বই আলোচনা
আরফান হাবিব

একটি ভূখণ্ডকে জানতে হলে শুধু তার ইতিহাস পড়াই যথেষ্ট নয়। একই সঙ্গে জানতে হয় সেই ইতিহাস কারা, কীভাবে এবং কোন দৃষ্টিকোণ থেকে লিখেছেন। কারণ ইতিহাস কখনোই সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ নয়। প্রত্যেক ইতিহাসেরই একটি দৃষ্টিভঙ্গি থাকে। সেই দৃষ্টিই কখনো ইতিহাসকে দলিলে, কখনো সাহিত্যকে স্মৃতিতে, আবার কখনো কোনো সাম্রাজ্যকে মানবিকতার মুখোশে রূপ দেয়।
থমাস হারবার্ট লুইনের ‘এ ফ্লাই অন দ্য হুইল’ ঠিক তেমনই এক বই। বাংলা অনুবাদে হারুন রশীদ নাম দিয়েছেন—থাংলিয়ানা: পার্বত্য চট্টগ্রামে এক ব্রিটিশ কর্মকর্তার রোমাঞ্চকর অভিযান (১৮৬৫-১৮৭২)। লেখক এই অনুবাদ গ্রন্থটিতে ইংরেজি স্মৃতিকথাকে বাংলায় অনুবাদ করে উন্মোচন করেছে উনিশ শতকের পার্বত্য চট্টগ্রামের এমন এক সময়কে, যার সম্পর্কে বাংলা ভাষায় প্রত্যক্ষ বর্ণনা খুবই দুর্লভ।
পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাস নিয়ে আমাদের আলোচনায় সাধারণত ব্রিটিশ শাসন, পার্বত্য চট্টগ্রাম রেগুলেশন, তিন সার্কেল কিংবা প্রশাসনিক পুনর্গঠনের কথা আসে। কিন্তু সেই প্রশাসনিক ইতিহাসের ভেতরে যে মানুষের জীবন ছিল, অরণ্যের পথ ছিল, নদীর স্রোত ছিল, অসংখ্য ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নিজস্ব রাষ্ট্রবোধ, সংস্কৃতি ও সামাজিক বিন্যাস ছিল। সেগুলোর বিবরণ খুব কমই পাওয়া যায়। লুইনের স্মৃতিকথা সেই শূন্যস্থান পূরণ করে।
১৮৬০ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামকে পৃথক জেলা ঘোষণার পর ব্রিটিশ প্রশাসনের অন্যতম লক্ষ্য ছিল সীমান্তকে নিয়ন্ত্রণে আনা। পূর্বদিকে তখনও লুসাই পাহাড়, আরাকান ও চিন অঞ্চলের সঙ্গে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর অবাধ যোগাযোগ ছিল। সীমান্ত মানে কেবল মানচিত্রের রেখা নয়; বাণিজ্য, আত্মীয়তা, অভিবাসন ও সংঘর্ষেরও বিস্তৃত অঞ্চল। এই রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যেই ১৮৬৫ সালে তরুণ কর্মকর্তা থমাস হারবার্ট লুইন চট্টগ্রামে আসেন। প্রথমে পুলিশ প্রশাসনে, পরে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রশাসনিক দায়িত্বে। কিন্তু তাঁর প্রকৃত পরিচয়—একজন নিবিড় পর্যবেক্ষক। প্রশাসনিক বিষয়টি বইয়ে উল্লেখ করেছেন এভাবে—
‘১৮৬৬ সালের মার্চ মাসের কলকাতা গেজেটে দেখলাম আমাকে ১০৪ রেজিমেন্টের ক্যাপ্টেন হিসেবে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। সেই সাথে আরও জানা গেল যে আমাকে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের সুপারিনটেনডেন্ট নিয়োগ করা হয়েছে। শেষের পদটি আমাকে দেওয়া হয়েছে কমিশনারের সুপারিশে যিনি পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসন করার জন্য একজন যোগ্য প্রশাসক খুঁজছিলেন। এই পদের জন্য তিনি আমাকে উপযুক্ত মনে করেছেন।’
বইটির শুরু থেকেই বোঝা যায়, পাহাড় লুইনকে ভীত করেনি; বরং আকর্ষণ করেছে। সমতলের বহু মানুষ যে ভূখণ্ডকে রহস্যময় বলে এড়িয়ে চলত, তিনি সেখানে বারবার প্রবেশ করেছেন। তাঁর বর্ণনায় পাহাড় মানে কুয়াশা, জুমক্ষেত, বাঁশবন, নদীর স্রোত, রাতের আগুন, পাহাড়ি গান এবং বিচ্ছিন্ন জনপদের এক নিজস্ব জীবনব্যবস্থা। এই সংবেদনশীল পর্যবেক্ষণ বইটিকে প্রশাসনিক নথি থেকে আলাদা করে সাহিত্যিক উচ্চতায় পৌঁছে দেয়।
তবে লুইনের সবচেয়ে বড় অবদান সম্ভবত তাঁর নৃতাত্ত্বিক পর্যবেক্ষণ। তিনি বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জীবনযাত্রা, পোশাক, অলংকার, কৃষিপদ্ধতি, সামাজিক রীতি, বিচারব্যবস্থা, ধর্মবিশ্বাস, উৎসব, শিকার ও যুদ্ধসংস্কৃতি সম্পর্কে বিস্তারিত লিখেছেন। বর্তমান সময়ের নিরিখে তাঁর দেওয়া কিছু তথ্য হয়তো সংশোধনযোগ্য কিংবা ঔপনিবেশিক পক্ষপাতদুষ্ট হতে পারে, তবুও এগুলোর ঐতিহাসিক মূল্য অনস্বীকার্য। কারণ এগুলো এমন এক সময়ের বর্ণনা, যখন পাহাড়ি সমাজ আধুনিক রাষ্ট্র ও বাজারব্যবস্থার প্রভাবের বাইরে ছিল।
লুইনের ভাষায় পাহাড়ের মানুষ কখনো সরল, কখনো সাহসী, আবার কখনো যুদ্ধপ্রিয়। এই বর্ণনাগুলো পড়তে পড়তে মনে রাখতে হয়, এগুলো একজন ঔপনিবেশিক কর্মকর্তার চোখে দেখা। এডওয়ার্ড সাঈদ যে ‘অন্যকে নির্মাণ’-এর কথা বলেছেন, লুইনের লেখায় তারও প্রতিধ্বনি শোনা যায়। পাহাড় যেন এক বিস্ময়ের জগৎ, আর পাহাড়ি মানুষ যেন ইউরোপীয় পাঠকের কৌতূহল মেটানোর উপকরণ। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, সেই দৃষ্টিভঙ্গির ভেতর দিয়েও মানুষের প্রতি তাঁর ব্যক্তিগত মমত্ববোধ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। হয়তো সে কারণেই পাহাড়ের মানুষ তাঁকে ‘থাংলিয়ানা’ নামে গ্রহণ করেছিল।
বইটির সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো, এটি পাঠককে কোনো একপাক্ষিক সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে দেয় না। একদিকে লুইন পাহাড়ের মানুষের প্রতি গভীর সহানুভূতি দেখিয়েছেন, অন্যদিকে তিনিই ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের প্রতিনিধি। তিনি স্থানীয় সমাজকে বুঝেছেন, আবার সেই সমাজকে নিয়ন্ত্রণের প্রশাসনিক কৌশলও নির্মাণ করেছেন। এই দ্বৈততা বইটির গভীরতা বাড়িয়ে দেয়। ইতিহাসের জটিলতা আসলে এখানেই—একজন মানুষ একই সঙ্গে সহৃদয়ও হতে পারেন, আবার সাম্রাজ্য বিস্তারের হাতিয়ারও হতে পারেন।
১৮৭১ সালে মেরি উইনচেস্টার অপহরণের ঘটনাকে কেন্দ্র করে যে লুসাই অভিযান হয়েছিল, তার বিবরণ বইটির রাজনৈতিক গুরুত্বকে আরও স্পষ্ট করে তোলে। লুইনের বর্ণনায় যুদ্ধের এক টানটান রোমাঞ্চ আছে; তবে আজকের পাঠক ভালো করেই জানেন, সেই অভিযানের মাধ্যমেই পাহাড়ে ব্রিটিশ শাসন আরও শক্ত হয়েছিল। ফলে এই স্মৃতিকথা পড়তে পড়তে বোঝা যায়, সাম্রাজ্য কেবল বন্দুক দিয়ে বিস্তার লাভ করে না; ভ্রমণ, মানচিত্র, ভাষা, নৃতাত্ত্বিক বর্ণনা এবং স্মৃতিকথাও সেই বিস্তারের অংশ।
অনুবাদক হারুন রশীদের কাজ এই বইটির একটি বড় প্রাপ্তি। তিনি মূল রচনার ঊনবিংশ শতাব্দীর আবহ অক্ষুণ্ন রেখেও বাংলা ভাষাকে সমকালীন পাঠকের উপযোগী করেছেন। কোথাও অনুবাদের জড়তা নেই, আবার অতিরিক্ত আধুনিকীকরণের চেষ্টাও নেই। ফলে পাঠের স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় থাকে। এর উদাহরণ হিসেবে একটা পাঠ নেওয়া যাক—
‘আমরা পরদিন খুব ভোরে যাত্রা করে সূর্যাস্ত পর্যন্ত অনেকটা পথ অতিক্রম করলাম। যাওয়ার পথে আমরা বন্যহাতিদের পথ অনুসরণ করে অগ্রসর হলাম পাহাড়ের খাঁজ বেয়ে। যাওয়ার পথে কখনো বাঁশ কেটে পথ করে নিচ্ছিলাম, কখনো আট-দশ ফুট উঁচু ঘাসের জঙ্গল পেরিয়ে যাচ্ছিলাম। দেখে মনে হতে পারে একদল পিঁপড়ে খড়ের গাদার মধ্যে পথ খুঁজে বেড়াচ্ছে।’
সাম্প্রতিক সময়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে প্রকাশিত বইগুলোর মধ্যে ‘থাংলিয়ানা’ বিশেষ গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে। কারণ এটি আমাদের ইতিহাসপাঠকেও প্রশ্ন করে। আমরা কি পার্বত্য চট্টগ্রামকে কেবল রাষ্ট্রের মানচিত্রে দেখি, নাকি মানুষের ইতিহাস হিসেবেও দেখি? আমরা কি ঔপনিবেশিক দলিলকে শুধু তথ্যের উৎস মনে করি, নাকি তার ভাষা ও ক্ষমতার সম্পর্কও বিশ্লেষণ করি? এই প্রশ্নগুলোর মুখোমুখি দাঁড় করানোর ক্ষমতাই বইটির সবচেয়ে বড় সাফল্য।
শেষ পর্যন্ত থাংলিয়ানা একটি স্মৃতিকথার চেয়ে অনেক বেশি কিছু। পার্বত্য চট্টগ্রামের অতীতকে নতুন চোখে দেখতে চাইলে, কিংবা ইতিহাসের ভেতরে লুকিয়ে থাকা ক্ষমতার ভাষা বুঝতে চাইলে, এই বই এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
বইয়ের নাম: থাংলিয়ানা, পার্বত্য চট্টগ্রামে এক ব্রিটিশ কর্মকর্তার রোমাঞ্চকর অভিযান ১৮৬৫-১৮৭২
লেখক: থমাস হারবার্ট লুইন
অনুবাদ: হারুন রশীদ
প্রকাশক: কথাপ্রকাশ
প্রকাশকাল: ফেব্রুয়ারি ২০২৪
প্রচ্ছদ: সব্যসাচী হাজরা

একটি ভূখণ্ডকে জানতে হলে শুধু তার ইতিহাস পড়াই যথেষ্ট নয়। একই সঙ্গে জানতে হয় সেই ইতিহাস কারা, কীভাবে এবং কোন দৃষ্টিকোণ থেকে লিখেছেন। কারণ ইতিহাস কখনোই সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ নয়। প্রত্যেক ইতিহাসেরই একটি দৃষ্টিভঙ্গি থাকে। সেই দৃষ্টিই কখনো ইতিহাসকে দলিলে, কখনো সাহিত্যকে স্মৃতিতে, আবার কখনো কোনো সাম্রাজ্যকে মানবিকতার মুখোশে রূপ দেয়।
থমাস হারবার্ট লুইনের ‘এ ফ্লাই অন দ্য হুইল’ ঠিক তেমনই এক বই। বাংলা অনুবাদে হারুন রশীদ নাম দিয়েছেন—থাংলিয়ানা: পার্বত্য চট্টগ্রামে এক ব্রিটিশ কর্মকর্তার রোমাঞ্চকর অভিযান (১৮৬৫-১৮৭২)। লেখক এই অনুবাদ গ্রন্থটিতে ইংরেজি স্মৃতিকথাকে বাংলায় অনুবাদ করে উন্মোচন করেছে উনিশ শতকের পার্বত্য চট্টগ্রামের এমন এক সময়কে, যার সম্পর্কে বাংলা ভাষায় প্রত্যক্ষ বর্ণনা খুবই দুর্লভ।
পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাস নিয়ে আমাদের আলোচনায় সাধারণত ব্রিটিশ শাসন, পার্বত্য চট্টগ্রাম রেগুলেশন, তিন সার্কেল কিংবা প্রশাসনিক পুনর্গঠনের কথা আসে। কিন্তু সেই প্রশাসনিক ইতিহাসের ভেতরে যে মানুষের জীবন ছিল, অরণ্যের পথ ছিল, নদীর স্রোত ছিল, অসংখ্য ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নিজস্ব রাষ্ট্রবোধ, সংস্কৃতি ও সামাজিক বিন্যাস ছিল। সেগুলোর বিবরণ খুব কমই পাওয়া যায়। লুইনের স্মৃতিকথা সেই শূন্যস্থান পূরণ করে।
১৮৬০ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামকে পৃথক জেলা ঘোষণার পর ব্রিটিশ প্রশাসনের অন্যতম লক্ষ্য ছিল সীমান্তকে নিয়ন্ত্রণে আনা। পূর্বদিকে তখনও লুসাই পাহাড়, আরাকান ও চিন অঞ্চলের সঙ্গে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর অবাধ যোগাযোগ ছিল। সীমান্ত মানে কেবল মানচিত্রের রেখা নয়; বাণিজ্য, আত্মীয়তা, অভিবাসন ও সংঘর্ষেরও বিস্তৃত অঞ্চল। এই রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যেই ১৮৬৫ সালে তরুণ কর্মকর্তা থমাস হারবার্ট লুইন চট্টগ্রামে আসেন। প্রথমে পুলিশ প্রশাসনে, পরে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রশাসনিক দায়িত্বে। কিন্তু তাঁর প্রকৃত পরিচয়—একজন নিবিড় পর্যবেক্ষক। প্রশাসনিক বিষয়টি বইয়ে উল্লেখ করেছেন এভাবে—
‘১৮৬৬ সালের মার্চ মাসের কলকাতা গেজেটে দেখলাম আমাকে ১০৪ রেজিমেন্টের ক্যাপ্টেন হিসেবে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। সেই সাথে আরও জানা গেল যে আমাকে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের সুপারিনটেনডেন্ট নিয়োগ করা হয়েছে। শেষের পদটি আমাকে দেওয়া হয়েছে কমিশনারের সুপারিশে যিনি পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসন করার জন্য একজন যোগ্য প্রশাসক খুঁজছিলেন। এই পদের জন্য তিনি আমাকে উপযুক্ত মনে করেছেন।’
বইটির শুরু থেকেই বোঝা যায়, পাহাড় লুইনকে ভীত করেনি; বরং আকর্ষণ করেছে। সমতলের বহু মানুষ যে ভূখণ্ডকে রহস্যময় বলে এড়িয়ে চলত, তিনি সেখানে বারবার প্রবেশ করেছেন। তাঁর বর্ণনায় পাহাড় মানে কুয়াশা, জুমক্ষেত, বাঁশবন, নদীর স্রোত, রাতের আগুন, পাহাড়ি গান এবং বিচ্ছিন্ন জনপদের এক নিজস্ব জীবনব্যবস্থা। এই সংবেদনশীল পর্যবেক্ষণ বইটিকে প্রশাসনিক নথি থেকে আলাদা করে সাহিত্যিক উচ্চতায় পৌঁছে দেয়।
তবে লুইনের সবচেয়ে বড় অবদান সম্ভবত তাঁর নৃতাত্ত্বিক পর্যবেক্ষণ। তিনি বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জীবনযাত্রা, পোশাক, অলংকার, কৃষিপদ্ধতি, সামাজিক রীতি, বিচারব্যবস্থা, ধর্মবিশ্বাস, উৎসব, শিকার ও যুদ্ধসংস্কৃতি সম্পর্কে বিস্তারিত লিখেছেন। বর্তমান সময়ের নিরিখে তাঁর দেওয়া কিছু তথ্য হয়তো সংশোধনযোগ্য কিংবা ঔপনিবেশিক পক্ষপাতদুষ্ট হতে পারে, তবুও এগুলোর ঐতিহাসিক মূল্য অনস্বীকার্য। কারণ এগুলো এমন এক সময়ের বর্ণনা, যখন পাহাড়ি সমাজ আধুনিক রাষ্ট্র ও বাজারব্যবস্থার প্রভাবের বাইরে ছিল।
লুইনের ভাষায় পাহাড়ের মানুষ কখনো সরল, কখনো সাহসী, আবার কখনো যুদ্ধপ্রিয়। এই বর্ণনাগুলো পড়তে পড়তে মনে রাখতে হয়, এগুলো একজন ঔপনিবেশিক কর্মকর্তার চোখে দেখা। এডওয়ার্ড সাঈদ যে ‘অন্যকে নির্মাণ’-এর কথা বলেছেন, লুইনের লেখায় তারও প্রতিধ্বনি শোনা যায়। পাহাড় যেন এক বিস্ময়ের জগৎ, আর পাহাড়ি মানুষ যেন ইউরোপীয় পাঠকের কৌতূহল মেটানোর উপকরণ। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, সেই দৃষ্টিভঙ্গির ভেতর দিয়েও মানুষের প্রতি তাঁর ব্যক্তিগত মমত্ববোধ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। হয়তো সে কারণেই পাহাড়ের মানুষ তাঁকে ‘থাংলিয়ানা’ নামে গ্রহণ করেছিল।
বইটির সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো, এটি পাঠককে কোনো একপাক্ষিক সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে দেয় না। একদিকে লুইন পাহাড়ের মানুষের প্রতি গভীর সহানুভূতি দেখিয়েছেন, অন্যদিকে তিনিই ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের প্রতিনিধি। তিনি স্থানীয় সমাজকে বুঝেছেন, আবার সেই সমাজকে নিয়ন্ত্রণের প্রশাসনিক কৌশলও নির্মাণ করেছেন। এই দ্বৈততা বইটির গভীরতা বাড়িয়ে দেয়। ইতিহাসের জটিলতা আসলে এখানেই—একজন মানুষ একই সঙ্গে সহৃদয়ও হতে পারেন, আবার সাম্রাজ্য বিস্তারের হাতিয়ারও হতে পারেন।
১৮৭১ সালে মেরি উইনচেস্টার অপহরণের ঘটনাকে কেন্দ্র করে যে লুসাই অভিযান হয়েছিল, তার বিবরণ বইটির রাজনৈতিক গুরুত্বকে আরও স্পষ্ট করে তোলে। লুইনের বর্ণনায় যুদ্ধের এক টানটান রোমাঞ্চ আছে; তবে আজকের পাঠক ভালো করেই জানেন, সেই অভিযানের মাধ্যমেই পাহাড়ে ব্রিটিশ শাসন আরও শক্ত হয়েছিল। ফলে এই স্মৃতিকথা পড়তে পড়তে বোঝা যায়, সাম্রাজ্য কেবল বন্দুক দিয়ে বিস্তার লাভ করে না; ভ্রমণ, মানচিত্র, ভাষা, নৃতাত্ত্বিক বর্ণনা এবং স্মৃতিকথাও সেই বিস্তারের অংশ।
অনুবাদক হারুন রশীদের কাজ এই বইটির একটি বড় প্রাপ্তি। তিনি মূল রচনার ঊনবিংশ শতাব্দীর আবহ অক্ষুণ্ন রেখেও বাংলা ভাষাকে সমকালীন পাঠকের উপযোগী করেছেন। কোথাও অনুবাদের জড়তা নেই, আবার অতিরিক্ত আধুনিকীকরণের চেষ্টাও নেই। ফলে পাঠের স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় থাকে। এর উদাহরণ হিসেবে একটা পাঠ নেওয়া যাক—
‘আমরা পরদিন খুব ভোরে যাত্রা করে সূর্যাস্ত পর্যন্ত অনেকটা পথ অতিক্রম করলাম। যাওয়ার পথে আমরা বন্যহাতিদের পথ অনুসরণ করে অগ্রসর হলাম পাহাড়ের খাঁজ বেয়ে। যাওয়ার পথে কখনো বাঁশ কেটে পথ করে নিচ্ছিলাম, কখনো আট-দশ ফুট উঁচু ঘাসের জঙ্গল পেরিয়ে যাচ্ছিলাম। দেখে মনে হতে পারে একদল পিঁপড়ে খড়ের গাদার মধ্যে পথ খুঁজে বেড়াচ্ছে।’
সাম্প্রতিক সময়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে প্রকাশিত বইগুলোর মধ্যে ‘থাংলিয়ানা’ বিশেষ গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে। কারণ এটি আমাদের ইতিহাসপাঠকেও প্রশ্ন করে। আমরা কি পার্বত্য চট্টগ্রামকে কেবল রাষ্ট্রের মানচিত্রে দেখি, নাকি মানুষের ইতিহাস হিসেবেও দেখি? আমরা কি ঔপনিবেশিক দলিলকে শুধু তথ্যের উৎস মনে করি, নাকি তার ভাষা ও ক্ষমতার সম্পর্কও বিশ্লেষণ করি? এই প্রশ্নগুলোর মুখোমুখি দাঁড় করানোর ক্ষমতাই বইটির সবচেয়ে বড় সাফল্য।
শেষ পর্যন্ত থাংলিয়ানা একটি স্মৃতিকথার চেয়ে অনেক বেশি কিছু। পার্বত্য চট্টগ্রামের অতীতকে নতুন চোখে দেখতে চাইলে, কিংবা ইতিহাসের ভেতরে লুকিয়ে থাকা ক্ষমতার ভাষা বুঝতে চাইলে, এই বই এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
বইয়ের নাম: থাংলিয়ানা, পার্বত্য চট্টগ্রামে এক ব্রিটিশ কর্মকর্তার রোমাঞ্চকর অভিযান ১৮৬৫-১৮৭২
লেখক: থমাস হারবার্ট লুইন
অনুবাদ: হারুন রশীদ
প্রকাশক: কথাপ্রকাশ
প্রকাশকাল: ফেব্রুয়ারি ২০২৪
প্রচ্ছদ: সব্যসাচী হাজরা
.png)

আজ ‘শার্ক অ্যাওয়ারনেস ডে’ বা আন্তর্জাতিক হাঙর সচেতনতা দিবস। হাঙর সম্পর্কে ভুল ধারণা দূর করা, সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রে তাদের অপরিহার্য ভূমিকা তুলে ধরা এবং বিলুপ্তপ্রায় এই প্রাণীটিকে রক্ষা করাই এই দিবসের প্রধান লক্ষ্য। ভূ-পর্যটক তারেক অণু ২০১০ সালের জুনের শেষ দিকে গিয়েছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবানে। মহ
১ দিন আগে
লোকালয়ে কোনো বিপন্ন বন্যপ্রাণী আটকা পড়েছে কিংবা আহত হয়েছে, এমন খবর পেলেই এলাকার মানুষ যার ওপর সবচেয়ে বেশি ভরসা করতেন, তিনি সীতেশ রঞ্জন দেব। দেশের মানুষের কাছে যিনি ‘সীতেশ বাবু’ নামেই বেশি পরিচিত। আহত পশুপাখি ও বন্যপ্রাণীদের পরম মমতায় সুস্থ করে তোলার এই অকৃত্রিম কারিগর আর নেই।
১৪ জুলাই ২০২৬
এমন অসংখ্য মেটাফোরে ছেয়ে থাকে আরবি ফুটবলের ধারাভাষ্য। বিভিন্ন তারকা প্লেয়াররাও ভূষিত হয় নানান খেতাবে। রোনালদো হয়ে যায় ‘কিংবদন্তি’ বা ‘দুর্ধর্ষ’, মেসি হয়ে যায় ‘পৃথিবীর অষ্টম আশ্চর্য’ বা ‘প্রলয়ংকরী’, এরিক হাল্যান্ড হয় ‘ট্যাংক মানব’, রিয়াদ মাহরেজ হয়ে যায় ‘মরুর দুলাল’।
১৪ জুলাই ২০২৬
‘কৌতুক অভিনেতা’ বললেই সবার আগে দিলদারের নাম মাথায় আসে। তাঁকে সবাই ভালোবেসে ‘হাসির রাজা’ বলতেন। পর্দায় তাঁর উপস্থিতি মানেই দর্শকদের মনে আনন্দের ঢেউ। একের পর এক হাততালিতে মুখর হয়ে উঠত সিনেমা হল। তবে সেই সোনালি দিনগুলো আজ শুধুই স্মৃতি। ২০০৩ সালের ১৩ জুলাই তিনি আমাদের ছেড়ে চলে যান।
১৩ জুলাই ২০২৬