মীর রাকেশ রৌশানের মতামত

এসআইআর: ভারত রাষ্ট্রের একটি বিশেষ নিবিড় ষড়যন্ত্র

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচন নিয়ে স্ট্রিমে ধারাবাহিক বিশ্লেষণ লিখছেন ভারতীয় লেখক ও গবেষক মীর রাকেশ রৌশান। আজ ছাপা হলো প্রথম পর্ব।

মীর রাকেশ রৌশান
মীর রাকেশ রৌশান

স্ট্রিম গ্রাফিক

ভারত রাষ্টের পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর (স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন) বা বিশেষ নিবিড় সংশোধনীর কাজ শুরু হয় মূলত ২০২৫ সালের অক্টোবর মাস থেকে। এই কাজের জন্য বিশেষ ট্রেনিং দিয়ে প্রতিটি ভোটদান কেন্দ্রকে ঘিরে একটি করে বিএলও (বুথ লেভেল অফিসার) নিয়োগ করা হয়। যার অধিকাংশই প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষক। তাদের প্রতিটি ব্লকে সমষ্টি উন্নয়ন আধিকারিকের (বিডিও) এবং মহকুমা শাসকের (এসডিও) নেতৃত্বে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।

বলে রাখা জরুরি, পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর হওয়ার আগে বিহারে এসআইআর হয়। এই ঘটনার পর বিহারের ভোটার সংখ্যা ৭ কোটি ৮৯ লাখ থেকে কমে ৭ কোটি ২৪ লাখে নেমে আসে। ২০২৫ সালে বিহারের এসআইআরে প্রায় ৬৫ লাখ ভোটারের নাম খসড়া তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল। এই বিশাল সংখ্যক নাম বাদের কারণ হিসেবে মৃত, ডুপ্লিকেট বা স্থায়ীভাবে স্থানান্তরিত ভোটারদের চিহ্নিত করা হয়েছিল।

এই বিশাল সংখ্যায় নাম বাদ যাওয়া নিয়ে ভারত রাষ্ট্রের প্রতিটি জায়গায় এসআইআর চর্চার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। যদিও ইসিআই (ইলেকশন কমিশন অব ইন্ডিয়া)-এর নিরপেক্ষতা নিয়ে বিজেপি জোট বাদে দেশের বিরোধী পক্ষের রাজনৈতিক দলগুলো সরব হয়ে ওঠে। তারা দাবি করে, নির্বাচন কমিশন শাসক দল বিজেপিকে বিহারের ক্ষমতায় নিয়ে আসার জন্য নিরপেক্ষভাবে কাজ করছে না। ফলে এই নিয়ে বিরোধী রাজনৈতিক দল সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়। বিহারে এসআইআর চলাকালীন প্রচুর ত্রুটি দেখা যায়। এবং এই বিপুল সংখ্যক মানুষের বাদ দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে সুপ্রিম কোর্ট কমিশনের কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছিল। সেই পরিস্থিতি এবং বিহারে বিজেপির জোট শিবিরের ভোটের জয় নিয়ে রাজনৈতিক মহলে প্রচুর আলোচনা, তর্ক-বিতর্ক শুরু হয়। আর তারপর এই পূজার ছুটির পরপরই পশ্চিমবঙ্গে এসআইআরের কাজ শুরু হয়।

পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক মহলে বিকর্ক শুরু হলেও কমিশনের পক্ষ থেকে বিবৃতি দেওয়া হয় যে এসআইআরে কোনো বৈধ নাগরিক বাদ যাবে না এবং একজনও অবৈধ নাগরিক নতুন ভোটার তালিকায় স্থান পাবে না। নির্বাচন কমিশন এই স্লোগানকে সামনে রেখে বিএলওদের ট্রেনিং দেওয়া শুরু করে। অন্যদিক ভারতের কেন্দ্র সরকারে থাকা শাসক বিজেপি এবং পশ্চিমবঙ্গে থাকা শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসের মধ্যে শুরু হয় রাজনৈতিক বিতর্ক। সাধারণ মানুষের মধ্যে শুরু হয় গুঞ্জন। বাংলা চিরাচরিতভাবেই প্রতিবাদ এবং প্রতিরোধে এগিয়ে বিশেষ করে বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন, স্বাধীন বামপন্থী এবং সমাজ সচেতন মানুষরা প্রথম থেকেই এসআইআরকে একটি রাষ্ট্রীয় চক্রান্ত বলে দাবি করতে শুরু করেন।

প্রথম থেকেই সমাজের এই অংশের গোষ্ঠী, সংগঠন এবং বুদ্ধিদীপ্ত সাধারণ ব্যক্তিমানুষ প্রকাশ্যেই এসআইআরের বিরোধিতা শুরু করেন। সংসদীয় বামপন্থী দলগুলোর মধ্যে সিপিআইএমএল লিবারেশন বাদে প্রায় প্রতিটি রাজনৈতিক দল প্রকৃত বা ভালো এসআইআরের পক্ষে ছিল। এসআইআরের হওয়াতে তাঁরাও যথেষ্ট খুশি। বিজেপির বিভিন্ন নেতারা প্রথম অবস্থাতেই বাংলাদেশ থেকে আসা লাখ লাখ অনুপ্রবেশকারী এবং দুই কোটি রহিঙ্গাকে দেশ থেকে তাড়ানোর কথা বলেন। তারা মনে করছেন, বিজেপি বাংলার মসনদে আসীন হবে।

বলে রাখা জরুরি, পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর হওয়ার আগে বিহারে এসআইআর হয়। এই ঘটনার পর বিহারের ভোটার সংখ্যা ৭ কোটি ৮৯ লাখ থেকে কমে ৭ কোটি ২৪ লাখে নেমে আসে। ২০২৫ সালে বিহারের এসআইআরে প্রায় ৬৫ লাখ ভোটারের নাম খসড়া তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল।

তৃণমূল দলও তাদের মত করে প্রচার শুরু করে। পশ্চিবঙ্গের প্রথম সারির খবরের চ্যানেল এবং পত্র-পত্রিকা বিজেপির মতোই শুরু করে বাংলাদেশি এবং দু কোটি রোহিঙ্গার ত্বত্ত্ব। বিজেপি ও গণমাধ্যমগুলোর মিথ্যে প্রচারের ফলে মানুষের মধ্যে তৈরি হয় গুঞ্জন। ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক। অন্যদিকে দেশজুড়ে চলমান বাঙালি খেদাও আরও একটি সমস্যা। প্রতিদিন দেশের প্রতিটি প্রান্তে বিশেষ করে হিন্দু-হিন্দি-হিন্দুস্থান বেল্টে নিয়মিত হারে চলতে থাকে বাঙালিদের ওপর অত্যাচার যেন বাংলাভাষী মানেই বাংলাদেশি। কোথাও পরিচয় পত্রের অভাবে জেলবন্দী। কোথাও বা ভোটার কার্ড, আধার কার্ড থাকা সত্ত্বেও তারা বাংলাদেশি বলে অত্যাচারীত হয়। কোথাও কোথাও বাঙালি পরিযায়ী শ্রমিক বাংলাদেশি তকমা দিয়ে মেরে ফেলা হয়।

দেশজুড়ে প্রতিটি প্রান্ত থেকে অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিকরা আতঙ্কে, প্রাণের ভয়ে নিজ রাজ্য পশ্চিমবঙ্গে ফিরতে শুরু করেন। বিশেষ করে বাংলার অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিকদের মধ্যে মূলত মুর্শিদাবাদের শ্রমিক সবচেয়ে বেশি। কিন্তু দেশের মূল ধারার সংবাদমাধ্যম এই খবরগুলো প্রকাশ করে না। এখনো সেই খবর হয় না বললেই চলে। মাঝে মাঝে শ্রোতের বিপরীতে চলা কিছু গণমাধ্যম খবরগুলো করলে শিরোনামে থাকে পরিযায়ী শ্রমিক।

ভদ্রবিত্তের এই ‘পরিযায়ী’ শব্দটি নিয়ে আমার আপত্তি আছে। একই দেশের ভিন্ন রাজ্যে কাজ করতে যাওয়া শ্রমিক কীভাবে পরিযায়ী হয়? তাহলে নিজভূমেই তাঁকে পরিযায়ী তকমা দেওয়া হয়। থাক সে কথা, এই বৃহৎ অংশের শ্রমিকদের মধ্যে নির্মাণ শ্রমিক সবচেয়ে বেশি এবং তাঁরা ধর্মে সংখ্যাগরিষ্ঠই মুসলমান। ভারত রাষ্ট্রের বসবাসকারী একটা বিষয় আমাকে অদ্ভুতভাবে ভারাক্রান্ত করে তোলে। এদেশে দলিত-আদিবাসীদের মেধা, নারীদের চরিত্র এবং মুসলমানদের দেশপ্রেম সদাই প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়। যাইহোক, এই ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে বাংলার এসআইআরের কাজ শুরু হয়।

বিহারের এসআইআর নিয়ে মামলা নিষ্পত্তি হওয়ার আগেই পশ্চিমবঙ্গসহ ১২টি রাজ্যে এবং কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলোতে নির্বাচন কমিশন এসআইআর করার কথা ঘোষণা করে। তবে মহারাষ্ট্র এবং আসামকে এই বাদ রাখা হয়। দেশের বিরোধী রাজনৈতিক শিবির থেকে বুদ্ধিজীবীদের দাবি, যেখানে যেখানে ‘ডবল ইঞ্জিন বিজেপি সরকার’ (যেখানে প্রদেশে বিজেপি ক্ষমতায়) আছে সেখানে নির্বাচন কমিশন ছাড় দিয়েছে।

নিন্দুকেরা বলছেন, ভারত রাষ্ট্রের নিবার্চন কমিশন নাগপুর থেকে আরএসএসের নির্দেশ মেনে কাজ করে চলেছে। বিহার এসআইআর বিজেপিকে ক্ষমতায় নিয়ে আসার চক্রান্ত করছে এবং নির্বাচন কমিশনের অনেক ত্রুটি আছে সেই বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। কারণ ২০২৫ সালের ৬ অক্টোবর আয়ুশ কর এবং বিষ্ণু নারায়ণ নামে দুজন রিপোর্টার্স কালেকটিভের সাংবাদিক বিহারের এসআইআর হওয়া ২৪৩টি কেন্দ্রে একটি সমীক্ষা করে দেখিয়েছেন এসআইআরের চূড়ান্ত তালিকায় অনেক মৃত ভোটার রয়েছে। প্রায় ১৪ লঅখ ৩৫ হাজার ডুপ্লিকেট ভোটার রয়েছে। লাখ লাখ মানুষের ভোটার ভুয়া ঠিকানায় আছে।

সেই সময়ে কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধি প্রেস কনফারেন্স করে দেখান, একই নাম এবং একই ছবি দেওয়া একাধিক জায়গায় ভোট আছে। আবার পর পর করা কয়েকটি প্রেস কনফারেন্সে দেখিয়েছেন, বিদেশি মডেলের দেওয়া ছবি দিয়ে ভুয়া ভোটার আছে। আবার একই ছবি দিয়ে নানান নামে ভোটার আছে। এছাড়াও তিনি দেখিয়েছেন, একটি ছোট্ট বাড়ির ঠিকানায় একশোরও বেশি ভোটারের নাম আছে। নির্বাচন কমিশন এই বিষয়ে কোনো সদুত্তর দিতে পারেনি।

  • মীর রাকেশ রৌশান: লেখক ও গবেষক

সম্পর্কিত