প্রাণিকুল ও উদ্ভিদ রক্ষায় ‘জিন পুল’ হতে পারে রক্ষাকবচ

স্ট্রিম গ্রাফিক্স

‘জীববৈচিত্র্য’ শব্দটি আমাদের দৈনন্দিন আলাপে ব্যবহৃত হলেও এর বিস্তৃতি মোটেও ক্ষুদ্র নয়। খালি চোখে না দেখা অণুজীব থেকে শুরু করে কীটপতঙ্গ, সুবিশাল বৃক্ষরাজি এবং প্রাণিকুল—সবকিছুই এর অন্তর্ভুক্ত। ১৯৮৬ সালে ওয়াল্টার জি. রোজেন সর্বপ্রথম ‘বায়োডাইভার্সিটি’ বা জীববৈচিত্র্য শব্দটি ব্যবহার করেন। তিনি এর মাধ্যমে পৃথিবীতে বিরাজমান সকল ধরনের জীবের বৈচিত্র্যকে বুঝিয়েছেন, যার ব্যাপ্তি জিন থেকে শুরু করে সমগ্র বাস্তুতন্ত্র পর্যন্ত বিস্তৃত। পরবর্তীতে এই ধারণাটি আরও বিস্তৃতি লাভ করে।

জীববৈচিত্র্যকে মূলত তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়। প্রথমটি হলো প্রজাতিগত বৈচিত্র্য, যা দুই বা ততোধিক প্রজাতির উদ্ভিদ ও প্রাণীর মধ্যকার পার্থক্যকে নির্দেশ করে। দ্বিতীয়টি হলো বাস্তুতান্ত্রিক জীববৈচিত্র্য, যা বিভিন্ন পরিবেশের বাস্তুতন্ত্রের মধ্যকার পার্থক্য বা ভিন্নতাকে বোঝায়। আর তৃতীয়টি হলো জিনগত বৈচিত্র্য।

প্রতিটি প্রজাতি যেসব কোষ দ্বারা গঠিত, তার নিউক্লিয়াসে থাকা ক্রোমোজোমের ভেতরের উপাদানই হলো জিন। এই জিনই বিভিন্ন প্রজাতির আকার, আকৃতি, গায়ের রঙ, চুলের বর্ণ ইত্যাদি বৈশিষ্ট্যে পার্থক্য গড়ে দেয়। জিনের এই ভিন্নতার কারণেই মূলত জিনগত বৈচিত্র্যের সৃষ্টি হয়। উদ্ভিদ ও প্রাণীর এই জিনগত ভিন্নতাই হলো জিনগত জীববৈচিত্র্য। যেসব প্রজাতির জিনগত বৈচিত্র্য বেশি, পৃথিবীতে তাদের টিকে থাকার মেয়াদও তত দীর্ঘ হয়, কারণ তাদের অভিযোজন ক্ষমতা তুলনামূলকভাবে বেশি থাকে। বিপরীতে, যেসব প্রাণীর জিনগত বৈচিত্র্য কম, তারা সর্বদাই অস্তিত্বের হুমকিতে থাকে। তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায় এবং বিলুপ্ত হবার আশঙ্কা বেশি থাকে।

কোনো একটি নির্দিষ্ট প্রজাতিতে উপস্থিত সকল জিনের সমষ্টিকেই ‘জিন পুল’ বলা হয়। একটি প্রজাতির জিন পুল যত বড় হবে, তার জিনগত বৈচিত্র্যও তত বেশি হবে। আর জিনগত বৈচিত্র্য যত বেশি তারা প্রতিকূলতা তত ভালোভাবে মোকাবিলা করতে পারবে। ১৯২০ সালে রাশিয়ান জিন প্রকৌশলী আলেক্সান্দার সেগ্রিভিচ সর্বপ্রথম ‘জিনফোল্ড’ শব্দটি ব্যবহার করেন। পরবর্তীতে বিজ্ঞানী থিওডোসিয়াস এর নাম দেন ‘জিন পুল’। সহজ কথায়, জিন পুল বলতে একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিদ্যমান সামগ্রিক জিনগত তথ্যকে বোঝায়। এই ধারণা উদ্ভিদ, প্রাণী এবং মানুষ—সবার জন্যই সমভাবে প্রযোজ্য।

