leadT1ad

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারত : বাস্তবতা, না কি কল্পকথা

লেখা:
লেখা:
মো. আনিসুর রহমান

প্রকাশ : ১৬ জুন ২০২৬, ১৯: ০৮
স্ট্রিম গ্রাফিক্স

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও জনপরিসরে একটি বেসরকারি টেলিভিশনের করা বিশ্লেষণাত্মক এক সংবাদ প্রতিবেদন নিয়ে ব্যাপক আলোচনা দেখা গেছে। প্রতিবেদনে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারত প্রভাবিত ‘ডিপ স্টেট’-এর উপস্থিতি এবং দেশের রাজনীতি, সরকার ও প্রশাসনে ভারতের প্রভাবের সম্পর্ক নিয়ে নানা দাবি উপস্থাপন করা হয়েছে। প্রতিবেদনটির তথ্যগত ভিত্তি, উপসংহার কিংবা বিশ্লেষণ নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে। কিন্তু এই বিতর্কের মধ্য দিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আবারো সামনে এসেছে—বাংলাদেশের রাজনীতি ও রাষ্ট্রব্যবস্থায় ভারতের প্রকৃত প্রভাব কতটুকু, আর ভারতের প্রভাব সম্পর্কে আমাদের কল্পনা কতটুকু?

প্রশ্নটি কেবল সমসাময়িক রাজনীতির নয়; এটি মূলত ক্ষমতা, আধিপত্য এবং রাজনৈতিক মনস্তত্ত্বের প্রশ্ন। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ইতিহাস আমাদের শেখায় যে ক্ষমতা কেবল সামরিক শক্তি, অর্থনৈতিক সক্ষমতা বা গোয়েন্দা নেটওয়ার্কের সমষ্টি নয়। ক্ষমতার একটি বড় অংশ নিহিত থাকে অন্যরা সেই ক্ষমতা সম্পর্কে কী কল্পনা করে তার মধ্যে। অনেক সময় একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত সক্ষমতার চেয়েও তার সক্ষমতা সম্পর্কে প্রচলিত ধারণা বা কল্পনা বেশি কার্যকর রাজনৈতিক ফলাফল তৈরি করে।

আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এই প্রক্রিয়াকে বিভিন্ন নামে ব্যাখ্যা করা হয়— Perception Management, Strategic Signaling, Deterrence, Psychological Warfare কিংবা Imperial Prestige। এ শব্দসমূহের মূল কথা একটাই: প্রতিপক্ষকে এমন একটি মানসিক অবস্থায় নিয়ে যাওয়া, যেখানে সে আধিপত্যবাদী রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তির চেয়ে সেই রাষ্ট্রের শক্তি সম্পর্কে একটি কাল্পনিক ধারণা তৈরি করে। আধিপত্যের ভীতি তৈরির মাধ্যমে ক্ষুদ্র রাষ্ট্রের জনগণ ও সরকারের মনোজগতে এমন এক পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটানো হয় যেন ‘বনের বাঘ কামড়ায় না মনের বাঘ কামড়ায়।

স্বাধীনতার পর থেকেই দেশের রাজনীতিতে ‘ভারতপন্থী’ ও ‘ভারতবিরোধী’ বিভাজন একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ভাষ্য হিসেবে উপস্থিত। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে বা প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করতে ভারতের প্রসঙ্গ ব্যবহার করেছে। ফলে ভারতকে ঘিরে একটি বাস্তব ভূরাজনৈতিক সম্পর্কের পাশাপাশি একটি রাজনৈতিক কল্পনাও গড়ে উঠেছে।

ইতিহাসের বৃহৎ সাম্রাজ্যগুলো এই বাস্তবতাকে খুব ভালোভাবেই বুঝত। উনিশ শতকের ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের কথা ধরা যাক। বাস্তবে ব্রিটিশ সামরিক বাহিনীর পক্ষে একই সময়ে পৃথিবীর প্রতিটি উপনিবেশে শক্তি প্রয়োগ করা সম্ভব ছিল না। কিন্তু তারা এমন একটি কাল্পনিক ভাবমূর্তি গড়ে তুলেছিল যে ব্রিটিশ কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ মানেই অনিবার্য শাস্তি। বহু উপনিবেশে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর প্রকৃত উপস্থিতির চেয়েও ব্রিটিশ শক্তি সম্পর্কে মানুষের বিশ্বাস বেশি কার্যকর ছিল। ইতিহাসবিদরা একে the myth of omnipotence বলে বর্ণনা করেছেন।

একই ঘটনা দেখা যায় ঠান্ডা যুদ্ধের সময়। যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন শুধু অস্ত্র প্রতিযোগিতায় নয়, কাল্পনিক ভাবমূর্তি নির্মাণের প্রতিযোগিতায়ও লিপ্ত ছিল। ‘মিসাইল গ্যাপ’ ও ‘বোম্বার গ্যাপ’ নিয়ে বিতর্কের ইতিহাস দেখায় যে অনেক সময় উভয় পক্ষই প্রতিপক্ষকে বাস্তবের চেয়ে বেশি শক্তিশালী হিসেবে প্রচার করত। এই অতিরঞ্জিত ধারণাই অস্ত্র প্রতিযোগিতা, কূটনৈতিক কৌশল এবং প্রতিপক্ষের আচরণ-সামগ্রিকভাবে আন্তর্জাতিক রাজনীতিকে প্রভাবিত করেছিল। অর্থাৎ, বাস্তব শক্তির পাশাপাশি শক্তির কাল্পনিক ধারণাও একটি কৌশলগত সম্পদ।

প্রখ্যাত কৌশলবিদ Thomas Schelling Zuvi Deterrence Theory-তে দেখিয়েছিলেন যে শক্তির সবচেয়ে কার্যকর ব্যবহার সবসময় শক্তি প্রয়োগ নয়; বরং শক্তি প্রয়োগের সম্ভাবনাকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলা বা শক্তির প্রয়োগের ভীতি ছড়ানো। প্রতিপক্ষ যদি বিশ্বাস করে যে আপনাকে চ্যালেঞ্জ করার মূল্য অনেক বেশি, তাহলে সে সংঘাতে যাওয়ার আগেই নিজের আচরণ পরিবর্তন করবে। অর্থাৎ, শক্তির একটি অংশ মানুষের কল্পনাকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা।

অন্যদিকে ইতালীয় চিন্তাবিদ Antonio Gramsci “hegemony” ধারণার মাধ্যমে দেখিয়েছিলেন যে আধিপত্যের সবচেয়ে স্থায়ী রূপ বলপ্রয়োগের মাধ্যমে নয়, বরং সম্মতি এবং ধারণা ও বিশ্বাসের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়। মানুষ যখন কোনো শক্তির আধিপত্যকে স্বাভাবিক, অনিবার্য কিংবা অপরিবর্তনীয় বলে মেনে নিতে শুরু করে, তখন সেই আধিপত্য সবচেয়ে গভীরে প্রোথিত হয়।

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের আলোচনায় এই তত্ত্বগুলো বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এখানে বিতর্কের একটি বড় অংশ ভারতের বাস্তব কর্মকাণ্ড নিয়ে নয়; বরং ভারতের ক্ষমতা সম্পর্কে প্রচলিত ধারণা নিয়ে। ভারত নিঃসন্দেহে দক্ষিণ এশিয়ার প্রধান শক্তি। অর্থনীতি, সামরিক সক্ষমতা, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি, কূটনৈতিক উপস্থিতি এবং ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে ভারত এই অঞ্চলের অন্য রাষ্ট্রগুলোর তুলনায় অনেক বেশি প্রভাবশালী। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের দীর্ঘ সীমান্ত, বাণিজ্যিক সম্পর্ক, নিরাপত্তা সহযোগিতা, আন্তঃসীমান্ত নদী, আঞ্চলিক যোগাযোগ এবং ঐতিহাসিক সংযোগ ভারতের প্রভাবকে আরো তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে।

অতিরঞ্জিত ধারণা বা কল্পনাগুলোই আমাদের রাজনৈতিক আচরণকে প্রভাবিত করে বা করছে। কোনো দল যদি বিশ্বাস করে যে ভারতের সমর্থন তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ, তাহলে সেই ধারণা বা বিশ্বাস তার কৌশল নির্ধারণে প্রভাব ফেলতে পারে।

কিন্তু এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। ভারতের প্রকৃত প্রভাব এক বিষয়, আর ভারতের প্রভাব সম্পর্কে আমাদের মনোজাগতিক ধারণা আরেক বিষয়। দেশটির অসীম শক্তির ধারণা কল্পনাপ্রসূত বলে অনুমান করা যেতেই পারে। কেননা, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে “ভারত” বহু সময়ে একটি বাস্তব রাষ্ট্রের চেয়ে বেশি কিছু হয়ে উঠেছে—একটি রাজনৈতিক প্রতীক, একটি ব্যাখ্যামূলক কাঠামো, এমনকি কখনো কখনো একটি রাজনৈতিক ভয়ের উৎস। স্বাধীনতার পর থেকেই দেশের রাজনীতিতে ‘ভারতপন্থী’ ও ‘ভারতবিরোধী’ বিভাজন একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ভাষ্য হিসেবে উপস্থিত। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে বা প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করতে ভারতের প্রসঙ্গ ব্যবহার করেছে। ফলে ভারতকে ঘিরে একটি বাস্তব ভূরাজনৈতিক সম্পর্কের পাশাপাশি একটি রাজনৈতিক কল্পনাও গড়ে উঠেছে।

১৯৭৫ সালের পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময় থেকে শুরু করে সামরিক শাসনের যুগ পর্যন্ত ভারতের ভূমিকা নিয়ে নানা ধরনের ব্যাখ্যা ও সন্দেহ প্রচলিত ছিল। নব্বইয়ের দশকে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পরও রাজনৈতিক বিতর্কে ভারতের প্রভাব একটি স্থায়ী বিষয় হিসেবে রয়ে যায়। কখনো বলা হয়েছে কোনো দল ভারতের সমর্থনপুষ্ট, কখনো বলা হয়েছে কোনো সরকার ভারতের স্বার্থ রক্ষা করছে, আবার কখনো দাবি করা হয়েছে যে ভারতের অসন্তোষ কোনো রাজনৈতিক শক্তির জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

২০০১ সালের নির্বাচন-পরবর্তী সময়, ২০০৭ সালের এক-এগারোর রাজনৈতিক সংকট, ২০১৪ সালের বিতর্কিত নির্বাচন, ২০১৮ সালের নৈশ্যভোটের নির্বাচন, ২০২৪ সালের আমি-ডামির নির্বাচন এবং সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ঘটনাবলি—প্রতিটি ক্ষেত্রেই জনপরিসরে ভারতের ভূমিকা নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়েছে। এসব আলোচনার কিছু অংশ বাস্তব কূটনৈতিক যোগাযোগ ও ভূরাজনৈতিক স্বার্থের উপর ভিত্তি করে হলেও অনেক ক্ষেত্রে সেগুলো অনুমান, রাজনৈতিক প্রচারণা বা জনধারণার পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থেকেছে। অর্থাৎ, সারকামস্টেনশিয়াল এভিডেন্স উপস্থাপন না করা গেলেও এসব রাজনৈতিক ঘটনা প্রবাহের সঙ্গে ভারতীয় প্রভাবের কথা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তবে আমাদের আলোচনার বিষয় প্রকৃত প্রভাবের চেয়ে আমাদের কল্পনা অনেক বেশি বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ফলে একটি বিষয় অস্বীকার করার উপায় নেই— এই অতিরঞ্জিত ধারণা বা কল্পনাগুলোই আমাদের রাজনৈতিক আচরণকে প্রভাবিত করে বা করছে। কোনো দল যদি বিশ্বাস করে যে ভারতের সমর্থন তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ, তাহলে সেই ধারণা বা বিশ্বাস তার কৌশল নির্ধারণে প্রভাব ফেলতে পারে। আবার কোনো রাজনৈতিক কর্মী যদি মনে করেন যে ভারতের বিরোধিতা করা মানেই রাজনৈতিক ঝুঁকি, তাহলেও সেটি তার আচরণকে প্রভাবিত করবে। অর্থাৎ, বাস্তব প্রভাবের পাশাপাশি প্রভাবের কাল্পনিক ধারণাও রাজনৈতিক বাস্তবতায় পরিণত হয়।

সাম্প্রতিক ‘ডিপ স্টেট’ বিতর্ক এই বাস্তবতাকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। বিতর্কিত প্রতিবেদনের তথ্যগত যথার্থতা নিয়ে প্রশ্ন থাকতে পারে। কিন্তু জনপরিসরে এর প্রতিক্রিয়া দেখায় যে বাংলাদেশের একটি অংশ ভারতের প্রভাবকে এমন এক সর্বব্যাপী শক্তি হিসেবে কল্পনা করে, যা রাষ্ট্রের দৃশ্যমান কাঠামোর বাইরেও কার্যকর। অনেকে মনে করেন যে রাজনৈতিক ক্ষমতার আনুষ্ঠানিক কেন্দ্রের বাইরেও এমন কিছু অদৃশ্য শক্তি কাজ করে, যাদের সঙ্গে ভারতের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। এই ধারণা বাস্তব হোক বা অতিরঞ্জিত—এটি নিজেই একটি রাজনৈতিক বাস্তবতা, যা মানুষের রাজনৈতিক চিন্তা ও আচরণকে তা প্রভাবিত করে।

আন্তর্জাতিক সম্পর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো ‘self-fulfilling prophecy’। কোনো সমাজ যদি দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বাস করতে থাকে যে একটি শক্তিধর রাষ্ট্র তার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে, তাহলে ধীরে ধীরে সেই বিশ্বাসই রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, কৌশল এবং জনমতকে প্রভাবিত করতে শুরু করে। তখন বাস্তব প্রভাবের পাশাপাশি কল্পিত প্রভাবও কার্যকর রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়। যেমন- দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশিদের মধ্যে প্রচার করা হয়েছে যে, তিন দিকে ভারত এবং এক দিকে সমুদ্র বেষ্টিত দেশ হিসেবে ভারতের সাহায্য-সহযোগিতা ও আনুকূল্য ছাড়া এদেশের টিকে থাকা সম্ভব নয়। তবে কখনোই বলা হয়নি যে বাংলাদেশ চাইলেই মুরগির গলা (চিকেন নেক বা শিলিগুড়ি কোরিডর) কাটতে পারে এবং সমুদ্রে অপার সম্ভাবনা রয়েছে।

দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে ভারতের মতো একটি বৃহৎ রাষ্ট্র স্বাভাবিকভাবেই প্রতিবেশী দেশগুলোর রাজনীতি, অর্থনীতি ও নিরাপত্তা পরিবেশকে প্রভাবিত করবে। প্রশ্নটি প্রভাব আছে কি নেই, সেটি নয়; বরং সেই প্রভাবের প্রকৃতি, সীমা ও কার্যকারিতা কী—সেটি বোঝা।

বলা হয়ে থাকে, যখন কোনো জাতি তার রাজনৈতিক সমস্যার ব্যাখ্যা ক্রমাগত বহিরাগত শক্তির মধ্যে খুঁজতে শুরু করে, তখন নিজেদের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, নেতৃত্বের ব্যর্থতা, দুর্নীতি, প্রশাসনিক অদক্ষতা কিংবা গণতান্ত্রিক ঘাটতির মতো অভ্যন্তরীণ কারণগুলো আড়ালে চলে যায়। রাজনৈতিক আত্মসমালোচনার জায়গা সংকুচিত হয়। ফলে বহিরাগত শক্তির প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ যতটা বাড়ে, নিজেদের সক্ষমতা নিয়ে আত্মবিশ্বাস ততটাই কমে।

তবে এ কথা অবশ্যই বলতে হয় যে, ভারতের বাস্তব প্রভাবকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করাও সমানভাবে অযৌক্তিক। দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে ভারতের মতো একটি বৃহৎ রাষ্ট্র স্বাভাবিকভাবেই প্রতিবেশী দেশগুলোর রাজনীতি, অর্থনীতি ও নিরাপত্তা পরিবেশকে প্রভাবিত করবে। প্রশ্নটি প্রভাব আছে কি নেই, সেটি নয়; বরং সেই প্রভাবের প্রকৃতি, সীমা ও কার্যকারিতা কী—সেটি বোঝা।

একটি পরিণত রাষ্ট্রের কাজ হলো এই দুই চরম অবস্থানের মাঝখানে দাঁড়ানো। একদিকে ভারতের বাস্তব প্রভাবকে স্বীকার করা, অন্যদিকে ভারতের ক্ষমতাকে এমন এক সর্বশক্তিমান শক্তি হিসেবে কল্পনা না করা, যার সামনে সবকিছু অসহায়। কারণ ইতিহাসের শিক্ষা হলো—আধিপত্যের সবচেয়ে সফল রূপ তখনই প্রতিষ্ঠিত হয়, যখন মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করে যে আধিপত্য অনিবার্য।

বাংলাদেশের সামনে তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি সম্ভবত ভারত কতটা শক্তিশালী—তা নয়। বরং প্রশ্নটি হলো, আমরা ভারতকে কতটা শক্তিশালী বলে কল্পনা করি। কারণ ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে, বাস্তব শক্তির চেয়েও শক্তি সম্পর্কে মানুষের বিশ্বাস কাল্পনিক ধারণা অধিক কার্যকর রাজনৈতিক বাস্তবতা সৃষ্টি করতে পারে।

রাষ্ট্রের স্বাধীনতা কেবল তার সীমান্তে রক্ষিত হয় না; রক্ষিত হয় তার নাগরিকদের চিন্তা, আত্মবিশ্বাস এবং বাস্তবতাকে নিরপেক্ষভাবে মূল্যায়ন করার সক্ষমতার মধ্যেও। যে জাতি নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণের ক্ষমতা নিজের মধ্যেই খুঁজে পায়, সে জাতি বহিরাগত প্রভাবকে বুঝতে পারে, মোকাবিলা করতে পারে, কিন্তু তার কাছে আত্মসমর্পণ করে না। আর যে জাতি নিজের শক্তির উপর আস্থা হারায়, সে অনেক সময় বাস্তব শক্তির কাছে নয়, শক্তির কাল্পনিক ধারণার কাছেই পরাজিত হয়।

  • মো. আনিসুর রহমান: প্রভাষক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়
Ad 300x250

সম্পর্কিত