ঈদের ছুটি শুরু হয়ে গেছে। বাবা আর বোন যাবে গ্রামের বাড়িতে। তাদের গাড়িতে উঠিয়ে দিতে গেলাম গাবতলীতে।
সকালের আলো গাঢ় হচ্ছে তখন। ঘড়ির কাঁটা ৭টা ছুঁই ছুঁই। চারদিকে মানুষের ঢল। কারও হাতে ব্যাগ, কারও কাঁধে শিশু। প্রত্যেকের চোখেমুখে বাড়ি ফেরার অদ্ভুত তাড়া। শহর যেন হঠাৎ করেই গ্রামে ফিরে যেতে চাইছে।
একটা পিকআপ ভ্যানের পেছনে গাদাগাদি করে মানুষ উঠছে। একজন আরেকজনকে টেনে তুলছে। কয়েকজন উঠে পড়েছে এরইমধ্যে। কেউ ঝুলছে পেছনের রড ধরে। পাশেই এক তরুণী (দেখে মনে হলো গার্মেন্টসকর্মী) তাঁর বৃদ্ধা মাকে বলছিলেন, ‘মা, আর গাড়ি পাইমু না। এইডাতেই উইঠা পড়ো।’
ঠিক তখনই মোবাইল ফোনে নিউজ নোটিফিকেশন এলো—টাঙ্গাইলে যাত্রীসহ রড বোঝাই ট্রাক উল্টে ১৫ জন নিহত। বিস্তারিত খবরে জানা গেল, ট্রাকটিতে একইসঙ্গে রড ও যাত্রী ছিল। তারা যাচ্ছিল উত্তরবঙ্গের দিকে। পথে ভোর সাড়ে ৪টার দিকে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের সরাতৈল দক্ষিণপাড়া এলাকায় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রাস্তার পাশে খাদে পড়ে উল্টে যায় ট্রাকটি। এতে ট্রাকের নিচে চাপা পড়ে ১৫ জন নিহত ও ৬ জন আহত হয়েছেন।
রড পরিবহনকারী একটি ট্রাকে কী করে এতগুলো যাত্রী থাকতে পারে, সেই প্রশ্ন বিস্ময়কর হলেও, ঈদের সময় এটিই বাস্তবতা। প্রতি ঈদে এরকম শত শত মানুষ ট্রাক ও পিক-আপে চেপে গ্রামের বাড়িতে ফেরে।
একটু পর খবর পেলাম, বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলার বনানী পর্যটন মোটেল-সংলগ্ন ঢাকা-রংপুর মহাসড়কে আরেকটি দুর্ঘটনা ঘটেছে।
ভদ্রলোকের নাম আনিসুর রহমান (৩৫)। চাকরি করেন ব্র্যাকের রংপুর মহানগরের মাহিগঞ্জ শাখায়। তাঁর গ্রামের বাড়ি পাবনার সুজানগর উপজেলার গোপালপুর গ্রামে। ঈদের ছুটিতে সেখানেই ফিরছিলেন মোটরসাইকেল যোগে। সঙ্গে ছিলেন স্ত্রী ও চার বছরের মেয়ে।
সকাল সাতটার দিকে বগুড়ার বনানী এলাকায় পৌঁছালে পেছন দিক থেকে একটি গাড়ি মোটরসাইকেলটিকে ধাক্কা দেয়। এতে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে আনিসুর রহমান, তাঁর স্ত্রী ও সন্তান সড়কে ছিটকে পড়েন। ঘটনাস্থলেই আনিসুর ও তাঁর মেয়ে আয়েশার মৃত্যু হয়। পরে স্থানীয় লোকজন গুরুতর আহত স্ত্রী পুষ্পা খাতুনকে উদ্ধার করে শহীদ জিয়াউর রহমান হাসপাতালে ভর্তি করেন।
প্রতি বছর ঈদের ছুটি শুরু হয়, আর সড়কে শুরু হয় মৃত্যুর মিছিল। গতকাল রোববার (২৪ মে) ফরিদপুরের নগরকান্দায় বিআরটিসির বাসের সঙ্গে সংঘর্ষে অ্যাম্বুলেন্সে থাকা এক পরিবারের চারজন নিহত হয়েছেন। তার আগের দিন (২৩ মে) যশোর-খুলনা মহাসড়কে কাভার্ড ভ্যানের ধাক্কায় মা ও ছেলে নিহত হয়েছেন। এরপর মেহেরপুর ও কুষ্টিয়াতেও সড়ক দুর্ঘটনায় কয়েকজন নিহত হয়েছেন।
বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের খবরে দেখা যাচ্ছে, মাত্র দুই দিনেই সড়কে ৩০ জনের বেশি প্রাণ হারিয়েছে। প্রতি বছর এই একই দৃশ্য দেখা যায়। ঈদের আগে মানুষ বাড়ি ফিরতে গিয়ে সড়কে প্রাণ হারাবে। তারপর টেলিভিশনে শোক, ফেসবুকে ক্ষোভ, মন্ত্রীর আশ্বাস—এসব দেখা যাবে কিছুদিন। ঈদ শেষ, আবার সব স্বাভাবিক। প্রতি ঈদে একই পুনরাবৃত্তি।
কিন্তু কেন? কেন ঈদ এলেই সড়কগুলো হঠাৎ মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়? প্রকৃত সত্য হচ্ছে, এই মৃত্যুগুলোকে দুর্ঘটনা বলা হলেও এর অনেকটাই পূর্বনির্ধারিত। কারণ সমস্যাগুলো পুরোনো, দৃশ্যমান এবং বহুবার চিহ্নিত।
সবাই জানে, ঈদের সময় পরিবহনব্যবস্থার ওপর অস্বাভাবিক চাপ পড়ে। কয়েক কোটি মানুষ কয়েক দিনের মধ্যে ঢাকা ছাড়তে চায়। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) জানিয়েছে, গত বছর ঈদে প্রায় ১ কোটি ৭ লাখ মোবাইল ব্যবহারকারী ঢাকা ছেড়েছিলেন।
আবার ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) বলেছিল, ঈদের ছুটিতে প্রতিদিন ১৫ থেকে ২০ লাখ মানুষ ঢাকা ছাড়ছেন। সেই হিসেবে ঈদের সময়ে এক কোটির বেশি মানুষ ঢাকা থেকে বাইরে যায়।
কিন্তু রাষ্ট্রের পরিবহন অবকাঠামো এত বিপুলসংখ্যক যাত্রীর চাপ নেওয়ার মতো অবস্থায় নেই। পর্যাপ্ত বাস নেই, ট্রেন কম, নৌপথ অব্যবস্থাপনায় ভরা। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি ও বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা কেন্দ্রের জরিপ বলছে, ঈদের সময় প্রতিদিন প্রায় ১৬ লাখ মানুষ নিয়মিত পরিবহনব্যবস্থায় ঢাকা ছাড়তে পারে। এর মধ্যে শুধু বাসে মাত্র ৮ লাখ যাত্রী পরিবহন করা সম্ভব।
আর এই পরিবহন স্বল্পতার কারণে মানুষ বিকল্প উপায়ে বাড়ি ফিরতে বাধ্য হয়।
আমাদের দেশের মানুষের কাছে ঈদ যেহেতু পরিবারে ফেরার সামাজিক বাধ্যবাধকতা; তারা চায় যেকোনো উপায়ে ঈদের সময় বাড়ি ফিরতে। আর এই বাধ্যবাধকতার সুযোগ নেয় পরিবহন খাতের নৈরাজ্য। ফিটনেসবিহীন বাস রাস্তায় নামে। মহাসড়কে একই সঙ্গে বাস, ট্রাক, মোটরসাইকেল, থ্রি-হুইলার চলতে থাকে। ক্লান্ত চালক টানা ১২-১৪ ঘণ্টা গাড়ি চালান। কোথাও নিয়ম নেই, কোথাও তদারকি নেই। পুরো সড়কব্যবস্থা ঈদের সময় এক ধরনের অস্থায়ী জুয়ার টেবিলে পরিণত হয়।
সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো, এই বিশৃঙ্খলাকে আমরা ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হিসেবে মেনে নিয়েছি। ট্রাক বা পিকআপে মানুষ গাদাগাদি করে বাড়ি ফিরছে—এই দৃশ্য এখন আর কাউকে খুব বেশি বিস্মিত করে না। বাসের ছাদে যাত্রী, ট্রেনের ছাদে মানুষ যাওয়া যেন ঈদের ‘ঐতিহ্য’ হয়ে গেছে। অথচ এগুলো সরাসরি মৃত্যুর আমন্ত্রণ।
রাষ্ট্র কি এসব জানে না? অবশ্যই জানে। প্রতি বছরই সড়কমন্ত্রী বড় বড় কথা বলেন। টিভি ক্যামেরাসমেত কাউন্টারে কাউন্টারে হানা দেন। লোকদেখানো অভিযান হয়। চেকপোস্ট বসে। ফিটনেস পরীক্ষা হয়। কিন্তু বাস্তবে খুব কম পরিবর্তন দেখা যায়। কারণ সমস্যাটা কেবল আইনের নয়; সমস্যাটা রাজনৈতিক অর্থনীতির।
গতকালও (২৪ মে) সড়ক ও সেতুমন্ত্রী রবিউল আলম মধুর মধুর বুলি আউড়েছেন। গাজীপুরের কালিয়াকৈরের খাড়াজোড়ায় সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধ ও নিরাপদ ঈদযাত্রা নিশ্চিত করতে আয়োজিত এক গণসচেতনতামূলক সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি পরিবহন মালিক ও শ্রমিক নেতাদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘আপনারা অবশ্যই বাইপাইল, এলেঙ্গা, চন্দ্রাসহ এই অঞ্চলে সুশৃঙ্খল ও নির্দ্বিধায় ঈদযাত্রা নিশ্চিত করবেন।’
মহাসড়কের পাশে অস্থায়ী বাস কাউন্টার স্থাপন করে যানজট সৃষ্টি করা যাবে না এবং রাস্তার উপর যত্রতত্র বাস রেখে যান চলাচলে বিঘ্ন ঘটানো থেকেও বিরত থাকতে হবে বলেও হুঁশিয়ারি দেন তিনি।
সড়কমন্ত্রী বলেন, ‘ফিটনেসবিহীন যানবাহন কোনোভাবেই সড়কে নামানো যাবে না এবং অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের বিরুদ্ধেও কঠোর অবস্থান নেওয়া হবে।’
মন্ত্রী যা যা বলেছেন, তা যদি বাস্তবায়ন করতেন, কতই না ভালো হতো!
দেশের পরিবহন খাত দীর্ঘদিন ধরেই এক ধরনের শক্তিশালী স্বার্থগোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে। বাস মালিক সমিতি, শ্রমিক ইউনিয়ন, রাজনৈতিক প্রভাব—সব মিলিয়ে এই খাত এমন এক ক্ষমতাকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে, যেখানে রাষ্ট্র অনেক সময় নিয়ন্ত্রকের চেয়ে সমঝোতাকারীর ভূমিকায় থাকে। ফলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা থাকলেও বাস্তবে তা টেকে না।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো আমাদের উন্নয়ন-দর্শন। আমরা উড়ালসেতু বানাই, এক্সপ্রেসওয়ে বানাই, মেট্রোরেল বানাই; কিন্তু নিরাপদ গণপরিবহন সংস্কৃতি তৈরি করতে পারি না। সড়কে মানুষ কীভাবে চলবে, চালক কত ঘণ্টা গাড়ি চালাবে, যাত্রীর নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত হবে, এসব প্রশ্ন উন্নয়নের আলোচনায় প্রায় অনুপস্থিত। ফলে উন্নয়ন দৃশ্যমান হয়, নিরাপত্তা হয় না।
এই জায়গায় রাষ্ট্রের ব্যর্থতার পাশাপাশি সমাজের হতাশাও কাজ করে। অনেক মানুষ জানেন ট্রাকের পেছনে যাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ। তবু তারা যান। কারণ তাদের সামনে আর কোনো বাস্তব বিকল্প নেই। কেউ ছুটি শেষ হওয়ার আগে বাড়ি পৌঁছাতে চান, কেউ টিকিট পাননি, কেউ বাড়তি ভাড়া দিতে পারেন না। অর্থাৎ এই ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রাও এক ধরনের অর্থনৈতিক বাধ্যবাধকতা।
মনে পড়ে ইতালীয় দার্শনিক আন্তোনিও গ্রামসির কথা। তিনি বলেছিলেন, পুরোনো ব্যবস্থা যখন মরতে থাকে আর নতুন ব্যবস্থা জন্ম নিতে পারে না, তখনই ‘অসুস্থ লক্ষণ’ দেখা দেয়।
ঈদযাত্রা যেন সেই অসুস্থ লক্ষণগুলোর একটি। মানুষ জানে ট্রাক-পিকআপে যাত্রা বিপজ্জনক, তবু ঈদযাত্রার এই যে সিস্টেম দাঁড়িয়ে গেছে, এই সিস্টেমের ভেতর দিয়েই তাকে বাঁচতে হবে।
প্রতি ঈদে সড়কে মৃত্যুর মিছল দেখে আমরা কিছুদিন খুব আবেগপ্রবণ হয়ে উঠি। ফেসবুকে ক্ষোভ লিখি, টেলিভিশনে টকশো হয়, পত্রিকায় সম্পাদকীয় ছাপা হয়। কিন্তু কয়েকদিন পর আবার সব থেমে যায়। যেন এই মৃত্যুগুলোও আমাদের জাতীয় জীবনের এক মৌসুমি আচার।
কিন্তু মৃত্যু কখনো মৌসুমি হওয়া উচিত নয়। প্রতিটি দুর্ঘটনায় মরা যাওয়া মানুষগুলোর বাড়ি ছিল, পরিবার ছিল, ঈদের নতুন জামা নিয়ে অপেক্ষা করা সন্তান ছিল। অথচ মৃত্যূর পর তারা হয়ে গেছে শুধুই সংখ্যা।
সকালের রোদ চড়া হয়ে এসেছে। গাবতলীর বাসগুলো একের পর এক হর্ন বাজিয়ে ছাড়ছে। মানুষ দৌড়ে উঠছে। কেউ জানালা দিয়ে হাত নেড়ে বিদায় দিচ্ছে। হঠাৎ মনে হলো, এই শহর যেন প্রতি ঈদে এক বিশাল বিদায়ঘাটে পরিণত হয়। কেউ বাড়ি ফিরতে পারে, কেউ আর ফেরে না।
বাসের ধোঁয়া আর বাড়ি ফেরা যাত্রীদের কোলাহলের ভেতর প্রশ্নটা ভাসতে থাকল—রাষ্ট্র কি সত্যিই চায় এই মৃত্যুগুলো থামুক, নাকি আমরা সবাই ধীরে ধীরে মৃত্যুকেও উৎসবের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে মেনে নিতে শিখে গেছি?
- মারুফ ইসলাম: কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক