সুমন সুবহান

দীর্ঘ ১৭ বছরের একপাক্ষিক নতজানু পররাষ্ট্রনীতি এবং রাজনৈতিক দাসত্বের চাদর ভেঙে গত ১২ই ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে অনুষ্ঠিত অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশে একটি সম্পূর্ণ নতুন, স্বাধীন এবং বাংলাদেশপন্থী সরকার গঠিত হয়েছে। জনগণের পরিচ্ছন্ন ও শক্তিশালী ম্যান্ডেটের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এই নির্বাচিত সরকার স্পষ্ট করে দিয়েছে—এখন থেকে রাষ্ট্রের কূটনীতি নির্ধারিত হবে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ এই মূলনীতিকে সামনে রেখে।
কিন্তু ঢাকা যখন সমমর্যাদা ও সার্বভৌমত্বের নতুন অধ্যায় রচনা করছে, তখন দিল্লি যেন এখনো তাদের পুরনো আধিপত্যবাদী মনস্তত্ত্ব এবং ‘দাদাগিরি’ আচরণ থেকে বের হতে পারছে না। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ সীমান্তে বিএসএফের নজিরবিহীন ও অমানবিক পুশ-ইন প্রচেষ্টা, দিল্লির আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর শীর্ষ উপদেষ্টাকে রহস্যজনক কূটনৈতিক বাধা এবং ক্ষমতাচ্যুত স্বৈরাচারী শেখ হাসিনাকে দিল্লিতে আশ্রয় দিয়ে ভারতের মিডিয়া ও রাজনীতিকদের ক্রমাগত বাংলাদেশ-বিরোধী বিষোদ্গার দুই দেশের সম্পর্ককে এক চরম উত্তেজনার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।
এমতাবস্থায়, ঢাকার স্বাধীনচেতা কূটনীতি বনাম দিল্লির বৈরী আচরণের এই সংঘাত দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে এক বড় ধরনের মেরুকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে, যা দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ভবিষ্যৎ গতিপথকে এক গভীর অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে।
নতজানু অধ্যায়ের অবসান: ঢাকার স্বাধীন ‘বাংলাদেশপন্থী’ পররাষ্ট্রনীতি
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার বিগত ১৭ বছর ধরে ভারতের প্রতিটি অন্যায় আবদার ও ইচ্ছার সামনে যেভাবে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করেছিল, তাতে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সার্বভৌমত্ব বারবার মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হয়েছে। তৎকালীন শাসকেরা ট্রানজিট সুবিধা, অবাধে বন্দর ব্যবহার কিংবা একতরফা নানা বাণিজ্যিক সুবিধা দিল্লিকে বিলিয়ে দিলেও, বাংলাদেশের অতিপ্রয়োজনীয় ও ন্যায্য তিস্তা নদীর পানির অধিকার আদায় করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে; উল্টো উপহার হিসেবে সীমান্তে অবিরত নিরীহ বাংলাদেশিদের ওপর বিএসএফের নির্মম গুলি ও নির্যাতন চলেছে।
এই মেরুদণ্ডহীন ও তাবেদার কূটনীতির চাদর ভেঙে বর্তমান সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেছেন, ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদই আমাদের সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক স্বকীয়তার মূল ভিত্তি।’ তিনি দিল্লির প্রতি কড়া বার্তা দিয়ে বলেছেন, ‘৫৬ হাজার বর্গমাইলের কোনো বাঙালিকে তার বাঙালিত্বের সার্টিফিকেট নেওয়ার জন্য সীমান্তের ওপারে অন্য কারও কাছে ধার করতে হবে না।’
সার্বভৌমত্বের এই নতুন অধ্যায়ে বাংলাদেশের নতুন পররাষ্ট্রনীতিতে অত্যন্ত দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে জানানো হয়েছে যে, এখন থেকে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে জাতিসংঘ এবং আঞ্চলিক কূটনীতির ক্ষেত্রে ‘সার্ক’-ই হবে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ ও নিরাপত্তা রক্ষার মূল ভিত্তি। দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতার এই অচল হয়ে পড়া ফোরামটিকে পুনরুজ্জীবিত করার মাধ্যমে বাংলাদেশ তার প্রতিবেশীদের সাথে সমমর্যাদার ভিত্তিতে নতুন দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে চায়।
তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন ভারতকে ইঙ্গিত করে কঠোরভাবে সতর্ক করে দিয়েছেন যে, সার্কের ২২০ কোটি মানুষকে মৈত্রীর বন্ধনে ঐক্যবদ্ধ করার বাইরে অন্য কোনো একক শক্তির ওপর ভর করে যদি কোনো ‘কৃত্রিম আঞ্চলিক বয়ান’ বা আধিপত্যবাদী তত্ত্ব জোরপূর্বক চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়, তবে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্র এখন থেকে তাকে গভীর সন্দেহের চোখে দেখবে।
সীমান্তের উত্তাপ: বিএসএফের পুশ-ইন প্রচেষ্টা ও বাংলাদেশের প্রতিরোধ
বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় এবং দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতটি তৈরি হচ্ছে দুই দেশের সুদীর্ঘ সীমান্তে, যা দীর্ঘ এক দশক ধরে বিএসএফের একতরফা আগ্রাসনের শিকার। কাঁটাতারে ঝুলন্ত কিশোরী ফেলানীর রক্তাক্ত ও নিথর মৃতদেহ থেকে শুরু করে আজ অব্দি সীমান্তে বিএসএফের নিষ্ঠুর ও ‘ট্রিগার হ্যাপি’ স্বভাব বিন্দুমাত্র পরিবর্তন হয়নি। আন্তর্জাতিক সীমান্ত আইন ও মানবাধিকারের তোয়াক্কা না করে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী প্রতিনিয়ত সীমান্তে নিরীহ বাংলাদেশিদের পাখির মতো গুলি করে হত্যা করছে, যা বৈশ্বিক অঙ্গনে এক নজিরবিহীন বর্বরতা।
সাম্প্রতিক সময়ে এই নির্মমতার সাথে যুক্ত হয়েছে জোরপূর্বক ‘পুশইন’ বা অনধিকারপ্রবেশ করানোর এক নতুন আগ্রাসী কৌশল। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মে থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি—মাত্র আট মাসেই বিএসএফ প্রায় ২ হাজার ৪৭৯ জনকে জোরপূর্বক বাংলাদেশে পুশইন করেছে, যার মধ্যে ভারতের নিজস্ব নাগরিক ও রোহিঙ্গা শরণার্থীও ছিল। ২০২৬ সালের মে ও জুন মাসে এই প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় সীমান্তজুড়ে এক তীব্র যুদ্ধংদেহী ও চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
গত ১৪ জুন চুয়াডাঙ্গার দর্শনা-জয়নগর সীমান্ত দিয়ে ১১ জনকে জোরপূর্বক পুশইনের চেষ্টা চালায় বিএসএফ, যা বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) কঠোর বাধায় সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়। একই সময়ে কুষ্টিয়ার প্রাগপুর সীমান্তে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে নারী ও শিশুসহ ১২জনকে জিরো লাইনে দীর্ঘক্ষণ ফেলে রেখে অমানবিক নির্যাতন চালায় ভারতীয় বাহিনী। এমনকি লালমনিরহাটের পাটগ্রাম ও হাতীবান্ধা সীমান্তে রাতের অন্ধকারে কাঁটাতারের গেট খুলে এবং সার্চলাইট বন্ধ করে দিয়ে গোপনে পুশইনের চেষ্টা করা হয়।
তবে নতুন বাংলাদেশের জাগ্রত জনতা ও বিজিবি এখন আর আগের মতো অসহায় নয়। ভারতের এই চক্রান্ত টের পেয়ে স্থানীয় জনতা তাৎক্ষণিকভাবে মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে পুরো গ্রামবাসী ও বিজিবিকে সাথে নিয়ে সীমান্তের জিরো লাইনে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলে এবং বিএসএফকে পিছু হটতে বাধ্য করে।
ভারতের এই সুদূরপ্রসারী আগ্রাসনের পেছনে মূলত কাজ করছে তাদের অভ্যন্তরীণ নোংরা রাজনীতি ও পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক নির্বাচন, যেখানে ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’ তাড়ানোর সস্তা ও সাম্প্রদায়িক এজেন্ডা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। তবে ঢাকার নতুন সরকার দিল্লির এই অমানবিক ও বেআইনি প্রচেষ্টাকে আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন হিসেবে চিহ্নিত করে আন্তর্জাতিক মহলে কঠোরভাবে মোকাবিলা করছে।
সম্প্রতি (জুন ৮-১১) নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ৫৭তম বিজিবি-বিএসএফ মহাপরিচালক পর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে বাংলাদেশ এই পুশইনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানিয়েছে। বর্তমানে দেশের ২৬টি সীমান্ত জেলায় প্রায় ৬০ হাজার বিজিবি সদস্যকে চব্বিশ ঘণ্টা সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় মোতায়েন রাখা হয়েছে।
দিল্লির বিমানবন্দরে ‘অনাকাঙ্ক্ষিত’ বাধা: কূটনৈতিক শিষ্টাচারের চরম লঙ্ঘন
সীমান্তের তীব্র উত্তেজনার মধ্যেই গত ১৫ই জুন ভারতের রাজধানী দিল্লিতে ঘটে যায় এক নজিরবিহীন, নিন্দনীয় ও অনাকাঙ্ক্ষিত কূটনৈতিক কেলেঙ্কারি, যা দুই দেশের রাষ্ট্রীয় সম্পর্কে বড় ধরনের ফাটল ধরিয়েছে। দিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ইন্ডিয়ান ওশান রিম অ্যাসোসিয়েশনের (আইওআরএ) জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দুই দিনের বৈঠকে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের মূল নেতা হিসেবে নেতৃত্ব দিতে যাচ্ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর পলিসি, স্ট্র্যাটেজি, তথ্য ও সম্প্রচার এবং সংস্কৃতিবিষয়ক শীর্ষ উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান।
আন্তর্জাতিক এই ফোরামে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গত শুক্রবারই দিল্লির বাংলাদেশ হাইকমিশন অত্যন্ত নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কূটনৈতিক পত্র পাঠিয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে তাঁর এই রাষ্ট্রীয় সফর ও আগমনের কথা স্পষ্ট জানিয়েছিল। তা সত্ত্বেও ১৫ই জুন রোববার সন্ধ্যায় দিল্লির ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণের পর ভারতের ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ সম্পূর্ণ ‘রহস্যজনক কারণে’ এবং কূটনৈতিক প্রটোকল ভেঙে বাংলাদেশের এই ভিভিআইপি প্রতিনিধিকে দীর্ঘ আড়াই ঘণ্টা বিমানবন্দরে আটকে বসিয়ে রাখে। তাঁকে দিল্লিতে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হবে কি না, তা নিয়ে চরম অনৈতিক টালবাহানা ও কালক্ষেপণ করতে থাকে।
ভারতের এই চরম ধৃষ্টতা ও অপমানের তাৎক্ষণিক প্রতিবাদস্বরূপ উপদেষ্টা পরবর্তীতে ভারতের উচ্চ মহলের তথাকথিত ‘অনুমতির নাটক’ প্রত্যাখ্যান করে দিল্লিতে প্রবেশ না করার দৃঢ় সিদ্ধান্ত নেন। তিনি দিল্লির মাটি মাড়িয়ে সে দেশে কোনো বৈঠক না করে তাৎক্ষণিকভাবে নিজ দেশের সম্মান রক্ষার্থে রাতেই এয়ার ইন্ডিয়ার ফ্লাইটে দিল্লির বিমানবন্দর ত্যাগ করেন এবং কলম্বো হয়ে সোমবার দুপুরে ঢাকায় ফিরে আসেন।
বাংলাদেশ সরকার এই নজিরবিহীন রাষ্ট্রীয় অপমানের জবাবে বিন্দুমাত্র কালক্ষেপণ না করে সোমবার দুপুরেই ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনার পবন বঢেকে (পবন কুমার তুলসীদাস বাধে) সরাসরি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তলব করে তীব্র অসন্তোষ, ক্ষোভ ও আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানায়।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান এবং পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম গণমাধ্যম ও সাংবাদিকদের সামনে জানান, দিল্লির এই হীন আচরণ কোনোভাবেই প্রত্যাশিত, বন্ধুসুলভ বা আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক আইনের অধীনে গ্রহণযোগ্য নয়।
স্বৈরাচারের আশ্রয় ও ভারতের ‘দ্বিমুখী’ বয়ান রাজনীতি
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের অবনতির মূলে রয়েছে দিল্লির গভীর ঐতিহাসিক দ্বিমুখী নীতি ও আধিপত্যবাদী আচরণ। গত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া ক্ষমতাচ্যুত স্বৈরাচারী শেখ হাসিনাকে ভারত সরকার দীর্ঘকাল ধরে দিল্লিতে রাষ্ট্রীয় আশ্রয়-প্রশ্রয়ে রেখেছে। শুধু আশ্রয় দেওয়াই নয়, বরং ভারতের মূলধারার মিডিয়া এবং দেশটির দায়িত্বশীল রাজনৈতিক নেতা, পাতিনেতা ও উপনেতারা প্রতিনিয়ত বাংলাদেশের নতুন সরকার, ধর্মীয় সম্প্রীতি ও সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে অত্যন্ত কদর্য প্রোপাগান্ডা এবং মারাত্মক উস্কানিমূলক বক্তব্য ছড়িয়ে যাচ্ছে।
দিল্লির এই চরম বাংলাদেশ-বিরোধী অবস্থানের সমান্তরালেই আবার দেখা যায় এক অভিনব ও বিপরীতমুখী বয়ান তৈরির সুচতুর কূটনৈতিক প্রচেষ্টা। গত ১২ই জুন বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে বাংলাদেশে পা রেখেই ভারতের নবনিযুক্ত ১৮তম হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী দুই দেশের সম্পর্ক এগিয়ে নিতে আপাতদৃষ্টিতে এক পাক্ষিক ও অত্যন্ত আবেগঘন বার্তা দেন। তিনি বাংলাদেশি সাংবাদিকদের সামনে ‘ভারত ও বাংলার একই আকাশ, একই বাতাস, একই যন্ত্রণা’ এবং দুই দেশের জনসংখ্যাকে এক করে ‘১৬০ কোটির এক বৃহৎ যৌথ শক্তি ও যৌথ ক্রিকেট টিম’ গঠনের মতো নজিরবিহীন রাজনৈতিক মন্তব্য করেন।
হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী মুখে দুই দেশের ‘শক্তিশালী গণতন্ত্রের’ রূপকথা ফেঁদে এবং দুই ডেমোক্রেসি মিলে বিশ্ব অর্থনৈতিক পরাশক্তি হওয়ার তাত্ত্বিক গল্প বললেও, বাংলাদেশের মানুষের প্রকৃত সংকট ও বাস্তব প্রশ্নগুলো সম্পূর্ণ এড়িয়ে যান।
দীর্ঘদিন ধরে সাধারণ বাংলাদেশিদের জন্য ভারতের পর্যটন ভিসা বন্ধ রাখা কিংবা সীমান্তজুড়ে বিএসএফের অমানবিক পুশইন সংক্রান্ত সাংবাদিকদের প্রশ্নগুলোর কোনো সদুত্তর না দিয়ে তিনি কৌশলে পাশ কাটিয়ে যান। ভারতের এই চরম স্ববিরোধী আচরণই প্রমাণ করে যে, তাদের মুখে মুখে কূটনৈতিক ভালোবাসার রঙিন বুলি থাকলেও, অবচেতনে ও বাস্তবে এখনো বাংলাদেশের ওপর আধিপত্য বিস্তার এবং একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার সেই পুরনো মনস্তাত্ত্বিক এজেন্ডাই সচল রয়েছে।
কোন পথে ঢাকা-দিল্লি কূটনীতি
বাংলাদেশ ও ভারতের দীর্ঘদিনের দ্বিপাক্ষিক কূটনীতি এখন এক ঐতিহাসিক ও অত্যন্ত সংবেদনশীল সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। দিল্লিকে স্পষ্ট বুঝতে হবে, বিগত ১৭ বছরের নতজানু ও তাবেদার বাংলাদেশ আর ১২ ফেব্রুয়ারির গণ-ম্যান্ডেটধারী আজকের বাংলাদেশ এক নয়। বাংলাদেশের মানুষ ও বর্তমান সরকার ভারতের সাথে সমমর্যাদা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং অখণ্ড সার্বভৌমত্বের ভিত্তিতে টেকসই বন্ধুত্ব চায়, কোনো প্রকার দাসত্ব বা আঞ্চলিক আধিপত্যের ভিত্তিতে নয়।
প্রতিবেশী উভয় দেশের বৃহত্তর ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থে এই সম্পর্কের ভবিষ্যৎ ইতিবাচক করতে হলে ভারতকে অবিলম্বে সীমান্তে অমানবিক পুশইন ও হত্যাকাণ্ড বন্ধ করতে হবে, শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ-বিরোধী প্রোপাগান্ডা থামানো নিশ্চিত করতে হবে এবং কূটনৈতিক শিষ্টাচার বজায় রাখতে হবে। দিল্লি যদি যৌথ নদী কমিশন গঠন, তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যা প্রদান এবং বন্ধ থাকা পর্যটন ভিসা চালুর মতো বাস্তবমুখী ও আন্তরিক পদক্ষেপ না নেয়, তবে ঢাকার নতুন ‘বাংলাদেশপন্থী’ পররাষ্ট্রনীতির অধীনে দুই দেশের সম্পর্ক আরও দীর্ঘস্থায়ী এবং গভীর সংকটে নিমজ্জিত হতে বাধ্য।
ভবিষ্যতের দিকে তাকালে এটি স্পষ্ট যে, দক্ষিণ এশিয়ার শান্তি ও স্থিতিশীলতার স্বার্থে দুই প্রতিবেশীর মধ্যে একটি কার্যকর ও ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখা অপরিহার্য, তবে তা কোনোভাবেই বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থকে বিসর্জন দিয়ে নয়।
ভারতকে বুঝতে হবে, একটি স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ কখনোই তার সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে আপস করবে না। তাই দিল্লির উচিত হবে কৃত্রিম আঞ্চলিক বয়ান তৈরির চেষ্টা বাদ দিয়ে ‘সার্ক’-এর মতো বহুপাক্ষিক ফোরামকে পুনরুজ্জীবিত করতে ঢাকাকে সহযোগিতা করা।
ট্রানজিট সুবিধা বা বাণিজ্যের ক্ষেত্রে দুই দেশের সম্পর্ককে একক সুবিধার পরিবর্তে সম্পূর্ণ ‘পারস্পরিক সমতা’ ও ‘উইন-উইন’ মডেলে রূপান্তর করতে হবে, যেখানে বাংলাদেশের নদী, বন্দর ও ভূখণ্ড ব্যবহারের বিনিময়ে সমপরিমাণ অর্থনৈতিক ও ভূ-কৌশলগত সুবিধা নিশ্চিত হবে।
দিল্লি যদি তার অভ্যন্তরীণ রাজনীতির হাতিয়ার হিসেবে বাংলাদেশকে ব্যবহার করা বন্ধ না করে এবং ঢাকার নতুন সরকারের পরিচ্ছন্ন ম্যান্ডেটকে সম্মান জানাতে ব্যর্থ হয়, তবে বাংলাদেশ বিকল্প আঞ্চলিক জোট ও বৈশ্বিক অংশীদারত্বের দিকে অগ্রসর হবে।

দীর্ঘ ১৭ বছরের একপাক্ষিক নতজানু পররাষ্ট্রনীতি এবং রাজনৈতিক দাসত্বের চাদর ভেঙে গত ১২ই ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে অনুষ্ঠিত অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশে একটি সম্পূর্ণ নতুন, স্বাধীন এবং বাংলাদেশপন্থী সরকার গঠিত হয়েছে। জনগণের পরিচ্ছন্ন ও শক্তিশালী ম্যান্ডেটের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এই নির্বাচিত সরকার স্পষ্ট করে দিয়েছে—এখন থেকে রাষ্ট্রের কূটনীতি নির্ধারিত হবে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ এই মূলনীতিকে সামনে রেখে।
কিন্তু ঢাকা যখন সমমর্যাদা ও সার্বভৌমত্বের নতুন অধ্যায় রচনা করছে, তখন দিল্লি যেন এখনো তাদের পুরনো আধিপত্যবাদী মনস্তত্ত্ব এবং ‘দাদাগিরি’ আচরণ থেকে বের হতে পারছে না। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ সীমান্তে বিএসএফের নজিরবিহীন ও অমানবিক পুশ-ইন প্রচেষ্টা, দিল্লির আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর শীর্ষ উপদেষ্টাকে রহস্যজনক কূটনৈতিক বাধা এবং ক্ষমতাচ্যুত স্বৈরাচারী শেখ হাসিনাকে দিল্লিতে আশ্রয় দিয়ে ভারতের মিডিয়া ও রাজনীতিকদের ক্রমাগত বাংলাদেশ-বিরোধী বিষোদ্গার দুই দেশের সম্পর্ককে এক চরম উত্তেজনার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।
এমতাবস্থায়, ঢাকার স্বাধীনচেতা কূটনীতি বনাম দিল্লির বৈরী আচরণের এই সংঘাত দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে এক বড় ধরনের মেরুকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে, যা দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ভবিষ্যৎ গতিপথকে এক গভীর অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে।
নতজানু অধ্যায়ের অবসান: ঢাকার স্বাধীন ‘বাংলাদেশপন্থী’ পররাষ্ট্রনীতি
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার বিগত ১৭ বছর ধরে ভারতের প্রতিটি অন্যায় আবদার ও ইচ্ছার সামনে যেভাবে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করেছিল, তাতে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সার্বভৌমত্ব বারবার মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হয়েছে। তৎকালীন শাসকেরা ট্রানজিট সুবিধা, অবাধে বন্দর ব্যবহার কিংবা একতরফা নানা বাণিজ্যিক সুবিধা দিল্লিকে বিলিয়ে দিলেও, বাংলাদেশের অতিপ্রয়োজনীয় ও ন্যায্য তিস্তা নদীর পানির অধিকার আদায় করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে; উল্টো উপহার হিসেবে সীমান্তে অবিরত নিরীহ বাংলাদেশিদের ওপর বিএসএফের নির্মম গুলি ও নির্যাতন চলেছে।
এই মেরুদণ্ডহীন ও তাবেদার কূটনীতির চাদর ভেঙে বর্তমান সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেছেন, ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদই আমাদের সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক স্বকীয়তার মূল ভিত্তি।’ তিনি দিল্লির প্রতি কড়া বার্তা দিয়ে বলেছেন, ‘৫৬ হাজার বর্গমাইলের কোনো বাঙালিকে তার বাঙালিত্বের সার্টিফিকেট নেওয়ার জন্য সীমান্তের ওপারে অন্য কারও কাছে ধার করতে হবে না।’
সার্বভৌমত্বের এই নতুন অধ্যায়ে বাংলাদেশের নতুন পররাষ্ট্রনীতিতে অত্যন্ত দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে জানানো হয়েছে যে, এখন থেকে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে জাতিসংঘ এবং আঞ্চলিক কূটনীতির ক্ষেত্রে ‘সার্ক’-ই হবে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ ও নিরাপত্তা রক্ষার মূল ভিত্তি। দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতার এই অচল হয়ে পড়া ফোরামটিকে পুনরুজ্জীবিত করার মাধ্যমে বাংলাদেশ তার প্রতিবেশীদের সাথে সমমর্যাদার ভিত্তিতে নতুন দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে চায়।
তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন ভারতকে ইঙ্গিত করে কঠোরভাবে সতর্ক করে দিয়েছেন যে, সার্কের ২২০ কোটি মানুষকে মৈত্রীর বন্ধনে ঐক্যবদ্ধ করার বাইরে অন্য কোনো একক শক্তির ওপর ভর করে যদি কোনো ‘কৃত্রিম আঞ্চলিক বয়ান’ বা আধিপত্যবাদী তত্ত্ব জোরপূর্বক চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়, তবে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্র এখন থেকে তাকে গভীর সন্দেহের চোখে দেখবে।
সীমান্তের উত্তাপ: বিএসএফের পুশ-ইন প্রচেষ্টা ও বাংলাদেশের প্রতিরোধ
বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় এবং দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতটি তৈরি হচ্ছে দুই দেশের সুদীর্ঘ সীমান্তে, যা দীর্ঘ এক দশক ধরে বিএসএফের একতরফা আগ্রাসনের শিকার। কাঁটাতারে ঝুলন্ত কিশোরী ফেলানীর রক্তাক্ত ও নিথর মৃতদেহ থেকে শুরু করে আজ অব্দি সীমান্তে বিএসএফের নিষ্ঠুর ও ‘ট্রিগার হ্যাপি’ স্বভাব বিন্দুমাত্র পরিবর্তন হয়নি। আন্তর্জাতিক সীমান্ত আইন ও মানবাধিকারের তোয়াক্কা না করে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী প্রতিনিয়ত সীমান্তে নিরীহ বাংলাদেশিদের পাখির মতো গুলি করে হত্যা করছে, যা বৈশ্বিক অঙ্গনে এক নজিরবিহীন বর্বরতা।
