চট্টগ্রামের বিপর্যয়: সতর্কবার্তা বাংলাদেশের জন্য

প্রকাশ : ১০ জুলাই ২০২৬, ২২: ১৫
সম্পাদকীয় প্রতীকী ছবি। স্ট্রিম গ্রাফিক

চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির পাহাড়ি জনপদ কয়েক দিন ধরে যা প্রত্যক্ষ করছে, তা পুঞ্জীভূত অবহেলার ফল। সেখানে পাহাড়ধস ও পানিতে ডুবে পাঁচ দিনে অন্তত ৩৩ প্রাণহানি হয়েছে, যার বড় অংশ আবার কক্সবাজারে রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরের বাসিন্দা। সাতকানিয়ার প্রায় আশি শতাংশ পানির নিচে; বৃহত্তর চট্টগ্রামে পানিবন্দী মানুষ পাঁচ লাখ। কক্সবাজার-চট্টগ্রাম রেলপথ তলিয়ে গিয়েছিল, সাজেকে আটকা শত শত পর্যটক। পরীক্ষা স্থগিত হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী দুর্যোগ মোকাবিলায় ১০ দফা নির্দেশনা দিয়েছেন। দুর্গত একজনও যেন সহায়তার বাইরে না থাকে, সেই নির্দেশ রয়েছে। পাহাড়ধসের ঝুঁকিতে থাকাদের জন্য নিরাপদ আবাসন গড়ার প্রতিশ্রুতিও এসেছে। ফেনী জেলা প্রশাসন আশ্রয়কেন্দ্র ও ত্রাণসামগ্রী প্রস্তুত রেখে যে দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছে, তা অন্যান্য জেলায় অনুসরণযোগ্য। তবে প্রশ্ন হলো, ওইসব নির্দেশনা কতটা কার্যকর হয় আর কতটা থেকে যায় কাগজে-কলমে। অভিজ্ঞতা বলে, ত্রাণ বরাদ্দ ও তাৎক্ষণিক নির্দেশনা প্রতিবারই আসে; কিন্তু বর্ষা শেষ হলেই পাহাড় কাটা বন্ধে কঠোরতা, ঝুঁকিপূর্ণ বসতি স্থানান্তর কিংবা দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামো সংস্কারের গতি শ্লথ হয়ে যায়।

উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে মাদ্রাসার দেয়াল-সংলগ্ন পাহাড়ের অংশ ধসে একাধিক কিশোরীর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী বাদেও জেলায় অন্তত দুই লাখ মানুষ নাকি পাহাড়ধসের ঝুঁকিতে। আর ক্যাম্পের ভেতরে ঝুঁকিগ্রস্তের সংখ্যা তার চেয়ে বেশি। এই দুর্যোগ একটি প্রশ্ন সামনে আনে, যা প্রতিবার ভুলে যাই। তা হলো, পাহাড় কাটা, বন উজাড় ও অপরিকল্পিত বসতি নির্মাণ বন্ধ না করে আমরা আর কত মানুষ হারাব?

সংকটটি শুধু চট্টগ্রাম অঞ্চলে সীমাবদ্ধ নয়। বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র সতর্ক করেছে, উজানের ভারী বৃষ্টিতে চলতি জুলাই-আগস্টে ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা অববাহিকায় ব্যাপক বন্যার শঙ্কা রয়েছে। এ সময়টিতেই ১৯৮৮ ও ১৯৯৮ সালের বড় বন্যাগুলো আঘাত হেনেছিল। ১৯৮৮ সালে দেশের প্রায় ষাট শতাংশ প্লাবিত হয় আর ১৯৯৮ সালের বন্যায় প্রাণ হারায় হাজারো মানুষ; বাস্তুচ্যুত প্রায় তিন কোটি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনার পানি একই সময়ে সর্বোচ্চ প্রবাহে পৌঁছালে ঝুঁকি অনেক বাড়ে। ইতিমধ্যে ফেনীতেও নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত এবং প্রশাসন আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখছে। অর্থাৎ চট্টগ্রামের বিপর্যয়টি একটি দীর্ঘ, বিপজ্জনক মৌসুমের সূচনা বলা যায়।

সরকারের ঘোষিত পদক্ষেপগুলোকে বাস্তবে রূপ দিতে কয়েকটি বিষয়ে বাড়তি মনোযোগ প্রয়োজন। প্রথমত, পাহাড়ধসের ঝুঁকিতে থাকা পরিবারগুলোর জন্য নিরাপদ আবাসন প্রকল্পের সুনির্দিষ্ট সময়সীমা ও অগ্রগতি প্রতিবেদন প্রকাশ করা উচিত, যাতে বর্ষা পেরিয়ে গেলেও বিষয়টি না হারায়। দ্বিতীয়ত, পাহাড় কাটা বন্ধে আইনের প্রয়োগ দুর্যোগকালীন অভিযানে সীমাবদ্ধ না রেখে সারা বছর ধারাবাহিকভাবে পরিচালনা করতে হবে। তৃতীয়ত, ত্রাণ বণ্টনে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির বাস্তবায়ন হচ্ছে কিনা, তা যাচাইয়ে স্বাধীন পর্যবেক্ষণ দরকার। চতুর্থত, আবহাওয়ার পূর্বাভাস সরাসরি ঝুঁকিপূর্ণ বাসিন্দাদের কাছে মাইকিং, মুঠোফোন বার্তা ও স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পৌঁছাতে হবে। ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা অববাহিকায় বন্যার সতর্কতা মাথায় রেখে উত্তরবঙ্গ আর হাওর অঞ্চলেও এখনই প্রস্তুতি জরুরি। পঞ্চমত, দীর্ঘমেয়াদে নদী খনন, বাঁধ সংস্কার ও জলাধার ব্যবস্থাপনায় বিনিয়োগ বাড়ানো এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে অভিন্ন নদীর তথ্য বিনিময় জোরদার করা প্রয়োজন।

প্রতিবছর বর্ষা এলেই আমরা দেখি— জরুরি নির্দেশনা, ত্রাণ বিতরণ ইত্যাদি। তার পরের বর্ষা পর্যন্ত বিষয়টি বিস্মৃত। এবারের ঘোষিত উদ্যোগগুলো যেন দীর্ঘস্থায়ী নীতিতে রূপ পায়, সেদিকে দৃষ্টি দিতে হবে। তাহলেই আগামী বর্ষাগুলোয় ভিন্ন কিছু দেখার আশা করা যাবে। নইলে প্রতিশ্রুতি আর বাস্তবতার ব্যবধান থেকেই যাবে আর প্রতিবছর আমরা কেবল সংখ্যার হেরফের দেখব।

Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত