সুমন সুবহান

দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্রে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যে অভূতপূর্ব গণবিক্ষোভ ও ক্ষমতার রদবদল দেখা যচ্ছে, তা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি গভীর অর্থনৈতিক সংকট, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি এবং তরুণ প্রজন্মের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ থেকে জন্ম নেওয়া এক আন্তঃসীমান্ত ‘ডমিনো ইফেক্ট’।
২০২২ সালে শ্রীলঙ্কার দেউলিয়া হয়ে যাওয়া অর্থনৈতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে সূচিত ‘আরাগালয়া’ বা ‘গোতা গো হোম’ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে এই আঞ্চলিক ক্ষোভের প্রথম টাইলটি পড়েছিল, যা পরবর্তীতে প্রতিবেশী দেশগুলোর সুশীল সমাজ ও যুবশক্তির মধ্যে দাবানলের মতো প্রচ্ছন্ন উদ্দীপনা সঞ্চার করে।
এই গণরোষের ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালে বাংলাদেশে কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে শুরু করে শেখ হাসিনা সরকারের পতন এবং পরবর্তী সময়ে নেপালে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও তরুণদের ‘নেপো কিড’ বিরোধী বিক্ষোভ প্রমাণ করেছে যে, অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী শাসকশ্রেণি জনগণের গণতান্ত্রিক মৌলিক প্রত্যাশা পূরণে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে।
দক্ষিণ এশিয়ার এই বিক্ষোভগুলোর মূল চালিকাশক্তি কোনো রাজনৈতিক দল বা সশস্ত্র গোষ্ঠী নয়, বরং জেনজি প্রজন্ম, যারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে হাতিয়ার করে নেতৃত্বহীন, বিকেন্দ্রীভূত এবং প্রথাবিরোধী রাজনৈতিক শক্তির রূপদান করেছে। ভৌগোলিক ও রাজনৈতিকভাবে বৈচিত্র্যময় এই অঞ্চলে এক দেশের সাধারণ মানুষের সফলতা অন্য দেশের নিপীড়িত তরুণদের অধিকার আদায়ে সাহসী করে তুলেছে, যা বিশ্বরাজনীতিতে আঞ্চলিক গণআন্দোলনের এক নতুন মডেল তৈরি করেছে।
ভারত শুরুতে নিজেদের এই তরুণ বিপ্লবের প্রভাব থেকে সুরক্ষিত মনে করলেও, লাদাখে স্থানীয় অধিকার রক্ষার আন্দোলন এবং সম্প্রতি নয়াদিল্লিতে আছড়ে পড়া যুব-বিক্ষোভের ঘটনা স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, আঞ্চলিক এই স্ফুলিঙ্গ এখন ভারতের অভ্যন্তরেও এক নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের উন্মোচন করেছে।
ভারতের ১৪৪ কোটি জনসংখ্যার প্রায় ২৬ শতাংশ থেকে ২৮ শতাংশই ১৯৯৭ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে জন্মগ্রহণকারী জেন-জি প্রজন্ম। উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করার পরও আশঙ্কাজনক যুব বেকারত্ব (যা শহরাঞ্চলে ১৩.৬% ও তরুণ স্নাতকদের ক্ষেত্রে ২৯% ছুঁয়েছে), সরকারি প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের অভাবে এই বিশাল যুব সমাজ দীর্ঘদিন ধরে এক হতাশায় দিন কাটাচ্ছিল। সেই হতাশার আগুনে ঘৃতাহুতি পড়ে যখন ভারতের সর্বোচ্চ আদালতের মাননীয় প্রধান বিচারপতির একটি বিতর্কিত মন্তব্যে কর্মহীন যুবসমাজকে কটাক্ষ করা হয় এবং অপমানকে শক্তিতে রূপান্তর করে অভিজিৎ দীপকের নেতৃত্বে ১৬ মে জন্ম নেয় ব্যঙ্গাত্মক সামাজিক-রাজনৈতিক প্রতিরোধ ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)।
কঠিন পরিস্থিতিতেও তেলাপোকা যেভাবে টিকে থাকে, ঠিক তেমনি প্রতিকূল অর্থনৈতিক বাজার ও ভঙ্গুর চাকরির পরিস্থিতিতেও শিক্ষিত যুবসমাজ টিকে থাকার লড়াই করবে—এই রূপক দর্শনে চালিত দলটি দ্রুত ইন্টারনেট স্পেস অতিক্রম করে রাজপথে নেমে আসে। ২০২৬ সালের ২০ জুলাই নয়াদিল্লির যন্তর মন্তরে হাজার হাজার তরুণ প্রতীকী তেলাপোকার মাস্ক পরে ব্যারিকেড ভেঙে পার্লামেন্ট ভবনের কাছাকাছি পৌঁছে গেলে পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর টিয়ারগ্যাস ও লাঠিচার্জের মুখে সংঘাতময় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, যা বিশ্ব গণমাধ্যমে আলোচনার শীর্ষে উঠে আসে।
দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনৈতিক ও সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা কীভাবে ভৌগোলিক সীমা অতিক্রম করে এক রাষ্ট্র থেকে অন্য রাষ্ট্রে স্থানান্তরিত হয়, সাম্প্রতিক আঞ্চলিক রাজনীতি তার স্পষ্ট সাক্ষী। এই ধারাবাহিক বিক্ষোভের মূল সুর গড়ে উঠেছে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদ অপচয়ের বিরুদ্ধে তরুণদের তীব্র অনাস্থার ভিত্তিতে।
দক্ষিণ এশিয়ায় প্রথাগত শাসনব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ জানানোর প্রথম রূপরেখা তৈরি করে শ্রীলঙ্কার ২০২২ সালের ‘আরাগালয়া’ আন্দোলন। ভুল অর্থনৈতিক নীতি, বিদেশি ঋণের বোঝা এবং করোনা মহামারীর পর পর্যটন খাত ধসে পড়ায় দেশটির বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ মারাত্মকভাবে হ্রাস পায়। মুদ্রাস্ফীতি এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্য ও জ্বালানির তীব্র সংকটের মুখে শ্রীলঙ্কার সাধারণ জনগণ, বিশেষ করে তরুণ সমাজ, কোনো রাজনৈতিক দলের ব্যানার ছাড়াই রাজপথে নেমে আসে। তারা প্রেসিডেন্টের বাসভবন দখল করে এবং গোতাবায়া রাজাপক্ষেকে দেশত্যাগে বাধ্য করে।
শ্রীলঙ্কার এই সাফল্য বাংলাদেশে প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক প্রভাব ফেলে। ২০২৪ সালের মধ্যভাগে বাংলাদেশে কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থী ও তরুণ সমাজ রাজপথে নেমে আসে এবং তৎকালীন শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটায়। এই আন্দোলনের বিশেষত্ব ছিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে দ্রুত জনমত গড়ে তোলা এবং সমন্বয়কারীদের বিকেন্দ্রীভূত নেতৃত্বের প্রয়োগ। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, তরুণদের এই অসন্তোষের পেছনে অন্যতম মূল অনুঘটক ছিল উচ্চ বেকারত্ব ও চাকরির বাজারের অনিশ্চয়তা।
বাংলাদেশের বিক্ষোভের রেশ না কাটতেই নেপালে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও স্বজনপ্রীতির বিরুদ্ধে জেন-জি প্রজন্ম তীব্র প্রতিবাদ শুরু করে। ‘নেপো কিড’ হ্যাশট্যাগের অধীনে টিকটক ও রেডিট-এর মতো প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে সাধারণ তরুণরা দেশটির ক্ষমতার শীর্ষে থাকা রাজনৈতিক পরিবারের সদস্যদের বিলাসবহুল জীবনযাত্রা ও দুর্নীতির চিত্র ফাঁস করে দেয়। সাধারণ তরুণদের চরম বেকারত্বের বিপরীতে বিশেষ সুবিধাভোগী শ্রেণীর সম্পদ প্রদর্শন সমাজকে চরমভাবে বিভক্ত করে তোলে। নেপালের জেন-জিদের এই সামাজিক প্রতিরোধ কেপি শর্মা ওলির সরকারের জন্য চরম রাজনৈতিক চাপ তৈরি করে এবং দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলে তরুণদের এই অনলাইনভিত্তিক সংঘবদ্ধতা এক শক্তিশালী নিয়ামক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশী দেশগুলোতে যখন রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটছিল, তখন ভারতের রাজনীতিতে একটি ধারণা ছিল যে, বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র হিসেবে দেশটি এই ধরনের প্রথাবিরোধী আন্দোলন থেকে মুক্ত থাকবে। তবে দেশের অভ্যন্তরে জেন-জি প্রজন্মের জনমিতিক অবস্থান এবং আর্থ-সামাজিক বঞ্চনা একটি বৈপ্লবিক প্ল্যাটফর্ম তৈরির পথ প্রশস্ত করছিল।
দেশে সামগ্রিক বার্ষিক বেকারত্বের হার কমে ৩.১%-এ নেমেছে, তবে ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী যুব বেকারত্বের হার এখনো ৯.৯% এবং শহরাঞ্চলে তা ১৩.৬% পর্যন্ত বিস্তৃত। উচ্চশিক্ষিত তরুণদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক; সাধারণ গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্নকারীদের মধ্যে বেকারত্বের হার ১১.২% হলেও তরুণ স্নাতকদের (১৫-২৫ বছর) ক্ষেত্রে তা ২৯% ছুঁয়েছে। অসীম প্রেমজি বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘স্টেট অব ওয়ার্কিং ইন্ডিয়া ২০২৬’ প্রতিবেদনের তথ্যমতে, ভারতের মোট কর্মহীন তরুণদের প্রায় ৬৭%ই উচ্চশিক্ষিত স্নাতক। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা ও বিশ্বব্যাংকের সমসাময়িক পরিসংখ্যান নিশ্চিত করে যে, বিশ্বের একক বৃহত্তম জেন-জি জনগোষ্ঠী হওয়া সত্ত্বেও কাজের বাজারে এই গভীর অসঙ্গতি তরুণদের তীব্র অর্থনৈতিক সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
শিক্ষিত তরুণদের মধ্যে এই সামাজিক ও অর্থনৈতিক অসন্তোষের অন্যতম বড় কারণ ছিল প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা ব্যবস্থার চরম অস্থিতিশীলতা। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জাতীয় স্তরের মেডিকেল প্রবেশিকা পরীক্ষা-সহ একাধিক রাজকীয় ও রাজ্য পর্যায়ের সরকারি চাকরির পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস ও কারিগরি অনিয়মের ঘটনা ঘটে। এতে লাখ লাখ শিক্ষার্থী তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়ে। নীতিনির্ধারকদের অবহেলা ও অনিয়ম পরীক্ষার্থীদের ধৈর্য চ্যুত করে এবং একটি সংগঠিত প্রতিবাদের মানসিক ভিত্তি তৈরি করে।
ভারতের ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দলগুলো এখনও বংশানুক্রমিক নেতৃত্ব, আঞ্চলিক ভোটব্যাংক এবং পুরোনো মতাদর্শের ভিত্তিতে রাজনীতি পরিচালনা করে। কিন্তু জেন-জি প্রজন্ম নিজেদের অধিকার, জলবায়ু পরিবর্তন, মানসম্মত শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং ডিজিটাল স্বাধীনতার মতো আধুনিক ও সুনির্দিষ্ট ইস্যুগুলোতে স্পষ্ট অঙ্গীকার চায়। প্রথাগত রাজনীতিতে নিজেদের সঠিক প্রতিনিধিত্ব না দেখে তরুণরা বর্তমান রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি পুরোপুরি বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়ে, যা তাদের প্রচলিত রাজনৈতিক কাঠামোর বাইরে গিয়ে নিজস্ব প্লাটফর্ম তৈরিতে উৎসাহিত করে।
ভারতের মূল ভূখণ্ডে জেন-জি কেন্দ্রিক আন্দোলনের প্রকাশটি ঘটেছে অতি দ্রুত এবং প্রথাবিরোধী উপায়ে। রাজনৈতিক সচেতনতা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সংমিশ্রণে শুরু হওয়া এই আন্দোলন অল্প সময়েই বিশাল এক পরিধি লাভ করে।
ভারতের জেন-জি আন্দোলনের প্রথম স্পষ্ট স্ফুলিঙ্গ দেখা যায় লাদাখে। পরিবেশকর্মী ও শিক্ষাবিদ সোনাম ওয়াংচুকের নেতৃত্বে স্থানীয় নাগরিক সংগঠন ‘লেহ অ্যাপেক্স বডি’ (ল্যাব) এবং ‘কারগিল ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স’ (কেডিএ) দীর্ঘদিন ধরে লাদাখকে পূর্ণ রাজ্যের মর্যাদা দেওয়া এবং সংবিধানের ষষ্ঠ তফসিলে অন্তর্ভুক্তির দাবি জানিয়ে আসছিল। এই আন্দোলনে স্থানীয় জেন-জি যুবসমাজের অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মতো। ২০২৫ ও ২০২৬ সালজুড়ে চলা এই গণআন্দোলনকে কেন্দ্র সরকার কঠোরভাবে দমনের চেষ্টা করে এবং সোনাম ওয়াংচুককে ন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট-এর অধীনে আটক করা হয়। ওয়াংচুকের স্ত্রী গীতাঞ্জলি জে. আংমোর দায়ের করা হেবিয়াস কর্পাস পিটিশনের ভিত্তিতে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি অরবিন্দ কুমার ও এন ভি আঞ্জারিয়ার বেঞ্চ কেন্দ্রকে নোটিশ জারি করলেও, তরুণদের মধ্যে অসন্তোষ কমেনি।
১৫ মে একটি আইনি শুনানির সময় ভারতের তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত দেশের কর্মহীন ও আন্দোলনরত তরুণদের একাংশকে উদ্দেশ্য করে মন্তব্য করেন যে, তারা ‘তেলাপোকা’-এর মতো আচরণ করছে এবং চাকরি না পেয়ে ডিজিটাল স্পেসে বা আরটিআই অ্যাক্টিভিস্ট সেজে বিভিন্ন সংস্থাকে আক্রমণ করছে। যদিও পরবর্তীতে দাবি করা হয় বক্তব্যটি ভুলভাবে ব্যাখ্যাত হয়েছে, কিন্তু দেশের শিক্ষিত যুবসমাজ এটিকে তাদের আত্মসম্মানে সরাসরি আঘাত হিসেবে গ্রহণ করে। এই চরম অপমানকে প্রতিবাদের কৌশলে পরিণত করে ১৬ মে বোস্টন ইউনিভার্সিটির গ্র্যাজুয়েট ও পলিটিক্যাল স্ট্র্যাটেজিস্ট ৩০ বছর বয়সী অভিজিৎ দিপকে ককরোচ জনতা পার্টি গঠনের ঘোষণা দেন।
ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ঝড়ের গতিতে ছড়িয়ে পড়া এই সিজেপি আন্দোলনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইনস্টাগ্রামে অনুসারীর সংখ্যা ২ কোটি ২০ লাখ অতিক্রম করে, যা দেশটির ক্ষমতাসীন দল বিজেপির অফিশিয়াল হ্যান্ডেলের চেয়েও বেশি। প্রথাবিরোধী এই অনলাইন আন্দোলন বাস্তবের রাজপথে রূপ নেয় ২০ জুলাইয়ে, যখন সংসদ অধিবেশনের প্রথম দিনে সিজেপি ‘সংসদ চলো’ পদযাত্রার আহ্বান জানায়।
বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের (দ্য হিন্দু, এনডিটিভি, রয়টার্স) তথ্যমতে, দিল্লিতে কয়েক স্তরের ব্যারিকেড সত্ত্বেও প্রায় ২০ হাজার শিক্ষার্থী ও যুবকের মিছিল যন্তর মন্তর থেকে সংসদের দোরগোড়ায় পৌঁছে যায়। পুলিশ ও র্যাপিড অ্যাকশন ফোর্স (আরএএফ) তাদের থামাতে লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করে।
সংঘর্ষে বিশেষ কমিশনারসহ প্রায় ১১৮ জন পুলিশ সদস্য এবং ৬০ জনেরও বেশি আন্দোলনকারী গুরুতর আহত হন। পরিস্থিতি সামাল দিতে দিল্লি পুলিশ প্রায় ৭০ জন বিক্ষোভকারীকে আটক করে। বিক্ষোভ মোকাবিলায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এবং শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের মধ্যে কয়েক ঘণ্টার জরুরি বৈঠক হয় এবং স্বাস্থ্যমন্ত্রী জে পি নাড্ডাকে সিজেপি প্রতিনিধিদলের সাথে আলোচনায় পাঠানো হয়।
ভারতে বর্তমানে ৮৫ কোটিরও বেশি স্মার্টফোন ব্যবহারকারী রয়েছেন এবং ১৮ থেকে ২৯ বছর বয়সী ভারতীয় তরুণদের প্রায় ৯৫% সার্বক্ষণিক ইন্টারনেটে সংযুক্ত। ২০২৪ সালের উপাত্ত অনুযায়ী সোশ্যাল মিডিয়ায় সক্রিয় ভারতীয়দের সংখ্যা ছিল ৪৯.১ কোটি। ফেসবুক, এক্স (টুইটার), ইনস্টাগ্রাম এবং ইউটিউবের মতো মাধ্যমগুলোকে ব্যবহার করে জেন-জি আন্দোলনকারীরা কোনো বড় অর্থায়ন বা কেন্দ্রীয় দপ্তর ছাড়াই আন্দোলনকে দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছড়িয়ে দিতে পেরেছে।
ককরোচ জনতা পার্টির অভূতপূর্ব সফলতার প্রধান কারণ হচ্ছে তাদের যোগাযোগের ভাষা। তারা প্রথাগত রাজনৈতিক ভাষণের পরিবর্তে তীক্ষ্ণ হাস্যরস, মিম, ইনস্টাগ্রাম রিলস এবং শর্ট ভিডিওকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। ক্ষমতার অহংকার এবং বিচার বিভাগের একপেশে দৃষ্টিভঙ্গিকে ব্যঙ্গাত্মক রূপকের মাধ্যমে চ্যালেঞ্জ জানানোয় এটি লাখ লাখ সাধারণ তরুণের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে। এমনকি পশ্চিমবঙ্গ বিরোধী শিবিরের রাজনৈতিক কর্মসূচিতে বাংলাদেশের আদলে ‘দফা এক, দাবি এক’ স্লোগান ব্যবহার কিংবা তৃণমূল কংগ্রেস এমপি মহুয়া মৈত্রের মতো ব্যক্তিত্বদের সিজেপির প্রতীকী সদস্যপদ গ্রহণ আন্দোলনটিকে মূলধারার আলোচনায় নিয়ে আসে।
দক্ষিণ এশিয়াজুড়েই জেন-জি কেন্দ্রিক এই গণবিক্ষোভগুলো কেবল অভ্যন্তরীণ রাজনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। এর একটি আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব রয়েছে।
শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ ও নেপালের আন্দোলনগুলোতে একটি সাধারণ উপাদানের উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে, তা হলো, তৎকালীন সরকারগুলোর নীতিতে বৈদেশিকের ভূমিকা এবং জনগণের একাংশের মধ্যে ভারত-বিরোধী দৃষ্টিভঙ্গি। শ্রীলঙ্কায় সংকটের সময় অর্থনৈতিক সহায়তা দেওয়া বা বাংলাদেশে ক্ষমতাসীন সরকারের সঙ্গে ঐতিহাসিক সম্পর্কের কারণে প্রতিবেশী দেশের আন্দোলনগুলোতে ভারতের ভূমিকা নিয়ে ব্যাপক রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। ফলে ভারতে যখন নিজস্ব জেন-জি আন্দোলন দানা বেঁধে ওঠে, তখন অনেকেই এটিকে প্রতিবেশী দেশগুলোর আন্দোলনের সরাসরি প্রচ্ছন্ন প্রভাব হিসেবে দেখতে শুরু করেন।
নয়াদিল্লি ও লাদাখে জেন-জি আন্দোলন দমনে ভারত সরকারের কঠোর নীতি অভ্যন্তরীণ মেরুকরণকে আরও উসকে দিচ্ছে। পিটিআই ও দ্য টেলিগ্রাফের রিপোর্ট অনুযায়ী ২১ সরকারের নির্দেশে সিজেপির অফিশিয়াল এক্স হ্যান্ডেল সাময়িকভাবে ব্লক করা হয় এবং পুলিশি নজরদারি ও সাইবার সেন্সরশিপ বাড়ানো হয়। এছাড়াও সিজেপির আহ্বায়ক অভিজিৎ দিপকের বাসভবনের সামনে পুলিশ মোতায়েন করা হয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সরকার যদি শিক্ষিত তরুণদের এই শান্তিপূর্ণ ও ব্যঙ্গাত্মক আন্দোলনকে কেবল আইন-শৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করে দমন-পীড়ন অব্যাহত রাখে, তবে তা সাধারণ জনগণের সাথে সরকারের ব্যবধানকে আরও বাড়িয়ে তুলবে। লাদাখে অশান্তি বাড়ার সাথে সাথে নয়াদিল্লির বিক্ষোভে পঞ্জাবের কৃষকদের ‘দেশ বাঁচাও মোর্চা’ ব্যানারে নতুন আন্দোলনের ডাক দেওয়া রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতার জন্য জটিল পরিস্থিতি তৈরি করেছে।
দক্ষিণ এশিয়ায় ছড়িয়ে পড়া এই জেন-জি আন্দোলন দীর্ঘস্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেবে, নাকি সময়ের সাথে বাষ্পীভূত হয়ে যাবে—তা নিয়ে বিশ্ব রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে দুটি স্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। নাগরিক অধিকার আন্দোলনের সংগঠক যোগেন্দ্র যাদব দ্য টেলিগ্রাফকে বলেছেন, তিনি সিজেপিকে এখনও একটি পূর্ণাঙ্গ আন্দোলন হিসেবে দেখার চেয়ে ভারতের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের একটি তাৎপর্যপূর্ণ ‘মুহূর্ত’ হিসেবে দেখতে চান। তবে তরুণদের এই সামাজিক অসন্তোষ যে সাময়িক নয়, তার প্রমাণ মেলে সিভোটার জরিপে, যেখানে ১৮ থেকে ৩৪ বছর বয়সী তরুণদের ৭৫%-এরও বেশি ভারতের প্রশ্নপত্র ফাঁস ও অনিয়মের দায়ে দায়িত্বশীল মন্ত্রীদের পদত্যাগ দাবি করেছেন। তরুণ ভোটারদের এই মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব দীর্ঘমেয়াদে নির্বাচনে ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতায় বড় প্রভাব ফেলতে পারে। মূলত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের স্যাটায়ারকে কার্যকর কাঠামোগত এজেন্ডায় রূপান্তরের ক্ষমতা, দমন-পীড়ন ত্যাগ করে সরকারের নমনীয় মনোভাব প্রদর্শন এবং কৃষক-শ্রমিকদের মতো অন্যান্য সামাজিক শ্রেণির সাথে জোট বাঁধার সামর্থ্যের ওপরই এই আন্দোলনের ভবিষ্যতের গতি-প্রকৃতি নির্ভর করছে।
শ্রীলঙ্কার আরাগালয়া থেকে শুরু করে ঢাকার কোটা আন্দোলন, কাঠমান্ডুর প্রথাবিরোধী বিক্ষোভ এবং লাদাখ হয়ে নয়াদিল্লির রাজপথে ককরোচ জনতা পার্টির অভূতপূর্ব উত্থান—দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে এক নজিরবিহীন যুগান্তকারী রূপান্তর ঘটিয়েছে। ব্যালট বাক্সে বা নির্বাচন কমিশনের খাতায় এই বৈপ্লবিক জেন-জি দলগুলোর আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দ্রুত না এলেও, তারা প্রাতিষ্ঠানিক অনিয়মের বিরুদ্ধে এক নতুন অহিংস ও দূরদর্শী নাগরিক পাহারাদার হিসেবে রাজনীতিতে স্থায়ী দাগ কেটে গেছে। ভবিষ্যতে যদি রাষ্ট্রযন্ত্র আলোচনা ও সংস্কারের পথ বেছে না নেয়, তবে সেন্সরশিপ বা আইনি চাপ সত্ত্বেও প্রথাবিরোধী এই জোটগুলো আরও তীব্র গণঅসন্তোষের জন্ম দিতে পারে।

দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্রে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যে অভূতপূর্ব গণবিক্ষোভ ও ক্ষমতার রদবদল দেখা যচ্ছে, তা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি গভীর অর্থনৈতিক সংকট, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি এবং তরুণ প্রজন্মের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ থেকে জন্ম নেওয়া এক আন্তঃসীমান্ত ‘ডমিনো ইফেক্ট’।
২০২২ সালে শ্রীলঙ্কার দেউলিয়া হয়ে যাওয়া অর্থনৈতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে সূচিত ‘আরাগালয়া’ বা ‘গোতা গো হোম’ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে এই আঞ্চলিক ক্ষোভের প্রথম টাইলটি পড়েছিল, যা পরবর্তীতে প্রতিবেশী দেশগুলোর সুশীল সমাজ ও যুবশক্তির মধ্যে দাবানলের মতো প্রচ্ছন্ন উদ্দীপনা সঞ্চার করে।
এই গণরোষের ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালে বাংলাদেশে কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে শুরু করে শেখ হাসিনা সরকারের পতন এবং পরবর্তী সময়ে নেপালে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও তরুণদের ‘নেপো কিড’ বিরোধী বিক্ষোভ প্রমাণ করেছে যে, অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী শাসকশ্রেণি জনগণের গণতান্ত্রিক মৌলিক প্রত্যাশা পূরণে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে।
দক্ষিণ এশিয়ার এই বিক্ষোভগুলোর মূল চালিকাশক্তি কোনো রাজনৈতিক দল বা সশস্ত্র গোষ্ঠী নয়, বরং জেনজি প্রজন্ম, যারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে হাতিয়ার করে নেতৃত্বহীন, বিকেন্দ্রীভূত এবং প্রথাবিরোধী রাজনৈতিক শক্তির রূপদান করেছে। ভৌগোলিক ও রাজনৈতিকভাবে বৈচিত্র্যময় এই অঞ্চলে এক দেশের সাধারণ মানুষের সফলতা অন্য দেশের নিপীড়িত তরুণদের অধিকার আদায়ে সাহসী করে তুলেছে, যা বিশ্বরাজনীতিতে আঞ্চলিক গণআন্দোলনের এক নতুন মডেল তৈরি করেছে।
ভারত শুরুতে নিজেদের এই তরুণ বিপ্লবের প্রভাব থেকে সুরক্ষিত মনে করলেও, লাদাখে স্থানীয় অধিকার রক্ষার আন্দোলন এবং সম্প্রতি নয়াদিল্লিতে আছড়ে পড়া যুব-বিক্ষোভের ঘটনা স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, আঞ্চলিক এই স্ফুলিঙ্গ এখন ভারতের অভ্যন্তরেও এক নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের উন্মোচন করেছে।
ভারতের ১৪৪ কোটি জনসংখ্যার প্রায় ২৬ শতাংশ থেকে ২৮ শতাংশই ১৯৯৭ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে জন্মগ্রহণকারী জেন-জি প্রজন্ম। উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করার পরও আশঙ্কাজনক যুব বেকারত্ব (যা শহরাঞ্চলে ১৩.৬% ও তরুণ স্নাতকদের ক্ষেত্রে ২৯% ছুঁয়েছে), সরকারি প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের অভাবে এই বিশাল যুব সমাজ দীর্ঘদিন ধরে এক হতাশায় দিন কাটাচ্ছিল। সেই হতাশার আগুনে ঘৃতাহুতি পড়ে যখন ভারতের সর্বোচ্চ আদালতের মাননীয় প্রধান বিচারপতির একটি বিতর্কিত মন্তব্যে কর্মহীন যুবসমাজকে কটাক্ষ করা হয় এবং অপমানকে শক্তিতে রূপান্তর করে অভিজিৎ দীপকের নেতৃত্বে ১৬ মে জন্ম নেয় ব্যঙ্গাত্মক সামাজিক-রাজনৈতিক প্রতিরোধ ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)।
কঠিন পরিস্থিতিতেও তেলাপোকা যেভাবে টিকে থাকে, ঠিক তেমনি প্রতিকূল অর্থনৈতিক বাজার ও ভঙ্গুর চাকরির পরিস্থিতিতেও শিক্ষিত যুবসমাজ টিকে থাকার লড়াই করবে—এই রূপক দর্শনে চালিত দলটি দ্রুত ইন্টারনেট স্পেস অতিক্রম করে রাজপথে নেমে আসে। ২০২৬ সালের ২০ জুলাই নয়াদিল্লির যন্তর মন্তরে হাজার হাজার তরুণ প্রতীকী তেলাপোকার মাস্ক পরে ব্যারিকেড ভেঙে পার্লামেন্ট ভবনের কাছাকাছি পৌঁছে গেলে পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর টিয়ারগ্যাস ও লাঠিচার্জের মুখে সংঘাতময় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, যা বিশ্ব গণমাধ্যমে আলোচনার শীর্ষে উঠে আসে।
দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনৈতিক ও সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা কীভাবে ভৌগোলিক সীমা অতিক্রম করে এক রাষ্ট্র থেকে অন্য রাষ্ট্রে স্থানান্তরিত হয়, সাম্প্রতিক আঞ্চলিক রাজনীতি তার স্পষ্ট সাক্ষী। এই ধারাবাহিক বিক্ষোভের মূল সুর গড়ে উঠেছে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদ অপচয়ের বিরুদ্ধে তরুণদের তীব্র অনাস্থার ভিত্তিতে।
দক্ষিণ এশিয়ায় প্রথাগত শাসনব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ জানানোর প্রথম রূপরেখা তৈরি করে শ্রীলঙ্কার ২০২২ সালের ‘আরাগালয়া’ আন্দোলন। ভুল অর্থনৈতিক নীতি, বিদেশি ঋণের বোঝা এবং করোনা মহামারীর পর পর্যটন খাত ধসে পড়ায় দেশটির বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ মারাত্মকভাবে হ্রাস পায়। মুদ্রাস্ফীতি এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্য ও জ্বালানির তীব্র সংকটের মুখে শ্রীলঙ্কার সাধারণ জনগণ, বিশেষ করে তরুণ সমাজ, কোনো রাজনৈতিক দলের ব্যানার ছাড়াই রাজপথে নেমে আসে। তারা প্রেসিডেন্টের বাসভবন দখল করে এবং গোতাবায়া রাজাপক্ষেকে দেশত্যাগে বাধ্য করে।
শ্রীলঙ্কার এই সাফল্য বাংলাদেশে প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক প্রভাব ফেলে। ২০২৪ সালের মধ্যভাগে বাংলাদেশে কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থী ও তরুণ সমাজ রাজপথে নেমে আসে এবং তৎকালীন শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটায়। এই আন্দোলনের বিশেষত্ব ছিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে দ্রুত জনমত গড়ে তোলা এবং সমন্বয়কারীদের বিকেন্দ্রীভূত নেতৃত্বের প্রয়োগ। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, তরুণদের এই অসন্তোষের পেছনে অন্যতম মূল অনুঘটক ছিল উচ্চ বেকারত্ব ও চাকরির বাজারের অনিশ্চয়তা।
বাংলাদেশের বিক্ষোভের রেশ না কাটতেই নেপালে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও স্বজনপ্রীতির বিরুদ্ধে জেন-জি প্রজন্ম তীব্র প্রতিবাদ শুরু করে। ‘নেপো কিড’ হ্যাশট্যাগের অধীনে টিকটক ও রেডিট-এর মতো প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে সাধারণ তরুণরা দেশটির ক্ষমতার শীর্ষে থাকা রাজনৈতিক পরিবারের সদস্যদের বিলাসবহুল জীবনযাত্রা ও দুর্নীতির চিত্র ফাঁস করে দেয়। সাধারণ তরুণদের চরম বেকারত্বের বিপরীতে বিশেষ সুবিধাভোগী শ্রেণীর সম্পদ প্রদর্শন সমাজকে চরমভাবে বিভক্ত করে তোলে। নেপালের জেন-জিদের এই সামাজিক প্রতিরোধ কেপি শর্মা ওলির সরকারের জন্য চরম রাজনৈতিক চাপ তৈরি করে এবং দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলে তরুণদের এই অনলাইনভিত্তিক সংঘবদ্ধতা এক শক্তিশালী নিয়ামক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশী দেশগুলোতে যখন রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটছিল, তখন ভারতের রাজনীতিতে একটি ধারণা ছিল যে, বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র হিসেবে দেশটি এই ধরনের প্রথাবিরোধী আন্দোলন থেকে মুক্ত থাকবে। তবে দেশের অভ্যন্তরে জেন-জি প্রজন্মের জনমিতিক অবস্থান এবং আর্থ-সামাজিক বঞ্চনা একটি বৈপ্লবিক প্ল্যাটফর্ম তৈরির পথ প্রশস্ত করছিল।
দেশে সামগ্রিক বার্ষিক বেকারত্বের হার কমে ৩.১%-এ নেমেছে, তবে ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী যুব বেকারত্বের হার এখনো ৯.৯% এবং শহরাঞ্চলে তা ১৩.৬% পর্যন্ত বিস্তৃত। উচ্চশিক্ষিত তরুণদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক; সাধারণ গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্নকারীদের মধ্যে বেকারত্বের হার ১১.২% হলেও তরুণ স্নাতকদের (১৫-২৫ বছর) ক্ষেত্রে তা ২৯% ছুঁয়েছে। অসীম প্রেমজি বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘স্টেট অব ওয়ার্কিং ইন্ডিয়া ২০২৬’ প্রতিবেদনের তথ্যমতে, ভারতের মোট কর্মহীন তরুণদের প্রায় ৬৭%ই উচ্চশিক্ষিত স্নাতক। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা ও বিশ্বব্যাংকের সমসাময়িক পরিসংখ্যান নিশ্চিত করে যে, বিশ্বের একক বৃহত্তম জেন-জি জনগোষ্ঠী হওয়া সত্ত্বেও কাজের বাজারে এই গভীর অসঙ্গতি তরুণদের তীব্র অর্থনৈতিক সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
শিক্ষিত তরুণদের মধ্যে এই সামাজিক ও অর্থনৈতিক অসন্তোষের অন্যতম বড় কারণ ছিল প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা ব্যবস্থার চরম অস্থিতিশীলতা। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জাতীয় স্তরের মেডিকেল প্রবেশিকা পরীক্ষা-সহ একাধিক রাজকীয় ও রাজ্য পর্যায়ের সরকারি চাকরির পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস ও কারিগরি অনিয়মের ঘটনা ঘটে। এতে লাখ লাখ শিক্ষার্থী তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়ে। নীতিনির্ধারকদের অবহেলা ও অনিয়ম পরীক্ষার্থীদের ধৈর্য চ্যুত করে এবং একটি সংগঠিত প্রতিবাদের মানসিক ভিত্তি তৈরি করে।
ভারতের ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দলগুলো এখনও বংশানুক্রমিক নেতৃত্ব, আঞ্চলিক ভোটব্যাংক এবং পুরোনো মতাদর্শের ভিত্তিতে রাজনীতি পরিচালনা করে। কিন্তু জেন-জি প্রজন্ম নিজেদের অধিকার, জলবায়ু পরিবর্তন, মানসম্মত শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং ডিজিটাল স্বাধীনতার মতো আধুনিক ও সুনির্দিষ্ট ইস্যুগুলোতে স্পষ্ট অঙ্গীকার চায়। প্রথাগত রাজনীতিতে নিজেদের সঠিক প্রতিনিধিত্ব না দেখে তরুণরা বর্তমান রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি পুরোপুরি বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়ে, যা তাদের প্রচলিত রাজনৈতিক কাঠামোর বাইরে গিয়ে নিজস্ব প্লাটফর্ম তৈরিতে উৎসাহিত করে।
ভারতের মূল ভূখণ্ডে জেন-জি কেন্দ্রিক আন্দোলনের প্রকাশটি ঘটেছে অতি দ্রুত এবং প্রথাবিরোধী উপায়ে। রাজনৈতিক সচেতনতা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সংমিশ্রণে শুরু হওয়া এই আন্দোলন অল্প সময়েই বিশাল এক পরিধি লাভ করে।
ভারতের জেন-জি আন্দোলনের প্রথম স্পষ্ট স্ফুলিঙ্গ দেখা যায় লাদাখে। পরিবেশকর্মী ও শিক্ষাবিদ সোনাম ওয়াংচুকের নেতৃত্বে স্থানীয় নাগরিক সংগঠন ‘লেহ অ্যাপেক্স বডি’ (ল্যাব) এবং ‘কারগিল ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স’ (কেডিএ) দীর্ঘদিন ধরে লাদাখকে পূর্ণ রাজ্যের মর্যাদা দেওয়া এবং সংবিধানের ষষ্ঠ তফসিলে অন্তর্ভুক্তির দাবি জানিয়ে আসছিল। এই আন্দোলনে স্থানীয় জেন-জি যুবসমাজের অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মতো। ২০২৫ ও ২০২৬ সালজুড়ে চলা এই গণআন্দোলনকে কেন্দ্র সরকার কঠোরভাবে দমনের চেষ্টা করে এবং সোনাম ওয়াংচুককে ন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট-এর অধীনে আটক করা হয়। ওয়াংচুকের স্ত্রী গীতাঞ্জলি জে. আংমোর দায়ের করা হেবিয়াস কর্পাস পিটিশনের ভিত্তিতে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি অরবিন্দ কুমার ও এন ভি আঞ্জারিয়ার বেঞ্চ কেন্দ্রকে নোটিশ জারি করলেও, তরুণদের মধ্যে অসন্তোষ কমেনি।
১৫ মে একটি আইনি শুনানির সময় ভারতের তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত দেশের কর্মহীন ও আন্দোলনরত তরুণদের একাংশকে উদ্দেশ্য করে মন্তব্য করেন যে, তারা ‘তেলাপোকা’-এর মতো আচরণ করছে এবং চাকরি না পেয়ে ডিজিটাল স্পেসে বা আরটিআই অ্যাক্টিভিস্ট সেজে বিভিন্ন সংস্থাকে আক্রমণ করছে। যদিও পরবর্তীতে দাবি করা হয় বক্তব্যটি ভুলভাবে ব্যাখ্যাত হয়েছে, কিন্তু দেশের শিক্ষিত যুবসমাজ এটিকে তাদের আত্মসম্মানে সরাসরি আঘাত হিসেবে গ্রহণ করে। এই চরম অপমানকে প্রতিবাদের কৌশলে পরিণত করে ১৬ মে বোস্টন ইউনিভার্সিটির গ্র্যাজুয়েট ও পলিটিক্যাল স্ট্র্যাটেজিস্ট ৩০ বছর বয়সী অভিজিৎ দিপকে ককরোচ জনতা পার্টি গঠনের ঘোষণা দেন।
ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ঝড়ের গতিতে ছড়িয়ে পড়া এই সিজেপি আন্দোলনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইনস্টাগ্রামে অনুসারীর সংখ্যা ২ কোটি ২০ লাখ অতিক্রম করে, যা দেশটির ক্ষমতাসীন দল বিজেপির অফিশিয়াল হ্যান্ডেলের চেয়েও বেশি। প্রথাবিরোধী এই অনলাইন আন্দোলন বাস্তবের রাজপথে রূপ নেয় ২০ জুলাইয়ে, যখন সংসদ অধিবেশনের প্রথম দিনে সিজেপি ‘সংসদ চলো’ পদযাত্রার আহ্বান জানায়।
বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের (দ্য হিন্দু, এনডিটিভি, রয়টার্স) তথ্যমতে, দিল্লিতে কয়েক স্তরের ব্যারিকেড সত্ত্বেও প্রায় ২০ হাজার শিক্ষার্থী ও যুবকের মিছিল যন্তর মন্তর থেকে সংসদের দোরগোড়ায় পৌঁছে যায়। পুলিশ ও র্যাপিড অ্যাকশন ফোর্স (আরএএফ) তাদের থামাতে লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করে।
সংঘর্ষে বিশেষ কমিশনারসহ প্রায় ১১৮ জন পুলিশ সদস্য এবং ৬০ জনেরও বেশি আন্দোলনকারী গুরুতর আহত হন। পরিস্থিতি সামাল দিতে দিল্লি পুলিশ প্রায় ৭০ জন বিক্ষোভকারীকে আটক করে। বিক্ষোভ মোকাবিলায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এবং শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের মধ্যে কয়েক ঘণ্টার জরুরি বৈঠক হয় এবং স্বাস্থ্যমন্ত্রী জে পি নাড্ডাকে সিজেপি প্রতিনিধিদলের সাথে আলোচনায় পাঠানো হয়।
ভারতে বর্তমানে ৮৫ কোটিরও বেশি স্মার্টফোন ব্যবহারকারী রয়েছেন এবং ১৮ থেকে ২৯ বছর বয়সী ভারতীয় তরুণদের প্রায় ৯৫% সার্বক্ষণিক ইন্টারনেটে সংযুক্ত। ২০২৪ সালের উপাত্ত অনুযায়ী সোশ্যাল মিডিয়ায় সক্রিয় ভারতীয়দের সংখ্যা ছিল ৪৯.১ কোটি। ফেসবুক, এক্স (টুইটার), ইনস্টাগ্রাম এবং ইউটিউবের মতো মাধ্যমগুলোকে ব্যবহার করে জেন-জি আন্দোলনকারীরা কোনো বড় অর্থায়ন বা কেন্দ্রীয় দপ্তর ছাড়াই আন্দোলনকে দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছড়িয়ে দিতে পেরেছে।
ককরোচ জনতা পার্টির অভূতপূর্ব সফলতার প্রধান কারণ হচ্ছে তাদের যোগাযোগের ভাষা। তারা প্রথাগত রাজনৈতিক ভাষণের পরিবর্তে তীক্ষ্ণ হাস্যরস, মিম, ইনস্টাগ্রাম রিলস এবং শর্ট ভিডিওকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। ক্ষমতার অহংকার এবং বিচার বিভাগের একপেশে দৃষ্টিভঙ্গিকে ব্যঙ্গাত্মক রূপকের মাধ্যমে চ্যালেঞ্জ জানানোয় এটি লাখ লাখ সাধারণ তরুণের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে। এমনকি পশ্চিমবঙ্গ বিরোধী শিবিরের রাজনৈতিক কর্মসূচিতে বাংলাদেশের আদলে ‘দফা এক, দাবি এক’ স্লোগান ব্যবহার কিংবা তৃণমূল কংগ্রেস এমপি মহুয়া মৈত্রের মতো ব্যক্তিত্বদের সিজেপির প্রতীকী সদস্যপদ গ্রহণ আন্দোলনটিকে মূলধারার আলোচনায় নিয়ে আসে।
দক্ষিণ এশিয়াজুড়েই জেন-জি কেন্দ্রিক এই গণবিক্ষোভগুলো কেবল অভ্যন্তরীণ রাজনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। এর একটি আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব রয়েছে।
শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ ও নেপালের আন্দোলনগুলোতে একটি সাধারণ উপাদানের উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে, তা হলো, তৎকালীন সরকারগুলোর নীতিতে বৈদেশিকের ভূমিকা এবং জনগণের একাংশের মধ্যে ভারত-বিরোধী দৃষ্টিভঙ্গি। শ্রীলঙ্কায় সংকটের সময় অর্থনৈতিক সহায়তা দেওয়া বা বাংলাদেশে ক্ষমতাসীন সরকারের সঙ্গে ঐতিহাসিক সম্পর্কের কারণে প্রতিবেশী দেশের আন্দোলনগুলোতে ভারতের ভূমিকা নিয়ে ব্যাপক রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। ফলে ভারতে যখন নিজস্ব জেন-জি আন্দোলন দানা বেঁধে ওঠে, তখন অনেকেই এটিকে প্রতিবেশী দেশগুলোর আন্দোলনের সরাসরি প্রচ্ছন্ন প্রভাব হিসেবে দেখতে শুরু করেন।
নয়াদিল্লি ও লাদাখে জেন-জি আন্দোলন দমনে ভারত সরকারের কঠোর নীতি অভ্যন্তরীণ মেরুকরণকে আরও উসকে দিচ্ছে। পিটিআই ও দ্য টেলিগ্রাফের রিপোর্ট অনুযায়ী ২১ সরকারের নির্দেশে সিজেপির অফিশিয়াল এক্স হ্যান্ডেল সাময়িকভাবে ব্লক করা হয় এবং পুলিশি নজরদারি ও সাইবার সেন্সরশিপ বাড়ানো হয়। এছাড়াও সিজেপির আহ্বায়ক অভিজিৎ দিপকের বাসভবনের সামনে পুলিশ মোতায়েন করা হয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সরকার যদি শিক্ষিত তরুণদের এই শান্তিপূর্ণ ও ব্যঙ্গাত্মক আন্দোলনকে কেবল আইন-শৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করে দমন-পীড়ন অব্যাহত রাখে, তবে তা সাধারণ জনগণের সাথে সরকারের ব্যবধানকে আরও বাড়িয়ে তুলবে। লাদাখে অশান্তি বাড়ার সাথে সাথে নয়াদিল্লির বিক্ষোভে পঞ্জাবের কৃষকদের ‘দেশ বাঁচাও মোর্চা’ ব্যানারে নতুন আন্দোলনের ডাক দেওয়া রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতার জন্য জটিল পরিস্থিতি তৈরি করেছে।
দক্ষিণ এশিয়ায় ছড়িয়ে পড়া এই জেন-জি আন্দোলন দীর্ঘস্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেবে, নাকি সময়ের সাথে বাষ্পীভূত হয়ে যাবে—তা নিয়ে বিশ্ব রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে দুটি স্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। নাগরিক অধিকার আন্দোলনের সংগঠক যোগেন্দ্র যাদব দ্য টেলিগ্রাফকে বলেছেন, তিনি সিজেপিকে এখনও একটি পূর্ণাঙ্গ আন্দোলন হিসেবে দেখার চেয়ে ভারতের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের একটি তাৎপর্যপূর্ণ ‘মুহূর্ত’ হিসেবে দেখতে চান। তবে তরুণদের এই সামাজিক অসন্তোষ যে সাময়িক নয়, তার প্রমাণ মেলে সিভোটার জরিপে, যেখানে ১৮ থেকে ৩৪ বছর বয়সী তরুণদের ৭৫%-এরও বেশি ভারতের প্রশ্নপত্র ফাঁস ও অনিয়মের দায়ে দায়িত্বশীল মন্ত্রীদের পদত্যাগ দাবি করেছেন। তরুণ ভোটারদের এই মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব দীর্ঘমেয়াদে নির্বাচনে ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতায় বড় প্রভাব ফেলতে পারে। মূলত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের স্যাটায়ারকে কার্যকর কাঠামোগত এজেন্ডায় রূপান্তরের ক্ষমতা, দমন-পীড়ন ত্যাগ করে সরকারের নমনীয় মনোভাব প্রদর্শন এবং কৃষক-শ্রমিকদের মতো অন্যান্য সামাজিক শ্রেণির সাথে জোট বাঁধার সামর্থ্যের ওপরই এই আন্দোলনের ভবিষ্যতের গতি-প্রকৃতি নির্ভর করছে।
শ্রীলঙ্কার আরাগালয়া থেকে শুরু করে ঢাকার কোটা আন্দোলন, কাঠমান্ডুর প্রথাবিরোধী বিক্ষোভ এবং লাদাখ হয়ে নয়াদিল্লির রাজপথে ককরোচ জনতা পার্টির অভূতপূর্ব উত্থান—দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে এক নজিরবিহীন যুগান্তকারী রূপান্তর ঘটিয়েছে। ব্যালট বাক্সে বা নির্বাচন কমিশনের খাতায় এই বৈপ্লবিক জেন-জি দলগুলোর আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দ্রুত না এলেও, তারা প্রাতিষ্ঠানিক অনিয়মের বিরুদ্ধে এক নতুন অহিংস ও দূরদর্শী নাগরিক পাহারাদার হিসেবে রাজনীতিতে স্থায়ী দাগ কেটে গেছে। ভবিষ্যতে যদি রাষ্ট্রযন্ত্র আলোচনা ও সংস্কারের পথ বেছে না নেয়, তবে সেন্সরশিপ বা আইনি চাপ সত্ত্বেও প্রথাবিরোধী এই জোটগুলো আরও তীব্র গণঅসন্তোষের জন্ম দিতে পারে।
.png)

একটি রাজনৈতিক তুলনা তখনই গ্রহণযোগ্য হয়, যখন দুই ঘটনার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, ক্ষমতার অবস্থান, দেশত্যাগের কারণ এবং জন-প্রতিক্রিয়া সমমানের হয়। সাম্প্রতিক সময়ে একটি যুক্তি সামনে আনা হয় যে, এক-এগারোর সময় তারেক রহমানের দেশত্যাগ এবং ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার দেশত্যাগ একই প্রকৃতির ঘটনা।
৩ ঘণ্টা আগে
লিথুয়ানিয়ায় কাজের আশায় নেপাল ঘুরে দেশে ফিরে এসেছেন ছয় তরুণ। এই কাহিনী কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বাংলাদেশের গভীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটের প্রতিচ্ছবি এই ছয় তরুণ। দেশে কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতা, উন্নত জীবনের আকাঙ্ক্ষা এবং দেশের বাইরে গিয়ে এই জীবন থেকে মুক্তি পাওয়ার প্রবল বাসনাকে পুঁজি করে প্রতিনিয়ত সক্র
৩ ঘণ্টা আগে
আজকে সামনে কিশোর-কিশোরীদের আচরণের বিচ্যুতি ও উগ্রতা দৃশ্যমান হচ্ছে। এর পাশাপাশি তাদের মধ্যে ইতিবাচক পরিবর্তনের সম্ভাবনা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রশ্নটিও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এসব মূলত কাঠামোগত সামাজিক ধসের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে বিবেচিত হয়।
৫ ঘণ্টা আগে
কিছু মানুষ পৃথিবীতে আসেন ক্ষণিকের জন্য, কিন্তু চিরতরে নিভে যাওয়ার আগ মুহূর্তে তারা হয়ে ওঠেন অন্যের জীবনের অনন্ত আলোকবর্তিকা। মৃত্যু তাদের নিশ্চিহ্ন করতে পারে না। এমনই এক নির্লোভ ও মহীয়সী নারী ছিলেন মাহেরীন চৌধুরী। পেশায় ছিলেন শিক্ষিক, কিন্তু মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে প্রমাণ করে গেছেন—তিনি কেবল শ্রেণি
১২ ঘণ্টা আগে