স্মৃতি রুমানা

বাংলাদেশের সকালগুলোতে একটি দৃশ্য খুবই সাধারণ: স্কুলের পথে শিশুরা ব্যাগ কাঁধে, চোখে আধো ঘুম, মাথায় হাজার রকম চাপ। এদের কেউ বইকে ভালোবাসে, কেউ বইকে ভয় পায়, কেউ বইয়ের পাতায় নিজের জীবনকে খানিকটা খুঁজে পায়।
আবার কেউ নানা মাত্রিক চাপ অনুভব করে নিজের অস্তিত্বই খুঁজে পায় না। আর তখনই ‘পাঠ্যবই কেমন হওয়া উচিত?’—এই প্রশ্ন ওঠে। কারণ আমরা তো জানি, পাঠ্যবই শুধু শেখায় না, পাঠ্যবই জানায় কীভাবে শিখতে হবে, কীভাবে ভাবতে হবে এবং শেষ পর্যন্ত কীভাবে বাঁচতে হবে।
বাংলাদেশে পাঠ্যবই নিয়ে তর্ক বহুকালের। এজন্য আমরা বারবার ভুল সংশোধন করেছি, বিষয়বস্তু বদলে ফেলেছি, অধ্যায় যোগ-বিয়োগ করেছি। কিন্তু সবচেয়ে বড় ভুলটা করেছি সম্ভবত অন্য জায়গায়। আমরা কখনোই পাঠ্যবইকে ঠিক শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক করে তুলতে পারিনি।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১২৯৯ বঙ্গাব্দে ‘শিক্ষার হেরফের’ প্রবন্ধে বলেছিলেন, ‘যতটুকু কেবলমাত্র শিক্ষা অর্থাৎ অত্যাবশ্যক তাহারই মধ্যে শিশুদিগকে একান্ত নিবদ্ধ রাখিলে কখনোই তাহাদের মন যথেষ্ট পরিমাণে বাড়িতে পারে না।’ এই প্রবন্ধে তিনি আরও একটা কথা বলেছিলেন যে, ‘দেয়াল গাঁথতে আরম্ভ করার পূর্বে এর ভিত্তিপ্রস্তর কী রকম, কীভাবে গাঁথলে দেয়ালটা সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে, হেলে পড়বে না, সেসব ভাবনা ভেবেই কাজ শুরু করা উচিত। রোগের কারণ না জেনে চিকিৎসা করতে গেলে উল্টো ফল হবার সম্ভাবনাই বেশি।’ রবীন্দ্রনাথের এ কথা বলার শতবর্ষ পরেও আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা, পাঠ্যবই আমাদের শিশুদের পরিপূর্ণ বিকাশ নিশ্চিত করতে পারছে না।
অবশ্য বিনামূল্যে বই বিতরণ হচ্ছে, শিক্ষার্থী সংখ্যা বাড়ছে ঠিকই, কিন্তু শেখার গভীরতা কমছে। কারণ বইয়ের সঙ্গে জীবনের সম্পর্ক ছিন্ন হচ্ছে। মৌলিক দক্ষতা যেমন পড়ে শেখা, যৌক্তিক ভাবনা ও বাস্তব জীবনে প্রয়োগে ক্ষেত্রে বড় ফাঁক থেকে যাচ্ছে। এই ফাঁকটা যেমন পরীক্ষার ফলাফলে ধরা পড়ে, তেমনি ধরা পড়ে নাগরিক জীবনের প্রতিটি স্তরে। অর্থাৎ শিক্ষা দুর্বল হলে সমাজও দুর্বল হয়।
শিক্ষা কোনো নির্দিষ্ট সময় বা শ্রেণিকক্ষে সীমাবদ্ধ বিষয় নয়। এটি একটি জাতির আত্মপরিচয়, চিন্তাধারা ও ভবিষ্যৎ পথচলার ভিত্তি। আর সেই শিক্ষার সবচেয়ে শক্তিশালী ও প্রভাবশালী উপকরণ হলো পাঠ্যবই। বিশেষ করে প্রাথমিক স্তরের পাঠ্যবই শিশুর ভাষা, চিন্তা, মূল্যবোধ ও পৃথিবীকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলে। তাই পাঠ্যবইয়ের প্রশ্নটা এখন আর কেবল পাঠ্যসূচি বা পরীক্ষার সঙ্গে যুক্ত নয়; একটা সামগ্রিক জীবনবোধের প্রতিফলন।

বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে পাঠ্যবই নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্ব, প্রযুক্তির বিস্তার, কর্মক্ষেত্রের রূপান্তর এবং সামাজিক চ্যালেঞ্জ আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার সামনে নতুন প্রশ্ন হাজির করছে। এই প্রেক্ষাপটে পাঠ্যবই যদি কেবল তথ্য মুখস্থ করা ও ভালো ফলাফল অর্জনের হাতিয়ার হয়ে থাকে, তবে আমার বিবেচনায় তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে প্রস্তুত করতে সফল হতে পারবে না।
যদিও আমাদের পরিমার্জিত শিক্ষাক্রমে শিক্ষার্থীর শিখন অভিজ্ঞতা আনন্দময় ও সহজ করার লক্ষ্যে শিখন-শেখানো কার্যাবলি, মূল্যায়ন ও বিষয়বস্তু নির্বাচনে বিশেষ পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছে, তথাপি পাঠ্যবইয়ে এসবের গুণগত প্রতিফলন আসলে কতটা হয়েছে সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।
১.
বাংলাদেশের প্রাথমিক স্তরের পাঠ্যবই প্রধানত শিক্ষার মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের মাধ্যমে সারাদেশে একীভূত পাঠ্যবই বিতরণ নিঃসন্দেহে একটি বড় অর্জন। এর ফলে শিক্ষা উপকরণের ক্ষেত্রে একটি ন্যূনতম সমতা নিশ্চিত হয়েছে। তবে একইসঙ্গে এ কথাও স্বীকার করতে হবে যে আমাদের পাঠ্যবই এখনও বড় পরিসরে পরীক্ষাভিত্তিক ও মুখস্থনির্ভর শিক্ষাকে উৎসাহিত করে। অনেক ক্ষেত্রেই আমাদের পাঠ্যবই শিশুদের মানসিক বিকাশের তুলনায় ভারী হয়ে ওঠে। পাঠ্যবইয়ে প্রশ্ন থাকে, কিন্তু প্রশ্ন করার সংস্কৃতি গড়ে ওঠে না। শিক্ষার্থীরা শিখছে কী লিখলে নম্বর পাওয়া যাবে, কিন্তু শিখছে না কেন বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ কিংবা জীবনে এর প্রয়োগ কী। ফলে স্বাভাবিকভাবেই শিক্ষা ও জীবনের মধ্যে একটি দূরত্ব তৈরি হয়েছে।
শিক্ষাবিদ ও গবেষকগণ দীর্ঘদিন ধরেই একথা বলে চলেছেন যে, সমস্যা শুধু বইয়ের ভেতরে বিষয়বস্তুতে নয়। শিক্ষা পরিচালনার সামগ্রিক প্রক্রিয়া ও দর্শনেও সমস্যা রয়েছে। কারণ পাঠ্যবই কখনো উদ্দেশ্য হতে পারে না, পাঠ্যবই কেবলই একটি মাধ্যম।
অনেকে মনে করেন, পাঠ্যবই রচনায় বিষয়ভিত্তিক বিশেষজ্ঞ ও শিক্ষা-গবেষকদের যথাযথ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয় না। ফলে পাঠ্যবইয়ে বয়স-অনুপযোগী ভাষা, তথ্যগত ভুল এবং শিক্ষার্থীর বাস্তবতার সঙ্গে অসংগতি দেখা যায়।
এক্ষেত্রে শিক্ষাব্যবস্থায় ধারাবাহিকতার অভাব একটি বড় সমস্যা, আরও বড় সমস্যা হলো দর্শনগত অস্পষ্টতা। অল্প সময়ের ব্যবধানে পাঠ্যক্রম, মূল্যায়ন পদ্ধতি ও পাঠ্যবইয়ের কাঠামো বদলে যায়, কিন্তু কেন বদলাচ্ছি এবং কী অর্জন করতে চাই, সেই প্রশ্নের সুস্পষ্ট উত্তর থাকে না। এমনকি পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে পর্যাপ্ত গবেষণা বা মাঠপর্যায়ের প্রস্তুতি থাকেও না। এর ফলে শ্রেণিকক্ষে বিভ্রান্তি তৈরি হয় এবং শেখার উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়। এতে শিক্ষক ও শিক্ষার্থী, উভয়েই মানসিক চাপে পড়ে।
পাঠ্যবই নিয়ে আরেকটি সমালোচনা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সেটি হলো, শিক্ষা ও পাঠ্যবই প্রণয়নে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাব। এজন্য পাঠ্যবইয়ের নিরপেক্ষতা ও শিক্ষাগত উদ্দেশ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পাঠ্যবই হওয়া উচিত নিরপেক্ষ, গবেষণাভিত্তিক ও মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন। কোনো নির্দিষ্ট মতাদর্শ চাপিয়ে দিলে শিক্ষার্থীর স্বাধীন চিন্তার বিকাশ বাধাগ্রস্ত হবেই। তাই পাঠ্যবই সংস্কারকে আলাদা করে দেখলে চলবে না। একে অবশ্যই শিক্ষক প্রশিক্ষণ, শ্রেণিকক্ষ বাস্তবতা ও শিক্ষার্থীর মনোজগতের সঙ্গে সমন্বিতভাবে দেখতে হবে।
পাঠ্যবই যত ভালোই হোক, শিক্ষক যদি নমনীয় ও যথাযথভাবে তা ব্যবহার করতে না পারেন, তবে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না। গবেষণালব্ধ তথ্য ও শিক্ষাবিদদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো গেলে পাঠ্যবই সত্যিকার অর্থে শিক্ষার সহায়ক হয়ে উঠতে পারে। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, গবেষণাভিত্তিক সিদ্ধান্ত এবং পাঠ্যবইকে পরীক্ষার বই নয়, জীবন শেখার বই হিসেবে রচনা করতে হবে।
প্রাথমিক স্তরেই শিশু শেখে কীভাবে শিখতে হয়, কীভাবে প্রশ্ন করতে হয়, ভাবতে হয় এবং নিজের চারপাশের জগৎকে বুঝতে হয়। ফলে প্রাথমিক স্তরের পাঠ্যবই কোনোভাবেই কেবল বিষয়বস্তু সমৃদ্ধ হতে পারে না; হওয়া উচিত শিশুর মনোজগৎ, কৌতূহল ও মানবিক বোধ গঠনের প্রধান সহায়ক।
বাংলাদেশে প্রাথমিক শিক্ষা নিয়ে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বের কথা বহুবার উচ্চারিত হলেও পাঠ্যবইয়ের গুণগত প্রশ্নটি কখনো যথাযথ গুরুত্ব পায়নি। বর্তমান প্রজন্মের শিক্ষার্থীরা এমন এক সময়ে বড় হচ্ছে, যেখানে তথ্য, চিত্র ও প্রযুক্তির প্রভাব প্রবল। শিক্ষাক্রমেও আমাদের শিক্ষার্থীদের বৈশ্বিক নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে। অথচ তাদের হাতে দেওয়া পাঠ্যবইয়ের বড় একটি অংশ এখনও ভাষাগতভাবে ভারী, তথ্যনির্ভর ও পরীক্ষাকেন্দ্রিক। এর ফলে শিশুদের শেখা আনন্দের বদলে অনেক সময় চাপ ও ভয়ের বিষয়ে পরিণত হয়েছে।
প্রাথমিক স্তরের পাঠ্যবই যদি শিশুর ভাষা ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে না পারে, তবে তা শিক্ষার ভিত্তিকে দুর্বল করে দেয়। শিশুদের শেখার আনন্দ যদি না থাকে, তবে শিক্ষা দীর্ঘমেয়াদে ফলপ্রসূ হয় না।
উন্নত দেশের উদাহরণ সকল আমাদের জন্য সকল ক্ষেত্রে অনুকরণীয় না হলেও শিক্ষণীয় বটে। ফিনল্যান্ডের প্রাথমিক পাঠ্যবইয়ে বাস্তবজীবনের অভিজ্ঞতা, দলগত কাজ ও অনুসন্ধানভিত্তিক শেখার ওপর জোর দেওয়া হয়।
কানাডা ও যুক্তরাজ্যের পাঠ্যবইগুলোতে ভাষা শেখানো হয় গল্প ও আনন্দের মধ্য দিয়ে, মুখস্থের মাধ্যমে নয়। এসব উদাহরণ থেকে আমরা বুঝতে পারি, পাঠ্যবই যত জীবনঘনিষ্ঠ হয়, শেখা তত গভীর হয়।
প্রাথমিক শিক্ষা ও পাঠ্যবই সংস্কার তাই কেবল প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের বিষয় নয়। এটি একটি সামাজিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক দায়িত্ব। পাঠ্যবইকে পরীক্ষার যন্ত্র নয়, জীবনের সঙ্গে শেখার সেতু হিসেবে গড়ে তুলতেই হবে।
শিশুর শেখা শুরু হয়, দেখা, শোনা, জানার মধ্য দিয়ে, গল্পের মাধ্যমে, স্পর্শ, কাজ, খেলাধুলা পুনরাবৃত্তির মাধ্যমে। তাই প্রাথমিক স্তরের পাঠ্যবইয়ের জন্য অভ্যন্তরীণ অর্থাৎ বিষয়বস্তুগত এবং বাহ্যিক গঠনের ক্ষেত্রে কিছু বিষয় নিশ্চিত করতে হবে। অর্থাৎ শিশু যে শ্রেণিকক্ষে প্রথম বই হাতে নেয়, সেই বই থেকেই যদি চিন্তা, মানবিকতা ও আনন্দের বীজ রোপণ করা যায়, তবেই প্রাথমিক শিক্ষা তার প্রকৃত ভূমিকা পালন করতে পারবে। তাই পাঠ্যবইয়ের ভাষা, উদাহরণ ও কার্যক্রম হবে শিশুর বয়স ও মনস্তত্ত্বের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
কীভাবে শিক্ষক পড়াবেন, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ শিশু কীভাবে শিখবে। তাহলে পাঠ্যবই শিশুকে সক্রিয় অংশগ্রহণে উৎসাহিত করবে। পাঠ্যবইয়ে সকল ধর্ম বর্ণের মানুষের দৃশ্যমানতা, ভিন্ন ধর্ম বা ভাষা বা সংস্কৃতির প্রতি অবশ্যই সম্মান দেখাতে হবে।
পাঠ নির্ধারণের ক্ষেত্রে কেবল বিষয়ভিত্তিক নয়, প্রধান বিবেচনা হবে বাস্তব জীবনের বিষয়াবলি। এটা তো ঠিক যে, পরিবার, পরিবেশ, স্কুল, বন্ধু, প্রকৃতি—শিশুর পরিচিত জগৎ থেকেই শেখার উপাদান আসে। ফলে শিক্ষার্থী শেখা বিষয়গুলোর সঙ্গে নিজের জীবনের সহজ-মেলবন্ধন তৈরি করতে পারে। উদাহরণ হিসেবে ফিনল্যান্ডের Phenomenon-based Learning পদ্ধতির কথা বলা যায়। সেখানে পাঠ্যবইকে বাস্তব জীবনের সমস্যা ও অভিজ্ঞতাকে কেন্দ্র করে সাজানো হয়, যেখানে একটি অধ্যায়ে ভাষা, বিজ্ঞান ও সমাজের সমন্বয় ঘটে।
জাপানের Dōtoku (নৈতিক শিক্ষা) পাঠ্যবইয়ে কোনো উপদেশ বা নির্দেশমূলক ভাষা নেই। সেখানে শিশু গল্প ও পরিস্থিতির মাধ্যমে নৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়ে নিজেই ভাবতে শেখে। কানাডার Social Studies Alive! বইগুলো শিক্ষার্থীকে নাগরিক হিসেবে সমাজকে বোঝার ও প্রশ্ন করার সুযোগ দেয়।

প্রাথমিক পাঠ্যবইয়ে গল্প, ছবি ও চিত্রের ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভাষা শেখানো হবে গল্প, কবিতা, নাটক, ছবি ও চরিত্রের ভিজ্যুয়াল উপস্থাপনায়, ইতিহাস ও সমাজবিজ্ঞানে চরিত্রকেন্দ্রিক গল্প, ঐতিহাসিক চিত্র, মানচিত্র ও প্রাসঙ্গিক চিত্র, বিজ্ঞান শেখানো হবে পর্যবেক্ষণভিত্তিক, ছবি ও সিমুলেশন চিত্র ও লেবেলযুক্ত ডায়াগ্রাম দিয়ে। গণিতে থাকবে চার্ট, গ্রাফ, সমস্যা-ভিত্তিক স্পষ্ট চিত্র। আর বাস্তব জীবনের সঙ্গে অর্জিত এসব জ্ঞানের সংযোগ ঘটাতে হবে।
এছাড়া প্রাথমিক স্তরের পাঠ্যবইয়ের ভাষাও যেন সহজ, প্রাঞ্জল ও বয়সোপযোগী হয়ে থাকে, তা নিয়েও আমাদের ভাবতে হবে। জটিল বাক্য বা অপ্রয়োজনীয় তথ্য পরিহার করতে হবে যেন শিশুর পাঠভীতি তৈরি না হয়। এতে নিশ্চিত করেই শিশুর কল্পনা ও আগ্রহ বৃদ্ধি পাবে এবং শেখা আনন্দদায়ক হবে।
পাঠ্যবইগুলোতে মুখস্থনির্ভর প্রশ্নের পরিবর্তে উন্মুক্ত প্রশ্ন, মতামতভিত্তিক আলোচনা ও সমস্যা সমাধানমূলক কাজ থাকতে হবে। ‘তোমার কী মনে হয়?’, ‘অন্যভাবে করলে কী হতে পারে?’—এ ধরনের প্রশ্ন শিক্ষার্থীকে ভাবতে শেখায়।
পাঠ্যবইয়ে হাতে-কলমে কাজ, ছোট পরীক্ষা, দলগত কার্যক্রম ও ছোট ছোট প্রকল্পভিত্তিক কাজের সুযোগ থাকতে হবে। শিক্ষার্থী শুধু বই পড়ে নয়, কাজের মাধ্যমে শেখে। অভিজ্ঞতা ও অনুসন্ধানভিত্তিক শিক্ষার দিকে অগ্রসর হওয়া জরুরি। এতে শেখা গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী হয়।
পাঠ্যবই কেবল জ্ঞান দেয় না; এটি একটি জাতির সংস্কৃতি ও পরিচয় নির্মাণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বাঙালি শিক্ষাচিন্তাবিদগণ বারবার মাতৃভাষা ও সংস্কৃতিনির্ভর শিক্ষার ওপর জোর দিয়েছেন। রবীন্দ্রনাথ মনে করতেন, শিশুর শিক্ষা যদি তার ভাষা ও সংস্কৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়, তবে তা তার মানসিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। তাই পাঠ্যবইয়ের ভাষা, উদাহরণ ও গল্পে বাংলাদেশের সংস্কৃতি, ইতিহাস ও বহুত্ববাদী সমাজের প্রতিফলন থাকা জরুরি। কৃষি, প্রকৃতি, গ্রামীণ জীবন ও স্থানীয় সংস্কৃতির বাস্তব উপস্থাপন আরও জোরদার করা যেতে পারে, যাতে শিশুরা শেখার সঙ্গে আত্মপরিচয়ের সংযোগ খুঁজে পায়।
ডিজিটাল যুগে দাঁড়িয়ে পাঠ্যবই ও প্রযুক্তির সম্পর্ক নতুন করে ভাবার প্রয়োজন রয়েছে। আমাদের পাঠ্যবই এখনও প্রধানত ছাপাভিত্তিক। পাঠ্যবইয়ের সঙ্গে ডিজিটাল কনটেন্ট, অডিও-ভিডিও উপকরণ ও ইন্টারঅ্যাকটিভ শেখার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
আমাদের পাঠ্যবইগুলোতে নৈতিক শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত থাকলেও অনেক সময় তা উপদেশমূলক হয়ে ওঠে। পাঠ্যবইয়ে নৈতিকতা শেখাতে হবে গল্প, পরিস্থিতি ও অভিজ্ঞতার মাধ্যমে। জাপানের নৈতিক শিক্ষা পাঠ্যবইয়ে কোনো সরাসরি উপদেশ নেই। গল্প ও পরিস্থিতির মাধ্যমে শিশু নিজেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়ায় অংশ নেয়। শিক্ষা চিন্তাবিদগণ নৈতিকতার এই অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিক্ষার ওপর জোর দিয়েছেন।
শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণ, কাজ ও অগ্রগতির ভিত্তিতে মূল্যায়ন করতে হবে। শিশুকে অন্যের সঙ্গে তুলনা করা নয়, বরং তার নিজের আগের অবস্থানের সঙ্গে তুলনা করা। এই পদ্ধতিতে গুরুত্ব পায় শিশুর শেখার যাত্রা, সে কতটা বুঝতে পারছে, কতটা আগ্রহ দেখাচ্ছে এবং সময়ের সঙ্গে কীভাবে এগোচ্ছে। পরীক্ষাকেন্দ্রিক মূল্যায়ন যেখানে ভীতি ও প্রতিযোগিতা তৈরি করে, সেখানে অগ্রগতির ভিত্তিতে মূল্যায়ন শিশুর আত্মবিশ্বাস বাড়ায়। এতে শিক্ষক নম্বর দেওয়ার বিচারক নন, বরং শেখার সহযাত্রী হবেন। তখন পাঠ্যবই শেখার আনন্দ নষ্ট করবে না।
শিশুকে বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত করে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করতে হবে। এই স্তরেই শিশুর শেখার প্রতি আগ্রহ, চিন্তার ধরন ও আত্মবিশ্বাস গড়ে ওঠে। সময়োপযোগী পাঠ্যবই হতে হলে তাকে বর্তমান প্রজন্মের মনোজগতকে বুঝতে হবে। কার্যকর পাঠ্যবই কেবল তথ্য দেয় না; বরং চিন্তাশক্তি বিকাশে সহায়তা করে।
পাঠ্যবই যখন প্রয়োজনের অতিরিক্ত তথ্য চাপিয়ে দেয়, তখন শিশু বোঝার বদলে মুখস্থ করতে বাধ্য হয়। সীমিত কিন্তু অর্থবহ বিষয়বস্তু, গল্প ও প্রশ্নের মাধ্যমে শেখানো হলে শিশুর চিন্তাশক্তি, উপলব্ধি ও আগ্রহ স্বাভাবিকভাবেই বিকশিত হয়।
শিক্ষাক্রম অনুযায়ী পাঠ্যবই মানে কেবল সিলেবাস অনুসরণ করা নয়; বরং শিক্ষাক্রমে নির্ধারিত লক্ষ্য, দক্ষতা ও মূল্যবোধকে কার্যকরভাবে শ্রেণিকক্ষে রূপ দেওয়া। বিষয়বস্তু, কার্যক্রম ও মূল্যায়ন—এই তিনটির মধ্যে স্পষ্ট সামঞ্জস্য থাকতে হবে। কী শেখানো হবে, কেন শেখানো হবে এবং কীভাবে শেখা মূল্যায়িত হবে—এই প্রশ্নগুলোর সুসংগত উত্তরও পাঠ্যবইয়ের কাঠামোতেই প্রতিফলিত হবে।
পাঠ্যবইয়ের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হলো শিক্ষার্থীর কাছে সঠিক তথ্য পৌঁছে দেওয়া। বিশেষ করে ইতিহাস ও সমাজবিজ্ঞান ক্ষেত্রে তথ্যের সত্যতা না থাকলে শিশু বিভ্রান্ত হয়, তার বিশ্লেষণশক্তি ও যুক্তিবোধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ইতিহাসে প্রভাবিত তথ্য উপস্থাপন করলে শিক্ষার্থীর নৈতিক মূল্যবোধ ও যুক্তি বিকাশে বাধা পড়ে। তাই পাঠ্যবইয়ে সত্যনিষ্ঠ তথ্য থাকা শিক্ষার অবিচ্ছেদ্য ভিত্তি।
পাঠ্যবইয়ের প্রতিটি শব্দ শিশুর শেখার পথকে সুসংহত করে; তাই বানানের ক্ষেত্রে কোনো অবহেলা বা ভুল গ্রহণযোগ্য নয়। একই বানান বিভিন্ন পাঠ্যবইয়ে ভিন্নরকম হলে তা শিশুদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করে। তাই প্রতিটি পাঠ্যবইয়ে একইরকম বানান নিশ্চিত করতে হবে।
একুশ শতকের শিক্ষার্থীর প্রয়োজন গভীর চিন্তাশক্তি, সহানুভূতি এবং সহযোগিতা—এই তিনটি দক্ষতা। ভবিষ্যতের শিক্ষার জন্য পাঠ্যবই ও শিক্ষাক্রম এমনভাবে তৈরি হতে হবে, যাতে এই তিনটি দক্ষতা বিকাশ পায়।
চিন্তাশক্তি শিশুকে তথ্য বিশ্লেষণ করতে, প্রশ্ন করতে ও যুক্তি যাচাই করতে শেখায়। সহানুভূতি তাকে অন্যের অবস্থান বুঝতে এবং মানবিক মূল্যবোধ বিকাশ করতে সাহায্য করে। সহযোগিতা শিশুকে দলগত কাজ ও সমস্যা সমাধানে দক্ষ করে তোলে।
শিক্ষক শিক্ষার্থীর শেখার যাত্রার পথপ্রদর্শক, অনুপ্রেরণা ও সঙ্গী হবেন। পাঠ্যবইয়ের বিষয়বস্তু ও অনুশীলনী এমনভাবে উপস্থাপিত হবে যেন শিক্ষক পাঠ্যবই, কার্যক্রম ও মূল্যায়নকে নমনীয়ভাবে ব্যবহার করতে পারেন। শিশু নিজে প্রশ্ন করবে, বিশ্লেষণ করবে, ভাববে এবং সিদ্ধান্ত নেবে। শিক্ষক কেবল প্রয়োজন অনুযায়ী দিকনির্দেশনা, উদাহরণ দিয়ে শিশুদের উৎসাহিত করবেন।
পাঠ্যবইয়ের উপস্থাপনার ধরন এমন হওয়া প্রয়োজন যেন তা শিশুকে পড়ার জন্য প্রলুব্ধ করে এবং শেখার প্রক্রিয়াকে সহজ ও আনন্দময় করে তোলে। এর মধ্যে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে, যেমন:
কাগজ ও মুদ্রণের মান
ভালো মানের কাগজ ও পরিষ্কার মুদ্রণ পাঠ্যবইকে টেকসই করে তোলে। শিশু সহজে পৃষ্ঠা উল্টাতে পারে এবং দীর্ঘ সময় ধরে বইটি ব্যবহার করতে পারে।
ছবি ও চিত্রের ব্যবহার
রঙিন ছবি, গ্রাফিক্স, চিত্র ও ডায়াগ্রাম শিশুদের মনোযোগ আকর্ষণ করে। কেবল সাজসজ্জার জন্য নয়, এগুলো শেখার বিষয়বস্তু বোঝাতে সাহায্য করে। এই ছবিগুলো স্পষ্ট ও বাস্তবসম্মত ও আকর্ষণীয় হতে হবে।
ফন্ট ও বিন্যাস
সহজ ও পড়তে সুবিধাজনক ফন্ট, পর্যাপ্ত স্পেসিং ও সুসংগঠিত বিন্যাস শিশুর চোখকে ক্লান্ত করবে না এবং পাঠ্যবস্তুকে স্বচ্ছভাবে উপস্থাপন করবে।
পৃষ্ঠার নান্দনিকতা ও রঙের ব্যবহার
পাঠ্যবইয়ের রঙের ব্যবহার, পৃষ্ঠার ডিজাইন ও হেডিং-সাবহেডিং সমন্বয় শিশুর চোখ ও মনকে আকর্ষণ করে এবং শেখার আগ্রহ বাড়ায়। ফ্রন্ট কভার, ব্যাক কভারসহ ভেতরের পৃষ্ঠাগুলোর উপস্থাপন নান্দনিক হওয়া প্রয়োজন।
সহজ নেভিগেশন
সূচি, চ্যাপ্টার হেডিং, নম্বরিং বা কার্যক্রম নির্দেশনার মাধ্যমে বই সহজে অনুসরণযোগ্য হয়। শিক্ষার্থী নিজে স্বচ্ছন্দে পৃষ্ঠা খুঁজে পায় এবং শেখার ধারা মসৃণ হয়।
২.
মাধ্যমিক বয়সে শিশুরা বড় হয়। তখন তারা সমাজকে বুঝতে শেখে, নিজেদের পরিচয় বানাতে শেখে। কিন্তু আমরা তাদের অধিকাংশ সময় কেবল ‘পরীক্ষা’ বোঝাই, ভালো ফলাফলের পেছনে দৌড়াই। ফলে তৈরি হচ্ছে এমন এক নাগরিক, যে পাশ করতে পারে, কিন্তু প্রশ্ন করতে পারে না; যে তথ্য জানে, কিন্তু তা যাচাই করতে পারে না, বিশ্লেষণ করতে পারে না। অধিক তথ্যের চাপ মেনে নিলেও মননে নিতে পারে না।
মাধ্যমিক পাঠ্যবইয়ে সমালোচনামূলক চিন্তা অন্তর্ভুক্ত হওয়া প্রয়োজন। সমালোচনামূলক চিন্তা বিষয়বস্তুতে অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে শিক্ষার্থী বিশ্লেষণ ক্ষমতা, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা ও স্বাধীন চিন্তার সামর্থ্য অর্জন করে। শিক্ষার্থী শিখবে যুক্তি সাজাতে, উত্তর মুখস্থ করতে নয়। এক্ষেত্রে পাঠ্যবই কেবল তথ্য উপস্থাপন করার জন্য নয়; শিক্ষার্থী কেবল তথ্য গ্রহণ করবে না, বিশ্লেষণ, তুলনা, মূল্যায়ন ও যুক্তি নিরূপণও করবে।

প্রকৃত শিক্ষার মান নির্ধারণ হয় তখন, যখন শিক্ষার্থী বাস্তবজীবনের সমস্যা চিহ্নিত করতে এবং সমাধানের জন্য নিজে ভাবতে শেখে। এটি হলো বাস্তব সমস্যাভিত্তিক শেখা। পাঠ্যবইতে প্রকল্পভিত্তিক কার্যক্রম, বাস্তব উদাহরণ ও সমস্যা সমাধানের কার্যক্রম অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীর মানবিক গুণাবলি ও মানসিক স্বাস্থ্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পাঠ্যবই ও শিক্ষাক্রমে এই দিকগুলোর অন্তর্ভুক্তি শিক্ষার্থীকে সামাজিকভাবে দায়িত্বশীল, সংবেদনশীল এবং মানসিকভাবে স্থিতিশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলে। মাধ্যমিক স্তরের পাঠ্যবইতে মানবিকতা ও মানসিক স্বাস্থ্যের অন্তর্ভুক্তি শিক্ষার্থীর চিন্তাশক্তি, সংবেদনশীলতা, সহযোগিতা এবং আত্মনির্ভরতার বিকাশ নিশ্চিত করবে। আমাদের দেশে এই বয়সে পড়ার চাপ ভয়াবহ। জিপিএ ৫, ভর্তি যুদ্ধ, সামাজিক তুলনা, অনলাইন বুলিং এসবের জন্য অনেকেই ভেতরে ভেতরে ভেঙে পড়ে। তাই শুধু সফলতা নয়, কীভাবে জীবনযুদ্ধে টিকে থাকবে—সেটাও শেখাতে হবে।
৩
অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষার পূর্বশর্ত হিসেবে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জন্য মাতৃভাষাভিত্তিক পাঠ্যবই প্রণয়ন খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। বাংলাদেশের শিক্ষা বাস্তবতায় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিক্ষার্থীরা দীর্ঘদিন ধরে এই মৌলিক বৈষম্যের মুখোমুখি। মাতৃভাষার পরিবর্তে অপরিচিত ভাষায় পাঠ্যবই চাপিয়ে দিলে শেখা হয়ে ওঠে কষ্টকর, বিমূর্ত ও বিচ্ছিন্ন। এর ফলে অনেক শিক্ষার্থী প্রাথমিক স্তরেই আগ্রহ হারায়, ঝরে পড়ে কিংবা আত্মবিশ্বাসহীন হয়ে ওঠে।
মূলধারার শিক্ষার সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে পাঠ্যবই এমনভাবে রচিত হওয়া প্রয়োজন, যেখানে একদিকে থাকবে নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি ও জীবনঘনিষ্ঠ অভিজ্ঞতা, অন্যদিকে ধীরে ধীরে রাষ্ট্রভাষা ও জাতীয় শিক্ষাক্রমের সঙ্গে সেতুবন্ধন তৈরি হবে। এতে করে এসব শিক্ষার্থী নিজেদের পরিচয় অক্ষুণ্ণ রেখেই মূল ধারার সমাজ, শিক্ষা ও কর্মজীবনের সঙ্গে যুক্ত হতে পারবে।
৪.
