২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি এক বিধ্বংসী যৌথ সামরিক অভিযানে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির দেহাবসান কেবল একটি রাষ্ট্রের শীর্ষ নেতার মৃত্যু নয়, বরং এটি সমসাময়িক ভূ-রাজনীতির ইতিহাসে এক প্রলয়ঙ্কারী মোড়। তেহরানের ক্ষমতার অলিন্দ থেকে ওয়াশিংটনের হোয়াইট হাউস পর্যন্ত এই ঘটনার কম্পন অনুভূত হচ্ছে, যা মধ্যপ্রাচ্যের কয়েক দশকের স্থিতাবস্থাকে মুহূর্তেই ধূলিসাৎ করে দিয়েছে। হরমুজ প্রণালীর কৌশলগত জলপথ অবরুদ্ধ হওয়ার আশঙ্কায় বিশ্ব অর্থনীতি যখন এক ভয়াবহ মন্দার দ্বারপ্রান্তে, তখন পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর রণসজ্জা তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দামামা বাজিয়ে দিচ্ছে।
এই হত্যাকাণ্ড ইরানকে যেমন এক চরম নেতৃত্ব সংকটে ফেলেছে, তেমনি ইসরায়েল ও আমেরিকার জন্য তৈরি করেছে এক অনির্দিষ্ট ও রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পথ। আদর্শিক লড়াই আর সামরিক আধিপত্যের এই মহাপ্রলয়ে বিশ্ব আজ এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে একটি ভুল পদক্ষেপ পাল্টে দিতে পারে মানব সভ্যতার মানচিত্র। খামেনি পরবর্তী এই নতুন বিশ্বব্যবস্থা কি মুক্তির বারতা আনবে, নাকি অঞ্চলটিকে চিরতরে এক আগ্নেয়গিরির গহ্বরে নিক্ষেপ করবে—তা এখন সময়ের কঠিন পরীক্ষা।
তেহরানের শূন্যতা, ক্ষমতার উত্তরাধিকার সংকট
আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি কেবল ইরানের শাসক ছিলেন না, তিনি ছিলেন ইসলামি প্রজাতন্ত্রের মতাদর্শিক স্তম্ভ এবং ক্ষমতার মূল কেন্দ্রবিন্দু। তাঁর আকস্মিক প্রস্থান দেশটিকে এক গভীর সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক সংকটের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে, যেখানে ক্ষমতার ভারসাম্য সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। এখন একটি সামরিকতন্ত্র বা দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধের ঝুঁকি নিয়ে পরবর্তী উত্তরসূরি নির্বাচনের লড়াই পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রকে অচল করে দিচ্ছে।
অন্তর্বর্তীকালীন শাসন
খামেনির আকস্মিক মৃত্যুর পর ইরানি সংবিধানের ধারা অনুযায়ী রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য জরুরিভিত্তিতে একটি অন্তর্বর্তীকালীন শাসনব্যবস্থা গঠন করা হয়েছে। এই বিশেষ ব্যবস্থায় প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, বিচার বিভাগের প্রধান গোলাম হোসেইন মহসেনি এজি এবং গার্ডিয়ান কাউন্সিলের একজন সদস্যকে নিয়ে একটি ত্রয়ী পরিষদ গঠিত হয়েছে।
এই পরিষদ পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত রাষ্ট্রের প্রশাসনিক ও সামরিক কার্যক্রম পরিচালনা করবে। তবে সামরিক ও নিরাপত্তা খাতে ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পস-এর ব্যাপক প্রভাব থাকায় এই পরিষদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। ফলে ক্ষমতার মূল চাবিকাঠি বর্তমানে এই সাংবিধানিক পরিষদের বদলে সামরিক বাহিনীর হাতে চলে যাওয়ার আশঙ্কা প্রবল।
উত্তরাধিকারের লড়াই
খামেনির আকস্মিক প্রস্থানে ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নেতার পদটি শূন্য হওয়ায় পরবর্তী উত্তরাধিকারী নির্ধারণ নিয়ে বিশেষজ্ঞ মহল এবং অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টসের মধ্যে তীব্র বিতর্ক ও রাজনৈতিক সমীকরণ শুরু হয়েছে। প্রভাবশালী আলেমদের মধ্যে বর্তমানে আলোচনায় আছেন আয়াতুল্লাহ আলিরেজা আরাফি এবং খামেনির পুত্র মোজতবা খামেনি, তবে বংশানুক্রমিক নেতৃত্বের বিষয়ে সাধারণ জনগণের অনীহা মোজতবার জন্য বড় বাধা হতে পারে।
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ইরানের নিরাপত্তা ব্যবস্থা এখন পুরোপুরি ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পস-এর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা তারা তাদের পছন্দের প্রার্থীকে বসাতে অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টসের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে, যা দেশটিকে একটি পূর্ণাঙ্গ সামরিকতন্ত্রের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
হরমুজ প্রণালী: বিশ্ব অর্থনীতির নাভিশ্বাস
বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের প্রায় ৩০ শতাংশ এবং এলএনজির ২০ শতাংশ যে সরু জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়, সেই হরমুজ প্রণালী এখন ইরান-ইসরায়েল সংঘাতের প্রধান কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। ইরান কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই প্রণালী অবরুদ্ধ করে দেয়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ শৃঙ্খলে চরম অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। এর ফলে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম রেকর্ড পরিমাণ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা বিশ্ব অর্থনীতিকে এক ভয়াবহ মন্দার দিকে ঠেলে দিতে পারে।
জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা
ইরান ইতিমধ্যেই হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেয়ায় এবং বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বেশ কিছু বাণিজ্যিক জাহাজ আটক করায় বিশ্ব জ্বালানি বাজারে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। এরফলে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম রাতারাতি ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার তীব্র আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যদি এই প্রণালী পুরোপুরি অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে, তবে তেলের দাম ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে।
এই আকস্মিক মূল্যবৃদ্ধি বিশ্বজুড়ে তীব্র মুদ্রাস্ফীতি এবং অর্থনৈতিক মন্দার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। পশ্চিমা বিশ্ব এখন বিকল্প জ্বালানি উৎসের সন্ধানে মরিয়া হয়ে উঠেছে, কিন্তু স্বল্প মেয়াদে এই ক্ষতি পূরণ করা প্রায় অসম্ভব।
বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল বিপর্যয়
হরমুজ প্রণালীতে সামরিক উত্তেজনার সরাসরি প্রভাব পড়েছে দুবাইয়ের জেবেল আলী বন্দর এবং আবুধাবির খলিফা বন্দরের মতো মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম প্রধান লজিস্টিক হাবগুলোর ওপর, যার ফলে এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যকার পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। নিরাপদ সমুদ্রপথের সন্ধানে জাহাজগুলোকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হচ্ছে, যা পণ্য পরিবহন খরচ প্রায় ৫০-৬০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়ে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এই অতিরিক্ত পরিবহন ব্যয় চূড়ান্ত পণ্যের মূল্যের ওপর প্রভাব ফেলবে, যা বিশ্বজুড়ে নতুন করে ভয়াবহ মুদ্রাস্ফীতি সৃষ্টি করবে। এর ফলে উৎপাদকরা উৎপাদন কমাতে বাধ্য হতে পারেন, যা বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইনে এমন বিপর্যয় আনবে যার প্রভাব সাধারণ ভোক্তাদের ওপর দীর্ঘস্থায়ী হবে।
ওয়াশিংটন ও ইসরায়েলের রণকৌশল: মুক্তি নাকি মহাপ্রলয়?
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প খামেনি হত্যাকে ইরানের জনগণের জন্য ‘দেশ ফিরে পাওয়ার শ্রেষ্ঠ সুযোগ’ হিসেবে অভিহিত করে একে একটি আদর্শিক বিজয় হিসেবে তুলে ধরেছেন। তবে ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের এই কৌশলগত বিজয় মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা এবং অকল্পনীয় সামরিক ঝুঁকিরও জন্ম দিয়েছে।
এই হামলার ফলে ইরান এবং তার প্রক্সি গোষ্ঠীগুলো সরাসরি আমেরিকা ও ইসরায়েলের ওপর ভয়াবহ পাল্টা হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে, যা পুরো অঞ্চলকে একটি মহাপ্রলয়ঙ্কারী যুদ্ধের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।
প্রক্সি যুদ্ধের বিস্তার
খামেনির মৃত্যুকে প্রক্সি গোষ্ঠীগুলো তাদের অস্তিত্বের জন্য ‘রেড লাইন’ হিসেবে গণ্য করে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে একযোগে ব্যাপক হামলা শুরু করেছে, যা আঞ্চলিক সংঘাতকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। লেবাননের হিজবুল্লাহ উত্তর ইসরায়েলের গভীরে কয়েকশ রকেট নিক্ষেপ করেছে, অন্যদিকে ইয়েমেনের হুথিরা লোহিত সাগরে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ এবং ইসরায়েলি বন্দর লক্ষ্য করে ড্রোন হামলা চালাচ্ছে। একই সময়ে ইরাক ও সিরিয়ায় অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতেও ইরান-সমর্থিত মিলিশিয়া গোষ্ঠীগুলো ভারী মিসাইল ও ড্রোন হামলা পরিচালনা করছে।
আয়াতুল্লাহ খামেনির মৃত্যু কেবল ইরানের অভ্যন্তরীণ শাসনকাঠামোয় পরিবর্তনের সূচনা নয়, বরং এটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী প্রতিষ্ঠিত আন্তর্জাতিক নিয়ম-নীতি ও ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্যে এক ঐতিহাসিক ফাটলের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
এই সমন্বিত আক্রমণের ফলে মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা কাঠামো ঝুঁকির মুখে পড়েছে এবং ইসরায়েলকে কার্যত একটি বহুমাত্রিক যুদ্ধের মোকাবিলা করতে হচ্ছে। এই তীব্র প্রক্সি যুদ্ধের বিস্তার পুরো অঞ্চলকে একটি উন্মুক্ত ও দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
ওয়াশিংটনের অভ্যন্তরীণ চাপ
খামেনি হত্যাকাণ্ডের পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই বিতর্কিত সামরিক পদক্ষেপ নিয়ে মার্কিন কংগ্রেসের ভেতরে তীব্র অভ্যন্তরীণ বিতর্ক ও রাজনৈতিক ঝড় শুরু হয়েছে। বিরোধী ডেমোক্র্যাট নেতারা সরাসরি অভিযোগ করেছেন যে, কংগ্রেসের পূর্বানুমতি না নিয়ে এই হামলা চালানো সাংবিধানিক ক্ষমতার অপব্যবহার এবং এটি আমেরিকাকে একটি ‘অপ্রয়োজনীয় ও দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের’ দিকে ঠেলে দিয়েছে।
অনেক আইনপ্রণেতা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সেনা ও কূটনীতিকদের জীবন চরম ঝুঁকির মুখে পড়বে এবং এর দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক দায়ভার আমেরিকান করদাতাদের বহন করতে হবে। হোয়াইট হাউসের সমর্থকরা একে একটি ‘নির্ণায়ক ও প্রতিরক্ষামূলক’ পদক্ষেপ হিসেবে দাবি করলেও, ডেমোক্র্যাটরা এই হামলার আইনি ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এবং জরুরি শুনানির দাবি জানিয়েছেন। এই অভ্যন্তরীণ বিভাজন ট্রাম্প প্রশাসনের যুদ্ধের নীতিকে দুর্বল করছে এবং বৈশ্বিক মঞ্চে আমেরিকার অবস্থানের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
বৈশ্বিক মেরুকরণ: রাশিয়া, চীন ও উত্তর কোরিয়ার অবস্থান
খামেনি হত্যাকাণ্ড এবং পরবর্তী পরিস্থিতিতে বিশ্বশক্তিগুলোর মধ্যেকার ফাটল এখন চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা নতুন করে মেরুকরণ স্পষ্ট করে তুলেছে। রাশিয়া এবং চীন এই ঘটনাকে মধ্যপ্রাচ্যে পশ্চিমা আধিপত্য বিস্তারের একটি আগ্রাসী প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছে এবং এর তীব্র বিরোধিতা করেছে। এর ফলে একদিকে আমেরিকা ও তার পশ্চিমা মিত্ররা, অন্যদিকে রাশিয়া, চীন ও উত্তর কোরিয়ার মতো রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে স্নায়ুযুদ্ধ চূড়ান্ত রূপ নিতে পারে।
রাশিয়া
রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাজিমির পুতিন খামেনি হত্যাকাণ্ডকে ‘আন্তর্জাতিক আইনের নগ্ন লঙ্ঘন’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে এর তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন এবং এর কঠোর প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন। ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা ও কূটনৈতিক চাপের মুখে থাকা রাশিয়ার জন্য ইরান একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত ও সামরিক অংশীদার। এই হত্যাকাণ্ডের ফলে রাশিয়ার ইউক্রেন অভিযানের জন্য প্রয়োজনীয় ড্রোন ও সামরিক সরঞ্জামের সরবরাহ ব্যবস্থা ঝুঁকির মুখে পড়েছে। মস্কো আশঙ্কা করছে, মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা বাড়লে তাদের ইরানকে সহায়তা করার ক্ষমতা কমে যাবে এবং আমেরিকার প্রভাব আরও বৃদ্ধি পাবে।
চীন
চীন এই হত্যাকাণ্ডের তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে তাদের ক্রমবর্ধমান জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং এই অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করার জন্য সরাসরি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসী নীতিকে দায়ী করেছে। বেইজিং মনে করে, আমেরিকার এই পদক্ষেপ তাদের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’-এর মতো দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক প্রকল্পগুলোকে হুমকির মুখে ফেলবে। এরফলে চীন ইরানের ওপর থেকে পশ্চিমা চাপ কমাতে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়াতে পারে এবং প্রয়োজনে অর্থনৈতিক সহায়তা বৃদ্ধির ইঙ্গিত দিয়েছে। এই পরিস্থিতি চীন ও আমেরিকার মধ্যকার বিদ্যমান ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনাকে আরও চরম পর্যায়ে নিয়ে যাবে।
উত্তর কোরিয়া
উত্তর কোরিয়া এই যৌথ হামলাকে ‘গুণ্ডাতুল্য আচরণ’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে তীব্র নিন্দা জানিয়েছে এবং তেহরানের প্রতি তাদের অকুন্ঠ সমর্থন ঘোষণা করেছে। ওয়াশিংটনের সাথে দীর্ঘদিনের বৈরী সম্পর্কের কারণে পিয়ংইয়ং এই ঘটনাকে আমেরিকার হেমোনিক বা আধিপত্যবাদী’ নীতির অংশ হিসেবে দেখছে। বিশ্লেষকদের মতে উত্তর কোরিয়া সামরিক প্রযুক্তি ও মিসাইল তৈরির গোপন তথ্য ইরানকে সরবরাহ করে এই সংকটে সরাসরি ভূমিকা রাখতে পারে, যা আমেরিকার জন্য নতুন মাথাব্যথার কারণ হবে। এই হত্যাকাণ্ড রাশিয়া-চীন-উত্তর কোরিয়া ও ইরানের মধ্যেকার সামরিক অক্ষকে আরও মজবুত করতে পারে।
আয়াতুল্লাহ খামেনির মৃত্যু কেবল ইরানের অভ্যন্তরীণ শাসনকাঠামোয় পরিবর্তনের সূচনা নয়, বরং এটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী প্রতিষ্ঠিত আন্তর্জাতিক নিয়ম-নীতি ও ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্যে এক ঐতিহাসিক ফাটলের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এই ঘটনা একদিকে ইরানি জনগণের একটি বড় অংশের মধ্যে চার দশকের ধর্মীয় শাসনের অবসান ও স্বাধীনতার নতুন আশা জাগিয়ে তুলেছে, অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ছড়িয়ে পড়া যুদ্ধের দাবানল বিশ্বকে এক ভয়াবহ অনিশ্চয়তার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। ইরান-ইসরায়েল-আমেরিকার এই সরাসরি সংঘর্ষ আঞ্চলিক সামরিক ভারসাম্যকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দিয়েছে, যার ফলে লেবানন, ইয়েমেন, ইরাক ও সিরিয়ার মতো দেশগুলো চরম ধ্বংসযজ্ঞের সম্মুখীন হতে পারে।
হরমুজ প্রণালী অবরুদ্ধ হওয়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ শৃঙ্খল ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে, যা আকাশচুম্বী মুদ্রাস্ফীতি এবং বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দার ঝুঁকি তৈরি করেছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে স্নায়ুযুদ্ধ চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা যেকোনো মুহূর্তে একটি অনিয়ন্ত্রিত বিশ্বযুদ্ধে রূপ নিতে পারে। এমতাবস্থায় জাতিসংঘ এবং নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন যাতে সরাসরি সংঘর্ষ প্রশমিত করা যায় এবং হরমুজ প্রণালীতে নৌ-চলাচল স্বাভাবিক রাখা যায়। বিশ্ব নেতাদের এখন কেবল সামরিক প্রতিক্রিয়া নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার জন্য একটি নতুন কূটনৈতিক ফ্রেমওয়ার্ক তৈরির ওপর জোর দিতে হবে।
- সুমন সুবহান: কবি ও কথাশিল্পী