অভিভাবকদের জন্য বসার চেয়ার ও নাগরিক স্বস্তির তর্ক

এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের অভিভাবকদের খোলা আকাশের নিচে অপেক্ষা। ছবি: মারুফ ইসলাম

বৃহস্পতিবার বিকালে একজন আত্মীয়কে ফোন করে তার ছেলের এইচএসসি পরীক্ষা কেমন হয়েছে জানতে চাইলাম। তিনি বললেন, ছেলের পরীক্ষা ভালোই হয়েছে। কিন্তু তাঁর নিজের সম্ভবত জ্বর আসছে। ছেলেকে পরীক্ষাকেন্দ্রে দিয়ে কেন্দ্রের বাইরে যখন অপেক্ষা করছিলেন তখন বৃষ্টিতে ভিজেছেন।

পরদিন শুক্রবার সকালে সংবাদমাধ্যমের খবর: পরীক্ষাকেন্দ্রের বাইরে অভিভাবকদের জন্য শেড এবং বসার জন্য চেয়ারের ব্যবস্থা রাখার নির্দেশ দিয়েছে ঢাকা শিক্ষাবোর্ড।

এই ঘটনার কয়েকদিন আগে কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা জন্য রাজধানীর আগারগাঁওয়ে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ল্যাবরেটরিতে গিয়েছিলাম। দেখলাম নিচ তলায় বসার জন্য কোনো চেয়ারই খালি নেই। অনেকেই দাঁড়িয়ে আছেন। কয়েকজন নারী ও বয়স্ক লোকসহ বেশ কয়েকজনকে দেখা গেলো প্রবেশপথের সিঁড়িতে বসে আছেন। তারা সবাই এসেছেন শারীরিক কোনো না কোনো পরীক্ষা করাতে। প্রত্যেকেরই কোনো না কোনো অসুস্থতা আছে। অথবা অসুস্থ কাউকে নিয়ে এসেছেন। তাদের অপেক্ষা করার মতো একটা ন্যূনতম সম্মানজনক ও আরামদায়ক ব্যবস্থা থাকাই কাম্য। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতায় অধিকাংশ সময়ই এই সম্মান ও স্বস্তি নিশ্চিত করা যায় না।

এই ইনস্টিটিউটের পরীক্ষা-নিরীক্ষা বিশ্বাসযোগ্য এবং গ্রহণযোগ্য বলে এটি চালু হওয়ার পর থেকেই এখানে মানুষের ভিড়। এই ইনস্টিটিউট প্রতিদিন যত মানুষের ল্যাবরেটরি পরীক্ষা করানোর সক্ষমতা রাখে, মানুষ উপস্থিত হয় তার চেয়ে অনেক বেশি। সকালে প্রতিষ্ঠানটি খোলার আগে থেকেই লম্বা লাইন পড়ে যায়। সেখানে একজন পরিচিতের সঙ্গে দেখা। তিনি জানান, সাভার থেকে এসেছেন। ভোর ৫টায় এসে লাইনে দাঁড়িয়েছেন। তিনি এসে দেখেন তারও আগে অনেকে এসে লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন।

এরকম জনগুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে সেবা নিতে যাওয়া মানুষের জন্য সম্মান, সুরক্ষা ও স্বস্তি নিশ্চিত করা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব। তেমনি প্রায় ২০ কোটি মানুষের দেশে এই মানের যতগুলো প্রতিষ্ঠান থাকা প্রয়োজন, তার অনুপস্থিতিও বিবেচনায় রাখতে হয়।