কোনো একটি নির্দিষ্ট প্রজাতির মধ্যে উপস্থিত সকল জিনের সমষ্টিকে ‘জিন পুল’ বলা হয়। এই জিন পুল যত বিশাল হবে, সংশ্লিষ্ট প্রজাতির জিনগত বৈচিত্র্যও তত বেশি হবে। আর জিনগত বৈচিত্র্য যত সমৃদ্ধ হবে, প্রতিকূল পরিবেশ মোকাবিলার সক্ষমতাও তাদের তত বাড়বে।

আন্তর্জাতিক জীববৈচিত্র্য দিবস উপলক্ষ্যে বাংলাদেশ বন বিভাগের সাবেক প্রধান বন সংরক্ষক ইশতিয়াক উদ্দিন আহমেদ সম্প্রতি একটি গুরুত্বপূর্ণ মত দেন। তিনি বলেন, জীববৈচিত্র্য রক্ষা ও পরিবেশ সংরক্ষণের জন্য বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে জরুরি ভিত্তিতে জিন পুল গড়ে তোলা প্রয়োজন। গণমাধ্যমে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি আরও জানান, জিন পুল হলো কোনো নির্দিষ্ট প্রাণী, উদ্ভিদ বা কীটপতঙ্গের সব ধরনের জিনগত উপাদানের সমাহার। এটি একটি প্রজাতির সামগ্রিক জিনগত বৈচিত্র্যকে তুলে ধরে। পাশাপাশি এটি প্রাকৃতিক নির্বাচন ও বিবর্তনের মূল ভিত্তি হিসেবেও কাজ করে। অন্যদিকে, ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচার (আইইউসিএন) বাংলাদেশের প্রোগ্রাম ম্যানেজার এ.বি.এম. সরওয়ার আলমও এ বিষয়ে কথা বলেছেন। তিনি জানান, দেশের জীববৈচিত্র্য বর্তমানে নানাভাবে হুমকির মুখে। অনেক প্রজাতি সংকরায়ণের শিকার হচ্ছে। তাই বন্যপ্রাণী, উদ্ভিদ ও কীটপতঙ্গ সংরক্ষণে জিন পুল তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি। জিনপুল রক্ষা করার অর্থ হলো একটি নির্দিষ্ট প্রজাতির মধ্যে জিনগত বৈচিত্র্য বজায় রাখা। এটি ‘ইন-সিটু’ ও ‘এক্স-সিটু’ দুই পদ্ধতিতেই করা সম্ভব।

বাংলাদেশে ইন-সিটু এবং এক্স-সিটু—এই দুই পদ্ধতিতেই জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের কাজ চলছে। ইন-সিটু পদ্ধতি বলতে জীবের মূল বাসস্থানেই তাকে সংরক্ষণ করাকে বোঝায়। অর্থাৎ, যে প্রাকৃতিক পরিবেশে বা বাস্তুতন্ত্রে জীবটি বেড়ে উঠছে, সেখানেই তাকে রক্ষা করা। অন্যদিকে, উদ্ভিদ ও প্রাণীকে তাদের মূল বাসস্থানের বাইরে নিয়ে অন্য কোনো নিরাপদ স্থানে সংরক্ষণ করার পদ্ধতিকে এক্স-সিটু সংরক্ষণ বলা হয়।

ইন-সিটু পদ্ধতিতে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের প্রধান জায়গাগুলো হলো—জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যান (ন্যাশনাল পার্ক), ইকোপার্ক, সাফারি পার্ক, বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য এবং মৎস্য অভয়াশ্রম ইত্যাদি। বাংলাদেশে বেশ কয়েকটি জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যান রয়েছে। এর মধ্যে ভাওয়াল, হিমছড়ি, মধুপুর এবং রামসাগর জাতীয় উদ্যান উল্লেখযোগ্য। এছাড়া চট্টগ্রাম ও মৌলভীবাজারে ইকোপার্ক রয়েছে। কক্সবাজারের ডুলাহাজারা এবং গাজীপুরের শ্রীপুরে গড়ে তোলা হয়েছে সাফারি পার্ক। দেশে বেশ কিছু মৎস্য ও বন্যপ্রাণী অভয়াশ্রমও রয়েছে। টাঙ্গুয়ার হাওর, হাকালুকি হাওর এবং হালদা নদী এগুলোর মধ্যে অন্যতম। অন্যদিকে, এক্স-সিটু সংরক্ষণ পদ্ধতির মধ্যে রয়েছে বোটানিক গার্ডেন, সীড ব্যাংক, জিন ব্যাংক, ডিএনএ ও পরাগরেণু সংরক্ষণ।

বাংলাদেশের জীববৈচিত্র্য বলতে কেবল বনের উদ্ভিদ ও প্রাণীদের বোঝায় না। বরং বিশাল এই বাস্তুসংস্থানের সব উপাদানই এর আওতাভুক্ত। এই উপাদানে যেমন ছোট-বড় অসংখ্য নদ-নদী রয়েছে, তেমনি রয়েছে হাওর-বাঁওড় এবং খাল-বিল প্রভৃতি। সুন্দরবনের রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার বা হরিণকে যেমন বুঝাবে, তেমনি বুঝাবে প্রায় ১৬০০ প্রজাতিরও বেশি মেরুদণ্ডী প্রাণী, ৬২৮ প্রজাতির পাখি, ৭০৮ প্রজাতির মাছ, ১১৩ প্রজাতির স্তন্যপায়ী আর ২২ প্রজাতির উভচরকেও। রয়েছে আর্থ্রোপোডা পর্বের অসংখ্য পোকামাকড় এবং নানা ধরনের উদ্ভিদ। এই সুবিশাল উদ্ভিদ ও প্রাণীজগতের ওপর বাংলাদেশের ছয় ঋতুর প্রভাবও জীববৈচিত্র্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। গ্রাম বা শহরে যেসব প্রাণী ও উদ্ভিদ দেখা যায়, এমনকি পুকুর, নদী বা অন্যান্য প্রাকৃতিক জলাধারও বাস্তুসংস্থানের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

সম্প্রতি ‘বাংলাদেশে উদ্ভিদের লাল তালিকা’ নামে একটি বই প্রকাশিত হয়েছে। এই বইয়ে দেশের ১০০০টি উদ্ভিদ প্রজাতির অবস্থা তুলে ধরা হয়েছে। বইয়ে দেখানো হয়েছে, দেশের ৭টি প্রজাতির উদ্ভিদ ইতিমধ্যেই পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে গেছে। ন্যূনতম বিপদগ্রস্ত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে ২৭১টি প্রজাতিকে। এছাড়া ৩৯৫টি প্রজাতিকে বিপদাপন্ন হিসেবে দেখানো হয়েছে, যার মধ্যে ৫টি প্রজাতি ‘মহাবিপন্ন’ অবস্থায় রয়েছে। বিপন্ন ও সংকটাপন্ন প্রজাতির সংখ্যা যথাক্রমে ১২৭টি এবং ২৬৩টি। যে প্রজাতিগুলো একেবারে বিলুপ্ত হয়ে গেছে, সেগুলো হলো—ফিতাচাঁপা, কুড়াজিরি, ভানু দেয়পাত, গোলা অঞ্জন, সাত সারিলা, থার্মা জাম এবং মাইট্রাসিস। আর মহাবিপন্ন পাঁচটি উদ্ভিদ হলো—বাঁশপাতা, বনখেজুর, বালবোরক্স, লম্বা ট্রায়াস অর্কিড এবং বলগাছ। জরুরি ভিত্তিতে সঠিক যত্ন ও সংরক্ষণের ব্যবস্থা না নিলে এই পাঁচটি গাছও খুব দ্রুতই প্রকৃতি থেকে হারিয়ে যাবে।

