১৬ জুলাই ‘বিশ্ব সাপ দিবস’

সাপ সংরক্ষণে প্রয়োজন সামাজিক আন্দোলন

প্রকাশ : ১৬ জুলাই ২০২৬, ১৩: ৪২
স্ট্রিম গ্রাফিক্স

হিন্দুধর্মের দেবাদিদেব মহাদেবের শিবের গলায় যে সাপটি থাকে তার নাম মনে করার চেষ্টা করেন তো। মহাদেবের গলায় অলংকার হিসেবে শোভা পায় সেই সাপ। এই সাপের নামই বাসুকিনাগ। ইনিই হলেন নাগরাজ। মহাভারতের সেই বিখ্যাত সমুদ্র মন্থনের সময় দেবতারা দন্দ রপর্বতকে বাধতে বাসুকিনাগকেই রজ্জু হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। দেবী মনসা হলেন এই বাসুকিনাগেরই বোন। সাপের সাথে ভারতীয় মানুষের সখ্য সেই পৌরাণিক সময় থেকেই।

বাংলাদেশে ১০০ প্রজাতির মত সাপ রয়েছে। এইসব সাপের মধ্যে ৩৭ প্রজাতির সাপ বিষাক্ত। এসবের মধ্যে ১৬ প্রজাতির সাপ সমুদ্রে বাস করে, তিন প্রজাতির কোবরা , ৫ প্রজাতির কেউটে, ২ প্রজাতির কোরালসাপ, ৬ প্রজাতির সবুজ বোড়া, এক প্রজাতির চন্দ্রবোড়া। চন্দ্রবোড়া মূলত এশিয়া অঞ্চলের সাপ। এটি ভারতীয় অঞ্চল, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অধিকাংশ এলাকা, দক্ষিণ চীন ও তাইওয়ানেও দেখা যায়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী প্রতি বছর বিশ্বে ৫৪ লাখ মানুষ সর্প দংশনের শিকার হয়। এর মধ্যে ১ লাখ মানুষ মারা যায়। প্রায় ৪ লাখ মানুষ এর কামড়ে পঙ্গুত্ব বরণ করে। সংস্থাটির মতে প্রতি বছর বাংলাদেশে ৫ লাখ ৮০ হাজার মানুষ সর্পদংশনের শিকার হন এবং প্রায় ৬ হাজার মানুষ মারা যান। ভারতে ৩০০ প্রজাতির সাপ রয়েছে যার মধ্যে ৬০ প্রজাতির সাপ বিষাক্ত। সেখানে প্রতিবছর ৬৪ হাজার মারা যায় সর্পদংশনে। এই সংখ্যা বিশ্বের সর্প দংশনে মৃত্যুর ৮০ ভাগেরও বেশি। তবে অনেক দেশে বিষধর সাপ থাকলেও মৃত্যুহার খুবই কম। যেমন অস্ট্রেলিয়াতে ১৭২ প্রজাতির সাপ রয়েছে তার মধ্যে ১০০ প্রজাতি বিষাক্ত। এ সত্ত্বেও প্রতি বছর এখানে মাত্র ৩ হাজার সর্পদংশনের ঘটনা ঘটে। এখানে বছরে সর্পদংশনে মৃত্যুর হার মাত্র ২ %।

সর্পদংশন বেড়ে যাওয়ার একটি কারণ হতে পারে নগরায়ণ। এর প্রভাবে কৃষি ভূমি কমে যাচ্ছে, কমে যাচ্ছে পুকুর ও জলাশয়। সাপ প্রাকৃতিক আবাসস্থল হারাচ্ছে। মানুষের ঘরবাড়িতে প্রবেশ করছে। আরও একটি কারণ হলো এক ফসলের জায়গায় তিন ফসলের চাষ। এই ঘটনাটা বরেন্দ্র অঞ্চলে দেখা যাচ্ছে। সেখানে আগে বছরে একটি ফসল করা হত। কিন্তু এখন বছরে তিন ফসল করা হয়। তিনটি ফসল চাষ করলে জমিতে সবসময় পানি থাকে। এবং ইঁদুরের সংখ্যাও বাড়তে থাকে। ইঁদুর বাড়ার কারণে সাপও বাড়তে থাকে। আগে এক ফসল থাকার সময় বাকি সময় ফসলি জমি পতিত পড়ে থাকত বিধায় বংশ বিস্তারের অনুকূল পরিবেশ পেত না।

সাপ আমাদের পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যেমন ধরেন দাঁড়াস সাপ। এই সাপকে রেট স্নেকও বলে। এরা কৃষকের ফসল নষ্টকারী ইঁদুর খেয়ে বেঁচে থাকে। পাশাপাশি ব্যাঙ ক্ষতিকর কীটপতঙ্গ খেয়েও কৃষিজমি রক্ষা করে।

আবার সাপ আমাদের পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যেমন ধরেন দাঁড়াস সাপ। এই সাপকে রেট স্নেকও বলে। এরা কৃষকের ফসল নষ্টকারী ইঁদুর খেয়ে বেঁচে থাকে। পাশাপাশি ব্যাঙ ক্ষতিকর কীটপতঙ্গ খেয়েও কৃষিজমি রক্ষা করে। এই সমস্ত কারণে দাঁড়াস সাপকে কৃষকের পরম বন্ধু বলা হয়। এরা গ্রামের ঝোপঝাড়, মাঠ বা পুরনো বাড়ির আশেপাশে থাকে। এরা খুব চটপটে ও নির্বিষ হয়। আবার ঢোঁড়া সাপ জলাশয়ের আশেপাশে থাকে। এরা ছোট মাছ. ব্যাঙ খেয়ে বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য রক্ষা করে। শঙ্খিনী সাপটি বিষাক্ত হলেও এরা গোখরা, কালাচ সাপের মতো বিষধর সাপকে খেয়ে মানুষের অনেক উপকার করে।

পাইথনের কথাই ধরেন। এটিও পৃথিবীর অন্যতম বৃহত্তম সাপ। একে ময়াল নামেও ডাকা হয়। এদের বিষ থাকে না। তবে মজার বিষয় হচ্ছে এই সরীসৃপ প্রাণীটির পিছনের পা এর চিহ্ন রয়েছে, এটি এখনো বিলুপ্ত হয়নি। অজগররা সাধারণত জোরে পেঁচিয়ে ধরে শিকারকে। তারপর শিকারের মাথার দিক থেকে খেতে শুরু করে। পরে পুরো শিকারটা গিলে খায়। শিকার হজম করতে কয়েকদিন সময় লেগে যায়। তবে মৃত কোন প্রাণী এরা খায় না। এটি আফ্রিকার সাহারায় পাওয়া যায়। এশিয়া মহাদেশে ভারত, বাংলাদেশ, নেপাল, পাকিস্তান, মিয়ানমার, শ্রীলঙ্কা, ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়াতেও এর দেখা মিলে। বিশ্বে অজগরের ১০ থেকে ১৩টি প্রজাতি রয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশে তিন প্রজাতির অজগর পাওয়া যায়। সিলেট থেকে একেবারে টেকনাফ পর্যন্ত যে অজগর দেখা যায় সেটি বার্মিজ পাইথন। এটিই বেশি পাওয়া যায়। রাজশাহী ও রংপুরের দিকে আরেক প্রজাতির অজগর দেখা যায়। শুধু চট্টগ্রামে আরও এক প্রজাতির অজগর দেখা যায়। দেশি অজগর যেটা এটা ময়াল সাপ নামেও পরিচিত। একে ভারতীয় অজগরও বলা হয়। এছাড়া এরা ইন্ডিয়ান রক পাইথন বা এশিয়ান রক পাইথন নামওে পরিচিত। এরা দৈর্ঘে ৩ মিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন-২০১২ অনুযায়ী এই প্রাণীটি সংরক্ষিত।

লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে মূলত বার্মিজ পাইথন পাওয়া যায়। লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানটি মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জে অবস্থিত। এটি সংরক্ষিত বনাঞ্চল। সম্প্রতি একটি পত্রিকার প্রকাশিত সংবাদ মতে এখানকার অজগর সাপ প্রায়ই লোকালয়ে দেখা যাচ্ছে। অনেক অজগর আটকা পড়েছে বাসাবাড়িতে। আবার কিছু আটকা পড়ছে কৃষি জমিতে, চা বাগানে। ২০২৫ সালে জানুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত কমলগঞ্জ ও শ্রীমঙ্গল এলাকায় ১০টির মতো অজগর ধরা পড়েছে। গত ৬ বছরে এখানে ১০০টিরও বেশি অজগর ধরা পড়েছে। বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের তথ্যমতে, তারা ২০২১ সালে ১০টি অজগর, ২০২৩ সালে ১৬টি অজগর, ২০২৪ সালে ১৩টি অজগর এবং ২০২৫ সালের মে মাস পর্যন্ত ৭টি অজগর উদ্ধার করেছে। অর্থাৎ বন্যপ্রাণী এখন আর বনে থাকেত চাইছে না। লোকালয়ে চলে আসছে।

বনে বন্যপ্রাণীর জন্য যে পরিবেশ থাকা দরকার, যে খাবার থাকা দরকার, যে গাছপালা থাকা দরকার; তা আর নেই। ফলে অজগর সাপ এত পরিমাণে লোকালয়ে চলে আসছে। কিন্তু অজগর সাপের কি লোকালয়ে আসার কথা। অজগর কেন কোন সাপই আসলে লোকালয়ে আসতে চায় না। এরা তো প্রধানত বৃক্ষবাসী। অথবা নদী, হাওর বা ঝিলের কাছেও এদের পাওয়া যায়। তাহলে লোকালয়ে আসার কারণ কী হতে পারে। কোন কোন ক্ষেত্রে আবাস ঝুঁকির মধ্যে থাকলে অজগর লোকালয়ে আসতে পারে। আবার খাবার সংকট হলেও আসে। অনেক সময় দেখা গেছে বনে আগুন লাগার কারণে বা প্রচণ্ড গরমেও অজগর লোকালয়ে চলে আসে। বর্ষাকালে নিচু এলাকায় পানি জমে থাকে। এই কারণে অজগর সাপ লোকালয়ে উঁচু এলাকায় চলে আসে। আবার আবাসভূমি স্যাঁতসেঁতে হয়ে পড়লেও এরা জায়গা পরিবর্তন করে।

