ড. মোহাম্মাদ আনিসুর রহমান

বাংলাদেশের শিক্ষা খাত দীর্ঘকাল ধরেই নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা, নীতিগত পরিবর্তন এবং কাঠামোগত সংকটের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হচ্ছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বর্তমান সরকারের শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে ড. আ ন ম এহসানুল হক মিলনের দায়িত্ব গ্রহণ এই খাতে এক নতুন উদ্দীপনা ও আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
দুই দশক আগে, ২০০১-২০০৬ মেয়াদে শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী হিসেবে তাঁর নেওয়া ‘নকলমুক্ত পরীক্ষা’র কঠোর নীতি দেশব্যাপী ব্যাপক সমাদৃত হয়েছিল। বর্তমানের পূর্ণাঙ্গ শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে তাঁর প্রত্যাবর্তন স্বভাবতই শিক্ষা ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের একটি বড় প্রত্যাশা তৈরি করেছে। তবে অতি সম্প্রতি শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতার অভাবকে ইঙ্গিত করে তাঁর দেওয়া “ফার্মের মুরগী” সংক্রান্ত রূপক এবং পরবর্তীতে জাতীয় সংসদে দেওয়া তাঁর বক্তব্য ও দুঃখ প্রকাশ রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে এক বিতর্কের অবতারণা করেছে।
একজন জাতীয় নীতিনির্ধারকের বক্তব্যকে কেবল রাজনৈতিক চশমায় না দেখে, বর্তমান পরিস্থিতির আলোকে এর একটি গভীর, ইতিবাচক ও গঠনমূলক সমালোচনা করা আজ সময়ের দাবি।
শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই ড. আ ন ম এহসানুল হক মিলনের প্রশাসনিক কঠোরতা ও তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা পুনর্বার প্রমাণিত হয়েছে। চলমান উচ্চ মাধ্যমিক (এইচএসসি) পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র প্রণয়নের ত্রুটি বা জালিয়াতির বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থান ছিল আপসহীন।
পদার্থবিজ্ঞান প্রথম পত্রের ভুল প্রশ্নপত্র প্রণয়নের সাথে জড়িত ব্যক্তিদের যেভাবে তাৎক্ষণিকভাবে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে এবং শিক্ষার্থীদের মেধার সুরক্ষায় পূর্ণ নম্বর দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তা আমলাতান্ত্রিক জটিলতার এই যুগে প্রশংসনীয়।
অতিবৃষ্টি বা বন্যার মতো প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে যেসব শিক্ষার্থী যথাসময়ে পরীক্ষা কেন্দ্রে পৌঁছাতে পারেনি, তাদের জন্য বিশেষ বিবেচনা বা সুযোগের ঘোষণা প্রমাণ করে যে কঠোরতার পাশাপাশি তিনি শিক্ষার্থীদের বাস্তব সংকটের প্রতিও সচেতন।
তিনি যখন সংসদে দাঁড়িয়ে বলেন, "জাতি অর্ধকানা হলে ভবিষ্যৎ ভালো হবে না"—তখন তাঁর এই রূঢ় বাক্যের গভীরে লুকিয়ে থাকা গভীর উদ্বেগটি স্পষ্ট হয়। সস্তা জনপ্রিয়তার পেছনে না ছুটে পাসের হার কৃত্রিমভাবে বাড়ানোর চেয়ে প্রকৃত মেধার বিকাশ যে একটি রাষ্ট্রের অস্তিত্বের জন্য কতটা জরুরি, শিক্ষামন্ত্রীর এই অনড় অবস্থান তারই প্রতিফলন ঘটায়।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাঁর যে বক্তব্যটি সবচেয়ে বেশি আলোড়ন ও বিতর্কের সৃষ্টি করেছে, তা হলো বর্তমান প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের ‘ফার্মের মুরগী’র সাথে তুলনা করা। বাহ্যিকভাবে এই শব্দবন্ধটি অত্যন্ত আপত্তিকর ও তরুণদের জন্য মর্যাদাহানিকর মনে হলেও, এর পেছনের সমাজতাত্ত্বিক সত্যটিকে এড়িয়ে যাওয়া যায় না।
আমাদের বর্তমান শহুরে শিক্ষা ব্যবস্থা শিক্ষার্থীদের এতটাই বইমুখী ও চার দেয়ালের বন্দি করে ফেলেছে যে, বাস্তব জীবনের সাধারণ প্রতিকূলতা মোকাবিলা করার ক্ষমতা তাদের লোপ পাচ্ছে।
খেলার মাঠের অভাব, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং ডিজিটাল স্ক্রিনের প্রতি অতিরিক্ত আসক্তির কারণে নতুন প্রজন্ম একধরনের কৃত্রিম ও অতি-সুরক্ষিত পরিবেশে বড় হচ্ছে। শিক্ষামন্ত্রী মূলত এই কৃত্রিম জীবনধারা ও পরনির্ভরশীলতার দিকেই আঙুল তুলেছেন। একজন অভিভাবক ও দায়িত্বশীল হিসেবে এই ব্যাধিটি চিহ্নিত করা তাঁর দূরদর্শিতারই প্রমাণ, এই প্রজন্মকে তাচ্ছিল্য করা তাঁর উদ্দেশ্য নয়।
একটি ইতিবাচক সমালোচনার মূল লক্ষ্য হলো আলোর পাশাপাশি ছায়ার অংশটিকেও সমানভাবে মূল্যায়ন করা। শিক্ষামন্ত্রীর লক্ষ্য ও সদিচ্ছা ইতিবাচক হলেও, বর্তমান ২০২৬ সালের পরিবর্তিত বাস্তবতায় তাঁর কাজের পদ্ধতি ও প্রকাশভঙ্গিতে কিছু মৌলিক সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে, যা সংস্কার করা প্রয়োজন:
শিক্ষার্থীরা যদি আজ ‘ফার্মের মুরগী’র মতো নিষ্ক্রিয় বা পরনির্ভরশীল হয়ে থাকে, তবে তার জন্য তারা নিজেরা কোনোভাবেই দায়ী নয়। এই দায় আমাদের ত্রুটিপূর্ণ শিক্ষাক্রম, জিপিএ-৫ অর্জনের জন্য অভিভাবকদের মানসিক চাপ এবং রাষ্ট্রীয় বিনোদন ও খেলার মাঠের অভাবের ওপর বর্তায়।
শিক্ষামন্ত্রী এখন আর কোনো সাধারণ সমালোচক বা পর্যবেক্ষক নন; তিনি দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার সর্বোচ্চ অভিভাবক বা চালিকাশক্তি। সুতরাং, কেবল তরুণদের সীমাবদ্ধতা বা ত্রুটিগুলো ক্যামেরার সামনে তুলে ধরার চেয়ে, এই ব্যবস্থা থেকে তাদের মুক্ত করার জন্য কারিকুলামে কী কী প্র্যাকটিক্যাল, খেলাধুলা ও জীবনমুখী উপাদান যুক্ত করা হচ্ছে—তার সুনির্দিষ্ট নীতিগত রূপরেখা ও বাজেট বরাদ্দ তাঁর কাছ থেকে দেশবাসী প্রত্যাশা করে।
২০০২ সালের শিক্ষা ব্যবস্থার প্রেক্ষাপট আর ২০২৬ সালের ডিজিটাল যুগের জেনারেশন জেডের (জেন জেড) মনস্তত্ত্ব সম্পূর্ণ ভিন্ন। বর্তমান প্রজন্ম কোনো বিষয়ে আদেশ বা কঠোর হুকুমের চেয়ে লজিক, খোলামেলা আলোচনা ও পারস্পরিক সম্মান পছন্দ করে। শিক্ষামন্ত্রীর ভাষা অনেক সময় অতিরিক্ত মাত্রায় আধিপত্যবাদী বা সনাতন ঘরানার মনে হয়, যা তরুণদের অনুপ্রাণিত করার বদলে তাদের মধ্যে একধরনের মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব ও ক্ষোভের জন্ম দেয়।
অনুশাসন অবশ্যই থাকবে, তবে তা হতে হবে মেন্টরশিপ বা অভিভাবকসুলভ সহমর্মিতার আদলে, কোনো কটাক্ষের মাধ্যমে নয়।
গত ১৪ জুলাই জাতীয় সংসদে শিক্ষামন্ত্রী তাঁর কিছু মন্তব্যের জন্য যেভাবে অনুশোচনা ব্যক্ত করেছেন এবং দুঃখ প্রকাশ করেছেন, তা বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসে একটি অত্যন্ত ইতিবাচক নজির। নিজের ভুল বা শব্দের রূঢ়তা স্বীকার করে নেওয়া কোনো দুর্বলতা নয়, বরং এটি একজন পরিপক্ক ও গণতান্ত্রিক নেতার লক্ষণ। এই ঘটনা প্রমাণ করে যে তিনি জনআকাঙ্ক্ষা এবং সংসদের মর্যাদাকে সম্মান করেন। তবে এই দুঃখ প্রকাশের ধারাবাহিকতায় আগামী দিনে তাঁর বক্তব্য ও নীতিতে আরও বেশি সংযম ও আধুনিকতার প্রতিফলন ঘটাতে হবে।
শিক্ষামন্ত্রী প্রায়শই স্বপ্ন দেখান যে বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা এমন এক পর্যায়ে পৌঁছাবে যেখানে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শিক্ষার্থীরা জ্ঞান অর্জনের জন্য ছুটে আসবে। এটি নিঃসন্দেহে একটি চমৎকার এবং জাতীয় গৌরব জাগানিয়া ভিশন। তবে এই ভিশন বাস্তবায়নে কেবল কঠোর পরীক্ষা পদ্ধতি বা প্রশাসনিক নজরদারি যথেষ্ট নয়।
বিদেশি শিক্ষার্থীদের আকর্ষণ করতে হলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর র্যাঙ্কিং উন্নত করতে হবে, যার জন্য প্রয়োজন বিপুল পরিমাণ গবেষণার তহবিল এবং শিক্ষকদের একাডেমিক স্বাধীনতা।
আধুনিক যুগের এআই এবং আইটি বিপ্লবের এই সময়ে মোবাইল বা ইন্টারনেটকে শত্রু ভাবার কোনো সুযোগ নেই। শিক্ষামন্ত্রীর নীতিমালায় প্রযুক্তিকে নিষিদ্ধ করার চেয়ে, কীভাবে ক্লাসরুমে প্রযুক্তির ইতিবাচক ও নৈতিক ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়, সেই আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গির মেলবন্ধন ঘটাতে হবে।
ড. আ ন ম এহসানুল হক মিলনের মতো একজন অভিজ্ঞ নীতিনির্ধারকের হাত ধরে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা এক যুগান্তকারী মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে। তাঁর এই যাত্রাকে সফল করতে হলে নিচের বিষয়গুলোতে নজর দেওয়া জরুরি:
শিক্ষার্থী-বান্ধব পরিবেশ: শিক্ষার প্রতিটি স্তরে ভীতিহীন ও আনন্দময় পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে শিক্ষার্থীরা মুখস্থ বিদ্যার দাস না হয়ে নতুন কিছু সৃষ্টি করার সাহস পাবে।
অংশগ্রহণমূলক সংলাপ: দেশের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সাথে নিয়মিত মতবিনিময় সভার আয়োজন করা, যাতে তৃণমূল পর্যায়ের সংকটগুলো সরাসরি নীতিমালায় প্রতিফলিত হয়।