চিকিৎসা খাতে ভরসা এবং একইসঙ্গে অস্বস্তির আরেকটি বড় উদাহরণ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। এটিই দেশের একমাত্র হাসপাতাল যেখানে যেকোনো সময় যেকোনো রোগী গেলে তাকে ভর্তি করতে কর্তৃপক্ষ বাধ্য। কিন্তু প্রতিদিন এখানে যে পরিমাণ রোগী আসে, যে পরিমাণ রোগী ভর্তি থাকে, সেই তুলনায় হাসপাতালের ধারণক্ষমতা কম। চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য কর্মীর সংখ্যাও তুলনামূলকভাবে কম। কিন্তু এটিও ঠিক যে, কেবিনে, ওয়ার্ডে এমনকি মেঝেতে থাকলেও ঢাকা মেডিকেলে ভর্তির পরে অন্তত রোগীদের চিকিৎসাটা হয়। খুব ব্যতিক্রম না হলে এখানে আর যাই হোক চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ কম। কিন্তু এখানে স্বস্তির সংকট আছে। তার মানে ঢাকা মেডিকেলের মানের এবং এই সিস্টেমের আরও ২০টা হাসপাতাল রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বড় শহরগুলোয় থাকলে একটি হাসপাতালের ওপর এত চাপ পড়তো না।

পরীক্ষা কেন্দ্রের সামনে একটি শেড নির্মাণ এবং সেখানে কিছু চেয়ারের ব্যবস্থা করতে সর্বোচ্চ কত টাকা লাগে? এর জন্য সরকারের কোনো বড় বরাদ্দেরও প্রয়োজন হয় না। এমনকি সরকারি তহবিলেরও প্রয়োজন হয় না।

মুদ্রার অন্যপিঠ হলো, প্রতিটি বিভাগীয় এবং বড় শহরেই অন্তত একটি বড় সরকারি মেডিকেল কলেজ এবং সরকারি হাসপাতাল আছে। কিন্তু এসব প্রতিষ্ঠানে গিয়ে সাধারণ মানুষ কাঙ্ক্ষিত সেবা পায় কি না, সেটি পুরোনো তর্ক। এমন অভিযোগ অহরহ শোনা যায় যে, রোগীর অবস্থা একটু জটিল হলেই তাকে ঢাকায় পাঠিয়ে দেয়া হয়। আর ঢাকার গন্তব্য মানেই ঢাকা মেডিকেল, সোহরাওয়ার্দী, পঙ্গু কিংবা বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় তথা পিজি হাসপাতাল। লাখ লাখ রোগীর চাপ এই কয়টি হাসপাতালের পক্ষে সামাল দেয়া সম্ভব? সঙ্গত কারণেই এসব প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়া এবং তারপরে একটি কেবিন তো দূরের কথা, সাধারণ ওয়ার্ডে শয্যা পেতেও তদবির করতে হয়। অর্থাৎ যখনই কোথাও সক্ষমতার তুলনায় অনেক বেশি রোগীর চাপ তৈরি হবে, সেখানে ভোগান্তি হবেই। সেজন্য সরকারের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পা যেমন থাকতে হয়, তেমনি কিছু বিষয়ে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তও নিতে হয়।

যেমন উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার্থীদের অভিভাবকদের অপেক্ষা করার জন্য যে প্রতিটা কেন্দ্রের সামনে একটি শেড এবং সেখানে পর্যাপ্ত চেয়ারের ব্যবস্থা রাখা দরকার—কর্তৃপক্ষ এটি উপলব্ধি করল প্রথম পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার পরে। এটি মন্দের ভালো। ‘বেটার লেট দ্যান নেভার’। বছরের পর বছর ধরে অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের পরীক্ষাকেন্দ্রে ঢুকিয়ে দিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তার ওপরে, কেন্দ্রের আশেপাশের বিভিন্ন শপিংমল ও হাসপাতালসহ নানা জায়গায় অপেক্ষা করেন। এর মধ্যে বৃষ্টিতে ভিজলে অসুস্থ হয়ে যেতে হয়। আবার কাঠফাটা রোদে অপেক্ষার যন্ত্রণাও আছে। তার মানে, পরীক্ষাকেন্দ্রের বাইরেও যে প্রত্যেক পরীক্ষার্থীর বিপরীতে একজন করে মানুষ অপেক্ষা করছেন এবং তাদের অপেক্ষা করার জন্য সেখানে যে অন্তত একটু বসার ব্যবস্থাও নেই, এই বাস্তবতাটা বিগত দিনের সরকারগুলো উপলব্ধিই করলো না?

পরীক্ষা কেন্দ্রের সামনে একটি শেড নির্মাণ এবং সেখানে কিছু চেয়ারের ব্যবস্থা করতে সর্বোচ্চ কত টাকা লাগে? এর জন্য সরকারের কোনো বড় বরাদ্দেরও প্রয়োজন হয় না। এমনকি সরকারি তহবিলেরও প্রয়োজন হয় না। এরকম একটি শেড প্রতিটি এলাকার যেকোনো স্বচ্ছল বা ধনি লোক স্বপ্রণোদিত হয়েই বানিয়ে দিতে পারেন। এটাকে বলা হয় কমিউনিটি ম্যানেজমেন্ট। কিন্তু কমিউনিটির সঙ্গে আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলোর সেই যোগাযোগ আছে কি না, সেটি অন্য তর্ক।

সেই তর্ক একপাশে রেখেও এটা বলা যায় যে, এবার অন্তত প্রথম পরীক্ষার পরেও যে ঢাকা বোর্ড এরকম একটি সিদ্ধান্ত নিলো, সেটি সাধুবাদযোগ্য। প্রশ্ন হলো, অন্য বোর্ডগুলোও কেন এরকম উদ্যোগ নেবে না? জেলা শহরের বাইরে বড় শহর তথা মহানগরীর কলেজগুলোয় সাধারণত পরীক্ষার্থীদের সঙ্গে তাদের অভিভাবকরা যান। অনেকে সন্তানকে কেন্দ্রে দিয়ে বাসায় বা অফিসে চলে যান। পরীক্ষা শেষ হওয়ার কিছু আগে আবার গেটে এসে অপেক্ষা করেন। কিন্তু তারপরও নানা কারণে অনেককে কেন্দ্রের সামনে অপেক্ষা করতে হয়। তাদের বসা তথা অপেক্ষার জন্য ন্যূনতম একটা ব্যবস্থা থাকা উচিত।

রাজধানীর ফার্মগেটে আনোয়ারা উদ্যানের কথা আপনাদের মনে থাকবে। তেজগাঁও কলেজের উল্টো দিকে এই ছোট্ট পার্কটি ছিল হাজার হাজার মানুষের অপেক্ষার স্থল। কেননা প্রতিনিয়তই এই কলেজে বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষার বাইরেও অনেক চাকরির পরীক্ষা হয়। সেই পরীক্ষার্থীদের সঙ্গে যারা আসতেন, তারা এই পার্কের বেঞ্চিতে বা ঘাসের ওপর বসে অপেক্ষা করতেন। কিন্তু মেট্রোরেলের স্টেশন বানাতে গিয়ে পার্কটি পুরোপুরি ধ্বংস করা হয়েছে। এখানে পার্কের কোনো অস্তিত্বই নেই। এর বিরুদ্ধে পরিবেশকর্মীরা আন্দোলন করেছেন। তার মানে মেট্রোরেলের স্টেশনের যিনি বা যারা নকশা করলেন, তারা একটি পাবলিক প্লেস তথা পার্কের মতো একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ স্থানকে বিবেচনাতেই রাখেননি।

একই অবস্থা অদূরেই কারওয়ান বাজারের পান্থকুঞ্জ পার্কের। এই পার্কটিও ধ্বংস করা হয়েছে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের সংযোগ সড়ক নির্মাণ করতে গিয়ে। পরিবেশকর্মীরা মাসের পর মাস আন্দোলন করেছেন, কিন্তু কোনো ফায়দা হয়নি।

