সংস্কৃতিকে ধর্মের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলার রাজনীতি

প্রকাশ : ১৯ এপ্রিল ২০২৬, ১৮: ৩৩
স্ট্রিম গ্রাফিক

চাঁদের চারপাশ প্রদক্ষিণ শেষে গত ১১ এপ্রিল সংবাদ সম্মেলনে যেদিন নিজেদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরলেন আমেরিকার নভোচারীরা, সেদিনই কোরআন অবমাননার অভিযোগ তুলে একজন পীরকে পিটিয়ে হত্যা করেছে বাংলাদেশের কিছু লোক। তার দুদিন পরেই এই দেশে উদযাপিত হয়েছে বাংলা বর্ষবরণ পয়লা বৈশাখের উৎসব—যে উৎসবের নাম নিয়ে এখনও এই দেশের মানুষেরা বিতর্ক করে। যে উৎসবের একটি অংশে ‘মঙ্গল’ শব্দটি থাকা এবং শোভাযাত্রায় পেঁচার ভাস্কর্য ব্যবহারকে ‘হিন্দুয়ানি সংস্কৃতি’ মনে করা হয়। ফলে সরকারও শোভাযাত্রার নাম পরিবর্তন করে ‘মঙ্গল’ শব্দটি ফেলে দেয়।

শিশুদের পাঠ্যবইতে সুফিয়া কামালের ‘আজিকার শিশু’ নামে একটি কবিতার কয়েকটি লাইন উদ্ধৃত করা যাক:
‘আমাদের যুগে আমরা যখন খেলেছি পুতুল খেলা
তোমরা এ যুগে সেই বয়সেই লেখাপড়া কর মেলা।
আমরা যখন আকাশের তলে ওড়ায়েছি শুধু ঘুড়ি
তোমরা এখন কলের জাহাজ চালাও গগন জুড়ি।’

কবিতাটিকে এই সময়ের বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশের তুলনা করে বলা যায়, পৃথিবীর মানুষ যখন চাঁদ কিংবা মঙ্গল গ্রহের রহস্য ভেদ করায় ব্যস্ত; যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নিয়ে মানুষ নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষায় রত; তখন আমাদের দেশের সংখ্যাগুরু মুসলমানদের একটি বিরাট অংশ কথিত ধর্মীয় অনুভূতি এবং মঙ্গল আর পেঁচা হিন্দু সংস্কৃতির অংশ কি না—তাই নিয়ে বাহাসে লিপ্ত। অথচ ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের নামে এই দেশে যা হয়েছে এবং যা হচ্ছে, তার পেছনে রয়েছে ধর্ম নিয়ে, বিশেষ করে ইসলাম নিয়ে অজ্ঞতা বা অস্পষ্টতা এবং রাষ্ট্রীয় আইনের দুর্বলতা। সর্বোপরি সংস্কৃতি বা সংস্কৃতির নানা আয়োজনকে ধর্মীয় মূল্যবোধ ও বিশ্বাসের সঙ্গে তুলনা করার বিপজ্জনক প্রবণতা।

প্রসঙ্গত, ৫০ বছরেরও বেশি সময় পরে প্রথমবারের মতো মানুষবাহী মহাকাশযান চাঁদের চারপাশে ‘স্লিংশট’ ঘুরে আসার পরে গত ১১ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রের হিউস্টনে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে নভোচারীরা এই ঘটনাকে ‘মানব ইতিহাসের সবচেয়ে গভীর মহাকাশ ভ্রমণ’ হিসেবে উল্লেখ করেন। যদি প্রশ্ন করা হয়, আমাদের দেশে মহাকাশবিজ্ঞান কতটুকু এগোলো বা আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চা আর নতুন জ্ঞান উৎপাদন ও গবেষণায় কতটা অগ্রসর হলো—সেই প্রশ্নে হয়তো খুব আশাবাদী হওয়ার মতো জবাব মিলবে না।

আবার জ্ঞান-বিজ্ঞানের নানা শাখায় আমাদের দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো এগিয়ে গেলেও সামগ্রিকভাবে রাষ্ট্রের জনগণের মধ্যে তার কতটা প্রভাব পড়ছে; চিন্তায় ও বোধে মানুষ কতটা উন্নত হচ্ছে; ধর্মীয় গোঁড়ামি, অন্ধত্ব, কুশিক্ষা আর কুযুক্তির বেড়াজাল ডিঙিয়ে মানুষ কতটা সামনে যেতে পারছে, সেখানে হতাশার অন্ত নেই।

নেই বলেই কোনো একজন লেখক, বক্তা, গায়ক কিংবা পীরের কোনো একটি কথার খণ্ডাংশ ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হেনেছে অভিযোগ তুলে তাকে পিটিয়ে মেরে ফেলার মতো বর্বরতা এখনও এই দেশে চলছে। গানের আসরে কোনো একটি কথাকে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের সাথে তুলনা করে বাউলদের ওপর হামলা, তাদের বাড়িঘরে আগুন, মামলা দিয়ে জেলে ঢুকানো—এই সবই এখনও বাংলাদেশে হয়—যখন আমেরিকার নভোচারীরা চাঁদের চারপাশ ঘুরে আসেন। যখন প্রযুক্তির দুনিয়ায় প্রতিনিয়তই নানারকম আবিষ্কার নিয়ে মানুষ বিস্মিত হয়। যখন ধর্মীয় গোঁড়ামি আর অন্ধত্বকে জয় করে মানুষ আরও বেশি সহনশীল, গণতান্ত্রিক, সংস্কৃতিবান এবং উন্নত রুচির পরিচয় দেওয়ার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হবে বলে আশা করা হয়।

এই দেশে এখনও বাংলা বছরের প্রথম দিন তথা পয়লা বৈশাখের শোভযাত্রার নাম কী হবে, তা নিয়ে তর্ক হয়। বাঙালি সংস্কৃতির একটি উৎসবকে ধর্মের সাথে গুলিয়ে ফেলে ‘মঙ্গল’ শব্দের খৎনা করে দিয়ে মঙ্গল শোভাযাত্রাকে আনন্দ শোভাযাত্রা, বৈশাখী শোভাযাত্রা, বৈশাখ-ই আকবর ইত্যাদি নাম দেওয়া হয়। এই শোভাযাত্রায় ব্যবহৃত বিভিন্ন মোটিফ, বিশেষ করে পেঁচা নিয়েও বিতর্কের অন্ত নেই। পেঁচাকে অশুভ পাখি বা হিন্দু সংস্কৃতির অংশ বলে বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গে ইসলামকে মুখোমুখি দাঁড় করানো হয়। অবশ্য পেঁচার স্থানে এবার দেখা গেল মোরগ। অর্থাৎ পেঁচা হচ্ছে বিধর্মী পাখি আর মোরগ হচ্ছে পবিত্র পাখি। একুশ শতকের এক-চতুর্থাংশ সময় পার হওয়ার পরেও যে দেশের মানুষ এরকম বিতর্কে লিপ্ত হয়, সেই দেশের মানুষের চিন্তা ও বোধের পরিসর যে এখনও কতটা সংকীর্ণ—সেটি বুঝতে গবেষণার প্রয়োজন নেই।

যাকে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়ার অভিযোগে পিটিয়ে মেরে ফেলা হলো কিংবা আক্রমণ করা হলো অথবা মামলা দিয়ে জেলে ঢুকানো হলো, তিনি সত্যিই কী বলেছেন বা বলতে চেয়েছেন—সেটি নিয়ে সমাজে কোনো একাডেমিক আলোচনা কিংবা বাহাস হয় না। ‘তৌহিদী জনতা’ পরিচয়ে যারা লাঠিসোটা কিংবা ধারালো অস্ত্র নিয়ে হামলে পড়লেন, তাদের অনেকের হয়তো মহানবীর জীবনে সহনশীলতার চর্চা সম্পর্কে তাদের কোনো ধারণা নেই। যারা ইসলাম রক্ষার নামে এভাবে অন্যের ওপর হামলে পড়লেন তাদের অনেকে হয়তো প্রতিদিনই নানারকম মিথ্যার আশ্রয় নেন। আত্মীয়-স্বজনের হক নষ্ট করেন। নানারকম অনৈতিক কাজের সাথে যুক্ত থাকেন। অর্থাৎ ব্যক্তিগত জীবনে ইসলামের মৌলিক বিষয়গুলোর চর্চা না করলেও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের গুজবে ঝাঁপিয়ে পড়েন। কোনটা সংস্কৃতির অংশ আর কোনটা ইসলাম; কোন জিনিসটাকে ইসলামের সাথে মেলানো যৌক্তিক আর কোনটা অযৌক্তিক—সেটুকু চিন্তা করার মতো জ্ঞানবুদ্ধিরও আকাল।

আসলে ধর্মীয় অনুভূতি একটি উসিলামাত্র। বিভিন্ন সময়ে দেখা গেছে ফেসবুকে রাজনৈতিক ও ধর্মীয় ইস্যু নিয়ে পোস্ট দেওয়ার ঘটনায় এমন অনেকের বিরুদ্ধে মামলা হামলা হয়েছে, যার চেয়ে অনেক বেশি সিরিয়াস পোস্ট ও কমেন্ট করার পরেও অসংখ্য মানুষের বিরুদ্ধে কোনো কিছুই হয়নি। ফলে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগে এযাবৎ যত মামলা হয়েছে বা আক্রমণের ঘটনা ঘটেছে, নিরপেক্ষ ও নির্মোহ অনুসন্ধান করলে হয়তো দেখা যাবে, তার বিরাট অংশের পেছনেই রয়েছে অভিযুক্তের সঙ্গে কোনো প্রভাবশালী গোষ্ঠী বা তাদের প্রতিপক্ষের ব্যক্তিগত শত্রুতা। ধর্মীয় অনুভূতি এখানে একটি অনুঘটকের কাজ করে। কেননা ধর্মীয় অনুভূতির কথা বলে দ্রুতই মানুষকে উত্তেজিত করা সম্ভব।

কার অনুভূতিতে কে আঘাত করে এবং ঠিক কোন পরিস্থিতিতে তার ধর্মীয় অনুভূতি আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে বলে গণ্য হবে, তা রাষ্ট্রের প্রচলিত আইনেও পরিষ্কার বলা নেই। দণ্ডবিধির ২৯৫ থেকে ২৯৮ ধারায় মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত, উপাসনালয় ভাঙচুরের বিষয়ে ব্যাখ্যা দেওয়া আছে এবং শাস্তির বিধান উল্লেখ থাকলেও কী কী কারণে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার অভিযোগ আনা যেতে পারে তা বলা নেই। তথ্যপ্রযুক্তি আইন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন এবং সাইবার নিরাপত্তা আইনেও বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়নি।

সম্প্রতি কুষ্টিয়ায় একজন পীরকে পিটিয়ে হত্যা; অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব নেয়ার কিছুদিন পরে খুলনায় উৎসব মণ্ডল নামে এক তরুণকে পুলিশের হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়ে পিটিয়ে প্রায় মেরে ফেলা; তার আগে ফরিদপুরের মধুখালীতে ধর্মীয় অনুভূতির অভিযোগ তুলে দুজনকে খুনসহ এরকম আরও অসংখ্য ঘটনার পেছনে আসলেই ধর্মীয় অনুভূতি নাকি অন্য কিছু আছে—তা খুঁজে বের করা জরুরি। কেননা ধর্মীয় অনুভূতির কথা বলে অনেক সময় মূল ঘটনা আড়াল করা হয়। ব্যক্তিগত শত্রুতাকেও ধর্মীয় ও রাজনৈতিক রঙ দিয়ে প্রকৃত অপরাধীদের আড়াল করে দেওয়া হয়।

যারা সব সময়ই সমাজে ও রাষ্ট্রে একটা অস্থিতিশীল পরিস্থিতি জিইয়ে রাখতে চায়, তারা এ জাতীয় ঘটনায় উসকানি দিয়ে নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিল করতে চায়। ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত কিংবা বাঙালির চিরায়ত উৎসবেও ধর্মের রঙ মাখানোর পেছনের রাজনীতিটাও বোঝা দরকার।

  • আমীন আল রশীদ: সাংবাদিক ও লেখক

সম্পর্কিত