তেলসমৃদ্ধ ভেনেজুয়েলায় ট্রাম্প প্রশাসনের অতি নাটকীয় আক্রমণ এবং দেশটির বৈধ প্রেসিডেন্ট ও তাঁর স্ত্রীকে গভীররাতে বন্দী করে নিয়ে আসা তাবত বিশ্ব সভ্যতাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করার শামিল। বিষয়টি এমন যে, শক্তি থাকলে একটি দেশ এবং তার প্রধান যা ইচ্ছে তাই করতে পারেন। এখানে যেন বৈধ, অবৈধ, যৌক্তিক ও অযৌক্তিক কোনো কারণই কাজ করে না। শক্তিই যেন সব! তাহলে গোটা বিশ্বে এত মানবাধিকার সংস্থা, এত এত বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন, গবেষণা ও শাস্ত্র নিয়ে কথার মানে কি?
আমরা জানি, বহুদিন ধরেই মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের চোখে একটি বড়ো কাঁটা হয়ে আছে ভেনেজুয়েলা। এ বিরোধিতার সূচনা হয়েছিল নিকোলাস মাদুরোর পূর্বসূরি হুগো শ্যাভেজের সময় থেকেই। শ্যাভেজ এমন কিছু ‘বিপজ্জনক’ ধারণার প্রচার করেছিলেন, যেগুলো মার্কিন পুঁজিবাদী ব্যবস্থার সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক। যেমন, সবার জন্য বিনামূল্যে শস্যসেবা নিশ্চিত করা, দরিদ্র জনগণের কল্যাণে রাষ্ট্রের সক্রিয় ভূমিকা এবং জাতীয় সম্পদের ওপর জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা। যদিও এতে ভেনেজুয়েলার অর্থনীতি দুর্বল হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু একটি দেশের একজন নেতা তাঁর দেশের জন্য, জনগণের জন্য বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ নিতে পারেন। সেটি সবই হয়ত জনগণকে সেবা দিবে না। সেই হিসাব জনগণ রাখবেন, তারাই ব্যবস্থা নিবেন। সেই অজুহাত দেখিয়ে অন্য একটি দেশ তো একটি স্বাধীন দেশে ছো মারতে পারেনা।
বর্তমানে ট্রাম্প নিকোলাস মাদুরের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছেন যে, তিনি 'নার্কো-সন্ত্রাসবাদের' একজন মূল হোতা। এ অভিযোগও তো অবাস্তব ও অতিরঞ্জিত। বিশ্ব প্রত্যক্ষ করেছে যে, মার্কিনের ক্ষেত্রে এ ধরনের উদাহরণের শেষ নেই। ২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণ করেছিল সম্পূর্ণ মিথ্যার উপর ভিত্তি করে। যুক্তরাষ্ট্র দাবি করেছিল যে, ইরাকের কাছে গণবিধ্বংসী অস্ত্র রয়েছে, যা বিশ্ব নিরাপত্তার জন্য হুমকি। পরে প্রমাণিত হলো এসব অস্ত্র ইরাকের আদৌ ছিল না। তবুও সেই অজুহাতে ইরাকে পূর্ণমাত্রার সামরিক আগ্রাসন চালানো হলো। মার্কিন বাহিনী দেশটি ধ্বংস করে দিয়েছে এবং এই যুদ্ধে কয়েক লাখ ইরাকি প্রাণ হারিয়েছেন। অবকাঠামো ধ্বংস করে পুরো সমাজকে ভেঙে ফেলা হয়েছে। এই অধিকার মার্কিনিদের কে দিয়েছে? তাদের অস্ত্র আর অর্থশক্তি? এই শক্তি একটি দেশের কতদিন আর কতকাল থাকে?
যুক্তরাষ্ট্র চায় ভেনেজুয়েলার তেলশিল্পকে নতুন করে সচল করতে, যেখানে নেতৃত্ব দেবে মার্কিন তেল কোম্পানিগুলো। ট্রাম্প বলেছেন, এই খাত থেকে আসা আয় যাবে ভেনেজুয়েলার জনগণের কাছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের কাছেও। ট্রাম্প প্রশাসন আরও জানায়, বহু বছর আগে ভেনেজুয়েলা তেল শিল্প জাতীয়করণ করায় যুক্তরাষ্ট্র যে ক্ষতির মুখে পড়েছিল, তার ক্ষতিপূরণ হিসেবেই এই অর্থ নেওয়া হবে। এত রীতিমতো এক ধরনের ডাকাতি! ট্রাম্প বলেছেন, যথাযথ ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত দেশটি যুক্তরাষ্ট্র পরিচালনা করবে। যুক্তরাষ্ট্রকে এই অধিকার কে দিয়েছে?
ইতিহাসবিদ ম্যাকফারসন বলেন, এই অঞ্চলে মার্কিন হস্তক্ষেপের পর শান্তি, স্থিতিশীলতা ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এমন ঘটনা খুবই বিরল। মার্কিন হস্তক্ষেপগুলো প্রায় সব ক্ষেত্রেই ক্ষমতার পালাবদল নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা তৈরি করে। ট্রাম্প এখন বুঝতে পারছেন না যে, ভেনেজুয়েলায় তিনি আসলে কী শুরু করেছেন। দক্ষিণ আমেরিকার এই দেশ ইউক্রেন নয়, এমনকি এটি আফগানিস্তান, ইরাক বা লিবিয়ার মতোও নয়। অথচ মাদুরোকে ধরার জন্য সামরিক হামলার নির্দেশ দিয়ে ট্রাম্প দুই কোটি ৮০ লাখ মানুষের একটি দেশকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছেন। সেই সঙ্গে তিনি গত কয়েকদশকের মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির ব্যর্থতা থেকে পাওয়া সবচেয়ে স্পষ্ট ও কষ্টার্জিত শিক্ষাটিকেও গ্রহণ করলেন না। শাসনব্যবস্থা বা রেজিম চেঞ্জের জন্য অপেক্ষমাণ দুর্বল কোনো দেশকে আক্রমণ করা সহজ কিন্তু জয়ী হওয়া কঠিন।
দুই দশক ধরে দক্ষিণ ও মধ্য আমেরিকায় এবং ক্যারিবীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের দীর্ঘ ইতিহাসেরই ধারাবাহিকতা ভেনেজুয়েলায় মার্কিন বোমাবর্ষণ এবং প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে তুলে নেওয়া। দক্ষিণ আমেরিকার কোনে দেশে এটি প্রথম সরাসরি মার্কিন সামরিক হামলা। আগ্রাসন, দখলদারিত্ব এবং বর্তমান পরিস্থিতির সাথে সবচেয়ে সাদৃশ্যপূর্ণ ঘটনা হিসেবে ১৯৮৯ সালে পানামার স্বৈরশাসক ম্যানুয়েল নরিয়েগাকে আটকের বিষয়টি সামনে চলে আসে। যুক্তরাষ্ট্রের গোপন তৎপরতা ব্রাজিল, চিলি ও আর্জেন্টিনার মতো দেশগুলোতে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকার উৎখাতে এবং সামরিক স্বৈরশাসনের পথ প্রশস্ত্র করতে সহায়তা করেছে।
ব্রাজিলের রিওডি জেনিরোর স্টেট ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক বলেন, ‘মার্কিন সামরিক হামলা পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা নীতিতে একটি বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। কয়েক সপ্তাহ আগে ট্রাম্প প্রশাসনের প্রকাশিত নতুন জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলে এ অবস্থান স্পষ্ট করা হয়েছিল।’ গোটা বিশ্বে এই মার্কিন তৎপরতা গোটা বিশ্ব সভ্যতাকে হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছে। এ থেকে কেউই যেন নিরাপদ নয়। তাই প্রশ্ন উঠছে, এরপর কে? অনেকেই ধরে নিয়েছেন ট্রাম্পের পরবর্তী টার্গেট হচ্ছে ইরান। মার্কিনকে মনে রাখতে হবে, পৃথিবীর কোথাও তারা পজিটিভ কিছু অর্জন করতে পারেনি, যদিও ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে যেখানেই তাদের স্বার্থ ছিলো সেখানেই। আমেরিকাকে সরে আসতে হয়েছিল ভিয়েতনাম থেকে, আফগানিস্তান থেকে। ইরান আক্রমণ করলে সহজেই যে পার পেয়ে যাবে সেটি কিন্তু নয়।
ভেনেজুয়েলা আক্রমণ আর মাদুরো ও তার স্ত্রীকে গ্রেফতার করে নিয়ে আসা বহু মাস ধরে করা সূক্ষ্ম পরিকল্পনা আর অনুশীলনের ফল, যাতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল মার্কিন সেনাবাহিনীর এলিট শাখা ‘ডেলটা ফোর্সকে।’ এ পরিকল্পনা স্নায়ুযুদ্ধের পর লাতিন আমেরিকার সবচেয়ে বড়ো মার্কিন সামরিক অভিযান, তা ছিল চূড়ান্ত গোপনীয়। মার্কিন কংগ্রেসকে এ পরিকল্পনার বিন্দু বিসর্গ জানানো হয়নি, ভেনেজুয়েলায় হামলার আগে কোনো আলোচনাও হয়নি। সিনেটে ডেমোক্রেটিক পার্টির শীর্ষ নেতা চাক শুমার বলেন, ‘আমি স্পষ্ট করে বলতে চাই, নিকোলা মাদুরো একজন অবৈধ স্বৈরশাসক। কিন্তু কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া এবং পরবর্তী সময়ে কী হবে, তার জন্য একটি বিশ্বাসযোগ্য পরিকল্পনা ছাড়াই সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া রীতিমতো বেপরোয়া পদক্ষেপ। ট্রাম্পের বেপরোয়া পদক্ষেপ যে, আমেরিকাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে এবং ভবিষ্যতে এর ফল কোনদিকে মোড় নেবে সেটি আমেরিকার জনপ্রতিনিধিদেরও খেয়াল রাখতে হবে।
পরিকল্পনাটি খুঁটিনাটি পর্যালোচনার পর শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাদের অপেক্ষা করতে হয়েছিল অভিযান শুরুর সর্বোত্তম পরিস্থিতির জন্য। ট্রাম্পের নির্দেশ এসেছিল এমন সময় যখন কারাকাসে মধ্যরাত শুরু হয়েছে। ফলে মার্কিন বাহিনী অভিযানের বড় অংশটি রাতের অন্ধকারেই চালাতে পেরেছে যেমনটি ডাকাতরা করে থাকে। ভেনেজুয়েলার জলসীমা আর আকাশসীমায় ২ ঘণ্টা ২৪ মিনিটের সেই ক্ষিপ্র অভিযান ওয়াশিংটন ও বিশ্বের বহু মানুষকেই চমকে দিয়েছে।
একটি অবৈধ কাজের জন্য এত প্রস্তুতি, এত পরিকল্পনা, এত অর্থব্যয়, এত মানবিক বিপর্যয় সষ্টি! এতকিছু মানুষের কল্যাণে নিয়োজিত হলে গোটা পৃথিবীতে শান্তির বাতাস বইতো, আমেরিকাও ভালো থাকতো, আমেরিকাকে মানুষ বাহবা দিত। রাতের আধারে অন্য একটি দেশের উপর আক্রমণ করে সেদেশের প্রেসিডেন্টকে সস্ত্রীক অপহরণ করে নিজ দেশে নিয়ে আসা আর তার নামে যে-সব কথা বলা হচ্ছে সেগুলো আমেরিকার মিত্ররাও তো পছন্দ করছেন না। তাহলে এই মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার ব্যয় করে এসব নাটকের কী প্রয়োজন? উদ্দেশ্য তো সবাই জানে, তেল সম্পদের কতৃত্ব গ্রহণ করা। প্রশ্ন হচ্ছে বিশ্ব কি এটিও নেতানিয়াহুর গাজা ধ্বংসের মতো তাকিয়ে তাকিয়ে দেখবে?
মাদুরো পরবর্তী শাসনের জন্য ট্রাম্পের 'প্ল্যান' হচ্ছে মাদুরোর ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজকে ক্ষমতায় বসিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে কাজ করানো। তবে মাদুরো অপহৃত হওয়ার পর এক বক্তব্যে রদ্রিগেজ জোর দিয়ে বলেন, মাদুরোই ভেনেজুয়েলার বৈধ নেতা। সেই সঙ্গে তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে একটি অবৈধ, সাম্রাজ্যবাদী দখলদার শক্তি হিসেবে অভিহিত করেন, যারা দেশটি লুণ্ঠন করতে চাইছে। প্রতিরক্ষামন্ত্রী পাদ্রিনো অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট রদ্রিগেজের প্রতি পূর্ণ সমর্থন ব্যক্ত করে জানিয়েছেন দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে সশস্ত্র বাহিনীকে দেশজুড়ে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়েছে। বর্তমানে নিউইয়র্কের বন্দিশিবিরে মাদুরোকে জিজ্ঞাসবাদ করা হচ্ছে। একটি দেশের পররাষ্ট্রনীতি যখন আইনের বদলে ইচ্ছাশক্তিকে অনুসরণ করে, তখন সেই দেশের ভেতর বা বাইরে কেউই আর নিরাপদে থাকেনা।
ভেনেজুয়েলায় পরবর্তী সময়ে যা-ই ঘটুক না কেন, এর পরিণতি কেবল দেশটিতেই সীমাবদ্ধ থাকবেনা। সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়বে এর নেগেটিভ প্রভাব। ইতোমধ্যে চীন, ইরান আর রাশিয়া ট্রাম্পের এই আগ্রাসনের বিরুদ্ধে হুমকি প্রদর্শন করেছে। ট্রাম্প স্পষ্টভাবেই এ হামলার মাধ্যমে পুরো অঞ্চলে মার্কিন আধিপত্য জাহির করতে চেয়েছেন যে ‘এই বলে পশ্চিম গোলার্ধে যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য নিয়ে আর কখনোই কোনো প্রশ্ন উঠবেনা।’ ডিসেম্বর-২০২৫ এ প্রকাশিত জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলে ট্রাম্প প্রশাসন ১৮২৩ সালের 'মনরো ডকট্রিন' এর একটি ট্রাম্প করোলারি বা সংযোজন ঘোষণা করেছে। এর মাধ্যমে আমেরিকা অঞ্চল থেকে যে কোন ধরনের বাহ্যিক প্রভাব দূর করতে প্রয়োজনীয় যে কোন উপায় অবলম্বনের অধিকার দাবি করা হয়েছে।
পৃথিবী স্মরণ করতে পারে যে, ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে একীভূত করা আর পানামা খালে মার্কিন নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেন। এখন যেহেতু তিনি মাদুরোকে উৎখাত করেছেন, তাই একই যুক্তি ব্যবহার করে তিনি যে কোনো দেশে হামলা চালাতে পারেন। ট্রাম্প দাবি করেছেন, ‘মেক্সিকো ড্রাগ কার্টেলগুলো চালাচ্ছে’। এ একটি দাবিই মেক্সিকোতে আগ্রাসন চালানোর জন্য ট্রাম্পের কাছে যথেষ্ট অজুহাত হতে পারে। এদিকে কিউবা সরকারের উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত বলে সতর্ক করে দিয়েছে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। গত কয়েকমাসের মধ্যে এ অঞ্চলে মাদক পরিবহনের অভিযোগের কয়েক ডজন ছোট নৌকায় হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। প্রাথমিকভাবে অপারেশন অ্যবসোলিউট রিসোলভ'-এর পরিকল্পনা ছিল আকাশপথেই অভিযান চালানো। মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সারারাত বোমারু বিমান, যুদ্ধবিমান, নজরদারি করার বিমানসহ দেড় শতাধিক উড়োজাহাজ মোতায়েন করা হয়েছিল অভিযানে।
এই চাঞ্চল্যকর ঘটনার প্রেক্ষিতে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, ভেনেজুয়েলায় মার্কিন এই পদক্ষেপ বিশ্ব রাজনীতিতে একটি বিপজ্জনক নজির স্থাপন করেছে। সর্বশেষ মার্কিন আগ্রাসন আসলে দীর্ঘ কয়েক দশকে ধরে চলতে থাকা মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ধারাবাহিক অংশ। ২০২০ সালে জাতিসংঘের সাবেক বিশেষ প্রতিবেদক আলফ্রেড ডি জায়াস হিসেব করে দেখান যে, আমেরিকার জোরপূর্বক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার সরাসরি প্রভাবে এরই মধ্যে প্রায় এক লাখ ভেনেজুয়েলান প্রাণ হারিয়েছেন। সামরিক হামলার পাশাপাশি অর্থনৈতিক অবরোধও ভেনেজুয়েলার জনগণের জন্য ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় ডেকে এনেছে। সব মিলিয়ে বলা যায় ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের এ নীতিগুলো শুধু সামরিক আগ্রাসন নয়, বরং পরিকল্পিতভাবে একটি দেশের অর্থনীতি, সার্বভৌমত্ব এবং সাধারণ মানুষের জীবন ধ্বংস করার প্রচেষ্টা।
এই মুহূর্তে ভেনেজুয়েলার মানুষ জানে না দেশটি আসলে কে চালাচ্ছে। দেশটির টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে রাস্তায় পতাকা নেড়ে উদযাপনের ছবি দেখানো হচ্ছে। কারাকাস কোলেকটিভোস নামে পরিচিত সশস্ত্র বেসামরিক মিলিশিয়ারা টহল দিচ্ছে। সরকারি কর্মকর্তারা তাদের সমর্থকদের রাস্তায় নামতে ডাক দিয়েছেন, কিন্তু কোলেকটিভোস ছাড়া আর কেউ সেই ডাকে সাড়া দেয়নি। কারাকাসের পরিস্থিতি অত্যন্ত থমথমে। মাদুরোহীন ভেনেজুয়েলায় মানবিক সংকট আরো বেড়েছে। দেশটি আরো আগ থেকে খাদ্য ও ওষুধ সংকটে ভুগছিলো। বর্তমানে প্রায় ৫০ লাখ মানুষ ক্ষুধার্ত এবং লক্ষ লক্ষ মানুষ দেশ ছেড়ে শরণার্থী হিসেবে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে আশ্রয় নিয়েছে। গোটা দুনিয়ায় মার্কিনিদের এ ধরনের মোড়লিপান আর কতদিন? জাতিসংঘসহ বিশ্বের শক্তিশালী দেশগুলোকে একটি সিদ্ধান্তে আসতে হবে যাতে অযথা হানাহানি, লোভ ও অবৈধ আক্রমণ, আর অস্ত্রের ব্যাবসা প্রসারের জন্য এই সুন্দর পৃথিবীকে আর কেউই ইচ্ছেমতো যা ইচ্ছে তাই করতে না পারে। বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ এখনও ক্ষুধা, দারিদ্র আর বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যে দিনাতিপাত করছে। তাদের সাহায্যে এগিয়ে আসার পরিবর্তে ধনী দেশগুলো অস্ত্রের খেলায় আর নিজেদের শক্তিমত্তার জানান দিতে যেন পশুত্ব প্রদর্শন করেই চলছে।
আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন, আগ্রাসন ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র নিজেই মাদুরেরার চেয়ে অনেক বেশি দোষী। মাদুরোর শাসনকে অযোগ্য ও বিশৃঙ্খল বালা যেতে পারে, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তুলনা করলে এ অভিযোগ একপেশে ও ভণ্ডামিপূর্ণ বলে মনে হয়। আমরা চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু গত দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে গাজা উপত্যকায় ভয়াবহ গণহত্যা চালিয়ে যাচ্ছেন, অথচ যুক্তরাষ্ট্র তাকে সম্মান জানিয়ে এবং সর্বতোভাবে সহায়তা করেই যাচ্ছে। তার তো বিচার হওয়া প্রয়োজন মানবিকতার স্বার্থে। কই সেখানে তো দেখছি যুক্তরাষ্ট্রের উল্টো ভূমিকা!
মাছুম বিল্লাহ: শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও গবেষক এবং ইংলিশ টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ইট্যাব) প্রেসিডেন্ট