বর্তমান বাংলাদেশে সংঘটিত অমানবিক সহিংস ঘটনাগুলোর প্রতিক্রিয়ায় অতি-ডানপন্থী চিন্তক ও রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলো যখন ‘প্রকাশ্যে শাস্তি’র দাবি উত্থাপন করছে, তখন তা কেবল অপরাধ নিয়ন্ত্রণের ভাষা হিসেবে সামনে আসছে না। বরং এটি ক্ষমতার পুনঃপ্রতিষ্ঠা, নৈতিক আধিপত্য তৈরি, সামাজিক নিয়ন্ত্রণের বিস্তার এবং গণ-আবেগকে রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত করার একটি কৌশল হিসেবেও কাজ করছে।
লেখা:

বর্তমান বাংলাদেশে সংঘটিত অমানবিক সহিংস ঘটনাগুলোর প্রতিক্রিয়ায় অতি-ডানপন্থী চিন্তক ও রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলো যখন ‘প্রকাশ্যে শাস্তি’র দাবি উত্থাপন করছে, তখন তা কেবল অপরাধ নিয়ন্ত্রণের ভাষা হিসেবে সামনে আসছে না। বরং এটি ক্ষমতার পুনঃপ্রতিষ্ঠা, নৈতিক আধিপত্য তৈরি, সামাজিক নিয়ন্ত্রণের বিস্তার এবং গণ-আবেগকে রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত করার একটি কৌশল হিসেবেও কাজ করছে।
প্রাক-আধুনিক সমাজে প্রকাশ্যে শাস্তি ছিল রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার দৃশ্যমান প্রদর্শন। জনসমক্ষে দেহকে শাস্তি দেওয়ার মাধ্যমে রাষ্ট্র শুধু অপরাধের পরিণতি দেখাতো না; বরং স্পষ্ট করে জানিয়ে দিত যে ক্ষমতা কার হাতে রয়েছে। ফলে শাস্তি সেখানে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার চেয়ে বেশি ক্ষমতার প্রদর্শনী হিসেবেই কাজ করতো।
সমকালীন বাংলাদেশে ফার-রাইট রাজনীতি একই ক্ষমতাকৌশলকে নতুন সামাজিক ও মতাদর্শিক কাঠামোর মধ্যে পুনরুৎপাদন করছে। সহিংস অপরাধকে তারা মানুষের মধ্যে ভয়, ক্ষোভ এবং নৈতিক আতঙ্ক তৈরির উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করছে। এরপর ‘কঠোর’ বা ‘প্রকাশ্য’ শাস্তিকে একমাত্র কার্যকর সমাধান হিসেবে উপস্থাপন করছে। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তারা নিজেদেরকে সমাজের তথাকথিত ‘নৈতিকতার বিচারক’ বা পিতৃতান্ত্রিক নৈতিকতার রক্ষক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করছে।
কিন্তু এই অবস্থান বিচারব্যবস্থার অন্তর্নিহিত সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংকটগুলোকে আড়াল করে দেয়। ফলে সমস্যার কাঠামোগত কারণগুলো অদৃশ্য হয়ে যায়।
মর্মান্তিক ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনাগুলোতে অতি-ডানপন্থী গোষ্ঠীগুলো প্রায়ই প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ড, পাথর নিক্ষেপ বা অন্যান্য শারীরিক শাস্তির দাবি তোলে। কিন্তু একই সঙ্গে তারা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নকে আড়ালে রাখে—
পিতৃতান্ত্রিক সামাজিক কাঠামো কীভাবে নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা তৈরি ও পুনরুৎপাদন করছে?
ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে নীরবতা বা স্বাভাবিকীকরণের মাধ্যমে এই পরিস্থিতিকে টিকিয়ে রাখছে?
রাষ্ট্রীয় বিচারব্যবস্থা কেন ভিকটিম-বান্ধব হয়ে উঠতে পারছে না?
বিচারব্যবস্থা কেন অনেক ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীনদের বয়ান নির্মাণের হাতিয়ার হিসেবে কাজ করছে?
ক্ষমতাবান অপরাধীরা কীভাবে এবং কেন শাস্তির বাইরে থেকে যাচ্ছে?
অর্থাৎ, প্রকাশ্যে শাস্তির এই দাবিগুলো কাঠামোগত বিশ্লেষণকে সরিয়ে দিয়ে ঘটনাকে এক ধরনের আবেগীয় প্রদর্শনীতে পরিণত করে।
আধুনিক সমাজে বাস্তব সামাজিক সংকটগুলো অনেক সময় ধীরে ধীরে প্রদর্শনীতে রূপ নেয়। তখন বিচারও আর শুধু ন্যায়বিচারের প্রশ্ন থাকে না; বরং জনসমক্ষে প্রতিশোধের দৃশ্য তৈরি করে আবেগীয় তৃপ্তি অর্জনের উপায়ে পরিণত হয়। প্রকাশ্যে শাস্তির সবচেয়ে বড় সমস্যা এখানেই।
এটি সমাজকে ন্যায়বিচারের পথে এগিয়ে নেওয়ার বদলে সহিংসতার প্রতি সংবেদনশীলতা কমিয়ে দিতে পারে। মানুষ যখন বারবার জনসমক্ষে দেহের অপমান, নির্যাতন বা মৃত্যুকে ‘বিচার’ হিসেবে দেখতে শুরু করে, তখন সহিংসতাই ধীরে ধীরে সামাজিক নৈতিকতার ভাষা ও মানদণ্ডে পরিণত হতে থাকে।
সামাজিক কাঠামোকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, আধুনিক ক্ষমতা শুধু মানুষের জীবন নিয়ন্ত্রণ করে না; বরং নির্ধারণ করে কোন দেহকে প্রকাশ্যে অপমানিত, শাস্তিপ্রাপ্ত বা মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া হবে। ফলে প্রকাশ্যে শাস্তি অনেক ক্ষেত্রে ন্যায়বিচারের চেয়ে বেশি ক্ষমতার দৃশ্যমান সহিংসতার রূপ ধারণ করে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, অতি-ডান রাজনীতি প্রায়ই নির্বাচিত নৈতিকতার চর্চা করে। তারা কিছু নির্দিষ্ট ঘটনার ক্ষেত্রে অত্যন্ত উচ্চকণ্ঠ হলেও, যখন একই ধরনের সহিংসতা নিজেদের মতাদর্শিক বা প্রাতিষ্ঠানিক পরিসরের ভেতরে ঘটে, তখন নীরব থাকে। কারণ তাদের লক্ষ্য সবসময় ন্যায়বিচার নয়; বরং নৈতিক কর্তৃত্বের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা।
ফলে প্রশ্ন থেকে যায়—প্রকাশ্যে শাস্তি কি সত্যিই সহিংসতা কমায়, নাকি সমাজকে আরও সহিংস কল্পনার দিকে ঠেলে দেয়? এটি কি বিচার প্রতিষ্ঠা করে, নাকি প্রতিশোধকে বিচার হিসেবে বৈধতা দেয়? এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, যে সমাজ সহিংসতার কাঠামোগত কারণগুলো পরিবর্তন না করে শুধু দেহকে প্রকাশ্যে শাস্তি দিতে চায়, সেই সমাজ কি শেষ পর্যন্ত সহিংসতাকেই পুনরুৎপাদন করে না?
ফয়সাল জামান: লেখক ও গবেষক

বর্তমান বাংলাদেশে সংঘটিত অমানবিক সহিংস ঘটনাগুলোর প্রতিক্রিয়ায় অতি-ডানপন্থী চিন্তক ও রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলো যখন ‘প্রকাশ্যে শাস্তি’র দাবি উত্থাপন করছে, তখন তা কেবল অপরাধ নিয়ন্ত্রণের ভাষা হিসেবে সামনে আসছে না। বরং এটি ক্ষমতার পুনঃপ্রতিষ্ঠা, নৈতিক আধিপত্য তৈরি, সামাজিক নিয়ন্ত্রণের বিস্তার এবং গণ-আবেগকে রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত করার একটি কৌশল হিসেবেও কাজ করছে।
প্রাক-আধুনিক সমাজে প্রকাশ্যে শাস্তি ছিল রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার দৃশ্যমান প্রদর্শন। জনসমক্ষে দেহকে শাস্তি দেওয়ার মাধ্যমে রাষ্ট্র শুধু অপরাধের পরিণতি দেখাতো না; বরং স্পষ্ট করে জানিয়ে দিত যে ক্ষমতা কার হাতে রয়েছে। ফলে শাস্তি সেখানে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার চেয়ে বেশি ক্ষমতার প্রদর্শনী হিসেবেই কাজ করতো।
সমকালীন বাংলাদেশে ফার-রাইট রাজনীতি একই ক্ষমতাকৌশলকে নতুন সামাজিক ও মতাদর্শিক কাঠামোর মধ্যে পুনরুৎপাদন করছে। সহিংস অপরাধকে তারা মানুষের মধ্যে ভয়, ক্ষোভ এবং নৈতিক আতঙ্ক তৈরির উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করছে। এরপর ‘কঠোর’ বা ‘প্রকাশ্য’ শাস্তিকে একমাত্র কার্যকর সমাধান হিসেবে উপস্থাপন করছে। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তারা নিজেদেরকে সমাজের তথাকথিত ‘নৈতিকতার বিচারক’ বা পিতৃতান্ত্রিক নৈতিকতার রক্ষক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করছে।
কিন্তু এই অবস্থান বিচারব্যবস্থার অন্তর্নিহিত সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংকটগুলোকে আড়াল করে দেয়। ফলে সমস্যার কাঠামোগত কারণগুলো অদৃশ্য হয়ে যায়।
মর্মান্তিক ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনাগুলোতে অতি-ডানপন্থী গোষ্ঠীগুলো প্রায়ই প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ড, পাথর নিক্ষেপ বা অন্যান্য শারীরিক শাস্তির দাবি তোলে। কিন্তু একই সঙ্গে তারা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নকে আড়ালে রাখে—
পিতৃতান্ত্রিক সামাজিক কাঠামো কীভাবে নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা তৈরি ও পুনরুৎপাদন করছে?
ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে নীরবতা বা স্বাভাবিকীকরণের মাধ্যমে এই পরিস্থিতিকে টিকিয়ে রাখছে?
রাষ্ট্রীয় বিচারব্যবস্থা কেন ভিকটিম-বান্ধব হয়ে উঠতে পারছে না?
বিচারব্যবস্থা কেন অনেক ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীনদের বয়ান নির্মাণের হাতিয়ার হিসেবে কাজ করছে?
ক্ষমতাবান অপরাধীরা কীভাবে এবং কেন শাস্তির বাইরে থেকে যাচ্ছে?
অর্থাৎ, প্রকাশ্যে শাস্তির এই দাবিগুলো কাঠামোগত বিশ্লেষণকে সরিয়ে দিয়ে ঘটনাকে এক ধরনের আবেগীয় প্রদর্শনীতে পরিণত করে।
আধুনিক সমাজে বাস্তব সামাজিক সংকটগুলো অনেক সময় ধীরে ধীরে প্রদর্শনীতে রূপ নেয়। তখন বিচারও আর শুধু ন্যায়বিচারের প্রশ্ন থাকে না; বরং জনসমক্ষে প্রতিশোধের দৃশ্য তৈরি করে আবেগীয় তৃপ্তি অর্জনের উপায়ে পরিণত হয়। প্রকাশ্যে শাস্তির সবচেয়ে বড় সমস্যা এখানেই।
এটি সমাজকে ন্যায়বিচারের পথে এগিয়ে নেওয়ার বদলে সহিংসতার প্রতি সংবেদনশীলতা কমিয়ে দিতে পারে। মানুষ যখন বারবার জনসমক্ষে দেহের অপমান, নির্যাতন বা মৃত্যুকে ‘বিচার’ হিসেবে দেখতে শুরু করে, তখন সহিংসতাই ধীরে ধীরে সামাজিক নৈতিকতার ভাষা ও মানদণ্ডে পরিণত হতে থাকে।
সামাজিক কাঠামোকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, আধুনিক ক্ষমতা শুধু মানুষের জীবন নিয়ন্ত্রণ করে না; বরং নির্ধারণ করে কোন দেহকে প্রকাশ্যে অপমানিত, শাস্তিপ্রাপ্ত বা মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া হবে। ফলে প্রকাশ্যে শাস্তি অনেক ক্ষেত্রে ন্যায়বিচারের চেয়ে বেশি ক্ষমতার দৃশ্যমান সহিংসতার রূপ ধারণ করে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, অতি-ডান রাজনীতি প্রায়ই নির্বাচিত নৈতিকতার চর্চা করে। তারা কিছু নির্দিষ্ট ঘটনার ক্ষেত্রে অত্যন্ত উচ্চকণ্ঠ হলেও, যখন একই ধরনের সহিংসতা নিজেদের মতাদর্শিক বা প্রাতিষ্ঠানিক পরিসরের ভেতরে ঘটে, তখন নীরব থাকে। কারণ তাদের লক্ষ্য সবসময় ন্যায়বিচার নয়; বরং নৈতিক কর্তৃত্বের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা।
ফলে প্রশ্ন থেকে যায়—প্রকাশ্যে শাস্তি কি সত্যিই সহিংসতা কমায়, নাকি সমাজকে আরও সহিংস কল্পনার দিকে ঠেলে দেয়? এটি কি বিচার প্রতিষ্ঠা করে, নাকি প্রতিশোধকে বিচার হিসেবে বৈধতা দেয়? এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, যে সমাজ সহিংসতার কাঠামোগত কারণগুলো পরিবর্তন না করে শুধু দেহকে প্রকাশ্যে শাস্তি দিতে চায়, সেই সমাজ কি শেষ পর্যন্ত সহিংসতাকেই পুনরুৎপাদন করে না?
ফয়সাল জামান: লেখক ও গবেষক
.png)

একটি বেফাঁস মন্তব্য। তারপর কয়েকটা মিম। এরপর ইনস্টাগ্রাম পেজ। দেখতে দেখতে সেই পেজই হয়ে গেল রাজপথের আন্দোলন। আড়াই মাস বয়স হওয়ার আগেই ভারতের রাজধানী কাঁপিয়ে দিল ককরোচ জনতা পার্টি—সিজেপি। ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের একটি বিতর্কিত মন্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় গত ১৬ মে এটি একটি ব্যঙ্গাত্মক অনলাইন প্ল্য
১২ ঘণ্টা আগে
একটি টার্মিনাল বিকল হলেই কেন গোটা দেশকে এমন পঙ্গু দশায় পড়তে হবে? এর পেছনে আমাদের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব এবং জ্বালানি নিরাপত্তার ভঙ্গুর চিত্রটিই স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
১৫ ঘণ্টা আগে
রাজধানীসহ সারা দেশে সিএনজি স্টেশনে দীর্ঘ সারি নিছক সাময়িক কারিগরি বিভ্রাটের প্রতিফলন নয়। এটি জ্বালানি খাতের গভীর কাঠামোগত দুর্বলতারই বহিঃপ্রকাশ।
১৫ ঘণ্টা আগে
ভারতের গণমাধ্যমের জন্য এটি অস্বস্তিকর সময়। আরও স্পষ্ট করে বললে, এটি আত্মসমালোচনার সময়। অনেক বছর ধরে যে সংকট জমে উঠছিল, তার বিস্ফোরণ ঘটেছে রাস্তায়। আর সেই বিস্ফোরণের নাম ‘কাকরোচ জনতা পার্টি’। নামটি অদ্ভুত। কিন্তু এর ভেতরের বার্তা অত্যন্ত শক্তিশালী। এটি কোনো নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল নয়।
১৬ ঘণ্টা আগে