প্রাণিকুল ও উদ্ভিদ রক্ষায় ‘জিন পুল’ হতে পারে রক্ষাকবচ

ড. বিভূতি ভূষণ মিত্র
ড. বিভূতি ভূষণ মিত্র

প্রকাশ : ২৫ জুন ২০২৬, ১২: ৫২
স্ট্রিম গ্রাফিক্স

‘জীববৈচিত্র্য’ শব্দটি আমাদের দৈনন্দিন আলাপে ব্যবহৃত হলেও এর বিস্তৃতি মোটেও ক্ষুদ্র নয়। খালি চোখে না দেখা অণুজীব থেকে শুরু করে কীটপতঙ্গ, সুবিশাল বৃক্ষরাজি এবং প্রাণিকুল—সবকিছুই এর অন্তর্ভুক্ত। ১৯৮৬ সালে ওয়াল্টার জি রোজেন সর্বপ্রথম ‘বায়োডাইভার্সিটি’ বা জীববৈচিত্র্য শব্দটি ব্যবহার করেন। তিনি এর মাধ্যমে পৃথিবীতে বিরাজমান সকল ধরনের জীবের বৈচিত্র্যকে বুঝিয়েছেন, যার ব্যাপ্তি জিন থেকে শুরু করে সমগ্র বাস্তুতন্ত্র পর্যন্ত বিস্তৃত। পরবর্তীতে এই ধারণাটি আরও বিস্তৃতি লাভ করে।

জীববৈচিত্র্যকে মূলত তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়। প্রথমটি হলো প্রজাতিগত বৈচিত্র্য, যা দুই বা ততোধিক প্রজাতির উদ্ভিদ ও প্রাণীর মধ্যকার পার্থক্যকে নির্দেশ করে। দ্বিতীয়টি হলো বাস্তুতান্ত্রিক জীববৈচিত্র্য, যা বিভিন্ন পরিবেশের বাস্তুতন্ত্রের মধ্যকার পার্থক্য বা ভিন্নতাকে বোঝায়। আর তৃতীয়টি হলো জিনগত বৈচিত্র্য।

প্রতিটি প্রজাতি যেসব কোষ দ্বারা গঠিত, তার নিউক্লিয়াসে থাকা ক্রোমোজোমের ভেতরের উপাদানই হলো জিন। এই জিনই বিভিন্ন প্রজাতির আকার, আকৃতি, গায়ের রঙ, চুলের বর্ণ ইত্যাদি বৈশিষ্ট্যে পার্থক্য গড়ে দেয়। জিনের এই ভিন্নতার কারণেই মূলত জিনগত বৈচিত্র্যের সৃষ্টি হয়। উদ্ভিদ ও প্রাণীর এই জিনগত ভিন্নতাই হলো জিনগত জীববৈচিত্র্য। যেসব প্রজাতির জিনগত বৈচিত্র্য বেশি, পৃথিবীতে তাদের টিকে থাকার মেয়াদও তত দীর্ঘ হয়, কারণ তাদের অভিযোজন ক্ষমতা তুলনামূলকভাবে বেশি থাকে। বিপরীতে, যেসব প্রাণীর জিনগত বৈচিত্র্য কম, তারা সর্বদাই অস্তিত্বের হুমকিতে থাকে। তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায় এবং বিলুপ্ত হওয়ার আশঙ্কা বৃদ্ধি পায়।

কোনো একটি নির্দিষ্ট প্রজাতির মধ্যে উপস্থিত সকল জিনের সমষ্টিকে ‘জিন পুল’ বলা হয়। এই জিন পুল যত বিশাল হবে, সংশ্লিষ্ট প্রজাতির জিনগত বৈচিত্র্যও তত বেশি হবে। আর জিনগত বৈচিত্র্য যত সমৃদ্ধ হবে, প্রতিকূল পরিবেশ মোকাবিলার সক্ষমতাও তাদের তত বাড়বে। ১৯২০ সালে রাশিয়ান জিন প্রকৌশলী আলেকজান্ডার সের্গেইভিচ সর্বপ্রথম ‘জিনফন্ড’ শব্দটি ব্যবহার করেন। পরবর্তীতে বিজ্ঞানী থিওডোসিয়াস ডবঝানস্কি এর নামকরণ করেন ‘জিন পুল’। সহজ কথায়, জিন পুল বলতে কোনো একটি নির্দিষ্ট জীব-গোষ্ঠীর মধ্যে বিদ্যমান জিনগত তথ্যের ভাণ্ডারকে বোঝায়, যা উদ্ভিদ, প্রাণী এবং মানুষ—সবার ক্ষেত্রেই সমভাবে প্রযোজ্য।

কোনো একটি নির্দিষ্ট প্রজাতির মধ্যে উপস্থিত সকল জিনের সমষ্টিকে ‘জিন পুল’ বলা হয়। এই জিন পুল যত বিশাল হবে, সংশ্লিষ্ট প্রজাতির জিনগত বৈচিত্র্যও তত বেশি হবে। আর জিনগত বৈচিত্র্য যত সমৃদ্ধ হবে, প্রতিকূল পরিবেশ মোকাবিলার সক্ষমতাও তাদের তত বাড়বে।

সম্প্রতি আন্তর্জাতিক জীববৈচিত্র্য দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ বন বিভাগের সাবেক প্রধান বন সংরক্ষক ইশতিয়াক উদ্দিন আহমেদ মন্তব্য করেছেন, জীববৈচিত্র্য রক্ষা ও পরিবেশ সংরক্ষণের স্বার্থে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে জরুরি ভিত্তিতে জিন পুল গড়ে তোলা প্রয়োজন। গণমাধ্যমে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, জিন পুল হলো কোনো নির্দিষ্ট প্রাণী, উদ্ভিদ বা কীটপতঙ্গের সকল প্রকার জিনগত উপাদানের সমষ্টি। এটি একটি প্রজাতির সামগ্রিক জিনগত বৈচিত্র্যের প্রতিনিধিত্ব করে, যা প্রাকৃতিক নির্বাচন ও বিবর্তনের মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। অন্যদিকে, ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচার (আইইউসিএন) বাংলাদেশের প্রোগ্রাম ম্যানেজার এ.বি.এম. সরওয়ার আলম বলেন, দেশের জীববৈচিত্র্য নানামুখী হুমকির সম্মুখীন এবং অনেক প্রজাতি সংকরায়ণের শিকার হচ্ছে। তাই বন্যপ্রাণী, উদ্ভিদ ও কীটপতঙ্গ সংরক্ষণে জিন পুল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। জিন পুল রক্ষার অর্থই হলো একটি নির্দিষ্ট প্রজাতির মধ্যে জিনগত বৈচিত্র্য বজায় রাখা, যা ইন-সিটু এবং এক্স-সিটু—এই দুই পদ্ধতিতেই করা সম্ভব।

বাংলাদেশে ইন-সিটু এবং এক্স-সিটু—উভয় পদ্ধতিতেই জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ করা হয়ে থাকে। ইন-সিটু পদ্ধতি হলো কোনো জীবকে তার মূল বাসস্থানে, অর্থাৎ নিজস্ব প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্রের মাঝেই সংরক্ষণ করা। এর বিপরীতে, মূল বাসস্থানের বাইরে কৃত্রিম পরিবেশে উদ্ভিদ বা প্রাণীকে সংরক্ষণ করার প্রক্রিয়াকে এক্স-সিটু সংরক্ষণ বলা হয়।

ইন-সিটু পদ্ধতিতে সংরক্ষণের প্রধান মাধ্যমগুলো হলো—জাতীয় উদ্যান, ইকোপার্ক, সাফারি পার্ক, অভয়ারণ্য এবং মৎস্য অভয়াশ্রম। বাংলাদেশে ভাওয়াল, হিমছড়ি, মধুপুর ও রামসাগরের মতো বেশ কয়েকটি জাতীয় উদ্যান রয়েছে। চট্টগ্রাম ও মৌলভীবাজারে রয়েছে ইকোপার্ক। এছাড়া, ডুলহাজারা ও শ্রীপুরে সাফারি পার্ক গড়ে তোলা হয়েছে। পাশাপাশি টাঙ্গুয়ার হাওর, হাকালুকি হাওর, হালদা নদী প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য মৎস্য ও বন্যপ্রাণী অভয়াশ্রম হিসেবে সংরক্ষিত। অন্যদিকে, এক্স-সিটু সংরক্ষণ পদ্ধতির অন্তর্ভুক্ত রয়েছে বোটানিক্যাল গার্ডেন, সিড ব্যাংক (বীজ ব্যাংক), জিন ব্যাংক এবং ডিএনএ ও পরাগরেণু সংরক্ষণ কেন্দ্র।

বাংলাদেশের জীববৈচিত্র্য বলতে কেবল বনাঞ্চলের উদ্ভিদ ও প্রাণীকেই বোঝায় না; বরং সুবিশাল বাস্তুসংস্থানের প্রতিটি উপাদানই এর অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই উপাদানের মধ্যে যেমন জালের মতো ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য নদ-নদী রয়েছে, তেমনি রয়েছে হাওর-বাঁওড় ও খাল-বিল। সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগার বা হরিণ থেকে শুরু করে দেশে বিদ্যমান ১৬০০-এর বেশি প্রজাতির মেরুদণ্ডী প্রাণী, ৬২৮ প্রজাতির পাখি, ৭০৮ প্রজাতির মাছ, ১১৩ প্রজাতির স্তন্যপায়ী এবং ২২ প্রজাতির উভচর প্রাণীও এই জীববৈচিত্র্যের অন্তর্ভুক্ত। এর পাশাপাশি রয়েছে আর্থ্রোপোডা পর্বের অগণিত কীটপতঙ্গ এবং বিচিত্র সব উদ্ভিদ প্রজাতি। এই বৈচিত্র্যময় প্রাণী ও উদ্ভিদজগতের ওপর বাংলাদেশের ষড়ঋতুর প্রভাবও অনস্বীকার্য। বস্তুত, বাস্তুসংস্থান বলতে শুধু বন বা সমুদ্রের পরিবেশকে বোঝায় না; গ্রাম বা শহরে দৃশ্যমান প্রাণী ও উদ্ভিদ এবং পুকুর, নদীসহ অন্যান্য প্রাকৃতিক জলাধারও বাস্তুসংস্থানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

সম্প্রতি ‘বাংলাদেশের উদ্ভিদের লাল তালিকা’ শীর্ষক একটি বই প্রকাশিত হয়েছে, যেখানে ১০০০টি উদ্ভিদ প্রজাতির অবস্থা তুলে ধরা হয়েছে। এই তালিকা অনুযায়ী, দেশের ৭টি প্রজাতির উদ্ভিদ ইতোমধ্যে সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে গেছে। ন্যূনতম বিপদগ্রস্ত হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে ২৭১টি প্রজাতি এবং বিপদাপন্ন অবস্থায় রয়েছে ৩৯৫টি প্রজাতি। এর মধ্যে ৫টি প্রজাতি ‘মহাবিপন্ন’ অবস্থায় রয়েছে। বিপন্ন ও সংকটাপন্ন হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়েছে যথাক্রমে ১২৭টি ও ২৬৩টি উদ্ভিদ প্রজাতি। বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া প্রজাতিগুলোর মধ্যে রয়েছে ফিতাচাঁপা, কুড়াজিরি, ভানু দেয়পাত, গোলা অঞ্জন, সাত সারিলা, থার্মা জাম ও মাইট্রাসিস। আর মহাবিপন্ন প্রজাতিগুলো হলো—বাঁশপাতা, বনখেজুর, বালবোরক্স, লম্বা ট্রায়াস অর্কিড ও বলগাছ। এখনই যথাযথ সংরক্ষণের উদ্যোগ না নিলে এই পাঁচটি প্রজাতিও অচিরেই বিলুপ্তির মুখে পতিত হবে।

দেশের জীববৈচিত্র্য নানামুখী হুমকির সম্মুখীন এবং অনেক প্রজাতি সংকরায়ণের শিকার হচ্ছে। তাই বন্যপ্রাণী, উদ্ভিদ ও কীটপতঙ্গ সংরক্ষণে জিন পুল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। জিন পুল রক্ষার অর্থই হলো একটি নির্দিষ্ট প্রজাতির মধ্যে জিনগত বৈচিত্র্য বজায় রাখা, যা ইন-সিটু এবং এক্স-সিটু—এই দুই পদ্ধতিতেই করা সম্ভব।

আইইউসিএন-এর ২০১৫ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে বিলুপ্ত প্রাণী প্রজাতির সংখ্যা ৩১টি। ১৬০০ প্রাণী প্রজাতির মধ্যে ৩৯০টিই চরম হুমকির সম্মুখীন এবং ৫০টির বেশি প্রজাতি মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে। ২০০০ ও ২০১৫ সালের আইইউসিএন প্রতিবেদনের তুলনামূলক বিশ্লেষণে বিলুপ্তির এক ভয়াবহ চিত্র ফুটে ওঠে। ২০০০ সালে যেখানে বিলুপ্ত প্রাণীর সংখ্যা ছিল ১৩টি, সেখানে মাত্র ১৫ বছরের ব্যবধানে আরও ১৮টি প্রাণী প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে গেছে, যা বিলুপ্তির এক উদ্বেগজনক হারকে নির্দেশ করে।

বাংলাদেশ থেকে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া প্রাণীর তালিকায় রয়েছে—ডোরাকাটা হায়েনা, ধূসর নেকড়ে, নীলগাই, সুমাত্রা গণ্ডার, জাভা গণ্ডার, ভারতীয় গণ্ডার, শিঙা হরিণ (বারশিঙা) এবং মন্থর ভাল্লুক। অন্যদিকে, আইইউসিএন-এর মহাবিপন্ন প্রাণীর তালিকায় রয়েছে—হাতি, ভোঁদড়, রয়েল বেঙ্গল টাইগার, চিতা বাঘ, বনরুই, উল্লুক, চশমাপরা হনুমান, বনগরু (গৌর), সাম্বার হরিণ, কাঠবিড়ালি এবং কালো ভাল্লুক।

বর্তমান এই উদ্বেগজনক পরিস্থিতিতে, বাংলাদেশে বিলুপ্তপ্রায় এবং হুমকির সম্মুখীন উদ্ভিদ ও প্রাণী প্রজাতির জিন পুল সংরক্ষণ করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। যেসব উদ্ভিদ প্রজাতি হুমকির মুখে রয়েছে, অতিসত্ত্বর তাদের শনাক্ত করতে হবে। একইসঙ্গে, যেসব আগ্রাসী উদ্ভিদের কারণে দেশীয় প্রজাতিগুলো হুমকির সম্মুখীন, তাদের চিহ্নিত করে নিয়ন্ত্রণের কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। কৃষিজ সম্পদ রক্ষায় শস্যের জিন ব্যাংক গড়ে তোলা প্রয়োজন। দেশে বিদ্যমান সাফারি পার্ক ও ইকোপার্কগুলোতে বিলুপ্তপ্রায় প্রাণী সংরক্ষণের সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

জিন পুল সমৃদ্ধ করার লক্ষ্যে একই প্রজাতির অন্যান্য সদস্য এনে নতুন জিনোম তৈরির উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। পাশাপাশি, স্থানীয় ও বহিরাগত প্রজাতির মধ্যে নিয়ন্ত্রিত সংকরায়ণ ঘটানো এবং প্রাকৃতিক উপায়ে উদ্ভিদ ও প্রাণী সংরক্ষণের মাধ্যমেও জিন পুলের ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব। এভাবে জিন পুলের সমৃদ্ধি ও যথাযথ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমেই জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে এক যুগান্তকারী ভূমিকা রাখা সম্ভব।

  • লেখক: পরিবেশ বিষয়ক গবেষক
Ad 300x250

সম্পর্কিত