সর্পদংশন বেড়ে যাওয়ার একটি কারণ হতে পারে নগরায়ণ। এর প্রভাবে কৃষি ভূমি কমে যাচ্ছে, কমে যাচ্ছে পুকুর ও জলাশয়। সাপ প্রাকৃতিক আবাসস্থল হারাচ্ছে। ফলে অনেক সাপ খাবার এবং আশ্রয়ের জন্য লোকালয়ে চলে আসছে।

লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে অনেক পর্যটক প্রবেশ করে প্রতিদিন। পর্যটকদের অধিকাংশই পরিবেশ সচেতন নন। তারা কোন এক সময় প্রকৃতির কাছে আসেন। প্রকৃতিকে উপভোগ করেন। প্রকৃতিকে শুধু ভোগই করেন। সম্মান করেন না। ফলে প্রকৃতির প্রতি তাদের বিরূপ আচরণের কারণে প্রকৃতির সন্তানেরা টিকে থাকার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলছে। যেমন, যেখানে সেখানে প্লাস্টিকের বর্জ্য, ময়লা আবর্জনা ফেলার কারণে বনের স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এছাড়া এখানে খাল ও ছড়া ভরাট করা হচ্ছে। গাছপালা কেটে ফেলা হচ্ছে। এমনই খবর প্রকাশ পেয়েছে পত্রিকায়। ফলে অজগরের স্বাভাবিক আবাস সংকট হচ্ছে। খাবার সংকটও হচ্ছে। খাদ্য সংকটের পাশাপাশি সেখানে পানি সংকটও দেখা যাচ্ছে। লাউয়াছড়ার ভেতরের ছড়া ও খালগুলো শুকিয়ে যাচ্ছে। এতে করে পানির জন্যও এরা লোকালয়ে চলে আসতে পারে। আরেকটি কারণ হতে পারে। বানর ও হরিণের খাদ্য-পানির সংকটে লোকালয়ে চলে আসছে। হরিণ যেহেতু অজগরের খাবার। সেহেতু এই খাবারের খোঁজে অজগর হরিণের পিছু পিছু চলে আসতে পারে। কিন্তু যে হারে অজগর সাপটি লোকালয়ে আসছে আর যে হারে অজগর সাপ ধরা পড়ছে, তাতে এর সংখ্যা অনেক কমে যেতে পারে। এমনিতেই বাংলাদেশে সাপটিকে সংরক্ষিত প্রাণী হিসেবে ধরা হয়েছে, এর মধ্যে এটি যদি এভাবে লোকালয়ে আসে আর ধরা পড়ে; তাহলে এরও বিলুপ্তি ঠেকানো যাবে না।

প্রতি বছরই ১৬ জুলাই সারা বিশ্বে সাপ দিবস পালন করা হয়। এর উদ্দেশ্য হলো সাপ যেভাবে আমাদের সমাজে খারাপ হিসেবে উপস্থাপিত, তা থেকে বেরিয়ে এসে বৈজ্ঞানিক ধারণা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সাপ ও মানুষের সহাবস্থান স্বাভাবিক করা। সাপ নিয়ে যেসব কুসংস্কার আছে সেসব ভেঙে ফেলা। বিশ্বে প্রায় ৩ হাজার ৫ শত প্রজাতির সাপ রয়েছে, যার বেশির ভাগই নিরীহ ও বিষহীন। তবে বাংলাদেশে বর্তমানে সাপ নিয়ে অনেক ভ্রান্ত ধারণাই কেটে গেছে। স্নেক রেসকিউ টিম-বাংলাদেশের মতো অনেক সংগঠন তৈরি হচ্ছে যারা বাংলাদেশের যে কোন প্রান্ত থেকে সাপ রক্ষা করে। শুরুতে এরা ১০ জন নিয়ে রেসকিউ টিম গঠন করলেও বর্তমানে এদের সদস্য ৩০০ প্রায়। তারা বিভিন্ন জায়গায় সাপ উদ্ধার করছেন। সাপের প্রতি তাদের এই দরদ প্রশংসা করার মতো। স্নেক রেসকিউ টিম বাংলাদেশের মতো সাপ সংরক্ষণে আরও অনেক সংগঠন কাজ শুরু করতে পারে। তাহলে মানুষের মধ্যকার ভ্রান্তিগুলো দূর হবে। সাপ ও মানুষ বসবাস করতে পারবে একসাথে।

  • ড. বিভূতি ভূষণ মিত্র: পরিবেশ বিষয়ক লেখক
Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত