পদ্মা ব্যারাজ

পরিকল্পিত পলি ব্যবস্থাপনা না করলে বিলীন হতে পারে পদ্মা

ড. মো. মিজানুর রহমান আন্তর্জাতিক পানিসম্পদ উন্নয়ন বিষয়ক পরামর্শক। তিনি বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের অতিরিক্ত মহাপরিচালক। বাংলাদেশ ডেল্টা প্ল্যান-২১০০-এর প্রকল্প পরিচালকসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সরকারি পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। দায়িত্ব পালন করেছেন ঢাকা ওয়াসাতে উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে। এছাড়া বিশ্বব্যাংক, এডিবি, কানাডা ওয়াটার নেটওয়ার্ক এবং জুরিখ ফাউন্ডেশনের অর্থায়নে আন্তর্জাতিক পরামর্শক কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন। সম্প্রতি একনেকে অনুমোদন পাওয়া পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের নানা দিক নিয়ে তিনি কথা বলেছেন ঢাকা স্ট্রিমের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন স্ট্রিমের রিসার্চ ফেলো সানীউজ্জামান পাভেল।

ড. মো. মিজানুর রহমান

স্ট্রিম: সরকার সম্প্রতি পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প একনেকে অনুমোদন করেছে। এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে দেশের কী উপকার হবে বলে মনে করেন? ব্যারাজ দিয়ে নদীতে বাধ দিলে নদীর বাধাগ্রস্ত প্রবাহ কী প্রভাব ফেলবে?

মিজানুর রহমান: পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের নাম আগে গ্যাঞ্জেজ ব্যারাজ হিসেবে ছিল। এখন এটাকে পদ্মা ব্যারাজ বলা হচ্ছে। পদ্মা ব্যারাজ নির্মিত হবে গঙ্গা-কপোতাক্ষ (জিকে) সেচ প্রকল্পের ভাটিতে পাংশা উপজেলায়। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের গঙ্গা ব্যারাজ সমীক্ষা নামের একটি অফিস ছিল। এখন তা আছে কিনা জানি না। এই ব্যারাজ তৈরি করে পাংশার আপস্ট্রিমে (উজানে) পদ্মা নদীতে পানি ধরে রেখে পানির উচ্চতা বৃদ্ধি করা হবে। ব্যারাজের উজানে একেবারে ফারাক্কা পর্যন্ত কয়েকটি শাখা নদী পদ্মার দুই পাশ দিয়ে বের হয়ে গেছে। তার মধ্যে দক্ষিণ দিকে বা পদ্মার প্রবাহের ডান দিকে গড়াই, হিসনা, মাথাভাঙ্গা এবং ভাগীরথী নদী প্রবাহিত হচ্ছে। পদ্মার প্রবাহের বাম দিকে বা উত্তরে আছে বড়াল নদী, বাদাই নদী। চলনবিলের প্রধান উৎস বড়াল নদীর উৎসমুখে স্লুইস গেট ও বাঁধ নির্মাণের ফলে স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। গড়াইয়ের সঙ্গে সংযোগ আছে চন্দনা-বারাশিয়া নদীর, ভাটিতে মধুমতি-কুমার নদীর নেটওয়ার্ক। ওদিকে কুমার নদী ভাটিতে আড়িয়াল খা হয়ে শেষ পর্যন্ত সন্ধ্যা নদীতে মিশেছে। সন্ধ্যা এবং মধুমতি পিরোজপুরের বলেশ্বর নদীতে মিলিত হয়ে শেষ পর্যন্ত বঙ্গোপসাগরে মিশেছে। হিসনা এবং মাথাভাঙ্গা মেহেরপুরে মাথা ভাঙ্গার সঙ্গে মিলিত হয়ে ইছামতি-কালিন্দি নদী দিয়ে বঙ্গোপসাগরে প্রবাহিত হয়েছে।

পদ্মা ব্যারাজের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য হচ্ছে ওই নদীগুলো দিয়ে বিশেষ করে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে আন্তঃনদী সংযোগের মাধ্যমে শুষ্ক মৌসুমে পানি প্রবেশ করানো। আর শুকনো সময়ে পানি প্রবেশ করলে বিস্তীর্ণ এলাকায় সবুজ বেনিফিট পাবে। সবুজ মানে পরিবেশ। পরিবেশের মধ্যে হচ্ছে গাছপালা, কৃষি। সেই সঙ্গে জোয়ারের পানিতে উঠে আসা লবণাক্ততা কমবে। মিঠা পানির মৎস্য উৎপাদন বাড়বে। মোট কথা জীববৈচিত্রের ব্যাপক ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। গ্রাউন্ড ওয়াটার রিচার্জ বাড়বে। অর্থাৎ ভূ-গর্ভস্থ পানির প্রবাহ হবে। আমাদের বাংলাদেশে ব্যাপকভাবে ভূ-গর্ভস্থ পানি উত্তোলন করা হয়। বিশেষ করে শীত মৌসুমে বোরো ধান চাষ করার জন্য। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বর্ষায় বৃষ্টিপাতে তারতম্যের কারণে আজকাল আমন ধান চাষেও সম্পুরক সেচের জন্য ভূ-গর্ভস্থ পানি উত্তোলন করা হচ্ছে। সারকথা হচ্ছে, পদ্মা ব্যারাজ দিয়ে পানি ধরে রাখতে পারলে দুই পারের জনপদের জীবনমান আর পরিবেশের জন্য এক সম্ভাবনাময় অধ্যায়ের সূচনা হতে পারে।

এবার আসি অন্য কথায়। পদ্মা ব্যারাজ দিয়ে যে পানি ধরে রাখা হবে, সেই ধরে রাখা পানির উচ্চতা উজানে কতদূর পর্যন্ত বজায় থাকবে? এটা কি বাংলাদেশের বর্ডার পর্যন্ত থাকবে, না বর্ডার ক্রস করে ভারতে প্রবেশ করবে? নাকি একদম ফারাক্কা ব্যারাজের ভাটিতে গিয়ে ঠেকবে? পদ্মা ব্যারাজ দিয়ে পানি ধরে রাখলে ব্যারাজের উজানে পানির গতিশীল প্রবাহ থাকবে না। ফলে পদ্মা ব্যারাজের উজানে পানি স্থির হয়ে যাবে। এই স্থির হয়ে যাওয়া পানির পলিও স্থির হয়ে পড়বে এবং তা নদীর তলদেশকে জমা হয়ে যাবে। আর জমে যাওয়া পলি ফারাক্কা ব্যারাজের ভাটিতে ১৮ কিলোমিটার পদ্মা নদীর গতিপথ ব্লক হয়ে যাবে। তার মানে পলি বা সেডিমেন্ট যদি ম্যানেজ না করা যায়, তাহলে নদীর গতিপথই পরিবর্তিত হয়ে যেতে পারে।

স্ট্রিম: গত ১৫ জানুয়ারি ২০২৬ অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (বাপউবো) পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভায় উল্লেখ করা হয় যে ব্যারাজ নির্মাণ-পরবর্তী পলি ব্যাবস্থাপনার বিষয়ে ডিপিপিতে পর্যাপ্ত ব্যাখ্যা প্রদান করা হয়নি। বাপউবোর মহাপরিচালক নিজেও সেই সভায় উল্লেখ করেন, পদ্মা নদীর জলাধারে ও গড়াই অফটেকে প্রচুর পলি জমার সম্ভাবনা রয়েছে। আপনি আশঙ্কা করছেন, পলি ব্যাবস্থাপনা না করা গেলে কালের আবর্তে হারিয়ে যেতে পারে পদ্মার প্রবাহ। এই ব্যাপারে আরও কিছু বলুন।

মিজানুর রহমান: আমাদের দেশে ৫৭টি আন্তঃনদী অববাহিকা থেকে আনুমানিক প্রায় ১ বিলিয়ন টনের বেশি সেডিমেন্ট প্রতিবছর বাংলাদেশে প্রবেশ করে। এর মধ্যে পদ্মা দিয়েই প্রবেশ করে প্রতি বছর গড়ে কম বেশি মৌসুমভেদে ৩০০ থেকে ৬০০ মিলিয়ন টনেরও বেশি। ৩০০ মিলিয়ন টনের একটা অংশ পদ্মা ব্যারাজের উজানে নদীর তলদেশে জমা হতে থাকবে। আর এই পলি পতনের জায়গাটা যদি বাংলাদেশের ভেতরে থাকে তাহলে একরকম। আর যদি ভারতের ভেতরে চলে যায় তাহলে আরেকরকম। যদি বাংলাদেশের ভেতরে থাকে তাহলে তা ড্রেজিং করে সরিয়ে ফেলা যাবে।

