leadT1ad

মতামত

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতায় বাংলাদেশের কী লাভ

স্ট্রিম গ্রাফিক

হরমুজ প্রণালি মাত্র ৩৩ কিলোমিটার চওড়া। কিন্তু এই সরু জলপথটি বন্ধ হয়ে গেলে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে অর্থনৈতিক কম্পন অনুভূত হয়। এবারও ঠিক তাই হয়েছে। গত ফেব্রুয়ারির শেষে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরান অভিযানের পর প্রণালিটি কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। বিশ্বের মোট তেল ও এলএনজি বাণিজ্যের প্রায় এক পঞ্চমাংশ এই পথে চলাচল করে। সেই স্রোত থেমে যাওয়ার অর্থ কী, গত কয়েক মাস বাংলাদেশ তার নিষ্ঠুর পরীক্ষা দিয়েছে। জ্বালানি বাজার, শিল্প উৎপাদন, বৈদেশিক বাণিজ্য, মূল্যস্ফীতি এবং বৈদেশিক ঋণ ব্যবস্থাপনা সব জায়গায় একযোগে চাপ পড়েছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে নতুন সহায়তা কর্মসূচির জন্য আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের দ্বারস্থ হতে হয়েছে।

এই পরীক্ষার মাঝখানে গত ১৪ জুন এল আংশিক স্বস্তির সংবাদ। পাকিস্তান ও কাতারের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি প্রাথমিক সমঝোতায় পৌঁছেছে। এই সমঝোতা কি বাংলাদেশের ক্ষত সারাবে, নাকি কেবল রক্তক্ষরণ কিছুটা কমাবে? প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ক্ষতির মাপটি বিশাল।

দ্যা ডেইলি স্টার-এর প্রতিবেদনে উদ্ধৃত সানেমের বিশ্লেষণ বলছে, যুদ্ধ দীর্ঘ হলে আগামী দুই বছরে বাংলাদেশের জিডিপি তিন শতাংশ পর্যন্ত সংকুচিত হতে পারে। পরিমাণে এটি প্রায় ১৩ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার, যা মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসা বার্ষিক রেমিট্যান্সের সমতুল্য। পোশাক শিল্পের উৎপাদন সাড়ে চার শতাংশ এবং পরিবহন ও লজিস্টিক্স খাত পাঁচ শতাংশ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে সেই বিশ্লেষণে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। বিশ্বব্যাংক চলতি অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়ে ইতিমধ্যে ৩ দশমিক ৯ শতাংশে নামিয়ে এনেছে।

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতা তাৎক্ষণিক ক্ষতি কিছুটা লাঘব করবে, কিন্তু কাঠামোগত ভঙ্গুরতার কোনো চিকিৎসা এই সমঝোতায় নেই। দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি উৎসের বৈচিত্র্য, নবায়নযোগ্য শক্তিতে বিনিয়োগ, রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণ এবং বৈদেশিক ঋণ ব্যবস্থাপনায় সতর্কতা এখন সময়ের দাবি।

ঢাকার রাস্তায় রাইড-শেয়ার চালক জ্বালানির লাইনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে আছেন, বিশ্ববিদ্যালয় আগাম বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে, শপিং মলে রাত আটটায় বন্ধের নির্দেশ জারি হচ্ছে, এগুলো সেই সংখ্যাগুলোরই মানবিক রূপ। পোশাক কারখানার মালিক যখন বলছেন পরের মৌসুমে কাজের অর্ডার ২০ থেকে ২৫ শতাংশ কমে যাওয়ার আশঙ্কা আছে, তখন সেটি লাখো শ্রমিকের জীবিকার প্রশ্ন হয়ে ওঠে।

জ্বালানি সংকট: একটি অস্তিত্বের প্রশ্ন

বাংলাদেশ তার প্রয়োজনীয় জ্বালানির ৯৫ শতাংশ আমদানি করে। মধ্যপ্রাচ্য এ ক্ষেত্রে অন্যতম প্রধান উৎস। ফলে হরমুজ বন্ধ হয়ে যাওয়া বাংলাদেশের জন্য অস্তিত্বের সংকট। জ্বালানি ছাড়া কৃষি চলে না, পরিবহন চলে না, কারখানা চলে না।

যুদ্ধ শুরুর পর আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৬৬ ডলার থেকে ১০০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছে যায়। বাধ্য হয়ে বাংলাদেশকে জ্বালানির দাম ১০ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়াতে হয়েছে। পেট্রোল, ডিজেল ও কেরোসিনের এই মূল্যবৃদ্ধি সরাসরি পরিবহন ব্যয় বাড়িয়েছে, যার প্রভাব পড়েছে খাদ্যপণ্য থেকে শুরু করে দৈনন্দিন ভোগ্যপণ্যের বাজার পর্যন্ত। সার আমদানিতে সংকট তৈরি হওয়ায় কৃষি উৎপাদনেও আঘাত আসার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। মার্চ ২০২৩ থেকে বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের উপরে আটকে ছিল। ইরান যুদ্ধের ধাক্কা এল ঠিক সেই পুরনো ক্ষতের উপর।

পোশাক শিল্পের ওপর দ্বিমুখী চাপ

বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮৪ শতাংশ আসে পোশাক খাত থেকে। এই শিল্পের কাঁচামালের বড় অংশ আসে চীন থেকে এবং সেই পরিবহন পথ মধ্যপ্রাচ্য ও লোহিত সাগর ঘুরে। যুদ্ধ পরিস্থিতিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় পরিবহন ব্যয় বেড়েছে, সরবরাহ শৃঙ্খলে বিলম্ব তৈরি হয়েছে। মার্চে যুদ্ধের শুরুতে আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থাগুলো ফ্লাইট বাতিল করায় ইউরোপের বড় ক্রেতাদের কাছে পাঠানো পোশাক চালান বিমানবন্দরে আটকে যায়। ইউরোপীয় বাজারে জানুয়ারিতেই রপ্তানি ২৫ শতাংশের বেশি কমে গিয়েছিল।

পোশাকের পাশাপাশি প্লাস্টিক শিল্পও একই চাপে পড়েছে। যুদ্ধের আগে প্রতি টন রেজিনের দাম যেখানে ৯০০ থেকে ৯৫০ ডলারের মধ্যে ছিল, তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৫০০ থেকে ১৬০০ ডলারে। জ্বালানিনির্ভর এই শিল্পগুলোর উপরে যখন বিদ্যুৎ সংকট ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির দ্বিমুখী চাপ পড়ে, তখন প্রতিযোগিতা সক্ষমতা দ্রুত হারিয়ে যায়।

বৈদেশিক ঋণের বোঝা এবং আইএমএফের দরজায়

বৈদেশিক ঋণের চিত্রও উদ্বেগজনক। ২০২৫ সালের শেষ দিকে বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ১১৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। বাংলাদেশ ২০২৩ সালে শুরু হওয়া ৫ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারের একটি আইএমএফ কর্মসূচির আওতায় আগে থেকেই রয়েছে। সেই কর্মসূচি চলমান থাকলেও নতুন বাস্তবতায় অতিরিক্ত সহায়তার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার করতে বিশ্বব্যাংক ৩৫ কোটি ডলারের ঋণ অনুমোদন করেছে। কিন্তু ডলার সংকট ও আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির মাঝে এই ঋণ পরিশোধ আরও কঠিন হয়ে উঠছে, নতুন ঋণ নিয়ে পুরনো ঋণ সামলানোর এই চক্রটি দীর্ঘ মেয়াদে বড় ঝুঁকি তৈরি করছে।

সমঝোতার স্বস্তি, কিন্তু শর্ত আছে

তাহলে সমঝোতা কি স্বস্তি দেবে? সম্ভাবনা আছে, তবে শর্ত আছে। এই মুহূর্তে সমঝোতাটি মূলত একটি রোডম্যাপ মাত্র। ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতিতে হরমুজ খুলে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি আছে, ইরানের তেল বিক্রির সুযোগ আছে এবং পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার ইচ্ছাপত্র আছে। বাজারের প্রতিক্রিয়া তাৎক্ষণিক এসেছে, তেলের দাম তিন মাসের সর্বনিম্নে নেমে এসেছে। বাংলাদেশের জন্য এর অর্থ হলো আমদানি ব্যয় কমার সম্ভাবনা, মূল্যস্ফীতির চাপ কিছুটা শিথিল হওয়ার আশা এবং জাহাজ ভাড়া কমার প্রত্যাশা।

এই যুদ্ধ বাংলাদেশকে একটি মৌলিক প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে, যেটি সমঝোতার পরেও থাকবে। একটি দেশ যদি তার জ্বালানির ৯৫ শতাংশ বাইরে থেকে আনে, রপ্তানির ৮৪ শতাংশ একটি মাত্র শিল্পের উপর নির্ভর করে এবং বৈদেশিক মুদ্রার একটি বড় অংশ একটি অঞ্চলের শ্রমবাজার থেকে আসে, তাহলে দূরের একটি যুদ্ধও তাকে কীভাবে ভেঙে ফেলতে পারে, সেটি এবার আর কোনো তত্ত্বের মধ্যে নেই, সেটি বাস্তবে দেখা গেছে।

কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বারবার একটি কথাই বলছেন, সমঝোতার ঘোষণা এবং বাস্তবায়নের মাঝখানে বিশাল ব্যবধান থাকতে পারে। সমুদ্রতলে পোঁতা মাইন সরাতে কয়েক সপ্তাহ লাগবে। জাহাজ মালিক ও বিমা প্রতিষ্ঠানগুলো নিরাপত্তার নিশ্চয়তা না পাওয়া পর্যন্ত জাহাজ পাঠাবে না। আর মূল চুক্তি এখনো হয়নি। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, জমানো বিদেশি সম্পদ মুক্তির প্রশ্নগুলো ঝুলে আছে। ৬০ দিনের মধ্যে মতভেদ না মিটলে যুদ্ধ আবার জ্বলে উঠতে পারে, এবং বাংলাদেশ আবার সেই একই কবলে পড়বে।

রেমিট্যান্স ও শ্রমবাজারের সুযোগ, যা প্রায়ই উপেক্ষিত

বাংলাদেশের জন্য আরও একটি হিসাব আছে, যেটি প্রায়ই উপেক্ষিত থাকে। মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশি শ্রমিকের একটি বিশাল অংশ কর্মরত। যুদ্ধের কারণে অনেকে কাজ হারিয়ে দেশে ফিরে এসেছেন, রেমিট্যান্স প্রবাহে চাপ তৈরি হয়েছে। যুদ্ধপূর্ব সময়ে মধ্যপ্রাচ্য থেকে বার্ষিক যে রেমিট্যান্স আসত, সেটি এই সংকটে উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

তবে সমঝোতা স্থায়ী রূপ পেলে একটি সুযোগও তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা আছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলের পুনর্গঠন কার্যক্রমে সাধারণত বিপুল শ্রমশক্তির প্রয়োজন হয়। বাংলাদেশি শ্রমিকরা মধ্যপ্রাচ্যের নির্মাণ ও অবকাঠামো খাতে দীর্ঘদিন ধরে পরিচিত মুখ। এই সুযোগটি কাজে লাগাতে এখনই শ্রমবাজার কূটনীতিকে সক্রিয় করা দরকার, আলোচনার সুযোগ তৈরি হওয়ার পর নড়াচড়া করলে তখন অনেক দেরি হয়ে যাবে।

কাঠামোগত ভঙ্গুরতার প্রশ্ন, যেটি সমঝোতায় মিটবে না

এই যুদ্ধ বাংলাদেশকে একটি মৌলিক প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে, যেটি সমঝোতার পরেও থাকবে। একটি দেশ যদি তার জ্বালানির ৯৫ শতাংশ বাইরে থেকে আনে, রপ্তানির ৮৪ শতাংশ একটি মাত্র শিল্পের ওপর নির্ভর করে এবং বৈদেশিক মুদ্রার একটি বড় অংশ একটি অঞ্চলের শ্রমবাজার থেকে আসে, তাহলে দূরের একটি যুদ্ধও তাকে কীভাবে ভেঙে ফেলতে পারে, সেটি এবার আর কোনো তত্ত্বের মধ্যে নেই, সেটি বাস্তবে দেখা গেছে।

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতা তাৎক্ষণিক ক্ষতি কিছুটা লাঘব করবে, কিন্তু কাঠামোগত ভঙ্গুরতার কোনো চিকিৎসা এই সমঝোতায় নেই। দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি উৎসের বৈচিত্র্য, নবায়নযোগ্য শক্তিতে বিনিয়োগ, রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণ এবং বৈদেশিক ঋণ ব্যবস্থাপনায় সতর্কতা এখন সময়ের দাবি। একটি প্রণালি বন্ধ হলে যেন পুরো অর্থনীতি থমকে না যায়, সেই সক্ষমতা তৈরি করতে হবে। সেই চিকিৎসা করতে হবে বাংলাদেশকেই, নিজের ঘরে বসে।

  • শোয়েব সাম্য সিদ্দিক, অর্থনৈতিক বিশ্লেষক
Ad 300x250

সম্পর্কিত