কুয়েতপ্রবাসী ব্যবসায়ীর লেখা

মধ্যপ্রাচ্যে প্রবাসী বাংলাদেশিদের বড় উদ্বেগ ‘চুক্তি নবায়ন’

লেখা:
লেখা:
আসাদ হক

প্রকাশ : ০৮ এপ্রিল ২০২৬, ২৩: ৩০
এআই জেনারেটেড ছবি

ইসরায়েল-আমেরিকা ও ইরানের মধ্যকার ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব এবং সংঘাতের জেরে মধ্যপ্রাচ্য চরম উদ্বেগজনক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই অস্থিতিশীলতার প্রভাব শুধু ওই অঞ্চলের রাজনীতি বা অর্থনীতিতেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং এর সরাসরি শিকার হচ্ছেন সেখানে কর্মরত লাখ লাখ প্রবাসী বাংলাদেশি।

যুদ্ধের আতঙ্ক, বিমান চলাচল বিঘ্নিত হওয়া এবং সার্বিক অর্থনৈতিক মন্দার কারণে প্রবাসী বাংলাদেশিদের দিন কাটছে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে। তবে বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের প্রবাসীদের সবচেয়ে বড় এবং প্রধান উদ্বেগের জায়গা হয়ে দাঁড়িয়েছে তাদের চাকরির ‘কন্ট্রাক্ট রিনিউ’ বা চুক্তি নবায়ন ইস্যু।

মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে, বিশেষ করে কুয়েত, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশে বাংলাদেশিরা মূলত পরিচ্ছন্নতাকর্মী, অফিসের টি-বয়, রেস্তোরাঁকর্মী বা বিমানবন্দরে পোর্টারিংয়ের মতো কায়িক শ্রমের কাজগুলো বেশি করে থাকেন। একটি নির্দিষ্ট মেয়াদের চুক্তিতে (সাধারণত দুই বা তিন বছর) তারা এসব দেশে যান। যাওয়ার জন্য একেকজন কর্মীকে ৫ থেকে ৭ লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ করতে হয়। অথচ সেখানে তাদের মাসিক বেতন থাকে মাত্র ৮০ থেকে ১০০ দিনারের মতো, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় বড়জোর ৪০ হাজার টাকার সমান। এই বিপুল পরিমাণ ঋণ বা খরচ তুলে আনতে একজন কর্মীকে বছরের পর বছর ঘাম ঝরাতে হয়। কিন্তু বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে এই কায়িক শ্রমের কাজগুলোই সবচেয়ে বেশি হুমকির মুখে পড়েছে।

কুয়েতের বাস্তবতার দিকে তাকালে দেখা যায়, সেখানকার এয়ারপোর্টের বেশিরভাগ কর্মীই বাংলাদেশি। অনেকেই নির্দিষ্ট কোম্পানির মাধ্যমে নিয়োগ পেলেও, ভালো আয়ের আশায় প্রতিদিন নিজেদের পকেট থেকে সুপারভাইজারদের উৎকোচ দিয়ে বিমানবন্দরে কাজ নেন, যাতে যাত্রীদের ট্রলি টেনে কিছু বাড়তি বকশিশ পাওয়া যায়। কিন্তু সংঘাতের কারণে ফ্লাইট বাতিল বা কমে যাওয়ায় এই কর্মীদের আয় এখন শূন্যের কোঠায়। নিয়মিত বেতন না পেয়ে টিকে থাকার তাগিদে অনেক প্রবাসী বাধ্য হয়ে অবৈধভাবে পার্ট-টাইম বা চুক্তিভিত্তিক দিনমজুরের কাজ খুঁজছেন। কুয়েতের আইনে যা সম্পূর্ণ বেআইনি। ধরা পড়লে সরাসরি দেশে ফেরত পাঠানো ছাড়া কোনো উপায় থাকে না। পেটের দায়ে তারা এখন এই চরম ঝুঁকি নিতে বাধ্য হচ্ছেন।

এই সংকটজনক পরিস্থিতিতে প্রবাসীদের সবচেয়ে বড় আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে তাদের ভিসার মেয়াদ এবং কাজের চুক্তি। যারা বর্তমানে ছুটিতে দেশে এসেছেন, তারা পড়েছেন সবচেয়ে বড় বিপাকে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর নিয়ম অনুযায়ী, গৃহকর্মীদের (খাদিম ভিসা) চার মাসের মধ্যে এবং সাধারণ খাতের কর্মীদের (শোন ভিসা) ছয় মাসের মধ্যে ছুটি শেষে নিজ নিজ কর্মস্থলে ফিরতে হয়। কিন্তু ফ্লাইট সংকট, বর্ধিত বিমান ভাড়া এবং যুদ্ধাবস্থার কারণে অনেকেই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ফিরতে পারছেন না।

এক্ষেত্রে নিয়ম অনুযায়ী, সময়মতো ফিরতে না পারলে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই তাদের ভিসা বাতিল হয়ে যাওয়ার কথা। সাধারণ পরিস্থিতিতে কোম্পানিগুলো সরকারের কাছে আবেদন করে আটকে পড়া কর্মীদের ভিসার মেয়াদ বাড়ানোর ব্যবস্থা করতে পারে। কিন্তু বর্তমান মন্দায় কোম্পানিগুলো সেই সাহায্যটুকুও করছে না। উল্টো অনেক কোম্পানি এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে কর্মী ছাঁটাইয়ের পথে হাঁটছে।

কুয়েত বা দুবাইয়ের মতো দেশগুলোতে ব্যবসা-বাণিজ্য এমনিতেই এখন পড়তির দিকে। অনেক ব্যবসায়ীর মতে, তাদের ব্যবসার পরিধি প্রায় ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। ফলে কোম্পানিগুলো খরচ বাঁচাতে এখন আর নতুন করে কর্মীদের চুক্তি নবায়ন (কন্ট্রাক্ট রিনিউ) করতে চাচ্ছে না। যে কর্মীর চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে আসছে, তাকে দেশে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। আবার যারা ছুটিতে দেশে গেছেন, তাদের ফেরানোর কোনো উদ্যোগ নিচ্ছে না নিয়োগকর্তারা। এছাড়া যেসব কোম্পানির কাছে ক্লিনিং কর্মীদের চুক্তি থাকে, তারাও কাজ না থাকায় মাসের পর মাস কর্মীদের বেতন আটকে রাখছে। নিজেদের খরচ বাঁচাতে কোম্পানিগুলো এখন কর্মীদের দীর্ঘমেয়াদি অবৈতনিক ছুটিতে (আনপেইড লিভ) দেশে পাঠিয়ে দিচ্ছে।

শুধু কুয়েত নয়, মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশের চিত্রও প্রায় একই। কাতারের অর্থনীতি বিশ্বকাপ ফুটবলের পর থেকেই কিছুটা নিম্নমুখী, আর বর্তমান পরিস্থিতিতে তা আরও নাজুক। দুবাইয়ের ব্যবসা মূলত বিদেশি পর্যটক ও ক্রেতাদের ওপর নির্ভরশীল। যুদ্ধের কারণে সেখানেও বিদেশি ক্রেতার সমাগম কমে যাওয়ায় ব্যবসায় অন্তত ৩০ শতাংশ ধস নেমেছে। ব্যতিক্রম হিসেবে সৌদি আরবের অবস্থা কিছুটা স্থিতিশীল হলেও, সামগ্রিকভাবে পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলেই এক ধরনের অর্থনৈতিক স্থবিরতা বিরাজ করছে।

এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে প্রবাসী বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের ওপরও। মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশিরা মূলত ট্রেডিং ও আমদানিনির্ভর ব্যবসা করেন। কার্গো ফ্লাইটের অভাবে বাংলাদেশ থেকে কাঁচাবাজার ও ফলমূল ঠিকমতো মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছাতে পারছে না। এই সুযোগে সৌদি আরবের রুট ব্যবহার করে ভারতীয় ব্যবসায়ীরা বাজার দখল করে নিচ্ছেন, ফলে আর্থিকভাবে পিছিয়ে পড়ছেন বাংলাদেশি ব্যবসায়ীরা।

একজন রেমিট্যান্স যোদ্ধা যখন ৫-৭ লাখ টাকা ধারদেনা করে বিদেশে পাড়ি জমান, তখন তাঁর চোখে থাকে পরিবারকে একটু স্বচ্ছলতা দেওয়ার স্বপ্ন। কিন্তু মাত্র এক বা দুই বছর কাজ করার পরই যদি যুদ্ধ বা কোম্পানির ছাঁটাইয়ের অজুহাতে তার কন্ট্রাক্ট রিনিউ না হয় এবং তাকে দেশে ফিরে আসতে হয়, তবে সেই কর্মীর পথে বসা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না।

বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্য প্রবাসী বাংলাদেশিদের প্রতিটি দিন কাটছে এই কন্ট্রাক্ট রিনিউ না হওয়ার আতঙ্কে। যুদ্ধবিরতির আলোচনা চললেও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি কবে স্বাভাবিক হবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। এই চরম অনিশ্চয়তার মাঝে আটকে পড়া কর্মীদের ভিসা নবায়ন এবং তাদের কর্মস্থল সুরক্ষিত রাখার জন্য বাংলাদেশ সরকার ও দূতাবাসগুলোর উচিত অবিলম্বে জোরদার কূটনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা। রেমিট্যান্স পাঠিয়ে যারা দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখছেন, চরম এই বিপদের দিনে তাদের পাশে দাঁড়ানো রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব। তা না হলে হাজার হাজার প্রবাসী সর্বস্বান্ত হয়ে দেশে ফিরতে বাধ্য হবেন, যা আমাদের জাতীয় অর্থনীতিতেও এক গভীর ক্ষত সৃষ্টি করবে।

সম্পর্কিত