বাংলাদেশ অংশে যে পলি জমবে তা আপনি টাকা খরচ করে প্রতিবছর তুলে ফেললেন নদী থেকে। তুলে ফেলে আপনি নদীর নাব্য রক্ষা করলেন, এই পলি পতন যদি পদ্মা নদীর ভারতের অংশে চলে যায় তাহলে সীমান্ত থেকে ফারাক্কা ব্যারাজ পর্যন্ত ১৮ কিলোমিটার পর্যন্ত ড্রেজিং করে তা সরাতে দিল্লির ওপর নির্ভর করতে হবে। ওই ১৮ কিলোমিটার পলি যদি না সরানো হয় তাহলে পদ্মা ব্যারাজের উজানে শুকনো মৌসুম তো দূরের কথা, বর্ষা মৌসুমেও পানি নাও আসতে পারে। এখানে বলে রাখি, পদ্মা ব্যারাজের উজানে পানির উচ্চতা বৃদ্ধি যদি বাংলাদেশ সীমান্ত পর্যন্তও থাকে, তখনও ভারতের ভেতর ১৮ কিলোমিটার পর্যন্ত ধীরে হলেও পলি পতন হতে থাকবে এবং ফারাক্কার ভাটিতে নদী ব্লক হয়ে যেতে পারে।

বাংলাদেশের দিকে ব্লক হলে পদ্মা নদী ভাগীরথীর দিকেও যেতে পারে অথবা চলনবিলের দিকেও চলে যেতে পারে। মানে পলি যদি ম্যানেজ না করা যায়, তাহলে নদীর পুরো গতিপথ পরিবর্তিত হয়ে যেতে পারে।

স্ট্রিম: এই পলি অপসারণের জন্য পিইসির সেই সভায় প্রকল্প এলাকায় সার্বক্ষণিক দুইটি ২৬ ইঞ্চি কাটার সাকশন ড্রেজার রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কিন্তু পদ্মা নদী বিশ্বের অন্যতম সর্বোচ্চ পলি পরিবহনকারী নদী। দুইটি ২৬ ইঞ্চি কাটার সাকশন ড্রেজার দিয়ে কি এই পলি অপসারণ সম্ভব? আপনার অভিজ্ঞতার আলোকে বলুন।

মিজানুর রহমান: আমাদের দেশে সীমান্ত অতিক্রম করে আসা ৫৭টি আন্তঃনদীর অববাহিকা থেকে আনুমানিক প্রায় ১ দশমিক ২ থেকে ১ দশমিক ৪ বিলিয়ন টন পলি প্রতিবছর প্রবাহিত হয়ে বঙ্গোপসাগরে চলে যায়। এই পলি দিয়েই বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চল তথা উপকূলীয় এলাকায় প্রতিবছর ল্যান্ড এক্রিয়েশন বা ভূমি পরিবৃদ্ধি হচ্ছে, সেই এক্রিয়েশনটাকে আমরা টেকসই করার চেষ্টা করি। যাকে বলি ভূমি পুনঃরুদ্ধার। মানে নদীর মোহনায় চর পড়ে, আর সাগরে নতুন নতুন দ্বীপ তৈরি হয়। সুন্দরবন ম্যানগ্রোভও তো আসলে এই পলি থেকে সৃষ্টি হয়েছে। সুন্দরবন অঞ্চল হলো একটিভ ডেল্টার একটি অংশ। বাংলাদেশের উজান থেকে আসা সেডিমেন্ট মেঘনা দিয়ে যখন সাগরে পড়ে তখন এটা ক্লকওয়াইজ মুভ করে। ক্লকওয়াইজ মানে সাগরের পশ্চিম দিকে যায়। তো পশ্চিম দিকে গিয়ে কিছু সেডিমেন্ট সাগরে সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ডে চলে যায় আর বাকিটা আমাদের পশ্চিমাঞ্চলে খুলনা যশোরের ওদিকে যে নদীগুলো আছে নদীগুলোর ভিতর ঢুকে যায়। ফলে ওখানে সুন্দরবনে ডেল্টার বৃদ্ধি হচ্ছে। ওখানে যে পলি পড়ছে সেই পলি পতন শুধু আমাদের দেশে না তা কলকাতা পর্যন্ত বিস্তৃত। কলকাতা সমুদ্র বন্দরের নাব্যতাকে কমিয়ে দেয়। কলকাতা সমুদ্র বন্দরের নাব্যতাকে বাড়ানোর জন্য বৃটিশ আমলের পরিকল্পনা অনুযায়ী ভারত ১৯৬১ সালে ফারাক্কাতে ব্যারাজ নির্মাণ শুরু করে এবং ১৯৭৫ সাল থেকে কলকাতার দিকে প্রবাহ বাড়ানোর জন্য ফারাক্কা ব্যারাজ চালু করে। অর্থাৎ ফারাক্কাতে ব্যারাজ তৈরি হয়েছে সেডিমেন্ট বা পলি ব্যবস্থাপনার জন্য, তবে তা শুষ্ক মৌসুমে যখন গঙ্গার প্রবাহ কমে যায়।

ফারাক্কা ব্যারাজ পূর্ণমাত্রায় ওপেন না থাকলে, ফারাক্কার উজানে পলি আটকা পড়ে থাকে, ফলে প্রতি বছর বিহারে বন্যা হয়। গঙ্গার আরেকটি উপনদী কোশী। কোশীতে ভারত সেচের জন্য ব্যারাজ নির্মাণ করেছে। এই কোশি ব্যারাজের উজানে এবং ভাটিতে পলি আটকা পড়ে থাকে। যার ফলে কোশী ব্যারাজের উজানে নেপালকে বড় বন্যা মোকাবেলা করতে হয়। একইভাবে অন্যান্য প্রকল্পের অভিজ্ঞতা থেকে বলা যায়, পদ্মা ব্যারাজের উজানেও পলি আটকা পড়ে যাবে। ২৬ ইঞ্চি ২টি কাটার সাকশন ড্রেজার দিয়ে পলি অপসারনের ব্যাবস্থা রাখার সিদ্ধান্ত খুবই ভালো হয়েছে। কথা হচ্ছে শত শত মিলিয়ন টন পলি ২৬ ইঞ্চি ২টি কাটার সাকশন ড্রেজার দিয়ে অপসারণ কতটুকু সম্ভব? আর এত পলি ফেলা হবে বা রাখা হবে কোথায়?

স্ট্রিম: পদ্মা ব্যারাজের অনুমোদন হবার পর থেকে অনেকেই ফারাক্কা ব্যারাজের অভিজ্ঞতার আলোকে এর তীব্র বিরোধিতা করে আসছেন। আপনি কিভাবে দেখছেন বিষয়টিকে?

মিজানুর রহমান: আমি দুই বছর কাজ করেছি ভারতের বিহারে। বিশ্ব-ব্যাংকের একটি প্রকল্পের আন্তর্জাতিক পরামর্শক টিম লিডার হিসেবে কাজ করেছি। তখন ফারাক্কাসহ অন্যান্য ব্যারাজ যেমন কোশী, গন্ধক, সোন বা ইদ্রপুরী, ঘাগারা ইত্যাদি ব্যারাজ দেখা এবং বুঝার সুযোগ হয়েছে। ওখানে আমার কাজ ছিল বিহারের পানিসম্পদ বিভাগের জন্য ম্যাথমেটিক্যাল মডেলিং সেন্টার প্রতিষ্ঠিত করা। মডেলিং সেন্টারের কাজ ছিল বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ এবং ভবিষ্যৎ নদী ভাঙন নির্ণয় করা।

নীতিশ কুমার তখন বিহারের যে মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন, তার একজন উপদেষ্টা ছিলেন, নাম ইন্দু কুমার। তিনি বিহার পানিসম্পদ বিভাগের ইঞ্জিনিয়ার-ইন-চিফ ছিলেন। অবসরে যাওয়ার পরে নীতিশ কুমার তাকে নিজের পানিসম্পদ সংক্রান্ত উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন। ভদ্রলোক নিজেই আমার কাছে এসেছিলেন। এসে বললেন, ফারাক্কার উজানের নদীগুলিতে প্রচুর পলি পরে, তাই পানি সরতে না পেরে বিহারে প্রতিবছর বন্যা হচ্ছে, বিহার সরকারের জিডিপির বিরাট অংশ এই বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনা আর জীবনজীবিকা পুনর্বাসনে চলে যায়। আপনি যেহেতু ম্যাথমেটিক্যাল মডেলের মাধ্যমে পানিসম্পদ উন্নয়নে কাজ করবেন, তাই ফারাক্কার উজানে (বিহারে) যে পলি পড়ছে, যার কারনে বিহারে বন্যা হচ্ছে, তা নিয়ে একটি মডেল স্টাডি করে দেন।

আমি একটু বিব্রত অবস্থায় পড়লাম। উনি হয়তো জানেন না যে আমি বাংলাদেশের নাগরিক। বললাম, আমি বাংলাদেশের নাগরিক। আমি স্টাডি করলে অনেকে অন্যভাবে নিবে। তখন উনি আমার হাতটা চেপে ধরলেন। বললেন– দ্যাটস হোয়াই উই নিড ইউ। আপনার এবং আমার একই সমস্যা। আপনি আছেন ফারাক্কার ভাটিতে, আপনি পাচ্ছেন না পানি। আর আমি আছি উজানে, আমি পাচ্ছি পলি। পলির কারণে আমি পানিতে ডুবছি আর ভাটিতে আপনি পানির অভাবে শুকিয়ে আছেন।

আমি স্টাডিটা হাতে নিলাম। দেখলাম যে ফারাক্কা থেকে উজানে ৮১ কিলোমিটার পর্যন্ত এই পলির একটা ইমপ্যাক্ট আছে। কিন্তু সার্ভে করা নদীর ক্রস সেকসনে তেমন পলি দেখা যায় না। আমি ফারাক্কা ব্যারাজ সম্বন্ধে বলতে পারবেন, অভিজ্ঞতা আছে, এমন একজন অভিজ্ঞ মানুষ খোঁজা শুরু করলাম। বেশি খুজতে হয়নি। আমার সাথে কাজ করতেন স্বনামধন্য প্রকৌশলী এম-ইউ গনি। মুসলমান, সেন্ট্রাল ওয়াটার কমিশনের চিফ ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন। তিনি এক সময় ফারাক্কা ব্যারাজের ইনচার্জ ছিলেন, বাড়ি পাটনা শহরের হারুন নগর। তিনি আমাকে জানালেন যে, ফারাক্কা ব্যারাজ কর্তৃপক্ষ উজানে শিহাববাজার পর্যন্ত এই ৮১ কিলোমিটার প্রতিবছর পলি অপসারণ করে থাকে। তাই মডেলে পলি দেখা গেলেও বাস্তবে নাই। ফারাক্কার পলি অপসারণ করা হয় বর্ষাকালে। পানির স্রোত এমন ভাবে তৈরী করা হয় যার সাথে পলি বা সেডিমেন্ট ভাটিতে চলে যায়। তবে কয়েক বছর পর পর পিরিওডিক ড্রেজিং করা হয় এবং প্রচুর টাকা খরচ হয়, আমার ঠিক মনে পড়ছে না, সম্ভবত ৪/৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয় ফারাক্কা ব্যারাজের উজানে ৮১ কিলোমিটার এবং ভাটিতে ফিডার ক্যানালে পিরিওডিক ড্রেজিং এর জন্য। হুগলির ভাটিতে, অর্থাৎ যেখান দিয়ে পানি ডাইভার্ট করে নিচ্ছে কলকাতার দিকে- সেখানেও তাদের ড্রেজিং করতে হয়, এমনকি কলকাতা বন্দরেও ড্রেজিং করতে হয়।

অর্থাৎ ফারাক্কা দিয়ে যে স্বপ্ন ব্রিটিশ ইঞ্জিনিয়াররা দেখিয়েছিল, যে সুবিধার কথা ভারত পরে চিন্তা করেছিল, সেই সুবিধা পুরোপুরি অর্জিত হয়নি। হয়তো প্রকল্প কর্তৃপক্ষের পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণের সক্ষমতার (অর্থ ও লোকবল) অভাব অথবা ফারাক্কা ব্যারাজ নির্মাণের জন্য যে ফিজিবিলিটি স্টাডি করা হয়েছিল তা উচ্চাভিলাষী ছিল।

আমাদেরও এই পদ্মা ব্যারাজের ফিজিবিলিটির মধ্যে বহু স্বপ্ন দেখানো আছে। শুরুতে বলেছি, সেচ পানির প্রাচুর্যতা থাকবে শুকনো মৌসুমে, ফলে গ্রাউন্ড ওয়াটার উত্তোলন করা লাগবে না, সারাবছর নদীতে পানি থাকবে, লবণাক্ততা কমে যাবে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে এবং মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে, পরিবেশও হবে উন্নত। প্রশ্ন হচ্ছে যে এই সব কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য মাত্রায় আমরা পৌঁছাতে পারব কিনা, সেই সক্ষমতা আমাদের থাকবে কিনা। তিস্তা ব্যারাজ আর টাঙ্গন ব্যারাজের অভ্যন্তরের অভিজ্ঞতা হল প্রকল্প কর্তৃপক্ষের পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণের সক্ষমতার অভাব। দুটি প্রকল্পই পরিকল্পনা করা হয়েছিল বর্ষাকালে আমন উৎপাদনে সম্পুরক সেচ দেয়ার জন্য। কিন্তু বর্তমান রাজনৈতিক এবং সামাজিক চাহিদা অনুযায়ী শুষ্ক মৌসুমে সেচ সুবিধা প্রয়োজন, যা উজান থেকে পানির প্রাপ্যতার উপর নির্ভর করে। আমি নিজেও তিস্তার জলাধারের ধারণ ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য একটি সমীক্ষা কমিটির আহ্বায়ক ছিলাম। শুষ্ক মৌসুমে সেচ দেয়ার জন্য পানি ধরে রাখার কোন জলাধারই রাখা হয় নাই প্রকল্পটিতে, ফলে শুষ্ক মৌসুমে সেচের জন্য পানি ধরে রাখার জন্য ধারণ ক্ষমতা বৃদ্ধির প্রশ্নই আসে না।

প্রস্তাবিত পদ্মা ব্যারাজ। স্ট্রিম গ্রাফিক
প্রস্তাবিত পদ্মা ব্যারাজ। স্ট্রিম গ্রাফিক

ভারত আর নেপালের আটটা ব্যারাজ আমি দেখেছি। ফারাক্কা, কোশী, ইন্দ্রপুরী, ঘাগরা, গণ্ডক, বাগমতি, কমলা এবং হরিদ্বারের ভীমগোড়া ব্যারাজ। ভীমগোদা ব্যারাজ গঙ্গা নদীর উৎস ঋষিকেশের ভাটিতে গঙ্গোত্রীর অব্যবহিত পরে নির্মিত হয়েছিল ১৮৫৪ সালে। পলি আসে না বললেই চলে; মোটামুটি ভালো ফাংশন করে যাচ্ছে। আটটা ব্যারাজের ওপেক্স রেশিও অনেক বেশি।

বাংলাদেশে চারটা ব্যারাজ আছে। তিস্তা ব্যারাজ, মনু ব্যারাজ, বুড়ি তিস্তা ব্যারাজ আর টাঙ্গন ব্যারাজ। এগুলি নিয়ে স্টাডি করা দরকার, কাঙ্ক্ষিত লক্ষে পৌছতে পেরেছে কিনা? পানি উন্নয়ন বোর্ড ৯১০ টা প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে । কত টাকা খরচ হয়েছিল, কী বেনিফিট পাওয়ার কথা ছিল, কী পাচ্ছে? প্রকল্পগুলি রক্ষণাবেক্ষণে সরকারের সক্ষমতা এবং ওপেক্স রেশিও কতটুকু? এই প্রশ্নগুলির আলোকে বিশ্লেষণ করতে হবে পদ্মা ব্যারাজের বাস্তবায়ন উত্তর রক্ষণাবেক্ষণ এব ওপেক্স রেশিও কি হবে, তার উত্তর ধারনা করা যাবে।

প্রশ্ন: আপনি বলছেন ফারাক্কার উজানে পলি আটকা পড়ে থাকে, এ ব্যাপারে তাদের ব্যবস্থাপনা কৌশল আছে । সেই রকম কিছু পদ্মা ব্যারাজে কি করা যাবে না?

মিজানুর রহমান: সেডিমেন্ট ম্যানেজমেন্টের একটা কৌশল তো আছে বটে। প্রথমেই বলেছি যে এত পলি ফেলা হবে কোথায়, সেটা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের মত অবশ্যই পুশ ডাউন করা যেতে পারে। পুশ করে পাংশার ভাটিতে গোয়ালন্দের দিকে দিয়ে দিতে হবে। গোয়ালন্দে থেকে পলি পদ্মা-যমুনার পানির সম্মিলিত স্রোতের টানে আরো ভাটিতে চলে যাবে। আমি ২০১৯ সালে কিছুদিনের জন্য পদায়ন ছিলাম গ্যাঞ্জেজ ব্যারাজ সমীক্ষা দপ্তরে। তখন সমীক্ষা শেষ। রিপোর্ট গুলি থেকে বুঝতে পেরেছিলাম যে, গোয়ালন্দের ভাটিতে এই পলি প্রবাহের কী ইমপ্যাক্ট হবে- তার কোনো জোড়ালো স্টাডি করা হয় নাই। দপ্তরটি ২০০২ সালে তৎকালীন পানিসম্পদ মন্ত্রী এল,কে, সিদ্দিকির নির্দেশে সৃষ্টি করা হয়েছিল। প্রস্তাবনার নোট শিট আমি লিখেছিলাম। সেখানে দপ্তরের নাম লিখেছিলাম “পদ্মা ব্যারাজ সমীক্ষা দপ্তর”। এল কে সিদ্দিকি সাহেব বললেন পদ্মার পরিবর্তে গ্যাঞ্জেজ লিখে নিয়ে আসেন, তা না হলে গঙ্গার পানির শেয়ার নিবেন কিভাবে? আমি তার ডিপ্লোমেটিক প্রজ্ঞায় মুগ্ধ হয়েছিলাম। পরে দেখেছি জেমস রেনেলসের ১৭৭৬ সালের ম্যাপে কোথাও পদ্মা নাম নাই। বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত এর নাম ছিল গঙ্গা।

যাই হোক, আমি ২০১৩ সালে সমীক্ষা থেকে যা বুঝতে পেরেছিলাম, তাহলো–- গোয়ালন্দের ভাটিতে কী ঘটবে? শুধু পলি পতন, সাথে লবনাক্তা, নদী ভাংগন, নৌ-চলাচলের নাব্যতা, পানি প্রবাহের তারতম্য, জীব বৈচিত্রের উপর প্রভাব কি হবে? তেমন ভালো কোন আলোচনা নাই সমীক্ষায়। আপনি পানি দিয়ে দিলেন সব ফরিদপুর, পিরোজপুর, কুষ্টিয়া, রাজশাহীতে। কী ঘটবে মানিকগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, শরিয়তপুর, মাদারীপুর, ঢাকা, চাঁদপুর, এবং বরিশালে? ঐ স্টাডিতে খুব স্ট্রং কিছু নাই। ব্যারাজে নৌ চলাচলের জন্য যে প্যাসেজ আছে, তা অল্প রাখা হয়েছে, বড় জাহাজ চলাচল করতে অসুবিধা হবে। আসলে ব্যারাজটা যদি করতেই হয় তাহলে ২০১৩ সালে করা ফিজিবিলিটি স্টাডিটা রি-ভিজিট করা উচিৎ ।

স্ট্রিম: যে ফিজিবিলিটি স্টাডির উপর ভিত্তি করে এই প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হলো আপনার কথা অনুযায়ী তা বেশ আগের। ঘটনাক্রমে এই স্টাডি সম্বন্ধে তখন থেকেই আপনার একটা সম্যক ধারণা আছে। এই অভিজ্ঞতার আলোকে আপনার অভিমত কী?

মিজানুর রহমান: আসলে ব্যারাজের ফিজিবিলিটি স্টাডি ২০১২-২০১৩ সালে শেষ করা হয়েছে। শুরু করা হয়েছিল সম্ভবত ২০১০ সালের দিকে। ২০১৩ সালে ফিজিবিলিটি স্টাডি শেষ হয় এবং ফিজিবিলিটি স্টাডির সব রিপোর্ট প্রথম আমার কাছে জমা দেওয়া হয়। তখন আমি মহাপরিচালকের চিফ-স্টাফ-অফিসার হিসেবে কাজ করি। সমীক্ষা প্রকল্পের প্রজেক্ট ডাইরেক্টর বা চিফ ইঞ্জিনিয়ার জানালেন খরচ হবে ৩৪ হাজার কোটি টাকা। আমি বললাম, এত টাকা লাগবে? আসলে তখনও পদ্মা ব্রীজ বা মেট্রোরেলের মতো মেগা-প্রকল্প শুরু হয় নাই। তাই ৩৪ হাজার কোটি টাকা আমার কাছে বিশাল মনে হয়েছিল। আমার প্রশ্ন শুনে প্রকল্প পরিচালক ছোট করে বললেন, আসলে লাগবে ৪১ হাজার কোটি টাকা, এটাকে ফিজিবল করার জন্য আমরা ৩৪ হাজার কোটি টাকায় সীমাবদ্ধ রেখেছি, ভবিষ্যতে অ্যাডজাস্ট করা হবে। শুনেছি একনেক থেকে অনুমোদিত ডিপিপির মোট ব্যয় বর্তমান মূল্য অনুযায়ী হালনাগাদ করা হয়েছে এবং এখন তা হয়েছে ৫০ হাজার কোটি, তবে একনেক থেকে শুধু ব্যারাজ এবং গড়াই মুখের অফটেক স্ট্রাকচার নির্মাণের জন্য ৩৫ হাজার কোটি টাকা অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

পদ্মা ব্যারাজ যখন হয়ে যাবে তখন এর থেকে কোনো ইনকাম আসবে? পদ্মা ব্যারাজ পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য কে টাকা দেবে? এখানে জনগণ কি ইউটিলিটি বিলের মতো কোনো টাকা দেবে? অর্থাৎ ব্যয় রিকভারি হবে না। অতএব পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণ বাবদ যে টাকা লাগবে তা সরকারকেই দিতে হবে। পদ্মা ব্যারাজ পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য লাগবে কারিগরিভাবে দক্ষ লোকবল এবং এটার নিরাপত্তা ও সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার জন্য খুবই ডেডিকেটেড কর্মী লাগবে, তার সঙ্গে লাগবে প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দ। সেটা সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে, তা না হলে পদ্মা ব্যারাজ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বহু স্লুইস গেটের মতো অকার্যকর অবস্থায় পরে থাকবে।

আমি আমেরিকাতে একটা ব্যারাজ দেখেছি, নাম অ্যালুম ক্রিক ড্যাম। আমেরিকার ওহাইও রাজ্যে অবস্থিত। মূল লক্ষ্য ছিল বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং সেন্ট্রাল ওহাইও অঞ্চলের জন্য সুপেয় পানির সরবরাহ নিশ্চিত করা। এটি তার লক্ষ্যমাত্রা ১০০% সফলভাবে অর্জন করেছে। কারণ তাদের পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণ সক্ষমতাও শতভাগ। জনগণ সুবিধাভোগী হিসেবে রেভিনিউ দিয়ে যাচ্ছে। পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের বাস্তবায়নের পরে তার পরিচালন, রক্ষণাবেক্ষণ এবং ব্যবস্থাপনার জন্য সরকারের উচ্চ পর্যায়ের একটা কমিটেড গভরনেন্স ফ্রেম-ওয়ার্ক থাকা দরকার এবং বাস্তবায়ন শুরুর আগেই প্রকল্পের ডিপিপিতে এটা অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।

স্ট্রিম: তাহলে আপনি খুব জোরালোভাবেই মনে করেন যে পদ্মা ব্যারাজের কাজ শুরুর আগে আবার নতুন করে ফিজিবিলিটি স্টাডি করা উচিৎ?

মিজানুর রহমান: আসলে ২০১৩ তে ফিজিবিলিটি স্টাডি শেষ হয় ও ডিপিপি বানানো হয়। গত ১৩-১৪ বছরে দেশের আর্থ সামাজিক ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে। নদীর মরফোলজি চেঞ্জ হয়ে গেছে। বহু নতুন অবকাঠামো গড়ে উঠেছে। ক্লাইমেটেরও পরিবর্তন হয়ে গেছে। প্রযুক্তির পরিবর্তন হয়েছে। তাই শুধু মূল্য হালনাগাদ না করে সম্পূর্ণ ফিজিবিলিটি স্টাডিটা পুনঃবিবেচনা করা উচিৎ।

স্ট্রিম: পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প নিয়ে অনেকেই এই আশঙ্কা প্রকাশ করছেন যে, ব্যারাজের উজানে পলি জমে নদীগর্ভ উপরে উঠে আসবে, ফলত জলাবদ্ধতা, বন্যা ও পানির চাপের প্রভাবে নদীভাঙন হবে অনেক। আবার ভাটিতে পানির অভাবে নদীভাঙন হবে। আপনি কিভাবে দেখছেন শঙ্কাগুলোকে?

মিজানুর রহমান: বাংলাদেশ ভাটির দেশ, পলি দ্বারা গঠিত। বন্যা আর নদী ভাঙন বাংলাদেশের প্রতি বছরের ঘটনা। কিন্তু নদীই যদি না থাকে? তাহলে বন্যা এবং নদী ভাঙন কোনটাই হবে না। যে ঘটনা ঘটবে সেটা হলো আউটফ্ল্যাংকিং। বাংলাদেশের সীমান্তের উজানে পদ্মা নদী পলিতে ব্লক হয়ে যেতে পারে এবং গঙ্গা তার দিক পরিবর্তন করে ফেলতে পারে। গঙ্গা ব্রহ্মপুত্রের দিক পরিবর্তনের ইতিহাস আছে। আগেও করেছে তবে সেটা ছিল বাংলার পলল ভুমিতে হাজার বছরের পরিক্রমা।

স্ট্রিম: আপনাকে ধন্যবাদ।

মিজানুর রহমান: আপনাদেরকেও ধন্যবাদ।

সর্বাধিক পঠিত
লেটেস্ট
Ad 300x250

সম্পর্কিত