ডনের নিবন্ধ

বাংলাদেশ থেকে যে শিক্ষা নিতে পারে পাকিস্তান

ডনের নিবন্ধ

লেখা:
লেখা:
হ্যারিস খালিক

প্রকাশ : ১৬ জুন ২০২৬, ২২: ৩৭
এআই জেনারেটেড ছবি

২০২১ সালে বাংলাদেশ তার স্বাধীনতার ৫০ বছর উদযাপন করেছে। ইসলামাবাদে ঘটনাটি সাধারণত ‘ঢাকা পতন’ হিসেবে পরিচিত হলেও, ঢাকায় এটি ‘বাংলাদেশের মুক্তি’ বা স্বাধীনতা অর্জন হিসেবে স্মরণ করা হয়। সে সময় বাংলাদেশের রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিল এবং বছরব্যাপী নানা আয়োজন, অনুষ্ঠান ও কর্মসূচির মাধ্যমে দিবসটি ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনার সঙ্গে উদযাপন করে।

পাকিস্তানের কিছু গবেষক, শিক্ষাবিদ, সাবেক আমলা, অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা ও সাংবাদিক বছরের পর বছর ধরে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান এবং পশ্চিম পাকিস্তানের সঙ্গে তার টানাপোড়েনপূর্ণ সম্পর্ক নিয়ে বই ও স্মৃতিকথা লিখেছেন। সেই টানাপোড়েনপূর্ণ সম্পর্কের পরিণতিতেই ১৯৭১ সালে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ, ভারতের সামরিক হস্তক্ষেপ এবং অবিভক্ত পাকিস্তানের ভাঙন ঘটে। তবে ওই ঘটনার কারণ ও দায় অনুসন্ধানে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার যে হামুদুর রহমান কমিশন গঠন করেছিল, তার পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন আজও সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করা হয়নি।

এসব কারণে এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি হয়, যেখানে ক্ষমতাসীন মহলের মধ্যে বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিক, সাংবাদিক ও শিক্ষার্থীদের পাকিস্তান ভাঙনের কারণ, বিশ্লেষণ ও সেখান থেকে শিক্ষা নেওয়ার আগ্রহ ক্রমশ কমে যেতে দেখা যায়। দেশ ভাঙনের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে জনপরিসর বা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কোনো উল্লেখযোগ্য আত্মসমালোচনা বা রাজনৈতিক আলোচনা অনুষ্ঠিত হওয়ার সুযোগও দেওয়া হয়নি।

২০২১ সালে লাহোরের একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষাবিদ বাংলাদেশের জন্ম নিয়ে আলোচনা ও বিতর্কের জন্য একটি সম্মেলনের আয়োজন করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু পরে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নির্দেশে সেটি বাতিল করা হয়। অতীত থেকে শিক্ষা না নেওয়ার ফলে ভবিষ্যতের পথ আরও কঠিন হয়ে ওঠে এবং রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বিদ্যমান সমস্যাগুলোর সঙ্গেই আমাদের লড়াই চালিয়ে যেতে হয়।

এখনও পাকিস্তান ন্যায়সঙ্গত ও সমতাভিত্তিক সম্পদ বণ্টনের মাধ্যমে সরকার কাঠামো কার্যকরভাবে পরিচালনা করতে পারেনি। জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ম্যান্ডেটও পুরোপুরি গ্রহণ করা হয়নি। অর্থনৈতিক বৈষম্য কমানোর বিষয়টিও অগ্রাধিকার পায়নি, আর নাগরিকদের মৌলিক সেবা নিশ্চিত করার স্পষ্ট রাজনৈতিক সদিচ্ছাও দৃশ্যমান নয়।

১৯৭১ সালের ঘটনাবলি নিয়ে উর্দু বা পাকিস্তানের অন্যান্য ভাষায় লেখা বইয়ের সংখ্যা খুবই সীমিত। ইংরেজিতে লেখা কিছু বই পরে উর্দু ও সিন্ধি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। তবে মৌলিক ও অনূদিত সব মিলিয়ে এ ধরনের বইয়ের সংখ্যা এখনও হাতেগোনা। অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার সিদ্দিক সালিকের ম্যায়নে ঢাকা ডুবতে দেখা, আনোয়ার শহীদ খানের পদ্মা সুরখ হ্যায় এবং জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক আলি আহমেদ খানের জীবন এক কাহানি উর্দু ভাষায় প্রকাশিত এমন কয়েকটি বই, যেখানে ১৯৭১ সালের ঘটনাকে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে তুলে ধরা হয়েছে এবং পাঠকদের সে সময় সম্পর্কে ধারণা দেওয়া হয়েছে।

সাংবাদিক, গবেষক ও লেখকদের মতে, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ এবং পাকিস্তান ভাঙনের ইতিহাস নিয়ে পাকিস্তানে প্রকাশ্যে আলোচনা বা লেখালেখি খুবই সীমিত। আনোয়ার শহীদ খানের একটি বই প্রকাশের পর বহু বছর নিষিদ্ধ ছিল।

সাংবাদিক, গবেষক ও লেখকদের মতে, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ এবং পাকিস্তান ভাঙনের ইতিহাস নিয়ে পাকিস্তানে প্রকাশ্যে আলোচনা বা লেখালেখি খুবই সীমিত। আনোয়ার শহীদ খানের একটি বই প্রকাশের পর বহু বছর নিষিদ্ধ ছিল। মেজর ইশাক, ড. তারিক রহমান, রাসুল বখশ পালিজো এবং কর্নেল নাদির আলী তাদের মধ্যে অন্যতম, যারা উর্দু, সিন্ধি, পাঞ্জাবি বা ইংরেজিতে এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কথা বলেছেন বা লিখেছেন। ১৯৭১ সালের পর বাংলাদেশে কী ঘটেছে, সে বিষয়ে পাঠকদের জানাতে সক্ষম পাকিস্তানি লেখকদের রচনা ও নিবন্ধও খুব কম পাওয়া যায়।

এই প্রেক্ষাপটে সিন্ধি ভাষায় প্রকাশিত নাসির মেমন রচিত ‘বাংলাদেশ: বোহরান খান বোহরান তাঈন (বাংলাদেশ: সংকট থেকে সংকটে) বইটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। রোশনি পাবলিকেশন্স থেকে সম্প্রতি প্রকাশিত বইটি ১৯৭১ সালের আগের সময় থেকে শুরু করে ২০২৬ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের ইতিহাস, রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং সামাজিক-অর্থনৈতিক রূপান্তরের একটি বিস্তৃত বিবরণ তুলে ধরেছে।

পেশায় সিভিল ইঞ্জিনিয়ার নাসির মেমন মেহরান ইউনিভার্সিটি অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজিতে শিক্ষকতা করেছেন। পরে তিনি সামাজিক উন্নয়ন, জলবায়ু ন্যায়বিচার, সিন্ধু অববাহিকায় পানি সংরক্ষণ ও বণ্টন, করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং পাকিস্তানের উন্নয়ন ও পরিবেশবিষয়ক নীতির বিশ্লেষণে যুক্ত হন। তিনি একাধিক বইয়ের লেখক এবং সিন্ধি, উর্দু ও ইংরেজি ভাষার নিয়মিত কলাম লেখক।

সিন্ধু প্রদেশসহ পাকিস্তানের ছোট প্রদেশগুলোর নানা সমস্যার বিষয়ে মেমন দীর্ঘদিন ধরে সোচ্চার। তিনি পাকিস্তানের সংবিধানের চেতনা ও সরকার কাঠামোর ভিত্তিতে ন্যায়সঙ্গত শাসনব্যবস্থার পক্ষে মত দেন। ইতিহাস সম্পর্কে তাঁর গভীর জ্ঞান এবং সমসাময়িক রাজনৈতিক ও সামাজিক ঘটনাপ্রবাহ পর্যবেক্ষণের দক্ষতা তাঁকে বাংলাদেশ নিয়ে বই লেখার প্রতি আগ্রহী করে তোলে।

বইটিতে পাকিস্তানের শুরুর দিকের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনাবলি, বাংলা-উর্দু ভাষার বিতর্ক, পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং দেশের অস্থির গণতান্ত্রিক ইতিহাস বিশদভাবে আলোচিত হয়েছে। লেখকের মতে, এসব বিষয়ই পূর্ব পাকিস্তানে বঞ্চনার অনুভূতি তৈরি করে এবং শেষ পর্যন্ত বিচ্ছিন্নতার পথ প্রশস্ত করে।

শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর দল আওয়ামী লীগের পূর্ব পাকিস্তানের একক প্রতিনিধি হিসেবে উঠে আসার কারণগুলোও বইটিতে বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। ১৯৭০ সালের নির্বাচনের পর এবং ১৯৭১ সালের সামরিক অভিযানের সময় পশ্চিম পাকিস্তানের সামরিক নেতৃত্ব, বেসামরিক আমলাতন্ত্র ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভূমিকা সংক্ষেপে কিন্তু কার্যকরভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

বইটির একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো, বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা শেখ মুজিবুর রহমানের ক্ষমতায় আসার পর তাঁর রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও নীতিমালার পাশাপাশি আওয়ামী লীগের শাসনকাল এবং পরবর্তীকালে তাঁর কন্যা শেখ হাসিনার রাজনৈতিক নেতৃত্বকেও লেখক তুলনামূলক নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে বিশ্লেষণ করেছেন।

বইয়ের শেষ অংশে শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর বাংলাদেশের পরিস্থিতি এবং দেশটির সামনে থাকা বর্তমান চ্যালেঞ্জগুলো সম্পর্কেও আলোকপাত করা হয়েছে।

  • হ্যারিস খালিক: কবি ও প্রাবন্ধিক

(ডন থেকে অনুবাদ করেছেন কাজী নিশাত তাবাসসুম)

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত