ভারত–বাংলাদেশ সীমান্ত: কেন মৃত্যুকূপে পরিণত হচ্ছে সীমান্তরেখা

প্রকাশ : ১১ জুলাই ২০২৬, ১৭: ২১
বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত। ছবি: সংগৃহীত

৩১ মে, রাত। যশোরের শার্শা উপজেলার সাদিপুর সীমান্তের কাছে টহলরত বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সদস্যরা দেখতে পান, সীমান্তের কাঁটাতারের একটি অংশ কেটে ফেলা হয়েছে। ওপারে দাঁড়িয়ে ছিলেন অনেক মানুষ। তাদের মধ্যে নারী ও শিশুও ছিল। অভিযোগ, ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) তাদের সেখানে এনে বাংলাদেশের দিকে হাঁটতে নির্দেশ দেয়।

বিজিবি তাদের বাংলাদেশে প্রবেশ করতে দেয়নি। পরে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হলেও কোনো সমাধান হয়নি। ফলে অসহায় মানুষগুলোকে পুরো রাত কাটাতে হয় সীমান্তের কাঁটাতারঘেরা কাদাময় ‘নো ম্যানস ল্যান্ড’ এলাকায়।

দুই দেশের কেউই যেসব পরিবারকে নিজেদের নাগরিক হিসেবে স্বীকার করতে চায় না, সীমান্তে আটকে থাকা সেই মানুষগুলোর ছবি আজ ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের বর্তমান বাস্তবতাকে যেকোনো যৌথ বিবৃতির চেয়ে অনেক বেশি স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। আর এটি এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়।

বিজিবি জানিয়েছে, জুনের শুরুতে মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই তারা ভারতের দিক থেকে বাংলাদেশে জোরপূর্বক লোক পাঠানোর (পুশ-ইন) মতো অন্তত ১০টি পৃথক ঘটনা প্রতিহত করেছে। অন্যদিকে মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, চলতি বছরের প্রথম চার মাসে ভারতের বিএসএফের গুলিতে অন্তত চারজন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। মে মাসেই আরও চারজনের মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে তিনজন গুলিতে এবং একজন হেফাজতে মারা যান। এ তথ্য দিয়েছে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) এবং মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন।

দুই দেশের সরকার দীর্ঘদিন ধরে যে সীমান্তকে ‘বন্ধুত্বের সীমান্ত’ হিসেবে তুলে ধরেছে, সমালোচকদের মতে, সেই সীমান্ত এখন প্রাণহানির ঘটনায় উদ্বেগজনক এক অঞ্চলে পরিণত হচ্ছে।

কলকাতার রাজনৈতিক বাস্তবতা

এই পরিস্থিতির বড় একটি অংশের সঙ্গে বাংলাদেশের সরাসরি সম্পর্ক নেই। এটি ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ফল। মে মাসে পশ্চিমবঙ্গে প্রথমবারের মতো ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) সরকার গঠন করে। নির্বাচনী প্রচারে দলটি অবৈধ অভিবাসীদের শনাক্ত করে দেশ থেকে বের করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়। সমালোচকদের আশঙ্কা, এ ধরনের উদ্যোগে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র না থাকা ভারতীয় নাগরিক এবং বাংলাদেশি অভিবাসীদের মধ্যে পার্থক্য করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

এদিকে সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের জন্য নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সীমান্তবর্তী জমি বিএসএফের কাছে হস্তান্তরের কাজও চলছে। পাশাপাশি নদীপথের যেসব এলাকায় কাঁটাতারের বেড়া দেওয়া সম্ভব নয়, সেখানে কুমির ও বিষধর সাপ ছেড়ে দেওয়ার একটি প্রস্তাবও বিএসএফের পক্ষ থেকে আলোচনায় এসেছে।

নাগরিকত্ব বাছাইয়ের নামে রাজনৈতিক নিপীড়ন, ‘অনুপ্রবেশকারী’ ইস্যুকে ঘিরে রাজনৈতিক প্রচারণা, নাগরিকত্ব যাচাইয়ের অভিযান এবং কুমির বা সাপ ছাড়ার মতো বিতর্কিত প্রস্তাব সবই ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর নীতির প্রতিফলন। আর পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের ফলাফল রাজ্য সরকারকে বহিষ্কার বা ফেরত পাঠানোর মতো বিষয়গুলো নিয়ে আরও বেশি রাজনৈতিক প্রচারণা চালানোর নতুন সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে।

কলকাতার অভ্যন্তরীণ রাজনীতির বিষ এখন সীমান্ত পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়ছে এমন এক ভূখণ্ডে, যেখানে পৃথিবীর সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ ও জলাবদ্ধ সীমান্তাঞ্চলগুলোর একটি অবস্থিত।

তবে এটিও সত্য যে, বাংলাদেশের রাজনীতিতেও পরিবর্তন এসেছে। এখন ঢাকায় ক্ষমতায় রয়েছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন একটি নির্বাচিত সরকার। শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতি ও ভারতে চলে যাওয়ার পর যে অন্তর্বর্তী সরকার প্রায় ১৮ মাস দেশ পরিচালনা করেছিল, সেই অধ্যায়ের অবসান ঘটেছে।

