leadT1ad

বাংলাদেশের রাজনীতি ও রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান

প্রকাশ : ১৯ জানুয়ারি ২০২৬, ১৫: ৩৩
জিয়াউর রহমান। ছবি: সংগৃহীত

সমাজ সংসারে জাতির ক্রান্তিলগ্নে যে-সকল ক্ষণজন্মা মহাপুরুষের আবির্ভাব ঘটে, দেশ ও জাতিকে বিশৃঙ্খলা-অন্যায়-অত্যাচারের হাত থেকে উদ্ধার করেন যে, এবং যাদের ত্যাগ তিতিক্ষা ও বীরোচিত কর্মের কারণে গোটা জাতি নতুন করে প্রাণ ফিরে পায়, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান তাদের অন্যতম। বাংলাদেশের জনগণ যখন শেখ মুজিবুর রহমানের বাকশালি স্বৈরশাসনে নিষ্পেষিত, অত্যাচারে জর্জরিত, দেশ যখন দুর্ভিক্ষকবলিত, আওয়ামী শাসক গোষ্ঠী জনগণকে শোষণ ও বঞ্চিত করে সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলছিল, সেই সময়ে বীরোত্তম রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমান দেশের দায়িত্ব গ্রহণ করে সুচারুরূপে দায়িত্ব পালন করে দেশ-কাল-জাতির কাছে চিরকালীন ভক্তি, শ্রদ্ধা, ভালোবাসার আসন অলংকৃত করে রয়েছেন। তাঁর দীপ্ত প্রত্যয় ও জীবনাদর্শ দেশবাসীকে উজ্জীবিত করেছে।

প্রাচীন গ্রিসের এথেন্সের সক্রেটিস, পেরিক্লিসরা যেভাবে মানুষকে জাগিয়ে তুলেছিলেন, ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠায় ঠিক সেভাবে বাংলাদেশে জিয়াউর রহমান মানুষকে জাগিয়ে সুসংবদ্ধ গণঐক্য গড়ে তুলেছিলেন। জিয়াউর রহমানই প্রথম কালুর ঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে হতভম্ব জাতিকে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে দেশ স্বাধীন করতে পথের দিশা দিয়েছিলেন। রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসীন হয়ে ভারত সফরে গিয়েছিলেন। তার সম্মানে প্রদত্ত এক ভোজসভায় বক্তৃতা দিতে গিয়ে ভারতের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি নীলম সঞ্জীব রেড্ডি খুব স্পষ্টভাবে বলেন যে “মিস্টার প্রেসিডেন্ট, বাংলাদেশের ইতিহাসে আপনার আসন সবচেয়ে স্থায়ী হয়ে গেছে সেদিন, যেদিন আপনি সবার আগে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন”।

জিয়াউর রহমান প্রথম চট্টগ্রামে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করে বসে থাকেননি, তিনি নিজে রণাঙ্গনে যুদ্ধ শুরু করেছেন, মুক্তিবাহিনী ও গেরিলা বাহিনী গড়ে তুলেছিলেন। তিনি জেডফোর্স গঠন করেছেন। অসম সাহসিকতার সঙ্গে পাক হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে সম্মুখসমরে যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছেন। অথচ এ সময় আওয়ামী লীগের অনেক ঊর্ধ্বতন নেতা কলকাতায় বসে অলস সময় কাটিয়েছেন। তাদেরই অনেকেই আজ বলছেন জিয়া মুক্তিযুদ্ধ করেননি।

জিয়াউর রহমানের রাজনীতির প্রধান লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশের মানুষের প্রকৃত পরিচয় প্রতিষ্ঠা করা। মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত চেতনাকে ধারণ করে তিনি এগিয়ে গেছেন। পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিদের থেকে বাংলাদেশের বাঙালিদের তিনি আলাদা করেছেন। এ জন্য তিনি ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদের’ পরিবর্তে ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ প্রবর্তন করে দেশের ক্ষুদ্র জাতি সত্তাগুলোকে একত্রিত করার প্রয়াস চালিয়েছেন এবং তাতে তিনি সফলও হয়েছেন। সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতার স্থলে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ সংযোজন করেছেন। রাষ্ট্রীয় মূলনীতিতে, ‘আল্লাহর প্রতি অবিচল আস্থা ও বিশ্বাসের’ও প্রতিস্থাপন করে এদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণকে মর্যাদা প্রদান করেছেন। জিয়াউর রহমান বাংলাদেশকে স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে চেয়েছেন। যাতে দেশ অন্য রাষ্ট্রের প্রতি নির্ভরশীল না হয়। এ জন্যই জিয়াউর রহমান দেশকে যাবতীয় আধিপত্য ও বহির্দেশীয় হস্তক্ষেপ থেকে মুক্ত রাখা ও দেশের সমৃদ্ধি গৌরব মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য ১৯ দফা কর্মসূচি প্রদান করেছিলেন।

জিয়া তাঁর রাজনীতি দ্বারা বাংলাদেশকে প্রকৃত অর্থে রক্ষা করা এবং জনগণের জীবনমান উন্নত করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তিনি প্রচলিত রাজনীতিকে উৎপাদনের রাজনীতিতে রূপান্তরিত করেছিলেন। দেশের কৃষিক্ষেত্রে জমির ক্ষতি করণের সমস্যা মোকাবেলা করা, সেচ, বীজ, সার, আধুনিক প্রযুক্তি, স্বেচ্ছাশ্রমে খাল খনন, খামার ও পোলট্রি, গ্রামীণ শিল্প, তাঁতের উন্নয়ন ইত্যাদি ক্ষেত্রে মৌলিক বহু কাজে হাত দিয়ে এগিয়ে নিয়েছেন। দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করে রপ্তানি পর্যায়ে উন্নীত করাই ছিল তার লক্ষ্য।

বিশেষ করে জিয়াউর রহমান বন্যা সমস্যা সমাধান, শীতে সেচ, মাছের চাষ এসবকে একত্রে নিয়ে স্বেচ্ছাশ্রমে খালকাটার ক্ষেত্রে বিপ্লবী অভিযানে সমগ্র দেশ ও জাতিকে আলোড়িত করেছিলেন। কলে কারখানায় তিন শিফটে কাজের মাধ্যমে উৎপাদন বৃদ্ধিতে জোয়ারও সৃষ্টি করেছিলেন। প্রকৃত অর্থে তাঁর রাজনীতি ছিল কৃষি বিপ্লবের রাজনীতি, নিরক্ষরতা দূরীকরণ ও শিল্প বিপ্লবের রাজনীতি, পরিবার পরিকল্পনার রাজনীতি, নারী ও যুব জাগরণের রাজনীতি, বাংলাদেশ সরকারের মহিলা মন্ত্রণালয়, যুব মন্ত্রণালয়, ধর্ম মন্ত্রণালয় জিয়ার রাজনীতির ফসল। এর বাইরেও, নারীর কর্মসংস্থান ও আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠা, বেকারত্ব দূরীকরণ, আত্মকর্মসংস্থানের ব্যবস্থাকরণ, যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর, রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল প্রতিষ্ঠা এমনকি বিকেএসপি জিয়ার রাজনীতির অসাধারণ কৃতিত্ব হিসেবে, দেশ ও বিদেশে প্রশংসিত হয়েছে। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও জাতীয় প্রেস ক্লাব ও বর্তমান জাতীয় সংসদ ভবন জিয়ার রাজনীতির অসাধারণ ফসল।

জিয়াউর রহমানের রাজনীতির প্রধান লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশের মানুষের প্রকৃত পরিচয় প্রতিষ্ঠা করা। মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত চেতনাকে ধারণ করে তিনি এগিয়ে গেছেন। পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিদের থেকে বাংলাদেশের বাঙালিদের তিনি আলাদা করেছেন। এ জন্য তিনি ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদের’ পরিবর্তে ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ প্রবর্তন করে দেশের ক্ষুদ্র জাতি সত্তাগুলোকে একত্রিত করার প্রয়াস চালিয়েছেন এবং তাতে তিনি সফলও হয়েছেন

জিয়ার রাজনীতি বিশ্লেষণে আরও দেখা যায় যে, তাঁর রাজনীতি ছিল ‘মা, মাটি মানুষের রাজনীতি’। মাটি ও মানুষের একেবারে কাছে তিনি চলে গিয়েছিলেন। প্রচলিত শহুরেঘেঁষা রাজনীতিকে তিনি কঠিন করে তুলেছিলেন। বাংলাদেশের প্রত্যন্ত এলাকায় গ্রামে গঞ্জে তিনি নিয়মিত ছুটে গেছেন। নিরাপত্তা বেষ্টনীর তোয়াক্কা না করে মাইলের পর মাইল হেঁটেছেন, নিজ হাতে গাছ লাগিয়েছেন, গেঞ্জি আর প্যান্ট পরে কোদাল চালিয়ে খাল কেটেছেন, কারখানায় মেশিন চালিয়েছেন। নিজে মাঠে নেমে কাজ করে অন্যদের উদ্বুদ্ধ করেছেন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় এর আগে ও পরে কোন রাজনীতিবিদকে প্রকৃত অর্থে জনগণ এ ধরনের কাজ করতে আর দেখেনি। সে জন্য জিয়াউর রহমান সাধারণ মানুষের জিয়ায় পরিণত হয়েছিলেন।

জিয়ার রাজনীতি ছিল গণ মানুষের সংগঠনের রাজনীতি। তিনি একদলীয় বাকশালি ব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে বহুদলীয় গণতন্ত্রের রাজনীতি চালু করেছিলেন। গ্রাম উন্নয়নের জন্য গ্রাম সরকার, গ্রামের সাধারণ মানুষের চিকিৎসা সেবা প্রদানের জন্য নগ্নপদ ডাক্তারের পরিকল্পনা জিয়ার রাজনীতিরই ফসল। জিয়াউর রহমান প্রতিদিন গড়ে পাঁচটি করে সাংগঠনিক আলোচনা করতেন। ছোট বড় সবার সঙ্গে মিশতেন, কথা বলতেন। নেতাকর্মীদের রাজনৈতিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছিলেন এবং তাদেরকে জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক রাখতেও বলতেন। জিয়া তার সংক্ষিপ্ত রাজনৈতিক জীবনে প্রায় পাঁচ হাজারের মতো সাংগঠনিক সভা করেছেন।

রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের জনকল্যাণমূলক বিবিধ কার্যক্রমের ফলে দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় স্থিতিশীলতা ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ এবং শান্তিশৃঙ্খলা ফিরে আসে। দেশ ও বিদেশে তার শাসনামল যথেষ্ট প্রশংসিত হয়। এতে ঈর্ষান্বিত হয়ে দেশী বিদেশী আধিপত্যবাদী ও কুচক্রী মহল দেশের গণতান্ত্রিক পরিবেশ ধ্বংস করার চক্রান্ত শুরু করে। যার ফলশ্রুতিতে ১৯৮১ সালের ৩০শে মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে সেনাবাহিনীর একাংশের বিদ্রোহে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান শাহাদাত বরণ করেন।

মূলত এ হত্যাকাণ্ডের দ্বারা জিয়াউর রহমান শাসনামলে সূচিত দেশের গণতন্ত্র ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে আধিপত্যবাদী ও সম্প্রসারণবাদী শক্তি ধ্বংস করতে চেয়েছিল। কিন্তু আধিপত্য ও সম্প্রসারণবাদী, শক্তির চেষ্টা সত্ত্বেও জিয়াউর রহমানের শাসনামলে সূচিত উন্নয়নমূলক কার্যক্রমকে দেশের মানুষ মনে প্রাণে গ্রহণ করেছিল বলেই জিয়াউর রহমানের শাহাদাত পরবর্তী সময়ে বিএনপি আরও শক্তিশালী হয়ে তার যোগ্য সহধর্মিণী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে তিনবার সরকার গঠন করে। মূলত রাষ্ট্রপতি জিয়ার অনুসৃত নীতি ও কর্মসূচিকে ধারণ করেই বর্তমানে ১/১১ পরবর্তী সংকট মোকাবেলা করে আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল আগামী দিনে দেশের শাসন কাঠামোয় নিজকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য সুসংগঠিতভাবে এগিয়ে চলেছে।

ড. মো. শামছুল আলম: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও সমাজবিজ্ঞান অনুষদের ডিন

Ad 300x250

সম্পর্কিত