সারওয়ার হোসেন

১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ ফুরিয়ে আসছে। প্রায় তিন দশক ধরে চুক্তিটি দুই দেশের মধ্যকার সম্পর্ক স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করেছে। তবে বিষয়টি এখন আর শুধু ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। এটি এখন দক্ষিণ এশিয়ায় জলবায়ু সহনশীলতা, আন্তঃসীমান্ত নদী ব্যবস্থাপনা এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা বিষয়ক বৃহত্তর আলোচনার অংশ হয়ে উঠেছে।
গঙ্গার পানি বণ্টন নিয়ে ঢাকা ও দিল্লির মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ কাঠামো তৈরি করেছিল এই চুক্তি। তবে চুক্তিটির মেয়াদ শেষ হবে ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে। এমন এক সময়ে এই মেয়াদ শেষ হচ্ছে, যখন পুরো অববাহিকাজুড়ে রাজনৈতিক টানাপোড়েন বাড়ছে এবং পরিবেশগত চাপও ক্রমেই তীব্র হচ্ছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বাড়ছে। একই সঙ্গে পানি ব্যবহারের চাহিদাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে শুষ্ক মৌসুমে নদীর পানিপ্রবাহ নিয়ে উদ্বেগ আবারও দুই দেশের সীমান্তের দুই পাশেই নতুন করে সামনে আসছে।
ক্ষমতাসীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সম্প্রতি জানিয়েছে, ভারতের সঙ্গে ভবিষ্যৎ সম্পর্ক অনেকটাই গঙ্গা পানি চুক্তির ওপর নির্ভর করবে। এই বক্তব্য থেকেই বোঝা যায়, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ক্ষেত্রে এটি কতটা গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। তবে এখানে ঝুঁকিও রয়েছে। পানি বণ্টন ও কূটনৈতিক আলোচনার ওপর অতিরিক্ত গুরুত্ব দিতে গিয়ে নদীর নিজস্ব স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার প্রশ্নটি আড়ালে পড়ে যেতে পারে।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিদ্যমান অনেক পানি বণ্টন ব্যবস্থার ভিত্তিই বদলে যাচ্ছে। তাই এখন একটি মৌলিক প্রশ্ন তোলা জরুরি—গঙ্গা নদী ব্যবস্থা আর কতটা পরিবেশগত চাপ সহ্য করতে পারবে? সেই সীমা অতিক্রম করার আগে কি আমরা যথাযথ পদক্ষেপ নিতে পারব?
জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক আন্তঃসরকার প্যানেল (আইপিসিসি)-এর ষষ্ঠ মূল্যায়ন প্রতিবেদন মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা বিশ্বের অন্যতম অঞ্চল দক্ষিণ এশিয়া। এই ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে তুলছে দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি, দারিদ্র্য, পানির সংকট, দুর্বল শাসনব্যবস্থা এবং আন্তঃসীমান্ত নদীগুলোকে ঘিরে বাড়তে থাকা বিরোধ।
বিশ্বের খুব কম অঞ্চলই রয়েছে, যেগুলোর ইতিহাস, অর্থনীতি ও সংস্কৃতি নদীকেন্দ্রিকভাবে দক্ষিণ এশিয়ার মতো গড়ে উঠেছে। গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা নদী ব্যবস্থা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই অঞ্চলের সভ্যতা, কৃষি, অর্থনীতি ও সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রেখেছে। কিন্তু আজ জলবায়ু পরিবর্তন এবং ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা এই অভিন্ন নদীগুলোর ওপর অভূতপূর্ব চাপ সৃষ্টি করছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ইতোমধ্যে হিমালয়ের হিমবাহ, মৌসুমি বৃষ্টিপাতের ধরন এবং নদীর পানিপ্রবাহে বড় ধরনের পরিবর্তন আনছে। একই সঙ্গে পুরো অববাহিকাজুড়ে পরিবেশগত চাপের নানা লক্ষণও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এর প্রভাব পড়ছে মানুষের জীবিকা, মৎস্যসম্পদ, বন্যা পরিস্থিতি এবং লবণাক্ততার ওপর।
সাম্প্রতিক গবেষণাগুলো বলছে, এই অঞ্চলের বেশ কয়েকটি বড় নদী, বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমের গঙ্গা, বিপজ্জনক পরিবেশগত সীমার কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের চাপ, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যবস্থার পরিবর্তন এবং উজানে পানি প্রত্যাহারের কারণে নদীর প্রবাহ কমে যাচ্ছে। এর ফলে লবণাক্ততা বাড়ছে, কৃষি উৎপাদন চাপের মুখে পড়ছে, জলজ প্রতিবেশ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং নদীনির্ভর মৎস্যসম্পদ কমে যাচ্ছে।
নদীর আন্তঃসীমান্ত চরিত্রের কারণে স্থানীয় পর্যায়ের পানি সংকট খুব দ্রুত আঞ্চলিক সংকটে রূপ নিতে পারে।
গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা অববাহিকাজুড়ে নদীর প্রবাহ কমে যাওয়া এবং লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাওয়ায় পরিবেশগত চাপ বাড়ছে। এর সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে ভারতের পূর্বাঞ্চল এবং বাংলাদেশের উপকূলীয় ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায়। বঙ্গোপসাগরের সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির প্রভাব মোকাবিলা করতে এবং বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনকে রক্ষা করতে পর্যাপ্ত মিঠাপানির প্রবাহ অত্যন্ত জরুরি। এই সুন্দরবন ভারত ও বাংলাদেশের যৌথ প্রাকৃতিক সম্পদ।
শিল্পকারখানার বর্জ্য, পয়োনিষ্কাশন এবং কৃষি খাত থেকে আসা রাসায়নিক প্রবাহ দক্ষিণ এশিয়ার নদীগুলোকে ক্রমাগত দূষিত করছে। এ পরিস্থিতি নদী ব্যবস্থাপনায় আরও শক্তিশালী আঞ্চলিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তাকে সামনে নিয়ে এসেছে।
নদীর স্বাভাবিক প্রবাহের পরিবর্তনের কারণে নদী ও তার আশপাশের জলাভূমির মধ্যে জলগত সংযোগও দুর্বল হয়ে পড়ছে। মৌসুমি বন্যা কমে যাওয়ায় পুষ্টি উপাদানের আদান-প্রদান এবং বিভিন্ন প্রাণীর আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে জীববৈচিত্র্য কমছে। একই সঙ্গে জলাভূমিগুলোর সেই সক্ষমতাও দুর্বল হচ্ছে, যা কার্বন শোষণ এবং জলবায়ুগত বৈচিত্র্যের ধাক্কা সামলাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
নদী ব্যবস্থার এই পরিবর্তনের প্রভাব ভারতের ভেতরেও স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে।
ভারতের বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ফারাক্কা বাঁধের কারণে বিহারের কিছু এলাকায় বন্যার ঝুঁকি বেড়েছে। বিশেষ করে পাটনা ও ভাগলপুরের মধ্যবর্তী এলাকায় উজানে পলি জমে নদীর ধারণক্ষমতা কমে যাচ্ছে। ফলে ভারী বর্ষণের সময় বন্যা আরও তীব্র হতে পারে।
একসময় গঙ্গা বিপুল পরিমাণ পলি বয়ে এনে বন্যাপ্রবণ সমভূমি ও বদ্বীপকে সমৃদ্ধ করত। এখন ফারাক্কা বাঁধ সেই পলির বড় অংশ উজানেই আটকে রাখছে। এর ফলে একটি ভারসাম্যহীন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। উজানে পলি জমে বন্যার ঝুঁকি বাড়ছে, আর ভাটিতে পলির ঘাটতির কারণে বদ্বীপ ক্ষয় ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির বিরুদ্ধে প্রতিরোধক্ষমতা হারাচ্ছে। নদীতীর ভাঙন, ভূমি অবনমন এবং আবাসস্থল ধ্বংসের মতো সমস্যা দীর্ঘমেয়াদে নদীর স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি হয়ে উঠছে।
ভারতের পশ্চিমবঙ্গেও এর প্রভাব দেখা যাচ্ছে। মাছের সংখ্যা কমে যাওয়ায় মানুষের জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এর সঙ্গে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যও প্রভাবিত হচ্ছে। দুর্গাপূজা বা জামাই ষষ্ঠীর মতো উৎসবের সঙ্গেও মাছের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।
ফারাক্কা বাঁধ মাছের স্বাভাবিক অভিবাসন পথ বাধাগ্রস্ত করে। গঙ্গা অববাহিকাজুড়ে একসময় ব্যাপকভাবে বিচরণ করা ইলিশ মাছের অভিবাসন প্রায় ভেঙে পড়েছে। এটি নদীর পরিবেশ ও মৎস্যসম্পদের ওপর সৃষ্ট ক্ষতির একটি বড় উদাহরণ। শুধু ইলিশ নয়, ফারাক্কা বাঁধের কারণে আবাসস্থল ও পরিবেশগত সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ায় গাঙ্গেয় ডলফিন, ঘড়িয়ালসহ বিভিন্ন মাছের প্রজাতিও হুমকির মুখে পড়েছে।
গঙ্গা শুধু নদী নয়। এটি একটি গতিশীল ও জীবন্ত পরিবেশগত ব্যবস্থা, যা কোটি কোটি মানুষের জীবন ও জীবিকাকে টিকিয়ে রাখে। একই সঙ্গে অসংখ্য প্রাণী ও উদ্ভিদের আবাসস্থল হিসেবেও কাজ করে। তাই এর পরিবেশগত অখণ্ডতা রক্ষা করতে হলে বিজ্ঞাননির্ভর নীতি, বিভিন্ন খাতের সমন্বিত উদ্যোগ এবং দীর্ঘমেয়াদি টেকসই নদী ব্যবস্থাপনার প্রতি দৃঢ় অঙ্গীকার প্রয়োজন।
একটি সম্ভাব্য সমাধান হতে পারে নদীর জন্য ‘সেফ অপারেটিং স্পেস’ (এসওএস) বা নিরাপদ পরিচালন সীমা ধারণা চালু করা।
বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস (বিইউপি), গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এবং রিভারাইন পিপল-এর গবেষকদের সঙ্গে যৌথভাবে পরিচালিত একটি আন্তর্জাতিক গবেষণার নেতৃত্ব দিয়েছি আমি। ওই গবেষণাতেই প্রথমবারের মতো গঙ্গা বদ্বীপের প্রধান নদীগুলোর জন্য একটি ‘সেফ অপারেটিং স্পেস’ নির্ধারণ করা হয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের বদ্বীপ অঞ্চলের ১০টি নদীর মধ্যে চারটি ইতোমধ্যে নিরাপদ সীমা অতিক্রম করেছে। নদীগুলোর প্রবাহে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটেছে। বাকি ছয়টি নদীকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় রয়েছে বলে চিহ্নিত করা হয়েছে।
এই গবেষণা আন্তঃসীমান্ত পানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিজ্ঞানভিত্তিক নীতি প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সরবরাহ করে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়ায় টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনেও এটি সহায়ক হতে পারে। গঙ্গা পানি চুক্তির নতুন কাঠামো নিয়ে আলোচনা করার সময় এ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত।
অভিন্ন নদীগুলো যেন আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার উৎস হয়ে থাকে, নতুন ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কারণ না হয়—এটি নিশ্চিত করা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু একই সঙ্গে এখনই পদক্ষেপ নেওয়াও জরুরি, যাতে গঙ্গা নদী ব্যবস্থা ভবিষ্যতের দশকগুলোতেও ভারত ও বাংলাদেশের মানুষকে সহায়তা করার মতো সক্ষমতা ধরে রাখতে পারে। কারণ নদীর স্বাস্থ্য রক্ষা করতে ব্যর্থ হলে শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় ক্ষতির মুখে পড়বেন সেই মানুষরাই, যাদের জীবিকা, খাদ্যনিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ এই নদীর ওপর নির্ভরশীল।
(ডাউন টু আর্থ-এ প্রকাশিত লেখাটি অনুবাদ করেছেন মাহবুবুল আলম তারেক)

১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ ফুরিয়ে আসছে। প্রায় তিন দশক ধরে চুক্তিটি দুই দেশের মধ্যকার সম্পর্ক স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করেছে। তবে বিষয়টি এখন আর শুধু ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। এটি এখন দক্ষিণ এশিয়ায় জলবায়ু সহনশীলতা, আন্তঃসীমান্ত নদী ব্যবস্থাপনা এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা বিষয়ক বৃহত্তর আলোচনার অংশ হয়ে উঠেছে।
গঙ্গার পানি বণ্টন নিয়ে ঢাকা ও দিল্লির মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ কাঠামো তৈরি করেছিল এই চুক্তি। তবে চুক্তিটির মেয়াদ শেষ হবে ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে। এমন এক সময়ে এই মেয়াদ শেষ হচ্ছে, যখন পুরো অববাহিকাজুড়ে রাজনৈতিক টানাপোড়েন বাড়ছে এবং পরিবেশগত চাপও ক্রমেই তীব্র হচ্ছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বাড়ছে। একই সঙ্গে পানি ব্যবহারের চাহিদাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে শুষ্ক মৌসুমে নদীর পানিপ্রবাহ নিয়ে উদ্বেগ আবারও দুই দেশের সীমান্তের দুই পাশেই নতুন করে সামনে আসছে।
ক্ষমতাসীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সম্প্রতি জানিয়েছে, ভারতের সঙ্গে ভবিষ্যৎ সম্পর্ক অনেকটাই গঙ্গা পানি চুক্তির ওপর নির্ভর করবে। এই বক্তব্য থেকেই বোঝা যায়, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ক্ষেত্রে এটি কতটা গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। তবে এখানে ঝুঁকিও রয়েছে। পানি বণ্টন ও কূটনৈতিক আলোচনার ওপর অতিরিক্ত গুরুত্ব দিতে গিয়ে নদীর নিজস্ব স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার প্রশ্নটি আড়ালে পড়ে যেতে পারে।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিদ্যমান অনেক পানি বণ্টন ব্যবস্থার ভিত্তিই বদলে যাচ্ছে। তাই এখন একটি মৌলিক প্রশ্ন তোলা জরুরি—গঙ্গা নদী ব্যবস্থা আর কতটা পরিবেশগত চাপ সহ্য করতে পারবে? সেই সীমা অতিক্রম করার আগে কি আমরা যথাযথ পদক্ষেপ নিতে পারব?
জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক আন্তঃসরকার প্যানেল (আইপিসিসি)-এর ষষ্ঠ মূল্যায়ন প্রতিবেদন মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা বিশ্বের অন্যতম অঞ্চল দক্ষিণ এশিয়া। এই ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে তুলছে দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি, দারিদ্র্য, পানির সংকট, দুর্বল শাসনব্যবস্থা এবং আন্তঃসীমান্ত নদীগুলোকে ঘিরে বাড়তে থাকা বিরোধ।
বিশ্বের খুব কম অঞ্চলই রয়েছে, যেগুলোর ইতিহাস, অর্থনীতি ও সংস্কৃতি নদীকেন্দ্রিকভাবে দক্ষিণ এশিয়ার মতো গড়ে উঠেছে। গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা নদী ব্যবস্থা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই অঞ্চলের সভ্যতা, কৃষি, অর্থনীতি ও সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রেখেছে। কিন্তু আজ জলবায়ু পরিবর্তন এবং ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা এই অভিন্ন নদীগুলোর ওপর অভূতপূর্ব চাপ সৃষ্টি করছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ইতোমধ্যে হিমালয়ের হিমবাহ, মৌসুমি বৃষ্টিপাতের ধরন এবং নদীর পানিপ্রবাহে বড় ধরনের পরিবর্তন আনছে। একই সঙ্গে পুরো অববাহিকাজুড়ে পরিবেশগত চাপের নানা লক্ষণও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এর প্রভাব পড়ছে মানুষের জীবিকা, মৎস্যসম্পদ, বন্যা পরিস্থিতি এবং লবণাক্ততার ওপর।
সাম্প্রতিক গবেষণাগুলো বলছে, এই অঞ্চলের বেশ কয়েকটি বড় নদী, বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমের গঙ্গা, বিপজ্জনক পরিবেশগত সীমার কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের চাপ, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যবস্থার পরিবর্তন এবং উজানে পানি প্রত্যাহারের কারণে নদীর প্রবাহ কমে যাচ্ছে। এর ফলে লবণাক্ততা বাড়ছে, কৃষি উৎপাদন চাপের মুখে পড়ছে, জলজ প্রতিবেশ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং নদীনির্ভর মৎস্যসম্পদ কমে যাচ্ছে।
নদীর আন্তঃসীমান্ত চরিত্রের কারণে স্থানীয় পর্যায়ের পানি সংকট খুব দ্রুত আঞ্চলিক সংকটে রূপ নিতে পারে।
গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা অববাহিকাজুড়ে নদীর প্রবাহ কমে যাওয়া এবং লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাওয়ায় পরিবেশগত চাপ বাড়ছে। এর সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে ভারতের পূর্বাঞ্চল এবং বাংলাদেশের উপকূলীয় ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায়। বঙ্গোপসাগরের সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির প্রভাব মোকাবিলা করতে এবং বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনকে রক্ষা করতে পর্যাপ্ত মিঠাপানির প্রবাহ অত্যন্ত জরুরি। এই সুন্দরবন ভারত ও বাংলাদেশের যৌথ প্রাকৃতিক সম্পদ।
শিল্পকারখানার বর্জ্য, পয়োনিষ্কাশন এবং কৃষি খাত থেকে আসা রাসায়নিক প্রবাহ দক্ষিণ এশিয়ার নদীগুলোকে ক্রমাগত দূষিত করছে। এ পরিস্থিতি নদী ব্যবস্থাপনায় আরও শক্তিশালী আঞ্চলিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তাকে সামনে নিয়ে এসেছে।
নদীর স্বাভাবিক প্রবাহের পরিবর্তনের কারণে নদী ও তার আশপাশের জলাভূমির মধ্যে জলগত সংযোগও দুর্বল হয়ে পড়ছে। মৌসুমি বন্যা কমে যাওয়ায় পুষ্টি উপাদানের আদান-প্রদান এবং বিভিন্ন প্রাণীর আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে জীববৈচিত্র্য কমছে। একই সঙ্গে জলাভূমিগুলোর সেই সক্ষমতাও দুর্বল হচ্ছে, যা কার্বন শোষণ এবং জলবায়ুগত বৈচিত্র্যের ধাক্কা সামলাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
নদী ব্যবস্থার এই পরিবর্তনের প্রভাব ভারতের ভেতরেও স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে।
ভারতের বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ফারাক্কা বাঁধের কারণে বিহারের কিছু এলাকায় বন্যার ঝুঁকি বেড়েছে। বিশেষ করে পাটনা ও ভাগলপুরের মধ্যবর্তী এলাকায় উজানে পলি জমে নদীর ধারণক্ষমতা কমে যাচ্ছে। ফলে ভারী বর্ষণের সময় বন্যা আরও তীব্র হতে পারে।
একসময় গঙ্গা বিপুল পরিমাণ পলি বয়ে এনে বন্যাপ্রবণ সমভূমি ও বদ্বীপকে সমৃদ্ধ করত। এখন ফারাক্কা বাঁধ সেই পলির বড় অংশ উজানেই আটকে রাখছে। এর ফলে একটি ভারসাম্যহীন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। উজানে পলি জমে বন্যার ঝুঁকি বাড়ছে, আর ভাটিতে পলির ঘাটতির কারণে বদ্বীপ ক্ষয় ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির বিরুদ্ধে প্রতিরোধক্ষমতা হারাচ্ছে। নদীতীর ভাঙন, ভূমি অবনমন এবং আবাসস্থল ধ্বংসের মতো সমস্যা দীর্ঘমেয়াদে নদীর স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি হয়ে উঠছে।
ভারতের পশ্চিমবঙ্গেও এর প্রভাব দেখা যাচ্ছে। মাছের সংখ্যা কমে যাওয়ায় মানুষের জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এর সঙ্গে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যও প্রভাবিত হচ্ছে। দুর্গাপূজা বা জামাই ষষ্ঠীর মতো উৎসবের সঙ্গেও মাছের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।
ফারাক্কা বাঁধ মাছের স্বাভাবিক অভিবাসন পথ বাধাগ্রস্ত করে। গঙ্গা অববাহিকাজুড়ে একসময় ব্যাপকভাবে বিচরণ করা ইলিশ মাছের অভিবাসন প্রায় ভেঙে পড়েছে। এটি নদীর পরিবেশ ও মৎস্যসম্পদের ওপর সৃষ্ট ক্ষতির একটি বড় উদাহরণ। শুধু ইলিশ নয়, ফারাক্কা বাঁধের কারণে আবাসস্থল ও পরিবেশগত সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ায় গাঙ্গেয় ডলফিন, ঘড়িয়ালসহ বিভিন্ন মাছের প্রজাতিও হুমকির মুখে পড়েছে।
গঙ্গা শুধু নদী নয়। এটি একটি গতিশীল ও জীবন্ত পরিবেশগত ব্যবস্থা, যা কোটি কোটি মানুষের জীবন ও জীবিকাকে টিকিয়ে রাখে। একই সঙ্গে অসংখ্য প্রাণী ও উদ্ভিদের আবাসস্থল হিসেবেও কাজ করে। তাই এর পরিবেশগত অখণ্ডতা রক্ষা করতে হলে বিজ্ঞাননির্ভর নীতি, বিভিন্ন খাতের সমন্বিত উদ্যোগ এবং দীর্ঘমেয়াদি টেকসই নদী ব্যবস্থাপনার প্রতি দৃঢ় অঙ্গীকার প্রয়োজন।
একটি সম্ভাব্য সমাধান হতে পারে নদীর জন্য ‘সেফ অপারেটিং স্পেস’ (এসওএস) বা নিরাপদ পরিচালন সীমা ধারণা চালু করা।
বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস (বিইউপি), গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এবং রিভারাইন পিপল-এর গবেষকদের সঙ্গে যৌথভাবে পরিচালিত একটি আন্তর্জাতিক গবেষণার নেতৃত্ব দিয়েছি আমি। ওই গবেষণাতেই প্রথমবারের মতো গঙ্গা বদ্বীপের প্রধান নদীগুলোর জন্য একটি ‘সেফ অপারেটিং স্পেস’ নির্ধারণ করা হয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের বদ্বীপ অঞ্চলের ১০টি নদীর মধ্যে চারটি ইতোমধ্যে নিরাপদ সীমা অতিক্রম করেছে। নদীগুলোর প্রবাহে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটেছে। বাকি ছয়টি নদীকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় রয়েছে বলে চিহ্নিত করা হয়েছে।
এই গবেষণা আন্তঃসীমান্ত পানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিজ্ঞানভিত্তিক নীতি প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সরবরাহ করে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়ায় টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনেও এটি সহায়ক হতে পারে। গঙ্গা পানি চুক্তির নতুন কাঠামো নিয়ে আলোচনা করার সময় এ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত।
অভিন্ন নদীগুলো যেন আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার উৎস হয়ে থাকে, নতুন ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কারণ না হয়—এটি নিশ্চিত করা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু একই সঙ্গে এখনই পদক্ষেপ নেওয়াও জরুরি, যাতে গঙ্গা নদী ব্যবস্থা ভবিষ্যতের দশকগুলোতেও ভারত ও বাংলাদেশের মানুষকে সহায়তা করার মতো সক্ষমতা ধরে রাখতে পারে। কারণ নদীর স্বাস্থ্য রক্ষা করতে ব্যর্থ হলে শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় ক্ষতির মুখে পড়বেন সেই মানুষরাই, যাদের জীবিকা, খাদ্যনিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ এই নদীর ওপর নির্ভরশীল।
(ডাউন টু আর্থ-এ প্রকাশিত লেখাটি অনুবাদ করেছেন মাহবুবুল আলম তারেক)
.png)

আগস্টের সম্ভাব্য ঢেউ মোকাবিলায় এখনই প্রস্তুতি নিতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ জেলার হাসপাতালে চিকিৎসাসামগ্রী, প্রশিক্ষিত চিকিৎসক ও নার্স প্রস্তুত রাখতে হবে। নইলে এবার ডেঙ্গুর সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হতে পারে ঢাকার বাইরের মানুষকে।
১ ঘণ্টা আগে
বাংলাদেশে মাদক আর শুধু সামাজিক সমস্যা নয়; এটিকে বলা যায় জাতীয় নিরাপত্তা সংকট। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সর্বশেষ জরিপ বলছে, প্রায় ৮২ লাখ মানুষ মাদক সেবন করছে, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪.৮৮ শতাংশ। সিনথেটিক মাদকের ব্যাপ্তিও দ্রুত বাড়ছে। আর মাদকাসক্তদের ৬০ শতাংশেরও বেশি তরুণ।
২ ঘণ্টা আগে
বাংলাদেশের কৃষি উন্নয়নের ইতিহাসে কিছু অঞ্চল বিশেষ কৌশলগত গুরুত্ব বহন করে। উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বরেন্দ্র যেমন দেশের খাদ্য উৎপাদনের নতুন শক্তিকেন্দ্র হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, তেমনি মধ্যাঞ্চলের মধুপুর গড় ভবিষ্যতে বাংলাদেশের ফল উৎপাদন, পুষ্টি নিরাপত্তা, জলবায়ু সহনশীল কৃষি এবং পরিবেশ সংরক্ষণের অন্যতম জাতীয়
৯ ঘণ্টা আগে
আটলান্টার স্টেডিয়ামে ১৫ জুন যখন কেপ ভার্দে স্পেনের বিপক্ষে মাঠে নামল, পুরো ফুটবল দুনিয়ার চোখ ছিল আফ্রিকার সেই ছোট দ্বীপরাষ্ট্রের ঐতিহাসিক অভিষেকের দিকে। কিন্তু ঢাকার উত্তরার একটি কারখানার শ্রমিকরা সেদিন আলাদা এক অনুভূতি নিয়ে খেলাটা দেখেছিলেন। কারণ মাঠে দৌড়ানো প্রতিটি খেলোয়াড়ের গায়ে যে জার্সি,
১০ ঘণ্টা আগে