ককরোচ জনতা পার্টি
রাজীব নন্দী

বছর দুয়েক আগে, চব্বিশ সালের মে-জুন মাসে ঢাকার কোরবানির ঈদের গরুর বাজারে লাখ টাকার এক ছাগল কাণ্ডে তোলপাড় হয়ে গিয়েছিল ডিজিটাল দুনিয়া। মিম, স্যাটায়ার আর অনলাইন ক্ষোভের আগুনে সেই ছাগল এমন এক প্রতীকে পরিণত হয়েছিল, যা শেষ পর্যন্ত সরকারের জন্য সাক্ষাৎ ডিজিটাল যম হয়ে দাঁড়ায়। তখন হয়তো কেউ বুঝতে পারেনি, কিন্তু দুই মাসও যায়নি—ছাত্র আন্দোলনের মধ্যে সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনার এক বেফাঁস মন্তব্য পরিস্থিতিকে আরও বিস্ফোরক করে তোলে। পরে রসিকতা করে অনেকে বলতে শুরু করে—বাংলাদেশে সতেরো বছরের সরকার খেয়ে ফেলেছিল পনেরো লাখ টাকার একটা ছাগল।
ঢাকা থেকে এবার চোখ ফেরাই নেপালের দিকে। মন্ত্রীপুত্রদের আলিশান জীবনযাপন যখন নেটপাড়ার টাইমলাইনে ভেসে উঠতে শুরু করলো, তখন জেনজির ডাকে ‘নেপোকিডস বিরোধী’ ডিজিটাল ক্ষোভ দ্রুতই রাস্তায় গড়িয়ে পড়ে। ঢাকায় লাখ টাকার ছাগল কোটি টাকার সরকার খেয়ে ফেলার পর নেপালের বিদ্রোহী তরুণরাও যেন একই সূত্র খুঁজে পেল।
তারপর সদ্য নতুন খবর রটলো— ভারতে নাকি জন্ম নিয়েছে ‘আরশোলা পার্টি’।
সম্প্রতি ভারতের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি দেশটির বেকার তরুণ-তরুণীদের ‘পরগাছা’ ও ‘তেলাপোকা’র সঙ্গে তুলনা করেন। মন্তব্যটি প্রকাশ্যে আসতেই ভারতীয় সোশ্যাল মিডিয়ায় তীব্র প্রতিক্রিয়া শুরু হয়। সেই ক্ষোভ থেকেই জন্ম নেয় ব্যঙ্গাত্মক ডিজিটাল সংগঠন—‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপি। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সংগঠনটির ফলোয়ার হু-হু করে বাড়তে থাকে। ভারতের রাজনীতিতে এক অভিনব ডিজিটাল ঘটনা—বাস্তবের রাজনৈতিক দলের চেয়ে বেশি ভাইরাল হয়ে ওঠে একটি ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক মিম-সংগঠন।
নিজেদের তারা পরিচয় দেয় ‘ধর্মনিরপেক্ষ, সমাজতান্ত্রিক, গণতান্ত্রিক, অলস’ দল হিসেবে। তরুণ প্রজন্মকে টানতে তারা ভার্চুয়াল সম্মেলনের ডাক দেয়। সদস্য হওয়ার শর্তও কম হাস্যকর নয়—বেকার হতে হবে, অলস হতে হবে, সারাক্ষণ অনলাইনে থাকতে হবে এবং পেশাদারিভাবে অভিযোগ করার দক্ষতা থাকতে হবে। দক্ষিণ এশিয়ার বেকার, হতাশ, চব্বিশ ঘণ্টা অনলাইনে থাকা জেনজির জন্য এরচেয়ে নিখুঁত রাজনৈতিক মেনিফেস্টো বোধহয় আর হয় না।
ভারতের এই ডিজিটাল আরশোলা বাহিনীর গল্প সামনে আসতেই বাংলাদেশের ইন্টারনেট সংস্কৃতির পুরোনো কিছু ভূতের কথা মনে পড়ে যায়। বাংলাদেশের ফেসবুকভিত্তিক রাজনৈতিক স্যাটায়ারের অন্যতম পথিকৃৎ ছিল ‘নতুন রাজনৈতিক দল’ বা নরাদ। এটি ছিল এমন এক ছদ্ম-রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম, যা প্রচলিত রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে উপহাস করত রাজনৈতিক দলীয় চামচামি, নেতাদের অতিরঞ্জিত বক্তব্য এবং অন্ধ সমর্থকদের আচরণ হুবহু নকল করে। ডিজিটাল পোস্টার, স্লোগান আর কাল্পনিক কর্মসূচির মাধ্যমে নরাদ দেখিয়ে দিয়েছিল—বাংলাদেশের রাজনীতি অনেক সময় বাস্তবের চেয়ে মিম-এ বেশি বাস্তব।
নরাদের পর আসে ‘বাইনসদ’ বা বাংলাদেশ ইসলামিক নব্য সমাজতান্ত্রিক দল। নামের মধ্যেই যার সবচেয়ে বড় কৌতুক লুকিয়ে আছে। ‘ইসলামিক’ এবং ‘সমাজতান্ত্রিক’—সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী দুই রাজনৈতিক আদর্শকে একসঙ্গে জুড়ে দিয়ে তারা মূলত দেশের ছদ্ম-আদর্শবাদী রাজনীতিকে ব্যঙ্গ করেছিল। বাংলাদেশের রাজনীতিতে যেখানে আদর্শ প্রতিদিন দলবদল করে, সেখানে বাইনসদ দেখিয়ে দিয়েছিল—এদেশে সবকিছু একসঙ্গে হওয়া সম্ভব, শুধু কনসিসটেন্ট হওয়াটা ছাড়া।
আর ‘ইয়ার্কি’ বাংলাদেশের ডিজিটাল স্যাটায়ার সংস্কৃতিকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নেয়। কেবল ফেসবুক পোস্ট বা মিম-এর মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে এটি অন্তর্জালকেন্দ্রিক ব্যঙ্গ ম্যাগাজিনের আদলে কাল্পনিক ব্রেকিং নিউজ, প্যারোডি রিপোর্ট এবং রম্য আর্টিকেল প্রকাশ করতে শুরু করে। দেশের আমলাতন্ত্র, রাজনৈতিক ভণ্ডামি, কর্পোরেট জীবন আর সামাজিক অসঙ্গতিগুলোকে তারা এমনভাবে উপস্থাপন করতো, যেখানে মানুষ একই সঙ্গে হাসত এবং অস্বস্তিতে পড়ত। বাস্তব জীবনে যখন সহ্যশক্তিকেও নিঃশেষ করে দেয়, দক্ষিণ এশিয়ার মানুষ যে স্যাটায়র পড়ে তখন সারভাইব করে—‘ইয়ার্কি’ সেটারই ডিজিটাল প্রমাণ।
এই কাল্পনিক গোষ্ঠীগুলোর সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তাদের কমেন্ট সেকশন ও পাবলিক এনগেজমেন্ট। সেখানে সাধারণ নেটাগরিকরাই ‘দলীয় কর্মী’ সেজে রাজনৈতিক স্লোগান দেয়, কাল্পনিক আন্দোলনের ডাক দেয়, এমনকি ফেইক ইন্টারনাল কনফ্লিক্ট-ও তৈরি হয়/হতো। অ্যাডমিনরা নিজেদের ‘মহাসচিব’ বা ‘আমীর’ দাবি করে আজগুবি কর্মসূচির পোস্ট দিলে, কমেন্ট বক্স মুহূর্তেই ভার্চুয়াল রাজনৈতিক মিছিলে পরিণত হতো। বাস্তবে কোনো রাজনৈতিক অস্তিত্ব না থাকলেও বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের কাছে এগুলো ছিল প্রচলিত রাজনীতির অসঙ্গতি বোঝার এক নতুন ডিজিটাল ভাষা।
আবার চোখ ফেরাই ভারতের ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র দিকে। এনডিটিভি জানিয়েছে, গত ১৬ মে অভিজিৎ দিপকে এই ব্যঙ্গাত্মক সংগঠনটি চালু করেন। পুনেতে সাংবাদিকতায় স্নাতক শেষ করা এই তরুণ বর্তমানে বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ে পাবলিক রিলেশনস নিয়ে মাস্টার্স করছেন। এর আগে ২০২০ সালের দিল্লি বিধানসভা নির্বাচনে অরবিন্দ কেজরিওয়ালের প্রচারণায় মিমভিত্তিক ডিজিটাল প্রচারণায় কাজ করেছিলেন তিনি। অভিজিতের ভাষায়, এই ব্যঙ্গাত্মক আন্দোলনের উত্থান আসলে ভারতীয় তরুণদের মধ্যে বাড়তে থাকা হতাশা, বেকারত্ব ও রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতার প্রতিফলন।
‘ককরোচ জনতা পার্টি’ নিয়ে এখন ভারতজুড়ে আলোচনা। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে হাজারো মিম পেইজের মতো এটিও কি কয়েকদিন পর হারিয়ে যাবে? নাকি এটি ডিজিটাল ক্ষোভের আরও বড় কোনো রূপ হয়ে উঠবে?
আরশোলা আসলে শুধু একটা পোকা না। এটি টিকে থাকার এক রাজনৈতিক রূপক। অন্ধকার ফাটলে এরা বংশবৃদ্ধি করে, বিষেও সহজে মরে না, চাপ দিলে লুকায়, আবার সুযোগ পেলে বের হয়ে আসে। ভারতের বহু তরুণ নিজেদের সঙ্গেই এই উপমার মিল খুঁজে পাচ্ছে। কারণ দক্ষিণ এশিয়ায় তরুণ হওয়া মানেই এখন—চাকরি নেই, নিরাপত্তা নেই, ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত, কিন্তু অনলাইনে থাকতে হবে। সবসময়। সারাক্ষণ। এলগরিদমের ভেতর বেঁচে থাকতে হবে।
ভারত সরকার অবশ্য বিষয়টিকে হালকাভাবে নিচ্ছে না। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে খতিয়ে দেখছে—এই প্ল্যাটফর্মের পেছনে কোনো বিদেশি অর্থায়ন, ডিজিটাল নেটওয়ার্ক বা সংগঠিত প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা রয়েছে কি না। বিশেষ করে সামাজিক মাধ্যমে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যঙ্গ করে তরুণদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরির প্রবণতাকে গুরুত্ব সহকারে দেখা হচ্ছে। বাংলাদেশের সরকারের পিআর ক্রাইসিস সিস্টেম এতটাই ভঙ্গুর ছিল যে তারা সময় থাকতে একটি ছাগলের গলায় দড়ি দিতেও ব্যর্থ হয়েছিল। কিন্তু ভারত দ্রুত নড়েচড়ে বসেছে। আইনি দাবির ভিত্তিতে এক্স প্ল্যাটফর্মে ভারতে “CJP”-এর অফিসিয়াল অ্যাকাউন্ট ব্লক করে দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে অন্যান্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মেও তাদের কার্যক্রম নজরদারির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সোশ্যাল মিডিয়া স্টাডিজে ‘নেটওয়ার্কড পাবলিক স্পিয়ার‘ নামে একটি বহুল আলোচিত ধারণা আছে। এই তত্ত্ব অনুযায়ী ডিজিটাল যুগে রাজনৈতিক মতামত আর শুধু টেলিভিশন স্টুডিও, সংবাদপত্র বা রাজনৈতিক দলের কার্যালয়ে তৈরি হয় না; বরং মিম পেইজ, কমেন্ট সেকশন, হ্যাশট্যাগ, স্যাটায়ার একাউন্ট এবং ভাইরাল পোস্ট মিলেই তৈরি করে নতুন ধরনের জনপরিসর। এখানে সাধারণ ব্যবহারকারীও শুধু দর্শক থাকে না, বরং নিজেই হয়ে ওঠে কনটেন্ট ক্রিয়েটর, প্রোপাগান্ডিস্ট, অ্যাকটিভিস্ট। ফলে একটি ছাগল, একটি মিম বা একটি ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ কখন নিছক ইয়ার্কি থেকে রাজনৈতিক প্রতীকে পরিণত হয়— তা অনেক সময় রাষ্ট্রও বুঝে উঠতে পারে না।
বর্তমানে রাজনৈতিক ব্যঙ্গ, মিম সংস্কৃতি এবং অনলাইন অ্যাক্টিভিজমের প্রভাব দ্রুত বাড়ছে। তরুণ প্রজন্মের বড় অংশ এখন সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমেই রাজনৈতিক মতামত তৈরি করে। ফলে একটি নিষ্পাপ মিম কখন কেবল হাস্যরসের সীমা ছাড়িয়ে বাস্তব রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ারে পরিণত হয়— তা আগেভাগে বোঝা কঠিন।
বাংলা সাহিত্যে বহুল উদ্ধৃত একটি লাইন আছে— “অতিকায় হস্তী লোপ পাইয়াছে, কিন্তু তেলাপোকা টিকিয়া আছে।” শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের “বিলাসী” গল্পের এই বিখ্যাত উক্তির মাধ্যমে টিকে থাকা আর সার্থকতার মধ্যকার পার্থক্যকে বোঝানো হয়েছিল। বিশাল শক্তিধর প্রাণীরা বিলুপ্ত হয়ে গেছে, অথচ ক্ষুদ্র তেলাপোকা কোটি কোটি বছর ধরে বেঁচে আছে। কিন্তু কেবল যেকোনোভাবে টিকে থাকাই জীবনের মহত্ত্ব নয়। এই রূপকের আড়ালে শরৎচন্দ্র যেমন তৎকালীন সমাজের অন্ধ রক্ষণশীলতাকে কটাক্ষ করেছিলেন, আজকের ডিজিটাল যুগেও সেই উপমা অস্বস্তিকরভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে।
বাংলাদেশের ‘লাখ টাকার ছাগল’ কাণ্ড সম্ভবত ভারত সরকারকেও একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিচ্ছে—ডিজিটাল যুগে কোনো ঘটনাকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। কারণ আজকের মিম আগামীকালের রাজনৈতিক ন্যারাটিভ, আজ যা সাদামাটা কমেন্ট কাল সেটা ‘নাইস এন্ড এট্রাক্টিভ’।
দক্ষিণ এশিয়ার তরুণ সমাজ এখন আর শুধু সংবাদ গ্রহণ করে না; তারা সেটিকে রিমিক্স করে, ব্যঙ্গ করে, ভাইরাল করে এবং শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক প্রতীকে পরিণত করে। বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, সময়মতো জনমনের ডিজিটাল প্রতিক্রিয়া বোঝা না গেলে একটি আপাতদৃষ্টিতে তুচ্ছ ঘটনাও বড় ধরনের জনঅসন্তোষের প্রতীকে রূপ নিতে পারে। সেই জায়গা থেকেই হয়তো ভারত সরকার ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র মতো প্ল্যাটফর্মকে কেবল অনলাইন ইয়ার্কি হিসেবে দেখছে না; বরং আগেভাগেই পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে।
ইতিহাসে ক্ষমতাবান রাষ্ট্রগুলো বহুবার ভিন্নমতাবলম্বী, হতাশ কিংবা বঞ্চিত তরুণদের ‘পোকা’, ‘পরজীবী’ বা ‘অপ্রয়োজনীয় জনগোষ্ঠী’ হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করেছে। কিন্তু ইতিহাসের বিদ্রূপ হলো—বড় বড় রাজনৈতিক পরিবর্তনের পেছনে প্রায়ই পরে সেই অবহেলিত মানুষগুলোর ভূমিকাই সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে। ব্রিটিশ শাসনামলে ভারতীয়দের মানুষ নয়, বরং নিচু জাতের প্রাণী বা কুকুরের সঙ্গে তুলনা করার ঔপনিবেশিক মানসিকতাও শেষ পর্যন্ত যুব বিদ্রোহ ও স্বাধীনতা আন্দোলনের আগুনকে আরও উসকে দিয়েছিল। আলবেয়ার কামুর ‘দ্য প্লেগ’ উপন্যাসে যেমন শহরের অন্ধকার গলি থেকে বেরিয়ে আসা ইঁদুর পুরো সমাজের ভেতরের পচনকে দৃশ্যমান করে তোলে, তেমনি ডিজিটাল যুগেও অনেক সময় মিম, ব্যঙ্গচিত্র ও স্যাটায়ার হঠাৎ করেই রাষ্ট্র ও সমাজের জমে থাকা হতাশাকে প্রকাশ্যে নিয়ে আসে। ফরাসি বিপ্লবের আগেও প্যারিসের দেয়ালজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল ব্যঙ্গচিত্র, গোপন প্রচারপত্র আর রাজতন্ত্রবিরোধী রসিকতা। ইতিহাস তাই বলে— রাজনৈতিক ক্রোধ অনেক সময় প্রথমে ইশতেহার হয়ে আসে না, আসে ঠাট্টা হয়ে।
পলিটিক্যাল কমিউনিকেশনের বহুল আলোচিত ‘নীরবতার সর্পিল’ তত্ত্ব (Spiral of Silence) তত্ত্ব অনুযায়ী মানুষ অনেক সময় সামাজিক বা রাষ্ট্রীয় চাপের কারণে নিজের রাজনৈতিক মতামত প্রকাশ করতে ভয় পায়, বিশেষ করে যখন তারা মনে করে তাদের অবস্থান সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের বিপরীতে। জার্মান গবেষক এলিজাবেথ নোয়েল-নিউম্যানের এই তত্ত্ব ডিজিটাল যুগে নতুন রূপ পেয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার বহু তরুণ এখন সরাসরি রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার বদলে মিম, স্যাটায়ার, প্যারডি পেইজের মাধ্যমে নিজেদের ক্ষোভ প্রকাশ করছে। কারণ হিউমার অনেক সময় ডিসেন্ট-এর সবচেয়ে নিরাপদ ভাষা। ফলে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’, ‘নরাদ’ বা ‘বাইনসদ’-এর মতো প্ল্যাটফর্মগুলো নিছক ‘ইয়ার্কি’ না; এগুলো অনেক ক্ষেত্রেই চাপা রাজনৈতিক হতাশার সাংকেতিক ডিজিটাল অভিব্যক্তি বা কোডেড ডিজিটাল এক্সপ্রেশন।
প্রশ্ন উঠে, মহাভারতে যক্ষ যেমন বকের রূপ ধরে যুধিষ্ঠিরের সামনে এসেছিল পরীক্ষা নিতে, দক্ষিণ এশিয়ার ডিজিটাল রাজনীতিতেও কি তেমন কোনো নতুন যক্ষের আবির্ভাব ঘটছে? বাংলাদেশে সে কি এসেছিল লাখ টাকার এক ছাগলের রূপ ধরে? আর ভারতে কি এখন সে আরশোলা হয়ে ডিজিটাল-মাটাল টাইমলাইনের অন্ধকার ফাটল থেকে বের হচ্ছে? কে জানে— হয়তো এই যুগের অন্তর্যামী যক্ষ আর বন-জঙ্গলে থাকে না, থাকে অন্তর্জালে। প্রশ্ন করে না সংস্কৃত শ্লোকে, করে ভারলাইন ক্যাপশনে। আর রাজাদের ধ্বংসও হয়তো এখন যুদ্ধক্ষেত্রে না, অনলাইনে।
ফ্রানৎস কাফকার গ্রেগর সামসা একদিন ঘুম থেকে উঠে নিজেকে পোকায় রূপান্তরিত অবস্থায় দেখেছিল। দক্ষিণ এশিয়ার তরুণেরা অবশ্য এখন আর ঘুম থেকে উঠে বদলায় না— তারা টাইমলাইন স্ক্রল করতে করতেই ধীরে ধীরে ‘আরশোলা জনতা’য় পরিণত হয়। ঘরের কোণায় দু-একটা আরশোলা দেখে যে দেশের সরকার নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়ে, তারা হয়তো জানে না— আলো নিভে গেলেই আরশোলারা বের হয়। একা না। দল বেঁধে! ঢাকা ও কাঠমুন্ডু দেখিয়েছে- সময় থাকতে থাকতে ‘লাইনে’ না এলে, ‘অনলাইন’ই হয়ে উঠে শাসকের জন্য বিপদ। তাই প্রতিবেশীর একটি ছাগল কী করতে পারে, তা দেখে নিশ্চয়ই ভারত এখন নিজেদের ‘আরশোলা’ সমস্যাকে গুরুত্ব দিচ্ছে।
লেখক: চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক, নিউ মিডিয়া ও রাজনৈতিক যোগাযোগ বিষয়ে গবেষক

বছর দুয়েক আগে, চব্বিশ সালের মে-জুন মাসে ঢাকার কোরবানির ঈদের গরুর বাজারে লাখ টাকার এক ছাগল কাণ্ডে তোলপাড় হয়ে গিয়েছিল ডিজিটাল দুনিয়া। মিম, স্যাটায়ার আর অনলাইন ক্ষোভের আগুনে সেই ছাগল এমন এক প্রতীকে পরিণত হয়েছিল, যা শেষ পর্যন্ত সরকারের জন্য সাক্ষাৎ ডিজিটাল যম হয়ে দাঁড়ায়। তখন হয়তো কেউ বুঝতে পারেনি, কিন্তু দুই মাসও যায়নি—ছাত্র আন্দোলনের মধ্যে সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনার এক বেফাঁস মন্তব্য পরিস্থিতিকে আরও বিস্ফোরক করে তোলে। পরে রসিকতা করে অনেকে বলতে শুরু করে—বাংলাদেশে সতেরো বছরের সরকার খেয়ে ফেলেছিল পনেরো লাখ টাকার একটা ছাগল।
ঢাকা থেকে এবার চোখ ফেরাই নেপালের দিকে। মন্ত্রীপুত্রদের আলিশান জীবনযাপন যখন নেটপাড়ার টাইমলাইনে ভেসে উঠতে শুরু করলো, তখন জেনজির ডাকে ‘নেপোকিডস বিরোধী’ ডিজিটাল ক্ষোভ দ্রুতই রাস্তায় গড়িয়ে পড়ে। ঢাকায় লাখ টাকার ছাগল কোটি টাকার সরকার খেয়ে ফেলার পর নেপালের বিদ্রোহী তরুণরাও যেন একই সূত্র খুঁজে পেল।
তারপর সদ্য নতুন খবর রটলো— ভারতে নাকি জন্ম নিয়েছে ‘আরশোলা পার্টি’।
সম্প্রতি ভারতের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি দেশটির বেকার তরুণ-তরুণীদের ‘পরগাছা’ ও ‘তেলাপোকা’র সঙ্গে তুলনা করেন। মন্তব্যটি প্রকাশ্যে আসতেই ভারতীয় সোশ্যাল মিডিয়ায় তীব্র প্রতিক্রিয়া শুরু হয়। সেই ক্ষোভ থেকেই জন্ম নেয় ব্যঙ্গাত্মক ডিজিটাল সংগঠন—‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপি। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সংগঠনটির ফলোয়ার হু-হু করে বাড়তে থাকে। ভারতের রাজনীতিতে এক অভিনব ডিজিটাল ঘটনা—বাস্তবের রাজনৈতিক দলের চেয়ে বেশি ভাইরাল হয়ে ওঠে একটি ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক মিম-সংগঠন।
নিজেদের তারা পরিচয় দেয় ‘ধর্মনিরপেক্ষ, সমাজতান্ত্রিক, গণতান্ত্রিক, অলস’ দল হিসেবে। তরুণ প্রজন্মকে টানতে তারা ভার্চুয়াল সম্মেলনের ডাক দেয়। সদস্য হওয়ার শর্তও কম হাস্যকর নয়—বেকার হতে হবে, অলস হতে হবে, সারাক্ষণ অনলাইনে থাকতে হবে এবং পেশাদারিভাবে অভিযোগ করার দক্ষতা থাকতে হবে। দক্ষিণ এশিয়ার বেকার, হতাশ, চব্বিশ ঘণ্টা অনলাইনে থাকা জেনজির জন্য এরচেয়ে নিখুঁত রাজনৈতিক মেনিফেস্টো বোধহয় আর হয় না।
ভারতের এই ডিজিটাল আরশোলা বাহিনীর গল্প সামনে আসতেই বাংলাদেশের ইন্টারনেট সংস্কৃতির পুরোনো কিছু ভূতের কথা মনে পড়ে যায়। বাংলাদেশের ফেসবুকভিত্তিক রাজনৈতিক স্যাটায়ারের অন্যতম পথিকৃৎ ছিল ‘নতুন রাজনৈতিক দল’ বা নরাদ। এটি ছিল এমন এক ছদ্ম-রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম, যা প্রচলিত রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে উপহাস করত রাজনৈতিক দলীয় চামচামি, নেতাদের অতিরঞ্জিত বক্তব্য এবং অন্ধ সমর্থকদের আচরণ হুবহু নকল করে। ডিজিটাল পোস্টার, স্লোগান আর কাল্পনিক কর্মসূচির মাধ্যমে নরাদ দেখিয়ে দিয়েছিল—বাংলাদেশের রাজনীতি অনেক সময় বাস্তবের চেয়ে মিম-এ বেশি বাস্তব।
নরাদের পর আসে ‘বাইনসদ’ বা বাংলাদেশ ইসলামিক নব্য সমাজতান্ত্রিক দল। নামের মধ্যেই যার সবচেয়ে বড় কৌতুক লুকিয়ে আছে। ‘ইসলামিক’ এবং ‘সমাজতান্ত্রিক’—সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী দুই রাজনৈতিক আদর্শকে একসঙ্গে জুড়ে দিয়ে তারা মূলত দেশের ছদ্ম-আদর্শবাদী রাজনীতিকে ব্যঙ্গ করেছিল। বাংলাদেশের রাজনীতিতে যেখানে আদর্শ প্রতিদিন দলবদল করে, সেখানে বাইনসদ দেখিয়ে দিয়েছিল—এদেশে সবকিছু একসঙ্গে হওয়া সম্ভব, শুধু কনসিসটেন্ট হওয়াটা ছাড়া।
আর ‘ইয়ার্কি’ বাংলাদেশের ডিজিটাল স্যাটায়ার সংস্কৃতিকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নেয়। কেবল ফেসবুক পোস্ট বা মিম-এর মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে এটি অন্তর্জালকেন্দ্রিক ব্যঙ্গ ম্যাগাজিনের আদলে কাল্পনিক ব্রেকিং নিউজ, প্যারোডি রিপোর্ট এবং রম্য আর্টিকেল প্রকাশ করতে শুরু করে। দেশের আমলাতন্ত্র, রাজনৈতিক ভণ্ডামি, কর্পোরেট জীবন আর সামাজিক অসঙ্গতিগুলোকে তারা এমনভাবে উপস্থাপন করতো, যেখানে মানুষ একই সঙ্গে হাসত এবং অস্বস্তিতে পড়ত। বাস্তব জীবনে যখন সহ্যশক্তিকেও নিঃশেষ করে দেয়, দক্ষিণ এশিয়ার মানুষ যে স্যাটায়র পড়ে তখন সারভাইব করে—‘ইয়ার্কি’ সেটারই ডিজিটাল প্রমাণ।
এই কাল্পনিক গোষ্ঠীগুলোর সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তাদের কমেন্ট সেকশন ও পাবলিক এনগেজমেন্ট। সেখানে সাধারণ নেটাগরিকরাই ‘দলীয় কর্মী’ সেজে রাজনৈতিক স্লোগান দেয়, কাল্পনিক আন্দোলনের ডাক দেয়, এমনকি ফেইক ইন্টারনাল কনফ্লিক্ট-ও তৈরি হয়/হতো। অ্যাডমিনরা নিজেদের ‘মহাসচিব’ বা ‘আমীর’ দাবি করে আজগুবি কর্মসূচির পোস্ট দিলে, কমেন্ট বক্স মুহূর্তেই ভার্চুয়াল রাজনৈতিক মিছিলে পরিণত হতো। বাস্তবে কোনো রাজনৈতিক অস্তিত্ব না থাকলেও বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের কাছে এগুলো ছিল প্রচলিত রাজনীতির অসঙ্গতি বোঝার এক নতুন ডিজিটাল ভাষা।
আবার চোখ ফেরাই ভারতের ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র দিকে। এনডিটিভি জানিয়েছে, গত ১৬ মে অভিজিৎ দিপকে এই ব্যঙ্গাত্মক সংগঠনটি চালু করেন। পুনেতে সাংবাদিকতায় স্নাতক শেষ করা এই তরুণ বর্তমানে বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ে পাবলিক রিলেশনস নিয়ে মাস্টার্স করছেন। এর আগে ২০২০ সালের দিল্লি বিধানসভা নির্বাচনে অরবিন্দ কেজরিওয়ালের প্রচারণায় মিমভিত্তিক ডিজিটাল প্রচারণায় কাজ করেছিলেন তিনি। অভিজিতের ভাষায়, এই ব্যঙ্গাত্মক আন্দোলনের উত্থান আসলে ভারতীয় তরুণদের মধ্যে বাড়তে থাকা হতাশা, বেকারত্ব ও রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতার প্রতিফলন।
‘ককরোচ জনতা পার্টি’ নিয়ে এখন ভারতজুড়ে আলোচনা। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে হাজারো মিম পেইজের মতো এটিও কি কয়েকদিন পর হারিয়ে যাবে? নাকি এটি ডিজিটাল ক্ষোভের আরও বড় কোনো রূপ হয়ে উঠবে?
আরশোলা আসলে শুধু একটা পোকা না। এটি টিকে থাকার এক রাজনৈতিক রূপক। অন্ধকার ফাটলে এরা বংশবৃদ্ধি করে, বিষেও সহজে মরে না, চাপ দিলে লুকায়, আবার সুযোগ পেলে বের হয়ে আসে। ভারতের বহু তরুণ নিজেদের সঙ্গেই এই উপমার মিল খুঁজে পাচ্ছে। কারণ দক্ষিণ এশিয়ায় তরুণ হওয়া মানেই এখন—চাকরি নেই, নিরাপত্তা নেই, ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত, কিন্তু অনলাইনে থাকতে হবে। সবসময়। সারাক্ষণ। এলগরিদমের ভেতর বেঁচে থাকতে হবে।
ভারত সরকার অবশ্য বিষয়টিকে হালকাভাবে নিচ্ছে না। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে খতিয়ে দেখছে—এই প্ল্যাটফর্মের পেছনে কোনো বিদেশি অর্থায়ন, ডিজিটাল নেটওয়ার্ক বা সংগঠিত প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা রয়েছে কি না। বিশেষ করে সামাজিক মাধ্যমে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যঙ্গ করে তরুণদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরির প্রবণতাকে গুরুত্ব সহকারে দেখা হচ্ছে। বাংলাদেশের সরকারের পিআর ক্রাইসিস সিস্টেম এতটাই ভঙ্গুর ছিল যে তারা সময় থাকতে একটি ছাগলের গলায় দড়ি দিতেও ব্যর্থ হয়েছিল। কিন্তু ভারত দ্রুত নড়েচড়ে বসেছে। আইনি দাবির ভিত্তিতে এক্স প্ল্যাটফর্মে ভারতে “CJP”-এর অফিসিয়াল অ্যাকাউন্ট ব্লক করে দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে অন্যান্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মেও তাদের কার্যক্রম নজরদারির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সোশ্যাল মিডিয়া স্টাডিজে ‘নেটওয়ার্কড পাবলিক স্পিয়ার‘ নামে একটি বহুল আলোচিত ধারণা আছে। এই তত্ত্ব অনুযায়ী ডিজিটাল যুগে রাজনৈতিক মতামত আর শুধু টেলিভিশন স্টুডিও, সংবাদপত্র বা রাজনৈতিক দলের কার্যালয়ে তৈরি হয় না; বরং মিম পেইজ, কমেন্ট সেকশন, হ্যাশট্যাগ, স্যাটায়ার একাউন্ট এবং ভাইরাল পোস্ট মিলেই তৈরি করে নতুন ধরনের জনপরিসর। এখানে সাধারণ ব্যবহারকারীও শুধু দর্শক থাকে না, বরং নিজেই হয়ে ওঠে কনটেন্ট ক্রিয়েটর, প্রোপাগান্ডিস্ট, অ্যাকটিভিস্ট। ফলে একটি ছাগল, একটি মিম বা একটি ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ কখন নিছক ইয়ার্কি থেকে রাজনৈতিক প্রতীকে পরিণত হয়— তা অনেক সময় রাষ্ট্রও বুঝে উঠতে পারে না।
বর্তমানে রাজনৈতিক ব্যঙ্গ, মিম সংস্কৃতি এবং অনলাইন অ্যাক্টিভিজমের প্রভাব দ্রুত বাড়ছে। তরুণ প্রজন্মের বড় অংশ এখন সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমেই রাজনৈতিক মতামত তৈরি করে। ফলে একটি নিষ্পাপ মিম কখন কেবল হাস্যরসের সীমা ছাড়িয়ে বাস্তব রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ারে পরিণত হয়— তা আগেভাগে বোঝা কঠিন।
বাংলা সাহিত্যে বহুল উদ্ধৃত একটি লাইন আছে— “অতিকায় হস্তী লোপ পাইয়াছে, কিন্তু তেলাপোকা টিকিয়া আছে।” শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের “বিলাসী” গল্পের এই বিখ্যাত উক্তির মাধ্যমে টিকে থাকা আর সার্থকতার মধ্যকার পার্থক্যকে বোঝানো হয়েছিল। বিশাল শক্তিধর প্রাণীরা বিলুপ্ত হয়ে গেছে, অথচ ক্ষুদ্র তেলাপোকা কোটি কোটি বছর ধরে বেঁচে আছে। কিন্তু কেবল যেকোনোভাবে টিকে থাকাই জীবনের মহত্ত্ব নয়। এই রূপকের আড়ালে শরৎচন্দ্র যেমন তৎকালীন সমাজের অন্ধ রক্ষণশীলতাকে কটাক্ষ করেছিলেন, আজকের ডিজিটাল যুগেও সেই উপমা অস্বস্তিকরভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে।
বাংলাদেশের ‘লাখ টাকার ছাগল’ কাণ্ড সম্ভবত ভারত সরকারকেও একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিচ্ছে—ডিজিটাল যুগে কোনো ঘটনাকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। কারণ আজকের মিম আগামীকালের রাজনৈতিক ন্যারাটিভ, আজ যা সাদামাটা কমেন্ট কাল সেটা ‘নাইস এন্ড এট্রাক্টিভ’।
দক্ষিণ এশিয়ার তরুণ সমাজ এখন আর শুধু সংবাদ গ্রহণ করে না; তারা সেটিকে রিমিক্স করে, ব্যঙ্গ করে, ভাইরাল করে এবং শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক প্রতীকে পরিণত করে। বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, সময়মতো জনমনের ডিজিটাল প্রতিক্রিয়া বোঝা না গেলে একটি আপাতদৃষ্টিতে তুচ্ছ ঘটনাও বড় ধরনের জনঅসন্তোষের প্রতীকে রূপ নিতে পারে। সেই জায়গা থেকেই হয়তো ভারত সরকার ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র মতো প্ল্যাটফর্মকে কেবল অনলাইন ইয়ার্কি হিসেবে দেখছে না; বরং আগেভাগেই পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে।
ইতিহাসে ক্ষমতাবান রাষ্ট্রগুলো বহুবার ভিন্নমতাবলম্বী, হতাশ কিংবা বঞ্চিত তরুণদের ‘পোকা’, ‘পরজীবী’ বা ‘অপ্রয়োজনীয় জনগোষ্ঠী’ হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করেছে। কিন্তু ইতিহাসের বিদ্রূপ হলো—বড় বড় রাজনৈতিক পরিবর্তনের পেছনে প্রায়ই পরে সেই অবহেলিত মানুষগুলোর ভূমিকাই সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে। ব্রিটিশ শাসনামলে ভারতীয়দের মানুষ নয়, বরং নিচু জাতের প্রাণী বা কুকুরের সঙ্গে তুলনা করার ঔপনিবেশিক মানসিকতাও শেষ পর্যন্ত যুব বিদ্রোহ ও স্বাধীনতা আন্দোলনের আগুনকে আরও উসকে দিয়েছিল। আলবেয়ার কামুর ‘দ্য প্লেগ’ উপন্যাসে যেমন শহরের অন্ধকার গলি থেকে বেরিয়ে আসা ইঁদুর পুরো সমাজের ভেতরের পচনকে দৃশ্যমান করে তোলে, তেমনি ডিজিটাল যুগেও অনেক সময় মিম, ব্যঙ্গচিত্র ও স্যাটায়ার হঠাৎ করেই রাষ্ট্র ও সমাজের জমে থাকা হতাশাকে প্রকাশ্যে নিয়ে আসে। ফরাসি বিপ্লবের আগেও প্যারিসের দেয়ালজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল ব্যঙ্গচিত্র, গোপন প্রচারপত্র আর রাজতন্ত্রবিরোধী রসিকতা। ইতিহাস তাই বলে— রাজনৈতিক ক্রোধ অনেক সময় প্রথমে ইশতেহার হয়ে আসে না, আসে ঠাট্টা হয়ে।
পলিটিক্যাল কমিউনিকেশনের বহুল আলোচিত ‘নীরবতার সর্পিল’ তত্ত্ব (Spiral of Silence) তত্ত্ব অনুযায়ী মানুষ অনেক সময় সামাজিক বা রাষ্ট্রীয় চাপের কারণে নিজের রাজনৈতিক মতামত প্রকাশ করতে ভয় পায়, বিশেষ করে যখন তারা মনে করে তাদের অবস্থান সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের বিপরীতে। জার্মান গবেষক এলিজাবেথ নোয়েল-নিউম্যানের এই তত্ত্ব ডিজিটাল যুগে নতুন রূপ পেয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার বহু তরুণ এখন সরাসরি রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার বদলে মিম, স্যাটায়ার, প্যারডি পেইজের মাধ্যমে নিজেদের ক্ষোভ প্রকাশ করছে। কারণ হিউমার অনেক সময় ডিসেন্ট-এর সবচেয়ে নিরাপদ ভাষা। ফলে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’, ‘নরাদ’ বা ‘বাইনসদ’-এর মতো প্ল্যাটফর্মগুলো নিছক ‘ইয়ার্কি’ না; এগুলো অনেক ক্ষেত্রেই চাপা রাজনৈতিক হতাশার সাংকেতিক ডিজিটাল অভিব্যক্তি বা কোডেড ডিজিটাল এক্সপ্রেশন।
প্রশ্ন উঠে, মহাভারতে যক্ষ যেমন বকের রূপ ধরে যুধিষ্ঠিরের সামনে এসেছিল পরীক্ষা নিতে, দক্ষিণ এশিয়ার ডিজিটাল রাজনীতিতেও কি তেমন কোনো নতুন যক্ষের আবির্ভাব ঘটছে? বাংলাদেশে সে কি এসেছিল লাখ টাকার এক ছাগলের রূপ ধরে? আর ভারতে কি এখন সে আরশোলা হয়ে ডিজিটাল-মাটাল টাইমলাইনের অন্ধকার ফাটল থেকে বের হচ্ছে? কে জানে— হয়তো এই যুগের অন্তর্যামী যক্ষ আর বন-জঙ্গলে থাকে না, থাকে অন্তর্জালে। প্রশ্ন করে না সংস্কৃত শ্লোকে, করে ভারলাইন ক্যাপশনে। আর রাজাদের ধ্বংসও হয়তো এখন যুদ্ধক্ষেত্রে না, অনলাইনে।
ফ্রানৎস কাফকার গ্রেগর সামসা একদিন ঘুম থেকে উঠে নিজেকে পোকায় রূপান্তরিত অবস্থায় দেখেছিল। দক্ষিণ এশিয়ার তরুণেরা অবশ্য এখন আর ঘুম থেকে উঠে বদলায় না— তারা টাইমলাইন স্ক্রল করতে করতেই ধীরে ধীরে ‘আরশোলা জনতা’য় পরিণত হয়। ঘরের কোণায় দু-একটা আরশোলা দেখে যে দেশের সরকার নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়ে, তারা হয়তো জানে না— আলো নিভে গেলেই আরশোলারা বের হয়। একা না। দল বেঁধে! ঢাকা ও কাঠমুন্ডু দেখিয়েছে- সময় থাকতে থাকতে ‘লাইনে’ না এলে, ‘অনলাইন’ই হয়ে উঠে শাসকের জন্য বিপদ। তাই প্রতিবেশীর একটি ছাগল কী করতে পারে, তা দেখে নিশ্চয়ই ভারত এখন নিজেদের ‘আরশোলা’ সমস্যাকে গুরুত্ব দিচ্ছে।
লেখক: চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক, নিউ মিডিয়া ও রাজনৈতিক যোগাযোগ বিষয়ে গবেষক

একটা পিকআপ ভ্যানের পেছনে গাদাগাদি করে মানুষ উঠছে। একজন আরেকজনকে টেনে তুলছে। কয়েকজন উঠে পড়েছে এরইমধ্যে। কেউ ঝুলছে পেছনের রড ধরে। পাশেই এক তরুণী (দেখে মনে হলো গার্মেন্টসকর্মী) তাঁর বৃদ্ধা মাকে বলছিলেন, ‘মা, আর গাড়ি পাইমু না। এইডাতেই উইঠা পড়ো।’
৫ মিনিট আগে
ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে রামিসার শাড়ি পরা ছবিগুলো। ছবিতে রামিসাকে বয়সের তুলনায় বেশ বড় দেখাচ্ছে। অভিব্যক্তিতেও বেশ পরিপক্বতার ছাপ। ছবিটি প্রথম কে পোস্ট করল? কেন পোস্ট করল? সে প্রশ্নের উত্তর খোঁজা এখন অবান্তর। কিন্তু এই ছবি এখন ব্যক্তিগত স্ট্যাটাস থেকে প্রতিষ্ঠিত সংবাদ মাধ্যমের থাম্বনেইল—সবখানে।
৩৮ মিনিট আগে
কোরবানি ঈদের আগ দিয়ে বাজারে কিছু সুখবর আছে। যেমন, বেড়ে যাওয়া ডিমের দাম কমে এসেছে। ব্রয়লার আর সোনালি মুরগির দামও। দাম আগের জায়গায় আসার ‘প্রত্যাশা’ থাকলেও সেটা কমই ঘটে। কারণ বাজারে সক্রিয় থাকে দাম বৃদ্ধির উপাদানগুলো। এরই মধ্যে তো ডিজেলের দাম বাড়ানো হয়েছে। তাতে রাতারাতি বেড়েছে পণ্য পরিবহন ব্যয়। হালে ডি
৪ ঘণ্টা আগে
দেশজুড়ে যেন শিশু মৃত্যুর এক নীরব মিছিল নেমেছে—যে মিছিল প্রতিদিন দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। অথচ এই ভয়াবহ পরিস্থিতিও আমাদের সমাজ, রাষ্ট্র কিংবা প্রশাসনের মধ্যে তেমন কোনো বড় আলোড়ন তুলতে পারেনি। সংক্রমণ শুরুর দুই মাসেরও বেশি সময় পার হয়ে গেলেও পরিস্থিতি মোকাবিলায় কোনো সর্বাত্মক উদ্যোগ আমরা দেখতে পাচ্ছি না
৪ ঘণ্টা আগে