হাসিনার দেশে ফেরার প্রতিজ্ঞায় দিল্লির মাথাব্যথা

লেখা:
লেখা:
গ্রেস করকোরান

হাসিনার দেশে ফেরার প্রতিজ্ঞায় দিল্লির মাথাব্যথা। স্ট্রিম গ্রাফিক

শেখ হাসিনার সম্প্রতি দেশে ফেরার অঙ্গীকার করেছেন। এই অঙ্গীকার বাংলাদেশের জন্য অস্থিতিশীলতার কারণ হতে পারে। তেমনি ভারতের জন্যও এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব দেখা দিতে পারে। বাংলাদেশের নতুন সরকারের সঙ্গে দিল্লি সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। ভারতে শেখ হাসিনার ধারাবাহিক রাজনৈতিক তৎপরতা ভারতের এই প্রয়াসের ওপর প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশে প্রভাব বিস্তারের ভারত ও চীনের মধ্যে প্রতিযোগিতায়ও তা ছাপ ফেলতে পারে।

অস্ট্রেলিয়াভিত্তিক থিংক ট্যাংক লোউই ইনস্টিটিউটের ভূরাজনীতি ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ গ্রেস করকরান তাঁর বিশ্লেষণে এসব দিক তুলে ধরেছেন।

তিনি লিখেছেন, ‘গত ৫ আগস্ট দিল্লিতে ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাবস অব সাউথ এশিয়া-এর এক বিশেষ আয়োজনে দেয়া ভার্চুয়াল বক্তব্যে বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আগামী ডিসেম্বরে বাংলাদেশে ফিরবেন বলে জানিয়েছেন। গণঅভ্যুত্থানের মুখে ২০২৪ সালের আগস্টে ভারতে আশ্রয় নেওয়া হাসিনা দাবি করেন, তাঁর এই প্রত্যাবর্তনের উদ্দেশ্য হবে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার এবং জাতীয় সংহতি পুনঃস্থাপন করা। যদিও জুলাই আন্দোলনকারীরা সম্ভবত তাঁর এই দাবি প্রত্যাখান করবে।’

বাংলাদেশে তাঁর জন্য কী অপেক্ষা করছে, তা বিবেচনা করলে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা আসলেই অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ পদক্ষেপ বলা চলে।

গণঅভ্যুত্থান দমনে তাঁর সরকারের সহিংস ভূমিকার দায়ে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল হাসিনাকে তাঁর অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করেন। জাতিসংঘের একটি তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে ১৫ আগস্টের মধ্যে প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। নিহতদের বড় অংশই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গুলিতে নিহত হন। তবে শেখ হাসিনা এই অভিযোগগুলোকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত আখ্যা দিয়ে প্রত্যাখ্যান করেছেন।

এদিকে বাংলাদেশে হাসিনার পতনের পর ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নির্বাচনে বড় ব্যবধানে জয় পেয়ে সরকার গঠন করেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং রাজনৈতিক অস্থিরতায় ক্ষতিগ্রস্ত অর্থনীতিকে আবার সতেজ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

তবে নতুন সরকার গুরুতর অর্থনৈতিক চাপের মুখে পড়েছে। পাশাপাশি পশ্চিম এশিয়ায় সংঘাতের ফলে জ্বালানি উচ্চমূল্যের অতিরিক্ত প্রভাবের মুখোমুখিও হতে হচ্ছে এই সরকারকে।

এরই মধ্যে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল-এর সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদন দাবি করছে যে বিএনপি তাদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি থেকে পিছিয়ে আসবার স্পষ্ট সংকেত পাওয়া গেছে। এছাড়া সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও বাকস্বাধীনতা নিয়ে ক্রমবর্ধমান উদ্বেগের বিষয়টিও সেখানে তুলে ধরা হয়েছে।

এই অবস্থায় হাসিনার প্রত্যাবর্তন তারেক রহমানের ক্ষমতাকে সরাসরি চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলবে। দেশেও তা অস্থিতিশীল পরিস্থিতিও ডেকে আনতে পারে।

ভারতের জন্যও এই সময়টি অত্যন্ত অস্বস্তিকর। শেখ হাসিনা ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঘনিষ্ঠ হিসেবে বিবেচিত। তাঁর দল আওয়ামী লীগ দিল্লির সাথে, বিশেষ করে নিরাপত্তা সহযোগিতা ও আঞ্চলিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে দৃঢ় সম্পর্ক বজায় রেখেছিল। তাঁকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক মারাত্মকভাবে তিক্ত হয়ে ওঠে। মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার একটি স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করে। সেই সময় থেকে বাংলাদেশে ভারতবিরোধী জনমত আরও স্পষ্ট ও দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।

শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন কেবল অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পদক্ষেপ নয়। বাংলাদেশে ভারত ও চীনের প্রভাববলয়ে তা এক অন্যতম প্রভাবকও বটে। কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রতিবেশী দেশের সাথে ভারত কীভাবে সম্পর্ক রক্ষা করে তা এখন দেখার বিষয়। দিল্লি এখন একটি কঠিন সিদ্ধান্তের মুখে দাঁড়িয়ে।

ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর থেকে দিল্লি দুই দেশের সুসম্পর্ক পুনরুদ্ধারে কাজ করে আসছে। সেপ্টেম্বরে দিল্লিতে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দেওয়ার জন্য তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে। তবে সাম্প্রতিক ঘটনাবলীর কারণে সেখানে তারেক রহমানের উপস্থিতির বিষয়টি অনেকটাই অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

ঢাকা কূটনৈতিক উপায়ে ভারত থেকে হাসিনার প্রত্যর্পণ চেয়ে আসছে। দিল্লি তাতে সাড়া দিচ্ছে না। ভারতে হাসিনার অবস্থান দুই প্রতিবেশী দেশের সম্পর্কের মধ্যে বিরাজমান নানা উত্তেজনার একটি স্থায়ী অনুঘটক হয়ে উঠেছে। হাসিনার সাম্প্রতিক বক্তব্য পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করেছে। তাঁকে বক্তব্য দিতে দেওয়ার অনুমতি দেওয়ায় তারেক রহমান ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানান। তবে ভারতের দাবি, ওই বেসরকারি আয়োজনে সরকারের কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না।

ভারত যখন বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক পুনস্থাপনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে তখন বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের পরিধি ক্রমশ বিস্তৃত হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিজের প্রথম আনুষ্ঠানিক বিদেশ সফরের জন্য তারেক রহমান মালয়েশিয়ায় কৌশলগত সফরের মধ্য দিয়ে কার্যত চীনকে বেছে নেন। এই সফরে অবকাঠামো ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে চীনের সহযোগিতা কামনা করে তিনি প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। বেইজিংয়ে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস জানায়, ‘বেশিরভাগ আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক ইস্যুতে উভয় দেশই একই রকম দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে।’

এই অবস্থায় শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন কেবল অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পদক্ষেপ নয়। বাংলাদেশে ভারত ও চীনের প্রভাববলয়ে তা এক অন্যতম প্রভাবকও বটে। কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রতিবেশী দেশের সাথে ভারত কীভাবে সম্পর্ক রক্ষা করে তা এখন দেখার বিষয়। দিল্লি এখন একটি কঠিন সিদ্ধান্তের মুখে দাঁড়িয়ে।

সাবেক মিত্রকে রাজনৈতিক আশ্রয় দেওয়া অব্যাহত রাখলে ভারতের পুরনো সম্পর্ক রক্ষা পায়। তবে এতে তারেক রহমানের সরকারের সাথে অবিশ্বাস আরও গভীর হওয়ার এবং বাংলাদেশকে বেইজিংয়ের আরও কাছাকাছি ঠেলে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

শেখ হাসিনা আগামী ডিসেম্বরে হয়তো ফিরবেন। হয়তো ফিরবেন না। কিন্তু ভারতে তাঁর উপস্থিতি কী বার্তা বহন করে? সেই বার্তাই সম্ভবত দুই দেশের সম্পর্কের জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

লোউই ইনস্টিটিউট-এ প্রকাশিত ইংরেজি লেখার অনুবাদ। লেখক: অস্ট্রেলিয়া ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউটের ভূরাজনীতি এবং নিরাপত্তা বিষয়ক সিনিয়র পলিসি অ্যান্ড প্রজেক্টস ম্যানেজার

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত

হাসিনার দেশে ফেরার প্রতিজ্ঞায় দিল্লির মাথাব্যথা