এমন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নির্বাচিত হয়ে আসা সরকার যখন দিল্লিকে জানায় যে, জোরপূর্বক, পরিচয় যাচাই ছাড়া এবং গভীর রাতে মানুষকে সীমান্ত দিয়ে ঠেলে দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়, তখন সেই বক্তব্যের রাজনৈতিক গুরুত্বও ভিন্ন।

শেখ হাসিনার সরকারকে দীর্ঘদিন ধরেই সীমান্ত-সংক্রান্ত বিষয়ে ভারতের প্রতি অতিরিক্ত নমনীয় বলে মনে করা হতো। সীমান্তে একের পর এক নীরব অপমান মেনে নেওয়ার কারণে দুই দেশের সম্পর্ক দেশের অভ্যন্তরে ক্রমেই বিতর্কিত হয়ে ওঠে।

অন্যদিকে, বর্তমান সরকার এমন এক জনমতের ভিত্তিতে ক্ষমতায় এসেছে, যেখানে শেখ হাসিনার সেই নমনীয় অবস্থানের স্মৃতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। পাশাপাশি সরকার তাদের পররাষ্ট্রনীতির মূলনীতি হিসেবে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’-এর কথা বলেছে। তাই এই পরিস্থিতিতে নিষ্ক্রিয় থাকার সুযোগ তাদের নেই।

বাংলাদেশ কোনো প্রকার বৈরিতা সৃষ্টি না করে সুষ্ঠু সমাধানের দাবি করে। কারণ দেশের জনগণ যে সরকারকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেছে, তাদের প্রত্যাশা বহু বছর ধরে চলতে থাকা এই দুঃখজনক ও অমানবিক পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটবে। তারা এমন একটি নীতি দেখতে চায়, যা আগের ব্যর্থতার পুনরাবৃত্তি করবে না।

এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য প্রয়োজনীয় আইনি কাঠামো বহু আগেই তৈরি হয়েছে। কয়েক দশকের দ্বিপক্ষীয় চুক্তি, বিশেষ করে ২০১১ সালের সমন্বিত সীমান্ত ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা অনুযায়ী, কাউকে ফেরত পাঠানোর আগে উভয় দেশকে যাচাইকৃত নামের তালিকা বিনিময় করতে হবে, নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় নাগরিকত্ব নিশ্চিত করতে হবে এবং শুধু অনুমোদিত সীমান্ত চেকপোস্ট দিয়েই প্রত্যাবাসন সম্পন্ন করতে হবে।

কিন্তু বাস্তবে যা ঘটছে, তা অনেকটাই অতর্কিতভাবে মানুষকে সীমান্তের ওপারে জোরপূর্বক পাঠিয়ে দেওয়ার মতো। গভীর রাতে, অনেক ক্ষেত্রে বলপ্রয়োগ করে, কোনো তালিকা বিনিময় ছাড়াই এবং নিজের পরিচয় বা নাগরিকত্ব নিয়ে আপত্তি জানানোর সুযোগ না দিয়েই মানুষকে সীমান্ত পার করানো হচ্ছে।

এদের মধ্যে কেউ কেউ হয়তো সত্যিই বাংলাদেশের নাগরিক। কিন্তু বিশ্বস্ত বিভিন্ন সূত্র বলছে, অনেকেই ভারতের নাগরিক, কেউ কেউ আবার বহু বছর ধরে ভারতে বসবাসরত রোহিঙ্গা, যাদের বাংলাদেশের নাগরিকত্বের কোনো প্রমাণ নেই। একটি আইনি প্রক্রিয়াকে যদি শুধু রাতের অন্ধকারে মানুষ সরিয়ে দেওয়ার প্রশাসনিক কাজ হিসেবে দেখা হয়, তাহলে এর ভয়াবহ পরিণতি দেখা দেয়। কেউ নদী পার হতে গিয়ে প্রাণ হারায়, কেউ দিনের পর দিন সীমান্তের খোলা প্রান্তরে মানবেতর অবস্থায় আটকে থাকে।

সীমান্তে মৃত্যুর ঘটনাগুলোকে কেবল অভিবাসন ব্যবস্থাপনার সাধারণ সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না। এগুলো স্পষ্টভাবে হত্যাকাণ্ড হিসেবেই উল্লেখ করা উচিত। ২০১১ সালে কাঁটাতারের বেড়ায় ঝুলন্ত অবস্থায় ১৫ বছর বয়সী ফেলানী খাতুনের মৃত্যু বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তুলেছিল। কারণ ঘটনাটি কোনো বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা নয়, বরং দীর্ঘদিনের একটি ধারাবাহিক বাস্তবতার প্রতীক হয়ে উঠেছিল। এরপর ঢাকায় একের পর এক সরকার বদলালেও সেই পরিস্থিতির খুব একটা পরিবর্তন হয়নি।