অবশ্যই বাংলাদেশের বাস্তবতা ও উন্নত দেশগুলোর বাস্তবতা এক নয়। অবকাঠামো, শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা আমাদের রয়েছে। কিন্তু দর্শনের জায়গায় পরিবর্তন আনা সম্ভব।
পাঠ্যবই প্রণয়নে যদি শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিকতা, জীবনঘনিষ্ঠতা ও শিক্ষা-চিন্তাবিদদের মানবিক দর্শনকে গুরুত্ব দেওয়া যায়, তবে বড় পরিবর্তনের সূচনা হতে পারে। পাঠ্যবই সংস্কার মানে শুধু বই বদলানো নয়; এটি একটি জাতির চিন্তা ও মূল্যবোধ বদলানোর প্রস্তুতি।
শিশুরা যেন কেবল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার যোগ্য না হয়, বরং চিন্তাশীল, মানবিক ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে ওঠে তা নিশ্চিত করতে হবে।
পাঠ্যবই কখনোই চূড়ান্ত জ্ঞান নয়; শেখার একটি সহায়ক কাঠামো, যার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে শিক্ষার্থী। পাঠ্যবইয়ে গল্প, ছবি, বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা ও কার্যভিত্তিক শেখার সমন্বয় সাধন করতে হবে। এতে শেখা হবে আনন্দময় ও স্থায়ী। সেই সঙ্গে পাঠ্যবইয়ের আভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক গঠনে যথার্থতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। পাঠ্যবই সংস্কারকে শিক্ষার্থীর মনোজগৎ, শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষাদর্শনের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।
বর্তমান প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের মনোজগৎ বুঝে পাঠ্যবই প্রণয়ন ও শিক্ষক-প্রস্তুতি নিশ্চিত করতে পারলেই শিক্ষা তার প্রকৃত উদ্দেশ্যে পৌঁছাবে।
শিক্ষার অর্থ হোক মানুষ হয়ে বাঁচা, আর পাঠ্যবই হোক তার কার্যকর ও সময়োপযোগী উপাদান।

বাংলাদেশের সকালগুলোতে একটি দৃশ্য খুবই সাধারণ: স্কুলের পথে শিশুরা ব্যাগ কাঁধে, চোখে আধো ঘুম, মাথায় হাজার রকম চাপ। এদের কেউ বইকে ভালোবাসে, কেউ বইকে ভয় পায়, কেউ বইয়ের পাতায় নিজের জীবনকে খানিকটা খুঁজে পায়।
আবার কেউ নানা মাত্রিক চাপ অনুভব করে নিজের অস্তিত্বই খুঁজে পায় না। আর তখনই ‘পাঠ্যবই কেমন হওয়া উচিত?’—এই প্রশ্ন ওঠে। কারণ আমরা তো জানি, পাঠ্যবই শুধু শেখায় না, পাঠ্যবই জানায় কীভাবে শিখতে হবে, কীভাবে ভাবতে হবে এবং শেষ পর্যন্ত কীভাবে বাঁচতে হবে।
বাংলাদেশে পাঠ্যবই নিয়ে তর্ক বহুকালের। এজন্য আমরা বারবার ভুল সংশোধন করেছি, বিষয়বস্তু বদলে ফেলেছি, অধ্যায় যোগ-বিয়োগ করেছি। কিন্তু সবচেয়ে বড় ভুলটা করেছি সম্ভবত অন্য জায়গায়। আমরা কখনোই পাঠ্যবইকে ঠিক শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক করে তুলতে পারিনি।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১২৯৯ বঙ্গাব্দে ‘শিক্ষার হেরফের’ প্রবন্ধে বলেছিলেন, ‘যতটুকু কেবলমাত্র শিক্ষা অর্থাৎ অত্যাবশ্যক তাহারই মধ্যে শিশুদিগকে একান্ত নিবদ্ধ রাখিলে কখনোই তাহাদের মন যথেষ্ট পরিমাণে বাড়িতে পারে না।’ এই প্রবন্ধে তিনি আরও একটা কথা বলেছিলেন যে, ‘দেয়াল গাঁথতে আরম্ভ করার পূর্বে এর ভিত্তিপ্রস্তর কী রকম, কীভাবে গাঁথলে দেয়ালটা সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে, হেলে পড়বে না, সেসব ভাবনা ভেবেই কাজ শুরু করা উচিত। রোগের কারণ না জেনে চিকিৎসা করতে গেলে উল্টো ফল হবার সম্ভাবনাই বেশি।’ রবীন্দ্রনাথের এ কথা বলার শতবর্ষ পরেও আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা, পাঠ্যবই আমাদের শিশুদের পরিপূর্ণ বিকাশ নিশ্চিত করতে পারছে না।
অবশ্য বিনামূল্যে বই বিতরণ হচ্ছে, শিক্ষার্থী সংখ্যা বাড়ছে ঠিকই, কিন্তু শেখার গভীরতা কমছে। কারণ বইয়ের সঙ্গে জীবনের সম্পর্ক ছিন্ন হচ্ছে। মৌলিক দক্ষতা যেমন পড়ে শেখা, যৌক্তিক ভাবনা ও বাস্তব জীবনে প্রয়োগে ক্ষেত্রে বড় ফাঁক থেকে যাচ্ছে। এই ফাঁকটা যেমন পরীক্ষার ফলাফলে ধরা পড়ে, তেমনি ধরা পড়ে নাগরিক জীবনের প্রতিটি স্তরে। অর্থাৎ শিক্ষা দুর্বল হলে সমাজও দুর্বল হয়।
শিক্ষা কোনো নির্দিষ্ট সময় বা শ্রেণিকক্ষে সীমাবদ্ধ বিষয় নয়। এটি একটি জাতির আত্মপরিচয়, চিন্তাধারা ও ভবিষ্যৎ পথচলার ভিত্তি। আর সেই শিক্ষার সবচেয়ে শক্তিশালী ও প্রভাবশালী উপকরণ হলো পাঠ্যবই। বিশেষ করে প্রাথমিক স্তরের পাঠ্যবই শিশুর ভাষা, চিন্তা, মূল্যবোধ ও পৃথিবীকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলে। তাই পাঠ্যবইয়ের প্রশ্নটা এখন আর কেবল পাঠ্যসূচি বা পরীক্ষার সঙ্গে যুক্ত নয়; একটা সামগ্রিক জীবনবোধের প্রতিফলন।

বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে পাঠ্যবই নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্ব, প্রযুক্তির বিস্তার, কর্মক্ষেত্রের রূপান্তর এবং সামাজিক চ্যালেঞ্জ আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার সামনে নতুন প্রশ্ন হাজির করছে। এই প্রেক্ষাপটে পাঠ্যবই যদি কেবল তথ্য মুখস্থ করা ও ভালো ফলাফল অর্জনের হাতিয়ার হয়ে থাকে, তবে আমার বিবেচনায় তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে প্রস্তুত করতে সফল হতে পারবে না।
যদিও আমাদের পরিমার্জিত শিক্ষাক্রমে শিক্ষার্থীর শিখন অভিজ্ঞতা আনন্দময় ও সহজ করার লক্ষ্যে শিখন-শেখানো কার্যাবলি, মূল্যায়ন ও বিষয়বস্তু নির্বাচনে বিশেষ পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছে, তথাপি পাঠ্যবইয়ে এসবের গুণগত প্রতিফলন আসলে কতটা হয়েছে সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।
১.
বাংলাদেশের প্রাথমিক স্তরের পাঠ্যবই প্রধানত শিক্ষার মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের মাধ্যমে সারাদেশে একীভূত পাঠ্যবই বিতরণ নিঃসন্দেহে একটি বড় অর্জন। এর ফলে শিক্ষা উপকরণের ক্ষেত্রে একটি ন্যূনতম সমতা নিশ্চিত হয়েছে। তবে একইসঙ্গে এ কথাও স্বীকার করতে হবে যে আমাদের পাঠ্যবই এখনও বড় পরিসরে পরীক্ষাভিত্তিক ও মুখস্থনির্ভর শিক্ষাকে উৎসাহিত করে। অনেক ক্ষেত্রেই আমাদের পাঠ্যবই শিশুদের মানসিক বিকাশের তুলনায় ভারী হয়ে ওঠে। পাঠ্যবইয়ে প্রশ্ন থাকে, কিন্তু প্রশ্ন করার সংস্কৃতি গড়ে ওঠে না। শিক্ষার্থীরা শিখছে কী লিখলে নম্বর পাওয়া যাবে, কিন্তু শিখছে না কেন বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ কিংবা জীবনে এর প্রয়োগ কী। ফলে স্বাভাবিকভাবেই শিক্ষা ও জীবনের মধ্যে একটি দূরত্ব তৈরি হয়েছে।
শিক্ষাবিদ ও গবেষকগণ দীর্ঘদিন ধরেই একথা বলে চলেছেন যে, সমস্যা শুধু বইয়ের ভেতরে বিষয়বস্তুতে নয়। শিক্ষা পরিচালনার সামগ্রিক প্রক্রিয়া ও দর্শনেও সমস্যা রয়েছে। কারণ পাঠ্যবই কখনো উদ্দেশ্য হতে পারে না, পাঠ্যবই কেবলই একটি মাধ্যম।
অনেকে মনে করেন, পাঠ্যবই রচনায় বিষয়ভিত্তিক বিশেষজ্ঞ ও শিক্ষা-গবেষকদের যথাযথ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয় না। ফলে পাঠ্যবইয়ে বয়স-অনুপযোগী ভাষা, তথ্যগত ভুল এবং শিক্ষার্থীর বাস্তবতার সঙ্গে অসংগতি দেখা যায়।
এক্ষেত্রে শিক্ষাব্যবস্থায় ধারাবাহিকতার অভাব একটি বড় সমস্যা, আরও বড় সমস্যা হলো দর্শনগত অস্পষ্টতা। অল্প সময়ের ব্যবধানে পাঠ্যক্রম, মূল্যায়ন পদ্ধতি ও পাঠ্যবইয়ের কাঠামো বদলে যায়, কিন্তু কেন বদলাচ্ছি এবং কী অর্জন করতে চাই, সেই প্রশ্নের সুস্পষ্ট উত্তর থাকে না। এমনকি পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে পর্যাপ্ত গবেষণা বা মাঠপর্যায়ের প্রস্তুতি থাকেও না। এর ফলে শ্রেণিকক্ষে বিভ্রান্তি তৈরি হয় এবং শেখার উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়। এতে শিক্ষক ও শিক্ষার্থী, উভয়েই মানসিক চাপে পড়ে।
পাঠ্যবই নিয়ে আরেকটি সমালোচনা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সেটি হলো, শিক্ষা ও পাঠ্যবই প্রণয়নে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাব। এজন্য পাঠ্যবইয়ের নিরপেক্ষতা ও শিক্ষাগত উদ্দেশ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পাঠ্যবই হওয়া উচিত নিরপেক্ষ, গবেষণাভিত্তিক ও মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন। কোনো নির্দিষ্ট মতাদর্শ চাপিয়ে দিলে শিক্ষার্থীর স্বাধীন চিন্তার বিকাশ বাধাগ্রস্ত হবেই। তাই পাঠ্যবই সংস্কারকে আলাদা করে দেখলে চলবে না। একে অবশ্যই শিক্ষক প্রশিক্ষণ, শ্রেণিকক্ষ বাস্তবতা ও শিক্ষার্থীর মনোজগতের সঙ্গে সমন্বিতভাবে দেখতে হবে।
পাঠ্যবই যত ভালোই হোক, শিক্ষক যদি নমনীয় ও যথাযথভাবে তা ব্যবহার করতে না পারেন, তবে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না। গবেষণালব্ধ তথ্য ও শিক্ষাবিদদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো গেলে পাঠ্যবই সত্যিকার অর্থে শিক্ষার সহায়ক হয়ে উঠতে পারে। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, গবেষণাভিত্তিক সিদ্ধান্ত এবং পাঠ্যবইকে পরীক্ষার বই নয়, জীবন শেখার বই হিসেবে রচনা করতে হবে।
প্রাথমিক স্তরেই শিশু শেখে কীভাবে শিখতে হয়, কীভাবে প্রশ্ন করতে হয়, ভাবতে হয় এবং নিজের চারপাশের জগৎকে বুঝতে হয়। ফলে প্রাথমিক স্তরের পাঠ্যবই কোনোভাবেই কেবল বিষয়বস্তু সমৃদ্ধ হতে পারে না; হওয়া উচিত শিশুর মনোজগৎ, কৌতূহল ও মানবিক বোধ গঠনের প্রধান সহায়ক।
বাংলাদেশে প্রাথমিক শিক্ষা নিয়ে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বের কথা বহুবার উচ্চারিত হলেও পাঠ্যবইয়ের গুণগত প্রশ্নটি কখনো যথাযথ গুরুত্ব পায়নি। বর্তমান প্রজন্মের শিক্ষার্থীরা এমন এক সময়ে বড় হচ্ছে, যেখানে তথ্য, চিত্র ও প্রযুক্তির প্রভাব প্রবল। শিক্ষাক্রমেও আমাদের শিক্ষার্থীদের বৈশ্বিক নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে। অথচ তাদের হাতে দেওয়া পাঠ্যবইয়ের বড় একটি অংশ এখনও ভাষাগতভাবে ভারী, তথ্যনির্ভর ও পরীক্ষাকেন্দ্রিক। এর ফলে শিশুদের শেখা আনন্দের বদলে অনেক সময় চাপ ও ভয়ের বিষয়ে পরিণত হয়েছে।
প্রাথমিক স্তরের পাঠ্যবই যদি শিশুর ভাষা ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে না পারে, তবে তা শিক্ষার ভিত্তিকে দুর্বল করে দেয়। শিশুদের শেখার আনন্দ যদি না থাকে, তবে শিক্ষা দীর্ঘমেয়াদে ফলপ্রসূ হয় না।
উন্নত দেশের উদাহরণ সকল আমাদের জন্য সকল ক্ষেত্রে অনুকরণীয় না হলেও শিক্ষণীয় বটে। ফিনল্যান্ডের প্রাথমিক পাঠ্যবইয়ে বাস্তবজীবনের অভিজ্ঞতা, দলগত কাজ ও অনুসন্ধানভিত্তিক শেখার ওপর জোর দেওয়া হয়।
কানাডা ও যুক্তরাজ্যের পাঠ্যবইগুলোতে ভাষা শেখানো হয় গল্প ও আনন্দের মধ্য দিয়ে, মুখস্থের মাধ্যমে নয়। এসব উদাহরণ থেকে আমরা বুঝতে পারি, পাঠ্যবই যত জীবনঘনিষ্ঠ হয়, শেখা তত গভীর হয়।
প্রাথমিক শিক্ষা ও পাঠ্যবই সংস্কার তাই কেবল প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের বিষয় নয়। এটি একটি সামাজিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক দায়িত্ব। পাঠ্যবইকে পরীক্ষার যন্ত্র নয়, জীবনের সঙ্গে শেখার সেতু হিসেবে গড়ে তুলতেই হবে।
শিশুর শেখা শুরু হয়, দেখা, শোনা, জানার মধ্য দিয়ে, গল্পের মাধ্যমে, স্পর্শ, কাজ, খেলাধুলা পুনরাবৃত্তির মাধ্যমে। তাই প্রাথমিক স্তরের পাঠ্যবইয়ের জন্য অভ্যন্তরীণ অর্থাৎ বিষয়বস্তুগত এবং বাহ্যিক গঠনের ক্ষেত্রে কিছু বিষয় নিশ্চিত করতে হবে। অর্থাৎ শিশু যে শ্রেণিকক্ষে প্রথম বই হাতে নেয়, সেই বই থেকেই যদি চিন্তা, মানবিকতা ও আনন্দের বীজ রোপণ করা যায়, তবেই প্রাথমিক শিক্ষা তার প্রকৃত ভূমিকা পালন করতে পারবে। তাই পাঠ্যবইয়ের ভাষা, উদাহরণ ও কার্যক্রম হবে শিশুর বয়স ও মনস্তত্ত্বের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
কীভাবে শিক্ষক পড়াবেন, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ শিশু কীভাবে শিখবে। তাহলে পাঠ্যবই শিশুকে সক্রিয় অংশগ্রহণে উৎসাহিত করবে। পাঠ্যবইয়ে সকল ধর্ম বর্ণের মানুষের দৃশ্যমানতা, ভিন্ন ধর্ম বা ভাষা বা সংস্কৃতির প্রতি অবশ্যই সম্মান দেখাতে হবে।
পাঠ নির্ধারণের ক্ষেত্রে কেবল বিষয়ভিত্তিক নয়, প্রধান বিবেচনা হবে বাস্তব জীবনের বিষয়াবলি। এটা তো ঠিক যে, পরিবার, পরিবেশ, স্কুল, বন্ধু, প্রকৃতি—শিশুর পরিচিত জগৎ থেকেই শেখার উপাদান আসে। ফলে শিক্ষার্থী শেখা বিষয়গুলোর সঙ্গে নিজের জীবনের সহজ-মেলবন্ধন তৈরি করতে পারে। উদাহরণ হিসেবে ফিনল্যান্ডের Phenomenon-based Learning পদ্ধতির কথা বলা যায়। সেখানে পাঠ্যবইকে বাস্তব জীবনের সমস্যা ও অভিজ্ঞতাকে কেন্দ্র করে সাজানো হয়, যেখানে একটি অধ্যায়ে ভাষা, বিজ্ঞান ও সমাজের সমন্বয় ঘটে।
জাপানের Dōtoku (নৈতিক শিক্ষা) পাঠ্যবইয়ে কোনো উপদেশ বা নির্দেশমূলক ভাষা নেই। সেখানে শিশু গল্প ও পরিস্থিতির মাধ্যমে নৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়ে নিজেই ভাবতে শেখে। কানাডার Social Studies Alive! বইগুলো শিক্ষার্থীকে নাগরিক হিসেবে সমাজকে বোঝার ও প্রশ্ন করার সুযোগ দেয়।

প্রাথমিক পাঠ্যবইয়ে গল্প, ছবি ও চিত্রের ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভাষা শেখানো হবে গল্প, কবিতা, নাটক, ছবি ও চরিত্রের ভিজ্যুয়াল উপস্থাপনায়, ইতিহাস ও সমাজবিজ্ঞানে চরিত্রকেন্দ্রিক গল্প, ঐতিহাসিক চিত্র, মানচিত্র ও প্রাসঙ্গিক চিত্র, বিজ্ঞান শেখানো হবে পর্যবেক্ষণভিত্তিক, ছবি ও সিমুলেশন চিত্র ও লেবেলযুক্ত ডায়াগ্রাম দিয়ে। গণিতে থাকবে চার্ট, গ্রাফ, সমস্যা-ভিত্তিক স্পষ্ট চিত্র। আর বাস্তব জীবনের সঙ্গে অর্জিত এসব জ্ঞানের সংযোগ ঘটাতে হবে।
এছাড়া প্রাথমিক স্তরের পাঠ্যবইয়ের ভাষাও যেন সহজ, প্রাঞ্জল ও বয়সোপযোগী হয়ে থাকে, তা নিয়েও আমাদের ভাবতে হবে। জটিল বাক্য বা অপ্রয়োজনীয় তথ্য পরিহার করতে হবে যেন শিশুর পাঠভীতি তৈরি না হয়। এতে নিশ্চিত করেই শিশুর কল্পনা ও আগ্রহ বৃদ্ধি পাবে এবং শেখা আনন্দদায়ক হবে।
পাঠ্যবইগুলোতে মুখস্থনির্ভর প্রশ্নের পরিবর্তে উন্মুক্ত প্রশ্ন, মতামতভিত্তিক আলোচনা ও সমস্যা সমাধানমূলক কাজ থাকতে হবে। ‘তোমার কী মনে হয়?’, ‘অন্যভাবে করলে কী হতে পারে?’—এ ধরনের প্রশ্ন শিক্ষার্থীকে ভাবতে শেখায়।
পাঠ্যবইয়ে হাতে-কলমে কাজ, ছোট পরীক্ষা, দলগত কার্যক্রম ও ছোট ছোট প্রকল্পভিত্তিক কাজের সুযোগ থাকতে হবে। শিক্ষার্থী শুধু বই পড়ে নয়, কাজের মাধ্যমে শেখে। অভিজ্ঞতা ও অনুসন্ধানভিত্তিক শিক্ষার দিকে অগ্রসর হওয়া জরুরি। এতে শেখা গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী হয়।
পাঠ্যবই কেবল জ্ঞান দেয় না; এটি একটি জাতির সংস্কৃতি ও পরিচয় নির্মাণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বাঙালি শিক্ষাচিন্তাবিদগণ বারবার মাতৃভাষা ও সংস্কৃতিনির্ভর শিক্ষার ওপর জোর দিয়েছেন। রবীন্দ্রনাথ মনে করতেন, শিশুর শিক্ষা যদি তার ভাষা ও সংস্কৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়, তবে তা তার মানসিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। তাই পাঠ্যবইয়ের ভাষা, উদাহরণ ও গল্পে বাংলাদেশের সংস্কৃতি, ইতিহাস ও বহুত্ববাদী সমাজের প্রতিফলন থাকা জরুরি। কৃষি, প্রকৃতি, গ্রামীণ জীবন ও স্থানীয় সংস্কৃতির বাস্তব উপস্থাপন আরও জোরদার করা যেতে পারে, যাতে শিশুরা শেখার সঙ্গে আত্মপরিচয়ের সংযোগ খুঁজে পায়।
ডিজিটাল যুগে দাঁড়িয়ে পাঠ্যবই ও প্রযুক্তির সম্পর্ক নতুন করে ভাবার প্রয়োজন রয়েছে। আমাদের পাঠ্যবই এখনও প্রধানত ছাপাভিত্তিক। পাঠ্যবইয়ের সঙ্গে ডিজিটাল কনটেন্ট, অডিও-ভিডিও উপকরণ ও ইন্টারঅ্যাকটিভ শেখার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
আমাদের পাঠ্যবইগুলোতে নৈতিক শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত থাকলেও অনেক সময় তা উপদেশমূলক হয়ে ওঠে। পাঠ্যবইয়ে নৈতিকতা শেখাতে হবে গল্প, পরিস্থিতি ও অভিজ্ঞতার মাধ্যমে। জাপানের নৈতিক শিক্ষা পাঠ্যবইয়ে কোনো সরাসরি উপদেশ নেই। গল্প ও পরিস্থিতির মাধ্যমে শিশু নিজেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়ায় অংশ নেয়। শিক্ষা চিন্তাবিদগণ নৈতিকতার এই অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিক্ষার ওপর জোর দিয়েছেন।
শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণ, কাজ ও অগ্রগতির ভিত্তিতে মূল্যায়ন করতে হবে। শিশুকে অন্যের সঙ্গে তুলনা করা নয়, বরং তার নিজের আগের অবস্থানের সঙ্গে তুলনা করা। এই পদ্ধতিতে গুরুত্ব পায় শিশুর শেখার যাত্রা, সে কতটা বুঝতে পারছে, কতটা আগ্রহ দেখাচ্ছে এবং সময়ের সঙ্গে কীভাবে এগোচ্ছে। পরীক্ষাকেন্দ্রিক মূল্যায়ন যেখানে ভীতি ও প্রতিযোগিতা তৈরি করে, সেখানে অগ্রগতির ভিত্তিতে মূল্যায়ন শিশুর আত্মবিশ্বাস বাড়ায়। এতে শিক্ষক নম্বর দেওয়ার বিচারক নন, বরং শেখার সহযাত্রী হবেন। তখন পাঠ্যবই শেখার আনন্দ নষ্ট করবে না।
শিশুকে বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত করে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করতে হবে। এই স্তরেই শিশুর শেখার প্রতি আগ্রহ, চিন্তার ধরন ও আত্মবিশ্বাস গড়ে ওঠে। সময়োপযোগী পাঠ্যবই হতে হলে তাকে বর্তমান প্রজন্মের মনোজগতকে বুঝতে হবে। কার্যকর পাঠ্যবই কেবল তথ্য দেয় না; বরং চিন্তাশক্তি বিকাশে সহায়তা করে।
পাঠ্যবই যখন প্রয়োজনের অতিরিক্ত তথ্য চাপিয়ে দেয়, তখন শিশু বোঝার বদলে মুখস্থ করতে বাধ্য হয়। সীমিত কিন্তু অর্থবহ বিষয়বস্তু, গল্প ও প্রশ্নের মাধ্যমে শেখানো হলে শিশুর চিন্তাশক্তি, উপলব্ধি ও আগ্রহ স্বাভাবিকভাবেই বিকশিত হয়।
শিক্ষাক্রম অনুযায়ী পাঠ্যবই মানে কেবল সিলেবাস অনুসরণ করা নয়; বরং শিক্ষাক্রমে নির্ধারিত লক্ষ্য, দক্ষতা ও মূল্যবোধকে কার্যকরভাবে শ্রেণিকক্ষে রূপ দেওয়া। বিষয়বস্তু, কার্যক্রম ও মূল্যায়ন—এই তিনটির মধ্যে স্পষ্ট সামঞ্জস্য থাকতে হবে। কী শেখানো হবে, কেন শেখানো হবে এবং কীভাবে শেখা মূল্যায়িত হবে—এই প্রশ্নগুলোর সুসংগত উত্তরও পাঠ্যবইয়ের কাঠামোতেই প্রতিফলিত হবে।
পাঠ্যবইয়ের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হলো শিক্ষার্থীর কাছে সঠিক তথ্য পৌঁছে দেওয়া। বিশেষ করে ইতিহাস ও সমাজবিজ্ঞান ক্ষেত্রে তথ্যের সত্যতা না থাকলে শিশু বিভ্রান্ত হয়, তার বিশ্লেষণশক্তি ও যুক্তিবোধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ইতিহাসে প্রভাবিত তথ্য উপস্থাপন করলে শিক্ষার্থীর নৈতিক মূল্যবোধ ও যুক্তি বিকাশে বাধা পড়ে। তাই পাঠ্যবইয়ে সত্যনিষ্ঠ তথ্য থাকা শিক্ষার অবিচ্ছেদ্য ভিত্তি।
পাঠ্যবইয়ের প্রতিটি শব্দ শিশুর শেখার পথকে সুসংহত করে; তাই বানানের ক্ষেত্রে কোনো অবহেলা বা ভুল গ্রহণযোগ্য নয়। একই বানান বিভিন্ন পাঠ্যবইয়ে ভিন্নরকম হলে তা শিশুদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করে। তাই প্রতিটি পাঠ্যবইয়ে একইরকম বানান নিশ্চিত করতে হবে।
একুশ শতকের শিক্ষার্থীর প্রয়োজন গভীর চিন্তাশক্তি, সহানুভূতি এবং সহযোগিতা—এই তিনটি দক্ষতা। ভবিষ্যতের শিক্ষার জন্য পাঠ্যবই ও শিক্ষাক্রম এমনভাবে তৈরি হতে হবে, যাতে এই তিনটি দক্ষতা বিকাশ পায়।
চিন্তাশক্তি শিশুকে তথ্য বিশ্লেষণ করতে, প্রশ্ন করতে ও যুক্তি যাচাই করতে শেখায়। সহানুভূতি তাকে অন্যের অবস্থান বুঝতে এবং মানবিক মূল্যবোধ বিকাশ করতে সাহায্য করে। সহযোগিতা শিশুকে দলগত কাজ ও সমস্যা সমাধানে দক্ষ করে তোলে।
শিক্ষক শিক্ষার্থীর শেখার যাত্রার পথপ্রদর্শক, অনুপ্রেরণা ও সঙ্গী হবেন। পাঠ্যবইয়ের বিষয়বস্তু ও অনুশীলনী এমনভাবে উপস্থাপিত হবে যেন শিক্ষক পাঠ্যবই, কার্যক্রম ও মূল্যায়নকে নমনীয়ভাবে ব্যবহার করতে পারেন। শিশু নিজে প্রশ্ন করবে, বিশ্লেষণ করবে, ভাববে এবং সিদ্ধান্ত নেবে। শিক্ষক কেবল প্রয়োজন অনুযায়ী দিকনির্দেশনা, উদাহরণ দিয়ে শিশুদের উৎসাহিত করবেন।
পাঠ্যবইয়ের উপস্থাপনার ধরন এমন হওয়া প্রয়োজন যেন তা শিশুকে পড়ার জন্য প্রলুব্ধ করে এবং শেখার প্রক্রিয়াকে সহজ ও আনন্দময় করে তোলে। এর মধ্যে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে, যেমন:
কাগজ ও মুদ্রণের মান
ভালো মানের কাগজ ও পরিষ্কার মুদ্রণ পাঠ্যবইকে টেকসই করে তোলে। শিশু সহজে পৃষ্ঠা উল্টাতে পারে এবং দীর্ঘ সময় ধরে বইটি ব্যবহার করতে পারে।
ছবি ও চিত্রের ব্যবহার
রঙিন ছবি, গ্রাফিক্স, চিত্র ও ডায়াগ্রাম শিশুদের মনোযোগ আকর্ষণ করে। কেবল সাজসজ্জার জন্য নয়, এগুলো শেখার বিষয়বস্তু বোঝাতে সাহায্য করে। এই ছবিগুলো স্পষ্ট ও বাস্তবসম্মত ও আকর্ষণীয় হতে হবে।
ফন্ট ও বিন্যাস
সহজ ও পড়তে সুবিধাজনক ফন্ট, পর্যাপ্ত স্পেসিং ও সুসংগঠিত বিন্যাস শিশুর চোখকে ক্লান্ত করবে না এবং পাঠ্যবস্তুকে স্বচ্ছভাবে উপস্থাপন করবে।
পৃষ্ঠার নান্দনিকতা ও রঙের ব্যবহার
পাঠ্যবইয়ের রঙের ব্যবহার, পৃষ্ঠার ডিজাইন ও হেডিং-সাবহেডিং সমন্বয় শিশুর চোখ ও মনকে আকর্ষণ করে এবং শেখার আগ্রহ বাড়ায়। ফ্রন্ট কভার, ব্যাক কভারসহ ভেতরের পৃষ্ঠাগুলোর উপস্থাপন নান্দনিক হওয়া প্রয়োজন।
সহজ নেভিগেশন
সূচি, চ্যাপ্টার হেডিং, নম্বরিং বা কার্যক্রম নির্দেশনার মাধ্যমে বই সহজে অনুসরণযোগ্য হয়। শিক্ষার্থী নিজে স্বচ্ছন্দে পৃষ্ঠা খুঁজে পায় এবং শেখার ধারা মসৃণ হয়।
২.
মাধ্যমিক বয়সে শিশুরা বড় হয়। তখন তারা সমাজকে বুঝতে শেখে, নিজেদের পরিচয় বানাতে শেখে। কিন্তু আমরা তাদের অধিকাংশ সময় কেবল ‘পরীক্ষা’ বোঝাই, ভালো ফলাফলের পেছনে দৌড়াই। ফলে তৈরি হচ্ছে এমন এক নাগরিক, যে পাশ করতে পারে, কিন্তু প্রশ্ন করতে পারে না; যে তথ্য জানে, কিন্তু তা যাচাই করতে পারে না, বিশ্লেষণ করতে পারে না। অধিক তথ্যের চাপ মেনে নিলেও মননে নিতে পারে না।
মাধ্যমিক পাঠ্যবইয়ে সমালোচনামূলক চিন্তা অন্তর্ভুক্ত হওয়া প্রয়োজন। সমালোচনামূলক চিন্তা বিষয়বস্তুতে অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে শিক্ষার্থী বিশ্লেষণ ক্ষমতা, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা ও স্বাধীন চিন্তার সামর্থ্য অর্জন করে। শিক্ষার্থী শিখবে যুক্তি সাজাতে, উত্তর মুখস্থ করতে নয়। এক্ষেত্রে পাঠ্যবই কেবল তথ্য উপস্থাপন করার জন্য নয়; শিক্ষার্থী কেবল তথ্য গ্রহণ করবে না, বিশ্লেষণ, তুলনা, মূল্যায়ন ও যুক্তি নিরূপণও করবে।

প্রকৃত শিক্ষার মান নির্ধারণ হয় তখন, যখন শিক্ষার্থী বাস্তবজীবনের সমস্যা চিহ্নিত করতে এবং সমাধানের জন্য নিজে ভাবতে শেখে। এটি হলো বাস্তব সমস্যাভিত্তিক শেখা। পাঠ্যবইতে প্রকল্পভিত্তিক কার্যক্রম, বাস্তব উদাহরণ ও সমস্যা সমাধানের কার্যক্রম অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীর মানবিক গুণাবলি ও মানসিক স্বাস্থ্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পাঠ্যবই ও শিক্ষাক্রমে এই দিকগুলোর অন্তর্ভুক্তি শিক্ষার্থীকে সামাজিকভাবে দায়িত্বশীল, সংবেদনশীল এবং মানসিকভাবে স্থিতিশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলে। মাধ্যমিক স্তরের পাঠ্যবইতে মানবিকতা ও মানসিক স্বাস্থ্যের অন্তর্ভুক্তি শিক্ষার্থীর চিন্তাশক্তি, সংবেদনশীলতা, সহযোগিতা এবং আত্মনির্ভরতার বিকাশ নিশ্চিত করবে। আমাদের দেশে এই বয়সে পড়ার চাপ ভয়াবহ। জিপিএ ৫, ভর্তি যুদ্ধ, সামাজিক তুলনা, অনলাইন বুলিং এসবের জন্য অনেকেই ভেতরে ভেতরে ভেঙে পড়ে। তাই শুধু সফলতা নয়, কীভাবে জীবনযুদ্ধে টিকে থাকবে—সেটাও শেখাতে হবে।
৩
অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষার পূর্বশর্ত হিসেবে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জন্য মাতৃভাষাভিত্তিক পাঠ্যবই প্রণয়ন খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। বাংলাদেশের শিক্ষা বাস্তবতায় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিক্ষার্থীরা দীর্ঘদিন ধরে এই মৌলিক বৈষম্যের মুখোমুখি। মাতৃভাষার পরিবর্তে অপরিচিত ভাষায় পাঠ্যবই চাপিয়ে দিলে শেখা হয়ে ওঠে কষ্টকর, বিমূর্ত ও বিচ্ছিন্ন। এর ফলে অনেক শিক্ষার্থী প্রাথমিক স্তরেই আগ্রহ হারায়, ঝরে পড়ে কিংবা আত্মবিশ্বাসহীন হয়ে ওঠে।
মূলধারার শিক্ষার সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে পাঠ্যবই এমনভাবে রচিত হওয়া প্রয়োজন, যেখানে একদিকে থাকবে নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি ও জীবনঘনিষ্ঠ অভিজ্ঞতা, অন্যদিকে ধীরে ধীরে রাষ্ট্রভাষা ও জাতীয় শিক্ষাক্রমের সঙ্গে সেতুবন্ধন তৈরি হবে। এতে করে এসব শিক্ষার্থী নিজেদের পরিচয় অক্ষুণ্ণ রেখেই মূল ধারার সমাজ, শিক্ষা ও কর্মজীবনের সঙ্গে যুক্ত হতে পারবে।
৪.
অবশ্যই বাংলাদেশের বাস্তবতা ও উন্নত দেশগুলোর বাস্তবতা এক নয়। অবকাঠামো, শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা আমাদের রয়েছে। কিন্তু দর্শনের জায়গায় পরিবর্তন আনা সম্ভব।
পাঠ্যবই প্রণয়নে যদি শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিকতা, জীবনঘনিষ্ঠতা ও শিক্ষা-চিন্তাবিদদের মানবিক দর্শনকে গুরুত্ব দেওয়া যায়, তবে বড় পরিবর্তনের সূচনা হতে পারে। পাঠ্যবই সংস্কার মানে শুধু বই বদলানো নয়; এটি একটি জাতির চিন্তা ও মূল্যবোধ বদলানোর প্রস্তুতি।
শিশুরা যেন কেবল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার যোগ্য না হয়, বরং চিন্তাশীল, মানবিক ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে ওঠে তা নিশ্চিত করতে হবে।
পাঠ্যবই কখনোই চূড়ান্ত জ্ঞান নয়; শেখার একটি সহায়ক কাঠামো, যার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে শিক্ষার্থী। পাঠ্যবইয়ে গল্প, ছবি, বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা ও কার্যভিত্তিক শেখার সমন্বয় সাধন করতে হবে। এতে শেখা হবে আনন্দময় ও স্থায়ী। সেই সঙ্গে পাঠ্যবইয়ের আভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক গঠনে যথার্থতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। পাঠ্যবই সংস্কারকে শিক্ষার্থীর মনোজগৎ, শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষাদর্শনের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।
বর্তমান প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের মনোজগৎ বুঝে পাঠ্যবই প্রণয়ন ও শিক্ষক-প্রস্তুতি নিশ্চিত করতে পারলেই শিক্ষা তার প্রকৃত উদ্দেশ্যে পৌঁছাবে।
শিক্ষার অর্থ হোক মানুষ হয়ে বাঁচা, আর পাঠ্যবই হোক তার কার্যকর ও সময়োপযোগী উপাদান।

লাশের কি কোনো রাজনীতি আছে? ৯ মাসের শিশুর লাশের গায়ে কি দলীয় লেবেল সাঁটা সম্ভব? বাগেরহাটের মর্মান্তিক ঘটনা ও কারাবন্দীর প্যারোল অধিকার প্রসঙ্গে লিখেছেন কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক মারুফ ইসলাম।
১৮ ঘণ্টা আগে
একসময় যা ছিল উগ্রবাদী প্রচারপুস্তকের স্লোগান, আজ তা আমেরিকার রাষ্ট্রীয় ভাষ্য। ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে নাৎসি মতাদর্শ লালন ও প্রচারের অভিযোগ ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।
২০ ঘণ্টা আগে
আজকের সমাজে আমরা এমন এক বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে ক্ষণিকের আনন্দ আমাদের জীবনের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠছে। মোবাইল স্ক্রলের তৃপ্তি, ফেসবুক বা রিলসের অন্তহীন প্রবাহ, কিংবা ভার্চুয়াল বিনোদনের সাময়িক স্বস্তি—এসবই আমাদের ক্লান্ত মনকে মুহূর্তের জন্য আরাম দেয়।
১ দিন আগে
কৃষি নির্ভর মেহেরপুর-মুজিবনগরের খেটে খাওয়া মানুষ এখন আর শুধু দল বদলের কথা বলছে না, তাদের চিন্তা বদলের কথা বলছে।
২ দিন আগে