তিন বিশেষজ্ঞের মত

যেভাবে শেষ হতে পারে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান। ছবি: স্ট্রিম গ্রাফিক
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান। ছবি: স্ট্রিম গ্রাফিক

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাত শেষ হওয়ার কোনো লক্ষণ নেই। চলছে নিজেদের অবস্থানে অনড় থাকার মন্তব্য। যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য, অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপে রেখে ইরানকে আলোচনায় বসতে বাধ্য করা। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে ইরানের হামলা বন্ধ করাও অন্যতম লক্ষ্য। জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি সমঝোতা স্মারক সই করেছিল। এর আওতায় ৬০ দিনের মধ্যে স্থায়ী যুদ্ধবিরতি ও একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর কথা ছিল। তবে সেই সময়সীমা ইতোমধ্যে শেষ হয়ে গেছে।

সংঘাত ৭ মাসে গড়িয়েছে। এটি শেষ পর্যন্ত কোন দিকে যেতে পারে, তা নিয়ে তিন বিশেষজ্ঞের মতামত নেওয়া হয়েছে।

সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপে ইরানকে আলোচনায় আনতে চায় যুক্তরাষ্ট্র

জেসন ক্যাম্পবেল, সিনিয়র ফেলো, মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউট, ওয়াশিংটন

ইরান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত আসল লক্ষ্য কী, তা এখনো পরিষ্কার নয়। রাজনৈতিকভাবে কোন পরিস্থিতি তারা মেনে নিতে পারবে, সেটিও হোয়াইট হাউস বারবার নতুন করে বিবেচনা করছে।

শুরুতে ধারণা করা হয়েছিল, সামরিক অভিযানেই দ্রুত জয় আসবে। কিন্তু তা হয়নি।

এখন যুক্তরাষ্ট্র সামরিক ও অর্থনৈতিক—দুই ধরনের চাপই কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে।

মার্কিন কর্মকর্তারা আশা করছেন, নতুন নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরান দুর্বল অবস্থান থেকে আলোচনার টেবিলে আসতে বাধ্য হবে।

সাম্প্রতিক দিনগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালি দিয়ে কিছুটা জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করতে পেরেছে বলে মনে হচ্ছে। এতে তেলের দামে বড় ধরনের ধাক্কা বা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় সংকট এড়ানো গেছে। তবে যুদ্ধ শুরুর সময় এটি যুক্তরাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য ছিল না।

আমার ধারণা, সংঘাত শেষ করতে ইরান বড় ধরনের ছাড় চাইবে। আর সেই দাবি ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষে রাজনৈতিকভাবে মেনে নেওয়া কঠিন হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের ছাড়ের অপেক্ষায় ইরান

ড. আনিসেহ বাসিরি তাবরিজি, সহযোগী ফেলো, চ্যাথাম হাউস

সাম্প্রতিক হামলায় ইরানে বড় কোনো পরিবর্তন এসেছে বলে আমি মনে করি না। তেহরান অর্থনীতির ওপর আরও চাপ আসার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। পাশাপাশি গত কয়েক মাসের মতো বিরতি দিয়ে হামলা ও পাল্টা হামলা চলতে পারে। ইরান সম্ভবত এসব হামলার জবাব সীমিত রাখবে, যাতে বড় সংঘাতে রূপ না নেয়।

অর্থনৈতিক চাপ অবশ্যই ইরানের জন্য ক্ষতিকর হবে। যুদ্ধের কারণে দেশটির অর্থনীতি এরই মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত। এর আগে থেকেই অর্থনীতিতে নানা কাঠামোগত সমস্যা ছিল। ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে ইরানে যে বিক্ষোভ হয়েছিল, সেখানেও এসব সমস্যার প্রভাব দেখা গেছে।

তবে আমার মনে হয় না, অর্থনৈতিক চাপ এখনই ইরানের অবস্থান বদলে দেবে। আলোচনার ক্ষেত্রেও এর তেমন প্রভাব পড়বে না।

এর মানে এই নয় যে ইরান সংঘাত থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজছে না। তবে তারা মনে করছে, এখন যুক্তরাষ্ট্রের ছাড় দেওয়ার সময়।

তেহরান চাইছে, যুক্তরাষ্ট্র জুনের সমঝোতা স্মারকে ফিরে আসুক। অথবা অন্তত নতুন কোনো ছাড়ের প্রস্তাব দিক।

ইরান যুক্তরাষ্ট্রের চাপের কাছে নতি স্বীকার করতে চায় না। নিষেধাজ্ঞা বা নতুন হামলার কারণে নিজেদের অবস্থানও বদলাতে চায় না।

সংঘাত থেকে বের হওয়ার পথ আছে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে

নিকোলাস হপটন, আন্তর্জাতিক নিরাপত্তাবিষয়ক বিশিষ্ট ফেলো, রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউট, লন্ডন; ইরানে সাবেক ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত

সামরিক হামলা বাড়িয়ে ইরানকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা যাবে না। সাম্প্রতিক হামলা সংঘাতের আরেকটি নতুন মোড় মাত্র।

অর্থনৈতিক চাপও খুব একটা কাজে আসবে না। কারণ চীন, রাশিয়া এবং ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য করা আরও অনেক দেশ একতরফা মার্কিন নিষেধাজ্ঞাকে সমর্থন করবে না।

ইরান চাইলে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত করে যেতে পারে। এই নৌপথের ওপর তাদের প্রভাব বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করে।

আমার মনে হয়, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে আগে থেকেই সেই পথ খোলা আছে। ট্রাম্প যদি জুনের সমঝোতা স্মারকে থাকা চুক্তি নিয়ে আবার গুরুত্ব দিয়ে আলোচনা শুরু করেন, সেটিই হতে পারে সংঘাত থেকে বের হওয়ার পথ।

এ ধরনের একটি চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রকে একধরনের বিজয়ও এনে দিতে পারে। কারণ এর মাধ্যমে ইরানের কট্টরপন্থিরা দুর্বল হবে। একই সঙ্গে বিশ্বকে আশ্বস্ত করা যাবে যে ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না।

জুনের সমঝোতা স্মারকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ইরানের ওপর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সব নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া।

নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হলে সময়ের সঙ্গে ইরানের শক্তিশালী ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) দুর্বল হতে পারে। বিশ্বের সঙ্গে ইরানের নতুন অর্থনৈতিক সম্পর্ক দেশটির রাজনীতি ও সমাজে ধীরে ধীরে পরিবর্তন আনতে পারে।

ফলে ইসলামি শাসনব্যবস্থা হয়ত থাকবে, কিন্তু সেটি বর্তমানের চেয়ে অনেক ভিন্ন ধরনের হতে পারে।

অবশ্য কাজটি সহজ হবে না। ইরানের অর্থনীতির বড় অংশে আইআরজিসির ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। তবে পর্যাপ্ত সময় দেওয়া হলে এবং যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা ধৈর্য ধরে এগোলে এই কৌশল কাজ করতে পারে।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এই মুহূর্তে সেই কৌশলগত ধৈর্যের ঘাটতি রয়েছে।

তাই আপাতত সংঘাতটি অনিশ্চয়তার মধ্যেই চলতে পারে। আর এমন পরিস্থিতি শেষ পর্যন্ত সবার জন্যই খারাপ।

সূত্র: বিবিসি

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত