ড. মোহাম্মাদ আনিসুর রহমান

একটি দেশের উচ্চশিক্ষা, মেধা গঠন এবং জাতীয় মনন বিকাশের মূল চালিকাশক্তি হলো বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্ববিদ্যালয় কেবল পূর্বে তৈরি করা বা সংগৃহীত জ্ঞান শিক্ষার্থীদের মুখস্থ করিয়ে পরীক্ষার মাধ্যমে ডিগ্রি দেওয়ার কোনো সাধারণ কারখানা নয়; বরং শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের যৌথ মেধা এবং অন্বেষণের মাধ্যমে প্রতিনিয়ত নতুন জ্ঞান সৃষ্টি, উৎপাদন কিংবা পুনরুৎপাদন করাই এর মূল উদ্দেশ্য। তবে সম্প্রতি বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণা খাতের বাজেট বরাদ্দের পদ্ধতিতে যে অভূতপূর্ব ও নজিরবিহীন পরিবর্তন এনেছে, তা দেশের উচ্চশিক্ষা মহলে এক গভীর সংকটের জন্ম দিয়েছে।
নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছর থেকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণা মঞ্জুরির অর্থ সরাসরি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে দেওয়া হবে না; বরং এই অর্থ সম্পূর্ণ কেন্দ্রীয়ভাবে ইউজিসির নিজস্ব কাঠামোর মাধ্যমে সরাসরি ব্যয় করা হবে। এই নীতিগত ও পদ্ধতিগত পরিবর্তনের ফলে দেশের শীর্ষস্থানীয় উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষক, গবেষক ও নীতিনির্ধারকদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ, ক্ষোভ ও গভীর উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। তাঁরা স্পষ্ট ভাষায় বলছেন, এই নিয়ম শিক্ষকদের স্বাধীন একাডেমিক পরিবেশকে মারাত্মকভাবে সংকুচিত করবে এবং উচ্চশিক্ষায় আমলাতান্ত্রিক জটিলতার এক নতুন প্রাচীর দাঁড় করাবে।
একাডেমিক স্বাধীনতার ওপর আঘাত ও কেন্দ্রীভূত গবেষণা ব্যবস্থার ঝুঁকি
উচ্চতর বৈজ্ঞানিক বা সামাজিক গবেষণা কোনো রুটিনমাফিক বা ফাইলবন্দি সাধারণ সরকারি কাজ নয়, যার প্রতিটি ধাপ আমলাতান্ত্রিক টেবিল ও লাল ফিতার দৌরাত্ম্য দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হতে পারে। গবেষণার জন্য প্রয়োজন সম্পূর্ণ মুক্ত ও স্বাধীন পরিবেশ, যাকে একাডেমিক স্বাধীনতা বলা হয়। গবেষণা বরাদ্দ যদি ইউজিসি থেকে কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত ও পরিচালিত হয়, তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক ও নিয়মিত গবেষণা কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়বে। ফলে বড়জোর মুষ্টিমেয় কিছু লোক বা সংস্থা বিক্ষিপ্তভাবে গবেষণা করতে পারবেন, কিন্তু একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের যে নিয়মিত গবেষণা সংস্কৃতি, তা পুরোপুরি থেমে যাবে। এই সিদ্ধান্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের মৌলিক স্বকীয়তা ও একাডেমিক স্বাধীনতাকে সরাসরি বাধাগ্রস্ত করবে এবং গবেষণার বরাদ্দ ইউজিসির হাতে কেন্দ্রীভূত করে রাখলে দেশের উচ্চশিক্ষার পুরো গবেষণা খাতটিই চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
গবেষণাকে একটি প্রতিষ্ঠানের হাতে কেন্দ্রীভূত করার ফলে প্রথমত সৃজনশীলতার ক্ষতি হতে পারে। দেশের প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভৌগোলিক, সামাজিক ও একাডেমিক বাস্তবতা আলাদা। পাহাড়ি অঞ্চলের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার চাহিদা যেমন হবে, রাজধানীভিত্তিক একটি প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের চাহিদা তেমন হবে না। যদি একটি কেন্দ্রীয় সংস্থা সবার জন্য একই গবেষণা অগ্রাধিকার নির্ধারণ করে, তবে স্থানীয় জ্ঞান, উদ্ভাবন এবং বিশেষায়িত গবেষণার সুযোগ সীমিত হয়ে যাবে।
দ্বিতীয়ত, গবেষণায় আমলাতান্ত্রিক জটিলতা বৃদ্ধি পাবে। গবেষণা প্রকল্প অনুমোদন, অর্থায়ন এবং মূল্যায়নের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ গবেষণার গতি কমিয়ে দিতে পারে। গবেষণার জগতে সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া গবেষকদের আগ্রহ কমিয়ে দিতে পারে এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে দিতে পারে।
আমলাতন্ত্রের যুক্তি বনাম একাডেমিক বাস্তবতা
শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের এই নীতিগত সিদ্ধান্তের পেছনে যে যুক্তিগুলো দাঁড় করানো হচ্ছে, তা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায়োগিক ও একাডেমিক বাস্তবতার সঙ্গে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বরাতে জানানো হয়েছে যে, গবেষণার বরাদ্দটি কেন্দ্রীয়ভাবে ইউজিসির মাধ্যমে ব্যয় করার বিষয়টি এ বছর থেকেই সরকারি সিদ্ধান্ত হিসেবে চালু করা হয়েছে, তবে এটি পরীক্ষামূলকও হতে পারে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে যুক্তি দেওয়া হয়েছে যে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে বিক্ষিপ্তভাবে বরাদ্দ দিলে নানা ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক সমস্যা তৈরি হয়, তাই একে কেন্দ্রীভূত করা প্রয়োজন। এমনকি ইউজিসির উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্বীকার করেছেন যে, এই বিশাল অর্থের প্রত্যক্ষ দায়িত্ব ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে খোদ ইউজিসির ভেতরেও একধরনের বড় অস্বস্তি কাজ করছিল।
জাতীয় বাজেটে শিক্ষা খাতে এবারই সবচেয়ে বড় বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, সেখানে গবেষণার মতো একটি মৌলিক খাতকে কেন এভাবে কেন্দ্রীভূত বা অবরুদ্ধ করা হচ্ছে তা বোধগোম্য নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি অনুষদে নিজস্ব গবেষণা প্রকল্প যাচাই-বাছাই কমিটি থাকে, যার ফলে গবেষণার সঠিক ও চুলচেরা একাডেমিক মূল্যায়ন সম্ভব হয় এবং অপচয় রোধ করে কম খরচে কাজ সম্পন্ন করা যায়। কিন্তু ঢাকার সচিবালয় বা ইউজিসি ভবনে বসে গবেষণার তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক গভীরতা কতটুকু মূল্যায়ন করতে পারবেন, তা নিয়ে বড় ধরনের একাডেমিক সংশয় থেকে যায়।
শিক্ষক ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের তীব্র সমালোচনার মুখে ইউজিসি একটি আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা ও বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে। সংস্থাটির দাবি অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে দেশের সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা খাতে তারা মোট ২২৬ কোটি টাকা বরাদ্দ রেখেছে, যা পূর্ববর্তী অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ১৩ শতাংশ বেশি। ইউজিসির মতে, গবেষণা প্রকল্পে অর্থায়নের এই নতুন পদ্ধতিটি আসলে দ্বৈততা পরিহার করার জন্য এবং একে আরও সহজ, স্বচ্ছ ও গবেষকবান্ধব করার লক্ষ্যেই প্রবর্তন করা হয়েছে। তারা আশ্বস্ত করতে চেয়েছে যে, এর ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক স্বাধীনতা, প্রাতিষ্ঠানিক স্বকীয়তা, গবেষণার অগ্রাধিকার কিংবা বিষয়ভিত্তিক বৈচিত্র্য কোনোভাবেই ক্ষুণ্ন হবে না।
এই লক্ষ্যে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের গবেষণা বরাদ্দ পাওয়ার জন্য সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়কে তাদের সামগ্রিক গবেষণা পরিকল্পনা, উপখাতভিত্তিক অর্থের চাহিদা এবং বাজেটের প্রাক্কলন দ্রুত কমিয়ে পাঠানোর জন্য চিঠিও দেওয়া হয়েছে। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা ইউজিসির এই আশ্বাসে আশ্বস্ত হতে পারছেন না। কারণ অতীতে যেকোনো কেন্দ্রীয় বা আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থার মাধ্যমে অর্থ ছাড় করার ক্ষেত্রে যে দীর্ঘসূত্রতা এবং জটিলতা দেখা গেছে, তা গবেষণার গতিকে স্তিমিত করে দিতে বাধ্য হবে এতে কোনো সন্দেহ নেই।
ইউজিসির করণীয় কী হওয়া উচিত?
আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণার মান নিয়ে বিভিন্ন সময় নানা বিতর্ক ও প্রশ্ন উঠলেও, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশীয় গবেষকদের বৈশ্বিক সাফল্য ও আন্তর্জাতিক প্রকাশনা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। স্কোপাস (Scopus) ডেটাবেজের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর স্কোপাস-ইনডেক্সড আন্তর্জাতিক প্রকাশনার সংখ্যা ১৮ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে বাংলাদেশের গবেষণা-প্রকাশনার প্রবৃদ্ধি ঘটেছে প্রায় ২১ শতাংশ। আরও গৌরবের বিষয় হলো, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের স্টানফোর্ড ইউনিভার্সিটি এবং নেদারল্যান্ডসভিত্তিক বিখ্যাত প্রকাশনা সংস্থা 'এলসভিয়ার' বিশ্বসেরা গবেষকদের যে তালিকা প্রকাশ করেছে, তাতে বাংলাদেশের ৩৫ জন শিক্ষক ও গবেষক স্থান পেয়েছেন।
এছাড়া সিঙ্গাপুরভিত্তিক বিজ্ঞান সাময়িকী 'এশিয়ান সায়েন্টিস্ট'-এর এশিয়ার সেরা ১০০ বিজ্ঞানীর তালিকায় বাংলাদেশের তিনজন বিজ্ঞানী স্থান পেয়েছেন। ইলিশ ও পাটের জিনরহস্য উন্মোচনের মতো বিশ্ব কাঁপানো গবেষণার নেতৃত্ব দেওয়া বিশিষ্ট বিজ্ঞানী এবং ইউজিসি অধ্যাপক হাসিনা খান এই নতুন নিয়ম সম্পর্কে তাঁর অভিমত ব্যক্ত করেছেন। তিনি মনে করেন, যে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নিজস্ব স্বাধীনতাকে সম্পূর্ণ অক্ষুণ্ন রেখেই সরকারকে যেকোনো ধরনের নীতিগত দিকনির্দেশনা প্রদান করতে হবে।
বাংলাদেশে গবেষণার মান উন্নয়নের জন্য ইউজিসির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে সেই ভূমিকা হওয়া উচিত সহায়ক, নিয়ন্ত্রক নয়। ইউজিসি গবেষণার জন্য বিশেষ তহবিল গঠন করতে পারে, আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা সহযোগিতা বাড়াতে পারে, আন্তর্জাতিক অংশীদারত্বের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে এবং গবেষণার মান মূল্যায়নের জন্য একটি স্বচ্ছ কাঠামো তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে তাদের নিজস্ব গবেষণা অগ্রাধিকার নির্ধারণের স্বাধীনতা দিতে হবে।
এছাড়া প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শক্তিশালী গবেষণা সেল, গবেষণা অনুদান ব্যবস্থাপনা ইউনিট এবং উদ্ভাবন কেন্দ্র গড়ে তোলার মাধ্যমে গবেষণার পরিবেশকে আরও কার্যকর করা সম্ভব। কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগই দীর্ঘমেয়াদে বেশি ফলপ্রসূ হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়োজনীয়তা ও ভবিষ্যৎ রূপরেখা
গবেষণা ও উচ্চশিক্ষার এই সামগ্রিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে একটি প্রশ্ন ধ্রুবতারার মতো সামনে চলে আসে—গবেষণা প্রকল্পের অনুমোদন, অর্থ ছাড় এবং প্রতিটি বিষয়ের নিয়ন্ত্রণ যদি ইউজিসি বা মন্ত্রণালয়ের আমলাদের টেবিল থেকে নির্ধারিত হয়, তবে উচ্চশিক্ষার শীর্ষ প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন ও স্বতন্ত্র প্রয়োজনীয়তা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? বিশ্ববিদ্যালয় যদি নিজস্ব তহবিলের মাধ্যমে স্বাধীনভাবে গবেষণার রূপরেখা তৈরি করতে না পারে, তবে তা স্রেফ ডিগ্রি দেওয়ার কারখানায় পরিণত হবে। শিক্ষকেরা তখন নতুন জ্ঞান সৃষ্টির চেয়ে আমলাতান্ত্রিক ফাইলের পেছনে দৌড়াতে বেশি বাধ্য হবেন, যার নেতিবাচক প্রভাব সরাসরি ক্লাসরুমের সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর পড়বে।
ইউজিসি বা সরকারের কাজ হওয়া উচিত গবেষণার আর্থিক স্বচ্ছতা অডিট করা এবং বড় অংকের ফান্ডের জোগান দেওয়া। গবেষণার প্রত্যক্ষ পরিচালনা ও একাডেমিক নিয়ন্ত্রণ বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুষদগুলোর হাতেই ছেড়ে দেওয়া উচিত। মেধার স্বাধীনতা ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বকীয়তাকে অবরুদ্ধ করে কোনো দেশেই উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়ন সম্ভব হয়নি। অতএব, পরীক্ষামূলক হোক বা স্থায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বকীয়তা ও শিক্ষকদের একাডেমিক স্বাধীনতাকে যেকোনো মূল্যে অক্ষুণ্ণের রাখাই দেশের উচ্চশিক্ষা ও মেধার ভবিষ্যৎ সুরক্ষার একমাত্র পথ।
আজ যদি গবেষণার নেতৃত্ব ইউজিসির হাতে চলে যায়, কাল হয়তো পাঠক্রম তৈরিও কেন্দ্রীয়ভাবে হবে, শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রেও বাড়বে নিয়ন্ত্রণ। ধীরে ধীরে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাদের স্বতন্ত্র চরিত্র হারাবে। তখন তারা আর জ্ঞান সৃষ্টির স্বাধীন প্রতিষ্ঠান থাকবে না; হয়ে উঠবে প্রশাসনিক ইউনিট মাত্র। তাই প্রশ্নটি আবারও উচ্চারণ করা জরুরি—গবেষণা যদি ইউজিসি পরিচালনা করে, তবে বিশ্ববিদ্যালয় থাকবে কেন?
বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্তিত্বের মূলেই রয়েছে স্বাধীন জ্ঞানচর্চা ও গবেষণা। সেই স্বাধীনতাকে দুর্বল করে গবেষণার উন্নতি সম্ভব নয়। বরং স্বাধীন, শক্তিশালী ও গবেষণামুখী বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তুলতে পারলেই বাংলাদেশ একটি জ্ঞানভিত্তিক সমাজ এবং উদ্ভাবননির্ভর অর্থনীতির দিকে এগিয়ে যেতে পারবে। বিশ্ববিদ্যালয়কে শক্তিশালী করার পথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষমতা কমানো নয়; বরং তার গবেষণা স্বাধীনতা, আর্থিক সক্ষমতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদা আরও সুদৃঢ় করা।

একটি দেশের উচ্চশিক্ষা, মেধা গঠন এবং জাতীয় মনন বিকাশের মূল চালিকাশক্তি হলো বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্ববিদ্যালয় কেবল পূর্বে তৈরি করা বা সংগৃহীত জ্ঞান শিক্ষার্থীদের মুখস্থ করিয়ে পরীক্ষার মাধ্যমে ডিগ্রি দেওয়ার কোনো সাধারণ কারখানা নয়; বরং শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের যৌথ মেধা এবং অন্বেষণের মাধ্যমে প্রতিনিয়ত নতুন জ্ঞান সৃষ্টি, উৎপাদন কিংবা পুনরুৎপাদন করাই এর মূল উদ্দেশ্য। তবে সম্প্রতি বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণা খাতের বাজেট বরাদ্দের পদ্ধতিতে যে অভূতপূর্ব ও নজিরবিহীন পরিবর্তন এনেছে, তা দেশের উচ্চশিক্ষা মহলে এক গভীর সংকটের জন্ম দিয়েছে।
নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছর থেকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণা মঞ্জুরির অর্থ সরাসরি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে দেওয়া হবে না; বরং এই অর্থ সম্পূর্ণ কেন্দ্রীয়ভাবে ইউজিসির নিজস্ব কাঠামোর মাধ্যমে সরাসরি ব্যয় করা হবে। এই নীতিগত ও পদ্ধতিগত পরিবর্তনের ফলে দেশের শীর্ষস্থানীয় উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষক, গবেষক ও নীতিনির্ধারকদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ, ক্ষোভ ও গভীর উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। তাঁরা স্পষ্ট ভাষায় বলছেন, এই নিয়ম শিক্ষকদের স্বাধীন একাডেমিক পরিবেশকে মারাত্মকভাবে সংকুচিত করবে এবং উচ্চশিক্ষায় আমলাতান্ত্রিক জটিলতার এক নতুন প্রাচীর দাঁড় করাবে।
একাডেমিক স্বাধীনতার ওপর আঘাত ও কেন্দ্রীভূত গবেষণা ব্যবস্থার ঝুঁকি
উচ্চতর বৈজ্ঞানিক বা সামাজিক গবেষণা কোনো রুটিনমাফিক বা ফাইলবন্দি সাধারণ সরকারি কাজ নয়, যার প্রতিটি ধাপ আমলাতান্ত্রিক টেবিল ও লাল ফিতার দৌরাত্ম্য দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হতে পারে। গবেষণার জন্য প্রয়োজন সম্পূর্ণ মুক্ত ও স্বাধীন পরিবেশ, যাকে একাডেমিক স্বাধীনতা বলা হয়। গবেষণা বরাদ্দ যদি ইউজিসি থেকে কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত ও পরিচালিত হয়, তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক ও নিয়মিত গবেষণা কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়বে। ফলে বড়জোর মুষ্টিমেয় কিছু লোক বা সংস্থা বিক্ষিপ্তভাবে গবেষণা করতে পারবেন, কিন্তু একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের যে নিয়মিত গবেষণা সংস্কৃতি, তা পুরোপুরি থেমে যাবে। এই সিদ্ধান্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের মৌলিক স্বকীয়তা ও একাডেমিক স্বাধীনতাকে সরাসরি বাধাগ্রস্ত করবে এবং গবেষণার বরাদ্দ ইউজিসির হাতে কেন্দ্রীভূত করে রাখলে দেশের উচ্চশিক্ষার পুরো গবেষণা খাতটিই চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
গবেষণাকে একটি প্রতিষ্ঠানের হাতে কেন্দ্রীভূত করার ফলে প্রথমত সৃজনশীলতার ক্ষতি হতে পারে। দেশের প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভৌগোলিক, সামাজিক ও একাডেমিক বাস্তবতা আলাদা। পাহাড়ি অঞ্চলের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার চাহিদা যেমন হবে, রাজধানীভিত্তিক একটি প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের চাহিদা তেমন হবে না। যদি একটি কেন্দ্রীয় সংস্থা সবার জন্য একই গবেষণা অগ্রাধিকার নির্ধারণ করে, তবে স্থানীয় জ্ঞান, উদ্ভাবন এবং বিশেষায়িত গবেষণার সুযোগ সীমিত হয়ে যাবে।
দ্বিতীয়ত, গবেষণায় আমলাতান্ত্রিক জটিলতা বৃদ্ধি পাবে। গবেষণা প্রকল্প অনুমোদন, অর্থায়ন এবং মূল্যায়নের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ গবেষণার গতি কমিয়ে দিতে পারে। গবেষণার জগতে সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া গবেষকদের আগ্রহ কমিয়ে দিতে পারে এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে দিতে পারে।
আমলাতন্ত্রের যুক্তি বনাম একাডেমিক বাস্তবতা
শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের এই নীতিগত সিদ্ধান্তের পেছনে যে যুক্তিগুলো দাঁড় করানো হচ্ছে, তা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায়োগিক ও একাডেমিক বাস্তবতার সঙ্গে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বরাতে জানানো হয়েছে যে, গবেষণার বরাদ্দটি কেন্দ্রীয়ভাবে ইউজিসির মাধ্যমে ব্যয় করার বিষয়টি এ বছর থেকেই সরকারি সিদ্ধান্ত হিসেবে চালু করা হয়েছে, তবে এটি পরীক্ষামূলকও হতে পারে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে যুক্তি দেওয়া হয়েছে যে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে বিক্ষিপ্তভাবে বরাদ্দ দিলে নানা ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক সমস্যা তৈরি হয়, তাই একে কেন্দ্রীভূত করা প্রয়োজন। এমনকি ইউজিসির উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্বীকার করেছেন যে, এই বিশাল অর্থের প্রত্যক্ষ দায়িত্ব ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে খোদ ইউজিসির ভেতরেও একধরনের বড় অস্বস্তি কাজ করছিল।
জাতীয় বাজেটে শিক্ষা খাতে এবারই সবচেয়ে বড় বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, সেখানে গবেষণার মতো একটি মৌলিক খাতকে কেন এভাবে কেন্দ্রীভূত বা অবরুদ্ধ করা হচ্ছে তা বোধগোম্য নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি অনুষদে নিজস্ব গবেষণা প্রকল্প যাচাই-বাছাই কমিটি থাকে, যার ফলে গবেষণার সঠিক ও চুলচেরা একাডেমিক মূল্যায়ন সম্ভব হয় এবং অপচয় রোধ করে কম খরচে কাজ সম্পন্ন করা যায়। কিন্তু ঢাকার সচিবালয় বা ইউজিসি ভবনে বসে গবেষণার তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক গভীরতা কতটুকু মূল্যায়ন করতে পারবেন, তা নিয়ে বড় ধরনের একাডেমিক সংশয় থেকে যায়।
শিক্ষক ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের তীব্র সমালোচনার মুখে ইউজিসি একটি আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা ও বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে। সংস্থাটির দাবি অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে দেশের সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা খাতে তারা মোট ২২৬ কোটি টাকা বরাদ্দ রেখেছে, যা পূর্ববর্তী অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ১৩ শতাংশ বেশি। ইউজিসির মতে, গবেষণা প্রকল্পে অর্থায়নের এই নতুন পদ্ধতিটি আসলে দ্বৈততা পরিহার করার জন্য এবং একে আরও সহজ, স্বচ্ছ ও গবেষকবান্ধব করার লক্ষ্যেই প্রবর্তন করা হয়েছে। তারা আশ্বস্ত করতে চেয়েছে যে, এর ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক স্বাধীনতা, প্রাতিষ্ঠানিক স্বকীয়তা, গবেষণার অগ্রাধিকার কিংবা বিষয়ভিত্তিক বৈচিত্র্য কোনোভাবেই ক্ষুণ্ন হবে না।
এই লক্ষ্যে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের গবেষণা বরাদ্দ পাওয়ার জন্য সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়কে তাদের সামগ্রিক গবেষণা পরিকল্পনা, উপখাতভিত্তিক অর্থের চাহিদা এবং বাজেটের প্রাক্কলন দ্রুত কমিয়ে পাঠানোর জন্য চিঠিও দেওয়া হয়েছে। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা ইউজিসির এই আশ্বাসে আশ্বস্ত হতে পারছেন না। কারণ অতীতে যেকোনো কেন্দ্রীয় বা আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থার মাধ্যমে অর্থ ছাড় করার ক্ষেত্রে যে দীর্ঘসূত্রতা এবং জটিলতা দেখা গেছে, তা গবেষণার গতিকে স্তিমিত করে দিতে বাধ্য হবে এতে কোনো সন্দেহ নেই।
ইউজিসির করণীয় কী হওয়া উচিত?
আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণার মান নিয়ে বিভিন্ন সময় নানা বিতর্ক ও প্রশ্ন উঠলেও, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশীয় গবেষকদের বৈশ্বিক সাফল্য ও আন্তর্জাতিক প্রকাশনা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। স্কোপাস (Scopus) ডেটাবেজের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর স্কোপাস-ইনডেক্সড আন্তর্জাতিক প্রকাশনার সংখ্যা ১৮ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে বাংলাদেশের গবেষণা-প্রকাশনার প্রবৃদ্ধি ঘটেছে প্রায় ২১ শতাংশ। আরও গৌরবের বিষয় হলো, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের স্টানফোর্ড ইউনিভার্সিটি এবং নেদারল্যান্ডসভিত্তিক বিখ্যাত প্রকাশনা সংস্থা 'এলসভিয়ার' বিশ্বসেরা গবেষকদের যে তালিকা প্রকাশ করেছে, তাতে বাংলাদেশের ৩৫ জন শিক্ষক ও গবেষক স্থান পেয়েছেন।
এছাড়া সিঙ্গাপুরভিত্তিক বিজ্ঞান সাময়িকী 'এশিয়ান সায়েন্টিস্ট'-এর এশিয়ার সেরা ১০০ বিজ্ঞানীর তালিকায় বাংলাদেশের তিনজন বিজ্ঞানী স্থান পেয়েছেন। ইলিশ ও পাটের জিনরহস্য উন্মোচনের মতো বিশ্ব কাঁপানো গবেষণার নেতৃত্ব দেওয়া বিশিষ্ট বিজ্ঞানী এবং ইউজিসি অধ্যাপক হাসিনা খান এই নতুন নিয়ম সম্পর্কে তাঁর অভিমত ব্যক্ত করেছেন। তিনি মনে করেন, যে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নিজস্ব স্বাধীনতাকে সম্পূর্ণ অক্ষুণ্ন রেখেই সরকারকে যেকোনো ধরনের নীতিগত দিকনির্দেশনা প্রদান করতে হবে।
বাংলাদেশে গবেষণার মান উন্নয়নের জন্য ইউজিসির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে সেই ভূমিকা হওয়া উচিত সহায়ক, নিয়ন্ত্রক নয়। ইউজিসি গবেষণার জন্য বিশেষ তহবিল গঠন করতে পারে, আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা সহযোগিতা বাড়াতে পারে, আন্তর্জাতিক অংশীদারত্বের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে এবং গবেষণার মান মূল্যায়নের জন্য একটি স্বচ্ছ কাঠামো তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে তাদের নিজস্ব গবেষণা অগ্রাধিকার নির্ধারণের স্বাধীনতা দিতে হবে।
এছাড়া প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শক্তিশালী গবেষণা সেল, গবেষণা অনুদান ব্যবস্থাপনা ইউনিট এবং উদ্ভাবন কেন্দ্র গড়ে তোলার মাধ্যমে গবেষণার পরিবেশকে আরও কার্যকর করা সম্ভব। কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগই দীর্ঘমেয়াদে বেশি ফলপ্রসূ হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়োজনীয়তা ও ভবিষ্যৎ রূপরেখা
গবেষণা ও উচ্চশিক্ষার এই সামগ্রিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে একটি প্রশ্ন ধ্রুবতারার মতো সামনে চলে আসে—গবেষণা প্রকল্পের অনুমোদন, অর্থ ছাড় এবং প্রতিটি বিষয়ের নিয়ন্ত্রণ যদি ইউজিসি বা মন্ত্রণালয়ের আমলাদের টেবিল থেকে নির্ধারিত হয়, তবে উচ্চশিক্ষার শীর্ষ প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন ও স্বতন্ত্র প্রয়োজনীয়তা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? বিশ্ববিদ্যালয় যদি নিজস্ব তহবিলের মাধ্যমে স্বাধীনভাবে গবেষণার রূপরেখা তৈরি করতে না পারে, তবে তা স্রেফ ডিগ্রি দেওয়ার কারখানায় পরিণত হবে। শিক্ষকেরা তখন নতুন জ্ঞান সৃষ্টির চেয়ে আমলাতান্ত্রিক ফাইলের পেছনে দৌড়াতে বেশি বাধ্য হবেন, যার নেতিবাচক প্রভাব সরাসরি ক্লাসরুমের সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর পড়বে।
ইউজিসি বা সরকারের কাজ হওয়া উচিত গবেষণার আর্থিক স্বচ্ছতা অডিট করা এবং বড় অংকের ফান্ডের জোগান দেওয়া। গবেষণার প্রত্যক্ষ পরিচালনা ও একাডেমিক নিয়ন্ত্রণ বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুষদগুলোর হাতেই ছেড়ে দেওয়া উচিত। মেধার স্বাধীনতা ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বকীয়তাকে অবরুদ্ধ করে কোনো দেশেই উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়ন সম্ভব হয়নি। অতএব, পরীক্ষামূলক হোক বা স্থায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বকীয়তা ও শিক্ষকদের একাডেমিক স্বাধীনতাকে যেকোনো মূল্যে অক্ষুণ্ণের রাখাই দেশের উচ্চশিক্ষা ও মেধার ভবিষ্যৎ সুরক্ষার একমাত্র পথ।
আজ যদি গবেষণার নেতৃত্ব ইউজিসির হাতে চলে যায়, কাল হয়তো পাঠক্রম তৈরিও কেন্দ্রীয়ভাবে হবে, শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রেও বাড়বে নিয়ন্ত্রণ। ধীরে ধীরে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাদের স্বতন্ত্র চরিত্র হারাবে। তখন তারা আর জ্ঞান সৃষ্টির স্বাধীন প্রতিষ্ঠান থাকবে না; হয়ে উঠবে প্রশাসনিক ইউনিট মাত্র। তাই প্রশ্নটি আবারও উচ্চারণ করা জরুরি—গবেষণা যদি ইউজিসি পরিচালনা করে, তবে বিশ্ববিদ্যালয় থাকবে কেন?
বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্তিত্বের মূলেই রয়েছে স্বাধীন জ্ঞানচর্চা ও গবেষণা। সেই স্বাধীনতাকে দুর্বল করে গবেষণার উন্নতি সম্ভব নয়। বরং স্বাধীন, শক্তিশালী ও গবেষণামুখী বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তুলতে পারলেই বাংলাদেশ একটি জ্ঞানভিত্তিক সমাজ এবং উদ্ভাবননির্ভর অর্থনীতির দিকে এগিয়ে যেতে পারবে। বিশ্ববিদ্যালয়কে শক্তিশালী করার পথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষমতা কমানো নয়; বরং তার গবেষণা স্বাধীনতা, আর্থিক সক্ষমতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদা আরও সুদৃঢ় করা।
.png)

প্রতিবছর বন্যা আসে, পাহাড়ধস হয়, মানুষ মারা যায়। এসব বাংলাদেশের পরিচিত দুর্ভাগ্য। কিন্তু এবার দক্ষিণ-পূর্ব ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বন্যা ও পাহাড়ধস আমাদের সামনে আরেকটি বাস্তবতা স্পষ্ট করে দিয়েছে। দুর্যোগের বড় ক্ষতি শুধু প্রাণহানি বা ঘরবাড়ি ধ্বংস নয়। বড় ক্ষতি হলো মানুষের বাস্তুচ্যুতি।
৩৪ মিনিট আগে
১৭৮৯ সালের ১৪ই জুলাই। দমবন্ধ করা মধ্যগ্রীষ্মের দাবদাহে প্যারিস তখন স্থবির। চরম হতাশা, পদ্ধতিগত অনাহার আর পুঞ্জীভূত অপমানের তীব্র ক্ষোভে সাধারণ নাগরিকের এক বিশাল জনস্রোত ধেয়ে চলল বাস্তিল দুর্গের পানে।
৬ ঘণ্টা আগে
মিনিট দশেক স্ক্রল করতেই বেশ কয়েকটি ভিডিও আর ছবি দেখা হলো। একটি ছেলে হাঁটুসমান পানি ভেঙে পরীক্ষা কেন্দ্রে যাচ্ছে। হঠাৎ পা পিছলে পড়ে গেল। ছিটকে উঠল নোংরা পানি। পুরো শরীর ডুবে গেলেও হাতে ধরা অ্যাডমিট কার্ডের ফাইলটা কোনোমতে হাত উঁচিয়ে রক্ষা করল ছেলেটা।
৭ ঘণ্টা আগে
বিশেষ করে দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চলে—যেমন চট্টগ্রাম ও এর আশেপাশের জেলাগুলোতে ঘনঘন যে ভয়াবহ বন্যা হচ্ছে, তা চরম উদ্বেগের। ২০২৪ সালে আমরা একটি বড় বন্যা দেখেছি, ২০২৬ সালেও শঙ্কা বাড়ছে।
১ দিন আগে