তার মানে সরকারের ভাবনায় থাকে অবকাঠামো নির্মাণ করে প্রকল্প বাস্তবায়ন, কিন্তু সেই প্রকল্প বানাতে গিয়ে পরিবেশ ও প্রাণ-প্রকৃতি তথা জনস্বার্থ কীভাবে ক্ষুণ্ন হলো, তা অনেক সময়ই তাদের ভাবনায় থাকে না—যার বড় উদাহরণ ঢাকার এই দুটি গুরুত্বপূর্ণ পার্ক।

মোদ্দা কথা, নাগরিকের স্বস্তি, সুরক্ষা ও সম্মানের বিষয়টি বরবরই উপেক্ষিত থাকে। অথচ এগুলো নিশ্চিত করা খুব কঠিন কাজ নয়। যেসব হাসপাতাল বা ইনস্টিটিউটে মানুষের চাপ বেশি, সেখানে বসার জায়গাটি অপেক্ষাকৃত বড় করে তৈরি করা এবং পর্যাপ্ত চেয়ারের ব্যবস্থা রাখা খুব কঠিন কাজ নয়। এটি অনেক টাকারও ব্যাপার নয়। এখানে লাগে শুধু আন্তরিকতা এবং মানুষকে স্বস্তি দেয়ার মানসিকতা। একইভাবে পার্ক ও উদ্যান অক্ষত রেখেই কীভাবে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো গড়ে তোলা যায়, সেটি নকশা প্রণয়নের সময়ে বিবেচনায় রাখলে চোখের সামনে ঐতিহাসিক আনোয়ারা উদ্যান হারিয়ে যেতো না। ইতিহাস বলছে, ষাটের দশকের শেষদিকে ৬ দফার আন্দোলন চলাকালীন ১৯৬৭ সালের একদিন সন্তানকে দুগ্ধ পানরত অবস্থায় পাকিস্তানি বাহিনীর গুলিতে আনোয়ারা বেগম নামে এক নারী নিহত হন। পরে তার স্মৃতি রক্ষায় এই উদ্যানটির নাম দেয়া হয় ‘শহীদ আনোয়ারা মাঠ’—পরে সেখানে একটি দৃষ্টিনন্দন পার্কও গড়ে তোলা হয়। কিন্তু সেই উদ্যান, মাঠ ও পার্ক এখন কেবলই স্মৃতি।

যারা নকশা করেন আর নকশার অনুমোদন দেন, তাদের কাছে অবকাঠামো এবং প্রকল্প বাস্তবায়নই মূল কথা। সেই প্রকল্প বানাতে গিয়ে পরিবেশ ও প্রাণ-প্রকৃতি, ইতিহাস-ঐতিহ্য এবং সর্বোপরি জনস্বার্থ কতটুকু লঙ্ঘিত হলো, তা আমলে নেয়ার সংস্কৃতি আমাদের নেই। বাংলাদেশের মতো আয়তনে ছোট বিপুল জনসংখ্যার দেশে সব সময় এটা বিবেচনায় রাখা কঠিন। কিন্তু সদিচ্ছাটা গুরুত্বপূর্ণ। যেমন গুরুত্বপূর্ণ মানুষের স্বস্তি নিশ্চিত করা।

পরীক্ষাকেন্দ্রের বাইরে অভিভাবকদের অপেক্ষার জন্য শেড ও পর্যাপ্ত চেয়ারের ব্যবস্থা রাখা বড় কোনো কাজ নয়। বড় কোনো প্রকল্পেরও বিষয় নয়। কিন্তু এটি ছোট্ট একটি সিদ্ধান্ত এবং আন্তরিকতার বিষয়। সদিচ্ছা ও সহানুভূতির বিষয়। অনেক বড় বড় অনিময় ‍দুর্নীতির দেশে এরকম ছোটখাটো সদিচ্ছা আর আন্তরিকতাও মানুষকে আশাবাদী করে।

আমীন আল রশীদ: সাংবাদিক ও লেখক

Ad 300x250

সম্পর্কিত