সাম্প্রতিক সময়ে এই নির্মমতার সাথে যুক্ত হয়েছে জোরপূর্বক ‘পুশইন’ বা অনধিকারপ্রবেশ করানোর এক নতুন আগ্রাসী কৌশল। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মে থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি—মাত্র আট মাসেই বিএসএফ প্রায় ২ হাজার ৪৭৯ জনকে জোরপূর্বক বাংলাদেশে পুশইন করেছে, যার মধ্যে ভারতের নিজস্ব নাগরিক ও রোহিঙ্গা শরণার্থীও ছিল। ২০২৬ সালের মে ও জুন মাসে এই প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় সীমান্তজুড়ে এক তীব্র যুদ্ধংদেহী ও চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
গত ১৪ জুন চুয়াডাঙ্গার দর্শনা-জয়নগর সীমান্ত দিয়ে ১১ জনকে জোরপূর্বক পুশইনের চেষ্টা চালায় বিএসএফ, যা বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) কঠোর বাধায় সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়। একই সময়ে কুষ্টিয়ার প্রাগপুর সীমান্তে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে নারী ও শিশুসহ ১২জনকে জিরো লাইনে দীর্ঘক্ষণ ফেলে রেখে অমানবিক নির্যাতন চালায় ভারতীয় বাহিনী। এমনকি লালমনিরহাটের পাটগ্রাম ও হাতীবান্ধা সীমান্তে রাতের অন্ধকারে কাঁটাতারের গেট খুলে এবং সার্চলাইট বন্ধ করে দিয়ে গোপনে পুশইনের চেষ্টা করা হয়।
তবে নতুন বাংলাদেশের জাগ্রত জনতা ও বিজিবি এখন আর আগের মতো অসহায় নয়। ভারতের এই চক্রান্ত টের পেয়ে স্থানীয় জনতা তাৎক্ষণিকভাবে মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে পুরো গ্রামবাসী ও বিজিবিকে সাথে নিয়ে সীমান্তের জিরো লাইনে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলে এবং বিএসএফকে পিছু হটতে বাধ্য করে।
ভারতের এই সুদূরপ্রসারী আগ্রাসনের পেছনে মূলত কাজ করছে তাদের অভ্যন্তরীণ নোংরা রাজনীতি ও পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক নির্বাচন, যেখানে ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’ তাড়ানোর সস্তা ও সাম্প্রদায়িক এজেন্ডা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। তবে ঢাকার নতুন সরকার দিল্লির এই অমানবিক ও বেআইনি প্রচেষ্টাকে আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন হিসেবে চিহ্নিত করে আন্তর্জাতিক মহলে কঠোরভাবে মোকাবিলা করছে।
সম্প্রতি (জুন ৮-১১) নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ৫৭তম বিজিবি-বিএসএফ মহাপরিচালক পর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে বাংলাদেশ এই পুশইনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানিয়েছে। বর্তমানে দেশের ২৬টি সীমান্ত জেলায় প্রায় ৬০ হাজার বিজিবি সদস্যকে চব্বিশ ঘণ্টা সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় মোতায়েন রাখা হয়েছে।
দিল্লির বিমানবন্দরে ‘অনাকাঙ্ক্ষিত’ বাধা: কূটনৈতিক শিষ্টাচারের চরম লঙ্ঘন
সীমান্তের তীব্র উত্তেজনার মধ্যেই গত ১৫ই জুন ভারতের রাজধানী দিল্লিতে ঘটে যায় এক নজিরবিহীন, নিন্দনীয় ও অনাকাঙ্ক্ষিত কূটনৈতিক কেলেঙ্কারি, যা দুই দেশের রাষ্ট্রীয় সম্পর্কে বড় ধরনের ফাটল ধরিয়েছে। দিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ইন্ডিয়ান ওশান রিম অ্যাসোসিয়েশনের (আইওআরএ) জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দুই দিনের বৈঠকে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের মূল নেতা হিসেবে নেতৃত্ব দিতে যাচ্ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর পলিসি, স্ট্র্যাটেজি, তথ্য ও সম্প্রচার এবং সংস্কৃতিবিষয়ক শীর্ষ উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান।
আন্তর্জাতিক এই ফোরামে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গত শুক্রবারই দিল্লির বাংলাদেশ হাইকমিশন অত্যন্ত নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কূটনৈতিক পত্র পাঠিয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে তাঁর এই রাষ্ট্রীয় সফর ও আগমনের কথা স্পষ্ট জানিয়েছিল। তা সত্ত্বেও ১৫ই জুন রোববার সন্ধ্যায় দিল্লির ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণের পর ভারতের ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ সম্পূর্ণ ‘রহস্যজনক কারণে’ এবং কূটনৈতিক প্রটোকল ভেঙে বাংলাদেশের এই ভিভিআইপি প্রতিনিধিকে দীর্ঘ আড়াই ঘণ্টা বিমানবন্দরে আটকে বসিয়ে রাখে। তাঁকে দিল্লিতে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হবে কি না, তা নিয়ে চরম অনৈতিক টালবাহানা ও কালক্ষেপণ করতে থাকে।
ভারতের এই চরম ধৃষ্টতা ও অপমানের তাৎক্ষণিক প্রতিবাদস্বরূপ উপদেষ্টা পরবর্তীতে ভারতের উচ্চ মহলের তথাকথিত ‘অনুমতির নাটক’ প্রত্যাখ্যান করে দিল্লিতে প্রবেশ না করার দৃঢ় সিদ্ধান্ত নেন। তিনি দিল্লির মাটি মাড়িয়ে সে দেশে কোনো বৈঠক না করে তাৎক্ষণিকভাবে নিজ দেশের সম্মান রক্ষার্থে রাতেই এয়ার ইন্ডিয়ার ফ্লাইটে দিল্লির বিমানবন্দর ত্যাগ করেন এবং কলম্বো হয়ে সোমবার দুপুরে ঢাকায় ফিরে আসেন।
বাংলাদেশ সরকার এই নজিরবিহীন রাষ্ট্রীয় অপমানের জবাবে বিন্দুমাত্র কালক্ষেপণ না করে সোমবার দুপুরেই ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনার পবন বঢেকে (পবন কুমার তুলসীদাস বাধে) সরাসরি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তলব করে তীব্র অসন্তোষ, ক্ষোভ ও আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানায়।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান এবং পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম গণমাধ্যম ও সাংবাদিকদের সামনে জানান, দিল্লির এই হীন আচরণ কোনোভাবেই প্রত্যাশিত, বন্ধুসুলভ বা আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক আইনের অধীনে গ্রহণযোগ্য নয়।
স্বৈরাচারের আশ্রয় ও ভারতের ‘দ্বিমুখী’ বয়ান রাজনীতি
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের অবনতির মূলে রয়েছে দিল্লির গভীর ঐতিহাসিক দ্বিমুখী নীতি ও আধিপত্যবাদী আচরণ। গত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া ক্ষমতাচ্যুত স্বৈরাচারী শেখ হাসিনাকে ভারত সরকার দীর্ঘকাল ধরে দিল্লিতে রাষ্ট্রীয় আশ্রয়-প্রশ্রয়ে রেখেছে। শুধু আশ্রয় দেওয়াই নয়, বরং ভারতের মূলধারার মিডিয়া এবং দেশটির দায়িত্বশীল রাজনৈতিক নেতা, পাতিনেতা ও উপনেতারা প্রতিনিয়ত বাংলাদেশের নতুন সরকার, ধর্মীয় সম্প্রীতি ও সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে অত্যন্ত কদর্য প্রোপাগান্ডা এবং মারাত্মক উস্কানিমূলক বক্তব্য ছড়িয়ে যাচ্ছে।
দিল্লির এই চরম বাংলাদেশ-বিরোধী অবস্থানের সমান্তরালেই আবার দেখা যায় এক অভিনব ও বিপরীতমুখী বয়ান তৈরির সুচতুর কূটনৈতিক প্রচেষ্টা। গত ১২ই জুন বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে বাংলাদেশে পা রেখেই ভারতের নবনিযুক্ত ১৮তম হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী দুই দেশের সম্পর্ক এগিয়ে নিতে আপাতদৃষ্টিতে এক পাক্ষিক ও অত্যন্ত আবেগঘন বার্তা দেন। তিনি বাংলাদেশি সাংবাদিকদের সামনে ‘ভারত ও বাংলার একই আকাশ, একই বাতাস, একই যন্ত্রণা’ এবং দুই দেশের জনসংখ্যাকে এক করে ‘১৬০ কোটির এক বৃহৎ যৌথ শক্তি ও যৌথ ক্রিকেট টিম’ গঠনের মতো নজিরবিহীন রাজনৈতিক মন্তব্য করেন।
হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী মুখে দুই দেশের ‘শক্তিশালী গণতন্ত্রের’ রূপকথা ফেঁদে এবং দুই ডেমোক্রেসি মিলে বিশ্ব অর্থনৈতিক পরাশক্তি হওয়ার তাত্ত্বিক গল্প বললেও, বাংলাদেশের মানুষের প্রকৃত সংকট ও বাস্তব প্রশ্নগুলো সম্পূর্ণ এড়িয়ে যান।
দীর্ঘদিন ধরে সাধারণ বাংলাদেশিদের জন্য ভারতের পর্যটন ভিসা বন্ধ রাখা কিংবা সীমান্তজুড়ে বিএসএফের অমানবিক পুশইন সংক্রান্ত সাংবাদিকদের প্রশ্নগুলোর কোনো সদুত্তর না দিয়ে তিনি কৌশলে পাশ কাটিয়ে যান। ভারতের এই চরম স্ববিরোধী আচরণই প্রমাণ করে যে, তাদের মুখে মুখে কূটনৈতিক ভালোবাসার রঙিন বুলি থাকলেও, অবচেতনে ও বাস্তবে এখনো বাংলাদেশের ওপর আধিপত্য বিস্তার এবং একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার সেই পুরনো মনস্তাত্ত্বিক এজেন্ডাই সচল রয়েছে।