দেশের জীববৈচিত্র্য নানামুখী হুমকির সম্মুখীন এবং অনেক প্রজাতি সংকরায়ণের শিকার হচ্ছে। তাই বন্যপ্রাণী, উদ্ভিদ ও কীটপতঙ্গ সংরক্ষণে জিন পুল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। জিন পুল রক্ষার অর্থই হলো একটি নির্দিষ্ট প্রজাতির মধ্যে জিনগত বৈচিত্র্য বজায় রাখা, যা ইন-সিটু এবং এক্স-সিটু—এই দুই পদ্ধতিতেই করা সম্ভব।

আইইউসিএন-এর ২০১৫ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে বিলুপ্ত প্রাণী প্রজাতির সংখ্যা ৩১টি। মোট ১৬০০ প্রজাতির প্রাণীর মধ্যে ৩৯০টিই বর্তমানে হুমকির মুখে আছে। এছাড়া আরও ৫০টির বেশি প্রজাতি বেশ ঝুঁকিতে রয়েছে। আইইউসিএন-এর ২০০০ সাল এবং ২০১৫ সালের প্রতিবেদন তুলনা করলে প্রাণী বিলুপ্তির এই ভয়াবহ চিত্রটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ২০০০ সালে দেশে বিলুপ্ত প্রাণী প্রজাতির সংখ্যা ছিল ১৩টি। অর্থাৎ, মাত্র ১৫ বছরের ব্যবধানে আরও ১৮টি প্রাণী প্রজাতি চিরতরে হারিয়ে গেছে যা ভয়াবহ বিলুপ্তির হারকে নির্দেশ করছে।

বাংলাদেশ থেকে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া প্রাণীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—ডোরাকাটা হায়েনা, ধূসর নেকড়ে, নীলগাই, সুমাত্রা গন্ডার, জাভা গন্ডার, ভারতীয় গন্ডার, শিঙা হরিণ এবং মন্থর ভালুক। অন্যদিকে, আইইউসিএন-এর মহাবিপন্ন প্রাণীর তালিকায় রয়েছে—হাতি, ভোঁদড়, রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার, চিতা বাঘ, বনরুই, উল্লুক, চশমাপরা হনুমান, বনগরু, সাম্বার হরিণ, কাঠবিড়ালি এবং কালো ভালুক।

এই অবস্থায় বাংলাদেশে বিলুপ্ত প্রায় এবং যে সমস্ত উদ্ভিদ ও প্রাণী হুমকির মধ্যে আছে, তাদের জিন পুল জরুরি ভিত্তিতে সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। উদ্ভিদের মধ্যে যে সমস্ত উদ্ভিদ হুমকিতে রয়েছে তাদের শনাক্ত করতে হবে। যে সমস্ত আগ্রাসী উদ্ভিদের কারণে এসব প্রজাতি হুমকিতে রয়েছে, সেগুলোকেও চিহ্নিত করতে হবে। এরপর আগ্রাসী উদ্ভিদ প্রজাতি নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। এছাড়া শস্যের জন্য জিন ব্যাংক তৈরি করতে হবে। বাংলাদেশে সাফারি পার্ক, ইকো পার্ক থাকলেও এ সমস্ত জায়গায় বিলুপ্ত প্রায় প্রাণীদের সংরক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

জিন পুলের সমৃদ্ধির জন্য একই প্রজাতির অন্যান্য সদস্য এনে নতুন জিনোম তৈরি করতে হবে। স্থানীয় ও বহিরাগত প্রজাতির মধ্যে সংকরায়ন ঘটাতে হবে। এছাড়া প্রাকৃতিকভাবেও উদ্ভিদ ও প্রাণী সংরক্ষণ করে জিন পুলের পরিবর্তন আনা যায়। এভাবে জিন পুলের সমৃদ্ধি ও যথাযথ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমেই জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে এক যুগান্তকারী ভূমিকা রাখা সম্ভব।

  • লেখক: পরিবেশ বিষয়ক গবেষক
Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত