আফতাব উদ্দিন ছিদ্দিকী রাগিব

গণভোট মানে সংবিধানের সঙ্গে গণমানুষের সংলাপ। রাষ্ট্র একটি স্পষ্ট প্রশ্ন রাখে। নাগরিকরা স্বাধীনভাবে উত্তর দেন। এটিই তত্ত্ব। কিন্তু সাম্প্রতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশের গণভোট যেন সেই নীরব সংলাপ নয়; বরং রাষ্ট্রীয় কণ্ঠে একটিমাত্র শব্দের পুনরাবৃত্তি—‘হ্যাঁ’। অথচ গণভোট গণতন্ত্রের নির্মলতম এক প্রকাশ। এখানে রাষ্ট্র নীরব। কেবল মানুষ কথা বলে। কেবল শোনা যায় ব্যালটের ভাষা। সেখানে সরকারই যখন একটি উত্তরের—বিশেষ করে ‘হ্যাঁ’-এর—প্রধান প্রচারযন্ত্রে পরিণত হয়, তখন স্বতঃস্ফূর্ত সম্মতি আর চাপিয়ে দেওয়া সম্মতির মাঝের সীমারেখাটা ঝাপসা হয়ে যায়। প্রশ্নটা এখানেই। রাষ্ট্র কি ব্যালটকে প্রভাবিত করে এমন প্রচারণা চালাতে পারে? এমন প্রচারণা কী আইনসঙ্গত?
জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকার সরাসরি ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে বহুমুখী প্রচারণায় নেমেছে। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে নির্মিত ভিডিও, রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় গান, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, ব্যাংক, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় স্থানে ব্যানার—সব মিলিয়ে একটি সমন্বিত রাষ্ট্রীয় প্রচেষ্টা দৃশ্যমান। প্রধান উপদেষ্টার ফেসবুক পেজে প্রকাশিত ফটোকার্ড ও ভিডিওতে সরাসরি ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। এমনকি জেলা প্রশাসন, ব্যাংক কর্মকর্তা, শিক্ষক এবং এমনকি মসজিদের ইমামদের জুমার খুতবায় আলোচনার মাধ্যমেও ‘হ্যাঁ’ ভোটে জনমত তৈরির নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তাতে নির্বাচন পরিচালনায় সরকারের নিরপেক্ষতা প্রবলভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে (বিবিসি বাংলা, ইত্তেফাক)।
এই প্রেক্ষাপটে আইনি প্রশ্ন অনিবার্য। গণভোট আইন, ১৯৯১-এর ২০ ধারা স্পষ্টভাবে বলছে—নিরপেক্ষেতা, সততা ও ন্যায়নিষ্ঠতার সাথে গণভোট অনুষ্ঠান নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে ভোটারের স্বাধীন মতপ্রকাশও নিশ্চিত করতে হবে। তজ্জন্য নির্বাচন কমিশন প্রয়োজনীয় যে কোন আদেশ বা নির্দেশনা জারী করতে পারবে। সরকারের ‘সকল নির্বাহী কর্তৃপক্ষ’ ওই আদেশ-নির্দেশনা পালনসহ কমিশনকে সব রকম সহায়তা প্রদানে বাধ্য (ধারা-২১)। এই ধারা দুটি হুবহু স্থান পেয়েছে সম্প্রতি জারি হওয়া গণভোট অধ্যাদেশ, ২০২৫-এ। ২০ ধারাটি অধ্যাদেশে ১৮ নং ধারা। আর ২১ ধারাটি অধ্যাদেশের ২০ নং ধারা। এই ধারাগুলো অলংকারিক নয়; ‘অবশ্য পালনীয়’ বিধান। আইন দুটি বিশ্লেষণে দেখা যায়, সরকার এখানে ব্যবস্থাপক, সহায়তাকারী; কোনো বিশেষ উত্তর বা পক্ষের প্রচারক নয়। আর সেই ব্যবস্থাপনা ও সহায়তার কাজটি করতে হবে শতভাগ নিরপেক্ষতা, সততা ও ন্যায়নিষ্ঠতার সাথে।
নির্বাচনের ক্ষেত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আইন হলো গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২। এই আইনে সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহার ও অযাচিত প্রভাব খাটানো দণ্ডনীয়। এটি মূলত সংসদ নির্বাচনের জন্য প্রণীত। তবে সংসদ নির্বাচনের সেই ভোটার তালিকা নিয়ে, একই নির্বাচন কমিশন, একই রিটার্নিং কর্মকর্তারাই কিন্তু, গণভোট পরিচালনা করে। তাই গণভোটেও আইনটি প্রাসঙ্গিক ও প্রযোজ্য। তাছাড়া সততা, ন্যায্যতা ও নিরপেক্ষতা ইত্যাদি কখনও ‘মৌসুমি’ বিষয় নয়। একজন ডিসি বা ইউএনও যদি সংসদ নির্বাচনে কোন প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণা চালাতে না পারেন, তবে রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যবহার করে গণভোটের একটি উত্তরের পক্ষে প্রচারণা কীভাবে বৈধ হয়?
সংবিধান এক্ষেত্রে আরও কঠোর। ৭ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ। ২৭ ও ৩১ অনুচ্ছেদ আইনের দৃষ্টিতে সমতা ও ন্যায়সঙ্গত আচরণের নিশ্চয়তা দেয়। ৩৯ অনুচ্ছেদ চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা নিশ্চিত করে। রাষ্ট্র যদি প্রশাসন, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান বা পরিসর বা অনুসঙ্গ ব্যবহার করে গণভোটে একটি নির্দিষ্ট উত্তর চায়, তাহলে ওই ভোটে নাগরিকের হ্যাঁ-না পছন্দের স্বাধীনতা প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।
সমর্থকরা বলে, অতীতেও এমন হয়েছে। সত্য। ১৯৭৭ ও ১৯৮৫ সালের গণভোটে সামরিক শাসনের অধীনস্থ সরকার সরাসরি ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারণা চালিয়েছিল। ফল ছিল বিপুল বিজয়। কিন্তু ওই বিজয় সরকারকে গৌরবান্বিত করেনি, বিতর্কিত করেছিল। সরকারের বৈধতাকে বার বার প্রশ্নবিদ্ধ করেছিল। ভুলের ইতিহাস কখনও যুক্তি বা বৈধতা নয়, কেবল ‘প্রবণতা’ প্রকাশ করে। আর দুইবার ভুল হওয়া তৃতীয়বারকে সঠিক করে না।
বিদেশি অভিজ্ঞতাও শিক্ষণীয়। যুক্তরাজ্যের ২০১৬ সালের ব্রেক্সিট গণভোটে সরকার ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে অবস্থান নিলেও; কঠোর ব্যয় সীমা, স্বচ্ছতা ও নানা বিধি-নিষেধ বিধি ছিল। ওই ভোটে বিরোধী পক্ষকেও সমান ও নির্বিবাধ প্রচারণার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। তারপরও সেখানে সরকারের ভূমিকা আদালত ও পার্লামেন্টে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।
স্কটল্যান্ডের ২০১৪ সালের গণভোটে রাষ্ট্র যুক্তি দিয়েছে, কিন্তু প্রশাসনিক চাপ প্রয়োগ করেনি। ১৯৮০ ও ১৯৯৫ সালের কানাডার কুইবেক গণভোটে কেন্দ্রীয় সরকার ‘না’ এর পক্ষে অবস্থান নিলেও, সুপ্রিম কোর্ট স্বচ্ছতা, ন্যায্যতা ও সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক চর্চা নিশ্চিত করেছিল। কোর্ট আদেশ দিয়েছিল, ‘প্রচারণা বা পক্ষ-সমর্থন যেন প্রশাসনিক চাপে রূপান্তরিত না হয়’। ভারতে ‘গোয়া অপিনিয়ন পোল’ (১৯৬৭) চলাকালে কেন্দ্রীয় সরকার প্রকাশ্য ও প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ এড়িয়ে গেছে। ওই ভোটে প্রশাসনকে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ আচরণের নির্দেশ দিয়ে বলা হয়—প্রশাসন যেন রেফারি ও খেলোয়াড়, দুই ভূমিকায় অবতীর্ণ না হয়। বিপরীতে পাকিস্তানের ১৯৮৪ সালের জেনারেল জিয়াউল হক-শাসিত গণভোট আজও ‘coercive consent’-এর উদাহরণ হিসেবে উচ্চারিত হয়।
বাংলাদেশে ফিরে তাকালে দেখা যায়, স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগম বাসসকে দেওয়া বক্তব্যে বলেছেন, ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারণা চালানো রাষ্ট্রের দায়িত্ব। এই বক্তব্যই সমস্যার সারকথা। রাষ্ট্রের দায়িত্ব কি প্রশ্ন ব্যাখ্যা করা, নাকি উত্তর বিক্রি করা? বিবিসি বাংলা ও শীর্ষ জাতীয় দৈনিকগুলো দেখাচ্ছে, ‘না’ ভোট দিলে ‘কিছুই পাওয়া যাবে না’—এমন বয়ানও সরকারীভাবে প্রচারিত হচ্ছে। এটি তথ্য নয়, এটি ‘ভয়’। (বাংলাদেশ প্রতিদিন)
গণভোট জনপ্রিয়তা যাচাইয়ের প্রতিযোগিতাও নয়। এটি এক সাংবিধানিক মুহূর্ত। রাষ্ট্র যখন অতিরিক্ত উৎসাহী হয়ে ওঠে, তখন তা শক্তির নয়, অনিশ্চয়তার লক্ষণ। যদি জনগণের রায় বা উত্তর সত্যিই ‘হ্যাঁ’ হয়; তবে গান, ব্যানার, খুতবা বা প্রশাসনিক প্রয়াস ছাড়াই তা উঠে আসবে। আর যদি না আসে, তবে রাষ্ট্রীয় প্রচারণা দিয়েও প্রকৃত সম্মতি তৈরি করা যায় না।
গণতন্ত্র মানে যে কোনো মূল্যে জেতা নয়। এর মর্মার্থ স্বাধীনভাবে নিজের ‘পছন্দ’কে বেছে নেওয়া—যদিও সেই পছন্দ ক্ষমতাবানদের অস্বস্তিতে ফেলে। এখানে ব্যালটই শেষ কথা। শর্ত একটাই—সরকার যেন নীরব থাকে। খেলোয়াড় নয়, সরকার যেন কেবল রেফারীর ভূমিকায় সন্তুষ্ঠ থাকে।
ইমেইল: aftabragib2@gmail.com

গণভোট মানে সংবিধানের সঙ্গে গণমানুষের সংলাপ। রাষ্ট্র একটি স্পষ্ট প্রশ্ন রাখে। নাগরিকরা স্বাধীনভাবে উত্তর দেন। এটিই তত্ত্ব। কিন্তু সাম্প্রতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশের গণভোট যেন সেই নীরব সংলাপ নয়; বরং রাষ্ট্রীয় কণ্ঠে একটিমাত্র শব্দের পুনরাবৃত্তি—‘হ্যাঁ’। অথচ গণভোট গণতন্ত্রের নির্মলতম এক প্রকাশ। এখানে রাষ্ট্র নীরব। কেবল মানুষ কথা বলে। কেবল শোনা যায় ব্যালটের ভাষা। সেখানে সরকারই যখন একটি উত্তরের—বিশেষ করে ‘হ্যাঁ’-এর—প্রধান প্রচারযন্ত্রে পরিণত হয়, তখন স্বতঃস্ফূর্ত সম্মতি আর চাপিয়ে দেওয়া সম্মতির মাঝের সীমারেখাটা ঝাপসা হয়ে যায়। প্রশ্নটা এখানেই। রাষ্ট্র কি ব্যালটকে প্রভাবিত করে এমন প্রচারণা চালাতে পারে? এমন প্রচারণা কী আইনসঙ্গত?
জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকার সরাসরি ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে বহুমুখী প্রচারণায় নেমেছে। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে নির্মিত ভিডিও, রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় গান, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, ব্যাংক, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় স্থানে ব্যানার—সব মিলিয়ে একটি সমন্বিত রাষ্ট্রীয় প্রচেষ্টা দৃশ্যমান। প্রধান উপদেষ্টার ফেসবুক পেজে প্রকাশিত ফটোকার্ড ও ভিডিওতে সরাসরি ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। এমনকি জেলা প্রশাসন, ব্যাংক কর্মকর্তা, শিক্ষক এবং এমনকি মসজিদের ইমামদের জুমার খুতবায় আলোচনার মাধ্যমেও ‘হ্যাঁ’ ভোটে জনমত তৈরির নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তাতে নির্বাচন পরিচালনায় সরকারের নিরপেক্ষতা প্রবলভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে (বিবিসি বাংলা, ইত্তেফাক)।
এই প্রেক্ষাপটে আইনি প্রশ্ন অনিবার্য। গণভোট আইন, ১৯৯১-এর ২০ ধারা স্পষ্টভাবে বলছে—নিরপেক্ষেতা, সততা ও ন্যায়নিষ্ঠতার সাথে গণভোট অনুষ্ঠান নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে ভোটারের স্বাধীন মতপ্রকাশও নিশ্চিত করতে হবে। তজ্জন্য নির্বাচন কমিশন প্রয়োজনীয় যে কোন আদেশ বা নির্দেশনা জারী করতে পারবে। সরকারের ‘সকল নির্বাহী কর্তৃপক্ষ’ ওই আদেশ-নির্দেশনা পালনসহ কমিশনকে সব রকম সহায়তা প্রদানে বাধ্য (ধারা-২১)। এই ধারা দুটি হুবহু স্থান পেয়েছে সম্প্রতি জারি হওয়া গণভোট অধ্যাদেশ, ২০২৫-এ। ২০ ধারাটি অধ্যাদেশে ১৮ নং ধারা। আর ২১ ধারাটি অধ্যাদেশের ২০ নং ধারা। এই ধারাগুলো অলংকারিক নয়; ‘অবশ্য পালনীয়’ বিধান। আইন দুটি বিশ্লেষণে দেখা যায়, সরকার এখানে ব্যবস্থাপক, সহায়তাকারী; কোনো বিশেষ উত্তর বা পক্ষের প্রচারক নয়। আর সেই ব্যবস্থাপনা ও সহায়তার কাজটি করতে হবে শতভাগ নিরপেক্ষতা, সততা ও ন্যায়নিষ্ঠতার সাথে।
নির্বাচনের ক্ষেত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আইন হলো গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২। এই আইনে সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহার ও অযাচিত প্রভাব খাটানো দণ্ডনীয়। এটি মূলত সংসদ নির্বাচনের জন্য প্রণীত। তবে সংসদ নির্বাচনের সেই ভোটার তালিকা নিয়ে, একই নির্বাচন কমিশন, একই রিটার্নিং কর্মকর্তারাই কিন্তু, গণভোট পরিচালনা করে। তাই গণভোটেও আইনটি প্রাসঙ্গিক ও প্রযোজ্য। তাছাড়া সততা, ন্যায্যতা ও নিরপেক্ষতা ইত্যাদি কখনও ‘মৌসুমি’ বিষয় নয়। একজন ডিসি বা ইউএনও যদি সংসদ নির্বাচনে কোন প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণা চালাতে না পারেন, তবে রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যবহার করে গণভোটের একটি উত্তরের পক্ষে প্রচারণা কীভাবে বৈধ হয়?
সংবিধান এক্ষেত্রে আরও কঠোর। ৭ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ। ২৭ ও ৩১ অনুচ্ছেদ আইনের দৃষ্টিতে সমতা ও ন্যায়সঙ্গত আচরণের নিশ্চয়তা দেয়। ৩৯ অনুচ্ছেদ চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা নিশ্চিত করে। রাষ্ট্র যদি প্রশাসন, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান বা পরিসর বা অনুসঙ্গ ব্যবহার করে গণভোটে একটি নির্দিষ্ট উত্তর চায়, তাহলে ওই ভোটে নাগরিকের হ্যাঁ-না পছন্দের স্বাধীনতা প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।
সমর্থকরা বলে, অতীতেও এমন হয়েছে। সত্য। ১৯৭৭ ও ১৯৮৫ সালের গণভোটে সামরিক শাসনের অধীনস্থ সরকার সরাসরি ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারণা চালিয়েছিল। ফল ছিল বিপুল বিজয়। কিন্তু ওই বিজয় সরকারকে গৌরবান্বিত করেনি, বিতর্কিত করেছিল। সরকারের বৈধতাকে বার বার প্রশ্নবিদ্ধ করেছিল। ভুলের ইতিহাস কখনও যুক্তি বা বৈধতা নয়, কেবল ‘প্রবণতা’ প্রকাশ করে। আর দুইবার ভুল হওয়া তৃতীয়বারকে সঠিক করে না।
বিদেশি অভিজ্ঞতাও শিক্ষণীয়। যুক্তরাজ্যের ২০১৬ সালের ব্রেক্সিট গণভোটে সরকার ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে অবস্থান নিলেও; কঠোর ব্যয় সীমা, স্বচ্ছতা ও নানা বিধি-নিষেধ বিধি ছিল। ওই ভোটে বিরোধী পক্ষকেও সমান ও নির্বিবাধ প্রচারণার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। তারপরও সেখানে সরকারের ভূমিকা আদালত ও পার্লামেন্টে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।
স্কটল্যান্ডের ২০১৪ সালের গণভোটে রাষ্ট্র যুক্তি দিয়েছে, কিন্তু প্রশাসনিক চাপ প্রয়োগ করেনি। ১৯৮০ ও ১৯৯৫ সালের কানাডার কুইবেক গণভোটে কেন্দ্রীয় সরকার ‘না’ এর পক্ষে অবস্থান নিলেও, সুপ্রিম কোর্ট স্বচ্ছতা, ন্যায্যতা ও সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক চর্চা নিশ্চিত করেছিল। কোর্ট আদেশ দিয়েছিল, ‘প্রচারণা বা পক্ষ-সমর্থন যেন প্রশাসনিক চাপে রূপান্তরিত না হয়’। ভারতে ‘গোয়া অপিনিয়ন পোল’ (১৯৬৭) চলাকালে কেন্দ্রীয় সরকার প্রকাশ্য ও প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ এড়িয়ে গেছে। ওই ভোটে প্রশাসনকে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ আচরণের নির্দেশ দিয়ে বলা হয়—প্রশাসন যেন রেফারি ও খেলোয়াড়, দুই ভূমিকায় অবতীর্ণ না হয়। বিপরীতে পাকিস্তানের ১৯৮৪ সালের জেনারেল জিয়াউল হক-শাসিত গণভোট আজও ‘coercive consent’-এর উদাহরণ হিসেবে উচ্চারিত হয়।
বাংলাদেশে ফিরে তাকালে দেখা যায়, স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগম বাসসকে দেওয়া বক্তব্যে বলেছেন, ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারণা চালানো রাষ্ট্রের দায়িত্ব। এই বক্তব্যই সমস্যার সারকথা। রাষ্ট্রের দায়িত্ব কি প্রশ্ন ব্যাখ্যা করা, নাকি উত্তর বিক্রি করা? বিবিসি বাংলা ও শীর্ষ জাতীয় দৈনিকগুলো দেখাচ্ছে, ‘না’ ভোট দিলে ‘কিছুই পাওয়া যাবে না’—এমন বয়ানও সরকারীভাবে প্রচারিত হচ্ছে। এটি তথ্য নয়, এটি ‘ভয়’। (বাংলাদেশ প্রতিদিন)
গণভোট জনপ্রিয়তা যাচাইয়ের প্রতিযোগিতাও নয়। এটি এক সাংবিধানিক মুহূর্ত। রাষ্ট্র যখন অতিরিক্ত উৎসাহী হয়ে ওঠে, তখন তা শক্তির নয়, অনিশ্চয়তার লক্ষণ। যদি জনগণের রায় বা উত্তর সত্যিই ‘হ্যাঁ’ হয়; তবে গান, ব্যানার, খুতবা বা প্রশাসনিক প্রয়াস ছাড়াই তা উঠে আসবে। আর যদি না আসে, তবে রাষ্ট্রীয় প্রচারণা দিয়েও প্রকৃত সম্মতি তৈরি করা যায় না।
গণতন্ত্র মানে যে কোনো মূল্যে জেতা নয়। এর মর্মার্থ স্বাধীনভাবে নিজের ‘পছন্দ’কে বেছে নেওয়া—যদিও সেই পছন্দ ক্ষমতাবানদের অস্বস্তিতে ফেলে। এখানে ব্যালটই শেষ কথা। শর্ত একটাই—সরকার যেন নীরব থাকে। খেলোয়াড় নয়, সরকার যেন কেবল রেফারীর ভূমিকায় সন্তুষ্ঠ থাকে।
ইমেইল: aftabragib2@gmail.com

লাশের কি কোনো রাজনীতি আছে? ৯ মাসের শিশুর লাশের গায়ে কি দলীয় লেবেল সাঁটা সম্ভব? বাগেরহাটের মর্মান্তিক ঘটনা ও কারাবন্দীর প্যারোল অধিকার প্রসঙ্গে লিখেছেন কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক মারুফ ইসলাম।
১৮ ঘণ্টা আগে
একসময় যা ছিল উগ্রবাদী প্রচারপুস্তকের স্লোগান, আজ তা আমেরিকার রাষ্ট্রীয় ভাষ্য। ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে নাৎসি মতাদর্শ লালন ও প্রচারের অভিযোগ ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।
২০ ঘণ্টা আগে
আজকের সমাজে আমরা এমন এক বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে ক্ষণিকের আনন্দ আমাদের জীবনের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠছে। মোবাইল স্ক্রলের তৃপ্তি, ফেসবুক বা রিলসের অন্তহীন প্রবাহ, কিংবা ভার্চুয়াল বিনোদনের সাময়িক স্বস্তি—এসবই আমাদের ক্লান্ত মনকে মুহূর্তের জন্য আরাম দেয়।
১ দিন আগে
কৃষি নির্ভর মেহেরপুর-মুজিবনগরের খেটে খাওয়া মানুষ এখন আর শুধু দল বদলের কথা বলছে না, তাদের চিন্তা বদলের কথা বলছে।
২ দিন আগে