শারীরিক ও মানসিক বিকাশ: প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক চর্চা এবং মানসিক স্বাস্থ্য কাউন্সেলিং বাধ্যতামূলক করা, যাতে শিক্ষার্থীরা আসলেই চার দেয়ালের বন্দিদশা থেকে মুক্ত হয়ে সুস্থ নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।
পরিশেষে, অতীতের সফল প্রতিমন্ত্রী হিসেবে তাঁর যে সুনাম ছিল, বর্তমানের পূর্ণাঙ্গ শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে তিনি তার চেয়েও বড় মাইলফলক স্পর্শ করবেন—এটাই দেশের মানুষের প্রত্যাশা। শব্দের রূঢ়তা ছাপিয়ে তাঁর কাজের গুণগত পরিবর্তনই হোক এ দেশের শিক্ষার নতুন সূর্যোদয়।
ড. মোহাম্মাদ আনিসুর রহমান: জনস্বাস্থ্য ও সমাজনীতি বিষয়ক গবেষক; শিক্ষক, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গোপালগঞ্জ

বাংলাদেশের শিক্ষা খাত দীর্ঘকাল ধরেই নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা, নীতিগত পরিবর্তন এবং কাঠামোগত সংকটের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হচ্ছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বর্তমান সরকারের শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে ড. আ ন ম এহসানুল হক মিলনের দায়িত্ব গ্রহণ এই খাতে এক নতুন উদ্দীপনা ও আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
দুই দশক আগে, ২০০১-২০০৬ মেয়াদে শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী হিসেবে তাঁর নেওয়া ‘নকলমুক্ত পরীক্ষা’র কঠোর নীতি দেশব্যাপী ব্যাপক সমাদৃত হয়েছিল। বর্তমানের পূর্ণাঙ্গ শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে তাঁর প্রত্যাবর্তন স্বভাবতই শিক্ষা ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের একটি বড় প্রত্যাশা তৈরি করেছে। তবে অতি সম্প্রতি শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতার অভাবকে ইঙ্গিত করে তাঁর দেওয়া “ফার্মের মুরগী” সংক্রান্ত রূপক এবং পরবর্তীতে জাতীয় সংসদে দেওয়া তাঁর বক্তব্য ও দুঃখ প্রকাশ রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে এক বিতর্কের অবতারণা করেছে।
একজন জাতীয় নীতিনির্ধারকের বক্তব্যকে কেবল রাজনৈতিক চশমায় না দেখে, বর্তমান পরিস্থিতির আলোকে এর একটি গভীর, ইতিবাচক ও গঠনমূলক সমালোচনা করা আজ সময়ের দাবি।
শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই ড. আ ন ম এহসানুল হক মিলনের প্রশাসনিক কঠোরতা ও তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা পুনর্বার প্রমাণিত হয়েছে। চলমান উচ্চ মাধ্যমিক (এইচএসসি) পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র প্রণয়নের ত্রুটি বা জালিয়াতির বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থান ছিল আপসহীন।
পদার্থবিজ্ঞান প্রথম পত্রের ভুল প্রশ্নপত্র প্রণয়নের সাথে জড়িত ব্যক্তিদের যেভাবে তাৎক্ষণিকভাবে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে এবং শিক্ষার্থীদের মেধার সুরক্ষায় পূর্ণ নম্বর দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তা আমলাতান্ত্রিক জটিলতার এই যুগে প্রশংসনীয়।
অতিবৃষ্টি বা বন্যার মতো প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে যেসব শিক্ষার্থী যথাসময়ে পরীক্ষা কেন্দ্রে পৌঁছাতে পারেনি, তাদের জন্য বিশেষ বিবেচনা বা সুযোগের ঘোষণা প্রমাণ করে যে কঠোরতার পাশাপাশি তিনি শিক্ষার্থীদের বাস্তব সংকটের প্রতিও সচেতন।
তিনি যখন সংসদে দাঁড়িয়ে বলেন, "জাতি অর্ধকানা হলে ভবিষ্যৎ ভালো হবে না"—তখন তাঁর এই রূঢ় বাক্যের গভীরে লুকিয়ে থাকা গভীর উদ্বেগটি স্পষ্ট হয়। সস্তা জনপ্রিয়তার পেছনে না ছুটে পাসের হার কৃত্রিমভাবে বাড়ানোর চেয়ে প্রকৃত মেধার বিকাশ যে একটি রাষ্ট্রের অস্তিত্বের জন্য কতটা জরুরি, শিক্ষামন্ত্রীর এই অনড় অবস্থান তারই প্রতিফলন ঘটায়।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাঁর যে বক্তব্যটি সবচেয়ে বেশি আলোড়ন ও বিতর্কের সৃষ্টি করেছে, তা হলো বর্তমান প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের ‘ফার্মের মুরগী’র সাথে তুলনা করা। বাহ্যিকভাবে এই শব্দবন্ধটি অত্যন্ত আপত্তিকর ও তরুণদের জন্য মর্যাদাহানিকর মনে হলেও, এর পেছনের সমাজতাত্ত্বিক সত্যটিকে এড়িয়ে যাওয়া যায় না।
আমাদের বর্তমান শহুরে শিক্ষা ব্যবস্থা শিক্ষার্থীদের এতটাই বইমুখী ও চার দেয়ালের বন্দি করে ফেলেছে যে, বাস্তব জীবনের সাধারণ প্রতিকূলতা মোকাবিলা করার ক্ষমতা তাদের লোপ পাচ্ছে।
খেলার মাঠের অভাব, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং ডিজিটাল স্ক্রিনের প্রতি অতিরিক্ত আসক্তির কারণে নতুন প্রজন্ম একধরনের কৃত্রিম ও অতি-সুরক্ষিত পরিবেশে বড় হচ্ছে। শিক্ষামন্ত্রী মূলত এই কৃত্রিম জীবনধারা ও পরনির্ভরশীলতার দিকেই আঙুল তুলেছেন। একজন অভিভাবক ও দায়িত্বশীল হিসেবে এই ব্যাধিটি চিহ্নিত করা তাঁর দূরদর্শিতারই প্রমাণ, এই প্রজন্মকে তাচ্ছিল্য করা তাঁর উদ্দেশ্য নয়।
একটি ইতিবাচক সমালোচনার মূল লক্ষ্য হলো আলোর পাশাপাশি ছায়ার অংশটিকেও সমানভাবে মূল্যায়ন করা। শিক্ষামন্ত্রীর লক্ষ্য ও সদিচ্ছা ইতিবাচক হলেও, বর্তমান ২০২৬ সালের পরিবর্তিত বাস্তবতায় তাঁর কাজের পদ্ধতি ও প্রকাশভঙ্গিতে কিছু মৌলিক সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে, যা সংস্কার করা প্রয়োজন:
শিক্ষার্থীরা যদি আজ ‘ফার্মের মুরগী’র মতো নিষ্ক্রিয় বা পরনির্ভরশীল হয়ে থাকে, তবে তার জন্য তারা নিজেরা কোনোভাবেই দায়ী নয়। এই দায় আমাদের ত্রুটিপূর্ণ শিক্ষাক্রম, জিপিএ-৫ অর্জনের জন্য অভিভাবকদের মানসিক চাপ এবং রাষ্ট্রীয় বিনোদন ও খেলার মাঠের অভাবের ওপর বর্তায়।
শিক্ষামন্ত্রী এখন আর কোনো সাধারণ সমালোচক বা পর্যবেক্ষক নন; তিনি দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার সর্বোচ্চ অভিভাবক বা চালিকাশক্তি। সুতরাং, কেবল তরুণদের সীমাবদ্ধতা বা ত্রুটিগুলো ক্যামেরার সামনে তুলে ধরার চেয়ে, এই ব্যবস্থা থেকে তাদের মুক্ত করার জন্য কারিকুলামে কী কী প্র্যাকটিক্যাল, খেলাধুলা ও জীবনমুখী উপাদান যুক্ত করা হচ্ছে—তার সুনির্দিষ্ট নীতিগত রূপরেখা ও বাজেট বরাদ্দ তাঁর কাছ থেকে দেশবাসী প্রত্যাশা করে।
২০০২ সালের শিক্ষা ব্যবস্থার প্রেক্ষাপট আর ২০২৬ সালের ডিজিটাল যুগের জেনারেশন জেডের (জেন জেড) মনস্তত্ত্ব সম্পূর্ণ ভিন্ন। বর্তমান প্রজন্ম কোনো বিষয়ে আদেশ বা কঠোর হুকুমের চেয়ে লজিক, খোলামেলা আলোচনা ও পারস্পরিক সম্মান পছন্দ করে। শিক্ষামন্ত্রীর ভাষা অনেক সময় অতিরিক্ত মাত্রায় আধিপত্যবাদী বা সনাতন ঘরানার মনে হয়, যা তরুণদের অনুপ্রাণিত করার বদলে তাদের মধ্যে একধরনের মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব ও ক্ষোভের জন্ম দেয়।
অনুশাসন অবশ্যই থাকবে, তবে তা হতে হবে মেন্টরশিপ বা অভিভাবকসুলভ সহমর্মিতার আদলে, কোনো কটাক্ষের মাধ্যমে নয়।
গত ১৪ জুলাই জাতীয় সংসদে শিক্ষামন্ত্রী তাঁর কিছু মন্তব্যের জন্য যেভাবে অনুশোচনা ব্যক্ত করেছেন এবং দুঃখ প্রকাশ করেছেন, তা বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসে একটি অত্যন্ত ইতিবাচক নজির। নিজের ভুল বা শব্দের রূঢ়তা স্বীকার করে নেওয়া কোনো দুর্বলতা নয়, বরং এটি একজন পরিপক্ক ও গণতান্ত্রিক নেতার লক্ষণ। এই ঘটনা প্রমাণ করে যে তিনি জনআকাঙ্ক্ষা এবং সংসদের মর্যাদাকে সম্মান করেন। তবে এই দুঃখ প্রকাশের ধারাবাহিকতায় আগামী দিনে তাঁর বক্তব্য ও নীতিতে আরও বেশি সংযম ও আধুনিকতার প্রতিফলন ঘটাতে হবে।
শিক্ষামন্ত্রী প্রায়শই স্বপ্ন দেখান যে বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা এমন এক পর্যায়ে পৌঁছাবে যেখানে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শিক্ষার্থীরা জ্ঞান অর্জনের জন্য ছুটে আসবে। এটি নিঃসন্দেহে একটি চমৎকার এবং জাতীয় গৌরব জাগানিয়া ভিশন। তবে এই ভিশন বাস্তবায়নে কেবল কঠোর পরীক্ষা পদ্ধতি বা প্রশাসনিক নজরদারি যথেষ্ট নয়।
বিদেশি শিক্ষার্থীদের আকর্ষণ করতে হলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর র্যাঙ্কিং উন্নত করতে হবে, যার জন্য প্রয়োজন বিপুল পরিমাণ গবেষণার তহবিল এবং শিক্ষকদের একাডেমিক স্বাধীনতা।
আধুনিক যুগের এআই এবং আইটি বিপ্লবের এই সময়ে মোবাইল বা ইন্টারনেটকে শত্রু ভাবার কোনো সুযোগ নেই। শিক্ষামন্ত্রীর নীতিমালায় প্রযুক্তিকে নিষিদ্ধ করার চেয়ে, কীভাবে ক্লাসরুমে প্রযুক্তির ইতিবাচক ও নৈতিক ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়, সেই আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গির মেলবন্ধন ঘটাতে হবে।
ড. আ ন ম এহসানুল হক মিলনের মতো একজন অভিজ্ঞ নীতিনির্ধারকের হাত ধরে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা এক যুগান্তকারী মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে। তাঁর এই যাত্রাকে সফল করতে হলে নিচের বিষয়গুলোতে নজর দেওয়া জরুরি:
শিক্ষার্থী-বান্ধব পরিবেশ: শিক্ষার প্রতিটি স্তরে ভীতিহীন ও আনন্দময় পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে শিক্ষার্থীরা মুখস্থ বিদ্যার দাস না হয়ে নতুন কিছু সৃষ্টি করার সাহস পাবে।
অংশগ্রহণমূলক সংলাপ: দেশের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সাথে নিয়মিত মতবিনিময় সভার আয়োজন করা, যাতে তৃণমূল পর্যায়ের সংকটগুলো সরাসরি নীতিমালায় প্রতিফলিত হয়।
শারীরিক ও মানসিক বিকাশ: প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক চর্চা এবং মানসিক স্বাস্থ্য কাউন্সেলিং বাধ্যতামূলক করা, যাতে শিক্ষার্থীরা আসলেই চার দেয়ালের বন্দিদশা থেকে মুক্ত হয়ে সুস্থ নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।
পরিশেষে, অতীতের সফল প্রতিমন্ত্রী হিসেবে তাঁর যে সুনাম ছিল, বর্তমানের পূর্ণাঙ্গ শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে তিনি তার চেয়েও বড় মাইলফলক স্পর্শ করবেন—এটাই দেশের মানুষের প্রত্যাশা। শব্দের রূঢ়তা ছাপিয়ে তাঁর কাজের গুণগত পরিবর্তনই হোক এ দেশের শিক্ষার নতুন সূর্যোদয়।
ড. মোহাম্মাদ আনিসুর রহমান: জনস্বাস্থ্য ও সমাজনীতি বিষয়ক গবেষক; শিক্ষক, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গোপালগঞ্জ
.png)

কিছু মানুষ পৃথিবীতে আসেন ক্ষণিকের জন্য, কিন্তু চিরতরে নিভে যাওয়ার আগ মুহূর্তে তারা হয়ে ওঠেন অন্যের জীবনের অনন্ত আলোকবর্তিকা। মৃত্যু তাদের নিশ্চিহ্ন করতে পারে না। এমনই এক নির্লোভ ও মহীয়সী নারী ছিলেন মাহেরীন চৌধুরী। পেশায় ছিলেন শিক্ষিক, কিন্তু মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে প্রমাণ করে গেছেন—তিনি কেবল শ্রেণি
১ ঘণ্টা আগে
ভারতীয় প্রকৌশলী ও শিক্ষাবিদ সোনাম ওয়াংচুককে জোর করে আদালতের নির্দেশের দোহাই দিয়ে তুলে নিয়ে যাওয়ার পরে দিল্লি পুলিশ ভেবেছিল, কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলনটি হয়ত থেমে যাবে। কিন্তু দেখা গেল, উল্টো এই আন্দোলন সারা দেশে ছড়িয়ে গেল।
১৪ ঘণ্টা আগে
পর্দা নামল ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর ষোলোটি শহরে এক মাস ধরে চলা এই মহাযজ্ঞ এখন স্মৃতি। বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের মতো বাংলাদেশের মানুষও ছিল এই আনন্দের অংশীদার।
১৫ ঘণ্টা আগে
বেলুচিস্তান দীর্ঘদিন ধরে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম স্পর্শকাতর অঞ্চল হিসেবে বিবেচিত। ভৌগোলিক বিস্তৃতি, প্রাকৃতিক সম্পদের প্রাচুর্য এবং কৌশলগত অবস্থানের কারণে এই অঞ্চল শুধু পাকিস্তানের নয়; বরং আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক রাজনীতিরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
১৬ ঘণ্টা আগে