সবুজের নতুন ভাষা: নিউ মিডিয়া, জেন জি ও পরিবেশ-রাজনীতির নতুন পৃথিবী

প্রকাশ : ০৫ জুন ২০২৬, ১৪: ১৫
স্ট্রিম গ্রাফিক

বিশ্ব পরিবেশ দিবস এখন আর কেবল জাতিসংঘের কোনো আনুষ্ঠানিক দিবস নয়। নয় গুরুগম্ভীর সেমিনার বা ফরমায়েশি র‌্যালি। এটি এখন টিকটকের একটি ভিডিও, ইনস্টাগ্রামের একটি রিল, ইউটিউবের একটি ভ্লগ, কিংবা কোনো জেন-জি’র একাকী পাহাড়যাত্রার নিরব স্টোরি। পৃথিবীকে বাঁচানোর ভাষা বদলে গেছে। জলবায়ু আন্দোলনের পোস্টার এখন আর শুধু রাজপথে টাঙানো হয় না, সেটি অ্যালগরিদমেও ট্রেন্ড করে।

একসময় পরিবেশ সচেতনতার প্রধান বাহক ছিল প্রথাগত সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম। পত্রিকার বিশেষ সংখ্যা, টেলিভিশনের ডকুমেন্টারি, কিংবা আন্তর্জাতিক সম্মেলনের রিপোর্টের মধ্যেই পরিবেশ-আলোচনা সীমাবদ্ধ থাকত। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশক থেকে দৃশ্যপট পাল্টাতে শুরু করে। নিউ মিডিয়া—বিশেষত সোশ্যাল মিডিয়া—পরিবেশ আন্দোলনকে গণতান্ত্রিক করে দেয়। এখন আর পরিবেশবাদ কেবল বিজ্ঞানী, রাষ্ট্র বা সাংবাদিকের একচেটিয়া ক্ষেত্র নয়; এটি সাধারণ তরুণদের প্রতিদিনের ভাষা, নন্দন ও জীবনযাপনের অংশ।

জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কিত কনটেন্টের সবচেয়ে দ্রুত বিস্তার ঘটে ইউটিউব, ফেসবুক, টিকটক ও ইনস্টাগ্রামে। কারণ নিউ মিডিয়া তথ্যকে শুধু জানায় না, অনুভূতিতে রূপান্তর করে। একটি গলতে থাকা হিমবাহের ভিডিও, একটি ক্ষুধার্ত মেরু ভালুক, কিংবা প্লাস্টিকে জড়িয়ে থাকা সামুদ্রিক কচ্ছপ—এই দৃশ্যগুলো মানুষের মধ্যে যে আবেগ তৈরি করে, তা অনেক সময় সম্পাদকীয় বা গবেষণা প্রতিবেদনের চেয়েও বেশি কার্যকর হয়ে ওঠে।

এখানেই নিউ জেনারেশন বা জেন জির আগমন গুরুত্বপূর্ণ। জেন জিকে প্রায়ই ‘উদাসীন’ বা ‘স্ক্রিন-আসক্ত’ প্রজন্ম বলা হয়। অথচ এই প্রজন্মই বৈশ্বিকভাবে সবচেয়ে বেশি ইকো-ফ্রেন্ডলি আচরণ করছে। থ্রিফট ফ্যাশন, সেকেন্ড-হ্যান্ড সংস্কৃতি, প্লাস্টিক বর্জন, ভেগান খাদ্যাভ্যাস, কার্বন ফুটপ্রিন্ট নিয়ে সচেতনতা—এসবের বড় চালিকাশক্তি আজকের তরুণেরা।

বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের তথ্যমতে, জেন জি ভোক্তাদের বড় অংশ এখন পরিবেশবান্ধব ব্র্যান্ড বেছে নিতে আগ্রহী, এমনকি বেশি দাম দিয়েও। তারা ‘কম কিনো, ভালো কিনো’ নীতিতে বিশ্বাস করে। তাদের কাছে পৃথিবী শুধু একটি গ্রহ নয়, বরং একটি নৈতিক দায়িত্ব। এই প্রজন্মের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো প্রাণীপ্রেম। বিড়াল, কুকুর কিংবা পথপ্রাণী নিয়ে জেন জির আবেগকে অনেকেই নিছক ‘কিউট কালচার’ বলে উড়িয়ে দেন। কিন্তু এর ভেতরে রয়েছে গভীর পরিবেশ-মনস্তত্ত্ব। আধুনিক নগরসভ্যতায় মানুষ যখন ক্রমশ বিচ্ছিন্ন ও একাকী, তখন প্রাণীদের সঙ্গে সম্পর্ক নতুন ধরনের সহাবস্থান শেখাচ্ছে। পরিবেশ-দর্শনের ভাষায় একে বলা যায় ‘পোস্ট-হিউম্যান সেন্সিবিলিটি’—যেখানে মানুষ নিজেকে আর প্রকৃতির মালিক নয়, বরং সহযাত্রী হিসেবে ভাবতে শেখে।

এই কারণেই জেন জির সলো ট্যুরও কেবল পর্যটন নয়; সেটি প্রকৃতির কাছে ফিরে যাওয়ার এক নীরব রাজনৈতিক ভাষা। পাহাড়, সমুদ্র, বন কিংবা গ্রামীণ নির্জনতা—এসব জায়গায় গিয়ে তারা নিঃসঙ্গ হয় না। বরং ডিজিটাল ক্লান্তির ভেতর প্রকৃতির সঙ্গে এক ধরনের অন্তরঙ্গ সংযোগ তৈরি করে। আধুনিক মনোবিজ্ঞানীরা একে ‘ইকোথেরাপি’ বলছেন। প্রকৃতি এখানে শুধু দৃশ্য নয়, মানসিক আশ্রয়।

এই প্রজন্মকে বুঝতে হলে গ্রেটা থুনবার্গকে বুঝতে হবে। ষোলো বছরের এক কিশোরী কীভাবে জাতিসংঘের মঞ্চে দাঁড়িয়ে বিশ্বনেতাদের জবাবদিহির মুখোমুখি করল—এটি কেবল ব্যক্তিগত ক্যারিশমা নয়; এটি নিউ মিডিয়ার যুগে নতুন রাজনৈতিক শক্তির জন্ম। গ্রেটা মূলত একটি প্রতীক—একটি টলমলে চোখের প্রজন্মের প্রতিনিধি, যারা পৃথিবীকে মৃত দেখতে চায় না। পরিবেশ এখন কেবল বৈজ্ঞানিক সংকট নয়; এটি ভিজ্যুয়াল কালচার, ডিজিটাল ন্যারেটিভ এবং অ্যালগরিদমিক আন্দোলনের অংশ। #SaveThePlanet, #ClimateJustice কিংবা #NoPlanetB—এই হ্যাশট্যাগগুলো এখন রাজনৈতিক স্লোগানের সমতুল্য।

তবে নিউ মিডিয়ার এই শক্তির বিপরীত দিকও আছে। একই প্ল্যাটফর্মে যেমন পরিবেশ আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে, তেমনি ছড়িয়ে পড়ে ভুয়া তথ্য, গ্রিনওয়াশিং এবং করপোরেট প্রচারণা। অনেক ব্র্যান্ড নিজেদের পরিবেশবান্ধব হিসেবে তুলে ধরে, অথচ বাস্তবে দূষণ অব্যাহত রাখে। ফলে নিউ মিডিয়ার যুগে সচেতনতা যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে তথ্যযুদ্ধও। নতুন বিশ্বব্যবস্থায় পরিবেশ এখন আর কেবল প্রকৃতির প্রশ্ন নয়; এটি অর্থনীতি, প্রযুক্তি, রাজনীতি ও সংস্কৃতির কেন্দ্রীয় ইস্যু। জলবায়ু পরিবর্তন এখন সীমান্ত মানে না। বাংলাদেশের উপকূলের লবণাক্ততা, আফ্রিকার খরা, ইউরোপের দাবানল, কিংবা আর্কটিকের বরফ গলা—সবই একই গল্পের বিভিন্ন অধ্যায়।

কিছুদিন আগেও পরিবেশবাদ মানেই ছিল হাতে প্ল্যাকার্ড, মুখে স্লোগান আর দীর্ঘ বক্তৃতা। এখন পরিবেশবাদ কখনো একটি “Before–After” রিল, কখনো একটি ক্যাফের কাগজের স্ট্র, আবার কখনো বন্ধুর সঙ্গে পাহাড়ে গিয়ে তোলা একটি ছবির ক্যাপশন—“Leave nothing but footprints.” মজার বিষয় হলো, যে তরুণদের একসময় বলা হতো তারা শুধু স্ক্রল করে, তারাই এখন স্ক্রল করতে করতেই পৃথিবী বাঁচানোর নতুন ভাষা শিখছে। অ্যালগরিদমের এই যুগে অনেক সময় একটি ভাইরাল ভিডিও এমন কাজ করে, যা কয়েকটি আন্তর্জাতিক সেমিনারও করতে পারে না।

তবে এই নতুন পরিবেশ-সচেতনতার মধ্যেও এক ধরনের মধুর স্যাটায়ার আছে। যে তরুণ সকালে প্লাস্টিক বর্জনের পোস্ট দেয়, ফ্যাশন সচেতন টোটে ব্যাগ কাঁধে ঝোলায়; সে-ই হয়তো বিকেলে অনলাইন শপিংয়ের তিনটি প্যাকেট গ্রহণ করছে। যে ইনফ্লুয়েন্সার “সেভ দ্য প্ল্যানেট” বলে ভিডিও বানায়, সে ভিডিও ধারণ করতে হয়তো তিনটি লাইট, দুটি ক্যামেরা আর একগাদা বিদ্যুৎ ব্যবহার করছে। কিন্তু এখানেই নিউ মিডিয়ার শক্তি—এটি নিখুঁত মানুষ তৈরি করে না, বরং অসম্পূর্ণ মানুষদেরও পরিবর্তনের আলোচনায় যুক্ত করে। পরিবেশ-রাজনীতির নতুন পৃথিবীতে তাই নায়ক নয়, অংশগ্রহণই সবচেয়ে বড় বিষয়।

এই পৃথিবীতে জেন জি এক অদ্ভুত প্রজন্ম। তারা একইসঙ্গে অবুঝ, সবুজ, আধমরা এবং আশাবাদী। তাদের চোখে উদ্বেগ আছে, কিন্তু সেই উদ্বেগের ভেতরেই আছে পৃথিবীকে বাঁচিয়ে রাখার আকাঙ্ক্ষা। তারা হয়তো পুরোনো রাজনৈতিক ভাষায় কথা বলে না, কিন্তু তারা পৃথিবীর সঙ্গে সম্পর্কের নতুন ভাষা তৈরি করছে। রবীন্দ্রনাথের ‘সবুজের অভিযান’ কবিতাটি আজকের জেন-জি প্রজন্মের জন্য একটি নিখুঁত মেটাফোর, যেখানে কবি বর্ণিত ‘কাঁচা’ ও ‘অবুঝ’ তরুণরাই মূলত আজকের ডিজিটাল যুগের প্রথা ভাঙা কিশোর-যুবা। সমাজের পুরোনো চিন্তাধারা, জরাজীর্ণ নিয়মকানুন এবং স্টেরিওটাইপকে (যা কবিতায় ‘আধ-মরা’) বুড়ো আঙুল দেখিয়ে জেন-জি তাদের নিজস্ব ‘ক্যানসেল কালচার’, ‘মিম ল্যাঙ্গুয়েজ’ কিংবা প্রথাগত ক্যারিয়ারের বাইরে গিয়ে নতুনত্ব সৃষ্টির মাধ্যমে সমাজে প্রতিনিয়ত ‘ঘা মেরে বাঁচানোর’ কাজটি করছে। দুনিয়া তাদের ‘অবুঝ’, অস্থির বা লক্ষ্যহীন বললেও—কবিতার লাইনগুলোর মতোই—তারা সব সামাজিক ‘তর্ক হেলায় তুচ্ছ করে’ নিজের শর্তে বাঁচতে এবং নিজস্বতা নিয়ে মাথা উঁচু করে নাচতে জানে। তথাকথিত সামাজিক জড়তা ও নিয়মকানুনের শৃঙ্খল ভেঙে জেন-জি যেভাবে নিজেদের অধিকার, মানসিক স্বাস্থ্য এবং বৈষম্যহীন পৃথিবীর পক্ষে অকপটে আওয়াজ তুলছে, তা যেন রবিঠাকুরের সেই চিরতারুণ্যের ‘সবুজ’ অভিযানেরই এক আধুনিক, নির্ভীক ও ডিজিটাল সংস্করণ।

শেষ পর্যন্ত পৃথিবীকে রক্ষা করবে তারাই—যাদের আমরা অবুঝ বলি। যারা রাতভর স্ক্রল করতে করতে হঠাৎ কোনো আহত কুকুরের জন্য কেঁদে ফেলে, যারা পাহাড়ে গিয়ে ছবি তোলে ঠিকই, কিন্তু সেই ছবির ভেতরে নিজের নিঃসঙ্গতাও রেখে আসে, যারা প্লাস্টিক বর্জনের পোস্ট দেয়, আবার বিষণ্নতার স্টোরিও শেয়ার করে। এই আধমরা পৃথিবীতে আধমরারাই কখনও কখনও জীবনের সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ হয়ে ওঠে। কারণ প্রকৃতির মতো তারাও আহত, ক্লান্ত, কিন্তু এখনও সম্পূর্ণ মৃত নয়।

লেখক: চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক

সম্পর্কিত