ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশন ও জনগণের প্রত্যাশা

প্রকাশ : ০৩ মে ২০২৬, ১৮: ৩৬
স্ট্রিম গ্রাফিক্স

বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন ইতোমধ্যেই শেষ হয়েছে। নতুন সংসদের এই সূচনাপর্বকে ঘিরে যেমন ছিল নানা প্রত্যাশা, তেমনি ছিল সংশয়ও। গণতান্ত্রিক রাজনীতির বাস্তবতায় সংসদ শুধু আইন প্রণয়নের ক্ষেত্র নয়, এটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি, সহনশীলতা এবং পারস্পরিক বোঝাপড়ার প্রতিফলনও বটে। বাংলাদেশের মতো দেশগুলোতে একটি নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশন সবসময়ই প্রতীকী হিসেবে বিবেচিত হয়। এটি শুধু যে কার্যক্রমের সূচনা তা নয়, বরং একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতির দিকনির্দেশনা। আগামীর সংসদ কোন দিকে যাচ্ছে, জনগণের প্রত্যাশা পূরণে সংসদ কতটা কাজ করবে সেসব বিষয় প্রথম অধিবেশনেই স্পষ্ট হয়ে উঠে। সেই বিবেচনায় এবারের অধিবেশনকে মূল্যায়ন করতে হলে একদিকে এর কার্যকারিতা, অন্যদিকে এর রাজনৈতিক বার্তা দুটিকেই একসাথে দেখতে হবে।

সংসদের কার্যকারিতা মূল্যায়নের একটি বড় মানদণ্ড হলো আইন প্রণয়ন। ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশন আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে ছিল বিশেষভাবে সক্রিয়। মোট ২৫ কার্যদিবসে অনুষ্ঠিত এই অধিবেশনকে সময়ের দিক থেকে একটি পূর্ণাঙ্গ ও কর্মব্যস্ত অধিবেশন বলা যায়। এই সময়ে ১৩৩টি অধ্যাদেশ উত্থাপন করা হয়েছে ও মোট ৯৪টি বিল পাস হয়েছে। এর মাধ্যমে সংসদের আইনগত কার্যক্রমের গতিশীলতা সহজেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তাই এটি বিদ্যমান প্রশাসনিক ও নীতিগত ধারাবাহিকতাকে আইনি কাঠামোর মধ্যে আনার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রচেষ্টা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

সংসদ যে শুধু আইন প্রণয়নেই সীমাবদ্ধ ছিল তা নয়। বরং সংসদ প্রাতিষ্ঠানিক কার্যকারিতা বৃদ্ধির দিকেও বিশেষ নজর দিয়েছে। এ অধিবেশনে মোট সাতটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। এর মধ্যে পাঁচটি স্থায়ী কমিটি এবং দুটি বিশেষ কমিটি। এসব কমিটি ভবিষ্যতে নীতিনির্ধারণ, তদারকি এবং জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুসমূহে গভীরতর পর্যালোচনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। এছাড়া রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আলোচনায় ২৮০ জন সদস্য অংশগ্রহণ করেন, যা একটি ব্যাপক অংশগ্রহণমূলক পরিবেশের প্রতিফলন। এই আলোচনা ৪০ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে চলে, যা সংসদীয় বিতর্কের পরিধি ও গুরুত্বকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে।

বাংলাদেশের জনগণ এখন একটি কার্যকর সংসদ চায়। সংসদে তর্ক-বিতর্ক হবে, কিন্তু তা যেন ব্যক্তিগত আক্রমণ বা অপ্রাসঙ্গিক ইস্যুতে সীমাবদ্ধ না থাকে। বরং সেই বিতর্ক থেকে যেন নীতিগত সমাধান বেরিয়ে আসে। এবারের অধিবেশনে বিতর্কের মধ্যেও একটি নিয়ন্ত্রিত পরিবেশ দেখা গেছে।

বলা বাহুল্য, এবার ২২০ জন প্রথমবার সংসদ সদস্য হয়েছেন। তাই স্বাভাবিকভাবেই অনেকে দুর্বল সংসদের আশঙ্কা করেছিল। কিন্তু, তেমনটি হয়নি। সরকারি দল ও বিরোধী দলের অংশগ্রহণমূলক উপস্থিতি ও আলোচনায় অংশগ্রহণ চোখে পড়ার মতো। বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসে বিরোধী দলের বর্জন বা নিষ্ক্রিয়তার কারণে সংসদের কার্যকারিতা প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার উদাহরণ নতুন নয়। কিন্তু এবারের অধিবেশনে বিরোধী দলের সক্রিয় অংশগ্রহণ একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করে। তারা বিভিন্ন আলোচনায় অংশ নিয়েছে, সরকারের নীতিমালা ও সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছে ও বিকল্প মতামত দিয়েছে, যা সংসদকে একটি অর্থবহ বিতর্কের জায়গায় পরিণত করেছে।

এখানে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ইতিবাচক দিক রয়েছে। প্রথম অধিবেশনে বিরোধিতা এবং সহাবস্থানের মধ্যে একটি ভারসাম্য লক্ষ্য করা গেছে। সংসদের ভেতরে তর্ক-বিতর্ক হয়েছে, কখনো তা উত্তপ্ত পর্যায়েও পৌঁছেছে। ইতিহাস, রাজনৈতিক বৈধতা, নির্বাচন-পরবর্তী বাস্তবতা ও জুলাই সনদ কার্যকর ইত্যাদি ইস্যুতে বাকবিনিময় ছিল তীব্র। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই উত্তাপ সংসদের দেয়াল অতিক্রম করে বাইরে বড় কোনো অস্থিরতা সৃষ্টি করেনি। পরিণত সংসদীয় আচরণের প্রতিফলনই আমরা দেখতে পেয়েছি। আশার ব্যাপার হলো, মতভেদ থাকা সত্ত্বেও তা নিয়ন্ত্রিত কাঠামোর ভেতরেই ছিল। এসব বিতর্ক রাষ্ট্রীয় কাজের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা হয়ে উঠেনি।

আবার, অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমানের সরব উপস্থিতি একটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ দিক। সংসদে তাঁর নিয়মিত উপস্থিতি, প্রশ্নোত্তর পর্বে অংশগ্রহণ এবং গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে সরাসরি বক্তব্য প্রদানের মাধ্যমে নির্বাহী বিভাগের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার একটি প্রবণতা দেখা গেছে। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে ঐক্য, সহনশীলতা এবং যৌথভাবে কাজ করার আহ্বান সংসদের ভেতরে একটি সহযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরিতে সহায়ক হয়েছে। এছাড়াও, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বশীল ও নমনীয় আচরণ। পুরো অধিবেশন জুড়ে তিনি বিরোধী দল ও মতকে সাদরে গ্রহণ করে একটি নজির সৃষ্টি করেছেন তাতে সন্দেহের অবকাশ নেই।

বলতে গেলে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় জনকল্যাণ নিশ্চিতে সরকারকে জবাবদিহিতার আওতায় আনার বিকল্প নেই। আর এই জবাবদিহিতার অন্যতম কার্যকর উপায় হলো সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্ব। পশ্চিমা গণতন্ত্রের ব্যাপক কার্যকারিতার পেছনের এই প্রশ্নোত্তর পর্ব বড় ভূমিকা রাখে। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই জনগণের প্রতিনিধিরা সরাসরি সরকারের কাছে বিভিন্ন নীতি, সিদ্ধান্ত ও কার্যক্রম সম্পর্কে ব্যাখ্যা চাইতে পারেন। ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনেও এই ধারা সক্রিয়ভাবে বজায় ছিল। অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রীর কাছে উত্তরের জন্য মোট ৯৩টি প্রশ্নের নোটিশ জমা পড়ে। এর মধ্যে তিনি সংসদে ৩৫টি প্রশ্নের উত্তর প্রদান করেন, যা নির্বাহী প্রধান হিসেবে তাঁর সরাসরি জবাবদিহিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত।

অন্যদিকে, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীদের কাছেও বিপুলসংখ্যক প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে। মন্ত্রীরা মোট ২ হাজার ৫০৯টি প্রশ্নের মধ্যে ১ হাজার ৭৭৮টি প্রশ্নের উত্তর সংসদে দিয়েছেন। এই পরিসংখ্যান সংসদীয় তদারকি ব্যবস্থার সক্রিয়তা এবং সরকারের বিভিন্ন স্তরে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার একটি ইতিবাচক ইঙ্গিত বহন করে। প্রশ্নোত্তর পর্বের এই সক্রিয়তা সংসদকে শুধু আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ রাখেনি, বরং এটিকে একটি কার্যকর জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার দিকেও এগিয়ে নিয়েছে। এই প্রক্রিয়া যত বেশি কার্যকর হবে, তত বেশি সংসদের প্রতি জনগণের আস্থা বাড়বে।

সংসদ মূলত কাজ করে কমিটির মাধ্যমে। যে সংসদের কমিটি ব্যবস্থা যত সক্রিয়, সেই সংসদ তত বেশি ফলপ্রসূ হয়। সংসদীয় গণতন্ত্রে কমিটিগুলোকে “মিনি-পার্লামেন্ট” বলা হয়। কারণ, এখানেই বিস্তারিত আলোচনা, পর্যালোচনা এবং নীতিগত সুপারিশের কাজ হয়। এই অধিবেশনে স্থায়ী কমিটির পাশাপাশি বিশেষ কমিটি গঠনের মাধ্যমে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে যৌথভাবে কাজ করার একটি কাঠামো তৈরি হয়েছে। সরকারি ও বিরোধী দলের সদস্যদের সমন্বয়ে গঠিত এই কমিটিগুলো যদি কার্যকরভাবে কাজ করে, তাহলে তা সংসদের সামগ্রিক কার্যকারিতা বহুগুণে বাড়িয়ে দিতে পারে। বিশেষ করে অর্থনীতি, প্রশাসন, জনসেবা বা জাতীয় সংকট ইত্যাদি বিষয়ে যৌথ কমিটির মাধ্যমে সমাধান খোঁজার উদ্যোগ একটি ইতিবাচক রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিচায়ক।

সংসদের কার্যকারিতা মূল্যায়নের একটি বড় মানদণ্ড হলো আইন প্রণয়ন। ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশন আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে ছিল বিশেষভাবে সক্রিয়। মোট ২৫ কার্যদিবসে অনুষ্ঠিত এই অধিবেশনকে সময়ের দিক থেকে একটি পূর্ণাঙ্গ ও কর্মব্যস্ত অধিবেশন বলা যায়। এই সময়ে ১৩৩টি অধ্যাদেশ উত্থাপন করা হয়েছে ও মোট ৯৪টি বিল পাস হয়েছে।

দীর্ঘ দিনের অভিজ্ঞতার আলোকে ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনকে একটি “সম্ভাবনাময় সূচনা” বলা যেতেই পারে। এটি নিখুঁত ছিল তা বলবো না। এতে আইন প্রণয়নের গুণগত দিক, আলোচনার গভীরতা বা কমিটির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায় তা সত্য। তবে একইসাথে এটি এমন একটি সংসদের আভাস দিচ্ছে যেখানে অংশগ্রহণ আছে, বিতর্ক আছে এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সহযোগিতার একটি প্রবণতা রয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো, এই প্রেক্ষাপটে জনগণের প্রত্যাশা কী? জনগণ ও জাতীয় স্বার্থ কতটুকু অগ্রাধিকার পাবে?

প্রথম অধিবেশনে এক পক্ষ আরেক পক্ষের সমালোচনা করেছে, যা সংসদীয় গণতন্ত্রের স্বাভাবিক চর্চা। কিন্তু সেই সমালোচনার মধ্যেই জাতীয় স্বার্থে একত্র হওয়ার প্রবণতাও দেখা গেছে। বিশেষ করে, জ্বালানি সংকটের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে সরকার ও বিরোধী দল যৌথভাবে কমিটি গঠন করেছে। এটি নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক ও প্রশংসনীয় পদক্ষেপ। কারণ, এ ধরনের সংকট মোকাবিলায় দলীয় অবস্থানের চেয়ে সমন্বিত উদ্যোগ বেশি কার্যকর হতে পারে।

বস্তুত, বাংলাদেশের জনগণ এখন একটি কার্যকর সংসদ চায়। সংসদে তর্ক-বিতর্ক হবে, কিন্তু তা যেন ব্যক্তিগত আক্রমণ বা অপ্রাসঙ্গিক ইস্যুতে সীমাবদ্ধ না থাকে। বরং সেই বিতর্ক থেকে যেন নীতিগত সমাধান বেরিয়ে আসে। এবারের অধিবেশনে বিতর্কের মধ্যেও একটি নিয়ন্ত্রিত পরিবেশ দেখা গেছে। এটি ধরে রাখা জরুরি। পাশাপাশি, জনগণ বাস্তব সমস্যার সমাধান চায়। মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের সংকট, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ইত্যাদি বিষয় মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। সংসদে এসব ইস্যুতে আরও গভীর আলোচনা এবং কার্যকর নীতি প্রণয়ন এখন সময়ের দাবি। তাছাড়াও সংসদীয় কমিটিগুলো কার্যকর হতে হবে এবং কমিটির স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং সময়মতো সুপারিশ বাস্তবায়ন হতে হবে।

জনগণ একটি স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ চায়। সংসদের ভেতরে মতভেদ থাকবে, এটি স্বাভাবিক। কিন্তু সেই মতভেদ যেন দেশের সামগ্রিক স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত না করে। প্রথম অধিবেশনে যে ভারসাম্যের আভাস পাওয়া গেছে তা ধরে রাখা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এই সূচনা কতটা সফল হবে, তা নির্ভর করবে পরবর্তী অধিবেশনগুলোতে এই ইতিবাচক প্রবণতা কতটা বজায় রাখা যায় তার ওপর। এক্ষেত্রে বিরোধী দলকে সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রমে সর্বদা সহযোগী হওয়ার বিকল্প নেই। সংসদ যদি সত্যিই জনগণের প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটাতে চায়, তাহলে তাকে শুধু আইন প্রণয়নেই সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না, বরং একটি জবাবদিহিমূলক, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং ফলপ্রসূ রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হতে হবে।

সংসদ যদি কেবল সমালোচনার জায়গা না হয়ে সমাধান খোঁজার ক্ষেত্র হয়ে ওঠে, তাহলে সেটিই হবে প্রকৃত অর্থে কার্যকর সংসদীয় চর্চা। সরকার ও বিরোধী দল একসঙ্গে কাজ করতে পারলে এবং বাস্তব সমস্যার সমাধানে যৌথভাবে ভূমিকা রাখতে পারলে সংসদ তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনের দিকে এগোতে পারবে। এবারের সংসদ অন্তত সেই পথে হাঁটার একটি ইঙ্গিত দিয়েছে বলেই মনে হচ্ছে।

ড. মো. শামছুল আলম: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও সমাজবিজ্ঞান অনুষদের ডিন।

সম্পর্কিত