যৌথ টহল ও গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ের চুক্তি অবশ্যই ইতিবাচক। কিন্তু সীমান্তে প্রতিটি মৃত্যুর নিরপেক্ষ তদন্ত, তদন্তের ফল প্রকাশ এবং দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনার প্রতিশ্রুতি ছাড়া এসব উদ্যোগ কার্যকর হবে না। শুধু তদন্তের ঘোষণা দিয়ে পরে নীরবে ফাইল বন্ধ করে দিলে সমস্যার সমাধান হবে না।

আলোচনা হয়েছে, কিন্তু সমাধান হয়নি

এ মাসে দিল্লিতে অনুষ্ঠিত বিজিবি-বিএসএফ মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠককে গুরুত্ব দিলেও সেটি সমস্যার চূড়ান্ত সমাধান নয়। ৫৭তম বিজিবি-বিএসএফ সম্মেলনে যৌথ টহল জোরদার, তাৎক্ষণিক গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং সীমান্তে উভয় পক্ষের মৃত্যুর ঘটনা তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।

সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে সমন্বয় বাড়লে মাঠপর্যায়ে বিভ্রান্তি কমবে এবং বিশৃঙ্খল সীমান্ত পারাপারের ঘটনাও কিছুটা হ্রাস পেতে পারে। তবে তদন্তের প্রতিশ্রুতি আর তদন্তের ফল প্রকাশ দুটি এক বিষয় নয়। অতীতেও এ ধরনের অনেক প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও তার বাস্তবায়ন হয়নি।

এ ছাড়া ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাস্তবতাও বিবেচনায় নিতে হবে। সীমান্তে কথিত ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’ ফেরত পাঠানোর বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক প্রচারণা চালানোর যে প্রবণতা রয়েছে, তার উৎস সীমান্ত নিরাপত্তা নীতি নয়, কলকাতাকেন্দ্রিক নির্বাচনী রাজনীতি।

এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের উচিত ভারতের কাছে বাস্তবসম্মত ও নির্দিষ্ট দাবি তোলা। প্রত্যেক প্রত্যাবাসন যেন নির্ধারিত ও যাচাইযোগ্য সরকারি প্রক্রিয়ায় হয়, প্রক্রিয়া সম্পন্নের পূর্বেই যেন নামের তালিকা বিনিময় করা হয়, শুধু স্বীকৃত সীমান্ত চেকপোস্ট ব্যবহার করে এবং কখনোই রাতের অন্ধকারে বা কাঁটাতারের ফাঁক দিয়ে কাউকে সীমান্ত পার না করা হয়। প্রতিটি সীমান্ত হত্যাকাণ্ডের পর শুধু আনুষ্ঠানিক দুঃখ প্রকাশ করলেই চলবে না। প্রতিটি ঘটনার যৌথ তদন্ত হতে হবে, নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে সেই তদন্ত শেষ করতে হবে এবং তার ফলাফল জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে।

একই সঙ্গে বাংলাদেশের উচিত সীমান্তে বাহিনীর আচরণকে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের সঙ্গে যুক্ত করা। যেমন ট্রানজিট সুবিধা, পানি বণ্টন এবং বাণিজ্য। সীমান্ত নিরাপত্তাকে আলাদা একটি বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না, বরং কূটনৈতিক সম্পর্কের প্রতিটি ক্ষেত্রেই এ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরতে হবে।

বাংলাদেশ কোনো প্রকার বৈরিতা সৃষ্টি না করে সুষ্ঠু সমাধানের দাবি করে। কারণ দেশের জনগণ যে সরকারকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেছে, তাদের প্রত্যাশা বহু বছর ধরে চলতে থাকা এই দুঃখজনক ও অমানবিক পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটবে। তারা এমন একটি নীতি দেখতে চায়, যা আগের ব্যর্থতার পুনরাবৃত্তি করবে না।

ধানক্ষেত, নদীর চর ও বিস্তীর্ণ গ্রামীণ এলাকা পেরিয়ে যাওয়া এই সীমান্ত শুধু কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব নয়। বাস্তবতাকে অস্বীকার করে কঠোর নিরাপত্তানীতির ওপর নির্ভর করলে সীমান্ত পারাপার কমে না, এতে প্রাণহানি বাড়ে এবং বহু পরিবার সীমান্তে মানবিক সংকটে পড়ে।

যৌথ টহল চুক্তি ভালো একটি উদ্যোগ হতে পারে। তবে এটি কতটা কাজে আসবে, তা নির্ভর করবে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বকে কতটা সম্মান করে তার ওপর। তাই সীমান্তে কোনো প্রাণহানির ঘটনা ঘটার পরই শুধু নয়, ভারতের সঙ্গে প্রতিটি বৈঠকেই এই বিষয়টি স্পষ্ট ও নিয়মিতভাবে আলোচনা করা উচিত।

(এশিয়া টাইমস থেকে অনুবাদ করেছেন কাজী নিশাত তাবাসসুম)

Ad 300x250

সম্পর্কিত