মতামত/১৭ আগস্ট কি আবার ফিরে আসতে পারে

স্ট্রিম গ্রাফিক

২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট বাংলাদেশের নিরাপত্তা ইতিহাসের একটি কালো অধ্যায়। মাত্র আধা ঘণ্টার মধ্যে দেশের ৬৩টি জেলায় ৪৫৯টি বোমা বিস্ফোরণ ঘটেছিল। ঘটনাটির দায় জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি) স্বীকার করে এবং পরবর্তী তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ায় সংগঠনটির শীর্ষ নেতৃত্বের সম্পৃক্ততা জানা যায়।

সেই ঘটনার ২১ বছর পর একটি প্রশ্ন আবারও করা দরকার। জেএমবি কি একাই এত বড়, এত বিস্তৃত এবং এত নিখুঁতভাবে সমন্বিত একটি অপারেশন পরিচালনা করতে সক্ষম হয়েছিল? নাকি জেএমবি ছিল অপারেশনের দৃশ্যমান অংশ, আর এর পেছনে আরও কোনো অদৃশ্য দেশীয় বা আন্তর্জাতিক সহায়ক কাঠামো কাজ করেছিল?

এই প্রশ্নের উত্তর আমাদের কাছে নিশ্চিতভাবে নেই। এবং প্রমাণ ছাড়া কোনো ‘ডিপ স্টেট’, ‘ফিফথ কলামিস্ট’ বা বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থাকে দায়ী করাও দায়িত্বশীল বিশ্লেষণ নয়। কিন্তু প্রশ্নটি একেবারে অমূলকও নয়। কারণ সমকালীন বিশ্লেষণেও বলা হয়েছিল, জেএমবির প্রত্যক্ষ ভূমিকার পাশাপাশি কোনো শক্তিশালী দেশীয় বা আন্তর্জাতিক পক্ষ তাদের সহায়তা করেছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। আর এখানেই ১৭ আগস্টের প্রকৃত তাৎপর্য।

একটি নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন কীভাবে একই সময়ে দেশের প্রায় সর্বত্র শত শত বিস্ফোরক স্থাপন করতে পারে, এ প্রশ্ন শুধু সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের নয়; এটি রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সক্ষমতা, রাজনৈতিক পরিবেশ, অর্থায়ন, লজিস্টিক নেটওয়ার্ক এবং সম্ভাব্য সহযোগী কাঠামোরও প্রশ্ন।

২০০৫ সালের আগে জেএমবির তৎপরতা একেবারে অজানা ছিল না। বিভিন্ন স্থানে তাদের কর্মকাণ্ড, প্রশিক্ষণ এবং বিস্ফোরক ব্যবহারের ঘটনা সামনে এসেছিল। কিন্তু রাষ্ট্র সেই সংকেতগুলোকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে পড়তে পারেনি—এমন সমালোচনা সে সময়ও ছিল। ১৭ আগস্টের হামলার পরই রাষ্ট্রীয় প্রতিক্রিয়া দ্রুত কঠোর হয়; পরবর্তীতে জেএমবির শীর্ষ নেতৃত্ব গ্রেপ্তার, বিচার ও দণ্ডিত হয়।

তাহলে প্রশ্ন হলো, ১৭ আগস্ট কি কেবল একটি জঙ্গি সংগঠনের সন্ত্রাসী প্রদর্শন ছিল, নাকি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকে প্রভাবিত করার বৃহত্তর কোনো প্রক্রিয়ার সূচনাবিন্দুও ছিল?

এখানে ইতিহাসের সঙ্গে বর্তমানের একটি সংযোগ খুঁজে দেখা প্রয়োজন। পরবর্তী প্রায় দেড় দশকে আমরা দেখেছি, বাংলাদেশে ইসলামি সন্ত্রাসবাদের ভয়কে রাজনৈতিক বয়ান, আন্তর্জাতিক কূটনীতি এবং রাষ্ট্রীয় বৈধতার প্রশ্নে বিভিন্নভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। এর অর্থ এই নয় যে পরবর্তী শাসনব্যবস্থাই ২০০৫ সালের হামলার নেপথ্যের কারিগর ছিল। এমন দাবি প্রতিষ্ঠা করতে হলে শক্ত প্রমাণ প্রয়োজন। কিন্তু একটি রাষ্ট্রের নিরাপত্তা-ইতিহাসে কোনো সন্ত্রাসী ঘটনার পরবর্তী রাজনৈতিক ব্যবহার এবং ঘটনাটির মূল পরিকল্পনা—এই দুটি প্রশ্ন আলাদা করে দেখা জরুরি।

সুতরাং আরও গভীর প্রশ্নটি হলো, ১৭ আগস্ট যদি কোনো বৃহত্তর অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির কৌশলের অংশ হয়ে থাকে, তবে সেই কৌশলের লক্ষ্য কী ছিল? একটি নির্বাচিত সরকারকে দুর্বল করা? রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আস্থা নষ্ট করা? বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিচয়কে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা-আলোচনার নতুন ফ্রেমে ঠেলে দেওয়া? নাকি কেবল একটি জঙ্গি সংগঠনের নিজস্ব রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের উচ্চাকাঙ্ক্ষা? আজকের বাংলাদেশে এই প্রশ্নের গুরুত্ব আরও বেড়েছে।

২০২৬ সালের নির্বাচনে বিএনপি এককভাবে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করেছে। ২০০৫ সালের বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। তখন বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার ক্ষমতায় ছিল। আজকের সরকার তাই রাজনৈতিকভাবে আরও শক্তিশালী। কিন্তু রাজনৈতিক শক্তি আর জাতীয় নিরাপত্তার নিশ্চয়তা এক জিনিস নয়। বরং বড় ম্যান্ডেটের সঙ্গে বড় দায়িত্বও আসে।

১৭ আগস্ট কি কেবল একটি জঙ্গি সংগঠনের সন্ত্রাসী প্রদর্শন ছিল, নাকি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকে প্রভাবিত করার বৃহত্তর কোনো প্রক্রিয়ার সূচনাবিন্দুও ছিল? এখানে ইতিহাসের সঙ্গে বর্তমানের একটি সংযোগ খুঁজে দেখা প্রয়োজন। পরবর্তী প্রায় দেড় দশকে আমরা দেখেছি, বাংলাদেশে ইসলামি সন্ত্রাসবাদের ভয়কে রাজনৈতিক বয়ান, আন্তর্জাতিক কূটনীতি এবং রাষ্ট্রীয় বৈধতার প্রশ্নে বিভিন্নভাবে ব্যবহার করা হয়েছে।

সান ঝু প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে যে মৌলিক সতর্কতা দিয়েছিলেন, তার সারকথা হলো, শত্রু আসবে না ধরে নেওয়া যুদ্ধনীতির অংশ নয়; বরং শত্রু কীভাবে আসতে পারে তা অনুমান করে তার আক্রমণ প্রতিহত করার প্রস্তুতি নেওয়াই রাষ্ট্রকৌশল। চাণক্যের অর্থশাস্ত্র কিংবা মেকিয়াভেলির দ্য প্রিন্স, দুই ভিন্ন সভ্যতার রাজনৈতিক চিন্তাতেও একই বাস্তববাদী শিক্ষা পাওয়া যায়—রাষ্ট্রনায়ককে শুধু প্রকাশ্য প্রতিপক্ষ নয়, গোপন কৌশল, ষড়যন্ত্র, বিভ্রান্তি, অনুপ্রবেশ এবং সুযোগসন্ধানী প্রতিপক্ষের সম্ভাবনাও বিবেচনায় রাখতে হয়।

সুতরাং আজকের সরকারের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক আত্মতুষ্টি হবে, ‘আমরা বিপুল ভোটে নির্বাচিত হয়েছি, অতএব আমাদের বিরুদ্ধে বড় ধরনের ষড়যন্ত্র সম্ভব নয়’—এমন ধারণা। বরং বিপুল জনম্যান্ডেটকে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা আরও পেশাদার করার সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করা উচিত।

সাম্প্রতিক বোমা বা বোমা-সদৃশ বস্তু উদ্ধারের ঘটনাগুলো তাই অতিরঞ্জিত আতঙ্কের কারণ নয়; আবার অবহেলারও বিষয় নয়। কারণ সন্দেহজনক বস্তু পাওয়া আর কার্যকর বিস্ফোরক উদ্ধার, এক বিষয় নয়। ১ আগস্ট মিরপুর-১০ ও ফার্মগেট মেট্রো স্টেশনের কাছে পাওয়া দুটি সন্দেহজনক বস্তুর পরীক্ষায় বিস্ফোরক পাওয়া যায়নি। কিন্তু এ ধরনের প্রতিটি ঘটনার দ্রুত পেশাদার যাচাই প্রয়োজন, কারণ নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ‘ফলস অ্যালার্ম’ এর সংখ্যাও গুরুত্বপূর্ণ, আবার একটি ‘জেনুইন সিগন্যাল’ উপেক্ষার মূল্যও অনেক বেশি।

তাই বাংলাদেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সামনে এখন সবচেয়ে বড় কাজ শুধু জঙ্গি ধরার অভিযান নয়। প্রয়োজন স্ট্র্যাটেজিক ইন্টেলিজেন্স—ঘটনার আগেই ঘটনার প্যাটার্ন শনাক্ত করা। স্থানীয় পুলিশ, জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা, সিটিটিসি, সাইবার ইউনিট এবং অন্যান্য নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে তথ্যের দ্রুত সমন্বয় অপরিহার্য।

বিশেষ করে দেখতে হবে অর্থের উৎস কোথায়, যোগাযোগের নেটওয়ার্ক কোথায়, অনলাইন র‌্যাডিকালাইজেশন কোথায়, সন্দেহজনক লজিস্টিক সহায়তা কোথায় এবং কোনো স্থানীয় নেটওয়ার্ক কি বৃহত্তর কোনো দেশীয় বা আন্তর্জাতিক কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে কি না। এখানে সরকারের প্রতি কোনো রাজনৈতিক পক্ষপাতের প্রয়োজন নেই। বরং প্রয়োজন রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য।

বিএনপি সরকারকে সফল হতেই হবে। কারণ এটি কেবল বিএনপির সরকার নয়; এটি স্বৈরাচারবিরোধী বিপ্লব-উত্তর বাংলাদেশের সরকার। তার ব্যর্থতা মানে একটি দলের ব্যর্থতা নয়, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থার ব্যর্থতা। একইভাবে গোয়েন্দা সংস্থার সাফল্যও কোনো সরকারের রাজনৈতিক সম্পদ নয়; সেটি বাংলাদেশের জনগণের নিরাপত্তার সম্পদ।

১৭ আগস্টের পুনরাবৃত্তি যেন কোনোভাবেই না হয়, আমরা সবাই সেটা আশা করি। কিন্তু একজন পেশাদার নিরাপত্তা পরিকল্পনাকারী কখনো ‘হবে না’ ধরে পরিকল্পনা করেন না। তিনি প্রশ্ন করেন—যদি কেউ চেষ্টা করে, আমরা কত আগে তা জানতে পারব? এটাই আজকের মূল প্রশ্ন।

১৭ আগস্টের সবচেয়ে বড় শিক্ষা বোমার সংখ্যা নয়। শিক্ষা হলো, রাষ্ট্রকে তার শত্রুর চেয়ে কয়েক ধাপ আগে চিন্তা করতে হবে। আতঙ্ক নয়। ষড়যন্ত্রতত্ত্বও নয়। আবার আত্মতুষ্টিও নয়। প্রয়োজন প্রমাণভিত্তিক অনুসন্ধান, পেশাদার গোয়েন্দা সক্ষমতা, আন্তঃসংস্থা সমন্বয় এবং সর্বোপরি একটি সতর্ক ঐক্যবদ্ধ রাষ্ট্র। কারণ ইতিহাস কখনো হুবহু ফিরে আসে না। কিন্তু ইতিহাসের কৌশলগুলো নতুন মুখে ফিরে আসতে পারে।

কমোডর সৈয়দ মিসবাহ উদ্দিন আহমদ (অবসরপ্রাপ্ত): মহাপরিচালক, বাংলাদেশ মেরিটাইম রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউট (বিআইএমআরএডি)

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত

১৭ আগস্ট কি আবার ফিরে আসতে পারে