leadT1ad

ইনবক্সের বাইরে—৩

খালেদা জিয়ার মৃত্যু, এনসিপি নেতাদের পদত্যাগ এবং চায়ের দোকানে এক সন্ধ্যা

প্রকাশ : ০৩ জানুয়ারি ২০২৬, ১৯: ৪৫
গ্রাফিক: তুফায়েল আহমদ

চা খাব বলে এই পৌষের সন্ধ্যায় মোড়ের চায়ের দোকানে গেলাম। শীতের কুয়াশা মোড়ানো ঢাকা শহরে এখনো ঝুলে আছে শোক। চায়ের দোকানের আড্ডাতেও ঝরে পড়ছে দীর্ঘশ্বাস।

দোকানের কাঠের বেঞ্চে আমাদের মহল্লার বুড়ো হাশেম সাহেব বসে আছেন। দোকানের ভিতর টুলের ওপর উবু হয়ে বসে আছে চা-দোকানি শফিক। বয়সে তরুণ। ‘অটো পাস’-এর যুগেও উচ্চমাধ্যমিকে ফেল করার পর তার কঠোর পিতা তাকে জোর করে এই দোকানে বসিয়ে দিয়েছেন।

আগে থেকে চলতে থাকা আলাপের সূত্র ধরে শফিককে লক্ষ্য করে হাশেম সাহেব বললেন, ‘ইতিহাস যখন কাউরে দুহাত ভইরা দিতে চায় শফিক, তখন তার বিদায়ও সেই রকম হয়। দেখলা না? জনসমুদ্র কারে কয়?’

শফিক মাথা নিচু করে মোবাইলে একটার পর একটা ছবি স্ক্রল করছিল। সে মুখ তুলল। নিচু স্বরে বলল, ‘দেখছি চাচা। লোকে বলতেছে বিশ লাখ, কেউ বলতেছে ২৫ লাখ। আমি একটা পত্রিকায় দেখলাম, জানাজায় নাকি লোক হইছে কমপক্ষে ৩২ লাখ!’

হাশেম সাহেব বললেন, ‘সংখ্যা দিয়া কি মানুষের ভালোবাসা মাপন যায় রে পাগলা! আমি শুধু দেখতেছিলাম ওই সাদা কাফনের মইদ্যে শুইয়া ছিল বাংলাদেশের চার দশকের রাজনীতির এক জেদ। এই জেদ কখনো ভাঙে নাই।’

এক মধ্যবিত্ত শহুরে বৃদ্ধ ও এক জেনজি তরুণের কথোপকথন থেকে বুঝলাম, তাঁরা কথা বলছেন খালেদা জিয়াকে নিয়ে। খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে যেন এক মিথের পুনর্জন্ম হয়েছে। তিনবারের এই সাবেক প্রধানমন্ত্রী, যাঁকে বাংলাদেশের রাজনীতি ‘আপসহীন’ উপাধি দিয়েছে, তাঁর মৃত্যু যেন পুরাণ থেকে উঠে আসা এক ট্র্যাজেডির শেষ দৃশ্য। যে মানুষটি বছরের পর বছর কারান্তরালে কিংবা গৃহবন্দী অবস্থায় তিলে তিলে শেষ হয়েছেন, কিন্তু ক্ষমতার কাছে মাথানত করেননি।

নতুন নাকি পুরনো বাংলাদেশ, সেটা সময় বলবে। কিন্তু আমাদের এই জল-কাদাময় বদ্বীপে একটা দীর্ঘস্থায়ী অভিশাপ আছে—আমরা বীরদের মৃত্যুতে কাঁদতে জানি, কিন্তু জীবিত থাকতে তাঁদের কদর করতে জানি না। আবার নতুন বীরদের পূজা করি, যারা ক্ষমতা পেলেই তাদের হলফনামার পৃষ্ঠাগুলো ভারী করতে শুরু করে।

ইতিহাসে এমন মৃত্যু সব সময় নাগরিকদের এক করে দেয়। হাশেম সাহেবের কণ্ঠে সেই কথাই প্রতিধ্বনিত হলো। তিনি বললেন, ‘শোনো শফিক, এই যে লাখ লাখ মানুষ ঢাকার রাস্তায় নাইমা আইলো, তারা কি শুধু একটা জানাজা পড়তে আইছিল? না। তারা আইছিল একটা ‘না’ বলার সাহসের জয় দেখতে।’

বন্দুকের নলের ভয় দেখিয়ে কিংবা গুম-খুনের ভয় দেখিয়ে যে মানুষের হৃদয় শাসন করা যায় না, বরং মানুষের হৃদয় শাসন করতে হয় নির্লোভ আপসহীনতা দিয়ে—সেই সত্যই কি জানান দিল না এই লাখো জনতা?

কথার মাঝখানে শফিক একটি ভিডিও অন করল। মোবাইলের স্ক্রিনে তারেক রহমান। পাশে পতাকায় মোড়ানো মায়ের কফিন। তিনি কথা বলছেন। শফিক বলল, ‘চাচা, এই ভিডিওটা কি দেখছেন? মাত্র ৫৮ সেকেন্ডের ভাষণ। মানুষ তো ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভাষণ দিয়াও এমন হাহাকার তৈরি করতে পারে না।’

আমার মনে পড়ল রবার্ট গ্রিনের লেখা ‘দ্য ফোর্টি এইট লজ অব পাওয়ার’-এর কথা। ওই বইয়ের চতুর্থ সূত্রে তিনি বলেছেন, ‘প্রয়োজনের চেয়ে সব সময় কম বলো। কম কথা তোমার কথার ওজন বাড়াবে। মানুষ তোমার পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে শঙ্কিত ও কৌতূহলী থাকবে।’

তারেক রহমান যেন সেই সূত্রই মেনে চলছেন। দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসন শেষে লন্ডন থেকে দেশে ফিরে তিনি প্রয়োজনের চেয়ে কমই কথা বলছেন। এতে কেউ দেখছেন কৌশল, কেউ দেখছেন সময় নেওয়ার রাজনীতি।

হাশেম সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘রাজনীতিতে মাঝেমধ্যে নীরবতা আর কম কথা বড় তলোয়ার হইয়া ওঠে।’

আমি ভাবলাম, তাই তো! প্রাচীন গ্রিসের ইতিহাসেও আমরা এমনটা দেখেছি। সেখানে মেসিডোনিয়ার রাজা দ্বিতীয় ফিলিপ একবার স্পার্টা দখলের হুমকি দিয়ে এক দীর্ঘ বার্তায় লিখেছিলেন—‘আমি যদি তোমাদের দেশে প্রবেশ করি, তবে তোমাদের খেতখামার জ্বালিয়ে দেব, তোমাদের মানুষকে হত্যা করব এবং শহর ধ্বংস করে দেব।’ উত্তরে স্পার্টানরা শুধু একটি শব্দ পাঠিয়েছিল: ‘যদি’। এই এক শব্দের উত্তর ফিলিপকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল।

আড্ডাটা এরপর মোড় নিল অন্যদিকে। শফিক একটু ইতস্তত স্বরে রাজনীতির মাঠে জামায়াতে ইসলামীর হঠাৎ ঝিমিয়ে পড়া নিয়ে কথা তুলল। সে বলল, ‘জামায়াত নিয়া মানুষের মধ্যে আর আগের মতন উত্তেজনা দেখা যাইতেছে না। এই এক বছর আগে, অভ্যুত্থানের পরপর তারা যেমনে মাঠ কাঁপাইতে শুরু করছিল... বাপরে বাপ!’

হাশেম সাহেব হাসলেন। সেই হাসিতে কিছুটা বিদ্রূপ আর কিছুটা ইতিহাসের নির্মমতা ছিল। মধ্যযুগে ইউরোপে রাজাদের ক্ষমতার বৈধতা দিত চার্চ। ‘ডিভাইন রাইট অব কিংস’ বা রাজাদের ঈশ্বরপ্রদত্ত ক্ষমতার তত্ত্ব দিয়ে তারা হাজার বছর শাসন করেছিল। বঙ্গদেশের ধর্মভিত্তিক রাজনীতিকদের মনেও সম্ভবত তেমন খায়েশ। কিন্তু সেই খায়েশ পূরণ হবে কি?

ইতিহাসে এমন মৃত্যু সব সময় নাগরিকদের এক করে দেয়। হাশেম সাহেবের কণ্ঠে সেই কথাই প্রতিধ্বনিত হলো। তিনি বললেন, ‘শোনো শফিক, এই যে লাখ লাখ মানুষ ঢাকার রাস্তায় নাইমা আইলো, তারা কি শুধু একটা জানাজা পড়তে আইছিল? না। তারা আইছিল একটা ‘না’ বলার সাহসের জয় দেখতে।’

মহাভারতের ইতিহাসেও দেখেছি, কৌরবরা ধর্মের দোহাই দিলেও তাদের আচরণে যখন অধর্ম প্রকাশ পেল, তখন তাদের পতন অনিবার্য হয়ে দাঁড়াল। এ থেকে বোঝা যায়, শাসক যদি ধর্মের মূল নৈতিকতা, মানে ন্যায়বিচার হারিয়ে ফেলে, তবে কেবল নামমাত্র ধর্মীয় পরিচয় তাকে রক্ষা করতে পারে না।

হাশেম সাহেব বললেন, ‘জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমানের একটা নিউজ ভাইরাল হইছে, দেখ নাই? ভারতীয় কূটনীতিকের সঙ্গে গোপন বৈঠক না কি জানি!’

শফিক বলল, ‘হ, দেখছি তো।’

হাশেম সাহেব বলতে থাকলেন, ‘শোনো, রাজনীতির খেলাটা খুব অদ্ভুত। এখন সারা দেশে ধানের শীষের জোয়ার উঠছে। জামায়াত এখানে নিজের প্রাসঙ্গিকতা কেমন ধইরা রাখে সেটাই দেখার বিষয়।’

তাঁদের কথোপকথনের মধ্যেই টেলিভিশনের পর্দায় খবর ভেসে উঠল। এনসিপির নেতাদের পদত্যাগের হিড়িক। এই খবর তরুণ শফিকের উত্তেজনা বাড়িয়ে দিল। সে গলার রগ ফুলিয়ে বলল, ‘এদের কাণ্ডটা দেখেন, চাচা। মানুষ কত আশা করছিল এদের ওপর। আর এরা এখন করতাছেটা কী!’

হাশেম সাহেব চশমাটা পরিষ্কার করতে করতে একটি দীর্ঘ দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। তিনি বললেন, ‘শোনো শফিক, প্রতিটি বিপ্লবই শেষ পর্যন্ত তার সন্তানদের ভক্ষণ করে। এই তরুণরা আইছিল ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের স্বপ্ন ফেরি করতে। কিন্তু ক্ষমতার মধু বড় বিষাক্ত রে বাবা!’

তরুণ শফিক ফ্যালফ্যাল করে প্রৌঢ় হাশেম সাহেবের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। হাশেম সাহেব বলেই চলেছেন, ‘ত্যাগ করলে লোকে মাথায় তুইলা রাখে। আর ত্যাগের নামে ভোগ করলে লোকে আস্তাকুঁড়ে ছুইড়া ফেলে।’

হাশেম সাহেব দোকানের বাইরে অন্ধকারের দিকে তাকালেন। দূরে আজান ভেসে আসছে।

এদের কথোপকথন শুনে আমার মনে হলো, নতুন নাকি পুরনো বাংলাদেশ, সেটা সময় বলবে। কিন্তু আমাদের এই জল-কাদাময় বদ্বীপে একটা দীর্ঘস্থায়ী অভিশাপ আছে—আমরা বীরদের মৃত্যুতে কাঁদতে জানি, কিন্তু জীবিত থাকতে তাঁদের কদর করতে জানি না। আবার নতুন বীরদের পূজা করি, যারা ক্ষমতা পেলেই তাদের হলফনামার পৃষ্ঠাগুলো ভারী করতে শুরু করে। মধ্যপন্থার আশা দেখানো তরুণদের এই নতুন গল্প থেকে আগামীর শাসকেরা কোনো শিক্ষা নেবেন? নাকি আবার কোনো এক বিশাল জানাজায় আমরা নতুন কোনো ট্র্যাজেডির শোকগাথা গাইব? কেননা, মহাকাব্য আর প্রহসন এই দেশে একই টেবিলে বসে কফি খায়।

শফিক মোবাইলটা পকেটে রাখল। হাশেম সাহেব চায়ের কাপে শেষ চুমুক দিলেন। চায়ের দোকানে ঝোলানো টেলিভিশনে খবর শোনা যাচ্ছে—খালেদা জিয়ার জানাজায় মানুষের ঢল আর এনসিপি নেতাদের একের পর এক পদত্যাগ।

এভাবেই কি তবে গড়ে ওঠে এক নতুন মানচিত্র? প্রশ্নটা হিমশীতল বাতাসে ভাসছে, যেমন ভাসে শীতের এই উদাস কুয়াশা। আমরা কেবল সেই কুয়াশার ভিতরে ভবিষ্যতের পদধ্বনি শোনার অপেক্ষা করতে পারি।

মারুফ ইসলাম: কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক

Ad 300x250

সম্পর্কিত