংবিধান সংস্কার পরিষদ বাধ্য থাকবে? কেউ কেউ এমন প্রশ্নও তুলছেন যে, গণভোটে ‘না’ জয়ী হলে জুলাই সনদের ভবিষ্যৎ কী?

সহজ ভাষায় প্রশ্নগুলোর উত্তর দেয়া যাক।

২০২৫-এর গেজেটে কী বলা হয়েছে

প্রথমত, জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫-এর গেজেটে কী বলা হয়েছে? বলা হয়েছে যে গণভোটে উপস্থাপিত প্রশ্নের উত্তরে প্রদত্ত সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট ‘হ্যাঁ’ সূচক হলে (ক) জাতীয় সংসদের সাধারণ নির্বাচনে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হবে, যারা সংবিধান সংস্কার বিষয়ে সকল ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারবে। (খ) জাতীয় নির্বাচনে নির্বাচিত প্রতিনিধিগণ একইসাথে জাতীয় সংসদের সদস্য এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। (গ) পরিষদ প্রথম অধিবেশন ‍শুরুর তারিখ হতে ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে জুলাই সনদ এবং গণভোটের ফলাফল অনুসারে সংবিধান সংস্কার সম্পন্ন করবে। সেটি সম্পন্ন হওয়ার পর পরিষদের কার্যক্রম সমাপ্ত হবে।

এখানে একটা বিষয় খুব স্পষ্ট। যারা জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হবেন, তারা প্রথম ৬ মাস অর্থাৎ ১৮০ দিন সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে কাজ করবেন। এই সময়ের মধ্যে জুলাই সনদে উল্লিখিত সংস্কার প্রস্তাবগুলোর ওপর আলাপ-আলোচনার মধ্য দিয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন যে, সনদের কোন কোন বিধানের কতটুকু তারা রাখবেন বা রাখবেন না।

তর্কের খাতিরে ধরা যাক গণভোটে ‘না’ জয়ী হলো। তখন কী হবে? প্রথম কথা হচ্ছে, গণভোটে ‘না’ জয়ী হলে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হবে না। অতএব, জুলাই সনদে বর্ণিত প্রস্তাবগুলোও আর আলোর মুখ দেখবে না।

পরিষদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যরা পুরো জুলাই সনদ অনুমোদনের পক্ষে ভোট দিতে পারেন। আবার যখন প্রতিটি প্রস্তাব নিয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ আলোচনা বিতর্ক হবে, তখন তারা চাইলে কোনো কোনো প্রস্তাব বাদও দিতে পারেন। কোনো কোনো প্রস্তাব সংশোধিত আকারে পাস হতে পারে। অর্থাৎ সংসদে যে প্রক্রিয়ায় সাধারণ আইন প্রণয়ন বা সংবিধান সংশোধনের সময় বিতর্ক হয়, আলাপ-আলোচনা হয়, জুলাই সনদ ইস্যুতেও সংসদে সেরকম আলোচনা হবে। স্পিকার এগুলো যখন ভোটে দেবেন, তখন সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যরা ‘হ্যাঁ’ বললেই কেবল সেগুলো অনুমোদিত হবে।

সংবিধান সংশোধনের সঙ্গে সম্পর্ক

জুলাই সনদের কিছু বিষয় সরাসরি সংবিধান সংশোধনের সঙ্গে সম্পর্কিত। যেমন সংবিধানের মূলনীতি পরিবর্তন। সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যরা যদি মনে করেন যে, সংবিধানের মূলনীতি পরিবর্তনের প্রয়োজন নেই বা যেভাবে আছে সেখানে তারা সংশোধন আনতে চান, অথবা তারা যদি মনে করেন যে, জুলাই সনদে যেভাবে আছে সেভাবেই তারা একমত—সেটিও ভোটে দিতে হবে।

এর বাইরে আরও কিছু বিষয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামতের প্রতিফলন ঘটবে। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে—সংসদের উচ্চকক্ষ, প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার মেয়াদ, রাষ্ট্রপতি নিয়োগ, সংসদে এমপিদের কথা বলার স্বাধীনতাসম্পর্কিত ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন, ডেপুটি স্পিকার ও গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় কমিটিগুলোর সভাপতি বিরোধী দল থেকে নিয়োগ। আশা করা যায় যে এসব প্রস্তাবের ওপর বিশদ আলোচনা ও বিতর্ক হবে। এর মধ্যে সংসদের উচ্চকক্ষের বিষয়ে যদি সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যরা একমত হন তাহলে একটি উচ্চকক্ষ গঠিত হবে। এর সদস্য সংখ্যা হবে একশো। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে এই একশো আসন বণ্টন হবে। সংশ্লিষ্ট দলগুলো এসব আসনের বিপরীতে তাদের সদস্য মনোনয়ন দেবে।

সংবিধান সংস্কারের বাইরে রাষ্ট্রের আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারের প্রস্তাব রয়েছে জুলাই সনদে। এসব সংস্কারের কতটুকু কীভাবে গৃহীত হবে, সে বিষয়েও পরিষদে দীর্ঘ আলাপ-আলোচনার অবকাশ রয়েছে।

তার মানে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত হলেই জুলাই সনদের বর্ণিত প্রস্তাবগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংবিধানে যুক্ত হয়ে যাবে বা সরকার সব প্রস্তাব মেনে নিতে বাধ্য থাকবে—বিষয়টা এমন নয়। যদিও শুরুতে জুলাই সনদে একটি বিধান ছিল। যদি নির্ধারিত ২৭০ দিনের মধ্যে সংস্কার পরিষদ জুলাই সনদে উল্লিখিত সংস্কার করতে ব্যর্থ হয় তাহলে সেগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংবিধানের অংশ হয়ে যাবে। কিন্তু সমালোচনার মুখে সরকার সেই বিধানটি বাতিল করে। সংবিধান সংস্কার পরিষদের মেয়াদ ২৭০ দিন থেকে কমিয়ে ১৮০ দিনে নিয়ে আসা হয়।

জুলাই সনদ কোনো অ্যাবসোলিউট ডকুমেন্ট নয়

দ্বিতীয়ত, যেভাবে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশের গেজেট প্রকাশিত হয়েছে, তাতে জুলাই সনদ এখন আর কোনো অ্যাবসোলিউট ডকুমেন্ট নয়। বরং এর প্রতিটি প্রস্তাব নিয়ে সংসদে তথা সংবিধান সংস্কার পরিষদে আলোচনা ও বিতর্কের অবকাশ রয়েছে। সেই আলোচনা ও বিতর্কের মধ্য দিয়ে যেসব প্রস্তাবের বিষয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য একমত হবেন শুধু সেগুলোই পাস হবে। রাষ্ট্র সংস্কারের যেসব বিষয়ে তাঁরা ঐকমত্যে পৌঁছাবেন, কেবল সেসব সংস্কার বাস্তবায়নেই সরকার বাধ্য থাকবে। আর সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যরা জুলাই সনদের যেসব বিষয়ে একমত হবেন, সেটি সংবিধানে যুক্ত হবে। অর্থাৎ, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলেই প্রস্তাবিত জুলাই সনদের পুরো ডকুমেন্টটি অবিকল সংবিধানে যুক্ত হয়ে যাবে—বিষয়টা এমন নয়।

অতীতের সংসদগুলোর সঙ্গে এবারের সংসদের পার্থক্য

এবার আসা যাক অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ প্রসঙ্গে। এই সরকার শপথ নিয়েছে বিদ্যমান সংবিধানের আলোকে এবং সেই শপথে তারা সংবিধান রক্ষার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। বিদ্যমান সংবিধানের ৭২ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, সংসদ নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার ৩০ দিনের মধ্যে সংসদের বৈঠক শুরু হবে।

রাষ্ট্রপতি সংসদের বৈঠক শুরু হওয়ার আগে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের প্রধানকে সরকার গঠনের জন্য আহ্বান জানাবেন। তার মানে, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরপরই নতুন সরকার গঠিত হবে এবং সংসদের অধিবেশন শুরু হয়ে যাবে। আর নতুন সরকার গঠনের মধ্য দিয়েই অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ শেষ হয়ে যাবে। তারপরে তাদের আর একদিনও আইনত এবং সংবিধানসম্মত উপায়ে ক্ষমতায় থাকার কোনো সুযোগ নেই।

অতীতের সংসদগুলোর সঙ্গে এবারের সংসদের পার্থক্য হবে শুধু এই যে, এবার সংসদ সদস্যরা প্রথম ৬ মাস অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে কাজ করবেন। যে সময়কালে তাঁরা জুলাই সনদে উল্লিখিত প্রস্তাবগুলোর ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবেন। এই কাজের সঙ্গে সরকারের দৈনন্দিন কাজের কোনো সম্পর্ক যেমন নেই, তেমনি কোনো দ্বন্দ্বও নেই। সংসদ সদস্যরা যখন সংসদে থাকবেন, তখন তারা আইনপ্রণেতা। আবার তাদের মধ্য যারা মন্ত্রী হবেন, তারা রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগের সদস্য হিসেবে অন্য দায়িত্ব পালন করবেন। অর্থাৎ অতীতের সরকারের মতোই তারা দৈনন্দিন কাজ করবেন, এবং সেইসাথে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে জুলাই সনদের ওপর তাদের মতামত দেবেন। সিদ্ধান্ত দেবেন।

যারা জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হবেন, তারা প্রথম ৬ মাস অর্থাৎ ১৮০ দিন সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে কাজ করবেন। এই সময়ের মধ্যে জুলাই সনদে উল্লিখিত সংস্কার প্রস্তাবগুলোর ওপর আলাপ-আলোচনার মধ্য দিয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন যে, সনদের কোন কোন বিধানের কতটুকু তারা রাখবেন বা রাখবেন না।

সংবিধান সংস্কার পরিষদের কার্যক্রম চলাকালীন অন্তর্বর্তী সরকারকে দায়িত্বে থাকতে হবে, এরকম কোনো বাধ্যবাধকতা যেমন নেই, তেমনি এটি সংবিধানসম্মতও নয়। অর্থাৎ অন্তর্বর্তী সরকার যদি জাতীয় নির্বাচন ও গণভোটের ফলাফল প্রকাশের পরে সরকার গঠন ও সংসদের বৈঠক শুরুর বিষয়ে কালক্ষেপণের চেষ্টা করে বা আরও কিছুদিন ক্ষমতায় থাকতে চায়, সেটি স্পষ্টতই সংবিধানের লঙ্ঘন হবে। এই সংবিধান সমুন্নত রাখার শপথ নিয়েই তারা দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন।

গণভোটে ‘না’ জয়ী হলে কী হবে

আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হবে। কেননা কোনো দল এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে ‘না’ ভোটের পক্ষে প্রচার চালাচ্ছে না। জুলাই সনদের অনেক বিষয়ে বিএনপির ভিন্নমত বা নোট অব ডিসেন্ট থাকলেও যখন সংবিধান সংস্কার পরিষদে বিষয়গুলো আলোচিত হবে সেখানে বিষয়গুলোর সুরাহা হতে পারে। অর্থাৎ বিএনপি যেসব বিষয়ে নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছে, পরিষদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যরা যদি সেগুলোর ব্যাপারে ‘না’ বলেন, তাহলে সেই প্রস্তাবগুলো বাতিল হয়ে যাবে। কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যরা যদি ‘হ্যাঁ’ বলেন তাহলে সেটা বিএনপিকে মেনে নিতে হবে।

তর্কের খাতিরে ধরা যাক গণভোটে ‘না’ জয়ী হলো। তখন কী হবে? প্রথম কথা হচ্ছে, গণভোটে ‘না’ জয়ী হলে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হবে না। অতএব, জুলাই সনদে বর্ণিত প্রস্তাবগুলোও আর আলোর মুখ দেখবে না। এটা হচ্ছে সাধারণ হিসাব। কিন্তু ‘না’ জয়ী হলেও জুলাই সনদে যেসব সংস্কার প্রস্তাব আনা হয়েছে, সেগুলো আরও বহু বছর ধরে রাজনীতি ও জনপরিসরে আলোচিত হতে থাকবে।

তাছাড়া, গণভোটে ‘না’ জয়ী হলেও ক্ষমতাসীন দল চাইলে জুলাই সনদের বর্ণিত প্রস্তাবগুলোর মধ্য দিয়ে সংবিধানের সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয়গুলো বিল আকারে সংসদে উত্থাপন করতে পারবে। এসব বিল সাধারণত আনেন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীরা। একজন সাধারণ সংসদ সদস্যও বিল আনতে পারেন। একে বলা হয় ‘বেসরকারি সদস্য বিল’। একইভাবে জুলাই সনদে উল্লিখিত সংস্কার প্রস্তাবগুলো ভিন্ন ভিন্ন বিল আকারে সংসদে যে কেউ উত্থাপন করতে পারবেন। সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যরা একমত হলে সেগুলো পাস হয়ে যাবে। সুতরাং, গণভোটে না জয়ী হলেই যে জুলাই সনদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার—বিষয়টা এমনও নয়।

  • আমীন আল রশীদ: সাংবাদিক ও লেখক
Ad 300x250

সম্পর্কিত