কোন পথে ঢাকা-দিল্লি কূটনীতি
বাংলাদেশ ও ভারতের দীর্ঘদিনের দ্বিপাক্ষিক কূটনীতি এখন এক ঐতিহাসিক ও অত্যন্ত সংবেদনশীল সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। দিল্লিকে স্পষ্ট বুঝতে হবে, বিগত ১৭ বছরের নতজানু ও তাবেদার বাংলাদেশ আর ১২ ফেব্রুয়ারির গণ-ম্যান্ডেটধারী আজকের বাংলাদেশ এক নয়। বাংলাদেশের মানুষ ও বর্তমান সরকার ভারতের সাথে সমমর্যাদা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং অখণ্ড সার্বভৌমত্বের ভিত্তিতে টেকসই বন্ধুত্ব চায়, কোনো প্রকার দাসত্ব বা আঞ্চলিক আধিপত্যের ভিত্তিতে নয়।
প্রতিবেশী উভয় দেশের বৃহত্তর ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থে এই সম্পর্কের ভবিষ্যৎ ইতিবাচক করতে হলে ভারতকে অবিলম্বে সীমান্তে অমানবিক পুশইন ও হত্যাকাণ্ড বন্ধ করতে হবে, শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ-বিরোধী প্রোপাগান্ডা থামানো নিশ্চিত করতে হবে এবং কূটনৈতিক শিষ্টাচার বজায় রাখতে হবে। দিল্লি যদি যৌথ নদী কমিশন গঠন, তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যা প্রদান এবং বন্ধ থাকা পর্যটন ভিসা চালুর মতো বাস্তবমুখী ও আন্তরিক পদক্ষেপ না নেয়, তবে ঢাকার নতুন ‘বাংলাদেশপন্থী’ পররাষ্ট্রনীতির অধীনে দুই দেশের সম্পর্ক আরও দীর্ঘস্থায়ী এবং গভীর সংকটে নিমজ্জিত হতে বাধ্য।
ভবিষ্যতের দিকে তাকালে এটি স্পষ্ট যে, দক্ষিণ এশিয়ার শান্তি ও স্থিতিশীলতার স্বার্থে দুই প্রতিবেশীর মধ্যে একটি কার্যকর ও ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখা অপরিহার্য, তবে তা কোনোভাবেই বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থকে বিসর্জন দিয়ে নয়।
ভারতকে বুঝতে হবে, একটি স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ কখনোই তার সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে আপস করবে না। তাই দিল্লির উচিত হবে কৃত্রিম আঞ্চলিক বয়ান তৈরির চেষ্টা বাদ দিয়ে ‘সার্ক’-এর মতো বহুপাক্ষিক ফোরামকে পুনরুজ্জীবিত করতে ঢাকাকে সহযোগিতা করা।
ট্রানজিট সুবিধা বা বাণিজ্যের ক্ষেত্রে দুই দেশের সম্পর্ককে একক সুবিধার পরিবর্তে সম্পূর্ণ ‘পারস্পরিক সমতা’ ও ‘উইন-উইন’ মডেলে রূপান্তর করতে হবে, যেখানে বাংলাদেশের নদী, বন্দর ও ভূখণ্ড ব্যবহারের বিনিময়ে সমপরিমাণ অর্থনৈতিক ও ভূ-কৌশলগত সুবিধা নিশ্চিত হবে।
দিল্লি যদি তার অভ্যন্তরীণ রাজনীতির হাতিয়ার হিসেবে বাংলাদেশকে ব্যবহার করা বন্ধ না করে এবং ঢাকার নতুন সরকারের পরিচ্ছন্ন ম্যান্ডেটকে সম্মান জানাতে ব্যর্থ হয়, তবে বাংলাদেশ বিকল্প আঞ্চলিক জোট ও বৈশ্বিক অংশীদারত্বের দিকে অগ্রসর হবে।

২০২১ সালে বাংলাদেশ তার স্বাধীনতার ৫০ বছর উদযাপন করেছে। ইসলামাবাদে ঘটনাটি সাধারণত ‘ঢাকা পতন’ হিসেবে পরিচিত হলেও, ঢাকায় এটি ‘বাংলাদেশের মুক্তি’ বা স্বাধীনতা অর্জন হিসেবে স্মরণ করা হয়। সে সময় বাংলাদেশের রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিল এবং বছরব্যাপী নানা আয়োজন, অনুষ্ঠান ও কর্মসূচির মাধ্যমে দিব
২ ঘণ্টা আগে
এখন কেবল সংবাদপত্র আর রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত রেডিও-টিভির যুগ নয়। কালক্রমে একগুচ্ছ ইলেকট্রনিক মিডিয়ার জন্ম হয়েছে বেসরকারি খাতে। বেড়েছে সংবাদপত্রের সংখ্যাও। অনলাইন আর ডিজিটাল মিডিয়ার উপস্থিতিও গণমাধ্যমের দিগন্ত বদলে দিচ্ছে।
৩ ঘণ্টা আগে
বাংলাদেশের সামনে তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি সম্ভবত ভারত কতটা শক্তিশালী—তা নয়। বরং প্রশ্নটি হলো, আমরা ভারতকে কতটা শক্তিশালী বলে কল্পনা করি। কারণ ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে, বাস্তব শক্তির চেয়েও শক্তি সম্পর্কে মানুষের বিশ্বাস কাল্পনিক ধারণা অধিক কার্যকর রাজনৈতিক বাস্তবতা সৃষ্টি করতে পারে।
৬ ঘণ্টা আগে
ফিফার র্যাঙ্কিংয়ে যে দেশের নামই কখনো বিশ্বকাপের মূল মঞ্চে ঠাঁই পায়নি, সেই দেশের ছাদে, অলিগলিতে, এমনকি ধানখেতের পাশের বাঁশের খুঁটিতেও এখন উড়ছে ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনার পতাকা। এই দুটি দূরবর্তী লাতিন আমেরিকান দেশই বাংলাদেশের নিজস্ব জাতীয় দল।
৬ ঘণ্টা আগে