স্পোর্টস ক্যাপিটালিজম ও যুদ্ধ-মানসিকতা
রাজীব নন্দী

বিশ্বকাপের দ্বিতীয় সেমিফাইনাল চলছে, বাংলাদেশ সময় রাত ১টায় ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনা মুখোমুখি। বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা চাইছে টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জয়ের পথে আরেকটি ধাপ এগিয়ে যেতে। ইংল্যান্ড চাইছে ১৯৬৬ সালের পর প্রথমবারের মতো আবার বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠতে। কিন্তু ম্যাচটি যত এগিয়ে এসেছে, আলোচনার কেন্দ্র তত সরে গেছে ফুটবল থেকে। মেসি, বেলিংহাম, হ্যারি কেইন কিংবা কৌশল নয়; ফিরে এসেছে ১৯৮২ সালের ফকল্যান্ড যুদ্ধ, ১৯৮৬ সালের আজতেকা স্টেডিয়াম, ‘হ্যান্ড অব গড’, শতাব্দীর সেরা গোল এবং দুই দেশের এমন এক ইতিহাস, যেখানে ফুটবল কখনোই কেবল ফুটবল ছিল না।
এটি নতুন কিছু নয়। ফুটবল বহুবার ইতিহাস, জাতীয়তাবাদ এবং রাজনৈতিক স্মৃতির বাহক হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—আমরা কি ইতিহাসকে বুঝতে খেলি, নাকি খেলাকে ইতিহাসের অসমাপ্ত যুদ্ধ বানিয়ে ফেলি?
১৯৮২ সালের ফকল্যান্ড যুদ্ধ ছিল যুক্তরাজ্য ও আর্জেন্টিনার মধ্যে দক্ষিণ আটলান্টিকের ছোট্ট কিছু দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সংঘটিত ৭৪ দিনের এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ। ২ এপ্রিল আর্জেন্টিনা দ্বীপগুলো দখল করে, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচার নৌবহর পাঠান, ১৪ জুন আর্জেন্টিনা আত্মসমর্পণ করে। কয়েকশ তরুণ সৈনিক মারা যায়, হাজারো মানুষ আজীবন শারীরিক ও মানসিক ক্ষত নিয়ে বেঁচে থাকে। কিন্তু বিশ্বকাপ এলেই সেই ট্র্যাজেডি হঠাৎ করেই পরিণত হয় একটি আকর্ষণীয় ফুটবলীয় উপমায়। যুদ্ধ হয়ে যায় প্রাক-ম্যাচ বিল্ডআপ, নিহত মানুষ হয়ে যায় পরিসংখ্যান, আর ইতিহাস হয়ে যায় বিপণনের ভাষা।
এখানেই আমাদের প্রথম নৈতিক প্রশ্নটি তোলা প্রয়োজন। যুদ্ধ কি সত্যিই খেলার উপমা হতে পারে? যুদ্ধের উদ্দেশ্য প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করা; খেলার উদ্দেশ্য প্রতিপক্ষকে সম্মান জানিয়ে হারানো। যুদ্ধের শেষে কবর বাড়ে, খেলার শেষে করমর্দন হয়। যুদ্ধের শেষে শরণার্থী তৈরি হয়, খেলার শেষে ট্রফি ওঠে। তাহলে এই দুই বিপরীত মানবিক অভিজ্ঞতাকে আমরা কেন একই ভাষায় প্রকাশ করি?
বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমও বহু বছর ধরে একই ভাষাগত ফাঁদে আটকে আছে। ভারত-পাকিস্তান ক্রিকেট মানেই ‘পারমাণবিক যুদ্ধ’। বাংলাদেশ-পাকিস্তান ম্যাচ মানেই ‘মুক্তিযুদ্ধের প্রতিশোধ’। ইংল্যান্ড-বাংলাদেশ টেস্ট মানেই ‘ব্রিটিশবধ’। আর ইংল্যান্ড-আর্জেন্টিনা মানেই ‘ফকল্যান্ড যুদ্ধ’। সাংবাদিকতার ভাষায় এগুলোকে রূপক বলা যায়। কিন্তু রূপক কখনো নিরীহ নয়। ভাষা বাস্তবতা নির্মাণ করে। আপনি যখন প্রতিবার একটি ম্যাচকে যুদ্ধ বলেন, তখন যুদ্ধের ভয়াবহতাকে ছোট করেন এবং খেলার মানবিকতাকে নষ্ট করেন। এখানেই এসে হাজির হয় স্পোর্টস ক্যাপিটালিজমের প্রশ্ন।
আধুনিক ক্রীড়া এখন আর শুধুই ক্রীড়া নয়; এটি বৈশ্বিক পুঁজিবাদের অন্যতম শক্তিশালী শিল্প। ফিফা, আইওসি, প্রিমিয়ার লিগ, এনবিএ—সবাই আবেগের অর্থনীতি পরিচালনা করে। সম্প্রচারস্বত্ব, বিজ্ঞাপন, স্পনসরশিপ, জার্সি বিক্রি, বেটিং, ডিজিটাল কনটেন্ট—সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু একটাই: দর্শকের আবেগকে সর্বোচ্চ মাত্রায় উত্তপ্ত রাখা। পুঁজিবাদ জানে, শান্তি বিক্রি হয় না; সংঘাত বিক্রি হয়।
এই কারণেই একটি ম্যাচকে ‘ফাইনাল’ বললে যতটা বিক্রি হয়, ‘প্রতিশোধের যুদ্ধ’ বললে তার চেয়ে অনেক বেশি বিক্রি হয়। ‘ঐতিহাসিক লড়াই’, ‘রক্তের হিসাব’, ‘মর্যাদার যুদ্ধ’, ‘জাতীয় সম্মান’—এসব শব্দ কেবল সাংবাদিকতার অলঙ্কার নয়; এগুলো বাজারের ভাষা। দর্শকের রক্তচাপ যত বাড়বে, বিজ্ঞাপনের দামও তত বাড়বে। ফরাসি দার্শনিক গি দ্য বোর্দ তাঁর Society of the Spectacle-এ লিখেছিলেন, আধুনিক পুঁজিবাদ বাস্তবতাকেও প্রদর্শনীতে পরিণত করে। আজ বিশ্বকাপ তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ। ফুটবল ম্যাচ আর কেবল ৯০ মিনিটের খেলা নয়; এটি কোটি কোটি মানুষের আবেগের লাইভ বাণিজ্য। ফলে বাস্তব যুদ্ধের স্মৃতিও বাজারের পণ্যে পরিণত হয়।
বিষয়টি কেবল অর্থনীতির নয়; এটি যুদ্ধ-মানসিকতারও প্রশ্ন। সমাজবিজ্ঞানীরা বহুদিন ধরেই দেখিয়ে আসছেন, রাষ্ট্র ও বাজার উভয়ই নাগরিকদের মধ্যে এমন এক মনস্তত্ত্ব তৈরি করে, যেখানে প্রতিযোগিতা ধীরে ধীরে শত্রুতায় রূপ নেয়। প্রতিপক্ষ আর প্রতিপক্ষ থাকে না; সে হয়ে ওঠে শত্রু। তখন জয় আর ক্রীড়াসাফল্য নয়, জাতীয় অস্তিত্বের প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়। এই মানসিকতা তৈরি হওয়ার পর মানুষ ধীরে ধীরে যুদ্ধের ভাষাকে স্বাভাবিক মনে করতে শুরু করে। ‘ধ্বংস করে দাও’, ‘গুঁড়িয়ে দাও’, ‘মেরে দাও’, ‘যুদ্ধ জিততে হবে’—এসব স্লোগান তখন স্টেডিয়াম থেকে সংসদ পর্যন্ত একইভাবে প্রতিধ্বনিত হয়।
জার্মান রাজনৈতিক তাত্ত্বিক কার্ল ফন ক্লজেভিৎস বলেছিলেন, ‘War is the continuation of politics by other means.’ যুদ্ধ হচ্ছে রাজনীতিরই আরেক রূপ। কিন্তু আজ মনে হচ্ছে আমরা তার উল্টো বাস্তবতায় বাস করছি। রাজনীতি যুদ্ধের ভাষা ধার করছে, আবার খেলাও যুদ্ধের ভাষা ধার করছে। ফলে তিনটি ক্ষেত্র—রাজনীতি, যুদ্ধ ও ক্রীড়া—একটি বিপজ্জনক ভাষাগত ত্রিভুজে আবদ্ধ হয়ে পড়েছে।
এই ত্রিভুজের আরেকটি দিক আরও উদ্বেগজনক। রাজনীতিও এখন খেলার ভাষায় কথা বলে। ‘খেলা হবে’—এই রাজনৈতিক স্লোগান বাংলাদেশে হয়ে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিকে কাঁপিয়েছিল। রাজনীতিকে খেলার ভাষায় নামিয়ে আনার মধ্য দিয়ে জনগণকে বোঝানো হয়েছিল, ক্ষমতার লড়াইও যেন এক ধরনের উৎসব। কিন্তু কী নির্মম পরিহাস! যে সমাজে ‘খেলা হবে’ সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনৈতিক স্লোগান হয়ে ওঠে, সেই সমাজেই শিশুদের জন্য এক চিলতে খেলার মাঠ থাকে না। শহর ভরে যায় কংক্রিটে, মাঠ দখল করে বহুতল, পার্ক দখল করে বাণিজ্য, আর রাজনীতি দখল করে খেলার ভাষা। আরও বড় ট্র্যাজেডি হলো, বাংলাদেশের নারায়নগঞ্জের যে রাজনীতিক এই স্লোগানকে জনমানসে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, বাংলাদেশে চব্বিশের জটিল রাজনৈতিক খেলার শুরুতেই তাঁকেই দেখা গেল নিরাপদে গ্যালারিতে সরে যেতে। জনগণকে মাঠে রেখে রাজনীতিক গ্যালারিতে, আর মাঠহীন শিশুরা টেলিভিশনের সামনে বসে ‘খেলা হবে’ শুনে বড় হচ্ছে। এ যেন আমাদের সময়ের সবচেয়ে নির্মম রাজনৈতিক রূপক— যেখানে খেলার ভাষা আছে, কিন্তু খেলা নেই; মাঠের আহ্বান আছে, কিন্তু মাঠ নেই; সাহসের স্লোগান আছে, কিন্তু সংকটের মুহূর্তে খেলোয়াড় নেই। রাজনীতি খেলাকে গ্রাস করেছে, অথচ খেলাধুলার মৌলিক অবকাঠামো নির্মাণে তার কোনো আগ্রহ নেই। এই ভণ্ডামিই আমাদের সময়ের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ট্র্যাজেডিগুলোর একটি।
‘খেলা হবে’, ‘নকআউট’, ‘গোল’, ‘হ্যাটট্রিক’, ‘ফাইনাল’, ‘হোম গ্রাউন্ড’—এসব শব্দ এখন সংসদ, নির্বাচন এবং রাষ্ট্রক্ষমতার আলোচনায় ব্যবহৃত হয়। অর্থাৎ রাজনীতি নিজেকে খেলায় পরিণত করছে। অন্যদিকে খেলাধুলাকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে রাজনীতির অসমাপ্ত সংঘর্ষ বহন করার দায়িত্বে। একটি গোল হয়ে উঠছে সাম্রাজ্যবাদের প্রতিশোধ, একটি ম্যাচ হয়ে উঠছে মুক্তিযুদ্ধের ধারাবাহিকতা, একটি ট্রফি হয়ে উঠছে জাতীয় আত্মমর্যাদার একমাত্র পরিমাপ।
ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকো ক্লজেভিৎসের উক্তিকে উল্টে দিয়ে বলেছিলেন, ‘Politics is the continuation of war by other means.’ অর্থাৎ রাজনীতিও একধরনের দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ। আজকের পৃথিবীতে মনে হচ্ছে ক্রীড়াও সেই একই ধারাবাহিকতার অংশ হয়ে যাচ্ছে। যুদ্ধ রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করছে, রাজনীতি খেলাকে নিয়ন্ত্রণ করছে, আর খেলা আবার যুদ্ধের কল্পনাকে পুনরুৎপাদন করছে। এই কারণেই বিশ্বকাপের সময় পৃথিবী ঐক্যবদ্ধ হওয়ার বদলে আমরা আরও বেশি বিভক্ত হয়ে পড়ি। অথচ বাস্তব পৃথিবীর দিকে তাকালে দেখি- গাজায় মানুষ বোমার নিচে মারা যাচ্ছে। ইউক্রেনে শিশুরা বাঙ্কারে বড় হচ্ছে। সুদানে মানুষ দুর্ভিক্ষ ও গৃহযুদ্ধের মধ্যে বেঁচে আছে। মিয়ানমারে মানুষ নিজ দেশেই উদ্বাস্তু। এসব বাস্তব যুদ্ধের মাঝেও আমরা একটি ফুটবল ম্যাচকে ‘যুদ্ধ’ বলি। এই ভাষা শুধু অসংবেদনশীল নয়; এটি যুদ্ধের প্রকৃত ভয়াবহতাকে তুচ্ছ করে।
সংবাদের অন্যতম মৌলিক উপাদান হলো দ্বন্দ্ব বা conflict। সেই অর্থে খেলাধুলাও সংবাদ, কারণ সেখানে দুটি প্রতিদ্বন্দ্বী দলের প্রতিযোগিতা, অনিশ্চয়তা ও ফলাফল রয়েছে। কিন্তু সংবাদমূল্যের এই ‘কনফ্লিক্ট’কে আমরা কেন যুদ্ধের ভয়াবহতার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলি? কেন একটি ফুটবল ম্যাচকে ‘যুদ্ধ’, একটি ক্রিকেট সিরিজকে ‘প্রতিশোধ’, কিংবা একটি গোলকে ‘জাতীয় বিজয়’ হিসেবে হাজির করতে হবে? সংবাদকে নাটকীয় করার এই প্রবণতা শুধু ভাষার অপব্যবহার নয়, এটি যুদ্ধের নির্মম বাস্তবতাকেও তুচ্ছ করে। যুদ্ধে মানুষ মরে, রাষ্ট্র ভেঙে পড়ে, প্রজন্ম পঙ্গু হয়ে যায়; খেলায় হার-জিত আছে, কিন্তু শত্রুতা থাকার কথা নয়। অথচ আমাদের গণমাধ্যম প্রতিযোগিতাকে শত্রুতায়, আর প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে যুদ্ধের অভিধানে ভাবানুবাদ করতে করতে এমন এক সংস্কৃতি তৈরি করেছে, যেখানে খেলার মানবিকতা হারিয়ে গিয়ে কেবল সংঘর্ষের নেশাই টিকে থাকে।
কবি ময়ুখ চৌধুরী একবার তীব্র ব্যঙ্গ করে বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশের গণমাধ্যম অন্তত একটি সংবাদ বস্তুনিষ্ঠভাবে লেখে— খেলায় কে কত গোলে জিতল’। এই মন্তব্যটি কেবল রসিকতা নয়; এটি বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমের প্রতি এক নির্মম অভিযোগ। যে গণমাধ্যম রাজনীতি, অর্থনীতি, নির্বাচন কিংবা রাষ্ট্রীয় সংকটের সংবাদে প্রায়ই পক্ষপাত, অতিরঞ্জন কিংবা প্রোপাগান্ডার অভিযোগে অভিযুক্ত হয়, সেই গণমাধ্যমই খেলার স্কোর লেখার সময় সত্য গোপন করতে পারে না। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, সেই খেলার সংবাদও তারা আর খেলা হিসেবে রাখতে চায় না। স্কোরলাইনটি হয়তো বস্তুনিষ্ঠ থাকে, কিন্তু শিরোনাম হয়ে যায় ‘যুদ্ধ’, ‘প্রতিশোধ’, ‘ব্রিটিশবধ’, ‘পারমাণবিক লড়াই’ কিংবা ‘ফকল্যান্ডের পুনরাবৃত্তি’। অর্থাৎ সত্যকে বিকৃত না করেও ভাষাকে এমনভাবে বিকৃত করা হয়, যাতে সংবাদ নয়, আবেগ বিক্রি হয়; তথ্য নয়, উন্মাদনা বাজার পায়।
সাংবাদিকতার কাজ ঘটনার প্রতি কৌতূহল তৈরি করা, কিন্তু যুদ্ধকে রোমান্টিসাইজ করা নয়। সংবাদকে আকর্ষণীয় করা সহ-সম্পাদনার একটি বড় দায়, কিন্তু ইতিহাসকে বাজারজাত করা নয়। কারণ ‘ফকল্যান্ড যুদ্ধ’ শিরোনাম আসলে নিহত সৈনিকের স্মৃতিকে একটি ক্লিকবেইটে পরিণত করে। ‘মুক্তিযুদ্ধের প্রতিশোধ’ শিরোনাম ১৯৭১-এর গণহত্যাকে একটি ক্রিকেটীয় রূপকে নামিয়ে আনে। ‘পারমাণবিক যুদ্ধ’ শিরোনাম মানবসভ্যতার সবচেয়ে ভয়ংকর সম্ভাবনাকে কৌতুকের ভাষায় ব্যবহার করে। ভাষারও নৈতিকতা আছে। সাংবাদিকতারও দায়িত্ব আছে। খেলাধুলারও একটি মানবিক দর্শন আছে। খেলার সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য হলো— এখানে প্রতিপক্ষকে হত্যা করতে হয় না, তাকে সম্মান জানিয়েই হারানো যায়। ম্যাচ শেষে খেলোয়াড়রা জার্সি বদল করেন, আলিঙ্গন করেন, একসঙ্গে ছবি তোলেন। যুদ্ধের শেষে জার্সি বদল হয় না; কফিন বদল হয়।
আমাদের তাই সিদ্ধান্ত নিতে হবে—আমরা কি স্পোর্টস ক্যাপিটালিজমের তৈরি যুদ্ধ-নাটকের দর্শক হয়ে থাকব, নাকি খেলাকে আবার স্টেডিয়ামে খেলার জায়গায় ফিরিয়ে আনব? ‘খেলা হবে’ বলে যারা স্লোগান দেয়, তারা কবে পাড়ায় পাড়ায় দেহে-মনে শিশু-কিশোরদের বেড়ে উঠার জন্য মাঠ তৈরি করবে? পরের খেলায় তালি দিয়ে, ভিনদেশি খেলার দর্শক হয়ে বহু রাত তো জেগেছি। আমরা সত্যিকারের জাগবো কবে?

বিশ্বকাপের দ্বিতীয় সেমিফাইনাল চলছে, বাংলাদেশ সময় রাত ১টায় ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনা মুখোমুখি। বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা চাইছে টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জয়ের পথে আরেকটি ধাপ এগিয়ে যেতে। ইংল্যান্ড চাইছে ১৯৬৬ সালের পর প্রথমবারের মতো আবার বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠতে। কিন্তু ম্যাচটি যত এগিয়ে এসেছে, আলোচনার কেন্দ্র তত সরে গেছে ফুটবল থেকে। মেসি, বেলিংহাম, হ্যারি কেইন কিংবা কৌশল নয়; ফিরে এসেছে ১৯৮২ সালের ফকল্যান্ড যুদ্ধ, ১৯৮৬ সালের আজতেকা স্টেডিয়াম, ‘হ্যান্ড অব গড’, শতাব্দীর সেরা গোল এবং দুই দেশের এমন এক ইতিহাস, যেখানে ফুটবল কখনোই কেবল ফুটবল ছিল না।
এটি নতুন কিছু নয়। ফুটবল বহুবার ইতিহাস, জাতীয়তাবাদ এবং রাজনৈতিক স্মৃতির বাহক হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—আমরা কি ইতিহাসকে বুঝতে খেলি, নাকি খেলাকে ইতিহাসের অসমাপ্ত যুদ্ধ বানিয়ে ফেলি?
১৯৮২ সালের ফকল্যান্ড যুদ্ধ ছিল যুক্তরাজ্য ও আর্জেন্টিনার মধ্যে দক্ষিণ আটলান্টিকের ছোট্ট কিছু দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সংঘটিত ৭৪ দিনের এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ। ২ এপ্রিল আর্জেন্টিনা দ্বীপগুলো দখল করে, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচার নৌবহর পাঠান, ১৪ জুন আর্জেন্টিনা আত্মসমর্পণ করে। কয়েকশ তরুণ সৈনিক মারা যায়, হাজারো মানুষ আজীবন শারীরিক ও মানসিক ক্ষত নিয়ে বেঁচে থাকে। কিন্তু বিশ্বকাপ এলেই সেই ট্র্যাজেডি হঠাৎ করেই পরিণত হয় একটি আকর্ষণীয় ফুটবলীয় উপমায়। যুদ্ধ হয়ে যায় প্রাক-ম্যাচ বিল্ডআপ, নিহত মানুষ হয়ে যায় পরিসংখ্যান, আর ইতিহাস হয়ে যায় বিপণনের ভাষা।
এখানেই আমাদের প্রথম নৈতিক প্রশ্নটি তোলা প্রয়োজন। যুদ্ধ কি সত্যিই খেলার উপমা হতে পারে? যুদ্ধের উদ্দেশ্য প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করা; খেলার উদ্দেশ্য প্রতিপক্ষকে সম্মান জানিয়ে হারানো। যুদ্ধের শেষে কবর বাড়ে, খেলার শেষে করমর্দন হয়। যুদ্ধের শেষে শরণার্থী তৈরি হয়, খেলার শেষে ট্রফি ওঠে। তাহলে এই দুই বিপরীত মানবিক অভিজ্ঞতাকে আমরা কেন একই ভাষায় প্রকাশ করি?
বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমও বহু বছর ধরে একই ভাষাগত ফাঁদে আটকে আছে। ভারত-পাকিস্তান ক্রিকেট মানেই ‘পারমাণবিক যুদ্ধ’। বাংলাদেশ-পাকিস্তান ম্যাচ মানেই ‘মুক্তিযুদ্ধের প্রতিশোধ’। ইংল্যান্ড-বাংলাদেশ টেস্ট মানেই ‘ব্রিটিশবধ’। আর ইংল্যান্ড-আর্জেন্টিনা মানেই ‘ফকল্যান্ড যুদ্ধ’। সাংবাদিকতার ভাষায় এগুলোকে রূপক বলা যায়। কিন্তু রূপক কখনো নিরীহ নয়। ভাষা বাস্তবতা নির্মাণ করে। আপনি যখন প্রতিবার একটি ম্যাচকে যুদ্ধ বলেন, তখন যুদ্ধের ভয়াবহতাকে ছোট করেন এবং খেলার মানবিকতাকে নষ্ট করেন। এখানেই এসে হাজির হয় স্পোর্টস ক্যাপিটালিজমের প্রশ্ন।
আধুনিক ক্রীড়া এখন আর শুধুই ক্রীড়া নয়; এটি বৈশ্বিক পুঁজিবাদের অন্যতম শক্তিশালী শিল্প। ফিফা, আইওসি, প্রিমিয়ার লিগ, এনবিএ—সবাই আবেগের অর্থনীতি পরিচালনা করে। সম্প্রচারস্বত্ব, বিজ্ঞাপন, স্পনসরশিপ, জার্সি বিক্রি, বেটিং, ডিজিটাল কনটেন্ট—সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু একটাই: দর্শকের আবেগকে সর্বোচ্চ মাত্রায় উত্তপ্ত রাখা। পুঁজিবাদ জানে, শান্তি বিক্রি হয় না; সংঘাত বিক্রি হয়।
এই কারণেই একটি ম্যাচকে ‘ফাইনাল’ বললে যতটা বিক্রি হয়, ‘প্রতিশোধের যুদ্ধ’ বললে তার চেয়ে অনেক বেশি বিক্রি হয়। ‘ঐতিহাসিক লড়াই’, ‘রক্তের হিসাব’, ‘মর্যাদার যুদ্ধ’, ‘জাতীয় সম্মান’—এসব শব্দ কেবল সাংবাদিকতার অলঙ্কার নয়; এগুলো বাজারের ভাষা। দর্শকের রক্তচাপ যত বাড়বে, বিজ্ঞাপনের দামও তত বাড়বে। ফরাসি দার্শনিক গি দ্য বোর্দ তাঁর Society of the Spectacle-এ লিখেছিলেন, আধুনিক পুঁজিবাদ বাস্তবতাকেও প্রদর্শনীতে পরিণত করে। আজ বিশ্বকাপ তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ। ফুটবল ম্যাচ আর কেবল ৯০ মিনিটের খেলা নয়; এটি কোটি কোটি মানুষের আবেগের লাইভ বাণিজ্য। ফলে বাস্তব যুদ্ধের স্মৃতিও বাজারের পণ্যে পরিণত হয়।
বিষয়টি কেবল অর্থনীতির নয়; এটি যুদ্ধ-মানসিকতারও প্রশ্ন। সমাজবিজ্ঞানীরা বহুদিন ধরেই দেখিয়ে আসছেন, রাষ্ট্র ও বাজার উভয়ই নাগরিকদের মধ্যে এমন এক মনস্তত্ত্ব তৈরি করে, যেখানে প্রতিযোগিতা ধীরে ধীরে শত্রুতায় রূপ নেয়। প্রতিপক্ষ আর প্রতিপক্ষ থাকে না; সে হয়ে ওঠে শত্রু। তখন জয় আর ক্রীড়াসাফল্য নয়, জাতীয় অস্তিত্বের প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়। এই মানসিকতা তৈরি হওয়ার পর মানুষ ধীরে ধীরে যুদ্ধের ভাষাকে স্বাভাবিক মনে করতে শুরু করে। ‘ধ্বংস করে দাও’, ‘গুঁড়িয়ে দাও’, ‘মেরে দাও’, ‘যুদ্ধ জিততে হবে’—এসব স্লোগান তখন স্টেডিয়াম থেকে সংসদ পর্যন্ত একইভাবে প্রতিধ্বনিত হয়।
জার্মান রাজনৈতিক তাত্ত্বিক কার্ল ফন ক্লজেভিৎস বলেছিলেন, ‘War is the continuation of politics by other means.’ যুদ্ধ হচ্ছে রাজনীতিরই আরেক রূপ। কিন্তু আজ মনে হচ্ছে আমরা তার উল্টো বাস্তবতায় বাস করছি। রাজনীতি যুদ্ধের ভাষা ধার করছে, আবার খেলাও যুদ্ধের ভাষা ধার করছে। ফলে তিনটি ক্ষেত্র—রাজনীতি, যুদ্ধ ও ক্রীড়া—একটি বিপজ্জনক ভাষাগত ত্রিভুজে আবদ্ধ হয়ে পড়েছে।
এই ত্রিভুজের আরেকটি দিক আরও উদ্বেগজনক। রাজনীতিও এখন খেলার ভাষায় কথা বলে। ‘খেলা হবে’—এই রাজনৈতিক স্লোগান বাংলাদেশে হয়ে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিকে কাঁপিয়েছিল। রাজনীতিকে খেলার ভাষায় নামিয়ে আনার মধ্য দিয়ে জনগণকে বোঝানো হয়েছিল, ক্ষমতার লড়াইও যেন এক ধরনের উৎসব। কিন্তু কী নির্মম পরিহাস! যে সমাজে ‘খেলা হবে’ সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনৈতিক স্লোগান হয়ে ওঠে, সেই সমাজেই শিশুদের জন্য এক চিলতে খেলার মাঠ থাকে না। শহর ভরে যায় কংক্রিটে, মাঠ দখল করে বহুতল, পার্ক দখল করে বাণিজ্য, আর রাজনীতি দখল করে খেলার ভাষা। আরও বড় ট্র্যাজেডি হলো, বাংলাদেশের নারায়নগঞ্জের যে রাজনীতিক এই স্লোগানকে জনমানসে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, বাংলাদেশে চব্বিশের জটিল রাজনৈতিক খেলার শুরুতেই তাঁকেই দেখা গেল নিরাপদে গ্যালারিতে সরে যেতে। জনগণকে মাঠে রেখে রাজনীতিক গ্যালারিতে, আর মাঠহীন শিশুরা টেলিভিশনের সামনে বসে ‘খেলা হবে’ শুনে বড় হচ্ছে। এ যেন আমাদের সময়ের সবচেয়ে নির্মম রাজনৈতিক রূপক— যেখানে খেলার ভাষা আছে, কিন্তু খেলা নেই; মাঠের আহ্বান আছে, কিন্তু মাঠ নেই; সাহসের স্লোগান আছে, কিন্তু সংকটের মুহূর্তে খেলোয়াড় নেই। রাজনীতি খেলাকে গ্রাস করেছে, অথচ খেলাধুলার মৌলিক অবকাঠামো নির্মাণে তার কোনো আগ্রহ নেই। এই ভণ্ডামিই আমাদের সময়ের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ট্র্যাজেডিগুলোর একটি।
‘খেলা হবে’, ‘নকআউট’, ‘গোল’, ‘হ্যাটট্রিক’, ‘ফাইনাল’, ‘হোম গ্রাউন্ড’—এসব শব্দ এখন সংসদ, নির্বাচন এবং রাষ্ট্রক্ষমতার আলোচনায় ব্যবহৃত হয়। অর্থাৎ রাজনীতি নিজেকে খেলায় পরিণত করছে। অন্যদিকে খেলাধুলাকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে রাজনীতির অসমাপ্ত সংঘর্ষ বহন করার দায়িত্বে। একটি গোল হয়ে উঠছে সাম্রাজ্যবাদের প্রতিশোধ, একটি ম্যাচ হয়ে উঠছে মুক্তিযুদ্ধের ধারাবাহিকতা, একটি ট্রফি হয়ে উঠছে জাতীয় আত্মমর্যাদার একমাত্র পরিমাপ।
ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকো ক্লজেভিৎসের উক্তিকে উল্টে দিয়ে বলেছিলেন, ‘Politics is the continuation of war by other means.’ অর্থাৎ রাজনীতিও একধরনের দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ। আজকের পৃথিবীতে মনে হচ্ছে ক্রীড়াও সেই একই ধারাবাহিকতার অংশ হয়ে যাচ্ছে। যুদ্ধ রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করছে, রাজনীতি খেলাকে নিয়ন্ত্রণ করছে, আর খেলা আবার যুদ্ধের কল্পনাকে পুনরুৎপাদন করছে। এই কারণেই বিশ্বকাপের সময় পৃথিবী ঐক্যবদ্ধ হওয়ার বদলে আমরা আরও বেশি বিভক্ত হয়ে পড়ি। অথচ বাস্তব পৃথিবীর দিকে তাকালে দেখি- গাজায় মানুষ বোমার নিচে মারা যাচ্ছে। ইউক্রেনে শিশুরা বাঙ্কারে বড় হচ্ছে। সুদানে মানুষ দুর্ভিক্ষ ও গৃহযুদ্ধের মধ্যে বেঁচে আছে। মিয়ানমারে মানুষ নিজ দেশেই উদ্বাস্তু। এসব বাস্তব যুদ্ধের মাঝেও আমরা একটি ফুটবল ম্যাচকে ‘যুদ্ধ’ বলি। এই ভাষা শুধু অসংবেদনশীল নয়; এটি যুদ্ধের প্রকৃত ভয়াবহতাকে তুচ্ছ করে।
সংবাদের অন্যতম মৌলিক উপাদান হলো দ্বন্দ্ব বা conflict। সেই অর্থে খেলাধুলাও সংবাদ, কারণ সেখানে দুটি প্রতিদ্বন্দ্বী দলের প্রতিযোগিতা, অনিশ্চয়তা ও ফলাফল রয়েছে। কিন্তু সংবাদমূল্যের এই ‘কনফ্লিক্ট’কে আমরা কেন যুদ্ধের ভয়াবহতার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলি? কেন একটি ফুটবল ম্যাচকে ‘যুদ্ধ’, একটি ক্রিকেট সিরিজকে ‘প্রতিশোধ’, কিংবা একটি গোলকে ‘জাতীয় বিজয়’ হিসেবে হাজির করতে হবে? সংবাদকে নাটকীয় করার এই প্রবণতা শুধু ভাষার অপব্যবহার নয়, এটি যুদ্ধের নির্মম বাস্তবতাকেও তুচ্ছ করে। যুদ্ধে মানুষ মরে, রাষ্ট্র ভেঙে পড়ে, প্রজন্ম পঙ্গু হয়ে যায়; খেলায় হার-জিত আছে, কিন্তু শত্রুতা থাকার কথা নয়। অথচ আমাদের গণমাধ্যম প্রতিযোগিতাকে শত্রুতায়, আর প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে যুদ্ধের অভিধানে ভাবানুবাদ করতে করতে এমন এক সংস্কৃতি তৈরি করেছে, যেখানে খেলার মানবিকতা হারিয়ে গিয়ে কেবল সংঘর্ষের নেশাই টিকে থাকে।
কবি ময়ুখ চৌধুরী একবার তীব্র ব্যঙ্গ করে বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশের গণমাধ্যম অন্তত একটি সংবাদ বস্তুনিষ্ঠভাবে লেখে— খেলায় কে কত গোলে জিতল’। এই মন্তব্যটি কেবল রসিকতা নয়; এটি বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমের প্রতি এক নির্মম অভিযোগ। যে গণমাধ্যম রাজনীতি, অর্থনীতি, নির্বাচন কিংবা রাষ্ট্রীয় সংকটের সংবাদে প্রায়ই পক্ষপাত, অতিরঞ্জন কিংবা প্রোপাগান্ডার অভিযোগে অভিযুক্ত হয়, সেই গণমাধ্যমই খেলার স্কোর লেখার সময় সত্য গোপন করতে পারে না। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, সেই খেলার সংবাদও তারা আর খেলা হিসেবে রাখতে চায় না। স্কোরলাইনটি হয়তো বস্তুনিষ্ঠ থাকে, কিন্তু শিরোনাম হয়ে যায় ‘যুদ্ধ’, ‘প্রতিশোধ’, ‘ব্রিটিশবধ’, ‘পারমাণবিক লড়াই’ কিংবা ‘ফকল্যান্ডের পুনরাবৃত্তি’। অর্থাৎ সত্যকে বিকৃত না করেও ভাষাকে এমনভাবে বিকৃত করা হয়, যাতে সংবাদ নয়, আবেগ বিক্রি হয়; তথ্য নয়, উন্মাদনা বাজার পায়।
সাংবাদিকতার কাজ ঘটনার প্রতি কৌতূহল তৈরি করা, কিন্তু যুদ্ধকে রোমান্টিসাইজ করা নয়। সংবাদকে আকর্ষণীয় করা সহ-সম্পাদনার একটি বড় দায়, কিন্তু ইতিহাসকে বাজারজাত করা নয়। কারণ ‘ফকল্যান্ড যুদ্ধ’ শিরোনাম আসলে নিহত সৈনিকের স্মৃতিকে একটি ক্লিকবেইটে পরিণত করে। ‘মুক্তিযুদ্ধের প্রতিশোধ’ শিরোনাম ১৯৭১-এর গণহত্যাকে একটি ক্রিকেটীয় রূপকে নামিয়ে আনে। ‘পারমাণবিক যুদ্ধ’ শিরোনাম মানবসভ্যতার সবচেয়ে ভয়ংকর সম্ভাবনাকে কৌতুকের ভাষায় ব্যবহার করে। ভাষারও নৈতিকতা আছে। সাংবাদিকতারও দায়িত্ব আছে। খেলাধুলারও একটি মানবিক দর্শন আছে। খেলার সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য হলো— এখানে প্রতিপক্ষকে হত্যা করতে হয় না, তাকে সম্মান জানিয়েই হারানো যায়। ম্যাচ শেষে খেলোয়াড়রা জার্সি বদল করেন, আলিঙ্গন করেন, একসঙ্গে ছবি তোলেন। যুদ্ধের শেষে জার্সি বদল হয় না; কফিন বদল হয়।
আমাদের তাই সিদ্ধান্ত নিতে হবে—আমরা কি স্পোর্টস ক্যাপিটালিজমের তৈরি যুদ্ধ-নাটকের দর্শক হয়ে থাকব, নাকি খেলাকে আবার স্টেডিয়ামে খেলার জায়গায় ফিরিয়ে আনব? ‘খেলা হবে’ বলে যারা স্লোগান দেয়, তারা কবে পাড়ায় পাড়ায় দেহে-মনে শিশু-কিশোরদের বেড়ে উঠার জন্য মাঠ তৈরি করবে? পরের খেলায় তালি দিয়ে, ভিনদেশি খেলার দর্শক হয়ে বহু রাত তো জেগেছি। আমরা সত্যিকারের জাগবো কবে?
.png)

সরকারি কর্মকর্তাদের মাসিক গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণ ভাতা ৫০ হাজার থেকে অর্ধেক করতে সম্প্রতি স্মারক জারি করেছিল অর্থ মন্ত্রণালয়। প্রধানমন্ত্রীয় নির্দেশনার কথা থাকলেও সচিবালয় নির্দেশমালার মারপ্যাচে সেটি স্থগিত করা হয়েছে। এটি আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্র কীভাবে কাজ করে তার একটি ক্ষুদ্র নমুনা।
২৮ মিনিট আগে
বাংলাদেশের সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০১১ সালের ৩০ জুন পাস হওয়া 'সংবিধান (পঞ্চদশ সংশোধন) আইন, ২০১১' একটি একটি টার্নিং পয়েন্ট। এর মাধ্যমে রাষ্ট্র ও শাসনব্যবস্থার মৌলিক কিছু কাঠামোগত পরিবর্তন আনা হয়, যার সুদূরপ্রসারী প্রভাব পরবর্তী এক দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশের সামগ্রিক রাজনীতিকে আবর্তিত করছে।
৪ ঘণ্টা আগে
এই বন্যা জনজীবনের পাশাপাশি আমাদের কৃষিখাতে যে গভীর ক্ষত তৈরি করেছে, তা সত্যিই উদ্বেগজনক। আউশ ধান, আমনের বীজতলা ও গ্রীষ্মকালীন সবজি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া অতিবৃষ্টি ও প্লাবনের কারণে বিভিন্ন জেলার মৎস্য খামারগুলো ভেসে গেছে, ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে প্রাণিসম্পদ খাতেও।
২১ ঘণ্টা আগে
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশের ইতিহাসের এক গভীর ক্ষত। নিহতদের পরিবার ন্যায়বিচারের অপেক্ষায়। রাষ্ট্রেরও দায় হচ্ছে অপরাধীদের আইনের আওতায় এনে বিচার নিশ্চিত করা। কিন্তু এই ন্যায়বিচারের পথেই যদি অসংখ্য নিরপরাধ মানুষ মিথ্যা মামলা, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা কিংবা মামলা-বাণিজ্যের শিকার হন তাহলে তা বি
১ দিন আগে